হাফিজ ইবরাহিম। পুরো নাম মুহাম্মদ হাফিজ ইবরাহিম—আরবিভাষী আধুনিক কাব্যজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশেষ করে মিশরের সাহিত্যচর্চায় তাঁর অবস্থান স্বতন্ত্র ও দীপ্তিমান। তিনি ‘নীলনদের কবি’ এবং ‘জনতার কবি’ নামেই বেশি পরিচিত। আধুনিকতার ভেতর দিয়ে প্রাচীন আরবি কবিতার সৌন্দর্যকে নতুন প্রাণ দিতে যে কাব্যধারার উন্মেষ ঘটে, হাফিজ ইবরাহিম ছিলেন সেই ধারার অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ। আহমাদ শাওকি, মাহমুদ সামি আল-বারুদি—এই মহৎ কবিদের সঙ্গে তিনি একই পথের পথিক।
আহমাদ শাওকির সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর ও অকৃত্রিম বন্ধুত্ব—জীবনের শেষ পর্যন্ত যা অটুট থেকেছে। হাফিজ ইবরাহিমের বিশেষত্ব হলো—তিনি শুধু নিজের অনুরাগীদের কাছেই নয়, বরং মতপার্থক্য থাকা সাহিত্যিকদের কাছেও সমান সম্মান পেয়েছেন। কাব্যধারায় পথ আলাদা হলেও আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ বা খলিল মুতরানের মতো কবিরাও তাঁর কবিত্বশক্তিকে আন্তরিকভাবে মূল্য দিয়েছেন। তাঁরা তাঁর সাহিত্যকীর্তিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে বিচার করেছেন এবং নিঃসংকোচে তাঁর মর্যাদা স্বীকার করেছেন। তাঁর কবিতার ভাষা, শক্তি ও মানবিক আবেদনই তাঁকে এই অসামান্য অবস্থান এনে দিয়েছে।
জন্ম ও পরিবার
কবি হাফিজ ইবরাহিমের জন্মতারিখ তাঁর নিজের সরকারি নথিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না। পরে যখন তিনি দারুল কুতুবে যোগ দেন, তখন তাঁর জন্মতারিখ নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ উদ্দেশ্যে ১৯১১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে একটি বিশেষ চিকিৎসক-কমিটির কাছে পাঠানো হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কমিটি তাঁর বয়স নির্ধারণ করে ৩৯ বছর। সেই হিসেবে ধরা হয়—হাফিজ ইবরাহিমের জন্ম ১৮৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি।
আহমাদ আমিন তাঁর জন্মপ্রসঙ্গে নীলনদের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন—‘এ যেন এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত—নীলনদের কবির জন্ম নীলনদের কোল ছাড়া অন্য কোথাও হওয়া যেন কল্পনারও অতীত।’
বাস্তবেও হাফিজ ইবরাহিম জন্ম নিয়েছিলেন ‘সোনালি’ নামের একটি নৌকায়, যা সে সময় নীলনদের তীরে ভেড়ানো ছিল।
তাঁর পিতা ইবরাহিম ফাহমি ছিলেন একজন প্রকৌশলী। দিরুত অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর মা হানিম বিনতে আহমাদ আল-বুরসলি ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত। তাঁদের পরিবার কায়রোর এক প্রাচীন পাড়া ‘মাগরাবেলিন’-এ বসবাস করত।
ছেলেবেলা ও শিক্ষাজীবন
হাফিজ ইবরাহিমের পিতা ইবরাহিম ফাহমি ছিলেন দক্ষিণ মিশরের দিরুত অঞ্চলের মানুষ। ১৮৭০ সালে তিনি নীলনদের ওপর নির্মিত বাঁধগুলোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। স্ত্রী হানিমকে নিয়ে তিনি ‘সোনালি’ নামের নৌকাতেই থাকতেন, আর সেই নৌকাতেই জন্ম নেন হাফিজ ইবরাহিম। কিন্তু মাত্র চার বছর বয়সেই পিতৃবিয়োগ ঘটে।
পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মা ছেলেকে নিয়ে কায়রোতে চলে আসেন। সেখানে তাঁর মামা—যিনি নগর পরিকল্পনার কাজে যুক্ত ছিলেন—হাফিজকে নিজের সন্তানের মতোই বড় করে তোলেন। প্রথমে তাঁকে মকতবে দেওয়া হয়, পরে বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু শৈশব থেকেই তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল অস্থির—এক বিদ্যালয় থেকে আরেক বিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাঁকে। শেষ পর্যন্ত তিনি খেদিভীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ঠিক সেই সময় তাঁর মামার বদলি হয়ে যায় টানটা শহরে, আর তাঁকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়।
টানটার জীবন তাঁর জন্য আরেক দফা অস্থিরতা বয়ে আনে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত যেতে না পারলেও তিনি যেতেন আহমাদি মসজিদে, যেখানে পাঠদান হতো আজহারের মতোই শক্ত ভিত্তিতে। সেখানে সহপাঠীদের সঙ্গে তাঁর আলোচনায় উঠে আসত পুরোনো কাব্যের ছন্দ, গল্প এবং আধুনিক কাব্যধারার নতুন স্বর। বারুদি-সহ আধুনিক আরব কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে করতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—হাফিজ ইবরাহিমের মন কাব্যের দিকেই ঝুঁকে যাচ্ছে।
কিছুদিন পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন—নিজের খরচ নিজেই বহন করবেন। তাঁর বলার ক্ষমতা, তীক্ষ্ণ যুক্তিবোধ ও আত্মবিশ্বাস তাঁকে নিয়ে যায় তর্কবিদের সহকারী হিসেবে কাজ করার দিকে। সেসময় তর্কপেশা ছিল উন্মুক্ত; কয়েকজন তর্কবিদের সঙ্গে কাজ করে নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বেশিদিন সেখানে থাকা হয়নি। তিনি আবার কায়রোতে ফিরে এসে সামরিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৯১ সালে সেখান থেকে বেরিয়ে সামরিক দপ্তরে চাকরি শুরু করেন। তিন বছর দায়িত্ব পালন করে কিছুদিন তিনি অভ্যন্তরীণ দপ্তরে নিয়োজিত থাকেন, পরে আবার সামরিক দপ্তরে ফিরে আসেন।
হাফিজ ইবরাহিম কেন এত অল্প বয়সেই আত্মনির্ভর হওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন? এর প্রধান কারণ—মামার কাছে থাকতে তাঁর অস্বস্তি ও বিরক্তি বোধ হচ্ছিল। জীবনের একটানা অস্থিরতা তাঁকে দ্রুত নিজেকে প্রতিষ্ঠার পথে ঠেলে দিয়েছিল। নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজে নেয়ার সংকল্প নিয়ে তিনি মামাকে উদ্দেশ্য করে কয়েকটি পঙ্ক্তি লিখেছিলেন। সেই পঙ্ক্তির সারমর্ম—
আপনার ওপর আমার ভার ক্রমেই বাড়ছে,
আপনার শক্তিও কমে আসছে—তা আমি দেখছি।
আজ আপনি আনন্দ করুন,
কারণ আমি বেরিয়ে পড়েছি—
জীবনের ঝড়-ঝাপটা নিজ হাতে সামলাতে।
কর্মজীবন
হাফিজ ইবরাহিমের জীবনযাত্রা ছিল দুঃখ-দুর্দশায় ভরা। জন্মেছিলেন সীমিত সামর্থ্যের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে, তার ওপর অল্প বয়সেই অনাথ হয়ে পড়েন। তাই খুব শুরুর দিক থেকেই নিজের ব্যয় নিজেকেই বহন করতে হয়। জীবনের চলার পথে নানা কাজে যুক্ত হতে হয়েছে—এই পথ ধরে পৌঁছেছেন চাকরি ও অবসরের শেষ প্রান্তে।
স্বভাবে তিনি ছিলেন কোমল অনুভূতির মানুষ—সংবেদনশীল, দ্রুত আঘাতপ্রবণ। জীবনযাপনের কষ্ট তাঁকে বারবার আঘাত করলেও তিনি পথ হারাননি। একসময় ‘আহরাম’ পত্রিকায় চাকরি করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু সেখানে তাঁকে গ্রহণ করা হয়নি। পরে তিনি শায়খ মুহাম্মদ আবদুহু’র ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন। নিজের ভাষায় তিনি বলেন—‘আমি ইমামের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠদের একজন ছিলাম; তাঁর ঘরে যেতাম, তাঁর আলো ভাগ করে নিতাম, আর তাঁর জ্ঞানের ফল সংগ্রহ করতাম।’
১৯১১ সালে শিক্ষামন্ত্রী হাশমত পাশার সুপারিশে তিনি নিয়োগ পান দারুল কুতুবে—সাহিত্য বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে। দারুল কুতুবে যোগদান তাঁর কাব্যজীবনে লক্ষণীয় পরিবর্তন আনে। এর আগে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়কে কেন্দ্র করে বহু কবিতা লিখেছিলেন; কিন্তু এই পদে যোগ দেওয়ার পর সেই প্রবণতা কমে আসে। ১৯৩২ সাল পর্যন্ত তিনি দারুল কুতুবে দায়িত্ব পালন করেন।
দাম্পত্য জীবন
১৯০৬ সালে হাফিজ ইবরাহিম বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন—কায়রোর আবেদিন এলাকার একটি সচ্ছল পরিবারের কন্যার সঙ্গে। কিন্তু দাম্পত্য খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি—মাত্র চার মাসের মধ্যেই বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তিনি আর বিয়ে করেননি।
নারী তাঁর জীবনে খুব সামান্যই স্থান পেয়েছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, সমাজ ও দেশের দুঃসময় তাঁকে ব্যক্তিগত আবেগ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ফলে হৃদয়ের কোমলতা তিনি উৎসর্গ করেন দেশ ও মানুষের জন্য। তাঁর কাব্যগ্রন্থে প্রেম বিষয়ক কবিতা খুবই কম—মোটে তিন পৃষ্ঠা, তাতেও কয়েকটি মাত্র পঙ্ক্তি। এর কিছু আবার দার্শনিক জাঁ জাক রুশোর লেখা থেকে অনূদিত।
১৯০৮ সালে তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেন—ছেলের অসহায় অবস্থা দেখে মনোকষ্টে। কিছুদিনের মধ্যে মামাও ইন্তেকাল করেন। এরপর তিনি তাঁর মামীর কাছে থাকতে শুরু করেন; তিনিই তাঁর জীবিকার ব্যবস্থা করে দেন।
তাঁর শিক্ষকগণ
হাফিজ ইবরাহিম তাঁর সময়ের খ্যাতিমান সাহিত্যিক, আলিম ও ভাষাবিদদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করেছিলেন। নিয়মিত যেতেন তাঁদের আসরে—যেখানে সমবেত হতেন গুণীজন, কবি, ভাষাবিদ ও সংস্কৃতিসাধকরা। এসব আসরেই তিনি শুনে শুনে ভাষাজ্ঞান সমৃদ্ধ করেছেন, আর তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির সহায়তায় দ্রুত গড়ে তুলেছেন নিজের সাহিত্যভান্ডার।
এই শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন সাইয়্যিদ তৌফিক আল-বাকরি। তিনি নিয়মিত যেতেন তাঁর কায়রোর খুরনুফিশ এলাকার বাসায়। সেখানে সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গভীর আলোচনা হতো। হাফিজের স্মৃতিশক্তি ছিল জন্মগত—শব্দ মুখস্থ করার ক্ষমতাও ছিল অদ্ভুত রকম তীক্ষ্ণ। তাই খুব অল্প সময়েই তিনি ভাষার জগতে শক্ত অবস্থান করে নেন। সাইয়্যিদ তৌফিকের আসরে যাঁরা আসতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন—শায়খ আশ-শানকিতি, শায়খ মুহাম্মদ আল-খুদরি, ভাষাবিদ ও কবি হাফনি নাসিফ।
তাঁর আরেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাস্থল ছিল ‘শায়খুশ শুআরা’—খ্যাতিমান কবি ইসমাইল সাবরির বাড়ি। সেখানে সমবেত হতেন ওই সময়ের উদীয়মান কবিরা, যাঁরা তাঁকে নিজেদের প্রধান শিক্ষক মনে করতেন। সেই আসরে উপস্থিত থাকতেন আহমাদ শাওকি, খলিল মুতরান, আহমাদ নাসিম, মুহাম্মদ আবদুল মুত্তালিব, আবদুল হালিম আল-মিসরি প্রমুখ। হাফিজ স্বীকার করেছেন—ইসমাইল সাবরির সান্নিধ্য তাঁর কাব্যশৈলিকে আরও পরিণত করেছে।
তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাজগৎ গঠনে আরও দুজনের প্রভাব ছিল গভীর—কবি মাহমুদ সামি আল-বারুদি এবং ইমাম মুহাম্মদ আবদুহু। এই দুজন তাঁর কাব্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তিত্বে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।
স্বভাব ও ব্যক্তিত্ব
হাফিজ ইবরাহিম ছিলেন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর কবিতা যেমন ভাষায় দৃঢ়, ভাবনায় মহিমান্বিত—তেমনই তাঁর স্মৃতিশক্তিও ছিল বিস্ময়কর। পুরোনো ও নতুন হাজারো আরবি কবিতা তাঁর মনে সঞ্চিত ছিল, আর শত শত গ্রন্থের অংশ তিনি হুবহু উদ্ধৃত করতে পারতেন।
সহকর্মীরা বলতেন—কয়েক মিনিটেই তিনি একটি বই পড়ে ফেলতে পারতেন এবং পরে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঠিকঠাক মনে রাখতে পারতেন। মামার বাড়িতে নিয়মিত কুরআন পাঠ শুনতে শুনতেই তিনি অর্জন করেন কুরআনের সুরা মুহূর্তে ধরে ফেলার ক্ষমতা। পরিচিতজনদের মতে—এ দক্ষতা ছিল তাঁর অসাধারণ প্রতিভার অন্যতম নিদর্শন।
তবে আশ্চর্যের বিষয়—দারুল কুতুবের সাহিত্য বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি কোনো বই পড়েননি। বিশাল গ্রন্থভান্ডারের ভিড়ে তিনি যেন ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলেন। কেউ কেউ বলেন—চোখের দুর্বলতা তাঁকে ভয় পাইয়ে দিত; বারুদির মতো শেষ বয়সে দৃষ্টি হারানোর আশঙ্কায় তিনি পড়াশোনা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন।
রসিকতায় তিনি ছিলেন অপরাজেয়। যেখানেই যেতেন, সেখানে হাসি-আনন্দের পরিবেশ তৈরি হতো। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, মিশুক স্বভাব আর রম্যরস তাঁকে সবার আপনজন করে তুলত। তবে একটি অভিযোগ প্রায়ই উঠত—অতিরিক্ত ব্যয়। আক্কাদ মজা করে বলতেন—‘হাফিজ ইবরাহিমের হাতে এক বছরের বেতন মাস পার হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যায়।’
এমনকি এমন কথাও প্রচলিত আছে—একবার তিনি পুরো একটি ট্রেন ভাড়া করেছিলেন, শুধু কাজ শেষে হুলওয়ানের বাড়িতে নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর জন্য!
কবিতা ও এর প্রধান বিষয়সমূহ
রাজনৈতিক ভাবধারা
হাফিজ ইবরাহিমের কবিতার অন্যতম প্রধান শক্তি হলো তার রাজনৈতিক সুর। তাঁর কাব্যে ফুটে ওঠে দেশের দুঃসময়, মানুষের অস্থিরতা, জাতির উদ্বেগ এবং স্বাধীনতার প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা। মিশর যখন সামাজিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক দুরবস্থা এবং নৈতিক পতনের মুখে দাঁড়িয়েছিল—হাফিজ ইবরাহিম তখন এসব ঘটনার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়।
জাতির বেদনা ও সংগ্রাম তাঁর হৃদয়কে আন্দোলিত করত, উদ্দীপ্ত করত। অনেক সময় তাঁর কবিতা মানুষের মনের অবস্থাকে এমনভাবে তুলে ধরত, যা বক্তৃতা বা সংবাদপত্র কখনোই বলতে পারত না। এ কারণেই তিনি ‘জনতার কবি’—যিনি জাতির মুখপাত্র, মানুষের মনের ভাষা।
দেশে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে তা সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হতো—আর তাঁর কবিতাও জাতির ভাবনা ও চেতনায় প্রভাব ফেলত।
তিনি এক জায়গায় নিজের মর্মবেদনা প্রকাশ করে লিখেছেন—
নীলের জল কবে হবে শান্ত?
কবে তার স্রোত যাবে নিরাপদে?
মিশরের নাম শুনলেই চোখ ভিজে ওঠে
অলৌকিক অশ্রুতে।
বুকের ভেতর যেন ধুকপুক করে ওঠে
এক বীর অশ্ব—
মৃত্যু আর পলায়নের দ্বিধায় কাঁপতে থাকা।
সামাজিক ভাবধারা
রাজনৈতিক কবিতার পাশাপাশি সামাজিক ভাবধারা হাফিজ ইবরাহিমের কাব্যের আরেকটি বড় অংশ। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন সাহিত্য ও চিন্তার পরিবেশে—যেখানে মানুষ, সমাজ, ন্যায়–অন্যায় আর নীতিবোধ নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হতো।
নিজের জীবনের দুঃখ-কষ্ট, মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক, তাদের আচরণ-সংস্কৃতির পর্যবেক্ষণ—এসবই তাঁর কবিতা সমৃদ্ধ করেছে। তিনি কখনো সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন রসিকতা ও হাস্যরসে, আবার কখনো মানুষের দুঃখ-বেদনা নিয়ে লিখেছেন গভীর ব্যথায়।
তাঁর সামাজিক ভাবনায় প্রভাব রেখেছেন—মাহমুদ সামি আল-বারুদি, মুফতি মুহাম্মদ আবদুহু, কাসিম আমিন, সাদ জগলুল পাশা প্রমুখ চিন্তাবিদেরা।
মিশরের পাশাপাশি আরব বিশ্বের সামগ্রিক সংকট, বাঁধন, আশা–আকাঙ্ক্ষাও তাঁর কবিতায় বড় জায়গা পেয়েছে।
আরবি ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা
হাফিজ ইবরাহিম ছিলেন আরবি ভাষার একনিষ্ঠ প্রেমিক। ব্রিটিশ শাসনের সময় যখন মিশরে ইংরেজি ভাষার আধিপত্য বাড়ানোর প্রয়াস চলছিল—তখন তিনি আরবিকে রক্ষা করার লড়াই শুরু করেন নিজের কবিতায়।
১৯০৩ সালে রচিত তাঁর বিখ্যাত ‘আরবি ভাষা’ কবিতায় তিনি ভাষাকে মানুষরূপে দাঁড় করিয়ে তাঁর ব্যথা–অভিমান প্রকাশ করান—
আমি নিজেকে দেখলাম—
আমার বুদ্ধি আর শক্তিকে যেন দোষ দিতে হয়!
নিজ জাতিকে ডেকেছি, জীবন দিয়ে নিবেদন করেছি,
তবু বলা হলো—
যৌবনে তুমি নাকি বন্ধ্যা!
হায়, যদি সত্যিই বন্ধ্যা হতাম,
তবুও শত্রুর কথায় আমার মন ভাঙত না।
আমি রচনা করেছি অগণিত সৃষ্টি—
কিন্তু যখন দেখলাম
তাদের যোগ্য ধারক নেই,
তখন কন্যার মতো করেই
আমি আমার রচনাগুলোকে নিজে বিলীন করে দিলাম।
এই কবিতায় তিনি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন—ভাষা হলো জাতির পরিচয়, সংস্কৃতির শিকড়, বিশ্বাসের ভিত্তি। ভাষাকে উপেক্ষা করা মানে নিজের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া।
কবিতার বৈশিষ্ট্য
রীত বা শোক-স্মরণ
হাফিজ ইবরাহিমের কবিতায় রীত বা শোক-স্মরণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর জীবনে নানা দুঃখ, প্রিয়জনের মৃত্যু, সমাজের অবক্ষয়—এসব তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এই ব্যথারই প্রকাশ তাঁর শোক-কবিতাগুলো।
এই ক্ষমতা এসেছে—তাঁর সৎ, সহানুভূতিশীল মনোভাব থেকে। নিজের জীবনের তীব্র দুঃখ-অভিজ্ঞতা থেকে। অন্তর্মুখী, বিষণ্ণ স্বভাবের কারণে। বন্ধুর মৃত্যু, নেতার মৃত্যু, জাতির শোক—সবই তাঁর কবিতায় হৃদয়স্পর্শী রূপে ফুটে উঠেছে।
কবিতার ভাষা ও গঠন
হাফিজ ইবরাহিমের কবিতা নানা দিক থেকে অনন্য—ছন্দের পরিশীলিত রূপ। কল্পনার অতিরঞ্জন নয়, বরং বাস্তবের ওপর ভর করে লেখা। বক্তব্য পরিষ্কার, অর্থ স্পষ্ট। বিষয়ভিত্তিক, উদ্দেশ্যপূর্ণ রচনা। শব্দচয়ন মার্জিত ও সহজবোধ্য। কখনো ছন্দে জটিলতা থাকলেও তা গভীর ভাব প্রকাশে সহায়ক। কাব্যের শক্তি তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততা, সরলতা, স্বচ্ছতা—যা পাঠককে সরাসরি স্পর্শ করে।
মানবিকতা ও দেশপ্রেম
হাফিজ ইবরাহিমের কবিতায় মানবিক সুর অত্যন্ত প্রখর। তাঁর কবিতা—মানুষের সুখ–দুঃখের কাব্য। জাতির দুর্দশা ও সংগ্রামের কাহিনি। মিশরের প্রতি গভীর দেশপ্রেমের আহ্বান। অজ্ঞতা, অবিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ। ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কণ্ঠ—কারও অনুসারী নন।
উল্লেখযোগ্য রচনাবলি
তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
দুনশওয়াই
মিশর
মুহাম্মদ আবদুহু (রীত)
মুস্তাফা কামাল (রীত)
হাতামাতুল ইয়রাআ
মুনাজাত
মুজাহেরাতুস সাইয়্যিদাত
রচনার সংকলন ও কবিতা সংগ্রহের প্রয়াস
হাফিজ ইবরাহিমের কবিতা আজ আমাদের হাতে এসেছে মূলত সংবাদপত্র, সাময়িকী ও তাঁর ব্যক্তিগত নোট থেকে। তিনি নিয়মিতভাবে রচনা সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করতেন না; যে কারণে তাঁর বহু কবিতা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। লেখক আহমাদ আমিন উল্লেখ করেছেন—‘হাফিজ ইবরাহিম প্রায়ই যেকোনো কাগজে কবিতা লিখতেন, ফলে পরে সেসব সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ত।’
তাঁর বিচ্ছিন্ন রচনাগুলো সংগ্রহ করেন আহমাদ আমিন, ইবরাহিম আল-অবিয়ারি ও আহমাদ জাইন। তাঁরা বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকী থেকে তাঁর কবিতা সংগ্রহ করেন—প্রকাশের শুরু থেকে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তাঁদের ভাষায়—‘আমরা যতটুকু জোগাড় করতে পেরেছি, দিওয়ানে তা-ই সংযোজন করা হয়েছে।’
জীবদ্দশায় প্রকাশিত দিওয়ান
হাফিজ ইবরাহিমের জীবদ্দশায় তিনটি সংক্ষিপ্ত দিওয়ান প্রকাশিত হয়েছিল—
১. প্রথম খণ্ড (১৯০১) — মুহাম্মদ ইবরাহিম হিলাল বেগ সম্পাদিত
২. দ্বিতীয় খণ্ড (১৯০৭)
৩. তৃতীয় খণ্ড (১৯১১)
এরপর তিনি আর নতুন কোনো সংকলন প্রকাশ করেননি, কারণ রচনাগুলো তিনি নিজের হাতে একত্র করতেন না।
মৃত্যুর পর প্রকাশিত দিওয়ান
১৯৩৩ সালে দামেস্কের সাহিত্যিক আহমাদ উবাইদ তাঁর বহু অপ্রকাশিত কবিতা সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন। তিনি হাফিজ ও শুকাই-এর রীতকবিতা একত্র করে ‘যিকরাতুশ শা’ইরাইন’ নামেও একটি সংকলন প্রকাশ করেন।
১৯৩৫ সালে মিশরের হিলাল লাইব্রেরি পূর্ণাঙ্গ দিওয়ান প্রকাশ করে—যেখানে জীবদ্দশায় প্রকাশিত তিন খণ্ড এবং উবাইদের সংগ্রহ যুক্ত হয়।
বিষয়ভিত্তিক দিওয়ান (১৯৩৭)
১৯৩৭ সালে আহমাদ আমিন, ইবরাহিম আল-অবিয়ারি ও আহমাদ জাইন আরও সুবিন্যস্তভাবে দিওয়ান প্রকাশ করেন। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : এটি বিষয়ভিত্তিকভাবে বিভক্ত—যেমন প্রশংসা, উপহাস, শোক ইত্যাদি। কবিতাগুলো বর্ণানুক্রমিক সূচিতে সাজানো—যাতে পাঠক সহজে খুঁজে পায়। প্রতিটি কবিতার সঙ্গে দুই ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে—১. রচনার প্রেক্ষাপট ও প্রকাশের সময়, ২. ভাষা, শব্দার্থ, ইতিহাস ও ধারণা।
আহমাদ আমিন বলেন—‘দিওয়ানটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যেন বুঝতে পারে—এই চিন্তা থেকেই ব্যাখ্যাগুলো সহজ ও বিস্তারিত করা হয়েছে।’
গদ্যসাহিত্য
‘প্রশ্নোত্তর’
পিতা–পুত্রের সংলাপের মতো করে লেখা এই বই তাঁর নৈতিক ভাবনা ও জীবনদর্শন তুলে ধরে। এখানে রয়েছে—সাফল্য, সুখ ও দায়িত্ব, সততা ও নৈতিক মূল্যবোধ ও জীবনবোধের সরল ব্যাখ্যা। প্রতিটি উত্তরে আছে পরিষ্কার ভাষা, সহজ বোধগম্যতা—যা সব বয়সের পাঠকের জন্য উপযোগী।
‘লায়ালি সাতিহ’
এই কাহিনিতে তিনি সমাজ ও সাহিত্যজগতের সমস্যাগুলোকে ব্যঙ্গ ও সমালোচনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ রচনাটি গদ্যধর্মী, কিছুটা মাকামাতে হারিরি রীতির মতো—যেখানে সংলাপ প্রধান এবং চরিত্রগুলো বাস্তব নয়; বরং তাঁর ভাব প্রকাশের মাধ্যম।
অনুবাদ ও অন্যান্য রচনা
ভিক্টর হুগোর ‘দ্য লেস মিজারেবল’-এর আরবি অনুবাদ
খলিল মুতরানের সঙ্গে যৌথভাবে অর্থনীতি বিষয়ক সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ
দুই খণ্ডের শিক্ষা ও নৈতিকতা বিষয়ক কাজ
১৯১৮ সালে প্রকাশিত ‘উমরিয়াত হাফিজ’—ন্যায়পরায়ণতা, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক আদর্শ নিয়ে সুবিন্যস্ত একটি রচনা
জীবনের শেষ দিন ও মৃত্যু
হাফিজ ইবরাহিম ১৯৩২ সালের ২১ জুন, বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে দাফন করা হয় সাইয়িদা নাফিসা কবরস্থানে।
তার আগের রাতেই (২০ জুন) তিনি দুই বন্ধুকে নৈশভোজে আমন্ত্রণ করেছিলেন, কিন্তু অসুস্থতার কারণে নিজে খাবার খাননি। বন্ধুরা চলে যাওয়ার পর তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। চিকিৎসক আসার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বন্ধু আহমাদ শুকাইয়ের শোক
কবির মৃত্যুর সংবাদটি তার বন্ধু শুকাইয়ের কাছে তৎক্ষণাৎ পৌঁছায়নি; তাঁর সচিব খবরটি গোপন রেখেছিলেন যাতে তাঁকে আঘাত না দেয়। পরে খবর জেনে শুকাই কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকেন, তারপর প্রিয়বন্ধুকে স্মরণ করে শোককবিতা রচনা করেন। তিনি লেখেন—
তুমি যদি বেঁচে থাকতে—
আমার শোকের বাণী শুনতে,
তবে তা আজকের এই নিঃসঙ্গ রীতের চেয়ে
অনেক শ্রেয় হতো।
তথ্যসূত্র
- আশ-শায়ের হাফিজ ইবরাহিম, Mowdoo3.com, ২ জানুয়ারি ২০২০
- কবি হাফিজ ইব্রাহীম ও তার কাব্যপ্রতিভা, মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, সাহিত্য পত্রিকা, বর্ষ ৩৭, সংখ্যা ১