আল্লামা (প্রথম কিস্তি)

সাত রাতের ইমলা 

হাম্মু আল হাইহি। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল আবদুর রহমানের একান্ত শ্রুতিলেখক। শারীরিক গড়নে ছিল অনেকটাই ইবনে বতুতার শ্রুতিলেখক ইবনে জুযাইয়ের মতো। খর্বকায়। মুখাবয়বও মনোরম না। অধিকহারে লেখালেখি আর পড়াশোনার প্রাবল্যে চোখজুড়ে হালকা ঝাপসা ভাব। অবশ্য জুযাইয়ের তুলনায় হাম্মু বোধবুদ্ধিতে বেশি তীক্ষ্ণ। প্রাণবন্ত। স্বভাবেও দৃঢ় ও স্থির। 

অনেকে নিঃশর্তভাবে, মোটামুটি বাধ্যবালকের মতোই অন্ধ অনুকরণে লেখে যায়। বাক্য যতই এলোমেলো, অগোছালো আর অর্থ-শব্দের বিবেচনায় অদ্ভুত সব বিচিত্রতায় ভরা হোক—বক্তা মুখ খোলা মাত্রই তারা দীর্ঘায়ুর দোয়া করে এবং বলা বাক্য কানে গিলে নিয়ে, বিনা বিচারে লেখে ফেলে। হাম্মু এমনটা না। 

ধরা যাক, ভাগ্যের পরিহাসে হাম্মু এখন ইবনে জুযাইয়ের স্থানে আছে, কিংবা সে তার প্রতিনিধি। সিরাফ এবং বাহরাইনের মাঝে গভীর উপত্যকায় মুক্তো-শিকারিদের ডুব দিয়ে মূল্যবান মুক্তো সন্ধানের অদ্ভুত গল্পটি ইবনে বতুতা বলে যাচ্ছেন, আর সে অলস ভঙ্গিমায় ধীরগতিতে, কিছুটা বিরক্তিভরে লিখে যাচ্ছে এই ধরনের বর্ণনা :

‘ডুবুরিরা পানির গভীরে নামার আগে বৃহৎ সামুদ্রিক কচ্ছপের অস্থি দিয়ে বানানো এক জাতীয় আবরণ মুখে পরে নেয়। এই অস্থি দিয়েই কাচির মতো বানানো একটি যন্ত্রও নাকে চাপিয়ে নেয়। কোমরে বাধা থাকে রশি। তারা তলদেশে নেমে যায়। জলসহনীতে তাদের একজন অপরজনের চেয়ে ভিন্ন। কেউ দুই ঘণ্টা, কেউ এক ঘণ্টা, কেউ আরও কম সময় টিকে থাকে। তলদেশে পৌঁছে গেলে তারা ছোট ছোট পাথরের মাঝে, বালুর ভেতরে খুঁজে পায় মুক্তোর গুড়ি-ভরতি শামুক। কেউ শূন্য হাতেই তা উপড়ে নেয়, কেউ বা বিশেষ ধারালো যন্ত্র দিয়ে কেটে আনে…’

ইবনে জুযাই যে লিখেছে—তেলেমসানের কাছাকাছি কোনো এক যুদ্ধে সুলতান একাই বনু আবদিল ওয়াদের মোকাবেলা করেছে—এই জাতীয় কোনো এক গল্প হাম্মুকে দিয়ে যদি লেখানো হতো তাহলে অবশ্যই সে তার কাগজ ছুড়ে দিয়ে কলমটা ভেঙে ফেলত। ছেড়ে দিত শব্দ-শব্দান্তরের এমন গল্প লেখার দায়িত্ব। অভিশাপ দিয়ে যেত তোষামোদ ও তোষামদকারীদের। আর পেছনে ফেলে যেত চাটুকারিতার এই জাতীয় সমস্ত প্রবচনগুচ্ছ :

‘আমাদের মনিব, আল্লাহ তার সহায় হন, জানতে পারলেন তার সামরিক বাহিনী পলাতক। যুদ্ধক্ষেত্রে কেউই নেই তার সাথে। তিনি আর তার মহিমান্বিত সত্তা একাই অগ্রসর হলেন। তাঁকে দেখে শত্রুদের মনে ভীতিসঞ্চার হলো। তারা ছুটে পালাল। কি আশ্চর্য তাই না, একজন ব্যক্তির সম্মুখে পুরো জাতির পশ্চাদপসরণ!’

মুদ্দাকথা হলো, হাম্মু মোটেও অহংকার বা অন্যকে অবমাননার কারণে এই অবস্থানে আসেনি। সে লেখালেখি করেছে মূলত পূর্ণ বিশ্বাস ও ভালোবাসা থেকে। অর্থোপার্জন বা বাধ্যতার মতো কোনো বিষয় তার ছিল না। ফলে আল-মুকাদ্দিমা পাঠ করে মনে একরকম জ্ঞানের প্রভাব ও আবেশ উপলব্ধির পরেই সে আল্লামা আব্দুর রহমান ইবনে খালদুনের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে। 

দুই.

আব্দুর রহমানের সাদামাটা বাড়ির ছোট পাঠাগার-কক্ষেই সাধারণত হাম্মুর সাথে সাক্ষাৎগুলো হতো। পাঠাগারটি মাগরেবি স্বাদে সজ্জিত। দেওয়ালজোড়া তাক। সেখানে ঠাঁই পেয়েছে দুষ্প্রাপ্য সব বই। সাক্ষাতের সময়গুলো ছিল সাধারণত এশার পর এক ঘণ্টা। কখনো কখনো গভীর রাত অব্দি—মধ্যরাত পেরিয়ে আরও এক ঘণ্টা। তাদের মাসিক এই সাক্ষাৎগুলো শুধুমাত্র লেখালেখিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত ছিল—ব্যাপারটা এমন না। তাদের কথাবার্তা জুড়ে নানাবিধ বিচ্ছিন্ন বিষয়ও থাকত। 

হাম্মু প্রায়ই তার স্ত্রীর রাধা থালাভর্তি মাগরেবি খাবার নিয়ে আসত। সুযোগ পেলেই মানুষের দুর্দশা নিয়ে আলাপ করত। বলত সুলতান ও তার দরবারের তুলনায় জনসাধারণের জীবনের বৈপরীত্যের কথা। তার স্ত্রী উম্মে বানিনকে নিয়ে কি যে আনন্দে সে ঘুরে বেড়ায়, পুরো পৃথিবীবাসীর একবার হলেও যে উম্মে বানিনের রান্নার স্বাদ পাওয়া দরকার—বাদ যেত না এসব কথাও!

অন্যদিকে আব্দুর রহমান কিছু সময় ব্যয় করে হাম্মুর থেকে মিশরের খোঁজখবর নিতেন। মাঝে মাঝে শুনে নিতেন বিভিন্ন বইয়ের কোনো অধ্যায়।

সফর মাসের শেষ রাত 

ইমলার প্রথম রাত। আব্দুর রহমান আর হাম্মুর সামনে রাখা এক কাপ কফি, খেজুর আর মিষ্টির একটি পাত্র। কাগজ-কলমগুলো আধোনিভু মোমবাতির আলোয় একটু ছায়া-ছায়া, একটু রোশনাই। কিছু নরম, কিছু গভীর কথাবার্তা শেষে তারা একসঙ্গে কপি করলেন মাসউদির মুরুজ আযযাহাব আর ইবনে বতুতার রিহলা গ্রন্থের কিছু অংশ। 

লেখা শেষে আল্লামা বললেন—‘আচ্ছা হাম্মু! কিছু অশুভ প্রকৃতির প্রাণী আলেকজান্ডারকে শহর নির্মাণে বাধা দিচ্ছিল। শুধুমাত্র তাদের চিত্রায়ন করার জন্য আলেকজান্ডার একটি কাঁচের বাক্সে সমুদ্রের তলদেশে নামলেন। এরপর ভীতি প্রদর্শনের জন্য সেসব প্রাণীদের মূর্তিও স্থাপন করলেন। কী মনে হয়? তোমার বৌদ্ধিক ক্ষমতা এই গল্পের কতটুকু সত্যায়ন করে? বিশ্বাস হয় আসলে?’

