সূর্যের সিঁড়ি (প্রথম পর্ব)

উম্মে হাসান মারা গেলেন। চিরদিনের জন্য মিলিয়ে গেলেন অন্তহীন ধূসর কুয়াশায়।

মানুষজন তাদের প্রাগৈতিহাসিক গুহার মতো ঘরগুলো ছেড়ে দলে দলে বেরিয়ে আসতে লাগল। ছোটাছুটি হুল্লোড়ে গমগম করতে শুরু করল ক্যাম্পের অলিগলি। কারও কারও পায়ে পা বেঁধে হুমড়ি খেয়ে পড়ার দশা। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে কোনোমতে চোখের জল মুছতে মুছতে ফের রুদ্ধশ্বাস দৌড়।

মাহমুদ আল-কাসেমির স্ত্রী উম্মে হাসান নাবিলা আজ মারা গেছেন। উম্মে হাসান, আমাদের সবার মা। মা বলেই আমরা তাকে ডাকতাম। শাতিলা ক্যাম্পের এই ধূসর ধুলোয় জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশু মাতৃজঠর থেকে খসে প্রথম তার হাতেই পড়েছিল। আমিও তার ব্যতিক্রম নই, আর আজ সবার মতো আমিও তার মৃত্যুতে দৌড়াচ্ছি।

গ্যালিলির কুওয়াইকাত গ্রাম থেকে আসা এই নারী হয়ে উঠেছিলেন শাতিলা ক্যাম্পের একমাত্র ধাত্রী, যেন এখানের একক ধাত্রীর শিরোপা বাগাতেই তিনি এসেছিলেন।

এক আশ্চর্য নারী তিনি! কোনো বয়স ছিল না তার, সময়ের চোরাবালুতে আটকে গিয়েছিল বয়সের চাকা। কোনো সন্তানও ছিল না। আমি তাকে চিরকাল এক বৃদ্ধ রূপেই দেখেছি—কুঁজো হয়ে যাওয়া দুটি কাঁধ, অজস্র বলিরেখায় ভরা একখানা মুখ, সাদা চৌকোনা অবয়বের ভেতর জ্বলজ্বল করতে থাকা বড় দুটি চোখ, কাশফুলের মতো ফুলে ওঠা সাদা চুলগুলো সবসময় এক সাদা শালে ঢাকা। 

কুনাফা বিক্রেতা করিম আল-জাশির স্ত্রী সানা, উম্মে হাসান নাবিলার প্রতিবেশী। পাশাপাশি ঘর। 

সানা বলল, গত রাতে নাকি তার কাছে এসেছিলেন উম্মে হাসান। শান্ত গলায় বলেছিলেন, ‘মৃত্যু আসছে। আমি মৃত্যুর আওয়াজ শুনেছি। মরণ এসে কানে কানে ফিসফিস করে কথা বলছে। মৃত্যুর গলা বড় নিচু; শব্দহীন।’

নিজের আধা-বেদুইন উচ্চারণে সানাকে শোনালেন মৃত্যুর সেই কানাকানি—‘সকালবেলা হঠাৎ করেই কানে এলো একটা গায়েবি আওয়াজ। বলল—প্রস্তুত হও!’

সানাকে এই খবর দিয়েই শুধু ক্ষান্ত হননি উম্মে হাসান। মারা যাওয়ার পর কীভাবে তাকে কাফনের কাপড় পরাতে হবে, তাও বলে দিলেন।

সানা বলল, উম্মে হাসান এসে হাত ধরে আমাকে তার ঘরে টেনে নিয়ে গেলেন। পুরোনো বাদামি কাঠের আলমারি খুলে দেখালেন ধবধবে সাদা সিল্কের এক কাফন। বললেন, ঘুমানোর আগে তিনি ভালোমতো গোসল সেরে নেবেন—‘আমি গোসল করে ঘুমাব, মরার সময় যেন শরীরটা পাক-পবিত্র থাকে। আমি পবিত্র হয়ে মরতে চাই। আর শোনো, আমার শেষ গোসলটা কিন্তু তুমিই দেবে, অন্য কেউ না।’

উম্মে হাসান মারা গেলেন।

সবাই জানত, ১৯৯৫ সালের ২০ নভেম্বরের এই সোমবার সকালটা হবে ফাতিমা-তনয়া উম্মে হাসান নাবিলার মৃত্যুর নির্ধারিত সময়। 

তাই ঘুম থেকে উঠে সবাই তার মৃত্যুর অপেক্ষা করতে লাগল। তবে কারোরই সাহস হলো না ঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে মৃত্যুর বিষয়টা নিশ্চিত হওয়ার। উম্মে হাসান সবাইকে জানিয়ে রেখেছিলেন আর সবাই তাকে বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করেছিল।

কেবল আমিই থ বনে গিয়েছিলাম।

রাত এগারোটা নাগাদ আমি আপনার সাথেই ছিলাম। এগারোটার পর ক্লান্ত অবসন্ন শরীর টেনে ঘরে গিয়ে বিছানায় পিঠ ছোঁয়াতেই মড়ার মতো ঘুম। ক্যাম্পের পেকে ওঠা রাত তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এত রাত করে ঘরে ফেরায় সন্ধ্যার খবরটা আমাকে দেওয়ার মতো কেউ রইল না। রাতের কালো সমুদ্রে ঘুমিয়ে সবাই কাদা।

আমি ছাড়া বাকি সবাই জানত।

উম্মে হাসানকে অবিশ্বাস করার মতো কেউ এ তল্লাটে ছিল না। তিনি কখনো সত্য ছাড়া কিছু বলতেন না। ১৯৬৭ সালের ৫ জুনের সেই সকালটির কথা কি ভোলা যায় কখনো? 

সেদিন একমাত্র উম্মে হাসানই দুচোখ ভরে কেঁদেছিলেন। মানুষ যখন ফিলিস্তিনে ফেরার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আনন্দে রাস্তায় নাচছিল, উম্মে হাসান তখন কেঁদেছিলেন। যার সঙ্গেই তার দেখা হয়েছে, বলেছেন, আজ তিনি শোকের পোশাক পরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এ দেখে সবাই হেসেছিল। বলেছিল—‘আরে, পাগল নাকি?’

যুদ্ধের সেই দীর্ঘ ছয়দিন বদ্ধ জানালার কপাট খোলেননি উম্মে হাসান। সপ্তম দিনে বেরিয়ে এলেন মানুষের চোখের জল মুছিয়ে দিতে। লোকজন সবাই কাঁদো-কাঁদো, নিরাশা-কাতর। উম্মে হাসান ব্যথাতুর অথচ গভীর নির্বিকার কণ্ঠে বললেন, তিনি জানতেন। বললেন—‘আমরা সবাই মরে সাফ না হওয়া পর্যন্ত ফিরবে না ফিলিস্তিন।’

দীর্ঘ জীবনে উম্মে হাসান একে একে কবর দিয়েছেন চার সন্তান। গায়ের সাথে সেঁটে যাওয়া চটচটে রক্তাক্ত জামাকাপড়ে একে একে তারা ফিরে এসেছিল কাঠের চেরা তক্তায়। তার আপন বলতে ছিল শুধু নাজি নামের এক ছেলে। অন্য কেউ নেই। নাজি এখন আমেরিকায় থাকে। নাজি অবশ্য তার পেটের সন্তান নয়, তবু তার সন্তানই সে। 

কাবরি-তারশিহা রোডের এক জলপাই গাছের নিচে তাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন উম্মে হাসান। নিজের শুকিয়ে যাওয়া স্তন থেকে তাকে দুধ পান করিয়েছিলেন। তারপর লেবাননের কানা গ্রামে বসবাসরত তার প্রকৃত মায়ের কোলে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

আজ উম্মে হাসান মারা গেছেন।

অথচ কারোরই তার ঘরে ঢোকার সাহস হলো না। দরজার সামনে এসে ভিড় করে অপেক্ষা করতে লাগল জনা বিশেক মহিলা। শেষে এলো সানা। কড়া নাড়ল, কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। তখন সজোরে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল দরজা। সানা হন্তদন্ত হয়ে উম্মে হাসানের শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকল। 

উম্মে হাসান তখন শুয়ে। সাদা রুমালে ঢাকা মুখ ও মাথা। সানা এগিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রাখতেই উম্মে হাসানের বরফশীতল শরীরের হিমায়িত স্রোত যেন সাপের মতো হিড়হিড় করে ছড়িয়ে গেল সানার সমস্ত হাতের তালুর ভেতর। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল সানা। বাইরে থেকে মহিলারা এসে ঘরে ঢুকল পড়িমরি। শুরু হলো ভারী মাতম। মানুষেরা বিভিন্ন দিক থেকে ছোটাছুটি করে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগল। 

সবার সঙ্গে আমারও দৌড়ে ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছে করছিল। খুব মনে হচ্ছিল, দেখি কেমন করে উম্মে হাসান ছোট্ট ঘরের বিছানায় জলপাইয়ের ম ম গন্ধের ভেতর শায়িত আছেন চিরনিদ্রায়।  

কিন্তু আমি একটুও কাঁদিনি। 

গত তিন মাস ধরে আমার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়াই কাজ করছে না। স্পন্দনহীন অসাড় এক কাষ্ঠখণ্ডে পরিণত হয়েছে আমার হৃদয়। গ্যালিলি হাসপাতালের বেডে কোনোমতে জান নিয়ে লটকে থাকা এই মানুষটাই শুধু আমাকে অনুভব করায় বস্তুজগতের কম্পন ও উপস্থিতি। এই হাসপাতালেই আমি ডাক্তার হিসেবে কাজ করি, বরং বলা ভালো, ডাক্তারির ভান করি মাত্র।

গ্যালিলি হাসপাতালের এই কেবিনে গত তিনমাস ধরে এই লোকটি ভাবলেশহীন পড়ে আছে। আমি তার পাশে বসে থাকি আর আনমনে ভাবার চেষ্টা করি—সে কি মারা গেছে, নাকি বেঁচে আছে এখনো? আমি জানি না, আমি তাকে সাহায্য করছি, নাকি ক্রমে ক্রমে দিয়ে চলেছি যন্ত্রণা? তার প্রতি আমার মনে আসলেই কোনো দরদ আছে, নাকি ঘৃণা করি তাকে? পাশে বসে আমি কি তাকে গল্প শোনাচ্ছি, নাকি শুনছি তারই গল্প? 

এই কেবিনেই আমি পড়ে আছি গত তিনমাস যাবৎ। 

আজ উম্মে হাসান মারা গেছেন। আমি চাই খবরটা এই মানুষটা জানুক, সেও আমার সঙ্গে উম্মে হাসানের জানাজায় এসে শরিক হোক, কিন্তু সে কিছু শুনতেও পায় না, ওঠেও না, নড়েও না।

লোকে বলাবলি করে, সে নাকি কোমায় চলে গেছে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে আজ তার এই স্থায়ী অচলাবস্থা। লোকটা আমার সামনে দিনের পর দিন এভাবে নির্বিকার পড়ে থাকছে, আমি বুঝতেও পারছি না আমার কী করা উচিত। আমি শুধু চেষ্টা করে যাচ্ছি যেন অন্তত জ্যান্ত পচে-গলে না যায় সে। কারণ আমি নিশ্চিত, সে ঘুমের মধ্যে রয়েছে, এখনো মরেনি।

কিন্তু দুইয়ের মধ্যে তফাতটা আসলে কোথায়? 

উম্মে হাসান যে বলেছিলেন, ঘুমন্ত মানুষ আর মৃত মানুষ একই কথা, কথাটা কি সত্যি? ঘুমের সময় শরীর ছেড়ে চলে যায় রুহ, শরীর যখন জাগে, রুহ আবার ফিরে আসে। মৃত মানুষের রুহও চলে যায়, কিন্তু তার রুহটা আর ফেরে না। 

এই ইউনুস ইবনে ইবরাহিম ইবনে সুলাইমান আল-আসাদির রুহ তাহলে এখন কোথায়? তার দেহ ছেড়ে দূরে কোথাও পাড়ি জমিয়েছে, নাকি হাসপাতালের এই কেবিনের ছাদের নিচেই আমাদের মাথার ওপর দিয়ে চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে? তার রুহ কি এখন আমাকে এখান থেকে উঠে যেতে বারণ করছে, কারণ লোকটা এখন অতল অন্ধকারে শুয়ে এবং নির্জনতাকে খুব ভয় পায় সে? 

আমি ঠিক জানি না। 

উম্মে হাসান প্রথমবার তাকে দেখতে এসে বলেছিলেন—‘ইউনুস খুব যন্ত্রণা পোহাচ্ছে। মানুষ মরলে বরজখে (বস্তুজগতের অন্তরালে) চলে যায়। ইউনুসও এখন বরজখেই রয়েছে, কিন্তু মৃতদের জগৎ থেকে এ সম্পূর্ণ ভিন্ন। জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি এক অদ্ভুত জগতে সে আটকে আছে। আমরা কেউই সেখানে পৌঁছাতে পারছি না।’

উম্মে হাসানকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখন আমি কী করতে পারি?’

তিনি উত্তর দিলেন, ‘ইউনুস যা বলে তাই করো!’ 

‘কিন্তু সে তো কথাই বলে না।’ 

‘অবশ্যই বলে। তোমাকে মন দিয়ে শুনতে হবে তার কথা।’ 

কিন্তু আমি কিছুই শুনতে পাই না। আল্লাহর কসম, কিচ্ছু না। তবু সারাক্ষণ এই চেয়ারটাতে পেরেকের মতো গেঁথে বসে থাকি আর অবিরাম বকবক করে যাই। 

আচ্ছা, আপনিই বলেন না, আমার এখন কী করা উচিত! আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? 

আমি এখন আপনার পাশে বসে আছি। ওদিকে আপনার কেবিনের জানালা দিয়ে ওপাশ থেকে ভেসে আসছে মানুষের কান্নার শব্দ। তা-ই শুনছি। আপনি কি শুনছেন না? সবাই তো কাঁদছে, আপনি কেন কাঁদছেন না?

আমরা তো কান্নার একটা উপযুক্ত উপলক্ষ্যই খুঁজছিলাম এতদিন। আমাদের চোখের ভেতর জমাট বেঁধে গিয়েছিল অশ্রুর দানা। আজ উম্মে হাসান ভেঙে দিয়েছেন সেই অশ্রুর গোপন বাঁধ। আপনি উঠছেন না কেন? উঠে সবার সঙ্গে কেন কাঁদছেন না?

এই যে, শুনছেন? 

আপনাকে কীভাবে কী বলব, বলুন তো? আমি আপনার সঙ্গে আবোলতাবোল বকে যাব টানা? নাকি আপনার গল্পই বলব আপনাকে? 

আমি কি এখন আপনার সেই চেনাজানা গল্পগুলোই শোনাব, নাকি চুপ থেকে আপনাকে যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই যেতে দেব? 

আমি এসে অতি সন্তর্পণে আপনার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছি, আপনার ঘুমটা না ভেঙে যায়, বেড়ালের মতো আঙুলের মাথায় ভর দিয়ে খুব সাবধানে হাঁটছি, পরক্ষণেই নিজের এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখে নিজেরই বড্ড হাসি পাচ্ছে। হা হা, আপনার ঘুমটা ভেঙে যাবে ভয়ে অবচেতনে এতটা সাবধানি পায়ে হাঁটছি, অথচ এই দুনিয়ায় আমার এখন একটাই চাওয়া—আপনার ঘুমটা একবার ভাঙুক, আর কিছু চাই না। 

কবে ভাঙবে আপনার ঘুম? হে আল্লাহ, আর তো কিছু দরকার নাই আমার, শুধু একটা জিনিসই চাই—এই লোকটা একবার জাগুক, একটু চোখ মেলুক এবং উচ্চারণ করুক অন্তত একটি শব্দ। দু-চোখ বন্ধ করে সে এখন গভীর ঘুমের সমুদ্রে ভাসছে।

কিন্তু আমি তো মিথ্যা বলছি। 

আপনি কি জানেন, আপনি আমাকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে ফেলেছেন? আমি বলছি আমার শুধু একটাই চাওয়া, অথচ আমার চাওয়া তো অনেক। আসলে আমার অজস্র চাওয়া। আমি এই আশায় মিথ্যা বলি, হয়তো আল্লাহ পাক আমার, আপনার এবং আপনার অভাগী মায়ের প্রতি করুণা করবেন। 

সত্যি বলতে, আমরা আপনার মায়ের কথা বেমালুম ভুলে গেছি। আপনি আমাকে দুনিয়ার সব গল্প শুনিয়েছেন, কিন্তু কোনোদিন বলেননি আপনার মা কীভাবে মারা গেলেন। আপনার অন্ধ বাবার মৃত্যুর কথা বলেছেন, বর্ডার পার হয়ে কীভাবে আপনি গোপনে গ্যালিলিতে গিয়েছিলেন, দেইর আল-আসাদ গ্রামের পাশের উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে শরিক হয়েছিলেন বাবার জানাজায়৷ আপনি সব দেখছিলেন, কিন্তু আপনাকে দেখেনি কেউ। আপনি সেখানে মুখ বুঁজে একলা বসে কাঁদছিলেন, আপনার কান্না দেখে কেউ এগিয়ে এসে হাউমাউ করে কেঁদে উঠবে নিজেও, সেই অবস্থা ছিল না।

সেদিন আপনার কথা আমি বিশ্বাস করেছিলাম। এও বিশ্বাস করেছিলাম, আপনার সিক্সথ সেন্স আপনাকে বাবার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে ঠিক ঠিক আপনার বাড়ির আঙিনায় পৌঁছে দিয়েছিল। 

এখন আর সেই বিশ্বাস নেই। সেদিন আমি আপনার গল্পের জাদুতে মোহাবিষ্ট ছিলাম, সেই ঘোর আজ কেটে গেছে। এখন আর বিশ্বাস হয় না।

কিন্তু আপনার মা? তাঁর মৃত্যু নিয়ে কেন একটি শব্দও কখনো উচ্চারণ করেননি? আপনার মা কি মারা গেছেন? 

কুমারী মেরির (মারইয়াম বিনতে ইমরান আ.) সেই চিত্রটির গল্প কি আপনার মনে আছে? 

লেবাননে তখন সিভিল ওয়ার চলছে। আমরা সবাই জর্জরিত। আপনি আমাকে বলতেন—‘যুদ্ধের প্রকৃতি এমন বিশৃঙ্খল ও নীতিহীন হওয়া উচিত না। ভাইয়ে-ভাইয়ে সংঘাত নয়, বরং যুদ্ধের একটি মহৎ উদ্দেশ্য ও নৈতিক ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। যুদ্ধ কখনোই এমন হতে পারে না।’

এমনকি আমি যখন বেইজিং থেকে ডাক্তার হয়ে ফিরলাম, আপনি আমাকে যুদ্ধে জড়াতে বারণ করলেন, আপনার সঙ্গে যেতে বললেন ফিলিস্তিন। ‘কিন্তু জনাব ইউনুস, আপনি তো যুদ্ধের জন্য যাচ্ছেন না, আপনি যাচ্ছেন আপনার রমণীর টানে।’

আপনি আমাকে যুদ্ধের অর্থ নিয়ে এক দীর্ঘ ভাষণই শুনিয়ে দিলেন। তারপর বললেন আপনাদের বাড়িতে থাকা মেরির ছবিটির কথা। সেদিন আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনার মা খ্রিস্টান কি-না। আইন আল-যাইতুন গ্রামের একজন মুসলিম শেখের পক্ষে কী করে একজন খ্রিস্টান নারী বিয়ে করা সম্ভব?

আপনি বললেন—না, উনি খ্রিস্টান না। উনি মেরিকে ভালোবাসতেন, তাঁর ছবিটি নিজের বালিশের নিচে রাখতেন, আপনাকেও মেরিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন। কারণ মেরি বিশ্বের নারীকুলের নেত্রী এবং তাঁর ছবিটি বড় সুন্দর, মায়াময়। ছবিতে একজন নারী মাথা নিচু করে নিজের সেই সন্তানের দিকে চেয়ে আছেন, যে কি-না জন্মেই কাফনের কাপড়ে মোড়ানো। 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর আপনার বাবা? উনি কিছু বলতেন না, নাকি?’ 

সেদিনই আপনি বললেন, আপনার বাবা ছিলেন অন্ধ। ওই ছবি তিনি কোনোদিন দেখেননি।

নুহাইলা আপনার মায়ের মৃত্যুর কথা কবে জানিয়েছিল? বলছেন না কেন? 

আপনার স্ত্রী জানিয়েছিল, আপনার মা নাকি অসিয়ত করে গেছিলেন, ছবিটা যেন মৃত্যুর সময় কবরে তাঁর সঙ্গেই দেওয়া হয়। তাঁর এই অন্তিম ইচ্ছা নিয়ে গ্রামে নাকি বেধেছিল তুমুল হট্টগোল। এজন্যই কি আমাকে বলছেন না?

উত্তর দিচ্ছেন না যে! এমন করে ঘুমাচ্ছেন কেন আপনি?

আপনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। অতল ঘুমের মধ্যেও আপনি ঘুমাচ্ছেন। ডাক্তার বলেছে ব্রেইন হ্যামারেজ। ক্লিনিক্যালি ডেড। আর কোনো আশা নেই। 

আমি ডাক্তারকে মৃদু ধমকের স্বরে বলেছি—‘কী সব আবোলতাবোল বকছেন? চুপ করুন! যান এখান থেকে!’

বলেছি—‘না, এ হতে পারে না।’

আমি চোখের সামনে আপনাকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখছি, অথচ কিছুই করতে পারছি না। আমি নিরুপায়।

আমি আপনার সাথে কথা বলে যাচ্ছি, আপনাকে গল্প শোনাচ্ছি। অপেক্ষা করুন, সবই বলব। 

আচ্ছা কেমন হয়, আমি যদি এখন চা বানিয়ে আনি, তারপর আপনার বাড়ির আঙিনায় পাতা সেই নিচু চেয়ারগুলোতে বসে পুরোনো দিনের মতো একসঙ্গে গল্পে মেতে উঠি? 

আমি ধুমপান করতাম না বলে কী হাসিটাই না হাসতেন আপনি! ওদিকে আপনি যে কীভাবে সিগারেট খেতেন! অত্যন্ত সুচারুভাবে সিগারেট টেনে একেবারে শেষপর্যন্ত নিয়ে যেতেন, এরপর ঠোঁটের ফাঁকে থেকে যাওয়া সিগারেটের ফিল্টারটাও চিবুতে চিবুতে শুষে নিতেন অবশিষ্ট সবটুকু ধোঁয়া।

অথচ এখন দেখুন, আপনার কেবিনের দরজা বন্ধ করে আপনার পাশে এসে বসে সিগারেট ধরাচ্ছি, তারপর ঠিক আপনার মতোই গভীর টানে গোড়া পর্যন্ত শুষে নিচ্ছি ধোঁয়া, আর আপনাকে শোনাচ্ছি গল্প, কিন্তু আপনি কোনো সাড়াশব্দ করছেন না।

কেন আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না? 

চা জুড়িয়ে শরবত হয়ে গেল। আমিও গেছি ক্লান্ত হয়ে, এদিকে আপনি গভীর ঘুমে সমাহিত। ত্রিভুবন ধ্বংস হয়ে গেলেও যেন আপনার কিছুই যায়-আসে না।

প্লিজ, ওদের কথা বিশ্বাস করবেন না!

মনে আছে, একদিন খুব মন খারাপ করে আপনি আমার কাছে এসেছিলেন? বললেন, লোকে নাকি আপনাকে নিয়ে বিরক্ত। আপনার ফর্সা গোলগাল মুখটা কেমন চুপসে ছিল তখন। আমি আপনার সেই ফর্সা চেহারা থেকে সরাতে পারিনি বিষাদের কালো ছায়া।

আচ্ছা, আমি কী বলতাম তখন? আমি কি বলতাম, আপনার সময় ফুরিয়ে গেছে, নাকি আসেইনি এখনো? এতে আপনি আরো কষ্ট পেতেন। অস্বস্তি বোধ করতেন। 

আমি তো আপনার সাথে মিথ্যা বলতে পারতাম না। আমি নিজেও দুঃখী। দুঃখ আমার হৃদয়ে তৈরি করেছে বিশাল এক গহ্বর; কোনো কিছু দিয়েই যা পূরণ করা সম্ভব না। সেখানে অবিরাম হুহু করে আসা-যাওয়া করে বেদনার বেয়াড়া বাতাস। তবু আমি চাই না, আপনি মারা যান।

আচ্ছা, আপনি আমাকে ডাহা মিথ্যা বলেছিলেন কেন? মনে করে দেখুন, যেদিন নুহাইলা মারা গেল, লোকজন সব সমবেদনা জানিয়ে চলে গেল, তখন আপনি কী বললেন? নুহাইলার মৃত্যু নাকি কোনো বিষয়ই না। এতে কিছুই যায়-আসে না।

শুনুন, পুরুষ যতক্ষণ একজন নারীকে ভালোবাসা অব্যাহত রাখে, ততক্ষণ সেই নারী মরে না। তাকে অমর করে রাখে পুরুষের ভালোবাসা। ভালোবাসা বন্ধ করে দিলেই কেবল মৃত্যু। আপনি যেহেতু নুহাইলাকে ভালোবাসেন, নুহাইলা এখনো মরেনি।

‘সে এখানেই আছে’— আপনি বললেন এবং বলে আপনার চোখের দিকে ইশারা করলেন। সেই রহস্যময় ধূসর দুটো চোখ আপনার। আমি কখনোই আপনার চোখের রঙ ঠিক করতে পারিনি। যখন জিজ্ঞেস করতাম, বলতেন, আপনার চোখের রঙ কী নুহাইলাও নাকি ঠিক জানত না।

বাব আল-শামসে যখন থাকতেন, নুহাইলা আপনাকে যখন-তখন জিজ্ঞেস করত নানা জিনিসের রঙের কথা—‘এটার রং কী? ওটার রং কী?’ বোঝাই যায়, তার রং বিষয়ক জ্ঞান ছিল শূন্য।

আসলে আপনি আমাকে মিথ্যা বলেছিলেন। পুরো সত্যটা বলেননি। আপনি আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন, নুহাইলা মরেনি… কিন্তু চেপে গিয়েছিলেন কথার শেষ অংশ। আপনি কী বলতে চেয়েছেন সেদিন বুঝিনি। ভেবেছিলাম, এসব কেবলই এক বৃদ্ধ প্রেমিকের প্রলাপ, বুড়ো বয়সে মনে অতীত-স্মৃতির রোমন্থন। তাই এসব কাব্য করছেন আপনি এবং এ সমস্ত সুন্দর সুন্দর কথায় আপনি সারিয়ে তোলেন আপনার হৃদয়ের ক্ষত। কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি যে, মৃত্যুর আসল বার্তাটি লুকিয়ে ছিল আপনার কথার দ্বিতীয় অংশে।

একজন পুরুষ তো তখনই মরে যায়, যখন তাকে ভালোবাসা বন্ধ করে দেয় তার নারী। আপনি এখন মারা যাচ্ছেন, কারণ নুহাইলা মরে গিয়ে আপনাকে ভালোবাসা বন্ধ করে দিয়েছে। নুহাইলা মারা গেছে মানে আপনার ভালোবাসার সাপ্লাই বন্ধ। আপনিও তাই মরতে বসেছেন। সরল অংক। 

দেখুন আপনার অবস্থা! শুধু ঘুম আর ঘুম। যেন সহস্র রাত্রির ঘুম। 

হায় আল্লাহ, এ কেমন ঘুম! আপনার পাশে বসতেই আমারও কেন এক মরণঘাতী ঘুমে জড়িয়ে আসে চোখ?

কেন জানি আমারও ঘুম পায় ভয়াবহ। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসামাত্র ঘুমের কাছে কাবু হয়ে পড়ি। মাঝরাতে যখন ঘুমটা ভাঙে, দেখি শরীরের সব জয়েন্টে ব্যথা। ব্যথায় একেবারে টনটন করছে।

আমি ধীরে আপনার কাছে এগিয়ে আসি, আসতেই দেখি আপনার চারপাশে বাতাসের একটা ঘূর্ণি। সেই জায়গাটাও দেখি, যেখানে আমি কোনোদিন যাইনি। অবশ্য ঠিক করেছি যাব। সবাই যখন যায়, আমি বাদ থাকব কেন? আমি দেখতে যাব। সচক্ষে চেখে চেখে দেখে নেব সব। ভালোমতো আলামতগুলো নিয়ে নেব চোখের তারায়। মনে আছে, আপনি আমাকে বলতেন, জায়গাগুলো নাকি আপনার খুব ভালো করে চেনা। একেবারে চোখে খোদাই হয়ে আছে, মুছবে না কখনো।

ইউনুস সাহেব, কোথায় সেসব আলামত? আমি রাস্তা চিনব কীভাবে? কে আমাকে নিয়ে যাবে ওখানে?

আপনি আমাকে সেই গুহাগুলোর গল্প বলেছেন। পাথর কেটে বানানো গুহা। সত্যিই কি আপনারা ওখানে দেখা করতেন? নাকি এখানেও গুল মেরেছেন? বলেছিলেন, জায়গাটার নাম বাব আল-শামস। পরক্ষণে ঠোঁট টিপে হেসে বললেন, ভেবো না তোমার প্রেমিকা ‘শামস’-এর কথা বলছি। এর সাথে ‘মিয়েহ ওয়া মিয়েহ’ ক্যাম্পের সেই হত্যাকাণ্ডেরও কোনো যোগসূত্র নেই, যেখানে শামসকে ওরা হত্যা করেছিল।

আমাকে জ্ঞান দিয়ে বললেন, আমি নাকি শামসকে ভালোবাসতাম না এবং আমার উচিত তাকে ভুলে যাওয়া। ‘তুমি যদি তাকে ভালোই বাসতে, অবশ্যই তার খুনের বদলা নিতে। এইসব ভালোবাসা না, বুঝলে বাছাধন? তুমি এমন কোনো নারীকে ভালোবাসতে পারো না, যে তোমাকে ভালোবাসে না। এটা অসম্ভব।’

ইউনুস সাহেব, আপনি আসলে বুঝতে পারছেন না। যে নারী অন্য এক পুরুষের জন্য খুন হয়েছে, তার হয়ে আমি কীভাবে প্রতিশোধ নিই?

‘এর মানে সে তোমাকে ভালোবাসত না?’ আপনি বললেন। 

‘বাসত। কিন্তু তার নিজস্ব কায়দায়।’ আমি উত্তর দিলাম। 

‘বিভ্রম, এ এক বিভ্রম বাছা! ভালোবাসার হাজারটা দরজা আছে৷ কিন্তু একতরফা ভালোবাসা কোনো দরজা না, ওটা হলো দেয়াল৷ বিভ্রম মাত্র।’

সেদিন আমি আপনাকে বলিনি যে, নুহাইলার প্রতি আপনার ভালোবাসাটাও হয়তো একটা বিভ্রমই ছিল৷ শুধু স্বপ্নের মতো ক্ষণিকের কিছু ভ্রমণ ছাড়া তার সাথে আপনার আর কবে কোথায় দেখা হতো? 

যাক গে, আসল কথায় আসি। আপনার একটু কাছে আসছি একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর দিতে। বলব? বাইরে দেখুন আজ আকাশে কত বিশাল চাঁদ উঠেছে। ভরা পূর্ণিমার চাঁদ। আমরা গাবিসিয়ার মানুষ চাঁদকে ভালোবাসি, আবার যমের মতো ভয়ও পাই। আকাশে পূর্ণ চাঁদ উঠলে আমাদের চোখে আর ঘুম থাকে না।

উঠুন, চাঁদের দিকে দেখুন!

আপনি আমাকে আপনার মায়ের গল্প বলেননি ঠিক, কিন্তু আমি আপনাকে আমার মায়ের গল্প বলব। সত্যি বলতে, আমার মায়ের কথা আমি নিজেও বেশি কিছু জানি না। মা হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। লোকজন বলল, তিনি আম্মানে তার বাবার বাড়ি চলে গেছেন। ১৯৭০ সালে যখন আমরা জর্ডানে ছিলাম, তাকে আমি অনেক খুঁজেছি। সে অন্য এক গল্প, পরে শোনাব। 

আমার মায়ের কথা আপনাকে আগেও বলেছি, আবারও বলব। আপনি যখন আমাকে বাব আল-শামসের গল্প শোনাতেন, তখন বলতেন—গল্প হলো মদের মতো, যত বলা হয় তত পুরোনো হয়, আর ততই মজে ওঠে, তেজ ও ঝাঁঝ বাড়ে। কিন্তু গল্প যদি মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়, সাধারণই থেকে যায়। মদ কলসে রেখে পুরোনো ও মূল্যবান করা হয়, গল্পের সেই কলস হলো বর্ণনা। গল্পকে বারবার বলার মাধ্যমেই সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করা হয়। আপনি নুহাইলার গল্প বারবার বলতেন, আপনার চোখ দুটো তখন চকচক করে উঠত দারুণ উদ্দীপনায়।

আপনি বলতেন, ‘ওই মহিলা আমাকে জাদু করেছে।’ 

কিন্তু আমি জানি আপনিই আসল জাদুকর। নুহাইলাকে আপনি কীভাবে পটিয়েছিলেন? বেচারি আপনার ওসব ঝটিকা সফরের গন্ধ শুঁকেই জীবন পার করে দিল!

ক্যাম্পের রাতগুলিতে মা আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন। ফিসফিস করে ডাকতেন। আমি উঠে দেখতাম, আকাশে থালার মতো ভরা চাঁদ। তখন আর ঘুম আসত না।

কুওয়াইকাত গ্রাম থেকে আসা ওই নারী বলত, আমরা নাকি পাগল। ‘গাবিসিয়ার মানুষদের মাথায় ছিট আছে গো! এরা চাঁদকে ভয় পায়।’

অথচ আমরা ভয় পেতাম না। হ্যাঁ, আমরা জেগে থাকতাম সারা রাত। মা আমাকে ঘুমাতে দিতেন না। তিনি মাথায় কালো একটা কাপড় বেঁধে নিতেন। তারপর বলতেন—চাঁদের দিকে তাকা! দেখ তোর মরা বাপকে দেখা যাচ্ছে।

মা জিজ্ঞেস করতেন, ‘দেখেছিস?’ 

আমি বলতাম, ‘হুঁ।’

অথচ আল্লাহর কসম আমি কিছুই দেখিনি। কিন্তু এখন… আপনি বিশ্বাস করবেন কি-না জানি না, এত বছর পর, যখন আমি চাঁদের দিকে তাকাই, দেখি বাবার মুখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। মা বলেছিলেন, ওরা বাবাকে মেরে আমাদের দরজার সামনে পোঁটলার মতো ফেলে রেখে গিয়েছিল। বাবা নাকি এমনভাবে দলা পাকিয়ে পড়ে ছিলেন, দেখে মনে হচ্ছিল ওটা মানুষ না, একটা পাটের বস্তা। মা কাছে গিয়েও বাবাকে দেখতে পাননি। ওরা বাবাকে নিয়ে গোপনেই কবর দিয়ে দিয়েছিল মাকবারা আশ-শুহাদায়।

‘তোর বাপের দিকে তাকা! যা বলার বল!’ 

আমি তাকাতাম, তবে কিছু দেখতামও না, বলতামও না। এখন ঠিকই দেখি, কিন্তু বলব কী? 

এই যে ইউনুস সাহেব, উঠুন, চাঁদের দিকে তাকান! আপনার বউকে দেখতে পাচ্ছেন? আমার বাবাকে দেখছেন? আমার মাকে নিশ্চয়ই দেখবেন না। দেখলেও চিনবেন না। আমি নিজেই তাকে ভুলে গেছি। তার গলার স্বর, তার চোখের জল—সব ভুলে গেছি। 

শুধু একটা জিনিস মনে আছে। মা আমাদের ঘরের আঙিনায় একধরনের রুটি বানাতেন চুলায়। সেই রুটির স্বাদ এখনো ভুলিনি। একদলা খামিরের ওপর লাল মরিচ, তেল, জিরে আর পেঁয়াজ মাখিয়ে তিনি সেটা সেঁকতেন। ব্যস, হয়ে যেত মজাদার রুটি। তারপর বানাতেন চা, নিজেও খেতেন, আমাকেও খাওয়াতেন। বসে বসে আমরা চা-রুটি খেতাম আর চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সেই ঝাল স্বাদটা এখনো আমার মুখে লেগে আছে। 

এখন যখনই আমি চাঁদ দেখি, সেই ঝাল স্বাদটা ফিরে আসে, পুরো জিভ অবশ হয়ে যায় আর চোখ-কান দিয়ে বেরোতে থাকে ঝাল ঝাল ধোঁয়া। তখন আমি চা খাই, চাঁদের দিকে তাকাই আর ফ্যালফ্যালিয়ে দেখতে থাকি। 

মা বলতেন, বাবাদের গ্রামে নাকি পূর্ণিমার রাতে কেউ ঘুমাত না। চাঁদ যখন গোল হয়ে মধ্য আকাশে উঠত, জেগে যেত পুরো গ্রাম। গ্রামের আঙিনায় এসে বসত এক অন্ধ গায়ক। একতারায় বোল তুলে এমন করুণ সুরে গান ধরত সে, মনে হতো রাত নিজেই কান্না জুড়েছে। 

মা আমাকে এই গল্প বলতেন আর কাঁদতেন। অন্যদিকে আমি কাঁদতাম ঘুমে, ভ্যাপসা গরমে আর স্বপ্নের মতো আবছা একটা ঘোরের মধ্যে। কাঁদতাম, একটুক্ষণ থামতাম, আবারও কাঁদতাম।

আজ আকাশে ভরা চাঁদ উঠেছে। আপনাকে মনে হচ্ছে সাদা চাদরের সমুদ্রে সাঁতার কাটছেন। এবার উঠুন। দেখুন। আমার সাথে একটু চা খান। নাকি আপনাদের আইন আল-যাইতুনের লোকেরা কেউ পূর্ণিমার রাতে ঘুম থেকে ওঠে না? 

চলবে..

মন্তব্য লিখুন (2)
  1. নুরুযযামান নাহিদ

    আলমগীর মুরতাজা খুব ভালো লেখেন। তার সবলেখাই সুখপাঠ্য। অনুবাদেও হাত বেশ পোক্ত। উজ্জ্বল ভবিষ্যত তার জন্য অপেক্ষমাণ।

  2. মাহমুদ তাশফীন

    অসাধারণ সুন্দর লেখনী

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *