অবিনশ্বর (দ্বিতীয় পর্ব)

পূ্ব প্রকাশের পর…

পরদিন ফজরের নামাজের পরপরই দেখা গেল, দারুল উলুম ফুলতলী মাদরাসার মাঠে প্রায় শ’খানেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। সবার হাতে কাস্তে-দড়ি। ছাত্রদের জন্য দেড়শো কাস্তে আলাদা করে আনা হয়েছে। আরও শ’খানেক লোক এসেছে স্বউদ্যোগে। ফুলতলী বিলে তাদেরও খেত আছে, আজকে তারা অন্যের ধান কেটে দেবে, পরদিন অন্যরা কেটে দেবে তাদের খেতের ধান। ফুলতলীর ছোট ছোট ছেলেরাও চলে এসেছে দড়িদড়া নিয়ে। তারা মাদরাসার ছাত্রদের সঙ্গে করে খেত থেকে ধান আনবে। মকতবের বাচ্চা মেয়েরাও এসেছে—তাদের কোনো কাজে লাগানো যায় কি-না!

একটু পর মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলেন আজগর মহাজন, আবদুল হাকিম-সহ মাদরাসার বাকি শিক্ষকরা। মাদরাসার ছাত্রদের রাতেই বলে দেওয়া হয়েছিল কাকে কোন কাজ করতে হবে। দশজন দশজন করে পনেরোটা দলে ভাগ করা হয়েছে তাদের। প্রত্যেক দলে একজন করে আমির নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। মাদরাসার পড়াশোনা অনেকটা সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের মতো কঠিন শৃঙ্খলামাফিক চলে, তাই যেকোনো কাজে নিয়মতান্ত্রিকতা নিজ থেকেই এসে যায়।

ফজরের নামাজ শেষ করে মাদরাসার ছাত্ররা লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে বেরিয়ে এলো। আজগর মহাজন সবাইকে নিয়ে রওনা হলেন বিলের দিকে।

ফুলতলী বিলের পশ্চিম পাশের খেতগুলো থেকে ধান কাটা শুরু করল স্বেচ্ছাসেবকরা। খেত অনুযায়ী একেক খেতে দশ জনের একটি বা দুটো করে স্বেচ্ছাসেবক দলকে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হলো। প্রতি খেতে মাদরাসার ছাত্রদের সঙ্গে রয়েছে কয়েকজন অভিজ্ঞ কৃষক। তারা ধান কাটা, আঁটি বাঁধা, বোঝা বাঁধার বিদ্যা ঝালাই করে দিচ্ছিল ছাত্রদের। ধানকাটুরে ছাত্ররা ধান কেটে আঁটি বেঁধে সেগুলো ছোট ছাত্রদের মাথায় তুলে দিচ্ছিল আর বলে দিচ্ছিল—এটা কার খেতের ধান।

মাদরাসার মাঠের দক্ষিণ পাশে পুকুর, পুকুরের দক্ষিণ পাশে বিশাল জায়গা খালি পড়ে আছে। সেখানে ধান মাড়াইয়ের পাঁচটা মেশিন বসানো হয়েছে। মাদরাসার ছাত্র আর এলাকার ছেলেপেলেরা ধানের বোঝা এনে রাখছে সেখানে। প্রতি খেতের ধান আলাদা আলাদা করে রাখা হচ্ছে।

যুবক স্বেচ্ছাসেবক, যাদের ধান মাড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আছে, এমন প্রায় পনেরো-বিশজন পাঁচটা মেশিনে মাড়াই শুরু করে দিয়েছে। যে কৃষকের খেতের ধান ছাত্ররা মাথায় করে এনে রাখছে, সে কৃষক সেখানে উপস্থিত থেকে যুবক স্বেচ্ছাসেবকদের দিয়ে ধান মাড়াই করিয়ে নিচ্ছে। ধান মাড়াই শেষ হলে কৃষক বস্তায় ভরে ধান ভ্যানে তুলে দিচ্ছে, ভ্যানচালক ধান নিয়ে ফেলছে কৃষকের বাড়িতে। বাড়িতে মেয়েছেলেরা তৈরি হয়ে আছে। ধানের বস্তা বাড়িতে আসতেই সেগুলো দুয়ারে নিয়ে স্তূপ করে রাখছে কিংবা আঙিনায় রোদে ছড়িয়ে দিচ্ছে। খালি বস্তাগুলো আবার পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধান মাড়াইয়ের খোলায়। আবার শুরু হচ্ছে আরেক কৃষকের ধান মাড়াইয়ের কাজ।

মসজিদের মুয়াজ্জিন চান মিয়া মুন্সি ওদিকে আরেক কাজ করে ফেলল। ফজরের পরপরই তিনি আট-দশজন লোক নিয়ে গ্রামের প্রতি বাড়ি থেকে চাল-ডাল, তরি-তরকারি আর রান্নার বাদবাকি অনুষঙ্গ চেয়ে আনল। মাদরাসার মাঠের একপাশে মাটি খুঁড়ে ইয়া বড় চুলা বানিয়ে ফেলেছে কয়েকজনকে নিয়ে। গ্রামের সমিতির বড় বড় তিনটা ডেগ এনে তাতে বসিয়ে দিল। রান্নার পেঁয়াজ-মরিচ আর সবজি কাটাকুটি চলতে লাগল। সকালে মাদরাসার ছাত্র আর স্বেচ্ছাসেবকদের খাবারের আয়োজন হবে সবজি-খিচুড়ি।

নাস্তার বেলা হতে হতে সারা গ্রাম উৎসবমুখর পরিবেশে ভরে উঠল। বাড়িতে বাড়িতে চর্চা চলছে—মাদরাসার ছাত্ররা ধান কেটে দিচ্ছে ফুলতলী বিলের! আশপাশের গ্রামের লোকেরা এ খবর পাওয়ার পর চলে এসেছে পশ্চিম পাশের রাস্তার ধারে। সেখানে দাঁড়িয়ে তারা ছাত্র আর স্বেচ্ছাসেবকদের ধান কাটার উৎসব দেখছে।

সকালের খিচুড়ি রান্না হতেই সেগুলো ভ্যানে করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো পশ্চিম বিলে। কাজ রেখে খেতের পাশে গাছের ছায়ায় বসে খেয়ে নিল সবাই। দুপুরের খাবারও খেতে পাঠানো হবে। এরই মধ্যে দুপুরের খাওয়ার আয়োজন শুরু হয়ে গেছে—পায়জাম চালের ভাতের সঙ্গে মুরগির ঝোল আর খেসারির ডাল।

দুপুরের খানিক পর স্থানীয় ‘দৈনিক দেশকাল’ পত্রিকার এক প্রতিবেদক এসে হাজির হলো মাদরাসার সামনে। সে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক ঊষা’ পত্রিকারও স্থানীয় প্রতিনিধি। এমন অভাবিত স্বেচ্ছাশ্রমের খবর শুনে চলে এসেছে ভিডিও-প্রতিবেদন তৈরি করতে। মাদরাসার ছাত্রদের ধান কাটার ভিডিও ধারণ করে চলে এলো মাদরাসায়। মাদরাসার সামনে চান মিয়া মুন্সি রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিল, সে সাংবাদিককে মাদরাসার মুহতামিম সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে বলল।

মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকীর সঙ্গে এটাসেটা নিয়ে কথা বলতে বলতে সাংবাদিক জানতে চাইল, ‘এ কাজের উদ্যোক্তা কে?’

আবদুল হাকিম বলল, ‘আসলে উদ্যোক্তা কেউই নয়। পরশু দিন আমার স্ত্রী আমাকে এমন কিছু একটা করার জন্য বলেছিল, সেটাই আমি কমিটিকে বলি। তারা উদ্যোগটা ভালো মনে করে সকলে মিলেমিশে কাজটা করে নিচ্ছি। একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করলে সেখানে আল্লাহ সাহায্য করেন। তিনি কুরআনে বলেছেন—‘তোমরা আল্লাহর রশিকে সকলে মিলে শক্ত করে ধরো, পৃথক হয়ো না।’

***

‘এক নারীর উদ্যোগে হেসে উঠল ফুলতলী’! পরদিন সকালে ফুলতলী উপজেলার ইউএনও আরমান হোসাইন ঘুম থেকে জেগে দেখেন, তার ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ-মেসেঞ্জারে ভিডিও ক্লিপের সয়লাব। অন্তত বিশটি মিসড কল। এর মধ্যে একটি জেলা প্রশাসক অফিস থেকে।

আরমান হোসাইন দ্রুত ভিডিও ক্লিপটি দেখলেন। তিনি নিজেও তাজ্জব হয়ে গেলেন। তার উপজেলায় এমন একটি উদ্যোগ হচ্ছে অথচ তিনি জানতেই পারেননি। ভিডিওর কল্যাণে ফুলতলী গ্রামে মাদরাসার ছাত্রদের স্বেচ্ছা উদ্যোগে ধান কাটার প্রতিবেদন ইতিমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। একে তো অভিনব উদ্যোগ, আবার ছোট ছোট ছেলেরা ধান কাটছে—এমন দৃশ্য যে কাউকে আবেগতাড়িত করবে। ইউএনও তাড়াতাড়ি তার গাড়ি রেডি করতে বললেন ড্রাইভারকে।  

একটু পর পৌরসভার চেয়ারম্যান, উপজেলার কৃষি অফিসার, শিক্ষা অফিসারকে নিয়ে ইউএনও তিনটি গাড়িতে করে ফুলতলী চলে এলেন। জলিল চেয়ারম্যান আর আজগর মহাজন আগেই খবর পেয়েছিলেন। উপজেলার দায়িত্বশীল অফিসারদের আসতে দেখে সম্ভাষণ জানিয়ে মাদরাসার দপ্তরে নিয়ে বসালেন। মুহতামিম মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকীও উপস্থিত হয়েছেন দপ্তরে।

আজগর মহাজন অতিথিদের জানালেন, কাল-পরশুর মধ্যেই পুরো বিলের ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে। মাদরাসা-ছাত্রদের কাজের উৎসাহ দেখে আশপাশের গ্রামের লোকজনও আগ্রহী হয়ে ধান কাটায় লেগে গেছে।

ইউএনও আরমান হোসাইন বয়সে তরুণ, তিনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ধান কাটা উৎসব দেখতে এসেছি। এখানে বসে না থেকে আমাদের মনে হয় বিলে যাওয়া উচিত।’

উপজেলা কৃষি অফিসারও বললেন, ‘হ্যাঁ, চলেন। একদম সরেজমিনে প্রতিবেদন যাকে বলে।’

পৌরসভার চেয়ারম্যান রাশভারী মানুষ। তিনি মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হুজুর, আপনার ওয়াইফ তো বিরাট বিদ্বান মানুষ। আমার সালাম দিয়েন তাকে।’

আজগর মহাজন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার কাহিনি জানেন না। তিনি চমকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হুজুরের ওয়াইফ আবার কী করল?’

‘আরে মহাজন সাব, আপনি তো মোবাইল-ইন্টারনেট কিছু বুঝেন না। এই দেখেন…।’ এ কথা বলে কৃষি অফিসার ঊষা পত্রিকার ভিডিও প্রতিবেদনটি দেখালেন সবাইকে—‘…স্থানীয় মাদরাসার পরিচালক মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকী জানান, তার স্ত্রী কয়েকদিন আগে মাদরাসার ছাত্রদের সহযোগিতায় গ্রামের ধান কেটে তুলবার পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ মতোই মাদরাসা কমিটি গ্রামবাসীকে নিয়ে এ উদ্যোগ গ্রহণ করে। … ’

প্রতিবেদন শুনে জলিল চেয়ারম্যান বাহবা দিয়ে উঠলেন, ‘ঘটনা সত্যি নাকি হুজুর?’

মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকী দারুণ বিব্রত হয়ে পড়েন। সাংবাদিকের কাছে কথাচ্ছলে বলা তথ্যটি যে এভাবে ফলাও করে প্রকাশ করা হবে, এটা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। কোনোরকম মাথা নিচু করে জবাব দেন, ‘জি, সে-ই বলছিল কথাটা…।’

আজগর মহাজন সোৎসাহে বলে উঠেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! এমন বিবি ঘরে ঘরে পয়দা হোক।’

একটু পর বিলে ধান কাটা দেখতে আসেন থানার অফিসাররা-সহ এলাকার গণ্যমান্য লোকজন। জলিল চেয়ারম্যান সবাইকে নিয়ে ধানকাটুরেদের কাছে চলে যান।

প্রায় আড়াইশো তিনশো লোকের একসঙ্গে ধান কাটার এ স্বেচ্ছাশ্রমের মচ্ছব দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হন সবাই। পৌরসভার চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন—আজকের দুপুরের খাবার তিনি মাদরাসার ছাত্রদের সঙ্গে খাবেন। তার সঙ্গে আসা দুজন স্থানীয় নেতাকে বললেন গ্রাম থেকে একটা গরু কিনে রান্নার ব্যবস্থা করতে। অন্য অফিসাররাও জানালেন—আজকে দুপুরে না খেয়ে তারা ফুলতলী থেকে কোথাও যাচ্ছেন না। এমন একটি মহৎ উদ্যোগের উদ্যোগী লোকজনের সাথে একসঙ্গে খেতে পারা পরম সৌভাগ্যের বিষয়।

***

রাতের বেলা। ঘরের বারান্দায় পাটি পেতে বসে আছেন মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকী ও আয়েশা। বিদ্যুৎ নেই, বারান্দায় চাঁদের আলো এসে পড়ছে। ঝিরঝির দখিনা বাতাস বইছে। বাড়ির চারপাশের টিনের বেড়া থাকা সত্ত্বেও কিছু বাতাস উড়নচণ্ডি হয়ে দোলা দিয়ে যাচ্ছে বারান্দায়।

কথা বলে ওঠে আয়েশা, ‘মুফতি সাব হুজুর!’

‘হুমম।’

‘আমারে একটা চাঁদ কিনা দিবেন?’

‘চাঁদ কি কিনার জিনিস?’

‘না, বলেন আপনে কিনা দিবেন কি-না?’

‘আমি এত বড় চাঁদ কিনব ক্যামনে? আমি গরিব মানুষ!’

‘তাইলে আমি যদি একটা চাঁদ কিনা দেই আপনারে, আপনে নিবেন?’

আবদুল হাকিম হাসি হাসি মুখ করে তাকায় চাঁদমুখ আয়েশার দিকে। আয়েশার মুখটা কেমন অচেনা মনে হয় চাঁদের আলোতে। মুফতি সাবকে চুপ করে থাকতে দেখে আয়েশা আবার বলে উঠে, ‘বলেন নিবেন কি-না?’

‘আচ্ছা নিব, যাও।’

‘ধরেন, আপনারে একটা আস্ত চাঁদ দিলাম…।’ বলেই মুফতি সাবের হাতটা নিয়ে নিজের উষ্ণ পেটের উপর রাখে আয়েশা।

আবদুল হাকিম চমকে তাকায় আয়েশার দিকে, ‘মানে?’

আয়েশা মুফতি সাহেবের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আমি পেটের মধ্যে আপনার জন্য একটা চাঁদ পুষতেছি। চাঁদটা পূর্ণিমার চান্দের সমান বড় হইলে আপনারে দিব। আমার পক্ষ থেকে এইটা আপনার জন্য উপহার।’

আবদুল হাকিম হতভম্ব হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আয়েশার হেঁয়ালি কথার অর্থ বুঝতে কিছুটা সময় লাগে তার। যখন বুঝতে পারে তখন তাকিয়ে দেখে আয়েশার চোখভরা জল। চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে ছোট ছোট অজস্র অশ্রুবিন্দু। আবদুল হাকিম গভীর মমতায় বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে আয়েশাকে।

আবদুল হাকিমের ছোট্ট ঘরের বারান্দায় চাঁদের রাশি রাশি টুকরো যেন গলে গলে মিশে যাচ্ছে বিভাবরী চন্দ্রিমা জ্যোৎস্নায়।

***

এশা নামাজ পড়তে পড়তে ঝুম বৃষ্টি। মসজিদে নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিরা বেতের নামাজ শেষ করে হুটহাট চলে যায় যে যার বাড়ি। মসজিদে একা বসে থাকে মুফতি আবদুল হাকিম ফারুকী। মাদরাসা ছুটি হয়েছে দুদিন আগে, ছাত্র-শিক্ষক সবাই ছুটিতে বাড়ি চলে গেছে। মসজিদের নিয়মিত ইমাম মাওলানা ফয়জুল্লাহও ছুটিতে যাওয়ায় মুফতি সাহেব নামাজ পড়াচ্ছে দুদিন ধরে।

বাইরে বৃষ্টির সঙ্গে আকাশ কাঁপিয়ে বজ্রপাত। বিদ্যুৎ চলে গেছে, ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে ওঠা বিজলির আলোতে চকমক করে ওঠে কাচের জানালা। আবদুল হাকিম জানালার পাশে এসে দাঁড়ায়। কাচ একটু সরিয়ে হাত বাড়ায় অবারিত বৃষ্টিফোঁটার নিচে। প্রতিটি ফোঁটা হাতের তালুতে ছলকে উঠে গড়িয়ে পড়ে মাটির দিকে। জৈষ্ঠ মাসের বড় বড় ফোঁটা, ঠান্ডা। আবদুল হাকিমের মন আনচান করে। ধ্রুব অন্ধকারে বৃষ্টির একটানা ঝরঝর শব্দ।

জানালা বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় আবদুল হাকিম। মসজিদের সদর দরজা লাগিয়ে নেমে আসে আকাশভাঙা বৃষ্টির নিচে। রাস্তায় কেউ নেই, এগিয়ে যায়। হাঁটতে থাকে খালি পায়ে। পরনের লুঙ্গি-পাঞ্জাবি ভেদ করে শরীরের প্রতিটি লোমকূপ অজানা আনন্দে শিহরিত হয়। বিহ্বল আনন্দে তাকায় আকাশের দিকে। বৈশাখী রাতের পারদের মতো বেগুনি আকাশ থেকে তিরের মতো ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা, তীব্র গতিতে ধেয়ে আসে চোখের দিকে।

আবদুল হাকিম রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শব্দ করে হেসে ওঠে। দুহাত দুদিকে ভাসিয়ে পাখির মতো ঘুরতে থাকে, যেন প্রবল বৃষ্টির তোড়ে ডানা মেলবে পরিযায়ী সারস পাখি।

আকাশ থেকে তিরের বেগে তার দিকে নেমে আসছে জলের আরতি। এখন তার আর আল্লাহর মাঝখানে পার্থিব-অপার্থিব কোনো দেয়াল নেই। আকাশ থেকে আল্লাহর করুণাস্পর্শ জল ঝরে পড়ছে তার শরীরে, চোখে, মুখে সবখানে। সুদূর আকাশ থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার সঙ্গে মিশে আছে অবিনশ্বর সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ। এই আশীর্বাদের বৃষ্টি পৃথিবীর ভূঁইয়ে এসে মিশে যায় মাটির কণার সঙ্গে। সবার অলক্ষ্যে মাটির অতলে গড়ে তোলে অনিঃশেষ উর্বরা। মাটি থেকে জন্ম নেয় বৃক্ষ, ঘাস, ফসল। মানুষ বাঁচে। মাটি আর বৃষ্টি—কোটি কোটি বছর থেকে ধরে রেখেছে প্রকৃতির চিরসবুজ তারুণ্য। বৃষ্টিই পৃথিবীর আদি কৃষক, পরমাত্মার একান্ত করুণাধারা। সেই নিঃসীম করুণায় প্লাবিত হচ্ছে সে।

বৃষ্টির ছাঁট উপেক্ষা করে আবদুল হাকিম বিহ্বল মন নিয়ে হেঁটে যায়। রাস্তায় কেউ নেই। পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসে শিশুর চিৎকার। আবদুল হাকিমের মনটা হাহাকার করে ওঠে—আহা! শিশুটি কি বৃষ্টির প্রকৌশল জানে না? প্রকৃতির সঙ্গে বৃষ্টির অনিন্দ্য বন্ধুত্ব কি সে বুঝে উঠতে পারেনি? অন্য কোনো পৃথিবী থেকে সবুজ পৃথিবীতে এসে সে কি চমকে গেছে? বিস্ময়ভরা পৃথিবীর রূপে এখনো মানিয়ে নিতে পারেনি মায়াময় দুই চোখ। নতুন পৃথিবীর চারপাশ কেমন আবছায়া নিয়ে ভোর হয়, সূর্যরঙিন দিনশেষে নামে আঁধার রাত, বৃষ্টির রুমঝুম শব্দ টিনের চালে আঁকে নৃত্যের মুদ্রা। এসব কিছু কি একটি শিশুকে বিহ্বল করে?

আবদুল হাকিম শিশুর কান্নার ভাষা বুঝতে চেষ্টা করে। সকল পাখি নিজেদের সুরে একই রকম ডাকে। তাদের সুরে শব্দ বা ভাষার কোনো তারতম্য হয় না। তবু এক পাখি আরেক পাখির ভাষা বুঝতে পারে। কাকের কা কা, কোকিলের কুউ কুউ, চড়ুইয়ের কিচিরমিচির—সবই অল্প কিছু শব্দ উৎপন্ন করে। পাখিরা সেই অল্প কিছু শব্দের ভেতর দিয়ে বিনিময় করে তাদের সকল ভাব, সকল কথা। শিশুর কান্নার কি তবে আলাদা ভাষা আছে? মা কি শিশুর সেই কান্নার আলাদা আলাদা ভাষা বুঝতে পারে?

মায়ের কথা মনে হতে আবদুল হাকিমের চোখের কোণে উষ্ণ জল জমা হয়। মুহূর্তে এক ফোঁটা বৃষ্টি এসে ধুয়ে দেয় সামান্য উষ্ণ জলের ধারা। মূল্যহীন অশ্রু। একই দুঃখে বহুবার ঝরেছে।

আবদুল হাকিমের শীত শীত লাগে। ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না তার। রাস্তার পাশে খন্দকার বাড়ির মেহগনি গাছের বাগান। আবদুল হাকিম অঝোর বৃষ্টি থেকে গা বাঁচিয়ে একটা মেহগনি গাছের নিচে দাঁড়ায়। গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। বৃষ্টি ও পাতার একটানা নৈঃশব্দ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো শব্দ কানে বাজে না।

আবদুল হাকিম সচকিত হয়। বাগানের ভেতরে কেউ একজন হাঁটছে। জলের ঢলে তার ছপছপ পায়ের শব্দ পাওয়া যায়। ঘুরে মেহগনি গাছের আবডাল থেকে বাগানের ভেতরে তাকায় সে। বৃষ্টিধোয়া মোহময় অন্ধকারে কোনো অবয়ব ঠাহর করা যায় না, পায়ের শব্দ আসে কেবল। আবদুল হাকিম কিছু বলে না। তার অস্তিত্ব ধর্মের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে তার কোনো প্রেম নেই। রোদ-বৃষ্টির গন্ধে তার কোনো অনুরাগ থাকতে নেই। মসজিদের মিম্বরে যার স্থান, বৃষ্টির জলে ভেজার আহ্লাদ তার জন্য বেমানান। কেউ শুনলে হাসবে। মানুষের কাছে মসজিদ ও মসজিদের মানুষের সম্পর্ক আকাশের ওপারে, পৃথিবীর রূপ-বিভূতির সঙ্গে তাদের একাত্মতা দৃষ্টিকটু।

আবদুল হাকিম কৌতূহলী হয়ে গাছের আড়াল থেকে বাগানের ভেতরে ঢুকে। বাগানে জল জমেছে গোড়ালি অব্দি। আস্তে পা টেনে নিঃশব্দে হাঁটে। বাগানের ভেতরের পায়ের শব্দ থেমে গেছে। যেদিক থেকে এসেছিল শব্দ, সেদিকে আরেকটু এগিয়ে যায় আবদুল হাকিম। আচমকা বিজলি চমকে ওঠে। চার-পাঁচটা গাছ তফাতে দাঁড়িয়ে এক নারীমূর্তি। পরনে শাড়ী, খোলা চুল, কানের মাকড়ি বিজলির চমকে ঝিলিক দিয়ে ওঠে মিইয়ে যায়। আবার ঢিবঢিব অন্ধকার। আবদুল হাকিম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মেহগনি বাগানের ভেতর শনশন করে বয়ে যায় পলকা হাওয়া। অপার্থিব মনে হয় চারদিক। মনে হয়—কোনো বৃষ্টি নেই, পাতাঘন কোনো গাছ নেই, পায়ের তলায় মাটি নেই, শিরশিরানি জলের ঢল নেই। বাজ পড়ে। আবার চমকে ওঠে বিজলি। নারীটির চোখ বন্ধ, মুখ উঁচু করে বৃষ্টিমুখী হয়ে নিথর দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টিমুখী ফুলের মতো বিজলির নীল আলোয় ভেসে যাচ্ছে তার মুখ।

‘শাহানা আপা!’ আবদুল হাকিমের গলা থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে।

শাহানা বৃষ্টি থেকে মুখ নামিয়ে তাকায় আবদুল হাকিমের দিকে। তার চোখে বিস্ময় নেই, বিহ্বল নেই। ‘মুফতি সাব হুজুর? এইখানে কী করেন?’ শাহানার কণ্ঠে কোনো জড়তা নেই।

‘এই তো, ভিজতেছিলাম…।’ বৃষ্টির তোড়ের কারণে কথায় জোর রেখে বলতে হয়। শাহানা আবদুল হাকিমের কাছাকাছি আসে। রাতঘন বর্ষণে বাতাস কথা বেশি দূর নিতে পারে না। জলতরঙ্গের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

‘একা একা বৃষ্টিতে ভিজেন কেন? ভাবীসাব কই? তারেও নিয়া আসতেন?’

‘আমি মসজিদ থেকে আসলাম। বাড়ির দিকে রওনা হইছিলাম, বৃষ্টি নাইমা গেল…।’ আবদুল হাকিম থেমে আবার বলে, ‘আপনে এই রাইত-বৃষ্টিতে বাগানের মইধ্যে কী করেন?’

শাহানা হাত উঁচু করে, হাতে পাটের মোটা দড়ি। ‘ফাঁসি নিতে আসছিলাম। ঝুম বৃষ্টির মাঝে আম গাছের ডালে ঝুইলা মরার শখ অনেকদিনের। কিন্তু কপাল খারাপ, আপনারে দেইখা মনে হইতেছে আজকে আর ফাঁসি নেওয়া হবে না।’

আবদুল হাকিমের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। ‘কী বলতেছেন এইসব! মাথা খারাপ হইছে নাকি আপনের? চলেন, আপনারে বাড়ি দিয়া আসি।’

‘আপনারে বাড়ি দিয়া আসতে হবে না হুজুর, বাড়ি যাওয়ার রাস্তা আমি চিনি, কেবল বাড়ি থেকে বাইর হওয়ার রাস্তা জানি না।’ শাহানা হাতের রশি মাটিতে ফেলে দেয়। ‘ভয় পায়েন না, আজকে আর ফাঁসি নেওয়া হবে না। এই বৃষ্টিতে আপনারে দেইখা মন ভালো হয়ে গেছে।’

‘শাহানা আপা, এইরকম পাগলামি আর কইরেন না। আপনের দুঃখটা আমি বুঝি, কিন্তু… সবই তো আল্লাহর হাতে। আমি আপনের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন আপনারে একটা নেকসন্তান দান করেন।’

শাহানার মনের মধ্যে তোলপাড় হয় একটুক্ষণ। একটি পরিচিত চিনচিনে হাহাকার বুকের ভেতর ভাসতে ভাসতে আবার তলিয়ে যায়। বহুদিনের পুরোনো ব্যথা, কাবু করা যায় সহজে। তবু ব্যথা তো, উথলে উঠলেই পুড়িয়ে যায় ভেতর-অন্দর।

‘আপনে যতই দোয়া করেন হুজুর, আমি কোনোদিন মা হতে পারব না। আপনের মূল্যবান দোয়া আমার জন্য নষ্ট কইরেন না।’

‘আল্লাহ সবই পারেন। তিনি মরা গাছেও ফুল ফোটাতে পারেন…।’

‘কিন্তু যদি গাছের শিকড়ই না থাকে, তাহলে সেই গাছে কি ফুল ফোটার সম্ভাবনা আছে?’

আবদুল হাকিম আরও শীত অনুভব করেন। প্রতিটি বৃষ্টিফোঁটা যেন পশমের গোড়া ভেদ করে শরীরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। রক্তকণিকায় মিশে সারা শরীরে উথলে উঠছে থরথর শীত।

বৃষ্টির তোড় কমে আসে। ফোঁটার মধ্যে জলের পরিমাণ কমে যায়, পাতায় পড়ে শব্দ হয় আস্তে। ঝিরঝিরে। পাতায় পড়ে জলের ফোঁটা টুপটাপ শব্দে গড়িয়ে যায় বাগানের ঢলে। আবদুল হাকিম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে গোড়ালি সমান ঢলের বানে। বানভাসী পাতা ভেসে যায় পা ছাড়িয়ে। জলের তোড় কমলে অন্ধকারও থিতিয়ে আসে। শাহানা দুহাত দিয়ে মুখের জল মুছে। এক হাত দিয়ে চুলের ডগা ধরে আরেক হাতে চিপড়ে নেয়।

‘মানুষের জীবন কেমনে পার হয়—সেই ব্যাপারে আপনের কোনো ধারণা নাই। কত দুঃখ নিয়া মানুষ বাইচা আছে—সেইসব দুঃখ দেখলে আপনে পাগল হয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতেন। মসজিদে নামাজ পড়িয়ে আর আল্লাহ-বিল্লাহ করে মানুষের জীবনের গভীর দুঃখ বোঝা যায় না, হুজুর।’

আবদুল হাকিমের অহমে ঘা লাগে। একজন নারী, হোক সে বড় ঘরের বউ, তার মুখে নিজের আত্মপরিচয় ও পেশার তাচ্ছিল্য চোট দেয়। আত্মপরিচয়ের অহংকার আবদুল হাকিমকে কিছুটা ক্ষুব্ধ করে। ‘আপনে এই গ্রামের মেয়ে, এই গ্রামের বউ, কিন্তু আপনের চেয়ে গ্রামের মানুষের চিন-পেহচান আমার কম জানা নাই। এই গ্রামের প্রতিটা বাড়ির ভাত খায়া আমার জীবন চলছে একসময়। প্রত্যেক বাড়ির ভাত-তরকারির মধ্যে লেখা থাকে তাগো জীবনের হালখাতা। খাবারের গন্ধ আর ঝোলের রংয়ের মধ্যে পাওয়া যায় তাগো সংসারের হাল-হাকিকত। ভাতের সঙ্গে পাটশাক আর পটল ভাজা কেমনে রাখা হয়—সেটা দেখে বোঝা যায় কোন বাড়ির বউয়ের চরিত্র কেমন। এসব জানতে অলৌকিক ক্ষমতা লাগে না। হয়তো মসজিদ আর মাদরাসায় পইড়া থাকি, কিন্তু মানুষের চরিত্র আর তাদের জীবনের সুখ-দুঃখ বুঝতে তাদের বাড়িতে যাওয়া লাগে না। মাথা নিচু করে রাস্তা দিয়া হাঁটি, তাই বলে ভাইবেন না যে কানে তুলা দেওয়া। হাঁটার সময় প্রত্যেক বাড়ির জীবনযাপন কানে আসে। জীবন আমরাও বুঝি শাহানা আপা…!’

আবদুল হাকিম মাথা উঁচু করে না। একজন মাওলানার মুখ সবসময় নত হয়। আল্লাহর সামনে নত হতে হতে এই মুখ পৃথিবীর আর কারো সামনে স্পর্ধিত হয় না। বিনয়কে সবাই ভাবে নতজানু মন। ভাবে, মানসিকতায় ক্ষুদ্র। সমাজের অভ্যাগত একজন। কিন্তু কেউ তার হৃদয়ের মহত্ব দেখে না। সামান্য সম্বল বুকে করে কীভাবে তৃপ্ত নয়নে সে ঘুমিয়ে পড়ে, এই গোপন বিদ্যা সে ছাড়া আর কেউ জানে না।

‘তাহলে বলেন দেখি, আমার জীবন কেমন?’

আবদুল হাকিম চুপ করে থাকে একটুক্ষণ। ‘শাহানা আপা, বৃষ্টি ধরে আসছে। আপনে বাড়ি যান, আমারও যাইতে হবে। বাড়িতে আয়েশা একা রয়েছে।’

‘আপনে যান, হুজুর। আমি বাগানের ভেতর দিয়ে চলে যাব। ভাবীরে আমার সালাম দিয়েন।…’ শাহানা একটু থেমে আবার বলে, ‘না থাক, এমন বৃষ্টির রাইতে তারে আমার সালাম জানাইলে আবার কী না কী ভাববে! সমস্যা আছে।’

শাহানা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকায়। আবদুল হাকিম এতক্ষণ খেয়াল করেনি, শাহানার ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক। ধবধবে ফর্সা মুখে লাল লিপস্টিক রক্তজবার মতো লাগে। আবদুল হাকিম কিছু বলে না, কেবল ভেতর থেকে প্রবল শীত অনুভব করে।  

শাহানা ঘুরে মেহগনি গাছের ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকে। আবদুল হাকিম আবার আশ্চর্য হয়, শাহানার ভেজা শরীরে লেপ্টে আছে লাল সিল্কের শাড়ী। গলায় দড়ি দিয়ে মরার জন্য কেউ এত আয়োজন করে ঘরের বাহির হয়!

আবদুল হাকিম বাড়িতে এসে কলপাড়ে গিয়ে পাঞ্জাবি-গেঞ্জি খুলে ফেলে। আয়েশাকে ডেকে লুঙ্গি গামছা দিতে বলে বারান্দায়। তার চুপসে যাওয়া ভেজা গতর দেখে আয়েশা হি হি করে হেসে উঠে, ‘মুফতি সাব, বিলাইয়ের মতো এমন ভিজলেন কেমনে? ছাতা নিয়া যান নাই?’

‘উঁহু। ঘরে যাও, আমি গোসল করে আসতেছি।’

আবদুল হাকিমের গলাটা একটু অন্যরকম শোনায়। আয়েশা আবদুল হাকিমের এমন আওয়াজ আগে দু-একবার শুনেছে। অন্যমনস্ক। লোকটা তার সামনে, কিন্তু মনে হয়, স্বাভাবিক কোনোকিছু তার সামনে থাকা লোকটার মধ্যে নেই। তার ভেতর থেকে আরেকটা মানুষ কথা বলছে। এই অন্য মানুষটাকে আয়েশা চেনে না। সারাদিন কথা, হাসি-ঠাট্টা, খুনসুটি; হঠাৎ সেই মানুষটা ভারিক্কি হয়ে উঠে। আয়েশা ভয় পেয়ে যায়। একা একা হাঁসফাস করতে থাকে। হয় কী লোকটার?

আবদুল হাকিম গোসল শেষ করে বারান্দায় উঠে আসে। গা-মাথা মুছে ঘরের আলনা থেকে একটা পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে নামাজে দাঁড়ায়। এখন কোন ওয়াক্তের নামাজ পড়ছে, জানে না। ঘোরের মধ্যে যেন সে নিজের মধ্যে নেই। তকবির দিয়ে মনে মনে আলহামদু সুরা শুরু করতেই তার হাত-পা কাঁপতে থাকে। দুই আয়াত পড়ার পর চোখ ভরে ওঠে নোনা জলে। সুরার মাঝামাঝি যেতে যেতে বুকের ভেতর থেকে গমকে উঠে কান্না। কান্নার তোড়ে আবদুল হাকিম সুরা পড়তে পারে না। কোনোরকম আলহামদু সুরা শেষ করলেও অন্য সুরা পড়তে ভুলে যায়। কান্না চেপে রেখে সুরা মনে করতে চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো সুরাই মনে আসে না। মাথার মধ্যে যেন হাজারটা কাচের ছুরি খচ খচ করে বিঁধছে। তার জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করে। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে একটা অবোধ শিশু যেমন চিৎকার করে, ঠিক তেমন করে কারো গলা জড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু চিৎকার করতে গেলে কান্না এসে গলার মধ্যে আটকে যায়। অক্ষম কান্নায় আবদুল হাকিম হাতে মুখ চাপা দিয়ে জায়নামাজে লুটিয়ে পড়ে।

আয়েশা পেছন থেকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে তাকে। জ্বরে আবদুল হাকিমের শরীর পুড়ে যাচ্ছে। আয়েশা নিজের বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে ধরে মুফতি সাবকে। আয়েশার নারীগন্ধা বুকে মাথা রেখে আবদুল হাকিম শিশুর মতো কাঁদতে থাকে।

চলবে…

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *