পাগল

আমি পাগল। জহিরকে ভালোবাসাই ছিল আমার পাগলামি। ভালোবাসা যে পাগলামি ছাড়া কিছু নয়, এ আমার জানা হয়ে গেছে। সঙ্গীকে পাগল বানিয়ে দাও বা নিজে পাগল হয়ে যাও। ব্যস। ইশ, আমি যদি পাগল না হতাম! পস্তিয়েই খেসারত দিচ্ছি। গড়িয়ে গেছে সময়। এখন আর ভেবে কী হবে!

কে না জানে আমার গল্প। আমি তো সেই অভাগী, যার বদনামে দুনিয়ামুখর! যাকে দেখলেই গল্পেরা লতিয়ে ওঠে। শ্রেণিকক্ষের ব্লাকবোর্ডে বেতের অগ্রভাগ তাক করার মতো করেই আমার দিকে আঙুল তাক করে মানুষ। চোখে খেলে যায় নগ্ন ইশারা। লোকজন দেখে দেখে হাসে। ঘৃণাভরা হাসি। কেউ-বা ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে অপলক দেখে যায়। যেন-বা আমি পৃথিবীর কোনো রাজ্যের সাম্রাজ্ঞী! মিথ্যা। একদম কাঁচা মিথ্যা। আমি বরং ছিমছাম গড়নের এক উদাস নারী। এইটুকুই। গেরুয়া রংয়ে সৌন্দর্য কোথায়! কষ্টকাতর লম্বাটে চেহারায় কোনো ঐশ্বর্য নেই। কিন্তু আমার চোখ…! তবে সেই চোখজোড়ায় দুঃখের ছায়া আর উদাসীনতা ছাড়া কী-ইবা আছে! উজ্জ্বলতা, চমক, হাসি; কিচ্ছু নেই। তবু কেন এত এত চাহনি আমার চোখের উজ্জ্বলতা খুঁজে বেড়ায়? কেন? চোখের গহ্বরে তো কেবলই দুঃখবোধ। তবুও লুকিয়ে রাখি। কৃতজ্ঞ না হয়ে উপায় নেই; আমার চোখের পাঁপড়ি বেশ লম্বা। যেন-বা ওরা আমার দুঃখমদিত চোখের অশ্রু হয়ে লতিয়েছে। কিন্তু মানুষের কথা আর কী বলব। তারা কোনোভাবেই আমাকে একটু স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। চোখ তুলে যে একটু দেখব, সে উপায়ও নেই। নানা কথা বলে। এমন এমন আচরণ করে, যেন-বা আমার কোনো হুঁশ-জ্ঞান নেই। পাঁপড়ি দিয়ে ঢেকে রাখব? কবুতরের দানা খুঁটে খাওয়ার মতো করেই আমাকে খেয়ে যাবে। গলা চড়িয়ে কথা বলবে। অসহ্য তাদের সেই নগ্ন কথা ও চাহনি। তারা আমাকে এতটাই নিচ মনে করে, হরেদরে যাকে নিয়ে যা তা বলা যায়। সবই সেই পাগল রেজার মেহেরবানি! ও খুবই সজাগ পাগল। তার আবয়ব, মুখের আদল, শান্ত-শীতল চোখ—আমি জানি ও পাগল নয়। ভেক ধরে আমার থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছে। উফ, কতটা ভয়ংকর তার এই প্রতিশোধ! ভাবা যায় না। পরিস্থিতিটাকে সে কী করে রেখেছে! অন্য কোনো কারণে নয়, কারণ একটাই; আমি ওকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেছি! আমি কি আমার নিজের জীবনসঙ্গীও বেছে নিতে পারব না?

হ্যাঁ, সে আমাকে ভালো অবশ্যই বাসত। মানছি আমিও তাকে বিয়ে করার ওয়াদা দিয়েছিলাম। তাই বলে কি আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারব না? আমার যদি ওয়াদা করার ক্ষমতা থাকে, ভাঙার কেন নয়? তাছাড়া আমি কি সেই ওয়াদা আসলেও ভেঙেছিলাম? আমি? আমিই বা কে! পরিস্থিতির করাতে বলি হয়ে গেছি। এসব নিয়েই আমার দিনযাপন৷ এগুলো কি আমার বানানো? আহ, পরিস্থিতি! অগুনতি কামুক নজর। চলন্ত তৈরি হওয়া গল্পেরা। মানুষের যেন আমাকে কষ্টকাতর করে তোলা ছাড়া কোনো কাজ নেই। যেন-বা কামুক লোকদের দুনিয়ায় আমি একাই নারী।

