ইমাম তাবারি : তাফসির শাস্ত্রের পথিকৃৎ

ইসলামি জ্ঞানবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আগমন ঘটেছে, যারা কেবল তাদের সময়ের সন্তান ছিলেন না, বরং তারা নিজেরাই একেকটি সময় বা যুগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি (২২৪–৩১০ হিজরি) নিঃসন্দেহে সেই সারির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। তাকে বলা হয় শাইখুল মুফাসসিরিন বা মুফাসসিরদের সর্দার। তবে তিনি কেবল মুফাসসির ছিলেন না; একাধারে ঐতিহাসিক, ফকিহ ও ভাষাতাত্ত্বিক হিসেবে তিনি যে বুদ্ধিবৃত্তিক ইমারত গড়ে তুলেছিলেন, তা পরবর্তী হাজার বছরের ইসলামি পাণ্ডিত্যকে আগলে রেখেছে।

খতিব বাগদাদি তাঁর সম্পর্কে বলেন—

“তিনি ছিলেন মহান ইমামদের একজন; তাঁর বক্তব্য দ্বারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতো। তিনি এমন সব জ্ঞানের বিশাল সমন্বয় সাধন করেছিলেন, যা তাঁর যুগের আর কোনো ব্যক্তি অর্জন করতে পারেনি। তিনি একাধারে ছিলেন কুরআনের হাফিজ, কিরাত ও তাফসির বিশারদ এবং ফিকহি মাসায়েলে গভীর ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন। সহিহ-দুর্বল হাদিস, নাসিখ-মানসুখ এবং ইতিহাসের ঘটনাপঞ্জি—সবই ছিল তাঁর নখদর্পণে।”

তৎকালীন মুসলিম বিশ্ব ও সময়ের দাবি

ইমাম তাবারির জন্ম ও বেড়ে ওঠা আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে। সময়টা ছিল তৃতীয় হিজরি শতক—ইসলামি জ্ঞানচর্চার এক উত্তাল সন্ধিক্ষণ। একদিকে বাগদাদের ‘বাইতুল হিকমাহ’ কেন্দ্র করে গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞানের অনুবাদের জোয়ার, অন্যদিকে মুতাজিলা বনাম আহলুস সুন্নাহর তাত্ত্বিক সংঘাত।

ততদিনে হাদিস সংকলনের মূল কাজগুলো (সিহাহ সিত্তাহ) প্রায় গুছিয়ে এসেছে। কিন্তু কুরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যার জগৎটি ছিল বেশ অগোছালো। সাহাবা ও তাবেয়িদের যুগ থেকে চলে আসা তাফসিরগুলো ছিল বিক্ষিপ্ত। কোথাও সনদবিহীন বর্ণনা, কোথাও ইসরাঈলি উপকথার অবাধ অনুপ্রবেশ, আবার কোথাও নিছক ব্যক্তিগত রায় বা মতামতের প্রাধান্য।

সময়ের নিড বা দাবি ছিল এমন একজন পলিমেথ বা বহুশাস্ত্রবিদ পণ্ডিতের—যিনি এই বিশাল ও বিক্ষিপ্ত তথ্যের ভান্ডারকে একটি সুশৃঙ্খল বাচনিক কাঠামোতে দাঁড় করাবেন। যিনি শুধু বর্ণনা উদ্ধৃত করবেন না, বরং বর্ণনার সত্যতা যাচাই করবেন এবং ভাষাতাত্ত্বিক ও ফিকহি বিশ্লেষণের মাধ্যমে কুরআনের মর্মার্থ উদ্ধার করবেন। ইতিহাসের সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই যেন ইমাম তাবারির আগমন।

জ্ঞানতাপসের প্রতিকৃতি : আমুল থেকে বাগদাদ

২২৪ বা ২২৫ হিজরির শুরুতে কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণে তাবারিস্তানের আমুল শহরে তাঁর জন্ম। শৈশবে অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন—মাত্র সাত বছর বয়সে কুরআন হিফজ এবং নয় বছর বয়সে হাদিস লেখা শুরু করেন। যৌবনে জ্ঞানপিপাসা মেটাতে তিনি দেশভ্রমণে বের হন। রাই, বসরা, কুফা, সিরিয়া এবং মিশর চষে বেড়িয়ে অবশেষে বাগদাদে থিতু হন।

তাঁর মেধা ও স্মৃতিশক্তি ছিল কিংবদন্তিতল্য। আবুল হাসান ইবনুল মুগলিস বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমার ধারণা, আবু জাফর তাবারি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত যা ভুলে গিয়েছিলেন, তা-ই অন্য এক বড় আলেম সারা জীবনেও মুখস্থ করতে পারেননি।’

তাঁর মেধার ক্ষুরধারতা বোঝাতে হারুন ইবনে আবদুল আজিজের একটি বর্ণনাই যথেষ্ট। তিনি বলেন, তাবারি একবার তাঁকে বলেছিলেন—

‘মিশরে অবস্থানকালে সেখানকার আলেমরা আমাকে নানাভাবে পরীক্ষা করতেন। একদিন এক ব্যক্তি আমাকে আরবি ছন্দবিজ্ঞান বা ‘আরুদ’ সম্পর্কে প্রশ্ন করল, অথচ আমি তখন এ বিষয়ে জানতাম না। আমি তাকে পরদিন আসতে বললাম। রাতে খলিল ইবনে আহমদের আরুদ বিষয়ক কিতাবটি এনে সারা রাত পড়লাম। সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম, তখন আমি একজন পুরোদস্তুর আরুদ বিশারদ।’

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন নির্মোহ জ্ঞানতাপস। তাঁর জীবনের ব্রত ছিল একটাই—পড়া এবং লেখা। কথিত আছে, তিনি প্রতিদিন গড়ে ৪০ পৃষ্ঠা লিখতেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই রুটিন বজায় ছিল। ইমাম ইবনে কাসির তাঁর সম্পর্কে বলেন—

‘তিনি ইবাদত, দুনিয়াবিমুখতা ও সত্যের পথে অটল থাকার ক্ষেত্রে ছিলেন অনন্য; কোনো নিন্দুকের নিন্দা তাঁকে বিচলিত করতে পারত না।’

তাবারির পূর্ববর্তী তাফসির চর্চা : একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

ইমাম তাবারির আগে তাফসির শাস্ত্র কোনো একক পূর্ণাঙ্গ কিতাব আকারে খুব একটা সুবিন্যস্ত ছিল না। সেসময় তাফসির ছিল প্রধানত হাদিসের অংশ। সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, ওয়াকি ইবনুল জাররাহ কিংবা আব্দুর রাজ্জাক তাদের হাদিস গ্রন্থে তাফসিরের অধ্যায় যুক্ত করতেন।

সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ লিখিত তাফসির কে রচনা করেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে—১৪৯ হিজরিতে মৃত্যুবরণকারী মক্কার মুহাদ্দিস আব্দুল মালিক ইবনে জুরাইজ এর পথিকৃৎ। আবার ইবনুন নাদিমের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভাষাবিদ আল-ফাররার কথা। আল-ফাররা তাঁর শিষ্য উমর ইবনে বুকাইরের অনুরোধে—যিনি আমির আল-হাসানের প্রশ্নের উত্তর দিতে হিমশিম খেতেন—কুরআনের তাফসির বা ‘মাআনিল কুরআন’ লিখিয়েছিলেন।

অন্যদিকে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি দাবি করেন, এরও আগে খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের অনুরোধে তাবেুয় সাঈদ ইবনে জুবাইর (মৃত্যু ৯৫ হিজরি) তাফসির লিখেছিলেন।

মোদ্দাকথা, তাবারির আগে তাফসিরের পাণ্ডুলিপি ছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। সেখানে কোনো আয়াতের ব্যাখ্যায় হয়তো একাধিক মত আসত, কিন্তু কোন মতটি অধিক গ্রহণযোগ্য, তার কোনো তাত্ত্বিক ফয়সালা ছিল না। তাবারি এসে এই বিচ্ছিন্ন ধারাকে একটি ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’র রূপ দিলেন।

তাফসিরে তাবারি : বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্রের নতুন দিগন্ত

তাঁর রচিত তাফসির গ্রন্থটির মূল নাম ‘জামিউল বায়ান আন তাবিলি আয়িল কুরআন’, যা লোকমুখে ‘তাফসিরে তাবারি’ নামে পরিচিত। এটিকে কেবল তাফসির বলা ভুল হবে, এটি তাফসিরের ইতিহাসে প্রথম ‘ক্রিটিকাল এনালাইসিস’।

তাফসিরে তাবারির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ

তাফসির বিল মাছুর : এটি এই কিতাবের প্রাণ। তিনি প্রথমে কুরআন দিয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাদিস এবং এরপর সাহাবা ও তাবেয়িদের ‘আসার’ (উক্তি) সনদ-সহ উল্লেখ করেছেন।

সনদ ও সূত্ররক্ষা : আধুনিক গবেষণায় ‘সাইটেশন’ বা সূত্র উল্লেখ করা যেমন জরুরি, তাবারি আজ থেকে এগারোশ বছর আগে সেই মানদণ্ড স্থাপন করেছেন। তিনি প্রতিটি ব্যাখ্যার চেইন অফ ন্যারেশন বা সনদ উল্লেখ করেছেন, যাতে পাঠক বর্ণনার বিশুদ্ধতা যাচাই করতে পারেন।

তারজিহ বা ক্রিটিকাল ইভালুয়েশন : তাবারির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি কেবল সংকলক ছিলেন না, ছিলেন বিচারক। কোনো আয়াতের ব্যাখ্যায় যদি সাহাবা ও তাবেয়িদের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকত, তিনি সবগুলো উল্লেখ করার পর বলতেন, ‘আমার দৃষ্টিতে এই মতটি অধিক গ্রহণযোগ্য।’ এরপর তিনি ব্যাকরণ, শানে নুজুল এবং যৌক্তিক প্রমাণের আলোকে তার পছন্দের পক্ষে দলিল দিতেন।

ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও জাহিলি কবিতা : কুরআনের কোনো শব্দের অর্থ নির্ণয়ে তিনি আরবের প্রাচীন জাহিলি যুগের কবিতার অঢেল ব্যবহার করেছেন। আরবি ভাষার ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণে এই কিতাব এক অনন্য দলিল।

লিখনশৈলী : তাঁর লেখার ভঙ্গি ছিল অত্যন্ত গোছানো। তিনি শিরোনাম করতেন—‘আল্লাহর এই বাণীর তাবিল (ব্যাখ্যা) হলো এই…’। এরপর বলতেন, ‘এর দ্বারা আল্লাহ এই উদ্দেশ্য নিয়েছেন…’ এবং সবশেষে দাবির স্বপক্ষে সাহাবা-তাবেয়িদের বক্তব্য নিজ সনদে পেশ করতেন।

অন্যান্য রচনাবলি

ইমাম তাবারি কেবল মুফাসসির ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক। তাঁর রচিত ‘তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক’ (যা ‘তারিখে তাবারি’ নামে পরিচিত) ইসলামের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ। পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে শুরু করে ৯১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইতিহাসের ধারাবিবরণী তিনি এতে লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়া ‘তাহজিবুল আসার’ তাঁর হাদিস বিষয়ক একটি অসমাপ্ত বিশাল কাজ এবং ‘ইখতিলাফুল ফুকাহা’ ফিকহি মতপার্থক্যের ওপর রচিত তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ।

উপসংহার

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া যথার্থই বলেছিলেন—‘মানুষের হাতে থাকা তাফসিরগুলোর ভেতর বিশুদ্ধতম তাফসির হলো মুহাম্মাদ ইবনে জারিরের তাফসির।’ প্রাচ্যবিদ থেকে শুরু করে আধুনিক গবেষক—সবার কাছেই তাবারির কাজ এক অনিবার্য রেফারেন্স।

ইমাম তাবারি এমন এক সময়ে কলম ধরেছিলেন যখন মুসলিম মানস নানামুখী ফিতনা ও বিভ্রান্তির মুখোমুখি ছিল। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও বিশ্লেষণ দিয়ে সেই বিশৃঙ্খল তথ্যরাশিকে শৃঙ্খলিত করেছেন। তাঁর কাজ পরবর্তী মুফাসসিরদের জন্য (যেমন ইবনে কাসির, কুরতুবি বা বাগাবি) এক বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছে। তিনি দেখিয়ে গেছেন, কীভাবে ভক্তি ও যুক্তির সমন্বয়ে ওহির জ্ঞানকে ধারণ করতে হয়। আজকের আধুনিক মনন যখন তথ্যের মহাসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন তাবারির এই মেথডলজি বা বাছবিচার করার পদ্ধতি আমাদের জন্য হতে পারে এক বড় শিক্ষার উৎস।

তথ্যসূত্র

  • তারিখে বাগদাদ, ড. বাশশার আওয়াদ মারুফ তাহকিককৃত (পৃষ্ঠা : ২৫৪৮)
  • শরহু মুকাদ্দিমাতি তাফসিরিত তাবারি, ড. মুসায়েদ বিন সুলাইমান আত-তাইয়্যাব, লেখকের জীবনী অংশ
  • তাফসিরে সায়ালাবির ভূমিকা, নিরীক্ষণ ও সম্পাদনা টিম,দারু ইহয়াউত তুরাসিল আরাবি মুয়াসসাতুত তারিখিল আরাবি (পৃষ্ঠা : ৮২-৮৬)
Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *