খুব কম মানুষই এ কথা জানে, বা হয়তো কেউই জানে না—ছেলেবেলায় একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমি বধূদের খুব ভয় পেতাম। এই ভয়ের কারণ ছিল একটি লোককথা, যা আমাদের পরিবারে বহুকাল আগের এক বধূ সম্পর্কে বলা হতো।
এই লোককথা শোনার আগে আমিও আমার অন্য সমবয়সীদের মতো বধূদের প্রতি একটা আকর্ষণ অনুভব করতাম। কোনো বিয়েতে গেলে আমি কনের যতটা সম্ভব কাছঘেঁষে বসতাম এবং তার মেহেদি-রাঙা হাত, তার লাল পোশাক ও অলংকার বারবার ছুঁয়ে দেখতাম। কনের কাছ থেকে ভেসে আসা ফুল, আতর এবং আরও কিছু অচেনা সুগন্ধের ঢেউ আমাকে তার দিকে টেনে নিয়ে যেত। তার অলংকারের মৃদু মৃদু ঝংকার আমার কাছে সবচেয়ে সেরা বাদ্যযন্ত্রগুলোর বাজনার চেয়েও ভালো মনে হতো। আমি আরও লক্ষ্য করতাম, প্রত্যেক মেয়েই বধূ সেজে কেমন সুন্দর ও কোমল হয়ে ওঠে। তাই আমি প্রতিটি কনের সাময়িক প্রেমে পড়ে যেতাম এবং যখন সে বিদায় নিয়ে তার বরের সঙ্গে চলে যেত, তখন আমি কিছুক্ষণের জন্য বিষণ্ণ হয়ে পড়তাম। এমন প্রেমিকের মতো যার কাছ থেকে তার প্রেমিকাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এক রাতে যখন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, তখন আমি আমার পরিবারে প্রচলিত সেই কনের গল্পটা শুনলাম। বিয়ের পর যথারীতি তাকে তার বাবা মায়ের বাড়ি থেকে বিদায় জানানো হয়। কিন্তু যখন বরের বাড়িতে তাকে নামানো হচ্ছিল, তখন জানা গেল, সে পথেই মারা গেছে। তার নিচের ঠোঁট দাঁতের নিচে পড়ে কেটে গিয়েছিল। শরীর জমে শক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং একটা পুরোনো চেলা তার পায়ের গোছায় সেঁটে ছিল। পুরোনো চেলা সম্পর্কে বলা হয়, এটি তার আঁকশিযুক্ত পাগুলো মানুষের চামড়ায় ঢুকিয়ে দেয় এবং ধীরে ধীরে মাংস ভেদ করে হাড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অবশেষে, কিছুটা তার বিষের কারণে, তবে বেশিরভাগই যন্ত্রণায় মানুষ মারা যায়। এই কনে যন্ত্রণায় মারা গিয়েছিল। যদি সে বলে দিত, চেলাটি তার পায়ের গোছায় জড়িয়ে আছে, তবে সে হয়তো প্রাণে বাঁচতে পারত। কিন্তু সেই যুগে কোনো কনে মুখ খুললে তাকে বেশরম বলা হতো। তাই সে চুপ করে থাকে এবং কষ্ট সহ্য করতে করতে নীরবে মারা যায়।
‘যদি সেই হতভাগী একবার উফও করে উঠত’ গল্প-বলা সেই নারীটি বলেছিলেন, ‘তবে গরম চিমটা দিয়ে পোকাটাকে ধরে টেনে বের করা যেত। না হয় তার ওপর একমুঠো চিনিই ঢেলে দেওয়া যেত, তাহলে ওখানেই গলে পানি হয়ে পড়ে থাকত।’
চিনি বিষয়ক এই কথাটি আমিও বুঝতে পারলাম। কারণ সে সময় যখনই ঘরে কোনো বড় চেলা বের হতো, আমরা ছুটে গিয়ে তার ওপর চিনি ঢেলে দিতাম। সেটা কিছুক্ষণ ছটফট করত, তারপর গলতে শুরু করত এবং দেখতে দেখতে একসময় পানি হয়ে যেত।
এই নির্বাক বধূটির প্রতি আমার সহানুভূতি, বরং এত দীর্ঘকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও কিছুটা ভালোবাসা অনুভূত হলো। কিন্তু তার গল্প এখানেই শেষ হয়নি। গল্প-বলা নারীটি আরও জানালেন, তার মৃত্যুতে আনন্দঘন সেই বাড়িতে হাহাকার পড়ে যায় এবং উভয় পরিবারই সিদ্ধান্ত নেয়, কনেকে সেভাবেই, পূর্ণ সাজসজ্জা-সহ, বিয়ের পোশাক এবং সমস্ত অলংকার সমেত দাফন করা হবে এবং সেদিনই গহনায় হলুদ কনেকে কবরে নামানো হয়।
কিন্তু সে কবরে শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি। সে রাতেই একজন লোক চুপিসারে কবরস্থানে পৌঁছে এবং সদ্য-দাফন করা কবরটি খুলে তার ভেতরে নেমে পড়ে। তার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে দেখতে পায়, সেই লোকটি কবরের ভেতর বধূর পাশে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে এবং তার হাত ও মুখে অলংকারের ছাপ বসে গেছে। উভয় পরিবারের লোকজনও খবর পেয়ে কবরস্থানে আসে। তখন জানা যায়, কবরে নামা লোকটি ছিল সেই বধূরই স্বামী। তাকে বাইরে বের করার চেষ্টা করা হলে কনের শরীরও তার সাথে কিছু দূর পর্যন্ত উঠে আসে। তারপর তার থেকে ছুটে গিয়ে কবরের মাটিতে পড়ে যায়।
মৃতের কিছু আচার-অনুষ্ঠান দ্রুত আবার পালন করে কবরটি পুনরায় বন্ধ করা হয় এবং এবার সবাই স্বামীর দিকে মনোযোগ দেয়। জ্ঞান ফেরার পর সে আবোল-তাবোল কথা বলছিল। প্রথমে সে বলল, কনের অলংকার তাকে ধরে ফেলেছিল এবং তার শরীরের মধ্যে গেঁথে যাচ্ছিল। এরপর বলল, কনে নিজেই তাকে চেপে ধরেছিল। তারপর বলল, কনের পুরো শরীর তার শরীরের সাথে লেপ্টে গিয়েছিল। সে কবরে নেমেছিল কেন শুরুতে এই প্রশ্নের কোনো জবাব সে দেয়নি । যখন তার জ্ঞান আরও কিছুটা ঠিকঠাক হলো, তখন সে বলল, শুধু তার বউকে একবার দেখার জন্য সে কবর খুলেছিল। কিন্তু পরে নিজেই বলে দিল, সে কবরের ভেতরে নেমে আসলে কনের অলংকারগুলো খোলার চেষ্টা করছিল।
কয়েক দিন সে পাগলের মতো এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতে থাকে। অবশেষে একদিন লোকেরা দেখতে পায়, সে সেই কবরস্থানেই কনের কবরের পায়ের কাছে মরে পড়ে আছে। এরপর থেকে বধূর কবরে যে বেশ ভালো পরিমাণ ধন-সম্পদ রয়েছে, এটা জানা সত্ত্বেও কোনো কাফন চোরও সেদিকে মুখ ফিরে তাকায়নি। এভাবে ধীরে ধীরে সেই কবরটি একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
এই গল্প শুনে আমার কাছে প্রথমবারের মতো বধূ এক ভয়ানক জিনিস বলে মনে হলো। বৃষ্টির শব্দে আমি অলংকারের মৃদু ঝংকার শুনতে লাগলাম। ঠিক তখনই আমার এক বড় ভাই বললেন, ‘আসলে কনেটি মরেছিল না। লোকেরা তাকে মৃত ভেবে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিয়েছিল আর সেই বেচারি লজ্জার চোটে বলতেও পারেনি যে সে জীবিত।’ এই কথায় কয়েকজন হেসে উঠল এবং গল্প-বলা নারীটি সেই ভাইকে ধমক দিয়ে বললেন, এমন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করা উচিত নয়। কিন্তু কনেকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়েছিল, এমনটা কল্পনা করে আমার ভয় আরও বেড়ে গেল। আর যখন আমি নিজেকে বিশ্বাস করালাম সে আসলে কবরে মৃতই ছিল, তখন তাকে আমার কাছে আগের চেয়েও বেশি ভয়ংকর মনে হতে লাগল।
কয়েক দিন ধরে তার কথা আমার মনে পড়তে থাকল। কখনো আমি তাকে জীবিত কল্পনা করতাম, কখনো মৃত। প্রতিটি রূপে সে আমার সামনে প্রথম রূপের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠত এবং তার অলংকার তার চেয়েও বেশি ভয়ানক মনে হতো। এমনকি আমি বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের কাছে যাওয়া তো দূরের কথা, বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতেই যেতে ভয় পেতে শুরু করলাম। অবশ্য কিছুদিন পরে ধীরে ধীরে আমার ভয় কমতে শুরু করল। কিন্তু বধূদের মধ্যে যে আকর্ষণ আমি আগে অনুভব করতাম, তা সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে গেল।
সেই দিনগুলোতেই আমাদের বাড়ির সামনে, রাস্তার ওপারে এক বাড়িতে একটি বিয়ে হলো, যেখানে আমাকে শরিক হতে হয়েছিল। বাড়িটিকে ‘বারান্দাওয়ালা বাড়ি’ বলা হতো। কারণ এর ওপরের তলার দুটি ঘরের সামনে রাস্তার দিকে একটি বারান্দা তৈরি করা ছিল। এই বাড়িতে আমাদের বেশ যাতায়াত হতো। যে মেয়েটির বিয়ে হচ্ছিল, তার ছোট দুই ভাই ছিল আমার বন্ধু। মেয়েটি ছিল চঞ্চল এবং বাচাল প্রকৃতির। সে আমাকে অকারণে জ্বালাতন করত। কখনো কখনো এমন কথা বলত, আমি কিছুটা ঘাবড়ে যেতাম আবার কিছুটা লজ্জাও পেতাম। কিন্তু তার জ্বালাতন আমার ভালোও লাগত। যেমনটা তাকেও ভালো লাগত।
বিয়ের কাজকর্মে ঘরের ভেতর-বাইরে বন্ধুদের সাথে আমিও ব্যস্ত ছিলাম। বেশ কয়েকবার আগুনের শিখার ঝলকের মতো আমার হৃদয়ে কনের পাশে বসে তাকে ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল এবং মুহূর্তেই তা মিলিয়ে গেল। বিয়ের পর যখন কনেকে বিদায় দেওয়ার সময় এলো, তখন আমি সেখান থেকে সরে যেতে চাইলাম। কিন্তু বন্ধুরা আমাকে ধরে ফেলল। নিচে, বাড়ির লম্বা বারান্দায় নারীদের ভিড় লেগে ছিল। আমিও সেখানে একটি দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পর কনেকে ওপরের ঘর থেকে নিচে নামিয়ে আনা হলো। বাইরে, রাস্তায় গাড়ি প্রস্তুত ছিল। কনে একেকজন করে সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিল। নারীরা একে একে তাকে জড়িয়ে ধরছিল এবং খুব জোরে জোরে কাঁদছিল। মনে হচ্ছিল যেন বাড়িতে বিয়ে নয়, মৃত্যু হয়েছে এবং মাতমকারী নারীদের মধ্যে কান্নার প্রতিযোগিতা চলছে। এর মধ্যে কারও কারও মুখের ভঙ্গি এমন হচ্ছিল—দেখে হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। আমি ভবিষ্যতে কখনো অন্যদের হাসাব ভেবে মনে মনে তাদের কান্নার নকল করছিলাম।
ঠিক তখনই বারান্দার দরজার কাছ থেকে কোনো পুরুষ ধমক দিয়ে নারীদের চুপ করিয়ে দিল। বলল, কনেকে যেন তাড়াতাড়ি গাড়িতে তোলা হয়। নয়তো স্টেশনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ট্রেন ফেল হয়ে যাবে। বারান্দায় নীরবতা নেমে এলো। কনে নারীদের ভিড়ের মধ্যে তার ছোট দুই ভাইয়ের কাঁধে ভর দিয়ে অলংকারের হালকা ঝংকার সহকারে, ধীরে ধীরে বারান্দার বাইরের দরজার দিকে এগোতে লাগল। দুজন নারী তার পায়ের কাছে ছড়িয়ে থাকা কাপড় চিমটি দিয়ে ধরে মাটি থেকে কিছুটা ওপরে তুলে রেখেছিল। লাল জোড়া এবং লম্বা ঘোমটার আড়ালে কনের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। তবে জরির কাজ করা জুতা ছুঁয়ে থাকা ভারী নুপুরের ওপরে তার এক পায়ের গোড়ালির শুভ্রতা দেখা যাচ্ছিল। যখন সে আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমার অবাক লাগল, কনে হওয়ার পর সে কেন এতটুকুন আর জড়োসড়ো হয়ে গেল। তাকে একটু ভালোভাবে দেখার জন্য আমি আমার সামনে দাঁড়ানো দুজন নারীর মাঝখান দিয়ে মাথা কিছুটা বাড়িয়ে দিলাম এবং সে কীভাবে যেন তার মুখের ওপরে পড়ে থাকা জোড়া ঘোমটা এবং ফুল ও জরির কাজ করা ঝালরের আড়াল থেকে আমাকে দেখে ফেলল।
তার শরীরে যেন আপাদমস্তক একটা অস্থিরতা তৈরি হলো এবং আমার সামনে দাঁড়ানো দুজন নারী যেন হঠাৎ একটি বড় লাল দাগে পরিণত হয়ে গেল। আমি অলংকারের তীব্র ঝংকার শুনলাম এবং দেখলাম, কনে আমার সামনে পূর্ণ উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছে। তারপর সে ঝুঁকে পড়ল এবং আমাকে জড়িয়ে ধরে জোরে জোরে কাঁদতে লাগল। ফুল, আতর এবং কনের শরীরের সুগন্ধ একসঙ্গে আমার ওপর হামলে পড়ল। তার হাতের জোড়া বালা আমার কাঁধে গেঁথে যাচ্ছে বলে অনুভব করলাম। সেগুলোর তীক্ষ্ণতার আড়ালে তার হাতের নরম স্পর্শ একদম টের পাওয়া যাচ্ছিল না। নারীরা তাকে টেনে আমার কাছ থেকে আলাদা করল। কিন্তু তার গলায় পরা লম্বা সোনার হারটির কোনো একটি অংশ আমার জামার খোলা বোতামে আটকে গিয়েছিল। ছাড়ানোর চেষ্টায় সেটি আরও জড়িয়ে গেল।
এখন কনে আমার থেকে দু-তিন কদম দূরে একেবারে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার আর তার মাঝে সোনার হারটি ঝকঝক করছিল এবং কয়েকজন নারী আমার জামার বোতাম ভাঙার চেষ্টা করছিল। বারান্দায় কান্নার শব্দ তীব্র হতে লাগল এবং সেই মুহূর্তে হঠাৎ আমার সেই কনের কথা মনে পড়ল, যার অলংকার একজনকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমার এমন মনে হলো যেন আমার সামনে সেই কনেই দাঁড়িয়ে আছে, বরং ঘোমটা আর ঝালরের আড়ালে আমি তার মাটির মতো বিবর্ণ মুখটিও দেখতে পেলাম। আমি দেখলাম, যেন সে পা না তুলেই আমার দিকে এগিয়ে আসছে এবং শীঘ্রই তার শরীর আমার সাথে বা আমার শরীর তার সাথে লেপ্টে যাবে। এই কয়েক মুহূর্তে আমার এও মনে হলো, বারান্দায় সে আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই, বরং বারান্দাও নেই, আছে একটি সদ্য খোঁড়া কবর, যার খোলা মুখের ওপর কোনো বেঁকে যাওয়া গাছের ডালপালা ঝুঁকে আছে।
আমি পেছন দিকে ঘুরে গিয়ে দেয়ালে ধাক্কা খেলাম। তারপর বারান্দার ভিড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম এবং কনের হারের একটি ছোট্ট সোনালি পাতা আমার জামার বোতামে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় রাস্তা পার হয়ে দৌড়ে নিজের বাড়িতে ঢুকে পড়লাম।
আমি বাড়ির কাউকে কিছু বললাম না। কিন্তু এই ঘটনা আমাকে অসুস্থ করে তুলল। নিজের বাড়ির খালি অংশগুলোতে গেলে আমার মনে হতো, এই বুঝি কিছুর আড়াল থেকে কোনো কনে বের হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসবে। রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে অস্পষ্ট শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যেত এবং নাকে এক ধরনের মিশ্র সুগন্ধ ভেসে আসত—যা আমার জেগে ওঠার পরেও কিছুক্ষণ আশেপাশে ঘুরপাক খেত। বৃষ্টির শব্দ বা অন্য কোনো একটানা শব্দের আড়ালে আমি কান্নার শব্দ এবং অলংকারের মৃদু ঝংকার শুনতে পেতাম। অব্যবহৃত ঘরগুলোর সামান্য খোলা দরজার কাছ দিয়ে আমি যেতে পারতাম না। কারণ বেশ কয়েকবার আমি সেগুলোর ফাঁকের ওপারে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সাদা পায়ের গোড়ালি এবং তার ওপর সেঁটে থাকা কালো চেলা দেখতে পেয়েছিলাম।
বারান্দাওয়ালা বাড়ির লোকজন বিয়ের কিছুদিন পরেই অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল এবং তাদের পরে সেখানে এক বৃদ্ধ দম্পতি এসে থাকতে শুরু করেছিল। কিন্তু যতদিন সেই বাড়িটি খালি ছিল, তার বারান্দার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমার পা টলে যেত। কখনো তার দরজা সামান্য খোলা দেখতে পেলে আমার সন্দেহ হতো, যেন আমি বারান্দার অন্ধকারে অলংকারের ঝলক দেখেছি এবং আমি নিশ্চিত হয়ে যেতাম, যদি দরজার ফোকর দিয়ে উঁকি দিই, তাহলে আমি সেখানে কনেকে দেখতে পাব। বারান্দাওয়ালা বাড়ির বাচাল কনে নয়, আমার থেকে বহু প্রজন্ম আগে নীরবে মারা যাওয়া সেই কনে।
আমি জানতাম, এসবই চোখের ভুল এবং একান্তই আমার ভ্রম। কিন্তু চোখের ভুল আমার কাছে আসল দৃশ্যের চেয়েও বেশি আসল এবং ভ্রম বাস্তবের চেয়েও বড় বাস্তব বলে মনে হতো।
আমার বিশ্বাস ছিল, আমার সারাটা জীবন এই ভয়ের সঙ্গেই কাটবে। কিন্তু নওজোয়ানির কাল আসতে আসতে ছেলেবেলার অনেক কিছুর সাথে এই ভয়ও আবছা হয়ে গেল এবং কনে ধীরে ধীরে তার প্রভাব হারাতে লাগল। এখন কখনো আমাদের বাড়িতে তার প্রসঙ্গ উঠলে আমি তার গল্পে অনেক অসঙ্গতি দেখতে পেতাম এবং এটা ভেবে অবাক হতাম—কোনো এক সময় এ ঘটনায় আমি কী ভয়টাই না পেতাম! কখনো কখনো এই ভয় ফুরিয়ে যাওয়ার কথা মনে হলে আমার ওপর এক ধরনের অস্পষ্ট বিষণ্ণতা ছেয়ে যেত। আমি ভাবতাম, হয়তো সেই সময় বেশি দূরে নয় যখন কনের প্রাণহীন স্মৃতি এবং স্মৃতির প্রাণহীন ভয়—দুটোই আমার মন থেকে চিরতরে মুছে যাবে। কিন্তু কিছুদিন আগেই এই দুটোর মধ্যে কয়েক মুহূর্তের জন্য প্রাণ ফিরে এসেছিল।
সেদিন আমাদের আত্মীয়দের মধ্যে একজন মারা গিয়েছিল। আমরা জানাজা নিয়ে কবরস্থানে পৌঁছালে জানা গেল, কবর প্রস্তুত হতে এখনো দেরি আছে। কারণ তিন জায়গায় আধাআধি কবর খোঁড়ার পর নিচ থেকে অন্য কোনো কবর বেরিয়ে এসেছিল। এবার চতুর্থ এক জায়গায় শাবল চালাতে চালাতে কবর খননকারী আমাদের আশ্বাস দিচ্ছিল, এখানে কোনো পুরোনো কবর বের হবে না। জানাজার সঙ্গে আসা লোকেরা সময় কাটানোর জন্য কবরস্থানে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করতে লাগল। আমিও তাদের একটি দলের সঙ্গে যোগ দিলাম। কবরস্থানটি আগ্রহ ও মনোযোগের সাথে দেখতে লাগলাম আমি। কারণ অনেক দিন পর এদিকে আসা হয়েছে। কিছুটা এ কারণেও—এটি আমাদের পারিবারিক কবরস্থান ছিল। তবে এতে বেশিরভাগই ছিল অন্য লোকেদের কবর। আসলে এখানে যে কেউ দাফন হতে পারত। কিন্তু যেহেতু এর জমি আমার পূর্বপুরুষদের দেওয়া ছিল, তাই এখানে কবরের জায়গা পেতে আমাদের অনুমতি প্রয়োজন হতো। এতে কিছু আয়ও হতো, যা কবরস্থানের পরিধি অনুযায়ী খুব কম, বলতে গেলে প্রায় ছিলই না। সেসময় আমার সঙ্গে থাকা লোকেরা কবরস্থানের সেই আর্থিক দিক নিয়েই আলোচনা করছিল। কিন্তু এমন আইনি ভাষায় যা আমার বুঝে আসছিল না।
আমি তাদের কথা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিলাম এবং দেখলাম, কবরস্থানে গাছের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। যে অবশিষ্ট গাছগুলো টিকে আছে, সেগুলোরও বেশিরভাগ শুকিয়ে গেছে। কবরস্থানের চড়া রোদে গাছের অভাব আমার কাছে আরও বেশি অনুভূত হলো। আমাদের কাছাকাছি যে বেঢপ গাছটি ছিল, তার ডালপালাও বেঁকেচুরে গিয়ে জায়গায় জায়গায় ফেটে গিয়েছিল।
কালো, ন্যাড়া ডালপালাযুক্ত এই পুরো গাছটিতে নির্জীবতা ছেয়ে ছিল। কিন্তু এর একটি ডাল, যা গাছের ঘের ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, তা ছিল সবুজ পাতায় ভরা। মাটির একটি অংশ তার ছায়ার আওতায় এসে গিয়েছিল। ‘এটাও কিছুদিন পর শুকিয়ে যাবে’—আমি ডালটির নিচে দাঁড়িয়ে সেটা দেখতে দেখতে ভাবলাম। কিন্তু ঠিক তখনই আমার সঙ্গে থাকা লোকদের মধ্যে কেউ একজন বলল, ‘এই গাছটা চিরকাল এমনই, শুকনো, আর এই ডালটিও চিরকাল এমনই, সবুজ পাতায় ভরা।’
একজন জীর্ণশীর্ণ দরিদ্র লোক ছিল। সে খেয়াল করল, আমরা তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছি। সে আমাদের আরও বেশি মনোযোগী দেখে বলল, ‘হয়তো এখানে কোনো কনের কবর আছে, এই ডালটার ঠিক নিচে। বলা হয়ে থাকে, কোনো কনে যদি বরের কাছে পৌঁছানোর আগেই মারা যায়, তবে তার কবরের ওপর ছায়া দেওয়া ডালপালাগুলো কখনো শুকিয়ে যায় না।’
এক মুহূর্তের মধ্যে আমার ছেলেবেলা, সেই বধূঘেরা ছেলেবেলা ফিরে এলো। লোকগুলো কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেল এবং আমি তাদের আটকাতে পারলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, আমি সেই বধূটিরই চিহ্নহীন কবরের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। আমার পায়ের নিচে শুকনো মাটি কাঁপছে বলে মনে হলো এবং তার ওপর পড়ে থাকা ফাটলগুলোর মধ্যে একটিকে চওড়া হতে দেখতে পেলাম যেন।
‘সেসব কি আবার শুরু হচ্ছে?’ আমি ভাবলাম। কিন্তু কেমন যেন আমি ভয় পাচ্ছিলাম না। মনে হলো, মাটি থেকে বিষণ্ণতার ঢেউ উঠে আসছে। আর যখন আমি সেই ঢেউগুলো থেকে বাঁচতে চাইলাম, তখন আমার আগের মতো ভয় লাগতে শুরু করল। তারপর আমার ভেতর জেদ জেগে উঠল। আমি পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাটাকে দমন করলাম এবং সেই শুকনো গরম মাটির ওপর জেঁকে বসলাম। এটা মাত্র কয়েক মুহূর্তের ঘটনা ছিল। তারপর সবকিছু আগের মতো হয়ে গেল।
কবর প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার ঘোষণা হয়ে গিয়েছিল এবং কবরস্থানে এদিক-ওদিক ঘোরাফেরা করা লোকেরা এক জায়গায় জড়ো হচ্ছিল। আমি উঠে সেই ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেলাম এবং সারাটা রাস্তায় বিষণ্ণতার সঙ্গে ভাবতে থাকলাম, সবকিছু আবার শুরু হয়ে এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল কেন। এখন আমি ভাবি, এর কারণ সম্ভবত এটা ছাড়া আর কিছু ছিল না যে আমি জানতাম—যদিও সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়েনি—এই কবরস্থানেই কোথাও বাঈকেও দাফন করা হয়েছে।
দুই.
বারান্দাওয়ালা বাড়িতে বৃদ্ধ দম্পতি নীরবে এসে থাকতে শুরু করেছিলেন এবং নিঃশব্দে পুরোনো হয়ে গিয়েছিলেন। আমার এটাও মনে নেই, এই বাড়িতে এসে তাদের থাকতে শুরু করাটা আমি প্রথম কবে এবং কীভাবে টের পেয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমি প্রায়ই দেখতাম, বাড়ির বাইরের দরজা খোলা আছে এবং ভেতরে, বারান্দায় একজন সাহেব একটি খাটের ওপর বসে আছেন। খাটটির পাশে কিছু মোড়া পড়ে থাকত, যার ওপর কখনো কখনো মহল্লার দু-একজন বয়স্ক লোককে বসে থাকতে দেখা যেত। বেশ কয়েকবার আমি এই লোকগুলোকে নীরবে দাবা খেলতেও দেখেছি।
পড়াশোনার কারণে আমি আমাদের বাড়ির ওপরের চিলেকোঠার একটি ঘরে থাকতে শুরু করেছিলাম। সেখান থেকে রাস্তার ওপারে সেই বারান্দার দরজাও দেখা যেত এবং এর ওপরের তলার দুটি ঘরও দেখা যেত। বারান্দায়, সামনের দিকে ফুলবিহীন পাতাবাহার গাছের টবের সারি ছিল এবং প্রতি দুই-তিন দিন পর পর একটি বাচ্চা মেয়েকে রুপার মোটা মোটা অলংকার পরে তামার প্রলেপ দেওয়া লোটা দিয়ে গাছগুলোতে পানি দিতে দেখা যেত। দুটি বাড়ির মাঝে আমাদের এখানকার বাগানও পড়ত এবং এত দূর থেকে তাকে শুধু একটি বাচ্চা মেয়ে বলেই মনে হতো।
পরে, তবে কবে তা বলতে পারব না, আমি জানতে পারলাম, সে এই বাড়ির কাজের মেয়ে এবং তাকে ‘খানম’ বলে ডাকা হয়। মহল্লার সকলেই এবং আশেপাশের সব দোকানদার কেবল তার সাথে পরিচিতই ছিল না, বরং তার সাথে হাসি-ঠাট্টাও করত। সে পাহাড়ি মেয়ে ছিল এবং সম্ভবত এই দম্পতির চেয়েও তার বয়স ছিল বেশি। কিন্তু তার উচ্চতা আট-দশ বছরের মেয়ের চেয়ে বেশি ছিল না। সম্ভবত এই কারণেই সবাই তার সাথে এমনভাবে কথা বলত, যেমন বাচ্চাদের সাথে বলা হয়। তার হাঁটা এমন ছিল যেন কেউ তাকে পেছন থেকে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে দিচ্ছে। আর সে যেভাবে হাঁটত, সেভাবেই কথা বলত। মনে হতো যেন প্রতিটি শব্দ তার মুখে এসে প্রথমে আটকে যায় এবং তার পরের শব্দটি তাকে ধাক্কা মেরে বের করে দেয়। তারপর নিজে বাইরে আসার জন্য তার পেছনে আসা শব্দটির ধাক্কার অপেক্ষা করে। মহল্লার ছেলেরা এবং কিছু দোকানদারও তার সাথে একইভাবে কথা বলত। যার কারণে সে কখনো কখনো রেগে যেত এবং হুমকি দিত, ‘পুলিশকে বলে দেব।’
কিন্তু সবাই জেনে গিয়েছিল, আসলে সে নিজেই পুলিশকে ভয় পায়। দুষ্টু ছেলেরা চুপিসারে তার পেছনে আসত এবং হেলে গিয়ে তার কানের কাছে জোরে বলত, পুলিশ! তাতেই সে লাফিয়ে উঠে নেচে নেচে পালাত। কয়েক কদম যাওয়ার পর থেমে গিয়ে আড়ষ্টভাবে বলত, ‘পুলিশকে বলে দেব।’
সে মহল্লার বাড়িগুলোতে যাতায়াত করত। বেশিরভাগই কাজের লোকদের সাথে কথা বলার জন্য… এবং এই দম্পতি সম্পর্কে আমাদের তথ্যের প্রধান উৎস ছিল সে। সে স্ত্রীকে বাঈ এবং স্বামীকে সাহেব বলত। তার কাছ থেকেই জানা গেল, তারা নিঃসন্তান। বাঈ’র আত্মীয়দের মধ্যে কেউ নেই। সাহেবের দূরের আত্মীয় অনেকে আছে, যাদের মধ্যে কয়েকজন এই শহরেই থাকে। কিন্তু তাদের সঙ্গে এই দম্পতির মেলামেশা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবে সেই আত্মীয়দের মধ্যে যখন কেউ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে বা কারও বাড়িতে মৃত্যু হয়, তখনই কেবল সাহেব সেখানে গিয়ে ঘুরে আসেন। বাঈ কোথাও যান না। তার হাঁটুতে পুরোনো ব্যথা আছে, যার কারণে তার বসা থেকে ওঠা খুবই মুশকিল এবং সিঁড়ি বেয়ে ওঠা একেবারেই অসম্ভব।
একবার খানম আমার মায়ের সামনে বাঈ’র এই অসুখের কথা বললে মা তাকে মালিশের একটি তেলের সহজ রেসিপি বললেন, যার একটি উপাদানের ওজন নিয়ে তার কিছুটা সন্দেহ ছিল। খানম চলে যাওয়ার পর বাবা ঘরের ভেতরে এলে মা তার কাছ থেকে সেই উপাদানের ওজন জানতে চাইলেন। এরপর বাঈ-সাহেবের গল্প শুরু হলো। জানা গেল, মা তাদের দুজনের অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা অবগত। তিনি জানালেন, বাঈ যৌবনে শহরের বিখ্যাত গায়িকা ছিলেন। তিনি বাঈ’র সেই নামটিও বললেন, যা সেই যুগে শহরের প্রত্যেক শৌখিন মানুষ জানত। মা আরও জানালেন, সাহেব ছিলেন পুরোনো রইসজাদা, ধনী পরিবারের সন্তান। তার সময় খারাপ যাচ্ছিল। কিন্তু তিনি বাঈ’র গানের সবচেয়ে বড় সমঝদার ছিলেন। সেই যুগেই বাঈ’র সাথে তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের পরে দুজনেই শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
‘আপনি কি তার গান শোনেননি?’ মা হেসে হেসে জিজ্ঞাসা করলেন।
বাবাও হেসে ফেললেন। ‘আমরা না শৌখিন ছিলাম, না রইসজাদা’, তিনি বললেন। ‘তখন স্কুলে পড়তাম। ফি-এর জন্য ছোটাছুটি থেকেই ফুরসত মিলত না। তবে তার গান শোনা না হলেও গানের খ্যাতি অবশ্যই শুনতে পেতাম।’
সাহেবকে আমি বেশিরভাগ সময় বারান্দার ভেতরে বসে থাকতে দেখতাম, যেখানে তার মুখাবয়ব পরিষ্কার বোঝা যেত না। কখনো কখনো তাকে বাড়ি থেকে বাইরে বের হতে বা বাহির থেকে বাড়িতে প্রবেশ করতেও দেখা যেত। তার হাতে খোদাই করা কাজের একটি কালো ছড়ি থাকত এবং তিনি শহরের সম্মানিত বয়স্কদের মতো ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরতেন। কিন্তু তার মাথায় শিকারিদের মতো একটি ইংরেজি হ্যাট অবশ্যই থাকত। তিনি ছড়িতে ভর দিয়ে খুব ধীরে ধীরে চলতেন। তবে এই সময়গুলোতেও আমি তাকে দূর থেকেই দেখতাম। বেশ কয়েকবার তাকে আমি বাজারেও দূর থেকে দেখতে পেয়েছি এবং আমি কেবল ছড়ি আর হ্যাটের কারণেই তাকে চিনতে পেরেছি।
বাঈকে আমি তেমন একটা দেখিনি, যেমনটা সাহেবকে দেখতাম। আমার থাকার জায়গা থেকে দেখা যাওয়া তাদের দুটি ঘরের একটির দরজা সবসময় বন্ধ থাকত। অন্য দরজাটি বেশিরভাগ সময় কেবল তখনই খোলা হতো যখন খানম টবে পানি দিত। তবে কখনো কখনো সেটা এমন সময়ও খুলে দেওয়া হতো যখন আবহাওয়া ভ্যাপসা হয়ে থাকত বা ভালো ঠান্ডা বাতাস বইত। এই সময়গুলোতে বাঈকে আমি ঘরের ভেতরে পালঙ্কের ওপর বসে থাকতে দেখতাম। বেশ কয়েকবার আমি দেখেছি, খানম তার চুলে চিরুনি চালাচ্ছে। একবার তিনি নিজেও খানমের চুল আঁচড়ে দিচ্ছিলেন দেখা গেল। এত দূর থেকে তার মুখাবয়বও ভালোভাবে বোঝা যেত না। কেবল এইটুকু অনুমান করা যেত, তিনি ভারী শরীরের একজন প্রবীণ নারী।
প্রথমে আমার ধারণা ছিল, সাহেব বোধহয় সবসময় নিচেই থাকেন। কিন্তু একদিন যখন সেই ঘরের দরজা খোলা ছিল, আমি দেখলাম, তিনি পালঙ্কের ওপর বাঈ’র সামনে বসে আছেন এবং কিছুক্ষণ পর পর সামনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন আর খানম বারবার তাদের দুজনের কাছে আসছে, ফিরে যাচ্ছে, আবার আসছে। আমার মনে হলো, তারা দুজনেই খাচ্ছেন। এরপর এই দৃশ্য আমি বেশ কয়েকবার দেখেছি। একবার এমনও দেখলাম, সাহেব জোর করে কোনো জিনিস বাঈকে খাওয়াতে চাইছেন এবং বাঈ এদিক-ওদিক মুখ ঘুরিয়ে মানা করছেন এবং খুব হাসছেন। ঠিক তখনই খানম পানি নিয়ে হাজির হলো। বাঈ তার কোমরে হাত দিয়ে মৃদুভাবে চাপরে দিলেন এবং সে কাঁধ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে হাসতে হাসতে ফিরে গেল।
আমার বাড়ির লোকেরা হয়তো ঠিকঠাক জানতে পারে, কিন্তু আমি অনুমান করেও বলতে পারব না, সাহেব এবং বাঈ কতদিন যাবত বারান্দাওয়ালা বাড়িতে থাকছিলেন। কারণ তাদের দুজনের প্রতি আমার তেমন কোনো আগ্রহ জন্মায়নি। আমার চারপাশের বর্ণহীন দৃশ্যগুলোর মধ্যে এই স্বামী-স্ত্রীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যাদের দেখা বা না দেখা আমার কাছে একই রকম ছিল। সম্ভবত এ কারণেই বেশ কয়েক দিন ধরে যে এই বাড়ির ওপরের ঘরের দরজা খোলা হয়নি এবং নিচের বারান্দার দরজাও ভেতর থেকে বন্ধ থাকত, তাতে আমার বিশেষ কোনো অনুভূতি হয়নি। যখন একদিন খানম আমাদের এখানে গরম পানি দিয়ে সেঁক দেওয়ার জন্য রবারের থলি চাইতে আসল, তখন জানা গেল, বাঈ’র শরীর কিছুদিন ধরে খুব খারাপ এবং সাহেব শহরের বাইরে কোথাও গেছেন। সেবা-যত্ন সম্পর্কে সে জানাল, সাহেবের আত্মীয়দের মধ্য থেকে বাঈ দুজন নারীকে ডাকিয়ে এনেছেন এবং তারা আজই এসে পৌঁছেছেন।
সেদিন সন্ধ্যায় আমি দেখলাম, বাঈ’র দুটি ঘরের দরজাই পুরোপুরি খোলা এবং ঘরগুলোতে দুজন নতুন নারী চলাফেরা করছে। পরের দিন সকালে দুজনের জায়গায় চার-পাঁচজন নারীকে দেখা গেল। তৃতীয় দিন বিকাল পর্যন্ত তাদের সংখ্যা আরও বাড়ল। চতুর্থ দিন সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পর সেই বাড়ি থেকে কান্নার শব্দ আসতে লাগল।
আমি কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বাড়ির লোকদের খবর দেওয়ার জন্য নিচে নামলে দেখতে পেলাম, খানম উঠোনে বসে কাঁদছে। সে জানাল, বাঈ কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছেন। সেবা-যত্নকারীরা তার শিয়রে জ্বালাবার জন্য লোবান চেয়েছেন এবং দোকানগুলো এখনো খোলেনি। আমার মা দালানের একটি আলমারির জিনিসপত্রের মধ্যে লোবানের পুরিয়া খুঁজতে খুঁজতে খানমের কাছে বাঈ’র অসুস্থতা-সহ অন্যান্য বিস্তারিত খবর জিজ্ঞাসা করছিলেন। সে সবকিছু খুব নিয়মমাফিক জানাল এবং এও জানাল, সাহেব এখনো ফেরেননি, এবং তিনি চলে যাওয়ার সময় বাঈ একেবারে ঠিকঠাক ছিলেন। খানম আরও জানাল, কোথাও যাওয়ার সময় সাহেব কেবল বাঈকেই বলতেন, তিনি কোথায় যাচ্ছেন।
আমি আবার আমার ওপরের ঘরে চলে এলাম। বাঈ’র বাড়িতে কান্নার শব্দ কমে গিয়েছিল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শব্দ প্রায় শেষ হয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরপর বারান্দায় নারীদের গাড়ি এসে থামছিল। তাদের সাথের পুরুষেরা, যারা আমাদের মহল্লার ছিল না, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত এবং ওপরে কান্নার শব্দ উঁচু হয়ে আবার শেষ হয়ে যেত। কিন্তু একবার আমি অনুভব করলাম, শব্দগুলো তীব্র হয়ে কমে যাওয়ার বদলে বেড়ে যাচ্ছে, বরং এখন একটি বিশৃঙ্খল কোলাহলে পরিণত হয়েছে। আমি আমার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালাম। বাঈ’র ঘরে এক অদ্ভুত হুলস্থূল চলছিল। কেউ কাঁদছিল না, সবাই চিৎকার করছিল, এবং সবার শব্দের ওপরে ছিল খানমের ধাক্কা খাওয়া কণ্ঠস্বর। প্রত্যেক নারী অন্য নারীর দিকে ছুটে গিয়ে কিছু বলছিল। কেউ এক জায়গায় স্থির হয়ে ছিল না। খানমকে তো এমন মনে হচ্ছিল যেন হঠাৎ আলোতে আসা কোনো বাদুড়, যা সারা ঘরে উড়ে বেড়াচ্ছে এবং একেকজনের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর রাস্তায় পুরুষালি কণ্ঠস্বর উঁচু হলে আমি বারান্দার নিচে তাকালাম। নারীদের সাথে আসা পুরুষেরা বারান্দার সামনে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছিল এবং মহল্লার দু-তিনজন লোক তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছিল। অনেকক্ষণ ধরে ওপর-নিচের হাঙ্গামা দেখার পর অবশেষে আমি দেখলাম, নারীরা বারান্দা থেকে বেরিয়ে পুরুষদের সাথে ফিরে চলে যাচ্ছে। তারা খুব জোরে জোরে কথা বলছিল এবং তাদের পুরুষেরা তাদের চুপ করানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু তারা নিজেরাও খুব জোরে জোরে কথা বলছিল। আমি বুঝতে পারলাম না, তারা সবাই আসলে কী বলছে। আমি আবার বারান্দার দিকে তাকালাম। দুটি ঘরের দরজাই বন্ধ ছিল। নীরবতা এমনভাবে ছেয়ে ছিল যেন সেখানে কিছুই ঘটেনি। তবে বাতাসের সাথে আমার দিকে লোবানের সুবাস ভেসে আসছিল।
আমি বাড়ির লোকদের এই হুলস্থূল কাণ্ডের খবর দেওয়ার জন্য নিচে নামলাম। খানম ইতোমধ্যেই আবার এসে উপস্থিত হয়েছিল এবং পুরো গল্প শুনিয়ে দিয়েছিল। আর এখন আমাদের বাড়ির নারীরা সেই একই গল্প পুনরাবৃত্তি করছিল। খানম জানিয়েছিল, বাঈ কয়েক দিন ধরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতেন। কিছুক্ষণ পর পর চমকে ওঠে সাহেবকে খুঁজতেন এবং আবার অজ্ঞান হয়ে যেতেন। একদিন আগে তার পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে এলো এবং তাকে একদম ঠিকঠাক মনে হতে লাগল। তিনি কিছু খেতে চাইলেন, তারপর খানমকে দিয়ে তার অলংকারের সিন্দুক বের করালেন এবং মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত অলংকার পরে নিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, বারান্দার দরজা যেন সাহেবের জন্য খোলা রাখা হয়। রাতভর তিনি পালঙ্কে বসে জেগে রইলেন। সকালে তিনি আবার সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করলেন, খানমকে দিয়ে চিরুনি করালেন এবং কাজলের কৌটা চাইলেন। খানম সেই কৌটা নিয়ে আসতে আসতেই তিনি চিরতরে নিভে যান।
সাহেবের অনেক আত্মীয় নারী এসেছিল। কান্নাকাটি শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর মাতমকারীরা বাঈ’র হাত-পা ও মুখের ওপর মুখ রেখে কাঁদতে ও বিলাপ করতে শুরু করল। এর মধ্যে একজন কাঁদতে কাঁদতে বাঈ’র মুখ থেকে মুখ সরাতেই অন্য একজন খেয়াল করল, বাঈ’র কানের দুল উধাও। সে জিজ্ঞেস করল, দুল গেল কোথায়। নারী বলল, যেখানে আংটি গেছে, এবং তৃতীয় একজন নারীর দিকে ইশারা করতে লাগল। বাঈ’র আঙুল থেকে আংটিও গায়েব ছিল। এই ছিল হুলস্থূলের শুরু। দেখতে দেখতে সবাই একে অপরের ওপর চুরির দোষ চাপানো এবং বাঈ’র সাথে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখিয়ে তার অলংকারগুলোর ওপর নিজের অধিকার জাহির করতে শুরু করল। কথা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, ঝগড়া করা নারীরা বাঈ’র ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃতদেহ একেবারে অলংকারমুক্ত, নারীদের ভাষায় ‘উলঙ্গ’ হয়ে গেল।
আমার কাছে মনে হলো, খানম যেন একটু বাড়িয়ে বলছে সবকিছু। বললাম, আমি নিজেও তো দেখছিলাম, সেখানে এমন লুটপাট চলছিল না তো। তারপর আমি কমবেশি যা দেখেছিলাম, তা বর্ণনা করলাম। খানম আমার বক্তব্য কিছুটা উদাসীনতা, কিছুটা তাচ্ছিল্যের সাথে শুনল এবং উত্তরে শুধু এতটুকুই বলল, সে তো নিজেই সেখানে উপস্থিত ছিল। তারপর সে জানাল, সকল আত্মীয় নারী রেগেমেগে চলে গেছে এবং সে বাঈ’র কাছে মহল্লার নারীদের বসিয়ে আমাদের এখানে শুধু এই জন্য এসেছে—আমরা যেভাবেই পারি সাহেবেকে যেন খুঁজে বের করে তাকে খবরটা দিই। আমার বাবাকে ভেতরে ডাকা হলো। সাহেব কোথায় থাকতে পারেন সে সম্পর্কে তার একেবারেই ধারণা ছিল না। কিন্তু তিনি শহরের দু-তিনজন পুরোনো লোকের কাছে, তার ধারণামতো যারা সাহেবের পরিচিত হতে পারেন, চিরকুট লিখে এক কর্মচারীর হাতে পাঠিয়ে দিলেন। এবার সবাই খেয়াল করল, খানমের নাক ও কান থেকে কিছুটা রক্ত বের হচ্ছ। আরও দেখা গেল, মোটা মোটা রুপার যে অলংকারগুলো সে সবসময় পরে থাকত, এখন না তার হাত-পায়ে আছে না চেহারায়। আমার মা চিৎকার করে উঠলেন, ‘আরে, তোরগুলোও কি খুলে নেওয়া হয়েছে?’
‘না…’ খানম বলল, ‘সে নাকি বাঈ’র অলংকারগুলো উদ্ধার করার জন্য একেক জন নারীকে ধরে ধরে তাদের তল্লাশি নিচ্ছিল, কিন্তু নারীরা তাকে ধাক্কে সরিয়ে দিচ্ছিল। শেষে সে নিজের অলংকারগুলোও খুলে খুলে নারীদের দিকে ছুড়ে মেরে বলল, ‘নাও, এগুলোও নিয়ে যাও।’
‘সেটাও তো আমাদের বাঈ’র গহনা ছিল’, শেষে সে বলল এবং বিলাপ করে কাঁদতে শুরু করল। তাকে বহু কষ্টে এবং অনেক দেরিতে চুপ করানো গেল। রক্ত বন্ধ করার ওষুধ সে চুপচাপ লাগিয়ে নিল এবং সেখানেই বসে কর্মচারীর ফিরে আসার অপেক্ষা করতে লাগল। তাকে কিছু খেতে দেওয়া হলে সে কোনো আপত্তি ছাড়াই মাথা নিচু করে খেয়ে নিল।
কর্মচারী চিরকুটগুলোর জবাব নিয়ে ফিরে এলো। কেউ বলতে পারল না, সাহেব কোথায় গেছেন, বরং তাদের এটাই জানা ছিল না, তিনি ফিরে এসে এই শহরেই থাকতে শুরু করেছেন।
খানম ওঠার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, ইতোমধ্যেই বাইরের কর্মচারীরা নতুন খবর নিয়ে এলো। কেউ থানাতে খবর দিয়েছিল যে বাঈকে দিন-দুপুরে খুন করে তার অলংকার লুট করা হয়েছে। এইমাত্র পুলিশ এসে লাশ তাদের হেফাজতে নিয়েছে এবং বয়ান নেওয়ার জন্য খানমকে খুঁজছে। এই সময় আমরা আবারও টের পেলাম, খানম পুলিশকে কতটা ভয় পায়। অলংকার ছাড়া এমনিতেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে ছিল, এখন তার ওপর আরও বেশি নির্জীবতা ছেয়ে গেল। আমার বাড়ির লোকেরা এই পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করছিল আর সে বিস্ফারিত, জ্যোতিহীন চোখে একেকজনের মুখের দিকে দেখছিল। উপরন্তু আমার এক মামা, যিনি মামলা-মোকদ্দমায় বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং কোনো এক মামলার সূত্রেই কানপুর থেকে এসেছিলেন, তিনি এই বলে তাকে আরও ভয় পাইয়ে দিলেন, এই মামলা অনেক দূর পর্যন্ত গড়াবে এবং তাকে বারবার সাক্ষ্য দেওয়ার সময় পুলিশ ও উকিলদের জেরার জবাব দিতে হবে। এবার যখন তাকে বয়ান দিতে যাওয়ার কথা বলা হলো, তখন সে মাটিতে আছাড় খেতে লাগল। সে কারও কোনো কথা শুনতে রাজি ছিল না এবং দৌড়ে দৌড়ে আমাদের বাড়ির ঘরগুলোতে ঢুকে যাচ্ছিল। অবশেষে তাকে জোর করে বাইরে কর্মচারীদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের জানিয়ে দেওয়া হলো, এই সময় তার আমাদের এখানে লুকিয়ে থাকাটা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।
যেসময় ছোট ছোট পা চালিয়ে চিৎকার করতে থাকা খানমকে প্রায় কোলে তুলে বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন আমি আমার মামাকে দেখলাম, তিনি আমার বাবা ও মাকে একপাশে নিয়ে গিয়ে চুপি চুপি কিছু বলছেন। তারপর তিনি ইশারা করে আমাকে কাছে ডেকে জানালেন, তিনি আমাকে ঠিক এখনই তার সাথে কানপুর নিয়ে যাচ্ছেন। ‘এবং এখানে বা সেখানে’, তিনি জোর দিয়ে বললেন, ‘কাউকে বলবে না যে তুমি কিছু দেখেছ, নয়তো সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য শুধু ঘুরতে হবে।’
মা দেখতে দেখতে সফরের জিনিসপত্র গুছিয়ে দিলেন। আমরা বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে পেছনের গলিতে এলাম। গলি থেকে অন্য রাস্তায় বের হলাম এবং রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা দিলাম।
চার-পাঁচ দিন পর আমাকে কানপুর থেকে ফিরিয়ে আনা হলো। বাড়িতে পৌঁছে আমি মাত্র তিনটি কথা জানতে পারলাম। এক. খানম আমাদের কর্মচারীদের মধ্যে কারও আত্মীয়ের বাড়িতে লুকিয়ে ছিল, কিন্তু পরের দিন সেখান থেকেও গায়েব হয়ে গেছে। দুই. বাঈকে আমার বাবার অনুমতিতে, বরং তারই প্রস্তাবে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে, এবং তিন. সাহেবের এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ নেই।
আমি ওপরে গিয়ে সেই বাড়িটি দেখলাম। বারান্দায় রাখা টবগুলোর বেশিরভাগ গাছ শুকিয়ে গিয়েছিল, এবং ওপর-নিচের সব দরজা বন্ধ ছিল। এমন মনে হচ্ছিল যেন সেগুলো বছরের পর বছর খোলা হয়নি।
তিন.
সাহেব চতুর্থ দিন দুপুরে আমাদের এখানে এলেন। আগের মতোই ছড়িতে ভর দিয়ে এবং শিকারি হ্যাট পরে। আমি তখন বাড়ির সামনের বাগানে একটি কেয়ারি তৈরি করছিলাম এবং বাবা কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে দিক নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। সাহেবও সেখানেই এলেন। বাবা এগিয়ে গিয়ে তাকে প্রথমে স্বাগত জানালেন, তারপর সমবেদনা জানালেন। সাহেব বাঈকে আমাদের কবরস্থানে জায়গা দেবার জন্য বাবাকে ধন্যবাদ দিয়ে তখনই ফিরে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বাবা তাকে থামালেন। একটি তুঁত গাছের নিচে বিছিয়ে রাখা বেঞ্চে বসে দুজন কথা বলতে লাগলেন এবং আমি আমার মতো কেয়ারি তৈরি করছিলাম। সাহেব প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় ধরে বসে রইলেন। তিনি মৃদু কণ্ঠে কথা বলছিলেন, যার কারণে তার কথাগুলো আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম না। তবে অনুমান করছিলাম, তিনি বাঈ’র গুণাবলি বর্ণনা করছেন, যেভাবে মৃতদের গুণাবলি বর্ণনা করা হয় আরকি! এবং উদাহরণস্বরূপ কিছু ঘটনাও শোনাচ্ছিলেন মনে হলো।
অবশেষে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বাবা আমাকে ইশারা করলেন, আমি যেন তাকে রাস্তার দিকের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি। তিনি নিজেও বাগান সংলগ্ন চবুতরা পর্যন্ত সাহেবের সঙ্গে সঙ্গে এলেন। চবুতরার বাইরের সিঁড়ির কাছে থেমে সাহেব তার সঙ্গে মোসাফা করলেন। সিঁড়ি বেয়ে নেমে দুকদম এগিয়ে গেলেন, তারপর থামলেন এবং ছড়ির ওপর তার পুরো শরীরের জোর দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন।
‘আপনি শুধু আমাকে এতটুকু বলুন’—তিনি উঁচু কণ্ঠে বললেন, কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই চুপ হয়ে গেলেন। বাবা কিছু সান্ত্বনাসূচক বাক্য বললেন এবং সাহেব ঘুরে উঠে ছড়িতে ভর দিয়ে এগিয়ে গেলেন। গেটে পৌঁছে তিনি আমার দিকে না তাকিয়ে আস্তে করে বললেন, ‘ব্যস বেটা, বেঁচে থাকো।’ এবং গেট দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে গেলেন।
সেই সপ্তাহেই একদিন আমি আমার ঘরের রাস্তার দিকের দরজা খুললে দেখতে পেলাম, সাহেবের বারান্দার সামনে ঘর-গৃহস্থালির জিনিসপত্রে বোঝাই দুটি টাঙা দাঁড়িয়ে আছে এবং সেগুলোর পাশে মহল্লার কিছু লোক নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। আমি আরও খেয়াল করলাম, বারান্দা থেকে টবের সারি উধাও। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর সাহেব বারান্দা থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করলেন। কড়াতে পিতলের একটি বড় তালা লাগালেন এবং চাবি মহল্লার একজন বয়স্ক লোকের হাতে দিয়ে দিলেন। তারপর তিনি একে একে সবার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। এতে বারবার তার হ্যাট জায়গা থেকে সরে যাচ্ছিল, যা তিনি আবার মাথায় বসিয়ে অন্য লোকের সঙ্গে কোলাকুলি করছিলেন।
সামনের টাঙা চলতে শুরু করল। সাহেব পেছনের টাঙার সামনের আসনে গাড়োয়ানের পাশে বসলেন। টাঙা সামান্য এগিয়ে আবার থেমে গেল। সাহেব নিচে নেমে গাড়োয়ানকে কিছু একটা বললে সে অন্য দিক থেকে নেমে এলো। পেছনে রাখা একটি সিন্দুক এবং কাঠের স্ট্যান্ডে লাগানো পানির সরাহি নামিয়ে দুটি জিনিসই সামনে নিয়ে রাখল। সাহেব সামনে থেকে পেছনের আসনে এসে বসলেন। তিনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মহল্লার লোকেদের দিকে তাকালেন এবং সালামের উদ্দেশ্যে হাত তুলে ধরলেন। ঘোড়ার লাগামটি হালকা ঝাঁকুনি খেল এবং টাঙাটি সামনের টাঙার পেছনে পেছনে চলতে শুরু করল।
অনেক লম্বা গল্প তবে বিরক্তি আসেনি। পড়তে ভাল লেগেছে। অসাধারণ লেখা!