হাম্মু নির্দ্বিধায় মাথা-হাত নেড়ে, অস্বীকৃতি জানিয়ে বলল—‘ইবনে বতুতার গল্পগুলো যে আছে—যেমন ধরুন আবু আনান একাই সামরিক বাহিনীর প্রত্যেককে পরাস্ত করেছে অথবা রাজার কাছে ভেড়ার তুলনায় সিংহ নিধন সহজ ছিল—আমি তো সেগুলোই বিশ্বাস করি না। তাহলে আমি এর চেয়েও অসম্ভব কোনো গল্প বিশ্বাস করবই বা কীভাবে?’

মত মিলে যাওয়ায় আল্লামা আনন্দিত হলেন। বললেন—‘যাত্রাপথের এই দুটো প্রতীকী গল্প বাদ দাও তো। কারণ পাঠ অনুসারে বোঝা যায়—সবটাই ইবনে জুযাইয়ের জল্পনা-কল্পনা এবং নিজস্ব রুচিমাফিক বর্ণনা। শোনো, ইবনে জুযাইকে এইসব কাজবাজের জন্য রাজা আনান নিজেই নিয়োগ দিয়েছিলেন। এরপরে আর কি বলব, বুঝতেই তো পারছ!’

হাম্মু বলল—‘এটা অবশ্য জানা ছিল না। তবে যত যাই হোক, এতটুকেই পুরো যাত্রাপথের সমস্ত গল্পগুলো শুদ্ধ হয়ে যায় না!’

আল্লামা খানিক থেমে বললেন, আচ্ছা, আপাতত এটা বাদ দাও আর লেখো—‘সমস্ত বিতর্কিত বিষয়ের মতোই, সম্ভাব্য এবং অসম্ভবের সীমারেখায় অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করাটাই অপরিহার্য। ঝরনার মূর্তির গল্প প্রসঙ্গে যে আমাদের বিরোধিতা করেছে, তাঁকে বলো একই কাজ করে অপেক্ষা করতে। সে দেখুক, পাখিটি তেল নিয়ে এলে সেটি বের হয় কিনা! আলেকজান্দ্রিয়ার নির্মাণকাহিনিতে যে আমাদের বিরোধিতা করেছে, তাঁকে বলো আলেকজান্ডারের সেই সমস্ত কর্মকাণ্ড পুনরাবৃত্তি করতে। সে দেখুক, কাঁচের কফিনে করে পানিতে নেমে বেচে থাকা সম্ভব কিনা?

যে গল্পগুলো বুদ্ধি, স্বভাবগত প্রকৃতি এবং প্রথাগত নিয়মের বিরুদ্ধে যায়, এভাবেই সেগুলো যাচাই ও নিরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও যুক্তির পথে আনতে হবে।’

কোনো বিষয়ের গভীর বিশ্লেষণ কিংবা তর্কের জটিলতায় পৌঁছলে ইবনে খালদুন নিজেই ভাবতেন। এটাই তার চিরচেনা স্বভাব। এরপর তার লেখককে সেসব ভাবনার, পর্যবেক্ষণের অথবা সমালোচনার নোট লেখতে বলতেন। এইবারও তিনি বললেন—

‘হাম্মু, এই সূক্ষ্ম বেপারটাও লেখো তো! লিখে রাখো, অনেক জ্ঞানী আছেন কঠোর, দৃঢ়মুখী এবং অতিরিক্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ। তারা বর্গাকার ও বৃত্তাকারভাবে চিন্তা করে। তারা শুধু সমীকরণ আর সংখ্যার ছায়াতেই বাস্তবতা বিবেচনা করে। কেউ যেন আবার আমাকেও এমনটা না ভাবে। আমি তাদের মতো না। হাম্মু, লিখে রাখো, ইতিহাসের প্রধান প্রধান উৎসে যে সব সুপ্রতিষ্ঠিত গল্পের নির্ভরযোগ্য নির্দেশক বা সমালোচক নেই আমি সেগুলো বলেই যাব। সেসব শব্দের অর্থের অসম্ভবতা আমি ঘোষনা করবই না। 

চলো, এইসমস্ত সীমারেখার বাইরে চলো। কঠিনতম এই যুগে, আমাদের একাকিত্বে কিংবা হতাশায় সেসব গল্প খানিকটা আশ্রয় দেয়। বিষয়টা কি যে আনন্দের, হাম্মু! আমরা সেসব পড়ি, উপভোগ করি, সখ্যতা গড়ি। এমন এমন উপভোগ আর সখ্যতা আমাদের জীবনের সমতা এবং নিসর্গের মতো শীতল বাতাসের অভাব পূরণ করে।’

হাম্মুর লেখনী-প্রতিভা অবিস্মরণীয়। দ্রুত লেখার ক্ষমতায় সে এক প্রকার দৃষ্টান্ত। তবে এইবার সে থেমে গেল। থামতে বাধ্য হলো। কারণ সে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিল তার সভাসঙ্গীর আবেগের জোয়ার আর উচ্ছ্বাসের প্রাবল্য। খেয়াল করল, তিনি গম্ভীর স্বরে বলছেন—

‘হাম্মু, লেখো, লেখাই তোমার কাজ। লিখে রাখো, আমি শয়নে-স্বপ্নে ঝরনার ওই পাখিটি বারবার দেখেছি। আমার আত্মাটা যেন সেটার ভেতরেই । উড়ে বেড়াচ্ছে। জলপাহাড় থেকে জলপাহাড়ে। এরপর ঘরে। একের পর এক পানির প্রতিটি ফোঁটা নিয়ে যাচ্ছে ক্ষুধার্তদের মুখে মুখে, সবটা দূরত্বজুড়ে। 

লিখে রাখো, সিজলামাসার মরুভূমির বুকে বিস্তৃত সেই তাম্রনগরীটি আমি একদিন স্বপনে দেখেছি। প্রবেশ করেছিলাম এক প্রাচীরের দরজা দিয়ে। চিরকালের জন্য কোনো রহস্যে লীন হয়ে যেতে পারি ভেবে উল্লাস করে হাততালি দেইনি, নিজেকে আত্মসমর্পণ করিনি। বরং প্রবেশ করেছি সুন্দরতম নামের মালিকের নামে। ভ্রমণের চুক্তি করেছিলাম সেখানকার দুর্ধর্ষ প্রহরীদের সাথে। শর্ত একটাই, শহর ছাড়া মাত্রই তারা আমার স্মৃতি থেকে মুছে দেবে দৃশ্যের সমস্তটা। 

আসলে হয়েছিলও তাই। দেখেছিলাম, শহরটি পরে আছে অলৌকিক সুন্দর এক রাজমুকুট। চমৎকার চমৎকার সব দৃশ্য। সব অনন্ত, সব অবিরাম! দেখেছিলাম সেখানে ন্যায় আর শোভা। কোনো চোখ তা দেখেনি। কোনো কান কখনো শুনেনি। কারো মন ঘুণাক্ষরেও তেমন কিছু ভাবেনি। 

জিজ্ঞেস করো না আমাকে সেসব দৃশ্যের পুরোটা! কিছুই তো নেই। স্মৃতি তো মুছেই গেছে, বিলীন তো হয়ে গেছে সবটাই। আছে, শুধু আছে সে নগরীর মিহি, মিঠা আবেশ। 

হাম্মু, মাঝে মাঝে না আমি অনুশোচনা আর বিভ্রান্তির ঘোরে নিবিষ্ট হয়ে বসে থাকি সমুদ্রের পারে। অগোচরে অবসরে মনে অদ্ভুত সব চিন্তাভাবনা দানা বাধে। আমি না, কাঁচের কফিনে করে যেতে থাকি সমুদ্রের তলদেশে। না, না—অশুভ প্রকৃতি প্রাণীদের খোঁজে না। আমি বরং সমুদ্রের অদৃশ্য সমস্ত প্রাণী আর উদ্ভিতগুলোকে অভ্যর্থনা জানাতে চাই। মাথা, চোখ আর পুরো শরীর দিয়ে সাদরে গ্রহণ করতে চাই। 

মিথ্যা বলবো না। সমুদ্রে নামার মতো বিভ্রান্তিকর ধারণার জন্য আমার স্বভাবসুলভ কৌতূহলই দায়ী। এখন বলো আমি কি শুধু দেখেই ক্ষান্ত হবো। আমি তো অনুসন্ধানী মানুষ। আমি তো আসলে দেখতে চাই, পানির চরিত্র, বৈশিষ্ট আর গুণাগুণগুলো। এমনসব ব্যাপারে অবশ্য আমি অ্যারিস্টটল বা জাহিযের মতো একদমই না।

কিন্তু শোনো, ভাবনা আমার ভ্রান্ত হতে পারে। তবে, সাঁতারু কোনো জলজ-সামুদ্রিক প্রাণী বা সেসবের অস্থি বা মাংসের বিশেষ কোনো কার্যকরী দিক সম্পর্কে পর্যবেক্ষণের তাগিদে আমি সমুদ্রে নামি না। এ সব তো আমি যথেষ্ট জানি। আমার কল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হলো সমুদ্রের গভীর। বরং তারও অভ্যন্তর। হাঙর, অন্যান্য জলজ প্রাণী, সামুদ্রিক কীটপতঙ্গ বা স্থায়ি-স্থানান্তরিত উদ্ভিদগুলোর মাঝে, সেসব কালো-নীল সীমাহীন নীরবতায় কি কোনো তর্ক, আকাঙ্ক্ষা বা রাজনৈতিক দ্বন্দের প্রতিফলন ঘটে? আমি তো জানতে চাই তার সমস্তটাই!

এই ধরো গোনাগুনতি মুহূর্তটুকুই। চিন্তার অজস্র চাপে পরমুহূর্তেই আমি হাপিয়ে উঠি। অনুভব করি ভাবনার সীমাবদ্ধতা আর ক্ষমতার অভাব। আমি না, থমকে যাই। ক্রমশই মুছে যেতে থাকে ভ্রান্ত সমস্ত কল্পনা। বাস্তব হতে থাকে সামুদ্রিক সব জীবন্ত ও নির্জীব দৃশ্যগুলো। অজান্তেই ব্যাখ্যা করতে থাকি তাদের চলাচল ও স্থিরতা। শোকর সব আল্লাহর! দরুদ আমার নবীর। এসবই তো অল্পবিস্তর বিনোদন আর টুটাফাটা হাস্যরস!

হাম্মু, কী হলো, শুনছ তো, নাকি!’

জমা জমা বিন্দু ঘামে মাখা মুখ মুছতে মুছতে হাম্মু বলল—‘জনাব, আমার কাগজ-কলমগুলো আপনার সঙ্গেই আছে; সমুদ্রের তলদেশে!’

ইবনে খালদুন বললেন—

‘এইবার তবে শেষ করি। লেখো, আমি স্বপ্ন এবং অত্যাশ্চর্যের মূল্যমান বিরোধী না। পৃথিবীর যথাযথ ভৌতিক অবস্থানে হলে, সেসব গ্রহণ করাই যায়। আমি প্রাচীন ও আধুনিক কোনো অদ্ভুত কিংবা অবান্তর গল্প প্রত্যাখ্যান করি না। আরও বরং সৃজনশীল কল্পনা এবং ভাবাবেগের জগতে তোরণ দিয়ে তাদের উল্লাসভরে স্বাগত জানাই। 

মরুভূমি মন, ঘনঘোর আরবীয় প্রেম আর স্বভাবের বিচ্যুতি আমাদেরকে নিয়ে যায় মানদণ্ড ও সীমারেখার বিভ্রান্তি, স্তরের সমতলীকরণ আর আদেশের অবমূল্যায়নের দিকে। এসব সরিয়ে পথ-পদ্ধতি বিনির্মাণ করাতেই মনের মুক্তি আর স্বচ্ছ দৃষ্টি। হাম্মু, এখনো আরও কত কথা বাকি!’

হাম্মু তন্ময় হয়ে শুনছে। আল্লামার আকর্ষিত মননের প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি তার আগ্রহভরে জানতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু প্রশ্ন করবে কি করবে না, সে বুঝতে পারছে না। ইতস্তত বোধ করছে, পরে না আবার বৈঠক আরও প্রসারিত হয়! কিন্তু আল্লামা হঠাৎ বললেন, ‘আজেকের মতো বৈঠক শেষ। বাড়ি যাও।’

হাম্মু চলে গেল। আব্দুর রহমান এখন একা। নিরিবিলি তিনি একটি বালিশে আয়েশ করে বসলেন। খানিক ভাবলেন। এরপর আবৃতি করলেন, কণ্ঠ তার গীতিগম্ভীর—

নিশীথে ঢেকেছিলে প্রেমের গোপন,

অন্ধকার শিরায় ছিল সুধার ঝরন।

তারাদের পাত্রে আলো দুলে দুলে

পড়েছিল নত, পথভ্রষ্ট হেমছুলে।

তবু এক শুভ-চিহ্ন পথের বাঁকে

সোজা স্রোত নামাল শান্ত নীরবাকে।

যখন ঘুম এলো আমাদের ছুঁয়ে,

ভোর যেন প্রহরীর ধারাল বুঁইয়ে—

হঠাৎই আঘাতে জেগে উঠল প্রাণ।

উল্কারা পালায়ে গেল অজান।

আর নারগিস-চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হায়

দগ্ধ করে অন্তর, ছায়া হয়ে যায়।


***

বাড়ি ফিরে হাম্মু খাবার-দাবার সেরে নিল। এরপর রুটিনমাফিক গিয়ে শুয়ে পড়ল উম্মে বানিনের কোলে। তুলে ধরল তার নতুন কাজের ফিরিস্তি। সমস্ত খুঁটিনাটি। আলাপে উঠে এলো আল্লামার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, সুগভীর বিশ্লেষণশক্তি এবং স্থান-কাল-মান মেপে প্রতিটি বিষয় পর্যবেক্ষণের এক বিরল ক্ষমতা। আর একটি দ্বৈত চরিত্র—উম্মে বানিনকে ব্যাপারটা হাম্মু বোঝাতে পারছিল না। সেও নীরব। কিছু জিজ্ঞেসও করছে না। হাম্মু তাই নিজে থেকেই বলে গেল—‘আবর্তিত এই সময়ের গভীরে ডুবন্ত। তবে প্রয়োজনে, সময়ের ব্যবচ্ছেদে নিঃসঙ্গ আর আত্মমগ্ন। এটাই দ্বৈত চরিত্র।’ 

কথার মাঝেই সে খেয়াল করল, উম্মে বানিন অন্যমনস্ক। কখনো তার চুল নেড়ে দিচ্ছে। কখনো বা আলতো স্পর্শে বুলিয়ে দিচ্ছে তার বা হাত। হাম্মু খানিক কাছে এসে তার কানে ফিসফিস করে বলল—‘জানো, দরকার হলে, বিনা পারিশ্রমিকেই আল্লামার সেবায় থেকে যাব।’

উম্মে বানিন হেসে হেসে ব্যঙ্গ করে বলল—‘খাবে কি তবে? দোয়া আর বরকত!’

ঘুমানোর আগ দিয়ে, তখনো, হাম্মু একা একাই বলছে—‘প্রতিটি বিষয়েই আল্লামা কেন গভীরভাবে নিমগ্ন?’

উম্মে বানিন তখন আলোটা নিভিয়ে দিল। এরপর তাঁকে বুকে টেনে বলল—‘এসব জিজ্ঞেস করতে হয় তার প্রেমে মন্ত্রমুগ্ধ, বিমগ্ন রমণীদের!’

রবিউল আউয়ালের শেষ রাত 

রাতের শুরুর ভাগ। আলাপ জমে উঠেছে। হাম্মু কিছু কিছু লিখলেও বাকি কথা উবে যাচ্ছে সময়ের খরস্রোতে। 

একটা প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে। প্রিয়তমার কাছেও কোনো সমাধান নেই। সহনেই মূলত দহন। আর কত! বহুদিনের দ্বিধা ঝেড়ে, জড়তা ভেঙে হাম্মু বলেই বসল সরাসরি—‘জনাব, সমস্ত বিষয়ের এত গভীরে কেন চলে যান?’

খানিকটা ক্ষীণ তবে স্পষ্ট স্বরে আব্দুর রহমান বললেন—

‘জানতে চাও? লেখো তাহলে। ব্যাপারটা নিয়ে আমিও ভেবেছি অনেক। শেষমেশ বুঝলাম, গভীরতাই আমাকে টেনে নেয়। গ্রাস করে ফেলে আমাকে মূল, সার আর ভিতের এই লব্ধ, এই অন্তর্গত জগৎ। আর সব তো কেবল ওপরি ফেনা এবং প্রশস্ততার ভ্রম। কিংবা বলা যায় খোসার মরুভূমি এবং বিভ্রমের বালুচর। 

ধরো, গভীরতার কোনো মহিমা আমার নেই। বাহ্যিক আবরণ ছাড়া তবে আমার অংশে আর কী জুটতো বলো? দেখতাম শুধু রূপ-ভঙ্গিমা। জীবনের বাকি সময়টা ভরে যেত অর্থহীন ব্যস্ততা, বিভ্রান্তি আর অহেতুক মত্ততায়। 

আল্লাহ, কি ঝামেলাটাই না হতো এমন কিছু ঘটলে! হয়ে পড়তাম দেশের গতানুগতিক আলেমদের মতো। চেচাতাম মাজহাব মাজহাব বলে। সংক্ষিপ্ত টীকাটিপ্পনী, হাশিয়া আর ফিকহের অগোছালো ঝাঁপি দিয়ে মাথাটা পুরো ভরে যেত। হয়তো হয়ে পড়তাম সুলতানদের আজগুবি সব ইতিহাসের বাহক। দিনরাত সোনালি কলম দিয়ে তাদের কাজবাজ, মহিমা আর গৌরবের কথাই লিখে বেড়াতাম। তাদের যাপিত দিনকাল, দরবেশের সাহচর্য আর শিকারের হিসাব রাখতাম।’

একটু হেসে যোগ করলেন—‘হয়তো হতে পারতাম পৃথিবীর এপ্রান্তে-ওপ্রান্তে ঘুরে বেড়ানো এক মুসাফির। হতে পারতাম গল্প আর আজব দৃশ্য সংগ্রহকারী অদ্ভুত সব গল্পের শিকারী।’

‘জনাব!’ কথা শেষ হওয়ার আগেই হাম্মু বলে উঠল—‘তুহফাতুন নাযযার ফি গারাইবিল আমসার ওয়া আজাইবিল আসফার—বইটির নাম লেখে দেই সাথে? পাঠকদের বুঝতে সুবিধা হবে তাহলে।’

‘বাদ দাও তো এইসব ঝায়-ঝামেলা। ইবনে বতুতার ওপর থেকে একটু ভার কমাও। খাটো বুদ্ধির দোষে পড়ো না।’

‘তাহলে আপত্তিটা কী, একটু বুঝিয়ে বলুন?’  

‘শোনো, যুগের এই ভয়াবহ অন্ধকারে আমি হাপিয়ে উঠেছি। ইবনে বতুতাও। অন্ধকার যেন মিটে যায় এই ভেবে যে যার মতো চেষ্টা করেছি। পরিবার-পরিজন, ছেলেমেয়ে আর আপনজন সব ফেলে ইবনে বতুতা আল্লাহর এই বিশাল পৃথিবীর পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছে। আর আমার যাত্রাটা অন্যরকম। অস্বাভাবিক মাত্রার মানবিক তীব্রতায় পূর্ণ। অভিন্ন ভূখণ্ড, তবু যাত্রাটা আমার চরম গভীরে। যাত্রাটা আমার, অন্তর্নিহিতেরও অভ্যন্তরে। 

বুঝলে, আমাদের দুজনেরই লাঠি আছে আস্থা রাখার মতো! ফলে কষ্টের মাঝেও স্বস্তির কথা ভেবে আমরা হেঁটে যাই নিভু নিভু যে কোনো আলো অভিমুখে। এসব শিখে নাও হাম্মু, কাজে দেবে।’

‘আল্লাহ যাকে যেভাবে চান তৈরি করেন,’ হাম্মু নরম স্বরে বলল—‘মিথ্যা বলব না। অবসরে আমিও ইবনে বতুতার গল্পগুলো পড়ি। অঝরে হাসি। মাঝে মাঝে ভীষন অবাক হই। উম্মে বানিনকে শুনাই। সে হেসে-ভেসে বলে, কী যা তা! আবার বিহ্বলতায় কখনো বুক চেপে পালিয়ে যায়। তবে জনাব, আপনার গভীরমুখী এই যাত্রাটাই আমাকে বেশি টানে।

সুদানের কতক গোত্র নাকি মাটিতে আমিরের সামনে গড়াগড়ি খায়। আরেকদল লবণ ব্যবহার করে টাকা হিসাবে। আর কেউ কেউ নাকি মৃত গাধা-শুকুর থেকে শুরু করে মানুষের মাংস পর্যন্ত খায়। কী অদ্ভুত!’

‘হাম্মু, মানুষ মূলত তার অভ্যাসের দাস। কে কোন বাতাসে শ্বাস নেয় সেটাও তো লক্ষণীয়। কৃষ্ণাঙ্গ এবং হলদে জাতির কাছে আমাদের কত কাজই তো অদ্ভুত ঠেকে!’

‘যাই বলেন না কেন, সেসব অঞ্চল সম্পর্কে ইবনে বতুতার মূল্যায়নগুলো ভুলে যাওয়া এতো সহজ না! কী যা তা যে তিনি বলেছেন! কোনো কোনো গোত্রের নাকি মনে হয় সাদা চামড়াদের মাংস ক্ষতিকর। পাকেনি নাকি ঠিকঠাক মতো। আর কৃষ্ণাঙ্গদের চামড়া স্বাস্থকর। কারণ সেটা সম্পূর্ণ পাকা!’

‘হাম্মু, তাদের হাতে ধরা পরে গেলে ভয় পেয়ো না তাহলে!’ 

‘শুনেন না, কোনো কোনো গোত্রের কাছে মানুষের মাংসের সবচেয়ে সুস্বাদু অংশ নাকি স্তন আর হাতের তালু। আরে, আমাদের যাত্রী মহোদয় তো আরও বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন। রমজানের কোনো একদিন তিনি নিজেই নাকি দেখেছেন, একস্থানে ছেলেমেয়ে সবাই বিবস্ত্র; প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। গল্পটির বিস্ময়ের দিক দুইটা। একে তো নগ্নতা। অপরটি আরও আজিব; অনুসন্ধিৎসু এই মালেকি ফকিহর নিষ্পলক চাহনি। রমযানের মতো পবিত্র মাসে চোখদুটো নামিয়ে নিলেও তো পারতেন!’

আব্দুর রহমান হালকা একটু হেসে বললেন—‘অদ্ভুত বটে। কিন্তু তোমার দ্বীন-দুনিয়া ঠিক রাখার মতো অনেক গল্পও তো তার আছে। সেসব মনে রাখলেও তো হয়!’

‘সেগুলো কি অদ্ভুত না?’ 

‘মানুষখেকো বা নগ্নতার মতো না। অন্যরকম অদ্ভুত। আচ্ছা, তার বলা শিক্ষামূলক একটা গল্প শোনো—সুলতান আবু আনানের নিকটে একবার ইবনে বতুতা হিন্দুস্তানের বাদশা মুহাম্মদ শাহ তুঘলকের অদ্বুত দানশীলতার কথা বলেছিলেন। সফরে বেরিয়ে তিনি দিল্লির মোট জনসংখ্যা গুণে সে অনুপাতে কোষাগার থেকে ছমাসের রসদ বরাদ্দ করতেন। ফিরে এসে নির্দেশ দিতেন ক্ষেতে মিনজানিক বসাতে। এরপর দরিদ্র আর অভাবীদের অভিমুখে দিনার দিরহাম নিক্ষেপ করা হতো।’

‘আসলেই তো, অদ্ভুত! হিন্দুস্তানের বিস্ময়কে তিনি যেন মাগরেবে এনে রেখে দিচ্ছেন। আচ্ছা, সুলতানের দরবারি লোকেরা কি করেছিল তখন?’

‘কপালে হাত রেখে, ব্যঙ্গভরা চোখে তাদের সে কি নানারকম ঢঙ্গি-মুচকি হাসি! কেউ কেউ তো অশোভন খিলখিলানিতে ফেটে পড়ছিল।’ 

‘লোভ-লালসায় ডোবা অনুসারী দল এবং দুর্নীতি আর ঘুষে-ভর্তি যত দরবারিবৃন্দ! উদারতার গল্প কি তাদের আর হজম হবে! তারা তো শুধু হেসেই যাবে। জনাব, আপনি নিশ্চয় গভীরভাবে ভেবেছেন গল্পটি নিয়ে?’ 

‘গল্পটি আমি যাচাই করে দেখেছি। ভেবেছিও অনেক। সত্য হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অস্বীকার করার মতো কোনো কারণ তো দেখি না।’ 

‘আচ্ছা, গল্প শোনার পরেও কি সুলতান আবু আনান স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় সিংহাসনে পা গুটিয়েই বসে ছিলেন? না কি অস্বস্তিতে পরে নড়েচড়ে উঠেছিলেন?’

আব্দুর রহমান নীরব। চোখেমুখে সামান্য বিরক্তি আর দ্বিধার রেখা। তক্ষুণি হাম্মু আবার বলে উঠল—‘গোপন রাখার মতো উত্তর হলেও চিন্তা করবেন না, জনাব! আমার এই বুকেই থাকবে কবর অব্দি।’

‘ঠিক ধরেছ হাম্মু। আবার দেখা যাচ্ছে, ক্ষতেও হালকা করে লবণ ছিটিয়ে দিলে! পারোও বটে। শোনো, গল্পটি শুনে বিরক্ত হননি আমিরুল মুমিনিন। শাস্তিও দেননি। তিনি বরং ছিলেন ধ্যানমগ্ন। অপারগতার একটি বোধ তাঁকে নরম করে দিচ্ছিল। হিন্দুস্তানের ওই বাদশার প্রতি যেন এক ঈর্ষাপূর্ণ প্রশংসা তার মনে। অন্য দিকে ভাবনায় বিভোর, নিজে যে বড়ই অক্ষম সেই অনুকরণে! 

অনেক তো হলো। ইমলার কাজ এখনো ঢের বাকি। চলো, মূল লেখায় চলো!’ 

‘কান পেতে আছি, জনাব। আপনি রাজি থাকলে ফজর অব্দি লিখে যাবে আমার এই হাত।’ 

‘তাহলে হাম্মু, এই সংশোধনী বাক্যটাও লিখে ফেলো। আমি না সবসময়ই গল্পসমূহের ভেতরকার সত্য, বস্তুর মূল উপাদান আর পরিবর্তনের নিয়ম-বিধি খতিয়ে দেখতে চেয়েছি—এটা সত্য। তবে ওপরিস্তরি দৃষ্টিও কি আমার কম! হোঁচটও তো কম খাইনি।’

‘আপনিও হোঁচট খান?’ 

‘আহা, ঝামেলা করো না। লেখো চুপচাপ। মাঝে মাঝে সরে পরে, ঝাঁপিয়ে বেরিয়ে যেতে পারলেও হাম্মু—আমি তো আমার সময়েরই লোক। এই ভঙ্গুর, চিহ্নচ্যুত আর কাঠামোহীন সময়টাই তার অল্পবিস্তর ভালো আর অসংখ্যক খারাপে গড়ে তুলেছে আমাকে। 

আবেগ আমাকে ভ্রান্ত করেছে বহুবার। অনেক বাস্তবতায় তো চোখই মেলিনি! বিশেষভাবে লিখে রাখো এটা সমালোচনা পর্বে। 

যেমন ধরো—মদপান, ভোগবিলাস আর অনাচারের অভিযোগ থেকে আমি কিছু আব্বাসী খলিফাকে রক্ষা করেছি। আমার উচিত ছিল বরং চুপ থাকা বা বিচার ছেড়ে দেওয়া আল্লাহর সমীপে। অথচ, ধন-সম্পদে ডোবা বিলাসী সভ্যতায় এ ধরনের ধ্বংস অনিবার্য—এমনতরো কথা আমি নিজেই তো তত্ত্বে বলেছি। 

অন্যদিকে দেখো, যিশুর অবস্থানের ভিন্নমত প্রসঙ্গে খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলোকে আমি এমনভাবে মত দিয়েছি যেন বা আমি দাঁড়িয়ে আছি ইসলামের প্রথম যুগে, বসবাস করছি বিজয়োল্লাসের সময়স্রোতে! অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। খৃষ্টীয় শক্তির নিরবিচ্ছিন্ন অগ্রগতির চাপে আমাদের আন্দালুস বিলীনপ্রায়। 

