‘হুস্, হুস্, যাহ্!’
সিকিউরিটি গার্ডের তাড়া খেয়েও জায়গা থেকে নড়ল না কুকুরটা। কিছুক্ষণ করুণ চোখে তাকিয়ে থেকে মাথা নিচু করে আবার এগিয়ে আসতে লাগল। ঝা চকচকে সিঁড়িটা ওর লক্ষ্য।
নিচের ঠোঁট কামড়ে ইঞ্চিখানেক পুরু বেতের লাঠিটা নিয়ে তেড়ে এলো সিকিউরিটি গার্ড সাগর। সাঁই করে বেতের ঘা মারল শূন্যে। কুঁইকুঁই করে দৌড়ে পালাল কুকুরটা।
‘কুত্তার বাচ্চা! সক্কাল সক্কাল মেজাজটারে পাংখা বানায়া দিল।’
কুঁচকে যাওয়া ভ্রু থেকে সরু হয়ে ঘাম গড়াচ্ছে৷ গাড়ির হর্ন শুনে চোখ ঘুরাল সাগর। প্রায় দৌড়ে আগের জায়গায় ফিরল। লোহার বিশাল ফটক ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। একটা প্রাইভেট কার ঢুকছে। বড় সাহেবের গাড়ি। কার থেকে নেমে অপ্রয়োজনে বুকের সাথে লেপ্টে থাকা টাইটা ঠিকঠাক করলেন বড় সাহেব। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে শ্লথ গতিতে এগিয়ে আসলেন।
‘স্লামালিকুম স্যার!’
ছোট করে মাথা নাড়লেন বড় সাহেব। ঠোঁটে যথাসম্ভব একটা হাসি ফুটিয়ে রেখেছেন। দৌড়ে এসে স্লাইডিং ডোরটা ঠেলে দিল সে। ঢুকে গেলেন অফিসে।
বড় সাহেব ওপরে উঠে যেতেই সাগর দেখল বিশাল ভুঁড়ি বাগিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নামছেন বুলবুল সাহেব। প্রাতকার্য সারতে এখন তিনি ঢুকবেন নিম্নস্থানীয় কর্মচারীদের বাথরুমে। ওপরে ওয়াশরুমের লম্বা লাইন থাকায় প্রায়ই তিনি একাজ করেন। এখানে তার সিরিয়াল লাগেনা, কর্মচারীরা খাতির করে বাথরুম খালি করে দেয়। সাগর দাঁত কটমট করে দেখে যায় শুধু। সে তো আর অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বলতে পারে না, ‘আপনার জন্য হাগার জায়গা আছে, আপনি আমাদের এখানে হাগেন কেন?’
অফিসের কাজকর্ম এখনো পুরোদমে চালু হয়নি। আপাতত ঘন্টাখানেক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। মূল ফটকের বুড়ো গার্ড আসলাম মিয়াকে এগিয়ে আসতে দেখে মুখ ভ্যাংচাল সাগর।
‘কালকাও উড়াল দিছিলা বুড়া। আজকা এইহানে দুই ঘন্টা প্রক্সি না দিলে সব কইয়া দিমু বড় সাবরে। তহন বুঝবা ঠেলা কারে কয়। পাও একখান কব্বরে, এহনো পিনিক ছুডাইতে পারলা না।’
বুড়োর মুখে ফিচেল হাসি।
‘বাবুল! অই বাবুইল্লা! কাস্টমার কী চায় দেহস না? ঝোল দে। বাড়ায়া দে বেডা।’
‘মেনা মাছের মতো খাড়ায়া আছস ক্যান্? পূবের টেবিল সাফ কর। গেলাস ধুইয়া আন্। এমন কচ্ছপের লাহান কাম করলে চলব না।’
ঝকঝকে সকাল। ব্যস্ত মহাসড়কের ধারে বিরাট কর্পোরেট অফিস বিল্ডিং। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঢুকছে-বের হচ্ছে। পাশেই সাত তলা আরেকটি ভবন-আন্ডার কন্সট্রাকশন। রোদে চিকিচিক করা বালিতে চোখ ফেললে বোঝা যায়, এই অফিসটিও চালু হয়েছে বেশিদিন গড়ায়নি। অফিস ভবনের ঠিক বিপরীতে রবিউলের ভাতের হোটেল। সড়কের ওপারে কর্পোরেট অফিসের ভবনে চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরিয়ে আনল ম্যানেজার রবিউল।
কাঁচে ঘেরা ভবনটিতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে৷ বাদামি নেড়ি কুকুরটা প্রধান ফটকের সামনে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। অপেক্ষায় আছে, সুযোগ পেলেই ঢুকে পড়বে।
সকালের এই সময়টায় কাস্টমারের বেশ চাপ থাকে হোটেলে। মফস্বলের ট্রাক ড্রাইভার-রিকশাওয়ালারা ভিড় করে খুব। তিনজন বেয়ারা কুলিয়ে উঠতে পারে না। তার ওপর বাবুলটা আবার কাজে অন্যমনস্ক। হঠাৎ একা একাই হেসে ওঠে। কী মনে করে হাসে কে জানে। ওকে অবশ্য বাদ দেওয়ারও ইচ্ছে নেই রবিউলের। কাজের লোকের অভাব। বাবুলের বয়স এগারো। বাপ-মা নেই। থাকে মামার কাছে। মাস শেষে কয়েকটা পয়সা মামার হাতে গুঁজে দিলেই হয়। বাবুল খাচ্ছে হোটেলে, থাকছে মামার সাথে। তার আর কী চাই? এইদিক দিয়ে অনেকটা সুবিধা।
অসুবিধাটা হলো, বাবুলের কাজে মন নেই। সারাক্ষণ কী যেন ভাবে। পেঁয়াজ আনতে গিয়ে মরিচ এনে দেয়, নুন ভরতে গিয়ে নুনের কৌটা রান্নাঘরে ফেলে রেখে যায়, ডিমের সালুন অর্ডার করলে মুরগি এনে দেয়, আরও কত কী!
এসব কারণে প্রতিনিয়ত বকা খায়, মারও পড়ে কখনো রবিউলের। তবুও ছোকরা শোধরায় না।
কিছুক্ষণ আগে কী কাণ্ডটাই না করল। মনে মনে হাসে রবিউল। বাঁক কাঁধে করে হোটেলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল এক চাষি। গায়ে কাপড় নেই, ময়লা লুঙ্গি। বাঁকের ভারে কুঁজো হয়ে হাঁটছে। হোটেলের সামনে আসতেই পা পিছলে ধপাস করে গেল পড়ে। বাঁকের দু’মাথায় দড়ি দিয়ে বাঁধা মাটির হাঁড়ি দুটি ভেঙে খান খান। খেজুরের রস ছিল ওগুলোয়। ধুসর তরলে ভেসে গেল রাস্তার এই ধার। এই দৃশ্য দেখে বাবুলের সে কী হাসি! হি হি করতে করতে হোটেল থেকে বেরুল।
বুড়ো পড়ে গিয়ে কাতরাচ্ছে। বাবুলের হাসি থামছেই না। এতে এমন হাসির কী হলো, বুঝতে পারেনি রবিউল। জোরে একটা ধমক লাগিয়েও কাজ হলো না। হঠাৎ ভেতরে ঢুকে একটা তরকারির বাটি হাতে নিয়ে দৌড় দিল বাবুল। বজ্জাতটার কাণ্ড দেখে মেজাজ খারাপ হচ্ছে রবিউলের। লুঙ্গিটা অর্ধেক উঠিয়ে বের হলো। গিয়ে দেখে রাস্তায় ভাসতে থাকা খেজুরের রস কেঁচে বাটিতে তুলছে বাবুল। ওর সাথে আরও কয়েকটা এসে জুটেছে। বুড়ো হম্বিতম্বি করে যাচ্ছে। কানে ধরে বাবুলকে হোটেলে নিয়ে গেল রবিউল।
‘এই রস খাওন যাইব রে গাধা? মাডি মাইখ্যা তো শেষ।’
‘যাইব। মেলাক্ষণ জ্বাল দেওন লাগব। জ্বাল দিলে আস্তে আস্তে মাডিডা তলে পড়ব। তহন রসটা উডায়া খাওন যাইব।’
বাবুলের ঠোঁটে হাসি। বাটিটা নিয়ে আপনমনে ভেতরের দিকে চলে গেল সে।
কাস্টমারের চাপ না থাকলে মাঝেমধ্যে বাবুলকে নিয়ে খোশগল্পে মজে রবিউল। লেংটা ফকিরের কেরামতি শোনায়। পিকআপ গ্যারেজের মালিক আবু মিয়াকে কীভাবে ঠক দিয়েছে, বাইম মাছ ধরতে গিয়ে কীভাবে সাপের কবলে পড়েছে এসব। বাবুল শুনে মজা পায়। সব কথাতেই সে হাসে। ভয়ের কথা শুনলেও, তাজ্জবের কথা শুনলেও৷ কখনো বাবুলের হাসিটা খুব ভাল লাগে রবিউলের। কখনো মেজাজ খারাপ হয়। মুরগি দিয়ে ভাত খাওয়া কাস্টমারের পাতে যখন শোল মাছের ঝোল ঢেলে দেয়, তখন কার মেজাজ ভালো থাকে? অথচ তখনো বাবুল ফিচকে হাসি হাসে।
বাবুলের একটা অভ্যাস ভালো লাগে রবিউলের। বাবুল কখনো অপরিষ্কার থাকে না। পরনের গেঞ্জি দুটো ধুয়ে পুঁছে রাখে। প্রতি রোজার ঈদে একজোড়া করে গেঞ্জি আর প্যান্ট পায় বাবুল। এক সেট দেয় রবিউল আরেক সেট ওর মামা। জলিলের মতো নাক দিয়ে শ্লেষ্মা পড়ে না। চুলগুলো চপচপে তেল মেখে যত্ন করে আঁচড়ে রাখে। হোটেলের পেছনের ঘরে রবিউলের সরিষার তেলের কৌটা আছে। বাবুল ওটা ব্যবহার করে। ঘরের আর কিছুতে হাত দেওয়ার অনুমতি নেই।
দুপুরের পরের সময়টা রবিউল বিশ্রাম করে কাটায়। এই সময় ক্যাশে বসে আজাদ। আজাদ বাবুলের চেয়ে বয়সে বড়। অন্য সময় কাস্টমার না থাকলে টুকটাক বাইরে যাওয়ার অনুমতি আছে বাবুলের, কিন্তু দুপুরের পর বাইয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কড়া নিষেধ করেছে রবিউল।
শিঙাড়ার প্লেটটা সিমেন্টের মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মেলামাইনের কর্কশ আওয়াজে ঘুম টুটে গেল রবিউলের। পেছনের ঘর থেকে হোটেলঘরে এসে দেখে তুলকালাম কাণ্ড। ড্রাইভার সালাউদ্দিন রেগে ফোঁসফোঁস করছে। এই লোকটা মাইশা ভাতের হোটেলের নিয়মিত কাস্টমার। পান থেকে চুন খসলেই রেগে ফেটে পড়ে। আজও কিছু একটা ঘটেছে আন্দাজ করল রবিউল।
কাঁচুমাচু হয়ে ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছে আজাদ। ঘটনা ঘটিয়েছে বাবুল। টেবিলে পুরি-শিঙাড়া দিয়ে গিয়েছিল পেঁয়াজ আনতে। এরমধ্যে কয়েকবার চেঁচিয়ে পেঁয়াজ না পেয়ে শিঙাড়ার প্লেট ছুঁড়ে মেরেছে সালাউদ্দিন। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে গেল লোকটা। রাগ উঠেছে রবিউলেরও। লুঙ্গি উঠিয়ে ছুটল রান্নাঘরের দিকে। গিয়ে দেখে ওখানে বাবুলের টিকিটাও নেই। দা-পেঁয়াজ উদোম পড়ে আছে। মাঠের দিকে গেছে যেই রাস্তাটা, ওটার দরজা হাট করে খোলা। খানিক বাদেই কান ধরে বাবুলকে রবিউলের সামনে হাজির করল আজাদ।
‘কই গেছিলি?’
‘গুল্লি খেলতে গেছিলাম।’
ড্যাবড্যাব করে রবিউলের দিকে তাকিয়ে থাকে বাবুল। মাথায় যেন রক্ত চড়ে যায় ওর।
মার্বেল খেলা বাবুলের নেশা। শুক্রবার সকাল অর্থাৎ ছুটির দিনে জোঁকের মতো লেগে থাকে। সারাদিন ঘড়া ভর্তি মার্বেল নিয়ে ঘুরে। মার্বেল হারাবার ভয়ে ওর সাথে খেলতে চায় না কেউ।
‘আজকা তোর খাওন নাই।’
চিৎকার করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় রবিউল। শাস্তি এখানেই শেষ না, কানে ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে এক ঘণ্টা। ফাঁকিবাজি ধরতে নজর রাখছে আজাদ। বাবুলের ভাবান্তর নেই। সে দাঁত বের করে হাসে। আজাদের দিকে তাকিয়ে একবার ভেংচি কেটে দেয়। আজাদ তাকায় না ওর দিকে। জানে, তাকালেই ভেংচি কাটবে বেহায়াটা।
মান্ধাতা আমলের রিস্ট ওয়াচটা একবার দেখে হাঁক ছাড়লেন ‘মাইশা ভাতের হোটেল’-এর ম্যানেজার রবিউল আলম। এবার স্বর রান্নাঘরের দিকে।
‘ছোট স্যারের ইস্পেশাল চা হইসে রে জলিল! চিনি দিসস ঠিকঠাক মতো? গতকাইল কিন্তু অভিযোগ আইসে তোর নামে। লিকার বেশি, চিনি কম—এই কথা কয়বার কইতে হইব? আবার উলটাপালটা হইলে তোর চাকরি নট।’
ছোট স্যার হলেন কর্পোরেট অফিসের ম্যানেজার মজুমদার বাবু। তার হোটেলের স্পেশাল চা মজুমদার বাবুর খুব প্রিয়। রবিউলের ননিযুক্ত খাঁটি গরুর দুধের চা না খেয়ে দিনের কাজ শুরু করেন না মজুমদার সাহেব। শুধু তিনিই না, তার চা’র প্রশংসা হয় অফিসজুড়ে। বড় স্যারকেও একদিন চা খাওয়াতে হবে—ভাবে রবিউল। প্রয়োজনে বড় স্যারকে সে নিয়মিত ফ্রিতেই খাওয়াবে৷ টাকাটা বড় কথা না, এমন উঁচু মানের মানুষকে খুশি করতে পারা তার সাত জনমের সৌভাগ্য।
এই ব্যবসাটায় খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না রবিউল। কুমিল্লা-ফেনী নতুন সড়ক হওয়ায় এদিকটায় বাস-ট্রাক আগের মতো আসে না। মফস্বলের একেবারে সীমানা ঘেঁষে হোটেল তার। এখানে আয়-রোজগারের একমাত্র অবলম্বন ওই যানবাহনগুলো। এখানকার অফিসের নতুন ম্যানেজার স্যার রবিউলকে কথা দিয়েছে, ওর মেজো মেয়েটাকে কাজে নেবে। তাতে আয় বাড়বে পরিবারের। সেই আশাতেই বুক বেঁধে আছে রবিউল।
‘ওয়াক থুহ্!’
বড় করে একদলা থুতু ফেলে লুঙ্গির গিঁট টাইট করল রবিউল।
‘কিরে জলিল! চা দেওনের টাইম তো হইয়া গেল। বাবুইল্লারে পাঠা।’
ফ্লাস্কভরতি চা নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল বাবুল। উত্তর দিক থেকে ধেয়ে আসছে কোম্পানির কন্টেইনারভর্তি ট্রাকটি। অফিসের সামনে এসে ট্রাকের নাক ঘুরলো ডানে। একটা তীব্র ঝাকুনি খেয়ে থেমে গেল ইঞ্জিন। কী হলো বোঝার আগেই একটা চিৎকার শোনা গেল। ট্রাক থেকে নেমে এলো ড্রাইভার। চারদিক শান্ত, বাবুল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ওপর। এক হাত দূরত্বে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে একটা মোটরবাইক। রক্তে ভেসে গেছে ট্রাকের তলা। একটা লাশের অর্ধেক শরীর বেরিয়ে আছে। বাকি অর্ধেক পিষে দিয়েছে ট্রাকের শক্তিশালী চার চাকা। একটু ঘুরে সামনে আসতেই দেখা মিলল আরেকটি লাশের। ছিটকে রাস্তার ওপারে এসে পড়েছে। কালচে হয়ে আছে জায়গাটা। তপ্ত বালি শুষে নিয়েছে রক্ত। একেও চেনার উপায় নেই। মুখের অর্ধেক থেতলে গেছে। একটা হাত আলগা হয়ে ঝুলছে।
মুহূর্তে হুলস্থুল পড়ে গেল চারদিকে। কানে ইয়ারফোন গুঁজে ফেসবুকের ফানি ভিডিওতে মজে ছিল অফিসের সিকিউরিটি গার্ড সাগর। হৈচৈ দেখে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। দ্রুত নিজের প্রোফাইলে গিয়ে লাইভ অপশন খুঁজতে লাগল। এর আগে কখনোই লাইভে আসেনি সে। লাইভ লেখায় ট্যাপ করছে পাগলের মতো, কিন্তু লাইভ স্টার্ট হচ্ছেনা। ছাতার ফোন!
আশপাশ থেকে নানান কথা কানে আসছে তার।
‘ভাই! আগে ৯৯৯ এ ফোন দেন।’
‘আরে মিয়া। মইরা গেছে, এহন ফোন দিয়া কী হইব?’
‘কেও লাশটা ঢাইকা দেন। উহ্, কেমন ভয়ঙ্কর দেহা যাইতাছে।’
‘সাবধান! লাশে হাত লাগান যাইবো না। এইটা এক্সিডেন্ট। পুলিশ কেইস।’
সাগরের মনে একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কে?
ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো রবিউল। এসে দেখে, বাবুল দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে শক্ত করে ধরে রাখা ফ্লাস্ক মৃদু কাঁপছে। কিছুক্ষণ আগে জায়গাটায় খেজুরের রসের হাঁড়ি ভেঙেছিল। লাশটার রক্ত খেজুরের রসের সাথে মিশেছে খয়েরি রং ধারণ করেছে।
আধঘণ্টার মধ্যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলো একদল সাংবাদিক। একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী বাবুলকে নানা প্রশ্ন করতে লাগল তারা। গোল গোল ভয়ার্ত চোখে অসংলগ্ন উত্তর দিচ্ছে বাবুল। সে বুঝতে পারছে না, এক কথা এতবার কেন জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে তাকে। হোটেলের টিভিতে সে দেখেছে সাংবাদিকরা বিভিন্ন মানুষকে প্রশ্ন করে। তার খুব ইচ্ছে ছিল, একদিন সেও ক্যামেরার সামনে কথা বলবে, কিন্তু এখন মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না, কেমন যেন আটকে যাচ্ছে সবকিছু।
বাবুলকে অফিসে নিয়ে বসানো হয়েছে। তাকে ঘিরে নানান ফিসফাস করছে স্টাফরা। বড় স্যারের ঘরে ডাক পড়েছে রবিউলের। বড় স্যার দীর্ঘক্ষণ ওর সাথে কী নিয়ে যেন কথা বললেন।
একটু পর বাবুলের হাত ধরে বড় সাহেবের রুমে নিয়ে গেল রবিউল। বাবুল কিছুই বলছে না। আগের মতোই বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। রবিউল জিজ্ঞাসা করল, ‘এক্সিডেন্টের সময় তুই অইখানে আছিলি। কী দেখছস ক। দোষটা কার আছিল?’
অনেক্ষণ পর মুখ খুলল বাবুল—‘দোষ আছিল ডেরাইভারের। হে গাড়ি ঘুরানের সময় পিছনে দেহে নাই। না দেইখা গাড়ি ঘুরাইছে আর পিছন থিকা হুন্ডা আইসা তলে পইড়া গেছে।’
‘হুন, এহনি পুলিশ আয়া জিগাইব তরে। আমি যা কই হেইডাই কইবি। কইবি দোষ আছিল হুন্ডাঅলাগ। টেরাকে হরন দিছিল কিন্তু অরা হরেন শুইনাও স্পিড কমায়নাই। বুঝছস? কী কইবি এহন ক দেহি?’
‘দোষ আছিল ডেরাইভারের। হে পিছনে…’
‘চোপ্ হারামির বাচ্চা। বড় স্যার যেইডা কইতে কইসে হেইডা কবি।’
চেঁচিয়ে উঠল রবিউল। ঘাড় ঘুরিয়ে বড় সাহেবের দিকে তাকিয়ে কাটল। এত বড় মানুষের সামনে গালি দেওয়া ঠিক হয়নি।
‘আবার ক, দোষ কার আছিল?’
‘দোষ আছিল…’
বাবুলের গলা আটকে যায়। প্রচণ্ড পানির তৃষ্ণা পেয়েছে তার। বড় সাহেবের ডেস্কে রাখা কাঁচের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। অর্ধ-শরীর থেতলানো লাশটা ভেসে উঠে চোখের সামনে। বড় সাহেবের হাতের ইশারায় বাবুলকে নিয়ে বের হয়ে যায় রবিউল। ফটক পেরুতেই বাবুলকে দেখে জেঁকে ধরে সাংবাদিকরা।
‘বাবু! আরেকবার একটু বিস্তারিত বলো তো কী দেখেছ তুমি?’
‘সব উঠতি বয়সের দোষ। শইল্যের রক্ত গরম থাকে। মোটরসাইকেলে এমুন টান দিসে এক্কেবারে টেরাকের নিচে। কারে দোষ দিবেন কন ভাই।’
বাবুল কিছু বলার আগেই উত্তর দেয় রবিউল।
‘বাচ্চাডা ডরাইসে। তারে কিছু জিগায়েন না আপনারা, বলে একপ্রকার টেনে বাবুলকে নিয়ে হোটেলে ফিরে যায় রবিউল।’
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যায়। পুলিশ এসে তুলে নিয়ে যায় লাশ। যার যার কাজে ফিরে যায় সবাই। ডিমের তরকারি মাখা অর্ধেক ভাত প্লেটে রেখেই দৌড়ে এসেছিল রিকশাওয়ালা করিম। রবিউলের দোকানে ফিরে এসে সেই ঠান্ডা ভাতে হাত দেয় আবার। সাগর লাইভ শেষ করে এসে দেখে নেড়ি কুকুরটা সিঁড়ির টাইলসে মসৃণ মেঝেতে শুয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। গার্ডের অনুপস্থিতির সুযোগে ঢুকে পড়েছে।
‘হেই, হেই, হুস্, যাহ্!’