ওয়াশিংটন স্কয়ারের পশ্চিম পাশের শহরের ক্ষুদ্র অংশটাতে রাস্তাগুলো যেন পাগলের মতো ছুটে গেছে লাগামহীন, বেদিশা। জায়গায় জায়গায় মোড় নিয়ে, ছোট ছোট অংশে ভাগ হয়ে চলে গেছে বিভিন্ন দিকে, এগুলোর নাম ‘প্লেস’। কোনো কোনো রাস্তা ঘুরেফিরে আবার আগের জায়গাতেই এসে মিশেছে। একবার এক চিত্রশিল্পী এই রাস্তা সম্পর্কে খুব অদ্ভুত একটা ব্যাপার আবিষ্কার করেছিলেন। ধরেন, একজন চিত্রশিল্পীর কাছে কিছু রংতুলি ইত্যাদি জিনিসপত্র ছিল যেগুলোর দাম এখনো তিনি পরিশোধ করেন নাই। ধরেন, তার কাছে আসলে কোনো টাকা ছিল না আর তার পাওনাদার টাকা আদায়ের জন্য তারে খুঁজতেছিল। এমন সময় যদি কেউ তার কাছে টাকা আদায় করতে আসে—সে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আবার হয়তো নিজেকেই ফিরে আসতে দেখবে এক টাকাও আদায় না করেই।
শহরের এই অংশটার নাম গ্রিনিচ ভিলেজ। আর পুরোনো এই গ্রিনিচ ভিলেজে খুব শিগগিরিই চিত্রশিল্পীরা এসে ভিড় জমাতে শুরু করেছিল। এখানে তারা তাদের মনমতো, কম ভাড়ার, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আছে এমন বাসা খুঁজে পেয়েছিল।
সু আর জনসি তিন তলা বিল্ডিংয়ের ওপরের তলায় থাকত। যুবতী এই দুইজন নারীর একজন মেইনের বাসিন্দা, আরেকজন ক্যালিফোর্নিয়ার। ইংলিশ স্ট্রিটের একটা রেস্তোরাঁতে দুইজনের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেখানেই কথায় কথায় তারা জানতে পেরেছিল দুইজনই একই রকমের শিল্প, খাবার এমনকি একই রকমের পোশাক পছন্দ করে। শেষে তারা একসাথে বাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তখন ছিল বসন্তকাল।
শীতের আগমনী বার্তার সাথে সাথে এক রূঢ় অচেনা পথিক এসে হাজির হলো গ্রিনউইচ ভিলেজে। কেউ তাকে চোখে দেখতে পেত না। সে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াতো—এখানে একজনকে, সেখানে আরেকজনকে তার হিম-শীতল স্পর্শে ছুঁয়ে দিত। সে ছিল এক নির্মম ব্যাধি। ডাক্তাররা তার নাম দিয়েছিল নিউমোনিয়া। শহরের পূর্ব দিকটায় সে তাণ্ডব চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে আক্রান্ত করে দ্রুত এগিয়ে গিয়েছিল গ্রিনউইচ ভিলেজের দিকে। কিন্তু গ্রিনউইচ ভিলেজের আঁকাবাকা সরু গলিতে তার গতি আর ততটা রইল না।
জনাব নিউমোনিয়া কোনো সদয় বৃদ্ধ ভদ্রলোক ছিলেন না। একজন ভদ্র বৃদ্ধ লোক কখনোই ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আসা একজন নাদান নারীকে কষ্ট দিত না। কিন্তু নিউমোনিয়া তার হিম-শীতল আঙুলে জনসিকে স্পর্শ করল। জনসি প্রায় নিঃশ্চল হয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে থাকত, আর জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকত পাশের বাড়ির দেয়ালের দিকে।
এক সকালে ডাক্তার সু-য়ের সাথে হলঘরে আলাদা করে কথা বললেন, জনসি যেন শুনতে না পায়।
‘তার বাঁচার আশা খুবই ক্ষীণ’—ডাক্তার বলল, ‘তবুও একটা সম্ভবনা আছে—যদি সে বাঁচতে চায়। কেউ যদি বাঁচতেই না চায়, তার জন্য আমার বেশি কিছু করার থাকে না। আপনার বন্ধু ধরেই নিছেন যে তিনি আর সুস্থ হবেন না। এমন কোনো ব্যাপার আছে যা তারে পীড়া দিতেছে?’
‘তার খুব ইতালি যাওয়ার ইচ্ছা। নেপলস উপসাগরের একটা ছবি আঁকা তার অনেক দিনের স্বপ্ন’, সু বলল।
‘আঁকাআকি? আঁকাআকি না। অন্যকিছু হবে। কোনো পুরুষ নয়তো?’
‘পুরুষ মানুষ?’ সু ভ্রু কুঁচকাল, ‘একজন পুরুষ মানুষের কি এতই ক্ষমতা—না, ডাক্তার। তেমন কোনো পুরুষ মানুষ নাই।’
‘তাইলে এইটা হতাশা’—ডাক্তার বললেন, ‘আমি আমার জানা সবকিছুই করব। কিন্তু একজন অসুস্থ মানুষ যদি ভেবে নেয় যে সে মরে যাবে, তাইলে আমার অর্ধেক কাজই বেহুদা হয়ে পড়ে। শীতের নতুন পোশাকআশাক নিয়া তার সাথে কথা বলেন। আগামী দিনের প্রতি তার যদি কোনো আগ্রহ থাকে, তাইলে তার বাঁচার সম্ভবনা বাড়বে।”
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর সু তার কাজের ঘরটায় গেল। কিছুক্ষণ কাঁদল। তারপর গেল জনসির রুমে। সাথে নিয়ে গেল তার আঁকা কিছু পেইন্টিং। আর সে গুনগুন করে গান ভাজছিল ঠোঁটে।
জনসি বিছানায় শুয়ে ছিল, রোগাপাতলা, নিথর যেন। জনসি শুয়ে ছিল জানালার দিকে মুখ করে। জনসি ঘুমাচ্ছে ভেবে সু গান গাওয়া বন্ধ করে দিল।
সু আঁকতে শুরু করল। আঁকার মাঝেই সে মৃদু একটা শব্দ শুনতে পেল। বারবার একই শব্দ। সে জনসির বিছানার পাশে সরে এলো।
জনসির চোখদুটো তাক-খোলা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে কিছু একটা গুনছিল।
‘বারো’—জনসি গুনল; একটু থেমে, ‘এগারো’; আবার, ‘দশ’, এবং ‘নয়, আট, সাত’—থেমে থেমে গুনতেই থাকল।
সু জানালার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল। ওখানে গোনার মত এমন কি আছে? জানালার ওপাশে তো পাশের বাড়ির দেওয়াল ছাড়া আর কিছুই নেই। দেয়ালটায় কোনো জানালাও নেই। শুধু একটা বয়েসি গাছ দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালটার পাশে। শীতের হিমেল হাওয়া গাছটাকেও ছুঁয়ে গেছে। সবকটা পাতাই প্রায় ঝরে গেছে। শাখাগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে।
‘কী গুনছ, জনসি?’ সু জিজ্ঞেস করল।
‘ছয়’—জনসি আওড়াল, মৃদু স্বরে; ‘পাতাগুলো এখন দ্রুত ঝরে যাচ্ছে। তিনদিন আগেও প্রায় শখানেক পাতা ছিল। গুনতে গুনতে আমার মাথা ধরে গেছে। কিন্তু এখন অভ্যস্থ হয়ে গেছি। এই যে আরেকটা ঝরে পড়ল। আর মাত্র পাঁচটা বাকি আছে।’
‘পাঁচটা বাকি আছে মানে কী, জনসি? সু-কে বলো।’
‘পাতা। ওই গাছটাতে। শেষ পাতাটা ঝরে গেলে, আমাকে চলে যেতে হবে। তিনদিন ধরেই আমি কথাটা জানি। ডাক্তার তোমাকে বলে নাই?’
‘এমন কথা আমি জীবনেও শুনি নাই’—সু বলল, ‘কোনো মানেই হয় না এই কথার। বুড়া একটা গাছের সাথে তোমার জীবনের সম্পর্ক-ইবা কী? জানি, এই গাছটা তোমার খুব পছন্দের ছিল। কিন্তু বাচ্চামি করো না। তোমার ভালো হয়ে যাওয়ার খবর ডাক্তার আমারে দিয়া গেছেন। খুব দ্রুতই ভাল হয়া যাইবা। কিছু খাওয়ার চেষ্টা করো। আমিও কাজ করতে যাব। ছবিগুলা বিক্রি করে কিছু টাকা পয়সা পাইলে শরীরে শক্তি হয় এমন ভালো ভালো কিছু খাবার কিনে আনতে পারব।’
‘আমার জন্য কিছু কিনে আনতে হবে না’—জনসি বলল, এখনো সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। ‘ওই যে দেখো। আরেকটা পাতা ঝরে গেছে। আমি আর কিচ্ছুই খাইতে চাই না। আর মাত্র চারটা পাতা বাকি আছে। রাত হওয়ার আগেই বাকি পাতাগুলাও ঝরে যাইতে দেখতে চাই আমি। তাইলে আমিও চলে যাইতে পারব।’
‘আহ্হা, জনসি’—সু বলল, ‘তুমি প্লিজ চোখ দুইটা বন্ধ করে শুয়ে থাকো। কথা দাও আমি কাজটা শেষ না করা পর্যন্ত তুমি এই জানালার বাইরে তাকাবা না। কালকের মধ্যেই এই ছবি শেষ করতে হবে আমারে। আলো দরকার। আলো ছাড়া কাজ করতে পারব না আমি। জানালাও বন্ধ করতে পারব না।’
‘পাশের রুমটাতে কাজ করতে পারো না তুমি?’ জনসি শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল।
‘না। তোমার পাশে বসে কাজ করতেই আমার বেশি ভালো লাগতেছে’—সু বলল, ‘আর আমি চাই না তুমি ওই পাতাগুলা দেখো।’
‘আচ্ছা, তোমার কাজ শেষ হইলে আমাকে জানায়ো’—জনসি বলল। চোখদুটি বন্ধ করে নিশ্চল শুয়ে থাকল সে; ‘আমি শেষ পাতার পড়াটাও দেখতে চাই। যথেষ্ট অপেক্ষা করছি। বহুত চিন্তাভাবনা করছি। আর না। আমিও ওই পাতাগুলার মতন ধীরে ধীরে ঝরে যাইতে চাই।’
‘ঘুমাতে চেষ্টা করো তো তুমি’—সু বলল, ‘আমাকে বেহেরমানকে ডাকতে যেতে হবে। এই ছবিটাতে আমি একজন মানুষরে আঁকতে চাই। আমার ইচ্ছা, মানুষটা বেহেরমানের মতো হউক। আমি এই এক মিনিটের মধ্যেই চলে আসব। আমি না আসা পর্যন্ত নড়াচড়া কইরো না।’
বেহেরমানও বয়েসি একজন চিত্রকর, একই বিল্ডিংয়ের নিচতলায় বসবাস করেন। বয়স ষাটেরও বেশি। চিত্রকর হিসেবে তার জীবনে তেমন কোনো সফলতা নাই। প্রথম চল্লিশ বছর তিনি কোনো ভালো ছবিই আঁকতে পারেন নাই। তিনি সবসময়ই একটা মাস্টারপিস ছবি আঁকার কথা বলেন, কিন্তু এখনো আঁকা শুরু করেন নাই।
অন্যদের ছবির জন্য পোজ দিয়ে সে অল্প কিছু টাকা উপার্জন করত। অতিরিক্ত মদ পান করত। সব সময়ই সে তার মাস্টারপিসটার কথা বলত। আর সে বিশ্বাস করত সু আর জনসিকে সাধ্যমত চেষ্টা করা তার কর্তব্য।
সু বেহেরমানকে অন্ধকার একটা রুমে খুঁজে পেল। সু-র নাকে গন্ধের একটা ধাক্কা লাগল। সে বুঝতে পারল, বেহেরমান পান করছে। বেহেরমানকে সে জনসি আর পাতার কাহিনিটা খুলে বলল। সু-রও ভয় লাগছিল জনসি বোধ হয় সত্যি সত্যিই ওই রকম একটা পাতার মতো ঝরে যাবে। দুনিয়াতে বেঁচে থাকার শেষ আশাটাও জনসির শেষ হয়ে আসছে।
কাহিনি শুনে বেহেরমান রাগে চিৎকার করে উঠল।
‘কী!’ রাগে লাফিয়ে উঠল বেহেরমান; ‘দুনিয়াতে এমন আহাম্মকও আছে নাকি? গাছের পাতা ঝরলে মানুষ মরে যায় এমন আজগুবি কথাও আছে? বাপের জন্মেও এমন কথা শুনি নাই। না, আমি তোমার সাথে ওপরে যাব না। জনসিরে তুমি এমন কথা ভাবতে দাও কেন? বেচারি মেয়ে!’
‘আসলে সে খুবই অসুস্থ আর দুর্বল হয়ে গেছে’—সু বলল, ‘অসুস্থতার জন্যই তার মাথায় এমন আজগুবি চিন্তাভাবনা ভর করছে। দেখেন, বেহেরমান চাচা, আপনি আসতে না চাইলে, আসবেন না। কিন্তু আমার মনে হয় না কাজটা ভালো হবে।’
‘হায়রে মেয়ে মানুষ!’ বেহেরমান ধমকে উঠল, ‘কে বলল আমি যাব না? যাও। আসতেছি। আধা ঘন্টা ধরে তো এটাই বলতে চাইতেছি। হায় খোদা! জনসির মতো একটা ভালো মেয়ের অসুখ হয়ে পড়ে থাকার মতো জায়গা না এটা। একদিন নিশ্চয় আমি মাস্টারপিসটা আঁকব। তারপর সবাই মিলে এখান থেকে চলে যাব। আয় খোদা! রহম করো।’
সু আর বেহেরমান ওপরে উঠে দেখতে পেলেন জনসি ঘুমুচ্ছে। আলগোছে জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে সু বেহেরমানকে নিয়ে পাশের রুমে চলে গেলেন। তারা দুইজনেই ভয়ার্ত চোখে গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখল। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক কিছুক্ষণ বসে রইল। হিম শীতল বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। সাথে অল্প তুষারপাত।
বেহেরমান বসলেন। সু আঁকা শুরু করল।
অনেক রাত পর্যন্ত সে কাজ করল। রাতে এক ঘণ্টার মতো ঘুমিয়েছে সে। সকালে উঠে জনসিকে দেখতে গেল। জনসি নিষ্পলক জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। ‘আমি দেখতে চাই’—সু-কে বলল জনসি।
সু জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিল।
গত প্রায় সারারাত বৃষ্টি হয়েছিল, সঙ্গে তুষারপাত। তারপরেও একটা পাতা গাছে ঝুলেছিল। এটাই শেষ পাতা। পাতাটি এখনো কচি সবুজ। তবে এক কোণায় একটু হলদেভাব দেখা যাচ্ছিল বয়সের কারণে। পাতাটি মাটি থেকে প্রায় বিশ ফুট ওপরে ঝুলছিল।
‘এটাই শেষ পাতা’—জনসি নিরাসক্ত কণ্ঠে বলল, ‘আমি ভাবছিলাম রাতেই হয়তো পাতাটা ঝরে গেছে। রাতের বাতাস আমার কানে বাজতেছিল। পাতাটা আজকে ঝরবে। আমিও ঝরে যাব। মরে যাব একই সময়ে।’
‘জনসি! বন্ধু আমার, বোন আমার’—সু কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল, ‘নিজের কথা না-ই ভাবতে পারো। অন্তত একবার আমার কথাটা ভেবে দেখো। আমি তখন কী করব?’
জনসি নিরুত্তর রইল। দুনিয়ার সবচেয়ে নির্বান্ধব, একাকী হলো সেই আত্মাটি যে তার অনন্ত যাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বন্ধনের প্রতিটি সুতা—বন্ধুত্ব, এবং আরও যা যা তাকে পৃথিবীর সাথে এতদিন বেঁধে রেখেছিল—ধীরে ধীরে ছিঁড়ে যাচ্ছে।
দিনটা এভাবেই পার হয়ে গেল। সন্ধ্যা হলো। পাতাটি এখনো গাছের শাখায় ঝুলে রইল। আর একটু পরেই, রাত একটু গভীর হতেই দখিনা বাতাস বইতে শুরু করল। জানালায় বৃষ্টি আছড়ে পড়তে শুরু করল।
সকালে আলো ফুটতেই জনসি জানালাটা খুলে দেওয়ার আবদার করল। পাতাটি এখনো ঝুলছে। পাতাটির দিকে অনেক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে শুয়ে রইল জনসি। তখন সে সু-কে ডাকল। সু রান্না করছিল।
‘আমি আসলে খুব বোকার মত আচরণ করেছি এতদিন, সু’—প্রশ্রয় প্রার্থনার সুরে বলল জনসি, ‘কিছু একটা আছে যা এখনো পাতাটাকে ঝুলায়ে রাখছে শুধু আমাকে বুঝায়তে যে আমি কতটা বোকা। মরে যাইতে চাওয়াটা কোনো কাজের কথা না। এবার আমি কিছু খাইতে চাই। তার আগে আমারে একটা আয়না এনে দাও। নিজেরে একবার দেখে নিই। তারপর তোমার পাশে বসে রান্না করা দেখব।’
ঘণ্টাখানেক এভাবেই কেটে যাওয়ার পর জনসি বলল, ‘সু, দেইখো, আমি একদিন নেপলস উপসাগরের ছবিটা আঁকবই।’
দুপুরে ডাক্তার সাহেব আসলেন। জনসির রুম থেকে বের হয়ে হলঘরে দাঁড়িয়ে ডাক্তার সু-র সাথে কথা বললেন।
‘আশার কথা, সবকিছু ঠিকঠাক আছে—ডাক্তার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল। সু-র নাজুক চিকন হাত দুটো হাতে নিয়ে ডাক্তার আশ্বাস দিতে দিতে বললেন, ‘ভালো করে একটু যত্ন নেন এইবার। শিগগিরিই সুস্থ হয়ে উঠবে ও। এই বাসায় আরেকজন রুগী আছেন। এখন তারে দেখতে হবে। বেহেরমান, চিত্রকরই তো, যতটুকু জানি। ওর-ও নিউমোনিয়া। বয়েসি মানুষ, দুর্বলও হয়ে গেছেন, খুব অসুস্থ। তার জন্য বেশি আশা নাই। তবে আজকে তারে হাসপাতালে নিয়া যাইতেছি। আমরা যতটুকু পারি চেষ্টা করব।’
পরেরদিন ডাক্তার সাহেব আবার আসলেন। ‘জনসি এখন পুরাপুরি নিরাপদ। তোমার জন্যই এটা সম্ভব হইছে। এখন শুধু ভালো খাবার আর যত্ম নাও—তাইলেই হবে।’
দুপুরে সু এসে জনসির বিছানার পাশে বসে জনসিকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল।
‘তোমারে একটা কথা বলার আছে—ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল সে, ‘বেহেরমান চাচা নিউমোনিয়াতে আজকে হাসপাতালে মারা গেছেন। মাত্র দুইদিন অসুস্থ ছিলেন। প্রথমদিন সকালে কেউ একজন তারে রুমে দেখতে পাইছিল। ব্যাথায় গোঙায়তেছিল।’
‘তার জামাকাপড়, জুতা সবকিছু ভিজা ছিল। ঠান্ডা হয়েছিল বরফের মত। কই যে গেছিলেন তিনি, সবাই এইটাই ভাবতেছিল। ওই রাতে অনেক শীত পড়ছিল।’
‘আর তখনই কিছু জিনিস সবার চোখে পড়ে। একটা টর্চ লাইট আর আঁকাআঁকির কিছু সরঞ্জাম। রংও ছিল, সবুজ আর হলুদ রং। আর—’
‘জানালা দিয়া বাইরে তাকায়া দেখো, বন্ধু আমার, দেখো দেয়ালটায় এখনো শেষ পাতাটা আছে। তোমার কি একবারও মনে হয় নাই—এত বাতাসেও পাতাটা একবারও নড়ল না কেন? ভালো করে দেখো, এইটাই বেহেরমানের মাস্টারপিস—গত রাতে আঁকছে বেচারা, শেষ পাতাটা ঝরে যাওয়ার পরে।’