মুকাদ্দিমার একটি অংশ আমি সত্যি সত্যি মুছে ফেলতে চাই। আমি তাদের সবকটি দলকে কাফের বলে লিখেছি—

‘ইসলাম, জিজিয়া বা মৃত্যু ছাড়া তাদের ও আমাদের মাঝে বিতর্ক আর প্রমাণের কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।’

হাম্মু, একজন অক্ষম কট্টরবাদীর মতো কথাটি ছিল একটি সম্পূর্ণ ভুল সময়ে, ভুল প্রেক্ষাপটে। যার বলার মতো কিছু নেই, সেই মূলত কঠোর ভাষায় কৃত্রিম দৃঢ়তা দেখায়।

গল্পের প্রকৃত রূপ উদঘাটন করার জন্য ইতিহাসের সংবাদ-তথ্য গভীরভাবে বিচার করে, সঠিক নিয়মের মানদণ্ডে যাচাই করে ঠিকঠাক মতো বোঝার ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব নীতিটিই আমি অস্বীকার করেছি বারবার। পথ হারিয়েছি। হোঁচট খেয়েছি। ভুলে গিয়েছি হজর আলির উপদেশ—‘কোনো সংবাদ শুনলে সেটি বুঝে নিও বিবেচনার বুদ্ধি দিয়ে। মুখস্ত বিদ্যা দিয়ে না। জ্ঞানের ধারক তো অনেক। কিন্তু মর্ম বুঝে কজন!’

হাম্মু, আমার অন্যতম একটি ভুল শোনো। গোত্রগত পক্ষপাতকে আমি ধর্মের মতো ইবাদত শুরু করেছিলাম। এই পক্ষপাতী ধারণাকে আমি খুব জোরেশোরে ধরে ফেলেছিলাম। ফলে আমার চোখে কিছু বিষয় ছিল অবমুক্ত আর কিছু গোপন। অথচ আড়ালে থাকা সেসব বিষয়গুলো কখনোই কোনো ইতিহাসবিদের কাছে হালকা কিছু ছিল না। উপেক্ষা করার মতো তো একদমই না। যেমন ধরো, ব্যর্থ বিদ্রোহগুলোকে আমি গুরুত্ব দেইনি। অনুরূপভাবে, নীতিবান কোনো বিদ্রোহী বা সংস্কারকদেরকে চিত্রিত করেছি হেয়সূচক শব্দে, অবজ্ঞাভরে। 

নির্দিষ্ট এই অবস্থানে আমি দাঁড়িয়েছিলাম বিজয়ীদের পক্ষে। ক্ষমতা ও জয়ের বর্ণনায় ইতিহাসকে আমি সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিলাম। যাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো গোত্রগত জোর ছিল না সেসব অসংখ্য পরাজিত মানুষকে রেখেছিলাম বৃত্তের বাইরে। 

কোনো কোনো স্থানে নেককার সুফিদের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে আমি গুরতর ভুলটি করেছিলাম। আমার শিফাউস সায়েল বইটি সম্পর্কে যে অপরিপক্কতা এবং দুর্বলতার দাবি তোলা হয় সেটা অনেকাংশেই সত্য। কারণ জনপ্রিয় সমস্ত সুফিবাদের বিস্তার ও তাদের কার্যক্রমের বিরোধিতা করে এবং মুরিদদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে প্রচলিত সুন্নি তরিকা ও সীমার মধ্যে বেঁধে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে বইটি আমি লিখেছিলাম। ফলে পরবর্তীকালে, এই নগণ্য বইটির কথা আমি কোথাও উল্লেখ করিনি আর। বইটি মূলত ছিল বাড়াবাড়ি এবং অতিরঞ্জনে ভরা মতাদর্শগত একটি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত। এই আন্দোলনের প্রভাবেই শেষ পর্যন্ত আমি সুফি ঐতিহ্যের অনেক মৌলিক গ্রন্থের বিরুদ্ধে সহিংসতার পথকে বৈধতা দিতে শুরু করি। ফলে অবিবেচকের মতো একটি ফতওয়া দিয়েছিলাম—

‘ইবনে আরাবির ফুসুলুল হিকাম ও আল ফুতুহাতুল মাক্কিয়া, ইবনে সাবঈনের আল বাদ, ইবনে কাসির খালুন নালাইন ইত্যাদি বিভ্রান্তিকর ও সহজলভ্য বইগুলো পাওয়া গেলেই আগুনে পুড়িয়ে বা পানিতে ধুয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। লেখার কোনো ছাপ রাখা যাবে না। ভ্রান্ত বিশ্বাসগুলো মুছে ফেলাই ধর্মের সামগ্রিক কল্যাণের দাবি। সুতরাং জনকল্যাণের স্বার্থেই শাসকের উচিত এইসব বই পুড়িয়ে ফেলা। আর ধ্বংস করার সুযোগ করে দেওয়াই প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’

আজ আমার একটাই কামনা, এই ফতওয়া পড়ামাত্রই যেন পুড়িয়ে ফেলা হয় কিংবা পানিতে ধুয়ে মুছে ফেলা হয়। পাপের বোঝা থেকে আমি মুক্তি পেতে চাই। 

রাজনীতি ও রাজনৈতিক চিন্তায় তো আমার ভুল অসংখ্য। সময়ের স্রোতে পরস্পরবিরোধী ঢেউয়ে আমি উতরে গিয়েছি। পরিস্থিতি আর প্রেক্ষাপটের বিবেচনায় রংসং মেখেছি। অবস্থানের ভিন্নতায় ঘুরে বেরিয়েছি। টিকে থাকার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির দাবি মেনে কখনো জোট বেঁধেছি, কখনো মুখ ফিরিয়েছি। তবুও রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর জটিলতার সংঘাতে আমি ছিলাম মূলত সময়ের গোলাম—এমনসব দোষ মুখ্য না। 

মাগরেবের সে সময়ে এবং এখনো তো—বাতাসে বাতাসে উড়ে বেড়ায় ষড়যন্ত্র আর হত্যার পরওয়ানা। গায়ে লেপ্টে থাকে ভাঙন আর দ্বন্দ্বের চিড়। এক আমির থেকে পালিয়ে নিশ্চিতভাবেই আরেক আমিরের ফাঁদে পরে যেতে হয়। সময়ের সঙ্গে আপস করা, হাওয়ার গতি বুঝে চলা, ক্ষমতাসীনদের নির্দেশ মোতাবেক শায়েখদের মন জয় করা, গোত্রগুলোকে ঐক্যে আনা এবং সুযোগ বুঝে হজ্জে গমন বা মরুভূমি-বনাঞ্চলে দীর্ঘ নিভৃতিতে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া আমাদের মতো লোকদের সামনে অগ্রসরের আর কোনো পথ খোলা থাকে না। এসব দিয়ে কিন্তু আমি নিজেকে দুষছি না!

বরং আমি দোষী বলছি ক্ষমতার চাতুরি আর বিলাসী আকর্ষণে মোহিত আমার স্বভাবকে। জ্ঞানেগুণে আমার চেয়ে কম লোকেরা শুধু মাত্র অত্যাচার, তোষামোদ, ষড়যন্ত্র আর কৌশলের দক্ষতায় যে পদ বাগিয়ে নেয়; আমি অভিযোগ তুলছি আমার সেই উচ্চপদের লোভের বিরুদ্ধে। 

আবু আনানের দরবারে অবস্থানকালে, এভাবেই আমি বেজায়ার অপসারিত আমির আবু আবদুল্লাহর সাথে একটি বোঝাপড়ায় রাজি হয়ে যাই। সে তার আমিরাতে ফিরে গিয়ে ক্ষমতা স্থির করে নিলে আমি তার হিজাবা গ্রহণ করব।

আমাদের মাগরেবি রাজনৈতিক পরিভাষায় হিজাবা মানে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখা। ক্ষমতায় কাউকে শরিক না করে সুলতান ও তার দরবারিদের মাঝে একমাত্র মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠা। 

আমার পরিবার আর ওই হাফসি আমিরের পূর্বপুরুষদের মাঝে বহুদিনের সৌহার্দ থাকায় আমি সেই গোপন চুক্তিটি মেনে নিয়েছিলাম। তবে কিছুদিনের মাথায় আমার গোপন পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। ফলে ওই মারিনিয় সুলতান আবু আনান দুবছরের মতো আমাকে তার অন্ধকার কারাগারে বন্দি করে রাখে। 

হঠাৎ উপলব্ধি করলাম, প্রচন্ড প্রতাপ আর দৃঢ়তা সত্ত্বেও সুলতানের প্রতি আমার মনে এক অজানা ঘৃণা হরহামেশাই কাজ করত। কারণ তালাশ করে দুইটি দিক পেলাম। 

প্রথমটা স্পষ্ট। তিউনিসের স্বেচ্ছাচারী হিজাব বিন তাফরাকিন একটা সময় আমাকে মধ্যমস্তরের অল্প ক্ষমতার পদে নিয়োগ দিয়েছিল। মারিনিয় সুলতানও আমাকে কখনোই উঁচু কোনো পদে নিয়োগ দেননি। 

দ্বিতীয়টা আরও গভীর। আবুল আনান তার পিতা আবুল হাসানের পিঠে আঘাত করে সিংহাসন কেড়ে নিয়েছিলেন। এরপর তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন মাসামিদা পাহাড়ে। এই সবই ঘটেছে কাইরওয়ানে আরব গোত্রগুলোর হাতে আবুল হাসানের মুওয়াহিদি পথ পুনপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মাগরেবে ফেরত আসার পরে। কিতাবুল ইবারে আমি এসব সবিস্তারে তুলে ধরেছি। 

যাই হোক না কেন, কৃষ্ণাঙ্গ এই সুলতানের জ্ঞানী সঙ্গীদের কথা আমি আমরণ মনে রাখব। তারাই মূলত আমার উদ্যমকে জাগিয়ে তুলে, মনকে শুদ্ধ করে নিখাদ জ্ঞানচর্চায় ফিরিয়ে এনেছিল। 

বেজায়ার ওই আমিরের বন্দিজীবনের সমাপ্তি ঘটে আবু আনানের শাসনকালের শেষ দিকে। আর আমি, হাহ! অনেক আবেদন-নিবেদন আর আরতি ভরা দুইশত পংক্তির এক দীর্ঘ কবিতা লেখার পর আবুল আনানের থেকে পেয়েছিলাম মুক্তির পরওয়ানা। সৌভাগ্যবশত, অনেকগুলো পঙক্তিই আজ আর মনে নেই। আবুল আনানকে তার মন্ত্রী ফুদুদির শ্বাসরোধ করে হত্যার পরেই আমি বাস্তবে মুক্তি পেয়েছিলাম। 

এরপর আমাকে সুলতান আবু সালেমের গোপন দাপ্তরিক লেখালেখি ও রচনার দায়িত্বে নিযুক্ত করা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি আশ্রয় নিয়েছিলাম গ্রানাডায়; বনি আল আহমারদের দেশে। সেখানে আমাকে অসাধারণ আন্তরিকতায় অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন আমির মোহাম্মদ পঞ্চম ও তার মন্ত্রী ইবনুল খাতিব। প্রায় বছরখানেক যাবৎ আমার মর্যাদা ছিল আকাশচুম্বী।

৭৬৫ হিজরি। আমার পূর্বপুরুষদের নগরী সেভিয়ার আমির আমাকে মূল্যবান উপহারসহ একটি দূতিয়ালি অভিযানে পাঠালেন কাস্তিলার অত্যাচারী রাজা পেদ্রো ইবনে হিনশার কাছে। আন্দালুসের মুসলিম আমিরদের সঙ্গে ওই খ্রিস্টান রাজ্যের মধ্যে সমঝোতা করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। যেন তারা আরাগনের খ্রিস্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে একটু শক্তি পায়! 

সেভিয়ায় আমার অবস্থানকালটা ছিল পুরোদস্তুর সম্মান ও মর্যাদার। তো, একদিন ইহুদি চিকিৎসক ইবরাহিম বিন জারজার সঙ্গে মোলাকাত হলো। আবুল আনানের দরবারি ব্যক্তি থাকার সুবাদে সে ছিল আমার পূর্বপরিচিত। সে আমাকে এই অত্যাচারী রাজার উচ্ছৃঙ্খল, পাপাচারী জীবন আর অন্তর্গত নিষ্ঠুরতার কথা বলল। আমার পূর্বের শোনা সংবাদ সে যেন আরও নিশ্চিত করে দিল। আরাগনিয় ও কাস্তিলিয়রা প্রতিযোগিতার মতো করে তাদের শাসনাধীন মুসলিম ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর নানান অত্যাচার নিয়ে এসেছে। ভয়ে, কপটভাবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলেও সেই নিপীড়ন থেকে কারোই রেহাই নেই। 

ভয়ংকর অত্যাচারী রাজা পেদ্রোর সান্নিধ্য কোনোভাবেই নিরাপদ না। তাহলে আমাকে তার পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার শর্তে সেভিয়ার মালিকানার প্রস্তাব আমি মেনেই বা নেই কীভাবে? বাস্তব ও কল্পিত সব অজুহাত সামনে এনেই আমি এ জাতীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। 

হাম্মু, আমার এইসব স্মৃতিচারণ আর পারিপার্শ্বিক ঘটনাগুলোর আদ্যপান্ত বলছি মূলত অন্ধকারের সূচনা পথগুলো বোঝার সুবিধার্থে। 

আমার বন্ধু লিসানউদ্দিন তার পদমর্যাদা ও একচ্ছত্র প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ফলে আমাদের মাঝে সৃষ্টি হয় দূরত্ব, মনোমালিন্য। 

দুর্দিনে আমি আবু আব্দুল্লাহকে সমর্থন করেছিলাম। প্রতিদান তো পাবোই। তাই আমি সর্বোচ্চ পদের আশায় চলে এলাম বেজায়ায়। হলোও তাই। পেয়েছিলাম কাঙ্খিত পদ। এরপর প্রায় একটা বছর হিজাবার দায়িত্বে ছিলাম ওই অত্যাচারী শাসনব্যবস্থার। 

পদটি পেয়ে আমি ভয়ংকর ভাবে ফুলে-ফেপে উঠেছিলাম। হাঁটতাম দর্পভরে। কণ্ঠস্বরে ছিল ক্ষমতা আর প্রভুত্বের দাপট। অঙ্গি-ভঙ্গি ছিল উদ্ধত; অহংকারে কর্কশ। 

এসবের অবশ্য কারণও আছে। ভোরবেলায় আমার দরজায় ভিড় জমাত রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা। সামনে এসে মাথা ঝোঁকাত সম্মানিত সব লোকেরা। আমার চলাফেরায় ছিল রাজকীয় অভিজাত্যের নানান চিহ্ন। 

কিন্তু সৌভাগ্য বলো অথবা তিক্ত কোনো শিক্ষা—ভ্রান্তি আর আত্মতুষ্টির এই দিনগুলো টেকেনি বেশিদিন। আবু আবদুল্লাহকে হত্যা করেছিল তারই চাচাতো ভাই কানসান্তিনার রাজা সুলতান আবুল আব্বাস। বেজায়ার কর্তৃত্ব হস্তক্ষেপে সাহায্য করতে অনেকটা বাধ্য হয়েই আমাকে তখন দাঁড়াতে হয়েছিল বিজয়ীর পাশে। 

অপেক্ষায় ছিলাম। একদিন সুযোগ বুঝে আমি আশ্রয় নিলাম দাওয়াদার গোত্রের কাছে। এরপর চলে গেলাম বিসকরা; ইবনে মুজনির নিকটে। 

আমার এইসব ব্যর্থ অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক দুধরনের শিক্ষাই পেলাম।

দুবছর যেতে না যেতেই আমি ফিরিয়ে দেই তেলেমসানের সুলতান আবু হাম্মুর দেওয়া হিজাবার প্রস্তাব। মনে মনে বলেছিলাম, ‘মুমিন এক গর্তে দুইবার পড়ে না। এটা ব্যাবহারিক শিক্ষা।

আর তাত্ত্বিক শিক্ষা ভেবে, নিজের সাথে অঙ্গীকার করেছিলাম, মুক্তিলাভ এবং রাজাদেরকে মতামত দেওয়া থেকে সরে যাওয়া অব্দি একটি কাগজের ওপরে এই কথাটি লিখে রাখব—‘জ্ঞানী মানুষদের জন্য উচিত হলো রাজনীতি আর তার কৌশল থেকে দূরে থাকা।’

ওই একই কাগজের উল্টো পিঠে লিখেছিলাম—

‘রাজ্যশাসন হলো জাগতিক সব সুখ-সম্ভোগ, দেহগত আকাঙ্ক্ষা আর মানসিক লালসার সম্মিলিত একটি মহান ও আরামকর পদ। ফলে এই পদকে ঘিরে জন্ম নেয় শত প্রতিযোগিতা। শক্তিতে পরাস্ত না হলে সাধারণত কেউ স্বেচ্ছায় এই পদ ছাড়তে চায় না। এই কারণেই সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব এবং সেটা গড়ায় যুদ্ধ অব্দি।’

হাম্মু, সংক্ষেপে বলতে গেলে জ্ঞানে আমিও ভুল করেছি। অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও রাজনীতিতে আমি ওই লোকের মতোই যে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হোচট খায়। সময়টাও তো নিখুঁত না; সাড়ে-পচা দাঁতের মতোই প্রভাব ফেলে। 

বিশ্রামের নিমিত্তে কিংবা আব্দুর রহমানের মনোযোগ অন্যস্থানে সরানোর উদগ্রীবে হাম্মু একটু বিরতি নিয়ে বলল—‘পাপ ও ভুল থেকে নিরাপত্তার ব্যাপারটা আল্লাহ এবং তার রাসুলের জন্যই বিশেষ। সেখান থেকে আমরা মানুষরা খুব সামান্যই লাভ করেছি। তাছাড়া আপনার অর্জিত কৃতিত্বও তাৎপর্যপূর্ণ। মহান গভীরতার তুলনায় তুচ্ছ আপনার শব্দের সব ফাঁক-ফোকর।’

‘তুমি যে আমাকে সহজভাবে প্রশমিত করতে চাচ্ছ, এইজন্য শুকরিয়া! কিন্তু এমনটার কোনো দরকার নেই আসলে।’ 

‘না, না, ব্যাপারটা এমন না। আচ্ছা, শুনুন। অনেকদিন যাবত মাথায় আপনার বংশ সম্পর্কিত একটি প্রশ্ন ঘুরছে, বলে ফেলি! আসলে নিজের বংশ সম্পর্কে তেমন কিছু আমি জানি না। সম্ভবত বংশই নেই আমার। 

সে যাই হোক, আপনি আরবের বিশিষ্ট সাহাবি ওয়াইল ইবনে হুজরের বংশধর। তিনি নবীর বরকত প্রাপ্ত। রেখে গিয়েছিলেন এক খলিফা—মুওয়াবিয়া রা. পরবর্তীতে যাকে হত্যা করেছিলেন। পূর্বদিক থেকে আন্দালুসে প্রবেশকারি খলিফাও তার বংশধর। আমার মূল আপত্তি অবশ্য এখানে নয়। 

আপত্তিটা হলো, শক্তিশালী মূলের আচ্ছাদনকারী গাছের মতো এই বংশে আপনি জন্ম না নিলে কি আপনার এই গভীর ক্ষমতা, যোগ্যতা আর অন্যান্য গুণগুলো থাকত না?’

কিছুক্ষণের জন্য আব্দুর রহমান নীরব হয়ে গেলেন। এরপর তার পাগড়িটি সরিয়ে ইশারা দিলেন লেখো—

নির্ভরযোগ্য বংশজ্ঞদের কথানুযায়ী আমি পরিচয়ের প্রারম্ভে কেবল স্মরণার্থেই আমার বংশতালিকা উল্লেখ করি। অহংকার প্রদর্শনের তাগিদে না। আমি এমনটা করতেও পারব না আসলে। কারণ আমি স্পষ্টভাবে লিখেছি—

‘বংশ ও মর্যাদা বস্তুগত বিবেচনায় জন্মগতভাবে প্রাপ্ত গোষ্ঠীর জন্যই। অন্যদের ক্ষেত্রে বিষয়টি তুলনামূলক কিংবা শুধুই উপমা।’

‘অনুকরণের মাধ্যমে মর্যাদা লাভ করলে এই হিসাবটা জন্মানুসারের না, কৃতিত্বের।’ 

যদি ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের স্বাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমি বংশের মূল ও প্রভাবের ওপরে নির্ভর করতাম তাহলে তো আমি কখনোই সমালোচনা করতাম না সেই ভ্রান্ত সম্মানের প্রসারকে। একদল চাটুকাররা যখন রাজপুত্র ইয়াগমুরাসেন আর জয়নীকে তার বংশের মহত্ত্ব বোঝাতে চাচ্ছিল আর তিনি বারবারিয়ান ভাষায় বলেছিলেন ‘আমরা দুনিয়া পেয়েছি তলোয়ারের জোরে, বংশের জোরে না। আর আখেরাতের ব্যাপার আল্লাহর হাতে।’—এসব কথাও আমি লিখতাম না। 

‘হায় আল্লাহ, কত অসাধারণ আর গভীর অর্থবহ কথা!’

‘এই ব্যাখ্যাগুলো কি তোমার দোটানা একটু হলেও দূর করেছে?’ 

‘একে তো খটকার উত্তর দিলেন আবার আড়ালের ব্যাখ্যাও করলেন। আলো আর স্বচ্ছতার মালিক আল্লাহর শপথ! আপনি তো আমার সংশয় দূর করে দিলেন।’

‘আরেকটা ব্যাপার কী, প্রাচ্যে আমি হাজরামি আর পশ্চিমে মাগরেবি। আসলে ভাঙাচোরা এই সময়েও আমি হতে চাই সংযোগের স্মৃতি, মিলনের সেতুবন্ধন।’বাক্যটা শেষ করে আব্দুর রহমান উঠে দাঁড়ালেন। দরোজার দিকে এগোলেন বিদায়ের ভঙ্গিতে। শেষে স্বভাব মোতাবেক বললেন—‘কথা এখনো বাকি আছে ঢের!’ 

চলবে..

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *