যুগসাক্ষীর স্মৃতিকথা (প্রথম পর্ব)

মালিক বিন নবি আলজেরিয়ান দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী ও সমাজবিজ্ঞানী। ফরাসি উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার মুক্তি–সংগ্রামের অকুতোভয় তাত্ত্বিক পুরুষ। এ কালের আরব দুনিয়ায় প্রধান দার্শনিকের মর্যাদা দেওয়া হলেও তাঁর খ্যাতি ও যোগ্যতা এখনো অপরিচয়ের অন্ধকারে। এর একটা কারণ হতে পারে তাঁর লেখালেখি মূলত ফরাসি ভাষায়, যার আরবি–ইংরেজি ভাষান্তর এখনো অপ্রতুল। আরেকটা কারণ এ–ও মনে করা হয়, সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্রের দিকে ক্রমে ঝুঁকে পড়া উত্তর–সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের ভয়ানক শত্রুতা আর কাঠামোগত ইসলামবিদ্বেষ। ফলে বামধারার অন্য বুদ্ধিজীবীরা স্বীকৃতি পেলেও মালিক বিন নবির কপালে উপেক্ষা ছাড়া কিছুই জুটেনি। ১৯৭৩ সালের ৩১ অক্টোবর এই মনস্বী ভাবুক ইন্তেকাল করেন।

তার প্রধান রচনাবলি হলো : The Conditions of the Renaissance, The Question of Culture, Islam in History and Society, The Birth of a Society ইত্যাদি৷ مذكرات شاهد للقرن বা Memoirs of a Witness of the century তাঁর আত্মজীবনী৷ যুগসাক্ষীর স্মৃতিকথা নামে এর বাংলা অনুবাদ ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে কেয়ারি-তে৷

আমার জন্ম আলজেরিয়ায় ১৯০৫ সালে, এমন যুগে, যখন অতীতের সাথে সংযোগ স্থাপন সম্ভব ছিল অতীতের সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা লোকদের মাধ্যমে আর ভবিষ্যৎ দেখা সম্ভব হতো যুগের অগ্রদূতদের চোখ দিয়ে।

যুগসাক্ষীর স্মৃতিকথা বর্ণনার জন্য যেসব বিশেষ সুবিধা অপরিহার্য, এভাবেই সেই সময়ে জন্মের সুবাদে আমি সেগুলো পেয়ে যাই৷

আমাদের পরিবারে দেখি আমার নানির মা হাজি বায়াকে, তার বয়স তখন একশোরও বেশি৷ তার মৃত্যুর সময় আমার বয়স তিন বা চার, সেই বয়সে তাকে যথেষ্ট চেনার মতো বোধ আমার ছিল না৷ তিনি যেসব পুরোনো স্মৃতির সাক্ষী আর দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী, সেগুলো পারিবারিকসূত্রে আমি পেয়ে যাই৷ সেই স্মৃতি আর দৃশ্যের গল্প আমার কানে ঢেলে দেন নানি হাজি জুলাইখা৷ যেদিন ফরাসিরা শহরে প্রবেশ করে, সেদিন কীভাবে তার মা ও তার পরিবার কনস্টান্টিন থেকে পালিয়ে যান, সব৷

সেদিন কনস্টান্টিনের সমস্ত পরিবারের ভাবনা ছিল একটাই—কীভাবে নিজেদের সম্মান রক্ষা করা যায়৷ বিশেষভাবে সেইসব পরিবার, যেখানে যুবতীর সংখ্যা বেশি৷ শহরের অধিবাসীরা রামল উপত্যকা হয়ে শহর ত্যাগ করে৷ এখন যার নিচের দিকে রয়েছে কাউকি মিল আর ওপরের দিকে ঝুলন্ত সেতু৷

যখন ফরাসিরা প্রাচীর ছিদ্র করে শহরে ঢুকে, বাবারা যুবতী মেয়েদের দ্রুত শহরের অন্যপ্রান্তে নিয়ে যায়, যেখান থেকে রশিতে ঝুলে নিচে নেমে পালিয়ে নিরাপদ থাকবে৷ অসংখ্যবার যুবতীদের ভারে রশি ছিঁড়ে যায় আর তারা আছড়ে পড়ে পাহাড়ি খাদের গহ্বরে৷ আমাদের বয়োবৃদ্ধা বায়া মর্মান্তিক এই ঘটনার সাক্ষী৷ সেদিন তার বাবা–মা আতঙ্কগ্রস্ত শহরের ছোট ছোট গলিপথ ধরে তাকে সেদিকে নিয়ে যান, যেমন ইবরাহিম তার ছেলে ইসমাইলকে নিয়ে গিয়েছিলেন কুরবানিস্থলে৷

একটি মুসলিম পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে পতনোন্মুখ জাতির কুরবানিস্থলে আমার নানিরও (নানির মা হাজি বায়া) সেদিন উৎসর্গ হওয়ার মতো অবস্থা৷ তবে শেষপর্যন্ত তিনি বেঁচে যান এই ভয়ংকর বিপর্যয় থেকে৷ যে রশিতে ঝুলে নিচে নামেন, তার ভারে সেটি ছিঁড়ে যায়নি, তিনি নেমে আসেন নিরাপদে৷ এরপর তার পরিবারের সাথে আশ্রয় নেন তিউনিসিয়ায়৷ এরও অনেক বছর পর হজের জন্য মক্কায় যান, তারপর স্বামী–সন্তানের সাথে ফিরে আসেন আলজেরিয়ায়৷ এখন তিনি মৃত, কিন্তু তার হৃদয়বিদারক গল্পটি চিরভাস্বর৷

আমার নানি তীব্র শীতের রাতগুলোতে ছোট ছোট নাতিদের কাছে বসিয়ে তার মায়ের কাহিনিটা বলতেন, আমাদের চিন্তা ও মনোজগতে এই গল্পের বিস্তৃত প্রভাব (এই সময়ে এসে) আমরা কল্পনা করতে পারি৷ নানি জুলাইখাও মায়ের মতো দীর্ঘজীবন লাভ করেন, তিনি একশো বছর বেঁচেছিলেন৷

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি, নানি জুলাইখার গল্প বলার আশ্চর্য দক্ষতা ছিল৷ তিনি টেনে টেনে সুর করে গল্প বলতেন, আমরা গোল হয়ে বসে থাকতাম চারপাশে৷ সেটাই আমার প্রথম বিদ্যালয় আর আমার মনোজগৎ গড়ে ওঠে সেখান থেকেই৷

তিরিশ বছর পর, আমি তখন প্যারিসে ছাত্র৷ একদিন কলেজের সহপাঠীদের সাথে আত্মসমীক্ষার একটা সেশনে অংশ নিই৷ আমাদের সবাইকে তখন নির্দিষ্ট একটা প্রশ্ন করা হয়—‘তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কী? এবং এর পেছনে কার অবদান?’

এই প্রশ্ন তখন আমার ভেতরের পুরোনো স্মৃতিগুলো জাগিয়ে তোলে৷

আমার বয়স যখন ছয় বা সাত, আমাদের পরিবার তখন নানান সমস্যায় জর্জরিত৷ আমার দাদা তার অংশের সমস্ত পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে উপনিবেশ শাসিত আলজেরিয়া থেকে হিজরত করে পশ্চিম ত্রিপোলিতে আশ্রয় নেন৷

সময়টা আনুমানিক ১৯০৮, দখলদার ফরাসিদের সাথে একত্রে বসবাসে অস্বীকৃতি জানিয়ে কনস্টান্টিন এবং তিলিমসানে তখন আলজেরিয়া ত্যাগের হিড়িক পড়ে, আমার দাদা সেই হিজরতকারী দলের প্রথম কাতারে ছিলেন৷ দখলদারদের প্রতি এই অনীহাকে পরবর্তী বহু রাজনৈতিক ঘটনার বীজ বলে গণ্য করা হয়, ১৯৫৪ সালে বিস্ফোরিত প্রতিরোধ আন্দোলন সবিশেষ উল্লেখযোগ্য৷

সেইসাথে তখন কনস্টান্টিন শহরের আশেপাশে ধীরে ধীরে সামাজিক পরিবর্তন শুরু হয়৷ শহরটি বাহ্যত উপনিবেশিক অবকাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখলেও সামাজিক শিষ্টাচার, ঐতিহ্যগত নীতি আর অভ্যাসে রূপান্তর ঘটে৷ যেমন : বিভিন্ন উৎসব, বিয়ে, মৃতদেহ দাফন, ঈদ, জিন তাড়ানো আর কবিরাজির আসর এবং বিভিন্ন সুফি তরিকার (হানছালা, রাহমানিয়া, তিজানিয়া এবং বিশেষভাবে ঈসাবিয়া) জিকিরের হালাকাগুলো অতীতের মতো অত্যন্ত জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সাথে শহরের প্রতিটা পরিবার পালন করতে শুরু করে, যদিও কখনো কখনো আর্থিক অবস্থা সঙ্গত নাও হয়৷ কখনো এমন হতো, বহুকাল ধরে ধনী পরিবার বলে বিবেচিত কারও ছেলেমেয়ের বিয়ের সময় নিজেদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সামাজিক রেওয়াজ বজায় রাখতে নিজেদের ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিতেও বাধ্য হতো৷

নিজেদের ঐতিহ্যগত রীতিনীতি বাহ্যত তারা অক্ষুণ্ণ রাখলেও রুহানিয়াত হারিয়ে বসে৷ এমনকি শেষমেষ বাহ্যিক রীতিনীতিগুলোও পরিবর্তনের হাত থেকে রেহাই পায়নি৷ নৈতিক ও সামাজিক শিষ্টাচারে ব্যাপক অধঃপতন ঘটে৷ অতীতে মানুষের অভ্যাস ছিল সদর দরজায় তারা ভিক্ষুকদের জন্য খাবার রেখে দিত, আমার জন্মের কয়েক বছর পূর্বে থেকেই এই অভ্যাস মানুষ ত্যাগ করে৷ ফলে দরজায় কড়া নেড়ে উচ্চ শব্দে খাবার চাইতে ভিক্ষুকরা বাধ্য হয়৷

মদ আর মদ্যপের সংখ্যা বেড়ে যায়৷ বিশ্বাসের অপব্যবহার আর সুপ্রতিষ্ঠিত প্রাচীন রীতিনীতির বিরোধিতা প্রকাশ পায়, পাশাপাশি সেইসব রীতিনীতি ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে৷

বিয়ের সময় কোনো প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীর কনেকে গহনা ধার দিত, আমাদের শৈশবে সুন্দর এই সামাজিক রীতিও বিলুপ্ত হতে দেখেছি৷ অধিকাংশ সময়ই গহনার মূল মালিক তার গহনা ফিরে পেত না, ফলে এই সুন্দর রেওয়াজও বিলুপ্ত হয়ে যায়৷

সামাজিক পরিমণ্ডলেও ঐতিহ্যবাদী অবকাঠামোর পতন শুরু হয়৷ তাঁত সংঘের মতো কিছু পেশাজীবী সংঘ তো বহু আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে৷ আর অন্যরা কিছুদিন প্রতিরোধ করলেও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি৷ তাদের জায়গা একে একে দখল করে আমদানিকৃত পণ্য৷

কনস্টান্টিনের কিছু সড়কে প্রাচীন নামই অক্ষুণ্ণ থাকে৷ তবে পেশাজীবী সংঘের নামে যেসব সড়কের নামকরণ হয়েছিল, সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায় বহু আগেই৷

কনস্টান্টিনের এলিটদের ভেতর শুরু হয় অবনমন আর মজদুর শ্রেণিতে দেখা দেয় দারিদ্র্য৷ শহরের অলিগলিতে সেই অবনমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷ বুরনুস, পাগড়ি আর ঐতিহ্যবাহী পোশাক সড়ক থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়৷ এমনকি যেসব কারখানায় তৈরি হতো এগুলো, ধীরে ধীরে সেগুলোও বন্ধ হতে থাকে৷ এসব সড়কে দৃশ্যমান হয় ইউরোপীয় পণ্য, কখনোবা দেখা যায় মার্সেই থেকে আমদানিকৃত ব্যবহৃত কাপড়৷

ফলে একদিকে হারিয়ে যায় শহরের প্রাচীন চেহারা আর অপরদিকে ক্রমশ বাড়তে থাকে ইউরোপীয়দের সংখ্যা৷ ইহুদি সম্প্রদায়ের লোকেরা হঠাৎই ফরাসি হয়ে ওঠে৷ তাদের জন্য পৃথকভাবে গড়ে তোলা হয় ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, মার্কেট, ব্যাংক, বিদ্যুৎব্যবস্থা আর জাঁকজমকপূর্ণ দোকানপাট৷ এভাবে শহরের একটি নতুন চিত্র দাঁড়িয়ে যায়৷ পক্ষান্তরে শহরের স্থানীয়দের জীবন অপাঙক্তেয় হতে হতে সংকুচিত হয়ে পড়ে সরু গলি আর সিদি রাশেদের পথঘাটে৷

এই পরিবর্তনগুলো শুধু নৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেনি, বরং প্রবীণদের মনোজগতেও গভীর প্রভাব ফেলে, আমার দাদা তাদের অন্যতম৷ চলমান ঘটনাবলি তাদেরকে আলজেরিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য করে৷ তবে মায়ের পাশে থাকার কারণে বাবা তার সঙ্গী হতে পারেননি৷ মায়ের পরিবার অর্ধশতাব্দী ধরে বাস করছে তেবেসায়, পরিবারের সঙ্গ ছাড়ার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না৷ বাধ্য হয়ে দাদা তার অপর ছেলে আর ভাইকে নিয়ে আলজেরিয়া ছেড়ে যান, সঙ্গে যতটুকু সম্ভব মালপত্রও নিয়ে যান৷ বাবা হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গ, তার কোনো চাকরি নেই, উপার্জনের কোনো উপায়ও নেই৷

আমাদের পরিবারের জন্য এই সময়টা ছিল ভীষণ সংকটের৷ বড় চাচার কাছে আমি দত্তক ছিলাম দীর্ঘদিন, হঠাৎ কনস্টান্টিনে তার ইন্তেকাল হয়৷ ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও চাচি আমাকে তেবেসায় পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেন৷ এতে আমার হৃদয়েও রক্তক্ষরণ হয়, তবে সামর্থ্য থাকলে চাচি হয়তো কখনো আমাকে ফেরত পাঠাতেন না৷

এরপর আমি তেবেসার শিশুদের দলে মিশে যাই৷ এই নতুন পরিবেশে, দারিদ্র্য জর্জরিত একটি পরিবারে পরিচিত হতে থাকি নানির সাথে৷ তিনি সৎ কাজ ও তার প্রতিদান, অসৎ কাজ ও তার শাস্তির ব্যাপারে আমাকে প্রচুর গল্প বলতেন৷ আল্লাহভীতির এই গল্পগুলো আমার অজান্তে আমাকে গড়ে তোলে৷ তখন আমি বুঝতে শিখি ইহসান বা পরোপকার মুসলিম চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তর৷ নানির ইহসান বিষয়ক একটি গল্প সেই ছয়-সাত বছর বয়সে আমাকে এমন কাজে উদ্বুদ্ধ করে, যা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে করি৷

সাধারণত দরিদ্র পরিবারে বাবার উপার্জন না থাকলে সন্তানদের ক্ষুধার্ত থাকাই নিয়তি৷ আমাদের পরিবার ছিল ব্যতিক্রম, মা সেলাইয়ের কাজের পাশাপাশি আর্থিক দিকটাও দেখভাল করতেন, প্রায় সময়ই যা শূন্য হয়ে খাঁ খাঁ করত৷

একটা স্মৃতি মনে পড়ছে৷ আমাকে কুরআন পড়ানোর দায়িত্বে যে শিক্ষক ছিলেন, একবার তার বেতন দিতে না পেরে মা নিজের বিশেষ বিছানাটা দিয়ে দিতে বাধ্য হন৷

পরিবারের উপার্জন ছিল খুবই সামান্য৷ তবে মায়ের বিচক্ষণতা আর রাতজাগা পরিশ্রমের ফলস্বরূপ আমাদের কপালে খাবার জুটত নিয়মিতই৷ সবকিছু ভালোভাবে পরিচালনার পরও মা অনুভব করতেন, সন্তানদের পরিপূর্ণ পুষ্টির জন্য এই পরিমাণ খাবার যথেষ্ট নয়৷ তাই জুমার দিনগুলোতে তিনি অতিরিক্ত পরিশ্রম করতেন৷ সেই অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলস্বরূপ আমি আর আমার বোন জুমার দিন এক টুকরো রফিস খেতে পারতাম—এটা আটা, চিনি, খেজুর আর তেল দিয়ে বানানো তেবেসার এক ধরনের মিষ্টান্ন দ্রব্য৷

এক জুমার দিন দুপুরে আমার ভাগের রফিস মজা করে খেতে বসছি৷ হঠাৎ বাড়ির দরজায় এক ভিক্ষুককে বলতে শুনি—‘আল্লাহর নামে কিছু দিন!’ তখনো আমি রফিস অর্ধেকও খাইনি, নানির ইহসান সম্পর্কিত গল্পগুলো মনে পড়ল, আমি তাকে বাকি অংশটুকু দিয়ে দিলাম৷

এই ঘটনার পঁচিশ বছর পর—যখন আমি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারলাম সেই বৃদ্ধ নানির কাছে আমি কী পরিমাণ ঋণী৷

***

এই স্মৃতিকথায় উল্লেখ করা জরুরি, সেই কঠিন মুহূর্তে, যখন দেশ তার অস্তিত্বের লাগাম টেনে ধরতে অক্ষম এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে যুবকদের একমাত্র অভীষ্ট ছিল উপনিবেশিক কাঠামোর ভেতর কেবল অল্প স্থিতি খোঁজা, সেই সঙ্গীন মুহূর্তে আমার নানা–নানি আঁকড়ে ধরেছিলেন নিজেদের ঐতিহ্য আর শিকড়। এগুলো এমন চেতনা, যার উপস্থিতিই পরবর্তীতে দেশকে আবার নতুনভাবে নিজেদের ইতিহাস রচনা করতে প্রেরণা জুগিয়েছে৷

তেবেসায় পরিবারের কাছে ফিরে এলাম ঠিকই৷ কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে স্মৃতিতে ফিরে আসতে লাগল কনস্টান্টিন, চাচির বাসায় কাটানো দৃশ্য ও মুহূর্ত৷

সম্ভবত যে পরিবেশে আমার বেড়ে ওঠা, সেটা হারিয়ে ফেলার কারণেই আমার অন্তর্জগতে স্মৃতির প্রভাব বাড়ছিল ক্রমশ৷ এ কারণেই দেখা গেছে শৈশবের প্রায় পুরোটা জুড়ে কনস্টান্টিনই ছিল মনোযোগের কেন্দ্র৷ তবে তেবেসাও ধীরে ধীরে আমার মনোজগতে গভীর ছাপ রাখা অন্য আরেকটি আকর্ষণকেন্দ্রে পরিণত হয়৷

শহরটি তখন প্রাচীন বাইজান্টিনীয় সীমানার ভেতর প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল, অর্থাৎ ভ্যান্ডালদের আক্রমণ প্রতিহত করতে যেসব নগরপ্রাচীর কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই তড়িঘড়ি প্রস্তুত করা হয়, শহরের অবস্থান ছিল সেগুলোর ভেতর৷ আরব শাসনকালে শহরের সাথে যুক্ত হয় প্রাচীরের বাইরে গড়ে ওঠা এক ধরনের ছোট্ট উপশহর, বর্তমানে যাকে বলা হয় যাবিয়াহ, সম্ভবত পির সিদি আব্দুর রহমানের দিকে সম্পৃক্ত করেই এই নামকরণ৷

আশপাশের বিভিন্ন উপজাতি—লিমুশি, ইয়াহইয়াবি, আব্দিস, এই উপশহরে এসে বসবাস করত৷ সম্ভবত গবাদি পশুর কাছাকাছি থাকার খাতিরেই শহরের চেয়ে সেখানকার জীবনই ছিল তাদের জন্য আরামদায়ক৷

এমন পরিবেশেই অতিবাহিত হয়েছে আমার শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়৷

শহরের ভেতর বসবাস করা স্থানীয় অধিবাসীদেরও গবাদি পশু ছিল৷ চারণের জন্য ভোরে শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো৷ গবাদি পশুর পাল প্রথমে এসে একত্র হতো কারাকিলা গেটের কাছে—এখন যা সিদি রাশেদ নামে পরিচিত, এরপর সন্ধ্যায় আপনাআপনি গোয়ালে ফিরে যেত৷ ফেরার সময় গবাদি পশুর কোলাহলে মুখর হয়ে উঠত শহরের অলিগলি আর পেছনে ফেলে যাওয়া ল্যাদা–আবর্জনার দুর্গন্ধে ভারী হয়ে উঠত চারপাশ৷

এরপর উপনিবেশিক প্রশাসন প্রাচীন এই শহরের সাথে তেবেসা ও মারসুতের মিশ্র উপজাতিদের বসবাসের জন্য আরেকটি উপশহর গড়ে তোলে৷ পাশাপাশি ইউরোপীয় অফিসার, কাস্টমস কর্মকর্তা এবং শিক্ষকদের জন্য একটি শান্ত আবাসিক এলাকাও গড়ে তোলা হয়, তাদের সঙ্গে রাখা হতো একজন ডাক্তারও৷

যে পরিবেশে আমার যৌবনকাল অতিক্রান্ত হয়, সেটি যেন আলজেরিয়ার দুই হাজার বছরের সংক্ষিপ্ত রূপ৷ আর তেবেসার পরিবেশ কনস্টান্টিন থেকে বহুলাংশে ভিন্ন, যেখানে শৈশবের প্রথম কয়েক বছর কেটেছে৷

ফরাসি সভ্যতা বলে পরিচিত কঠোর উপনিবেশিক অনুশাসন ও দমন–পীড়ন থেকে তেবেসা শহর অনেকাংশেই রক্ষা পায় তার ভূপ্রকৃতির কারণেই৷ শহরের পরিবেশ ছিল ইউরোপীয়দের জন্য বৈরী ভাবাপন্ন, এবং এই শহরে বিশেষ কিছু ছিল না, যা তাদেরকে আকৃষ্ট করতে পারে৷ পুলিশ ও কাস্টমস কর্মকর্তারা যেন বুরনুস পরা বিশাল জনসমুদ্রে ভেসে বেড়াত, হাটবারে দৃশ্যগুলো দেখাত আরও করুণ ও প্রকট৷ উপজাতিদের আনাগোনার কারণে শহরের প্রকৃতিতে আধা বেদুইন ছোঁয়া লাগে, পশুপালন নির্ভর গোত্রভিত্তিক জীবনের দৃশ্যও ঝলকে ওঠে মাঝেমধ্যে৷ পথঘাট, অলিগলিতে দুধ আর খামিরের গন্ধ এমনভাবে ভেসে বেড়াত, যেন সেটি চিরায়ত কিছু৷

তেবেসা শহরের নৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো বড় বড় শহরের তুলনায় পুরোপুরি ভিন্ন, উপনিবেশিক আচার এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাবই বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি৷ লোকজনও তাদের চিরায়ত ঐতিহ্য আর মর্যাদার অনুসঙ্গগুলো যথাসম্ভব আঁকড়ে রেখেছে৷ তাদের খাবার আর পানীয় বজায় ছিল পুরোনো রীতিতেই৷ তেবেসার অনাড়ম্বর জীবন আর অনুর্বর ভূপ্রকৃতি নিজ মর্যাদা আর রুহানিয়াত রক্ষায় সহায়ক হয়ে ওঠে৷

কনস্টান্টিন থেকে তেবেসায় এসে এমন ভিন্নতর উপাদান ও প্রভাবের সামনে নিজেকে আবিষ্কার করলাম, যা কনস্টান্টিনে আমার প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম৷

চলবে…

মন্তব্য লিখুন (2)
  1. যায়েদ

    পড়লাম পুরোটা। একটা টান থেকে গেলো পরেরটার জন্য…

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *