আয়েশা আব্দুর রহমান—বিশ্বজুড়ে যিনি ‘বিনতুশ শাতে’ বা ‘তীরকন্যা’ নামে পরিচিত—ছিলেন আরব ও মুসলিম বিশ্বের নারীদের জ্ঞানতাত্ত্বিক রুদ্ধদ্বার খোলার অগ্রদূত; আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী লেকচারার এবং আরবি সাহিত্যে ‘কিং ফয়সাল অ্যাওয়ার্ড’ জয়ী প্রথম নারী। রক্ষণশীল পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে লড়াই করে জায়গা করে নিয়েছেন মিশরের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের একেবারে প্রথম সারিতে। কুরআনের তাফসির, উসুলে ফিকহ ও তুরাস নিয়ে তাঁর ৪০টিরও বেশি আকর গ্রন্থ আজও গবেষকদের জন্য পথপ্রদর্শক। বিশেষ করে নারী কিংবদন্তিদের নিয়ে তাঁর জীবনীসাহিত্য এক অনন্য মানদণ্ড।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন নিজের অধ্যাপক আমিন খওলির সাথে। স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ তিন দশক বিরহ বয়ে বেড়িয়েছেন মিলনের ব্যাকুলতায়। জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি গেয়েছেন সেই বিরহের গান আর শুনিয়েছেন নীলনদের তীরে বিনতুশ শাতে হয়ে ওঠার দুর্বার কাহিনি। হায়াত মওতের পারাপার নামে তাঁর জীবনকথার বাংলা অনুবাদ ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে কেয়ারি-তে।
জমিনে যখন হাঁটি হাঁটি পা ফেলা বুঝতে শুরু করি, শৈশবের খেলাঘরে আমি, প্রাচীন শহর দিময়াতে নীলনদের তীরে। নদীর দিকে সেইখানে মুখ করে দাঁড়ায়ে নানাজান শায়েখ ইবরাহিম দামহুজিল কাবিরের বাড়ি, শানদার, পুরানা, নীলের জলে পাথুরে ভিতে গড়া, সামনের উত্তর-পশ্চিম যতদূর চোখ যায়, শুধু দিগন্ত আর দিগন্ত খোলা।
নদীর কিনারা ধরে নিচতালার সামনে বাড়ির সমান চওড়া একটা বারান্দা। তার দুই ধার দিয়ে পানির দিকে নেমে গেছে পাথরের সিঁড়ি। গ্রীষ্মের খরায় নদীর পানি নাইমা গেলে সিঁড়ির ধাপ একে একে বাইর হয়া পড়ে, আর বানের মৌসুমে উচ্ছাসের ধাক্কায় পানি দিয়া সিঁড়ি তলায়া যায়; তখন শুধু ওপরের মাথাগুলিই বাহির হয়ে থাকে।
বারান্দার উত্তরি দুয়ার খুইলা দিলে দেখা যায় দূর তরি চইলা যাওয়া লম্বাচওড়া ঘাট। সফর শেষে ওইখানে নোঙর ফেলে পালতোলা জাহাজ, ভূমধ্যসাগর দিয়া শাম, সাইপ্রাস, আনাতোলিয়া হইয়া তারা দিময়াতে ফিরা আসার পরে। আইসা পৌঁছলে, মাঝিদের নামা হয়া গেলে, রাস্তায় লোহার খুটায় শিকল দিয়া জাহাজ বাঁইধা, মালসামান নামায়া, তারা লোকালয় আর নদীর ধারে ধারে পরিবারের কাছে দিন বিতাইতে চলে যায়।
দক্ষিণা দুয়ার খুইলা দিলে দেখতে মিলে কাঠের বেড়া দিয়ে আড়াল করা কেমন ছোট্ট একখান জলাধার। খরার মৌসুমে এই জায়গাটা সমুদ্রগোশলের ঘাটলা বনে যায়, বাড়ির বেগমগণ এইখানে গোশল করেন; নাইল ছাড়ায়া তখন নোনতা পানি নীলের কয়েক মাইল ভিতরে ঢুইকা পড়ে, নীলরেও দূর থিকা দেখলে মনে হয়—সমুদ্র থিকা আইসা ঢুইকা পড়া একটা লম্বা উপসাগর।
বারান্দার পিছন দিকে মেহমান ও মিশর-শাম যাতায়াতকারী কারোবারিদের বড় এস্তেকবালখানা। এরই ওপরের দিকে মিলে যাবে তিনখানা তলা, সেগুলায় দাদার আজাদ করা দাসেদের রহস্যময় কতক কামরা—সারা যৌবন এই বাড়িতে বিতায়া দেওয়ার পর, যারা বয়স বাইড়া বুড়ায়া যাওয়ায় এই বাড়ি থেকে জুদা হইতে পারে নাই, দাদার ওয়াফাতের আগেই যারা হাতে হাতে মুক্তিনামা পাওয়ার পরেও আরেকটা নয়া জিন্দেগি শুরু করতে পারে নাই।
ওই কোমলমতি বয়সে আমার দাসপ্রথার দুখ নিয়া আর কীই বা সমঝ থাকবে। চোখ খুলতেই বরং দেখতে পাইছি দাদি হালিমা বাড়ির পোলাপানদের দেখভাল করতেছেন, চাচা মাবরুক মেহমানদের খেদমত ও বড়বাড়ির বাজারসদাই সামলাইতেছেন। এরপর চরম বুড়াকালে চাচা মাবরুক মইরা গেলে সমাধিত হইলেন পারিবারিক গোরস্তানে, শেখ দাদার দাসদের জন্য খাস করা নির্জন কিনারে। তারপর কিছুকাল তার পোলা নিজের বাবার স্থান সামলানো বাদে, একদিন সেও নিজের নসিবের তল্লাশে দুনিয়ার পথে রওয়ানা হয়া পড়ে। থাইকা যায় শুধুই দাদি হালিমা, তার অবসন্ন বুড়াবয়সে আমাদের দেখভাল করতে, বাড়ির পুরানা ইতিহাস থিকা জমানো কাহিনি শুনায়া শুনায়া আমাদের দিল বেহলাইতে।
* * *
এই পুরানা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকত আমার মায়ের নানা-নানি। বয়সের ভারে তারা অনেকটাই নুয়ে পড়ছিলেন; তাদের দেখভাল করতে যেয়ে মায়ের নিজের সময় আর শ্রমরে, নিজের সংসার ও নানুবাড়ির মাঝে ভাগ কইরা নিতে হইত।
মায়ের সাথে বড়বাড়ি যাওয়া আমার নিত্যদিনের অভ্যাস ছিল। সেইখানে পৌঁছাইয়া মা আমারে সোপর্দ করতেন দাদি হালিমার কাছে, উনি গল্প শুনাইয়া আমারে ব্যস্ত রাখতেন। মা যাওয়ার আগে বইলা দিতেন, আমারে যেন এক মুহূর্তও চোখের আড়াল না করেন। কিন্তু ঠিক মুহূর্তের মধ্যেই আমি কোনো না কোনো ফন্দি করে, এই সদয় বুড়া মানুশটার নজর এড়ায়ে সমুদ্রে চইলা যাইতাম, পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে খেলকুদে মাইতা ওঠতাম। মায়ের বাড়ি ফিরার সময় হইলে, নানা-নানির খেদমতের বড় আনচান দেখায়া বাহানা করতাম; মায়ের চইলা যাওয়া তরি অপেক্ষা কইরা, চইলা যাওয়ামাত্রই ফের নদীর তীরে ফিরা যাইতাম। এখন আর সন্ধ্যা হওয়া তরি কোনো তাড়া নাই।
অনেক সময় খোলা আসমানের নিচে শুনশানে নিজেরে একলা পাইতাম, নদীর ধারে তখন নোঙর ফেলা পালতোলা কোনো জাহাজের কল্পনা করতাম। নদীর ফিশফিশানি কানে লাগাইয়া বুড়ি মার মুখে মুখে শুনা বড়বাড়ির স্মৃতিগুলা মনে মনে আওড়াইতাম। আমার আনন্দের তিয়াশ পুরাই হইত না, হঠাৎই চিন্তা আইসা পড়ত—হায় মা যদি জাইনা ফেলে আমি এইখানে!
আমি নদীর ধারে আছি এই কথা শুনলেই হয়, মা ডরে আঁতকায়া উঠবেন। বইকা-ঝইকাও যখন নদীর থিকা দূরে রাখতে পারবেন না, তখন ডর দেখানির আশ্রয় নিবেন। জলপরীর ভয়ানক কাহিনি শুনাবেন—তারা তলদেশের গুহা থিকা ওপরে উইঠা আসে, পানির ধারে আইসা ভাইসা থাকে সুযোগ বুইঝা আদম সন্তান শিকার করবে বলে, অসতর্ক মানুশদের টাইনা নিয়া যায় তলদেশের গহীনে, তাদের বাকিটা জীবন ওইখানেই গুজরাইতে হয়। যারা একবার ওইখানে গেছে, তারা আর কোনোদিন ওপরে ফিরে আসে নাই।
আমি বুঝতে পারতাম, নদীর থিকা দূরে রাখতেই মা বানায়া বানায়া খুব মাহারতের সহিত এইসব কাহিনি আমারে বলেন। তবুও যে একটা জিনিশ আমারে অস্বস্থ কইরা তুলত, এই কাহিনিগুলি মা শুনাইতেন একটা বেদনাবিধুর হাহাকার সুরে, কথা বলতে বলতে উনার আবেগ কখনো এতখানিই হাভি হয়া পড়ত, যে টলমল চোখের অশ্রু উনি ধইরা রাখতে পারতেন না। পরে সেইখান থিকাই তার বয়ান করা সব কাহিনি আমার একিন হইতে শুরু করত।
ভয়ানক স্বপ্নরা আমারে ঘুমের মধ্যে তাড়া করে ফিরত। দেখতাম নদীর ওপর অর্ধেক গা দেখায়ে কোনো জলপরী ভেসে আছে : মানুশের মতন শরীর আর জাদুকরি বেশরূপ, নিঃশব্দে অপেক্ষা করতেছে শিকারের; শিকার পাওয়ামাত্রই চক্কর দিয়া দিয়া পানিতে ডুব যখন মারতেছে, প্রকাশ পাইয়া উঠতেছে তার অর্ধাঙ্গ নিচের লেজ, পাখনা আর আঁশ।
ডরে আমি পরের কিছুদিন মাঠে যাওয়া অফ রাখতাম। লাগত বড়ই একলা একলা বিষণ্নতা। যখনই নদীর বুকে আমার বসবার জায়গাটার কথা ইয়াদ হইত, আর দেখতাম মহল্লার মেয়েছেলে সব ছুইটা বেড়াইতেছে নদীর ধারে, মনে বলত, ওদের কি আমার মতন জলপরীর কাহিনি জানা মা নাই?
২.
অবশেষে দাদি হালিমার মুখ থেকে, ছোটকালে মায়েরে আতঙ্কিত কইরা তোলা ট্রাজেডির আশল কাহিনি জানলাম, যার ফলেই, মায়ের অন্দরজুইড়া রাজ কইরা আছে নদীর ভয়। আমার জন্মের আগে, বরং মায়ের বড় হইয়া বিবাহে বসারও আগে, এক সকালে মায়ের মা নামছিল নদীর পাড়ে, উনি আর কোনোদিন সেইখান থিকা ফিরা আসে নাই।
উত্তাল ঢেউয়ের বাহু তারে টাইনা নিয়া গেছে। তার চিৎকার আর পানির গর্জন মিলেমিশে হয়ে গেছে একাকার, লোকজন তার চিৎকার আর পানির গর্জন ফারাক করতে করতেই, পানির অতলে উনি হারায়ে গেছেন।
আজিব ব্যাপার হল, এই ট্রাজেডিক ঘটনা আর তার পরের করুণ রিয়ালিটি জানার পরেও, নদীর প্রতি আমার মহব্বতের টানে বিন্দু পরিমাণ ভাটা পড়ে নাই। বরং আরও শক্ত কোন বন্ধন যেন নদীর সাথে আমারে বাইধা নিছে, তার থিকা মুক্তি পাওনের সাধ্য আমার নাই।
অল্পদিনের ভেতরেই আমি আবার সেইখানে ফিরা যাই, যেইখান ছাইড়া গেছিলাম কিছুদিন আগেই। চেষ্টা করি ওই ট্রাডেজি অনুভব করার যার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আমি ছিলাম না। মনে হয়, ঢেউয়ের গর্জনের ভিতর দিয়া আমি নদীর গহীন থিকা ভাইসা আসা কোনো মানুশি কণ্ঠের দূর দোহরানি শুনতে পাই, সঙ্গে আলাদাও করতে পারি নদীর জলে বওয়া মায়ের অশ্রুগুলা, যা দূর অতীতের গর্ভে নিজের ডুইবা হারানো মায়ের স্মরণে উনি নদীর ধারে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে ঝরাইছিলেন; খুব করে নদীর কাছে ফরিয়াদ করছিলেন, তার মায়েরে যাতে ফিরায়ে দেয়; কিন্তু নদী তো নদীই—শুধুই তার ক্লান্ত, ছিন্ন, দিশাহারা আকুতির দোহরানিই ফিরায়ে দিছে।
এই অল্প বয়সেই আমি বুইঝা যাই, কেন নদীর প্রতি আমার টান দেখলেই মায়ের দিলে ডরের শঙ্কা ঢেউ তুইলা ওঠে। বুইঝা যাই নানা ও নানুর সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্কেরও কারণ; ট্রাজেডির পর থেকে তারা তো মায়ের বেদনাবিধুর হাহাকারের স্মৃতি লইয়াই দিন গুজরাইছে, সকাল-সন্ধ্যা তার যন্ত্রণার নাট্যমঞ্চের দিকে চাইয়াই দিন বিতাইছে।
এরপর থেকে বড়বাড়ির প্রতি আমার টান দিগুণ বেড়ে যায়। আমার যাবতীয় কচি আবেগসহ আমি ঝুকে পড়ি ওইদিকে—; কারণ ওইখানেই আমার মা তার মায়েরে হারাবার পর বাইড়া উঠছেন, ওইখানেই আছেন তার শোকাহত নানা ও নানু, যারা তারই ভিতর খুঁইজা নিছেন নিজেদের হারানো মেয়ের জীবন্ত ছায়াছবি, আর ওইখানেই সেই নাট্যমঞ্চ নদীর পাড়, যে এক পরিবারের তিন প্রজন্মরে জুইড়া রাখা ডুব-ট্রাজেডির সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়ে আছে।
* * *
এই বিপন্ন করুণ দিগন্তেই, আমার বোধের জানালা খুলতে শুরু করে, যখন পা রাখতেছি আমার পঞ্চম বছর বয়সে।
ওই শোকাবিষ্ট কিন্তু উষ্ণ মমতায় পূর্ণ পেয়ালা থেকেই আমি পয়লা জীবনের স্বাদ অনুভব করি, সেই ধ্বংসস্তুপের পাশেই দাঁড়ানো জিন্দা চরিত্রগুলার মধ্য দিয়া আমি ট্রাজেডির ছেঁড়া-ছেঁড়া সুতাগুলি কুড়ায়ে নিতে শুরু করি, আর তারপর শুধু ফুরসত পাইলেই, নজরদারি এড়ায়া চলে যাই নদীর পাড়ে—পাড়ে চুপচাপ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইসা জমানো সুতাগুলা সাজাইতে থাকি এবং বহুত মনোযোগ ও শীতল বেদনার সুহবত দিয়া আমার মিস হওয়া সিনারিগুলারে বোনার কোশেশ করতে থাকি।
এই সবকিছুর মাঝেই, আমার না-এলেমেই, আমার আব্বা আমার হায়াতের নকশা আঁকতে লেগে গেছেন, এমনতরা ওক্তে যখন সব অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ আমারে টাইনা নেওয়া শুরু করছে নদীর দিকে; নদীর চারতরফ ঘুরাফিরা করা আত্মাদের-ছায়াদের দিকে; বড়বাড়ির দিকে, বড়বাডির মধ্যে থাকা লোকজন-যাবতীয় স্মৃতিময় অবয়বের দিকে।
৩.
আমার আব্বাজান দিময়াত মাটির পয়দায়েশ না। উনার পয়দায়েশ মানুফিয়া জেলার ‘শুবরাবখুম’ গ্রামে, ওইখানেই উনার শিশুকাল আর কোরানের হাফেজ হওয়া, গ্রামের শায়েখ ইউসুফ শিলবি শুবরাবখুমির প্রতি বিমোহিত হইয়া তার হাতে এলেমের সবক নেওয়া, এরপর সাথিসঙ্গীর লগে রাজধানী চলে যাওয়া, সেইখানে সার্টিফিকেট লাভ করা ও তদ্বারা দিময়াত প্রাথমিক বালক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ পাওয়া, আর এরই কিছু সাল বাদ এই ধন্যধরায় আমি তীরকন্যার আগমন করা।
এই মর্মে শুনছি যে, আব্বা যখন এলাকায় ফিরা আসেন, তার পরিপাটি পোশাক আর নমনীয় মেজাজ, সজীব শাখসিয়ত দেইখা মানুশদের নজর তার ওপর গিয়া পড়ে; তবে পরে খুব কম সময়েই আব্বার ভিতর বড় অভূতপূর্ব বদলাভ ঘইটা যায়; আমার ধারণা, এর পিছে বড় ভূমিকা রাখে প্রাচীন এলাকার উত্তরাধিকারসূ রুহানিয়ত—সেই রুহানিয়ত, যার স্মৃতিকাতরতা আজতরি ঝলমল কইরা বেড়ায় চারতরফ এলাকারে ঘেরাও করে রাখা জনবহুল মসজিদগুলাতে; যেইসব মসজিদ-মাজারে শুইয়া আছেন মর্দে মুজাহিদ, তাবেয়িন হজরত আর ওলি-আওলিয়াগণ।
এলাকার একেবারে পুর্বপাড়ে মানজালা লেকের ধারে, ‘গিত নাসারা’র সন্নিকটে তাবেয়ি হজরত ‘সাইয়িদ শাত্তা’র মাজার; এরই বিপরীতে একদম উত্তরপাড়ে, ভূমধ্যসাগরের কিনারে, সাইয়িদ জারবি হজরত শায়িত।
পশ্চিমের শেষ সীমানায় শায়েখ আলি সইয়াদের মাজার এবং এরই দক্ষিণ দিকে মুখোমুখি শায়েখ মাজলুম রহিমাহুল্লাহর মাকবারা।
উত্তর দিকের ফটকে মাদলুবি জামে মসজিদ, জামে বাহার মসজিদের ধর্মীয় ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার আগ তরি যা যুগ যুগ ধরে ধর্মীয় জ্ঞানের শিক্ষালয় হিশেবে একমাত্র দাঁড়াইয়া ছিল।
এই জনবহুল সব মসজিদ আর মোবারক মাজারগুলা থেকে, রৌশনভরা এক আলো বেরোয়ে আসত, প্রাচীন এলাকার আসমানরে মোহিত কইরা তুলত কী এক আধ্যাত্মিক তলজ্জির সুবাসে। আমার ধারণা, এইটাই আমার আব্বারে মূলে আকর্ষিত করে তাসাউওফের পথে, উনি এতই এর গভীরতক চইলা যান, যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আধুনিক শিক্ষা উনার চোখে ফিকে মনে হইতে থাকে; উনি চেষ্টা কইরা সেইখান থেকে নিজেরে ছাড়ায়া নিয়া জামে বাহারের ধর্মীয় ইন্সটিটিউটে দাখেলা নেন, সেইখানের রুহানি ঐতিহ্যময় রক্ষণশীল আবহাওয়ায়, শায়েখ মহোদয়দের কাতারে, নিজের জায়গা কইরা নেন।
আব্বা আম্মারে বিয়া করেন। কারণ বাকি সব দিময়াতি মেয়েদের চেয়ে আব্বার চোখে আম্মা খাস হিশেবে ধরা দিছিলেন বলেই হয়তো। আম্মা ছিলেন শায়েখ দামহুজির পেয়ারের খাস নাতনি, আর শায়েখ ছিলেন কোন এক সময়ের জামেয়াল আজহারের সুনামসম্পন্ন হজরত।
ঘরের হিস্টোরি থেকে জানতে পারি, আমার জন্মের আগে, যখন মা তাঁর পয়লা সন্তান গর্ভে ধারণ করেন, আব্বা দুআ করছিলেন যেন আল্লাহ একখান নেককার বেটা সন্তান তাঁরে দান করেন, যেই সন্তান ঘরের ধর্মীয় জ্ঞানের উত্তরাধিকার বইয়া নিবে। কিন্ত মা যখন জন্মাইলেন বেটি সন্তান, তখন ‘খোদার ফয়সালাই সন্তুষ্টি’ বইলা, তাঁর মতো মানুশের যেমন আচরণ করা উচিত, আব্বা তেমনই আচরণ করছেন।
এরপর যখন আম্মা আমারে গর্ভে ধারণ করলেন এবং দুসরা মেয়েরূপে আমারে জন্ম দিলেন, তখনো আব্বা নাখোশি দেখান নাই। ‘খোদা তাআলার ইচ্ছা’। এমনকি পয়দায়েশকালেই আমারে ওয়াকফ করে দিলেন এলেমের তরে। বরকতের খায়েশে উম্মুল মুমিনিনের নামে আমার নাম রাখলেন ‘আয়েশা’ আর উপনাম রাখলেন উম্মুল খায়ের : ভালাইয়ের জননী।
আমি ঠিক জানি না সেই জীবনের একদম পয়লা পর্বেই—যার স্মৃতি আমার স্মরণশক্তিরও গত হয়ে গেছে—আব্বা কেমনে তার উৎসর্গিত পথে আমারে গইড়া তুলতে শুরু করছিলেন। হ্যাঁ, আবছা-আবছা তো কিছু অস্পষ্ট স্মৃতি আছেই—যেমন শৈশবের খেলাধুলা থেকে আমারে তুইলা নিয়ে গেছেন, তখন, যখন শৈশবের তাবিজ তরিও গলা থিকা আমার খোলা হয় নাই। আমারে তাঁর সঙ্গে বসাইতেন কখনো বাড়ির মজলিশে, কখনো তার জামে বাহরের অফিসে; এইটার নাম উনি দিছিলেন ‘খলওয়া : একান্ত যাপন’ ।
সম্ভবত সেই ভুইলা যাওয়া সময়েই, দীর্ঘদিন কোআন তেলাওয়াত শুনতে শুনতে, আমি কিছু আয়াত আর ছোট ছোট সুরা আত্মস্থ কইরা নিছিলাম, সঙ্গে ইসলামি উলুমের যেইসব কথাবার্তা উনি তাঁর সহকর্মী আর তলাবাদের সাথে করতেন, সেইখান থিকাও কিছু কিছু লফজ, ধারণা আমার জেহেনে ঢুইকা গেছিল।
সম্ভবত সেই সময়েই, আমার পড়ালেখার হাতেখড়িও শুরুওয়াত পাইয়া গেছে। বাকি, আমার তোড়জোড় আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হইছে ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মকালে, যখন আমার বয়স আনুমানিক পাঁচ বছর!
***
দূরস্মৃতির ওই শীতকালটারে আমরা বরণ করলাম যখন, আব্বা তৈয়ারি নিতেছেন আমাদের সঙ্গে নিয়া যাবেন শিবরাবাখুম গ্রামে, তাঁর পরিবারের কাছে গরমের ছুটি কাটাইতে। শুনছি প্রতি গ্রীষ্মেরই এই রীতি।
কিন্তু নদীর প্রতি অত্যাধিক টান আর নদীর ধারে দাঁড়ানো বাড়ির সাথে গভীর তাল্লুকের কারণে, এই সফর নিয়া আমার শ্বাস জড়াইয়া আসতেছিল। এই শ্বাসজড়ানি আরও দিগুণ হইতেছিল, যখন দেখি মাও একইরকম চাপায়া দেওয়া এই মৌসুমি সফরে শ্বাসজড়ানো হইতেছেন; ওইখানে গেলে বছরের প্রায় চারখানা মাস কাইটা যাবে মায়ের দেখভালের কত মুহতাজ নানা-নানি—উনাদের থিকা দূরে, দিন কাটাইতে হবে নিজের বাইড়া ওঠা পেয়ারের নগরজীবন থিকা সম্পূর্ণই বিপরীত গ্রামীন জীবনে।
তাও সত্য হইল, এত কিছুর পরও এই শ্বাসজড়ানো শুরুর সফর নয়া আনন্দ নিয়াই আমার কাছে ধরা দিল; আমার ভিতরের দমবন্ধ অন্দরে অন্দরেই ঘুরপাক খাইয়া হঠাৎ গায়েব হয়া গেল, যখন দাদাবাড়ির ঘাট ছাড়ায়া ‘ফুলুকা’ নদী পাড়ি দিয়া আমরা যায়া পৌঁছলাম বাড়ির বিপরীতে পশ্চিম তীরের লোহার ইস্টেশনে। সেইখান থিকা আমরা উঠলাম সকালের ট্রেনে। ট্রেন আমাদের নিয়া ছুইটা চলল, আমি জানালার ওপারে বিস্ময়ের চোখ মেইলা দেখতে লাগলাম চারিপাশের আজিবগরিব সুন্দর সব মনজর—যেন বা আমি তাকায়া আছি এই দুনিয়ার সিন্দুকের জাদুয়ি ছিদ্রখানা দিয়া; লোকভাষায় বললে ‘আজিব সুন্দুক’ এর ফুঁকা দিয়া।
বেনহা ইস্টেশনে আইসা, বড় ট্রেন থিকা নামতে হল। খানিক লম্বা সময় প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষার পর আসল একটা ছোট্ট জরাজীর্ণ ট্রেন। এই ট্রেন ধীমে ধীমে হোঁচট খেয়ে খেয়্ব, আমাদের নিয়ে গেল ‘মীত বরহা’ শহরে। আমাদের জন্য ওইখানে অপেক্ষায় ছিলেন আব্বার মামারা।
সারাদিন তাদের মেহমানদারি গ্রহণের পর, সন্ধ্যায় আমাদের দুইটা জিন বাধানো গাধা আইনা দিলেন তারা। সেগুলায় চইড়া, ধুলামাখা সরুপথ ধইরা, ক্ষেতের ভিতর দিয়া আমরা আব্বার বাড়ির দিকে রওয়ানা হইলাম।
* * *
আমাদের এস্তেকবাল জানাইতে বাড়ির লোকেরা সব জড়ো হইছে। তাদের দিকে তাকায়া আমার রক্তের টান মেহসুস হল, অথচ পয়লা দেখায় কেমন অচেনা অচেনাই লাগতেছিল। এই তরির ক্লান্তিকর দীর্ঘ সফর শেষে, যেন বা এক খণ্ড কোনো আজাব শেষে, আমি দোরগোড়ায় দাঁড়ায়া রইলাম এস্তেকবাল শেষ হয়ে যাওয়া তরি। আমার মন চাইতেছিল বাইরে ছুইটা যাই, এই নয়া জগৎটারে আবিষ্কার করি।
আমার বয়সি এক গেঁদু মেয়ে, চাচার মেয়ে, তারে কাছে যেয়ে বললাম, আমারে গ্রাম ঘুরায়া দেখাও। সে জানাইল, সকাল হইলে, তার আগে না, কারণ সূর্যাস্ত হয়া গেলে নাকি একলা বেরোনোর তাদের অনুমতি নাই। আমি তারে আমার সঙ্গে যাইতে রাজি করাইতেছিলাম, এমন সময় পুরুষদের বসবার ঘর থিকা বাইর হয়া আসলেন দাদা, উনি এশার ওক্ত হইয়া গেছে প্রায় সময়ে দহলিজে আমাদের দাঁড়াইয়া থাকতে মানা করলেন।
ধীরে ধীরে আমি বাড়ির উঠানে গেলাম। দেখলাম কাঠখরের ইস্তূপ রাখা চুল্লির পাশে; বাড়ির ত্রিসিমানায় এই চুল্লি দেইখা আমি অবাক হইলাম। আরও তাজ্জব হইলাম যখন দেখলাম গাইছাগলের খোলা গোয়ালঘর এই উঠানেই, আর তার পাশেই সারি সারি আন্ধার কক্ষগুলি। জিজ্ঞেশ কইরা জানলাম, শীতকালে এগুলায় বাড়ির লোকেরা ঘুমায়।
মা ওপর থিকা ডাকলেন। আমি ছুইটা গেলাম তাঁর কাছে। দেখলাম মা আমাদের মালসামান থিকা শাদা ফকফকা একটা চাদর বাইর কইরা বিছায়া দিছেন তলায় পিতলের মইরচা ধরা কালা লোহার একটা খাটে, নয়া নয়া মাদুর বিছানো বড়সড় মতন একখান ঘরে। পাশের ঘরে খানার এন্তেজামে তোশক বিছানো হইছে, আমরা তোশকের ওপর বসলাম একটা নিচা কাঠের কুরসির ওপর রাখা রাতের খানার থালাবাসনরে ঘিরে। কোণায় হাতমুখ ধুইতে রাখা আছে পিতলের গামলা ও কলশ। জানালার কার্নিশে রাখা তিনখানা পানির কলশি, মা সেগুলারে শাদা কাপড় দিয়া ঢাইকা দিছেন।
এই হইল আমাদের গ্রামের বাড়ির যা কিছু আসবাব।
আমি ভাবছিলাম শহরের অনূকূল জীবন হইতে এমন হুট বদলির পর, আমার আর ঘুম আসবে না। কিন্তু মায়ের কোলে মাথা নুওয়াইতেই দেরি, আমি পলকভরা ঘুমে হারায়া গেলাম, এমন হারানিই হারালাম, যে রাত্রে আব্বার পুরুষদের মজলিশ থিকা ঘরে ফেরা তরিও টের পেলাম না।
* * *
সকাল হইলে আমি তাড়াহুড়ায় নাশতা সারলাম। অপেক্ষায় থাকলাম কখন আব্বা বাইর হবেন আর ওমনি আমি চাচার মেয়ে আমিনার সঙ্গে গত সন্ধ্যার মুলতবি ভ্রমণে বাইর হব।
কিন্তু আমার টাশকি খাইতে হইল। আব্বা আমারে নিয়া গেলেন গেরামের মক্তবে। সেইখানে কোরান হেফজ করতে আমারে সোপর্দ করলেন হজরত শেখ মুরসির হাতে। আব্বা চইলা যাওয়ার আগে ঠিক হইল : সপ্তাহে ছয় দিন বিয়ান থিকা নিয়া কুরবে আসর তরি আমার মক্তবে থাকতে হবে।
পয়লা দিন শায়েখ আমার প্রতি কিছুটা সদয় থাকলেন, আমারে তেলাওয়াত কিংবা লেখার জন্য জোর করলেন না। শুধু উনার পাশে বসাইয়া রাখলেন একটা খসখসা মাদুরের ওপর, ওইখানে বইসা বইসা আমি ছয় ঘণ্টা ধইরা দেখলাম : পিচ্ছি পিচ্ছি ছেলেরা একে একে উনার সামনে আসতেছে, আইসা হেফজ করা স্লেট থিকা পইড়া শোনাইতেছে, নতুন পড়া স্লেটে লেইখা নিতেছে; কেউ তোতলাইয়া পড়ল কি ভুল করল লেখায়, শায়েখ একবার ও দুইবার ধমক দিতেছেন, আর তেসরাবার, এক পোলারে দিয়া তার পাও ধরায়া নিজ হাতের লাঠি দিয়া গলদকারী ছেলের পায়ে ঠাস ঠাস লাগাইতেছেন।
ওইদিন, রঙউড়া দিলখুড়া মুখ নিয়া আমি মায়ের কাছে ফিরলাম। মা আদর ভইরা আমারে বুকে টাইনা নিলেন, দোয়া করলেন আল্লাহ যাতে আমার জন্য আসান কইরা দেন, তজরুবার শুরুওয়াতের শিদ্দতরে সইয়া নেওয়ার তৌফিক দেন। মা আশ্বস্ত করলেন, শেখ তাঁর বেত দিয়া কখনো আমারে মারবেন না। এতে আমার ভীতি কিছুটা আসান হইল।
ওই সারাটা দিন মা আমার জন্য একটা কাপড়ের থলি সিলাইলেন, সেইটাতে আমি টিনের ফলক আর খাগের কলম রাখব, সঙ্গে কিছু শুকনা রুটি বানাইলেন, এগুলা দিয়া মক্তবের সময় আমি ভুখ সামলাইতে পারব।
গ্রীষ্মের চারটা মাস বিয়ানগুলা আমার মক্তবে বন্দি গেল । বিকালের কিছু সময় পেলে, ক্ষেতের দিকে ছুইটা যাইতাম। ধীরে ধীরে আমি গ্রাম আর গ্রামবাসীদের ভালোবাইসা ফেললাম; খসখসা তবিয়ত লইয়াই গেরামের হায়াত আমার কাছে প্রিয় হয়া উঠল, এবং ফলে, দুময়াত শহর থেইকা দূরে থাকার বেদনা, অনেকটাই লাঘব হয়া গেল।
আমি ভাবতাম, গরমের ছুটি শেষে আমি আবার নদীর কাছে খেলার মাঠে ফিরে যাব, কিন্তু আব্বা এইদিকে ফয়সালা নিছেন এই মৌসুম থিকাই আমার শুরু করতে হবে আরবি ও ইসলামি শিক্ষার এবতেদায়ি সবক, তাই আমারে জামে বাহারের মসজিদে উনার অফিসঘরে নিয়া যাইতে লাগলেন; সেইখানে উনি ছাত্রদের পড়াইতে মশগুল-কালে আমি উনার থিকা প্রাপ্ত সবক বইসা বইসা মুখস্ত করে নিতাম।
* * *
পরের গ্রীষ্মের সময়গুলাতে আমাদের গ্রামে যাতায়াত জারি রইল। সেইসব ফুরসতের মধ্যে আমি কোরানে কারিম পূর্ণাঙ্গ হেফজ করলাম, এবং শরত ও শীতকালে দুময়াত স্কুলের সিলেবাস থেকে পাওয়া সবকগুলাও পাশাপাশি জারি থাকল।
আমার বয়সি ক্লাসমেট ও বান্ধবীদের অনেকের জন্যই যা অপ্রাপ্য আমি তা হাছিল করতেছি—এর ফলে যট্টুক গায়েবি ফখর আমার মধ্যে পয়দা হইত—আব্বার আরোপিত কঠোর শাসন তার চেয়েও বেশি আমারে ক্লান্ত কইরা তুলত। সবক গ্রহণ ও মুখস্থ করার শিকলে বন্দি থাকতে হইত বিয়ানভর, শেষে বিকালের সময় বাধ্য মেয়ের মতো আবার আব্বার সঙ্গে ধর্মীয় ইস্কুলে শায়েখদের মজলিশে হাজির থাকতে হইত—যখন কিনা একই সময়ে, আমার বান্ধবীরা নদীর ধারে খেলার মাঠে নিরুদ্বেগ ছুইটা বেড়াইতেছে।
দিনে দিনে এই বিধিনিষেধ আমার অভ্যাস হয়ে পড়ল, অথবা হয়তো নিস্তারের আশা ছাইড়া দিয়া একরকম মানায়াই নিলাম আমি। তখন সমস্ত শক্তি আমি ঢাইলা দিলাম এলেমের ভিতর। আব্বার সঙ্গী ওলামারা যখন আমার ইসলামি এলেমে দখলদারি নিয়া জিকির করতেন, ফখরে আমার অহং জাইগা উঠত।
তাদের আনন্দভরা তাজ্জবে আমার সহি-সুরেলা কোরান তেলাওয়াতের তারিফ শুইনা, আর মুখস্থ করা আমার সুফি বয়াতগুলা গাইলে তাদের আরাম প্রতক্ষ্য কইরা, আমার অহং ক্রমশ আরও মওজ পাইয়া উঠত।
শহরে আমার সমবয়সিদের কাছে কোরান হেফজ করার ঘমন্ডে নিজেরে উঁচা মনে করতাম, আর গেরামে গেলে, যেইখানে অধিকাংশ কিষাণ-অওয়ালদই কোরানের হাফেজ, আরবি ভাষা ও ইসলামি এলেমের অর্জিত সবক নিয়া বড়াই করতাম।
এই বড়াই-ই একদিন আমারে দাদার হাতের ‘কঠিন শায়েস্তা’র মুখে ফেলল।
এক বিয়ানে উনি আমারে দেখলেন সূর্য ওঠার আগেই আমি বাড়ি থিকা বের হইতেছি। কই যাইতেছি জানতে চাইলে বললাম : গ্রামের উত্তর পাড়ে আমাদের বাগানে; মায়ের জন্য কিছু লেবুফুল আনতে যাই। উনি দ্বিধা করলেন কিছুকাল, তারপর যাইতে অনুমতি দিয়া সঙ্গে বললেন—ফেরার পথে যেন পীচ গাছগুলার হালত দেইখা আসি।
আমি দৌড়ায়া ছুটলাম। একিন হইতেছিল না, আমি স্বাধীন মুক্ত ছুটতেছি। বাগানে পৌঁছাইয়া, যার আয়তন দুই বিঘা জমির বেশি হবে না, যখন সবুজ পাড়ের মাঝামাঝি সূর্যোদয়ের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াইলাম, এক সুকুনি আরাম আমারে আচ্ছন্ন কইরা নিল। বিয়ানের আবিরে, ফুলের মিষ্টি ঘেরানে আমার শ্বাস ভইরা উঠল।
সেই আনন্দে আমি দাদুর কথা ভুইলা গেলাম, পীচ গাছের খবর নেওয়ার কথা আমার মনেই পড়ল না।
বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাইয়া যখন হঠাৎ মনে পড়ল, তখন আর বুঝতেছি না আমি কীই বা উত্তর দিব।
ভয় সামলায়া ভাবলাম, আলগোছে ওপরের ঘরে ঢুইকা পড়লে দাদুর চোখে পড়ব না। কিন্তু ঠিকই উনি বারান্দার খোলা জানালা দিয়া আমারে দেইখা ফেইলা ডাক মারলেন—‘পীচ গাছের হালত কী গো?’
আমি ঘাবড়ায়া গিয়া আমতা আমতা করে উত্তর দিলাম : ঠিকঠাক। উনি জানতে চাইলেন, আমি কী বলতে চাইতেছি। মাথায় কোনোই শব্দ আসল না আমার, গাল দুইটা শুধু লাল হয়া উঠল। উনি আমারে মারতে যখন উদ্যত মতন, তখন মুখ থেইকা বাইরাইয়া আসল শুরুতেই বাইর হওয়া উচিত শব্দখানা—‘মুহাম্মার…(লালচে)’
আমি দৌড়ায়া গিয়া আমাদের ঘরে উইঠা মায়ের বাহুমাঝে সাহারা নিলাম। ওইদিকে, এই মর্মে পিছন থিকা দাদুর ভেঙ্গানির গলা ভাইসা আসতেছে, উনি এইটারে আমার ‘মাতব্বরি’ আর ‘শুদ্ধতামি’ বইলা বিদ্রুপ করতেছেন—‘হে হে! এইটাই হইল তোমার শহইরা মানুশ হওয়ার হাকিকত! পরবাস যাইয়া খালি কথার ভেঙচিটাই শিখছ।’
আমার মনে আছে অনেক দিন তরি আমাদের শহুরে জীবন নিয়া বলা দাদুর কথাগুলা আমারে ভাবায়া রাখছে। আমার জানা মতে, ওই কাল তরি তো, আমার আশল বসত সেই সুন্দর উপকূলীয় শহর দিময়াতই ছিল। সেইখানেই আমার পয়দায়েশ, শৈশবের খেলাধুলা, এবং সেইখানেই পয়দায়েশ আমার বোনের, আমার মায়ের ও তার সমস্ত খান্দানের। আব্বার স্থায়ী কর্মস্থলও সেইখানেই। গেরামরে আমি কখনই স্থায়ী নিবাস বইলা ভাবি নাই; সে তো কেবল গ্রীষ্মকালীন সাহারা, আমাদের শহরের মানুশদের রওসুলবারে গিয়া ছুটি কাটাইবার মতন।
গেরামের সঙ্গে আমার যত্ত গভীর রিশতাই থাকুক না কেন, আমার ত্বকটারে পয়লা ছুইঁয়া দেওয়া মাটির প্রতি যেই মহব্বত, তামিলদারি, ওর চাইতে তো তার টান বেশি হইতে পারে না।
শহর থিকা এই দূর-গ্রামে মায়েরেও সত্যিকারের সুকুনে আছে বইলা কখনো অনুভব করি নাই। উলটা আকছারই একলা থাকলে, শুনছি মৃদু স্বর কইরা গুনগুন করতেছেন নিজের প্রিয় গানের লাইন—
বছরে একবার হইলেও দেখতে আইসো—
তোমগো আমারে ভুইলা যাওয়া হারাম।
তার কণ্ঠে তখন মেহসুস করতাম হাহাকার, বিচ্ছেদের বেদনা। অথচ সেই শহর নিয়াই কিনা আমার দাদু বলে, আমরা সেইখানের পরবাসী! আমি মন থিকা কোনদিন এটা মেনে নিতে পারি নাই।
তবে সেইদিনের কঠিন সবক আমারে এইটুকুন শিখাইছিল সত্য—যে গ্রামে গিয়া যেন প্রমিতগিরি না করি, সেইখানকার মানুশদের মুখে ফিরে না এমন ভারী শব্দের এস্তেমাল না করি, তারা যাতে মনে না করে, আমি তাদের নিরক্ষরতার মজা লুটতেছি।
তাই আমি বরং নিজ এরাদায় স্থির হইলাম, মনুফিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক টোনে কথা বলা শুরু করব, যাতে ‘পরবাস যাইয়া খালি কথার ভেংচিটাই শিখছ’ এমন কথা দোবারা শুনতে না লাগে, এবং আমার সুন্দর অনিন্দ্য শহরের সাথেও আমার রিশতার জায়গাতে কোনো আঘাতে না আসে।
ওইদিনের পরে, গ্রামে গিয়া জ্ঞান নিয়া বড়াই করার স্বাদ থিকা আমি যদিও বঞ্চিত হইলাম, তবুও ঠিকই দিময়াতে আমার জন্য এইখানে পথ খোলা রইল। সেইখানে আমি আমার সমবয়সি, বান্ধবীদের তুলনায় যেই বাড়তি সুযোগ পাইতেছিলাম—কোরানে কারিম, হাদিস শরিফ, নবির শানের কসিদা আর সুফি সংগীত মুখস্থ করা ইত্যাদির সুযোগ—তখনো এইসবের ফখর আমার সঙ্গে থাইকা গেছিল।
* * *
১৯২০ সালের কাছাকাছি আমরা যখন গরমের সফর থিকা ফিরলাম—সেই সময়ের বিপ্লবের চিৎকারে মুখরিত সফর থিকা—তখন দীর্ঘ সফরের ধুলাবালি গা ঝাড়া দেওয়ার আগেই আমি ছুইটা গেলাম নদীর ধারে বন্ধুদের খেলার মাঠে; কিন্তু দুপুরের খরা রইদের ভিতর জায়গাটারে পাইলাম নির্জন, ভীতিকর আর সান্নাটাভরা।
সারাটা দিন আমি নানুবাড়ির সমুদ্রমুখী জানালা দিয়া নদীর তীরে তাকায়া রইলাম। আমার সমবয়সি কারোরই কোনো দেখা পাইলাম না। মনে হইতেছিল যেনবা নদীর পানি তাদের ফাইল ফেলছে, অথবা নদীর পরীরা তাদের তলদেশে টেনে নিছে।
বিকাল হইতেই আমি মহল্লার ঘরবাড়ি ছুটলাম খবর নিতে। তখন হতবাক হইতে হল এই শুনে যে, পাড়ার সব ছোট্ট মেয়েগুলান ‘লুজি আমিরিয়া বালিকা বিদ্যালয়ে’ পড়া শুরু করছে।
ওরা সবগুলা স্ব-উৎসাহে ওদের ইস্কুলের পরিপাটি জামা, ছবিওয়ালা বই, নানান রঙের খাতা আর ইস্কুল থিকা পাওয়া সরঞ্জাম আমারে দেখাইল। সঙ্গে আনন্দ নিয়া আমারে শুনাইল ওদের আজিব জগতের কথা : আদুরে মেডামদের কথা, দেয়ালময় ছবি-অঙ্কিত ক্লাসরুমের কথা, সাজানো-গোছানো বিশালাকার খাবারঘরের কথা, এমনকি ছুটির সময় উম্মে হাবিবা দাদুর থেকে মিষ্টি কেনারও কথা।
এই সমস্ত কথাবার্তা শুইনা, এইসবে দিল ডুবায়া আমি বাড়ি ফিরলাম। আব্বা খেয়াল করলেন, আমি কেমন জানি দরসের পড়া সহিভাবে শুনতেছি না। উনি জিজ্ঞেশ করলেন, কী হইছে আমার, আমিও সাহস কইরা সব বলে দিলাম : পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে আমি ইস্কুলে যাইতে চাই।
মনে হইল কোনো মহাতর গুনাহের কথা বইলা ফেলছি!
চূড়ান্ত ফয়সালার সুর জানায়া উনার জবাব আসল : ‘কোনো ওলামা-হজরতের মেয়ে এইসব নোংরা ইস্কুলে যাইতে পারে না। তাদের শিক্ষা হবে ঘরে।’
এরপরে সুরা আহযাব তেলাওয়াত করতে বললেন আমারে : “হে নবির বিবিগণ, আপনারা অন্যসব সাধারণ নারীদের মতন নন, তাই যদি তাকওয়ার এহতেমাম করেন, তবে কথার গলা নরম করবেন না, পাছে মরজ মনে থাকা লোকেদের মনে লালসার উদ্রেক হয়। আপনারা বলেন ভালো ভালো কথা, আর অবস্থান গ্রহন করেন নিজেদের ঘরে, জাহেলি যুগের সাজসজ্জা প্রদর্শনীর মতন সাজসজ্জা প্রদর্শনী করবেন না। নামাজ কায়েম করেন, জাকাত আদায় করেন, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের এত্তেবা করেন। আল্লাহ তো কেবল আপনাদের আহলে বাইত থেকে ময়লা দূর করতে ও পূতপবিত্র করতে চান। তাই আপনাদের ঘরে ঘরে যা কিছু হয় আল্লাহর আয়াত ও হেকমতের তেলাওয়াত, তার স্মরণ করেন। জরুর আল্লাপাক সর্বসুক্ষ্মদর্শী, সমস্ত খবর রাখেন।”
আব্বারে তখন জিজ্ঞেশ করি নাই : ‘আমি কি নবি-পরিবারের কেউ?’ আমি জানতাম উনি নিজের উঁচা নসবের পেহচানে ফখর করেন, হজরত ফাতেমার আওলাদ ইমাম হোসাইন তরি নিজের সিলসিলা গননা করেন।
এমনকি এও প্রশ্ন করতে চাইছিলাম : ‘অন্তত নারী হওয়ার বয়সেও কি আমি উন্নীত হইছি?
কিন্তু, ডরকে মারে চুপ থাকারেই আমি শ্রেয় মনে করলাম।
মাসটা কাইটা গেল। প্রতিদিন আমি নয়নে-পরানে মহল্লার মেয়েদের ইস্কুলে যাওয়া দেখতাম, নির্ঘুম দীর্ঘ রাতগুলায় একা একা ডুইবা থাকতাম আর হাহাকার করতাম।
নিজের কোমল বয়সের সহ্যসীমার সমস্তটা জুইড়া আমার দুনিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মাইল। আমার চেহারায় আর আচরণে এমন শুকাইয়া যাওয়া, গাফেল হইয়া যাওয়া আর গুটাইয়া যাওয়া প্রকাশ পাইল, যে মা পেরেশান হইয়া মাশোয়ারার জন্য দাদাজান শায়েখ দামহুজির কাছে ছুইটা গেলেন। আল্লাহ দাদাজানের প্রতি রহম করেন। আহা আমার মা, একদিকে তার স্বামীর ফয়সালায় না-দখলদারির ফিকির, আরেকদিকে নিজের মেয়ের ভোগ করতে থাকা বেচেইনি ও মাহরুমির ভয়াবহ পরিণতির ভয়।
দাদা আগায়ে আসলেন চুড়ান্ত ফয়সালা করতে। অনেক বইলাটইলা শেষ তরি আব্বারে তার একমাত্র অবস্থান থিকা সরায়ে আইনা, আমার ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার অনুমতির ওপর রাজি করালেন। শর্ত হল তিনটা :
এক. না সরাসরি না পরোক্ষ, আব্বা কোনোভাবেই ইস্কুলের ভর্তি বা প্রক্রিয়াজাত কিছুতে যুক্ত হবেন না।
দুই. ঘরের ধর্মীয় পড়াশোনা জারি রাখা লাগবে। ইস্কুলে পড়ার ফলে ঘরের ধর্মীয় পড়ায় কোনো প্রকার ব্যাঘাত বা অবহেলা দেখানো চলবে না।
তিন. আমি বালেগ বয়সের কাছাকাছি পৌঁছানো মাত্রই, ইস্কুলে যাওয়া পুরাপুরি বন্ধ করতে হবে।
বিষয় হল, শেষ তরি আমি মুক্তি পাইলাম—যা কখনো পাব না বলেই এই যাবত তরি ভেবে আসছিলাম।
পরদিন সকাল হইলে, প্রবল কষ্ট স্বীকার-বাদ দাদা আমারে ইস্কুল ভর্তি সারলেন। শিক্ষাবর্ষ তখন প্রায় শেষ হওয়ার পথে। উনি ওলির প্রতিনিধি হইয়া জরুরি কাগজপত্র সব জমা দিলেন।
উপরিস্থিতি এমন হয়া দাঁড়াইল, পয়লা শ্রেণিতেই আমার ভর্তি হতে হবে। আমার আজও পষ্ট মনে আছে, ইস্কুলে আমার পয়লা আনন্দের দিনটা ছিল বিশ্যুদবার। পূর্ব দিকে বিশাল তলা ভবনের একেবারে শেষ কর্নারের সেই ক্লাসরুমটাও আমার দিব্যি মনে আছে।
আরও মনে আছে : একটা অতিরিক্ত বেঞ্চি আইনা পয়লা সারির শেষ বেঞ্চির সামনে আমারে বসানো হইছে। আমি পয়লা ক্লাসের ছাত্রীদের সঙ্গে বইসাই দোসরা ক্লাসে উত্তীর্ণ হওয়ার এমতেহান দিতেছি। এমনকি তখন ইস্কুলে ঢোকার মাত্র কয়েক মিনিটই গুজরাইছে—আমি প্রধান শিক্ষিকার রুম থিকা নিয়া খোলামেলা সাফসুতরা বিশাল আঙিনা পাড়ায়া মাত্রই পূর্ব দিকের কোরিডর ধইরা পয়লা ক্লাসের হলরুমে আইসা পৌঁছালাম।
নির্ধারিত সময়ের তিন ভাগের এক ভাগেরও কমে আমি পরীক্ষা শেষ করলাম। ক্লাসমেডাম আবলা আজিজা দিময়াতি আমার পরিক্ষার খাতায় এক নজর বুলায়া নিজের বিস্ময় লুকাইতে না পাইরা বইলা উঠলেন : ‘কিহ, এমন উত্তর কোনো ছাত্রীর থেকে কস্মিনকালেও কল্পনাওকরা যায় না!’
আমি সেদিন কোনোরকমে নিজের ছুইটা আসতে চাওয়া হাসিটারে চেপে ধরছিলাম। প্রশ্নগুলা তো আমার কাছে নিতান্তই বাচ্চাদের খেলার মতন সহজ ছিল। আর অবাক যদি হইতেই হয়, তাহলে আমিই বরং অবাক হব উনার অবাক হওয়া নিয়া যে, উনি ভাবছেন আমি পড়াশোনায় সবেমাত্র শিশু!
* * *
এই ‘কামিয়াবি’ আমারে ঘরের পড়াশোনাতেও আরো মনোযোগী কইরা তুলল। একদিকে আব্বার রেজামন্দি হাছিলের আশা—যাতে আমারে উনি আবার ইস্কুল থিকা মাহরুম না করেন, অন্যদিকে ইস্কুলের পড়াশোনাও তেমন কষ্টসাধ্য না, বরং পয়লা দিনই আবিষ্কার করছিলাম, আমার ঘরের বিশেষ এহতেমামি পড়াশোনাই মূলত ইস্কুলরে তাজ্জব কইরা দিছে।
শুরুর দিককার সময়ে, ক্লাসমেটদের দূর দূর আচরণ অনেক কষ্ট দিত। কিন্তু নিষ্পাপ কোমল শৈশবের জগত খুব কম সময়েই ওই দূরত্বগুলা ঘুচায়া আমাদের কাছায়া নিয়া আসে।