কতই না সুন্দর ছিল সেসব দিন। লাহোরের ভিড়ের মাঝেও আমি ছিলাম একা। যখন যেখানে ইচ্ছা, চলে যেতে পারতাম। আমার মতো বাউণ্ডুলে পাইনি কাউকে। তারপর পালটে গেল দিন। আমি আর রেজা হাঁটতে লাগলাম। কেউ বিরাগ ছিল না৷ যে যার মতো চলছে৷ দিনগুলো তো এমনই ছিল। একই রং। পরিচিত দুটি চোখ। তারপর? ফেলে আসা দিনগুলোই ছিল আমার জীবন৷ কিন্তু এখন? সবই জনতার ভাগে চলে গেছে। কিন্তু কেন? সবাই আমাকে এমন চোখে দেখে, আমার কোনোকিছুই যেন তাদের অজানা নয়। যেন-বা আমি তাদের খেলার পুতুল। তাদের একটামাত্র ইশারার আশায়ই বসে আছি। গায়ের পোশাকটাও তাদের দেখাব বলেই জড়ানো। তাদের লোলুপ চাহনি যেমন করে আমার কাপড়… উফ! আমি বুঝি, আমি তাদের থেকেও খারাপ অবস্থায় আছি। যারা কি না রাত নেমে এলে খদ্দরের আশায় বসে থাকে। খদ্দেররা তাদের সাথে যাচ্ছেতাই করলেও কাপড়ের ভেতর দিয়ে ক্ষুরধার নজরে তাদের গিলে ফেলার চেষ্টাটা অন্তত করে না। সবকিছু জানা আছে নজরে তাকায়ও না কেউ। নাক সিটকায়। মুখ ঘুরিয়ে পালটে নেয় পথ।

চরিত্র হারিয়ে আমার অবস্থা যেন রাতের অন্ধকারে খদ্দের খোঁজা নারীদের… না না! কে জানে, কেমন পরিস্থিতি তাদের এ পথে টেনে এনেছে! না জানি আমি… না না, আপনাদের কাছে কিছু লুকাব না। লুকানো? আমি আরও নিজেকে এই মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে বেড়াচ্ছি, আমার কাছে লুকানোর মতো কিছু এখনো আছে। মিথ্যা সান্ত্বনাকেই সত্য ধরে বলি, কয়েকবারই মন বলেছে, রাতের অন্ধকারে খদ্দের খোঁজা নারীদের মতো আমিও বসে যাই। নষ্টদের নগ্ন ইশারা ও লোলুপ চাহনি থেকে তো বাঁচব। জ্বলেপুড়ে আঙ্গার হয়ে যাওয়া নজরের আঁচ আমাকে আর স্পর্শ করবে না। দেহটা হয়তো চলে যাবে। বেঁচে যাবে মন৷ এখন সে আমার মন নিয়েই খেলছে৷ কিন্তু আমার সাহস আছে। আজনবিদের খেলার পুতুল হতে চাইলে এটা থাকতে হয়। আমি কখনো বোরকাও পড়তে পারিনি। ভয় পেয়েছি, না জানি লোকজন বলে বসে; অমুসলিম হয়েও গায়ে বোরকা জড়িয়েছে—কত বড় সাহস! ভয় পেয়েছি, আরও বেশি করে না আবার আলোচনায় চলে আসি। এটাও ভাবনার বাইরে ছিল না, ওই পাগলটা আবার কি না কি করে বসে। রোজ তো মানুষের চাহনির খোরাক হয়েই চলেছি। আমার খেলামেলা চেহারাই যখন কাউকে নিবৃত করতে পারেনি, আত্মসংবরণের বদলে কামনা জাগিয়েছে তাদের হৃদয়ে; বোরকার আবরণে আর কী আসে যায়! বোরকার জেল্লায় তো একজন সাধারণ নারীও অসাধারণ হয়ে ওঠে। কখনো-বা দুষ্ট পথিকদের হৃদয়ে খোলা মুখের নারী থেকে এরাই হয়ে ওঠে অধিকতর কমনীয়।

যাহোক, মানুষের করা অহর্নিশ বদনামি এখন আর আমাকে তেমন একটা স্পর্শ করে না। মানিয়ে নিয়েছি৷ ভাগ্যই আমার কপালে লিখে রেখেছে। এটা অনিবার্য। কিন্তু যখন ভাবি, আমি কত কী সহ্য করে এসেছি; তখন কষ্ট হয়। এত হিসেব করে, সচকিত হেঁটেও মনে হতো, আমার পা জমিনে নেই৷ দুষ্টুদের নজরে পিছলে পিছলে পথ চলছি। তাদের চাহনির সুতোয় কাপড়ের মতো তৈরি হচ্ছে আমার পথ। একটা সুতো কেটে গেলে অনায়াস জুড়ে যাচ্ছে আরও আরও সুতো। একজন তীক্ষ্ণ নজরে দেখে তো আরেকজন হাসতে হাসতে। কেউ আবার আঙুল উচিয়ে বলে, ওহে…ওহে… দেখেছিস! জানিস কে ও? মাশুকা। গলির ভেতর দরজা খুলে যায়। আচ্ছা, এটাই তাহলে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটাই। কেউ হাসে। কেউ নাক সিটকায়। নারীরা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চেপে রাখে বিস্ময়। কেউ কেউ আবার আমাকে দেখলেই কানে হাত দিয়ে বসে। আমার হাঁটার আওয়াজও যাতে শুনে না ফেলে৷ যেন-বা সদ্যই হজ করে এসেছে। অযথাই নাক ঝাড়ে। দেখ না দেখ করে নির্লজ্জ হাসি দেয়; দৃষ্টিতে উলঙ্গ আহ্বান। জোঁকের মতো ঝুলে যায় ঠোঁট। আতিপাতি করে কামড়ে ধরার জন্য একদলা মাংস খুঁজতে থাকে। বলে রাখা ভালো, এরাই আমাকে ঘৃণা করত। কারণ আর কিছু নয়, প্রতিশোধের নেশায় উন্মাদ কেউ একজন আমার প্রেমে পাগল হওয়ার নাটক মঞ্চস্থ করে বসে আছে। অলিতে-গলিতে আমার নামে তাকবির দিয়ে বেড়ায়। পাগল হওয়ার পরও এতটা সজাগ, সবসময় আমাকে ভালোবাসার কথা বলে।

আমার নাম আইভি। লোকটা পাগল হওয়ার পরও আমাকে ভালোবাসার কথা ভোলেনি। ভোলেনি আমার হাসপাতালে যাওয়ার রাস্তাও। এই পাগল সবখানেই আমার সাথে ছায়ার মতো লেগে থাকে। আমাকে অনুসরণ করে। শহর থেকে শহর, আমার পেছনে ছুটছে তো ছুটছেই। তার এমন সজাগ পাগলামো ও জেদের কারণে আমি পেরেশান হয়ে পড়ি। এ তো সজাগ পাগল। ভালোবাসার কপালে কলঙ্কের টিপ হয়ে আছে যার অস্তিত্ব।

মানুষ মনে করে, আমিই তার পাগলামির কারণ। উফ, এই মানুষগুলো আর তাদের কথায় মনে হয়, তারা ওকে প্রেমকুমার মনে করে। তার অঙ্গ-সঞ্চালনও তাদের কাছে প্রেম। আমানতদারিতার প্রতিচ্ছবি। আর আমার প্রতিটা কথাই দুর্বহ ও অবিশ্বাস‌্য। এরপর তারা নিজেদের উদ্ভুত এই ব্যাখ্যাকে নানাধাপে বিন্যস্ত করে পুলকিত হয়৷ এখান থেকে কিছু কাটছাট করে৷ ওখান থেকে একটু বাড়ায়। একটা শ্রুতিমধুর গল্প ফাঁদার চেষ্টা। এতেই তাদের আনন্দ। তাদের সেই ফাঁদানো গল্প শুনে এখন আমি নিজের আসল গল্প নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়েছি৷ আমার বুঝে আসছে না, আমার গল্পটাই সত্যি নাকি তাদের বানানো গল্পটা। তাদের কল্পিত গল্পগুলোও মানুষ বিশ্বাস করে। প্রত্যেকেই গল্পটাকে এমন করে মালিশ দিয়েছে, তাদের কাছে রেজার ভালোবাসাটা হয়ে উঠেছে মহান। তার পাগলামো, ত্যাগ সবার চোখে চোখে। আমার নীরবতা, দুঃখী চোখ যেন কিছুই না৷ এমন এমন কথাও ছড়ানো হতো, যেন এই তল্লাটে আমার থেকে বদ কেউ নেই৷ হতেই পারে না। এখনো আমি ঠিকঠাক শালীন হয়ে উঠিনি। তাদের ছোট ছোট ব্যাখ্যার দিকে নজর দিইনি। তবে বড়গুলো মনে আছে।

আপনারা রেজাকে চেনেন না। যদি মনে করেন ও পাগল; তবে বোকার স্বর্গে বাস করছেন। সে আসলে পাগল নয়। ছিল না কখনো। আমার সেদিনটির কথা এখনো মনে আছে। আমি প্রথম যেদিন তাকে দেখি। ডি ওয়ার্ডে ডিউটি ছিল আমার। টাইট ডিউটি৷ দশটার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছি। রাউন্ডে ছিলাম৷ আমাকে দেখে ওর চোয়াল ঝুলে যায়। অপলক তাকিয়ে থাকে। যদিও এটা আমার জন্য নতুন নয়। অধিকাংশ রোগীই এটা করে। এই নশ্বর দুনিয়ায় কাউকে দেখে কী অবলীলায়ই না আমরা বেহুশ হয়ে পড়ছি৷ এ তো নজরের নিতান্ত অপচয়। তবে রেজার নজর ছিল আলাদা। কৃত্রিমতার কোনো বালাই নেই৷ ভেতরটা কেমন করে ওঠে আমার। দ্রুত তার টিকিকটা দেখে ওষুধ বানিয়ে নিয়ে আসি। ওষুধ সেবনের সময়টুকুতেও সে আমার থেকে চোখ সরায়নি।

ওর বাম পা ভেঙে গিয়েছিল। খেলার মাঠের কাণ্ড৷ এছাড়া আর কোনো সমস্যা নেই। স্কয়ার চেহারা। তামাটে গায়ের রং। প্রশস্ত কপাল। পুরু চুল; ঈষৎ কোঁকড়ানো। প্রশান্ত চোখ। ভ্রু গভীর। জানি না তাকে দেখে কেন এমন অনুভূতি হতো; যেন একটা সাপ দলা পাকিয়ে পড়ে আছে। ওর ভ্রু-জোড়া একটু ঘন আর এলোমেলো ছিল দেখেই কিনা! রাউন্ড শেষে আমার চেয়ারে এসে বসি। ওর দিকে না তাকিয়েই বুঝতে পারছিলাম, ও তখনো আমাকে দেখছে! এই অনুভবের কারণেই কি না জানি না বা অন্য কিছু হলেও হতে পারে; আমার ভেতরটা ধুকপুক করতে থাকে।

আমি আর থাকতে পারিনি। চোখ তুলে ওকে দেখি। ওর চোখ তখন আমার চেহারায়। আমি চোখ নামিয়ে ফেলি৷ একভাবে বসে থাকি অনেকক্ষণ। যেন-বা বেশ ভারী কোনো কাজ করছি। কতক্ষণই আর এভাবে বসে থাকা যায়। রোগীরা সবাই শুয়ে পড়ে। ঝুপ করেই যেন নীরবতা নেমে আসে৷ আমি ওর বিপরীতে ছিলাম। তবুও ও ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখছিল! আমি আর চুপ করে থাকতে পারিনি!

‘তোমার ঘুম নেই?’ কাছে গিয়ে ওকে জিগ্যেস করি। 

‘কেন?’ ও জবাব দেয়।

‘তোমার তো এখন আরাম প্রয়োজন।’

ও হাসে৷ 

‘কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে তো তোমার সুস্থতায় ব্যঘাত ঘটবে!’

‘সুস্থতা? তোমার অধীনেই তো আছি৷ কতদিন ধরে পুরুষদের মতো পড়ে আছি। কিন্তু এখন…!’

দুয়েকটা দিন রেজা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছি৷ কিন্তু আমি কী করব। সারাটা রাতই ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে! এই অনুভূতির ভেতর আটকা পড়ে আমি কাজের মন হারিয়ে ফেলি। কোনোভাবেই মন বসছিল না। প্রথম প্রথম আমি বাহানা করে পুরো ওয়ার্ডেই ঘুরতাম। কিন্তু এক দুদিন পরই আমার এদিক-সেদিক ছোটা একটু কষ্টকর হয়ে পড়ে। দ্রুত গিয়ে কাজ শেষ করে ফিরে আসতে হতো। কেন জানি না, আমি আমার চেয়ারটা সরিয়ে এমন জায়গায় বসাই, যেন ও আমাকে পুরোপুরি দেখতে পারে। আমরা একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠি। ওর কথা বলার স্টাইলট ছিল আনোখা। অসাধারণ। আড়ষ্টতা নেই। নেই কোনো হেলদুল। ভালোবাসা প্রকাশের কথা ছাড়া আর কোনো কথায় তেমন আকর্ষণ ছিল না। প্রতিটা কথাই আমাকে দিয়ে শেষ করত। জিগ্যেস করি, মিথ্যা কেন বলো? জবাব দেয়, মিথ্যা না বললে তোমার সাথে সম্পর্ক হতো কেমন করে! কিন্তু সেদিন যখন জানতে পারে, আমার ডিউটি পাল্টে যাবে; অন্য ওয়ার্ডে পড়বে। চেহারা লাল হয়ে যায়। ঘণ্টাখানেক এমনই ছিল। অথচ সামান্য একটা বিষয়৷ আমি দুষ্টুমি করে বলি, এটুকুতেই এই অবস্থা! ও হাসে৷ উফ, সেই হাসিটা! প্রেমাতুর সেই হাসি। না জানি আমার কী হলো। মনে চাচ্ছিল নাই হয়ে যাই। এইটুকু মাত্র কথা, ও আবার হাসে।

জানি না কী হলো, এইটুকু বিষয়ের জন্য পেরেশান হয়ে পড়ি। আমি আমার ডিউটি পাল্টিয়ে ফেলি। এটা আমার ভুল ছিল। যদি ডিউটিটা না চেইঞ্জ করতাম; অবস্থা এতটা খারাপ হতো না।

দিনকয়েকের ভেতরই ও আমার সামনে কথোপকথনে আড়ষ্ট হয়ে যায়। ওর স্বভাবই অবশ্য এমন। পরে বুঝেছি। আড়ষ্টতা দূর করা ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ওর কথা বলার স্টাইলেই শ্রোতারা নিরাশ হয়ে পড়ত। ঘোমটা উঠিয়ে দিত ওর প্রতিটা কথা। তবুও এতটা আশা ছিল না, ও আমাকে এত দ্রুত বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসবে৷ আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, নার্সদের ডিউটি কিন্তু রোগীদের ওষুধ খাওয়ানো আর পট্টি চেইঞ্জ করে দেওয়াই নয়। তাদের মানুষিক উন্নতির দিকটাও আমাদের দেখতে হয়। এই দিক থেকে ভাবলে, আমরা কেমন জানি রোগীদের হাতের পুতুল। আমি রেজার মন পাল্টানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আমার কথা এমনও ছিল না, কোনো পড়ন্ত মানুষের জন্য তা সহায়ক কিছু হবে। আমি আসলে তখনো পরিস্কার জানতাম না আমার কথায় কোনো প্রেম আছে কি না! প্রতিটা নার্স তো আসলে রোগীদের ভালোবেসেই সেবা দিতে চায়। এ তো নতুন কিছু নয়৷ জানি না কেন, নার্সদের ভালোবাসাপূর্ণ চাহনিই হয়তো কখনো তাদের জন্য কাল হয়ে যায়। প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ারও উপক্রম হতে পারে কখনো। জানি না কেন, ও তখন দুর্বল আলোর বাতি হয়ে যেত; ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে যে বাতির তেল।

বেডে শুয়ে ও আমাকে টিকটিকির মতো করে দেখছিল। আমি চেয়ারে বসে দেখছিলাম ওর ফাইল। হঠাৎ আমাকে ডাকে। কাছে যেতে বলে। আমি এগিয়ে যাই। ওর বেডে গিয়ে বসি। চেহারা ছিল জ্যোতির্ময়। আমাকে বলে, একটা কথা জিগ্যেস করতে পারি? আমি বলি, হ্যাঁ, অবশ্যই৷ ও আমার হাত নিজের হাতের ভেতর নিয়ে নেয়। পরিস্কার কন্ঠে বলে, আমাকে বিয়ে করবে? আমার ভেতর যেন কী ঘটে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে বলি, বিয়ে? হ্যাঁ, বিয়ে৷ ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যদি আমি না করে দিই, তখন? আমি একটু রহস্যময়তা তৈরির জন্য কথা ঘুরাতে থাকি, তবে কী হবে? ও পেরেশান হয়ে পড়ে। যদি আমার জবাবটা তার স্বপ্ন বা কল্পনাতেও না থাকে, তাহলে না জানি কী হয়! ও গুনগুন করে। আমি হাসি; কী হবে! কী আর হবে, ও আশপাশ দেখে বলে, বাতিগুলো নিভে যাবে, এইতো৷ দরজার বাইরে ইশারা করে—ওই চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়ে নিচে পড়ে যাবে। তারায় তারায় ঘটে যাবে সংঘর্ষ। এই দুনিয়া… অনেক কিছুই হবে আর তুমি! আমি হাসি। হ্যাঁ হ্যাঁ, ওর চেহারায় আলো ছড়িয়ে পড়ে। আমি পাগল হয়ে যাব। মজা কোরো না, প্লিজ। মজা কোরো না। আমি ওর উজ্জ্বল ও সজাগ চেহারা দেখে ঘাবড়ে যাই। এত তাড়াহুড়োর কী আছে! আমাকে ভাবতে দাও। আচ্ছা। তবুও ও বলছিল। যাই হোক, মানা কোরো না৷ নাহলে… ওকে দেখে আমি কেঁপে উঠি। উত্তেজিত হয়ো না মিস্টার রেজা৷ পা ঝুলে পড়বে। পা? যদি আমার এই পা আমাদের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তবে তোমার কসম! আমি এই পা-ই ছিঁড়ে ফেলে দেব!

সেদিন থেকে আমি ওকে ভয় পেতে শুরু করি। তার আগ্রহের প্রাবল্য ভেতর থেকে আমাকে গুটিয়ে দেয়। আমি আর কথা বাড়াই না৷ কথায় কথা বাড়বে। ওর সাহস বেড়ে যায়৷ ওর দৃষ্টি আমাকে অনুভব করছিল। মনে হচ্ছিল, যেন-বা আমার জন্যই ও বেঁচে আছে। স্রেফ আমার জন্য। যেমন ভয় পেত, তেমনই মুশকিল ছিল ওকে সামলানো। আমার নীরবতা দ্বিগুণ করে দিত ওর সাহস। ভয় পাওয়া সত্বেও ওর দিকে এমন নীরব দৃষ্টি রাখতাম; শিকারির গুলির সামনে একটা ভীতু কবুতর যেমন জড়সড় হয়ে নিঃশব্দ বসে থাকে৷ ও আমাকে টিকটিকির মতো করে দেখত।

বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ও আমার বাড়ি চলে আসে। সেদিনই প্রথম আমরা রোগী ও নার্স ক্যারেক্টারের বাইরে গিয়ে আলাপ করি। তবুও সে অটো সাজেশনের মতো করেই নিজেকে রোগী বানিয়ে রাখে। যেন-বা তাকে সারিয়ে তোলাই আমার কাজ। আমি সবসময়ের জন্য তার নার্স হয়ে উঠি। রেজা দুয়েকবারের বেশি আমাদের বাড়িতে আসেনি। এরপর বাধ্য হয়েই আমাকে সত্যটা প্রকাশ করতে হয়। যদিও আমি তাকে প্রস্তুত করার পুরোপুরি চেষ্টা করেছি। ও যেন আমার ফিরিয়ে দেওয়াটা মেনে নেয়। কিন্তু এখন আর এসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে গিয়ে কী হবে?

আমার উপেক্ষার কথা শুনে আহত পাখির মতো নিথর হয়ে যায়। লালিমায় ছেয়ে যায় তার জ্যোতির্ময় মুখ। তারপর হঠাৎ-ই কলহাস্যে ফেটে পড়ে। সে কী ভয়ানক হাসি!

এরপর থেকে হাসপাতালে যাওয়ার পথে দেখতাম, কোথাও না কোথাও দাঁড়িয়ে আছে; হাসছে। তাচ্ছিল্যের হাসি৷ মনে হতো যেন অনেক দূর থেকে দুনিয়াত্যাগী কোনো দুষ্ট আত্মা প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া মিথ্যাকে উড়িয়ে দিয়ে হাসছে। তারপর সেই হাসি আমার হাসপাতালের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়ে আমার ঘরের বাইরেও। একদিন আমি জানালায় গিয়ে দাঁড়াই। গলিতে চোখ পড়তেই দেখি ও দাঁড়িয়ে আছে। বিধ্বস্ত চেহারা। জবা ফুলের মতো চোখ। ওর চেহারাই যেন আস্ত এক উপেক্ষিত প্রেমপত্র। ঘৃণাভরা চোখ। শক্ত চোয়াল। ভেতরটা কেঁপে ওঠে আমার৷ বিদ্যুৎস্পৃশ্য অনুভূতির ভেতর দিয়ে পেছনে চলে আসি। আবার সেই কলহাস্য। আমি গলির দৃশ্যটা ভোলার চেষ্টা করি। ঝাঁপিয়ে পড়ি খাটে।

এরপর থেকে সবখানেই ভাসতে থাকে সেই কলহাস্য। আকাশ-বাতাস মুখর। অবস্থা আরও অবনতির দিকে এগুতে থাকে৷ আমার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আমাকে নাম ধরে ডাকা শুরু করে। একটু পরপরই ভেসে আসে চিৎকার। আবার সেই কলহাস্য। আমার নামের ধ্বনি গলিতে প্রতিধ্বনিত হয়। হাসপাতাল, বাগান, রাস্তা, বাজার, প্রতিধ্বনীর জোয়ারে যেন ডুবে আছে সব। চলতে-ফিরতে মানুষজন আমাকে চোখ ঘুরিয়ে দেখে। হাসাহাসি করে। ফেঁদে বসে গল্পের পর গল্প। চোখে খেলে যায় নগ্ন ইশারা।

পরিস্থিতি আমাকে পাগল বানিয়ে দেয়। আহত পাখির মতো ছটফট করতে থাকি। রাস্তায় চোখ নিচু করে হাঁটি। তাতেও নিস্তার নেই। চাকরি ছেড়ে দিই। বাসা পাল্টে ফেলি। ছেড়ে যাই রেজার শহর৷ কিন্তু ও তো পাগল। ওর হাত থেকে যেন আমার মুক্তি নেই। সবখানেই ও হাজির। আবার ঠিকানা পাল্টাই। ও ঠিকই আমার বাসা খুঁজে নেয়। একদিন দেখি ও আমার দরজায় দাঁড়িয়ে। হাতে ফুল। বিড়বিড়িয়ে সেই ফুলের সাথে কথা বলছে। আবার বাসা পাল্টাই। ছেড়ে আসি শহর। তবু মুক্তি নেই। ঘুরেফিরে সেই একই দৃশ্য। উফ, শহর ছাড়ার ইচ্ছা পরিত্যাগ করি৷ কী লাভ এসব করে!

সেইসব এলোমেলো দিনে মাস্টার জহির আমার সাথে দেখা করতে আসে। প্রথম সাক্ষাৎ। এমনকি এত এত মানুষের ভিড়ে সেই আমাকে সহমর্মিতার চোখে দেখত। বাকি সবাই আমাকে মনে করত ডাইনি। মনে করত, আমিই জাদু দিয়ে রেজাকে পাগল বানিয়ে রেখেছি। আর তারা তাদের এই পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণে আপ্লুত। জানি না মানুষ পাগলদের প্রতি এত সহানুভূতি কেন অনুভব করে। তাদের এলোমেলো প্রতিটা কথাই এই শ্রেণীর কাছে অর্থবহ। তারা সেগুলো থেকে জুতসই কোনো না কোনো ব্যাখ্যা বের করেই ছাড়বে। এটাও জানি না, তারা রেজার মতো ভেকধারী পাগলদের শহিদ বা পয়গম্বর বানাতে এত কেন উদগ্রীব।

আমি বুঝি, লোকেরা একটু আনোখা গল্প শুনতে পছন্দ করে। প্রেম-ভালোবাসা বিষয়ক গল্পের প্লট যে একেবারে ঠুনকো হতে পারে, এটা তাদের বিশ্বাসেই নেই। এজন্য তারা প্রত্যেক সূচনাতেই আলাদা রং ছড়িয়ে দেয়। মুখে মুখে ফিরে আমাদের প্রেমের গল্পে নাজানি কেমন ডালপালা গজিয়েছে। ছিটানো হয়েছে কত রং। জুড়ে দেওয়া হয়েছে কত ব্যাখ্যা। রেজার কুরবানি আমার জুলুম; এই গল্পটা যে এখন কেমন করে দাঁড়িয়েছে! একদিকে এই কল্পিত গল্পের দুনিয়া অপরদিকে আমার বাস্তব গল্পটুকু; আমি আজকাল সন্দেহকেই সঠিক বলে বিশ্বাস করছি৷ মনে হচ্ছে কল্পিত গল্পটাই আসল। আমার স্মৃতির ওপর কেবলই প্রগাঢ় হচ্ছে অবিশ্বাস!

জহিরই আমার জীবনে প্রথম কেউ; আন্তরিকভাবেই যে কি না আমার প্রতি সহমর্মিতা অনুভব করত। ওর মন ছিল পাগল রেজার ওপর বিরাগ। তবুও তার মুখ থেকে কদাচিৎ এমন কথাও বের হয়ে আসত, বুঝতে কষ্ট হতো না, তার মনে আমার প্রতি করা রেজার পাগলামির জুলুম আর বিপরীতে আমার নিষ্পাপ অসহায়ত্বের কাতরতা কতটা গভীর! আমি পেরেশান হয়ে যেতাম। বুকটা এমন করে তড়পাত, যেন-বা বুকের ভেতর দিয়ে কিছু দৌড়ে যাচ্ছে। আঁধার হতে আসত দুচোখ। যেমন কি না জহির আজকে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দুষ্টুমি করে বলেছে, রেজা আসলে পাগলই। তবে দোষটা নিতান্তই তোমার! তোমাকে দেখে তো পাগল না হওয়াটা অসম্ভব! 

‘কেন? আমি কি অবিশ্বস্ত?’

‘না,’ মৃদু শব্দে বলে জহির। ‘তবে তোমার বিশ্বস্ততা নিজের ব্যাপারে উন্মাদ পর্যায়ের।’

জহির হাসতে থাকে। কিন্তু কথাটা আমার মনে বসে যায়; পাথরের লাকড়ি হয়ে জ্বলতে থাকে। আমি খুব বেশি সজাগ অনুভূতিসম্পন্ন নারী। কথারা আমার খুব ভেতরে ঢুকে আমাকে আরও বেশি দুখের গভীরে ঠেলে দেয়। আমি কখনো এমনও অনুভব করে উঠি; যেন-বা আমি নেশায় আচ্ছন্ন। অনুভূতিরা তখন মরে যায়। কোনো কাজ করে না। হ্যাঁ, জহির ব্যাপারটা জানত। খুব ভালো করেই জানত। নয়তো সে দুষ্টুমি করে হলেও এমন স্পর্ষকাতর বিষয়ে এভাবে খোলাসা করে বলত না।

প্রায়সময় সে বসে থেকেই চিৎকার করে উঠত, আহ! তারপর নিজেকে নিজেই ফিসফিসিয়ে বলত, তুমি যদি আমার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করো, আমার কষ্ট হবে। হাসির চেষ্টা করে বলি, তো? জানলার দাঁড়ানো কোনো প্রেয়সির জন্য আমিও যদি ফুল নিয়ে তার দৃষ্টিসীমায় বসে যেতে পারতাম! মিস্টার জহির! আমি রাগে চিৎকার করে উঠি। সে নিরুত্তাপ। নির্বিকার। আপন মনে বলে যেতে থাকে। রাগে গজরাতে গজরাতে বলে উঠি, ব্যস! একজন হয়ে বসে আছে! আরেকজন পথে! ভিজে আসে আমার চোখ। কারণ আমি জহিরকে ভালোবাসি। কিন্তু সে আমাকে ভুল বোঝে। হায় মুহাব্বত! এই ভালোবাসায় দায়ে কতকিছুই না সহ্য করতে হয়! একদিন সে বলে, আমাকে নাকি সে ভালোবাসে না। আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যায়। আমি জিগ্যেস করি, কেন? হয়তো আমি এটা ভেবে গর্বিত হতে চাই যে আমি তোমার প্রেমিক ছিলাম। আচ্ছা! আমি কষ্টের হাসি হেসে খানিক ঝাঁঝ মিশিয়ে বলি, মনে রাখবেন, গর্বমাত্রই অনিবার্য পতন। ছাড়িয়ে ওঠা সবকিছুকেই একদিন ঝুঁকে যায়। জহির হাসে, বলে, রেজা পাগল হয়ে ভালোই করেছে। তোমার মেহেরবানি ও অন্তর্মুখিতার জন্য যদি দু-দুটো মানুষ পাগল হয়ে যায়, তবে কার কী দায়! তবে তুমিও ভালোর পথটাই বেছে নাও; আমি রেগে যাই!

হায়, সে যদি বলত : তোমাকে গর্বিত করতেই নিজেকে কুরবান করলাম!

আহ, জহিরের সেই কথাগুলো! কিন্তু সেই কথা সত্বেও অথবা সেই কথার কারণে আমি তার দিকে আরও ঝুঁকে পড়ি। আমার মনে হতো, ওর একটা অংশ আমাকে ঘৃণা করে। ভয় পায়। আমার থেকে বাঁচতে চেষ্টা করে। জানি না কেন আমাকে জাদুর মতো জেঁকে ধরেছে এন্তার চিন্তা। আমি বেরোতে পারছি না৷ ওকে চিন্তামুক্ত দেখে রাগে গা রি রি করে আমার। উন্মাদ হয়ে যাই৷ প্রকাশ করি না। জাদুগ্রস্থের মতো বসে থাকি। মনে হতে থাকে, আমি আমার থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি। কিছুই বুঝে আসত না। কিন্তু জহিরকে আমি তখনো উন্মাদের মতোই ভালোবাসি। দিন দিন পাগল হতে চলেছি। তবুও লোকেরা মনে করে, প্রেমিককে পাগল করাই আমার কাজ৷ এটাই নাকি আমার আনন্দ। হায় লোকেরা!

শেষে চলে আসে সেই দিন। আহা সেই দিন। আমার ওপর যেন কেয়ামত নেমে আসে। আমার একটু একটু পাগলামি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে; ছড়িয়ে যায়।

আমি হাসপাতাল থেকে ফিরছিলাম। নিয়মমতো সেই পাগল হাজির। আমার থেকে দশ পনেরো হাত দূরত্ব রেখে হাঁটছিল। হাতে ফুল। ফুলের সাথে কত কী কথা! সবসময় সে আমার পেছন পেছনই হাঁটে। যখন আমি হাসপাতাল বা ঘরে ঢুকে পড়ি। রাস্তার পাড়ে বসে থাকে। লোকেজন তাকে দেখলেই বুঝে নিত, আমি আশপাশে কোথাও না কোথাও আছি। ইতিউতি খুঁজে ফিরত। চকচক করে উঠত চোখ। গল্পের কারুকাজ তো চলছেই। সাথে আঙুলের ইশারা। এতটা ত্রস্তপদে, সতর্ক হয়ে চলার পরও খামোখাই মনে হতো, বাজারের গলিরাও যেন আমার সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে!

এমনও মনে হতো, যেন-বা আমি আসমান ও জমিনের মধ্যকার বিশালতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। ভুউউ…ভুউউ…!! বাজারে একটা চিৎকার উচ্চকিত হয়। কিছুক্ষণ পর আবার! আমি প্রথমবারের মতো ঘুরে দেখি, রাস্তার মাঝে ও চিৎ হয়ে পড়ে আছে। বামপাশ হয়ে পড়ে আছে দেহটা৷ নিথর৷ পাশেই পড়ে আছে ফুল। আর ফুলের মতোই নেতিয়ে আছে পাগলটা। ভাবটা এমন, কেউ এসে উঠতে সাহায্য করলেই উঠে বসবে। ওর বাহু উঠতে উন্মুখ৷ চিৎকার করছিল। আহ সে দৃশ্য! হেলে পড়েছিল ঠোঁট৷ চোখ ছিল পড়ে থাকা ফুলের দিকে; দেখছিল। কেউ একজন ফুল উঠিতে হাতে এনে দেয়। কৃতজ্ঞতায় আরও একবার ভিজে ওঠে ওর চোখ। আমি তখনো দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, পেরেশান। চাচ্ছিলাম, চিৎকার করে পালিয়ে যাই। কিন্তু পা জমে গিয়েছিল। যখন ওকে লোকজন হাসপাতালে নিয়ে যেতে থাকে, আমার পায়ের স্থিরতা কেটে যায়। আমি বাড়ির দিকে ছুটি। চতুর্দিকে সে কী হাঙ্গামা। লোকজন একে অপরের সাথে কথা বলছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেদিন কেন জানি না আমার এমন অনুভূতি হয়েছিল, আমি যেমন পেরেশানির ভেতর দিয়ে চলাফেরা করছি; এ যেন প্রশস্ত দুনিয়ায় বুকে সামান্য একটা কিটের সতর্ক সঞ্চালন।

খবর পাই ও মারা গেছে৷ চরম ধাক্কা খাই। আমার পৃথিবীটা দুলে ওঠে। আমি নিজেও অনেক দোয়া করেছি, যেন ও মারা যায়। আমি মুক্তি পাই। আমার কপাল থেকে মুছে যাক বদনামির মেঘ। আমি মনে করতাম, ও মরে গেলে বোধহয় আমার ভালো লাগবে। আমি মুক্ত হয়ে যাব৷ পৃথিবীটা আমার কাছে এতটা প্রশস্ত হয়ে উঠবে, যেমন কি না বিগত সময়ে ছিল। কিন্তু বাস্তবতা সবসময় মানুষের ভাবনাকে জিতিয়ে দেয় না। ওর মৃত্যুতে কষ্ট না পাওয়ার চিন্তাটা ভুল ছিল। খুশিও হতে পারছিলাম না। মনে চাচ্ছিল, নাই হয়ে যাই। চারপাশের ছোটখাটো বিষয়গুলো ফুলেফেপে কলাগাছ হয়ে যায়। ও আমার অজান্তে আমাকে এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, মনে হচ্ছিল ওর সাথে আমাট মনকেও দাফন করে ফেলা হয়েছে!

সেদিন সন্ধ্যায় জহির আসে। জানি না ও কেন এত চিন্তিত ছিল। আমাকে বলে, আমি চাই… আমি চাই দ্রুতই আমাদের বিয়েটা হয়ে যাক। জানি না কেন, আমার মনে হতে থাকে; ও আমার সাথে মজা করছে। কেবলই আমাকে কষ্ট দেওয়া। আমি বলে, যদি এটা নাহয়? ওর চেহারা রাগেই না কি কারণে জানি না ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আহ, সেই চেহারা! মনে হচ্ছিল, যেন-বা রেজাই পুনরুজ্জীবন লাভ করেছে। তুমি কি চাও, আমিও রেজার মতো পাগল হয়ে যাই; চিৎকার করে ওঠে জহির! আমার ভেতর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে একটা বুনো উল্লাস। আমি হাসি। পাগলাটে হাসি৷ তার চেহারা আরও পাল্টে যায়। আমি উঠে দাঁড়াই। দরজার বাইরে আমার চোখ। ও দ্বিগুণ জোরে চিৎকার জুড়ে দেয়। লোকজনও কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, সত্যি সত্যিই আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি৷ পাগলী। আমি কি জহিরের জীবন শেষ করে দেব? না না। এটা হতে পারে না। আমি চিৎকার করে উঠি, এমনটা কখনো হতে পারে না। আমি আরও খেয়াল করি, আমি আমার খুশিকে জহিরের জন্য কুরবান করছি! ও দাঁড়িয়ে ছিল। চোখের উজ্জ্বলতা কিছুটা হারিয়ে গেছে। মুখ শুকনো। হতাশ চেহারা। হ্যাঁ, এগুলো ছিল আমার চোখের ধোঁকা। খেয়াল করি, আমার আত্মারই একটা অংশ তড়পাতে তড়পাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। তবে এটুকু ভেবে প্রশান্তু ছিলাম, আমি আমার প্রেমিককে পাগল হওয়া থেকে বাঁচিয়েছি। নিজেকে নিয়ে কোনো চিন্তা ছিল না আমার। আমি আর কে! আমাকে নিয়ে ভেবে কী হবে! নিজেকে প্রেমিকের জন্য কুরবান করে দেওয়াটা কি ভালোবাসার চূড়ান্ত নয়?

হ্যাঁ, আমি পাগল। জহিরকে ভালোবাসাই ছিল আমার পাগলামি। ভালোবাসা যে পাগলামি ছাড়া কিছু নয়, এ আমার জানা হয়ে গেছে। সঙ্গীকে পাগল বানিয়ে দাও বা নিজে পাগল হয়ে যাও। ব্যস। ইশ, আমি যদি পাগল না হতাম। পস্তিয়েই খেসারত দিচ্ছি। গড়িয়ে গেছে সময়। এখন আর ভেবে কী হবে!

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *