প্রথম অধ্যায়
কথিত আছে, রুমের বাদশাহ নিরোকে যখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছিল, তখন সে আক্ষেপের সুরে জনতার দিকে তাকিয়ে কেবল তিনটি শব্দ বলেছিল—‘Qualis artifex pereo!; আফসোস, দুনিয়া আমার মতো একজন দুর্লভ শিল্পীকে হারাল!’
প্রায় এমনই একটা কথা বলল এই ইটালিয়ান লিস্টার লোকটি। একটু আগেই তার সঙ্গী তাকে তার হেভি বাইক-সহ একটি নিগ্রোর ট্যাক্সিতে করে তুলে নিয়ে গেছে। বাইকের অবস্থা ভেঙেচুরে শেষ!
আমরা এখন নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন এলাকায় আছি—দৈত্যের মতো বিশাল বিশাল বাণিজ্যিক ভবনগুলোর পেছনের এক নির্জন, অন্ধকার গলিতে। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা। দূরে কোনো এক ঘড়িয়াল একটু আগেই রাত দুটোর ঘোষণা করল। চড়া বৃষ্টিতে আমরা ভিজে সপসপে। কনকনে বাতাসের চোটে জ্যাকেট ও কোটের কলার খাড়া করে রেখেছি প্রায় সবাই। একটা বিশেষ খেলা খেলতে এই নিরিবিলি গলিতে আমাদের জড়ো হওয়া। খেলাটির নাম—দ্য লাস্ট সারভাইভার বা শেষ বিজয়ী।
আগে এই খেলাটি আমরা ১৩ নং রোডে, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের গলিতে খেলতাম। তো, আমাদের গাট্টাগোট্টা, হেভি মোটরসাইকেলের ফাটা সাইলেন্সারের তীব্র, বেসুরো শব্দে এলাকার লোকেদের ঘুম হারাম হয়ে গেল। অতিষ্ঠ হয়ে মাঝরাত পর্যন্ত তাদের জেগে থাকতে হলো। শেষ পর্যন্ত মামলা চলে গেল থানায়। আমাদের ঢোকানো হলো হাজতে। আমাদের অভিভাবকদের থেকে মোটা অংকের জামানত নিয়ে তবেই এনওয়াইপিডি বা নিউ ইয়র্ক পুলিশ আমাদেরকে ঘরে ফিরতে দিল।
সেদিনের পর থেকে বাধ্য হয়েই আমাদেরকে ম্যানহাটনের এই জনশূন্য গলিগুলো চষে বেড়াতে হচ্ছে। এলাকাটা বাণিজ্যিক হওয়ায় সন্ধ্যে নামতেই ফাঁকা পড়ে যায়। তাই রাতভর আমাদের হুল্লোড়-বাজিতে বাধা দেওয়া বা মামলা করার মতো কেউ নেই এখানে।
তবে, বেশ রাত করে ফেললে, এলাকার নিগ্রো ছিনতাইকারীদের হাতে লুট হওয়ার ঝুঁকি সবসময়ই বর্তমান। তাই আমরা সাধারণত চার-পাঁচজনের দল বেঁধে যাওয়া-আসা করি।
আমাদের এই খেলাটা নামের মতোই ভীষণ অদ্ভুত এবং মারাত্মক। এর জন্য এমন একটা চিপা গলির দরকার, যেখান দিয়ে কেবল একসাথে সর্বোচ্চ দুটো বাইক যেতে পারে। একদম গলির মাথাটা আরও চিপা হতে হয়। যেন মাথায় গিয়ে কেবল একটা বাইকই বেরোতে পারে। এজন্য গলির মাথায় লোহার গেট অর্ধেকটা লাগিয়ে বা গেট না থাকলে অন্য কোনো ভারী কিছু বসিয়ে রাস্তার মুখটা অর্ধেক বন্ধ করে রাখি। সেখান দিয়ে তখন কেবল একটা বাইকই বেরোতে পারে।
খেলাটি হলো : দুজন আরোহী মোটরসাইকেলে চড়ে, তাদের হেভি বাইকের পুরো গতিতে, বুলেটের বেগে চিপা গলির মুখ গলে কে আগে বের হতে পারে, এই।
১৭০-১৮০ কিলোমিটার বেগে জানবাজ আরোহী দুজন যখন প্রাণপণে গলির শেষ মাথার দিকে ছুটে, তখন তাদের মধ্যে কেবল একজনই সহি-সালামতে গলি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। অপরজন দেয়ালে, আর না হয় লোহার গেটে ধাক্কা খেয়ে সোজা হসপিটালে। সেখানে শুয়ে শুয়ে সপ্তাহভর চলে ডাক্তারের বিল গণার পালা। হসপিটালটি আমাদের এই প্রতিযোগিতা-ক্ষেত্রের সবচেয়ে কাছের ‘গ্রেটার নিউ ইয়র্ক হসপিটাল।’
রাত এগারোটা থেকে শুরু হয়েছে এই খেলা। এখন পর্যন্ত তিনজনের হাড়গোড় ভেঙে চুরমার। এই ইতালীয় রোমিও ছিল তৃতীয়।
এবার ‘শেষ বিজয়ী’ দৌড়ের পালা আমার। আমার বিপরীতে পড়েছে আবিসিনীয় যুবক টম। টম এখন আমার অপেক্ষায় বসে আছে। বাইকে বসে রেস দিয়ে এক চাকায় করে বাইকটা বৃত্তাকারে ঘ্রুম ঘ্রুম করে ঘোরাচ্ছে।
রেসের আগে তার দিকে হেলমেট বাড়িয়ে দিতেই, হেলমেটটা ছুঁড়ে দূরে ফেলে দিল সে। তার মানে আমাকেও কোনোরকম সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই এই প্রতিযোগিতায় লড়তে হবে।
আশেপাশে দাঁড়ানো দুই দলের সমর্থকদের চিৎকার ও স্লোগান, ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।
প্রথমেই জ্যাকেটের জিপারটা টেনে বন্ধ করে, তারপর মোটরসাইকেলের দিকে মনোযোগী হলাম আমি। মোটরসাইকেলের পাওয়ারি হেডলাইটের আলো প্রচণ্ড উজ্জ্বল। তবুও কয়েক ফুট সামনের জায়গাটাও ঝাপসা হয়ে আছে। কিছুই দেখা যাচ্ছে না বৃষ্টির কারণে।
আমি আমার বাইকের চেইন ও গিয়ার ঠিক করতে করতে বাস্সামকে একপাশে সরে যেতে ইশারা করে, নিজে গিয়ে বসলাম বাইকের আসনে।
আমি আয়ান। আয়ান আহমেদ। আমেরিকান। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। আমার বয়স তখন পাঁচ—যখন বড় ভাই বাস্সাম এবং বাবা-মার সাথে আমেরিকায় চলে আসি। এরপর গত বিশ বছরে টেনেটুনে বড় জোর বিশ দিনের জন্যও দেশে যাইনি।
হ্যাঁ, চার বছর আগে যখন মা-বাবা একসাথে মারা গেলেন—তখন গিয়েছিলাম। হাইওয়েতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন তাঁরা, আর দুর্ঘটনায় স্পট ডেথ। তাঁদের অসিয়ত মোতাবেক মৃতদেহ পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হলো। সঙ্গে গেলাম আমি ও বাস্সাম।
এমনিতে বাস্সাম যদিও বয়সে আমার চেয়ে এক বছরের বড়; কিন্তু বেশিরভাগ সময় সে-ই আমার ভয়ে তটস্থ থাকে বা আমার বকাঝকা খায়।
বাবা-মাকে হারানোর পর, নিউ ইয়র্কে আমাদের আপন বলতে কেবল আরেফিন মামাই বাকি রইল। গ্রাউন্ড জিরোর দিকে একা থাকেন তিনি। আরেফিন মামা হলেন আম্মার বড় ভাই। ছোট থেকেই তিনি আমাদের দুই ভাইকে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু দুনিয়ার এই দ্রুততম শহরে, তড়িৎগতির জীবন সামলে তাঁর সঙ্গে দেখা হতে হতে সপ্তাহ পেরিয়ে যায়।
আমি আর বাস্সাম শহরের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করছি। বাস্সাম সন্ধ্যায় একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করে, আর আমি করি আওয়ারাগিরি!
সত্যি বলতে, আমাদের দুজনের সমস্ত খরচপাতি, ফুর্তিবাজি আর ঘরের সমস্ত খায়-খরচও বাস্সামই বহন করে।
কঠোর পরিশ্রম ছোট থেকেই আমার ধাতে নেই। তাছাড়া এই শ্বেতাঙ্গদের উলটাপালটা কথা আমার একেবারেই সহ্য হয় না। এজন্য ছোট থেকে আজ পর্যন্ত বাস্সামের অর্ধেক জীবন পার হয়েছে আমার ঝগড়া-বিবাদ মেটাতেই।
আমাদের খরচ চালাতে বাস্সাম রাতদিন মেহনত করে। কিন্তু তার দেওয়া টাকা আমার কাছে সবসময় কমই মনে হয়। তাই একরকম বাধ্য হয়েই আমাকে নিজের উপার্জনের জন্য উলটোপালটা বাজি ধরতে হয়, এবং এমনসব খেলা খেলতে হয়, যেগুলো থেকে মুহূর্তেই সপ্তাহের খরচ তুলে আনতে পারি।
এখনো তেমনই একটি বাজির জন্য এই অন্ধকার গলিতে জড়ো হয়েছি আমরা।
ভার্সিটিতে এক ক্লাসমেট এই ‘দ্য লাস্ট সারভাইভার’ খেলাটির কথা বলল, আর বাজির পরিমাণ ও পুরস্কারের কথা শুনে সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলাম আমি।
বাইকের ক্লাচ চেপে বাস্সামের দিকে বিদায়ী দৃষ্টিতে তাকিয়েছি আমি, আর বাস্সামও শেষবারের মতো অনুরোধ করছে, ‘আরে ইয়ার, বাদ দাও। এটা খুবই বিপজ্জনক খেলা। আগামী সপ্তাহে ওভারটাইম করে তোমার হাত খরচের টাকা কিছু বাড়িয়ে দেব নে।’
আমি মুচকি হেসে আমার এই আলাভোলা ভাইটাকে খ্যাপালাম। সে কী করে বুঝবে, নিজ হাতে কামাইয়ের মজা যে কী!
বাস্সামকে আমি পরামর্শ দিলাম, ‘দেখতে না পারলে চোখ বন্ধ করে ফেলো। আয়ান কখনো তার বাজি থেকে পিছু হটে না।’
বাইক গিয়ারে রেখে জোরে জোরে অ্যাক্সিলেটর দাবাচ্চি আর পতাকা ওড়ানো ছেলেটার ‘দৌড়াও’ ইশারার অপেক্ষা করছি।
আমরা এখন তুলনামূলক খোলামেলা একটা গলিতে দাঁড়িয়ে। আমাদের থেকে ঠিক দুশো গজ সামনে থেকে চিপা গলির শুরু। গলিটার শেষ মাথা লোহার পাত বসিয়ে অর্ধেক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
যেসব নিগ্রোরা এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, তারাই তাদের পুরনো ভাঙাচোরা বেডফোর্ড ট্রাকে করে এসব জিনিসপাতি নিয়ে আসে। জায়গা ঠিক করা এবং বাকি সমস্ত ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও তাদের।
বাজি ধরতে হলে অগ্রিম কুড়ি ডলার ফি তাদের কাছে জমা দিতে হয়। এটা বাধ্যতামূলক। দুঃখজনক বিষয় হলো, আমি আমার ফি-টাও বাস্সামের পকেট থেকেই নিয়ে দিয়েছি।
ও সবসময় আমাকে এসব কাজ থেকে বারণ করে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাকে কোনো সাহায্য করবে না বলে ভয় দেখায়। কিন্তু আমি জানি, ও আমাকে কখনোই একা ছেড়ে যাবে না। তাই অবশেষে আমার কথা তার মেনে নিতেই হয়।
আজ সন্ধ্যায়ও ঠিক এটাই ঘটল। বাজি নিয়ে ওর সাথে ঝগড়া করে ওর রেস্টুরেন্ট থেকে আমি ম্যানহাটনে ফিরে এলাম, তার দুই ঘণ্টা বাদেই সেও এসে উপস্থিত। রাগে গজগজ করতে করতে নিগ্রোদের কাছে আমার ফি-টাও জমা দিয়ে দিল।
নিগ্রো দলটি আরও কিছুক্ষণ বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করল। কিন্তু তা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এখন তো গলিতে রীতিমতো পানি জমতে শুরু করেছে! লোহার জালের ভেতর দিয়ে দুই ধারের নর্দমার ছলাৎ ছলাৎ পানি গড়ানোর শব্দও কানে আসছে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, অপেক্ষা করা বৃথা। তাই প্রতিযোগিতা শুরু করা যাক।
আমাদের সামনে ভিড় করা যুবকদের জটলা ফটাফট সরে গেল। সবাই দেয়ালের পাশে দু’ধারের ফুটপাথে গিয়ে দাঁড়াল। পতাকা-ওয়ালা ছেলেটা চিৎকার করে উঠল—‘তিন… দুই… এক…!’
আমার আর আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর বাইক দুটি যেন কামানের গোলার মতো লাফিয়ে তীব্র বেগে ছুটতে লাগল।
তারটা নতুন মডেলের সুপার ১৮০ বাইক, যেখানে আমার বাইকটা কিছুটা পুরনো। ওটার দেখভাল আবার আমি আর বাস্সাম মিলে নিজেরাই করি। মূলত আমরা দুজনই আমাদের বাইকের মেকানিক। আর বাস্সাম তার এতদিনের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমস্ত জ্ঞান এই বাইকের গতি ও কার্যকারিতা বাড়ানোর পেছনে ব্যয় করে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আমার আর টমের বাইকের গতি প্রায় শয়ের ঘর ছুঁই ছুঁই। কিন্তু এই মুহূর্তে বাইকের ডিজিটাল মিটারে দ্রুত বাড়তে থাকা ঝলমলে সংখ্যাগুলোর দিকে তাকানোর ঝুঁকি আমি নিতে পারছি না। কারণ চিপা গলিটা ঠিক আমার সামনেই।
বহু আনাড়ি চালক তো এই গলির শুরুতে এসেই দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে চিতপটাং। প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে শুরুর আগেই। কারণ প্রচণ্ড বেগে এই চিপা গলিতে সোজা ঢুকে পড়াটাও অসম্ভব দক্ষতার ব্যাপার। বিশেষ করে তার বাইকের গাঘেঁষে যখন, একই গতিতে বিদ্যুৎবেগে আরও একটি বাইক একেবারে উড়ে উড়ে ছুটছে।
এসব প্রতিযোগিতায় পুরনো ও ধূর্ত খিলাড়ি টম। গলিতে ঢোকার আগেই সে আমাকে ভয় দেখাতে লাগল। আমাকে বিভ্রান্ত করতে বাইকের সামনের চাকা সামান্য বাঁকিয়ে, ফটাফট সোজা করে ফেলল—যাতে আমি তার থেকে কয়েক ইঞ্চি পিছে পড়ে যাই।
কিন্তু আমি জানি, যতই খিলাড়ি হোক টম, এক-দুই সেকেন্ডের বেশি তার বাইকের চাকা বাঁকিয়ে রাখতে পারবে না। এমন করলে সে নিজেই দেয়ালে ধাক্কা খেতে পারে। তাই আমি ব্রেকে চাপ বাড়ালাম না, স্বাভাবিক রাখলাম গতি।
পরের মুহূর্তেই আমরা দুজন সুড়ঙ্গের মতো এই গলিতে তীব্র বেগে ঢুকে পড়লাম। গলির মেঝেতে টায়ারের ঘষায় শূন্যে কিছু স্ফুলিঙ্গও ছিটকে উঠল।
প্রচণ্ড চিপা এই গলি। এতটাই চিপা যে, আমাদের দু’জনের দুই পাশের দুই কাঁধ—প্রায় দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
এই পর্যায়ে চালকের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো, তার বাইককে একদম নাকসোজা রেখে, যতদূর সম্ভব শেষ সীমা পর্যন্ত দ্রুতবেগে চালিয়ে যাওয়া। সামান্যতম অসাবধানতাও আমাদের দুজনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। কারণ একজন পড়ে গেলে অন্যজন আপনা আপনিই তার কবলে পড়বে। দেয়ালের সাথে বা মোটরসাইকেলের নিচে পিষ্ট হয়ে আমাদের ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।
গলির বন্ধ কোণাটা কোনো ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো মুহূর্তে মুহূর্তে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। হঠাৎ একটু বেখেয়ালি হয়ে সামান্য বাঁ দিকে ঝুঁকতেই, আমার বাঁ কাঁধের লেদার-জ্যাকেটের একাংশ দেয়ালের ঘষটায় ছিলে গিয়ে বাতাসে উড়তে লাগল। মুহুর্তেই মরিচের গুঁড়ার মতো জ্বলতে লাগল আমার ছিলা-কাঁধ। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভ্রুম ভ্রুম করে টম তার বাইকের পুরো গতি এক ঝটকায় তুঙ্গে উঠিয়ে দিল।
তার বাইকের আগার চাকা আমার বাইকের থেকে কয়েক ইঞ্চি সামনে চলে গেল। টম ভারি দক্ষহাতে তার বাইকটি গলি থেকে বের হওয়ার সুড়ঙ্গ-পথের দিকে ঠেলে নিয়ে চলল।
সুড়ঙ্গের মুখ গলে বাইরের নীলচে আলো ভেতরে আসছে। সেই আলোর আয়তকার টুকরোটি মহাশূন্যে ছুটে বেড়ানো কোনো উল্কাপিণ্ডের মতো আমাদের অস্তিত্বকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। আর তখনই টম তার দক্ষতা দেখাল। সে শরীরকে সংকুচিত করে, কোনো সাঁতারুর মতো বাইকের সিটে শুয়ে পড়ল। দক্ষ ডুবুরিরা যেভাবে উঁচু থেকে ঝাঁপ দিয়ে জলের পিঠ গলে নিজেকে অতল গভীরে নিয়ে যায়, ঠিক তেমনই টমও নিজেকে এই সরু গলির শেষ প্রান্ত থেকে বাইরের নীল আলোর সমুদ্রে পার করে দিল।
শরীরের সবটুকুন শক্তি দিয়ে আমি সামনের ও পেছনের চাকার ব্রেক চেপে ধরলাম। তবুও বাইকটা সামলাতে পারলাম না। আমার বাইক তেরছা হয়ে উড়ে উড়ে প্রচণ্ড শক্তিতে লোহার পাতের সঙ্গে গিয়ে ধাক্কা খেল। ঠিক পরের মুহূর্তেই আমার শরীরও গিয়ে ধাক্কা খেল সেই পাতের সঙ্গে।
তবে সৌভাগ্য আমার, ভারসাম্যহীন দেহ ধাক্কা খাওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে, আমার হেভি বাইকের সমস্ত ওজন গিয়ে হামলে পড়ে সেই পাতের ওপর। ফলে পাতটি অনেকটা বাঁকা হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। আমার গায়ে ধাক্কা লেগে সেটি বাতাসে লাফিয়ে ওঠে। আর আমিও গিয়ে আছড়ে পড়ি পিচঢালা পথে—ডিগবাজি খেতে খেতে। এবং জ্ঞান হারাই সাথে সাথে।
আমার বাইক ভেজা রাস্তায় ঘষঘষ করে পিছলে কোনদিকে গিয়ে যে ধাক্কা খেয়েছে, তা বুঝতেও পারিনি। ক্ষতবিক্ষত শরীরে বৃষ্টিতে ভিজে জবজবে রাস্তায় পড়ে রইলাম আমি।
এরপর যখন চোখ খুলল, দেখলাম, সব ছেলেরা আমার চারপাশে জড়ো হয়ে আছে। আমার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। মাথাটা আমার বাস্সামের কোলে। অস্থির হয়ে পড়েছে সে। আমার গালে আলতো করে চাপড় দিচ্ছে আর বলছে, ‘আয়ান, চোখ খোলো! ঠিক আছ তো তুমি? কথা বলছ না কেন? আয়ান, এই আয়ান!’
আস্তে আস্তে চোখ খুললাম আমি। আকাশ থেকে পড়ন্ত ঝরঝর ফোঁটাগুলো যেন আমার দরদর অশ্রু হয়ে গেল।
‘হ্যাঁ, ঠিক আছি। শুধু মনে হচ্ছে কিছু হাড়গোড় হয়তো নড়েচড়ে গেছে’—বললাম আমি।
হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার ডান হাঁটু থেকেও রক্ত ঝরছে। নীল জিন্সটা লাল হয়ে গেছে। নিগ্রোরা যতটুকু সম্ভব তাদের তথাকথিত ফার্স্টএইড দিয়ে মলম-পট্টি করে দিচ্ছে। কিন্তু আমার পুরো শরীর এখনো যেন ফোঁড়ার মতো তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে।
বিজয়ী টম আমাকে হাত ধরে দাঁড় করাল।
‘ওয়েল প্লেড—ভালো খেলেছ ছেলে!’ টম হাসল। ‘কিন্তু জানো আয়ান, আজ তুমি আমার কাছে কেন হারলে?’
জিজ্ঞাসার চোখে টমের দিকে তাকালাম আমি, ‘কারণ আমার বাইকের মডেল তোমার বাইকের থেকে তিন বছরের পুরোনো?’
মুচকি হাসল টম, ‘না, বাইকের মডেল এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আসল জিনিসটা হলো কিলার ইন্সটিঙ্কট। যতক্ষণ না তোমার মধ্যে প্রতিপক্ষকে শেষ করে দেওয়ার এই সহজাত প্রবৃত্তি তৈরি হবে, ততক্ষণ তুমি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। যেমন জঙ্গলের হিংস্র প্রাণীদের মধ্যে নিজের সুরক্ষা ও বেঁচে থাকার জন্য অন্য পশুকে ছেঁড়াফাড়ার নীতি আছে। ঠিক তেমনই আমাদের এই কথিত সভ্য দুনিয়ারও কিছুটা একইরকম নীতি। আমি পুরো রেস-চলাকালীন অনুভব করছিলাম, তুমি নিজেকে বাঁচানোর পাশাপাশি আমাকেও বাঁচানোর চেষ্টা করছ। আর এটাই ছিল তোমার আসল ভুল। জেতার জন্য অন্যকে পিষে ফেলার জজবাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। পরেরবার যখন আমার মুখোমুখি হবে, এই পাশবিক প্রবৃত্তি⏤কিলার ইন্সটিঙ্কট ছাড়া আসবে না। সম্রাটরা যখন তাদের বিনোদনের জন্য গ্ল্যাডিয়েটরদের ময়দানে ক্ষুধার্ত সিংহের সামনে নামাতেন, তখনো এই সহজাত প্রবৃত্তিই গ্ল্যাডিয়েটরকে বাঁচাত। নয়তো কেবল তার আধ-খাওয়া লাশই মাঠ থেকে বাইরে যেত।’
মন দিয়ে টিমের কথাগুলো শুনছি আমি। সে হয়তো ঠিকই বলছে। ‘মারো অথবা মরো’—এই নীতিই আমাদেরকে বিজয়ের কাছাকাছি রাখে।
আমার বাইকটি দুমড়ে মুচড়ে একদিকে পড়ে আছে। তার রেডিয়েটর থেকে গরম বাষ্প উঠে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ক্যাচাল চুকিয়ে বাস্সাম আমাকে এবং ভাঙাচোরা বাইকটিকে একটা ট্যাক্সিতে ঢুকিয়ে নিল। আমরা অ্যাপার্টমেন্টের নিচে এসে নামলাম। এখন ভোর প্রায় পাঁচটা বাজতে চলেছে। বৃষ্টিও থেমে গেছে।
এরপর তিন দিন বিছানায় পড়ে পড়ে কাটল। বাস্সামের সেবাশুশ্রূষা, শরীরে সেঁক দেওয়া আর বকাঝকা সমানতালে চলল। আমার জন্য তার ক্লাস এবং সন্ধ্যার ওভারটাইমেরও অনেক ক্ষতি হচ্ছে, তাই চতুর্থ দিন আমি জোর করে তাকে ইউনিভার্সিটিতে পাঠালাম। তবে পুরোদস্তুর ঠিক হয়ে আমার নিজের ক্লাস করতে করতে প্রায় দুসপ্তাহ লেগে গেল।
বাইকটাও নেই। ওটার এখনো মেরামত চলছে গ্যারেজে। তাই আমাকে ইউনিভার্সিটির জন্য সাব-স্টেশন থেকে পাতালট্রেন ধরতে হলো।
***
দীর্ঘ দুসপ্তাহ পর বাইরের খোলা আবহাওয়ায় এসে, ঝলমলে রোদে আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ইউনিভার্সিটিতেও আমার গ্রুপ বরাবরের মতো ক্লাসরুমের বদলে ক্যাফেতে এসেই হুল্লোড় করছে।
আমার গ্রুপে আছে আমেরিকান এরিক ও জিম, ইরানি বংশোদ্ভূত ফরহাদ এবং ক্যানাডিয়ান জেনি। আর আমাদের সবার মধ্যে কেবল একটি বিষয়ই কমন—হুল্লোড়বাজি করা আর জীবনের চলমান প্রতিটা মুহুর্ত উপভোগ করা। বাকি দুনিয়া গোল্লায় যাক—হলো আমাদের উসুল, আর আয় বিপদ আয়!—হলো আমাদের নীতি।
আমাকে দেখেই এরিক জোরে চিৎকার করে উঠল, ‘হেই আয়ান! ম্যান, কোথায় ছিলে তুমি? আমরা সেই সকাল থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি!’
মাঝখানের বিছানা-নেওয়া সময়টাতে এরা সবাই আমার খোঁজখবর নিয়েছে। নিয়মিত আমার ফ্ল্যাটে যাওয়া-আসা করেছে। আর দুদিন আগেই আমি ওদের বলে দিয়েছিলাম, আজ ইউনিভার্সিটিতে আসব।
‘বাইক এখনো ঠিক হয়নি। ট্রেনে ধাক্কা খেতে খেতে এখানে এসে পৌঁছুলাম’—বললাম আমি।
জিম আমেরিকান। আর আমেরিকার কোনো বদনামি তার সহ্য হয় না। তাই ফটাফট গর্জে উঠল, ‘নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে ট্রেন, বিশ্বের সেরা সাবওয়ে ট্রেন!’
ফরহাদ তাকে ঝেরে উঠল, ‘আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে! এত টান টানার দরকার নেই। আম্রিকি কোথাকার!’
আমরা সবাই হেসে উঠলাম। জিম গেল রেগে।
‘চুপ করো তুমি। আমরা পারছি না শুধু তোমার ইরানকে আবারও পারস্য বানিয়ে দিতে!’ জেনি মাঝখান থেকে লোকমা দিল।
‘এইখানেই তো তোমরা আমেরিকানরা মার খাও। নিজেরা তো পারোই না!’
আমাদের কথা কাটাকাটি চলছে। হঠাৎ ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় চত্বর থেকে কিছু ছাত্রের স্লোগান ভেসে এলো। ক্যাফের দ্বিতীয় তলা থেকে উঁকি মেরে দূরের চত্বরে তাকালাম আমি। ওখানে দাঁড়িয়েই ব্যানার হাতে ছাত্ররা স্লোগান দিচ্ছে। তাদের দিকে তাকাতে তাকাতে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাপার কী?’
জেনি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, ‘কেমন পাকিস্তানি তুমি?! তোমার দেশের এক ডাক্তারকে আমেরিকা গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে এরা। শুনেছি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁর সাজা ঘোষণা হবে।’
আমি বিরক্তি দেখিয়ে মাথা নাড়লাম, ‘আমি দেশ ছেড়েছি বিশ বছর হলো। ওখানকার রোজকার খবরাদির সাথে আমার কী সম্পর্ক?!’
জেনি তার সোনালি চুলগুলো এমনভাবে ঝাঁকাল, যেন এই উত্তর শুনে তার খুব আফসোস হচ্ছে। ফরহাদ সাথে সাথে ফতোয়া জারি করল, ‘মাঝে মাঝে তো আমার সন্দেহ হয়, তুমি আসলেই মুসলমান কি না! এতটাই বিরক্তি!’
ফরহাদকে ঝেরে উঠলাম আমি, ‘আচ্ছা, এখন আমার মুরুব্বি সাজার চেষ্টা করো না। এই কাজের জন্য আমার আরফি মামাই যথেষ্ট। চলো, জলদি কিছু অর্ডার করো! দুসপ্তাহ ধরে বাস্সামের হাতের বিস্বাদ কফি খেতে খেতে আমার গলাও শুকিয়ে কাঠ।’
গালগপ্প সেরে মাত্রই ক্যাফেটেরিয়া থেকে বেরিয়েছি আমরা, অমনিই সামনে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের কাউন্সিলর-স্টুডেন্ট আমের বিন হাবিবের দেখা। ইউনিভার্সিটির কী একটা সমস্যার কাউন্সেলিং করছে সে।
আমাদের ইউনিভার্সিটিতে সব ধর্মের ছাত্রদের জন্য একজন করে প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। সে নিজেও হয় একজন ছাত্র। আবার বছর বছর অন্যান্য ছাত্রদের ভোটে নতুন করে নির্বাচিত হয় সে।
এই কাউন্সিলরের দায়িত্ব হলো—নিজ নিজ ধর্মের ছাত্রদের সমস্যাগুলো ভার্সিটি কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরা। তাদের সাথে আলোচনা করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, এমন একটি সমাধান বের করা।
মুসলিম কাউন্সিলরের মতোই খ্রিস্টান এবং ইহুদি কাউন্সিলরও ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হয়। কিন্তু জানি না, মানুষকে এই ধর্মের ছাঁচে ফেলে ভাগ করাটা শুরু থেকেই কেন জানি আমার খুব খারাপ লাগে। সবসময় ভাবি—মানুষকে কেন শুধু ‘মানুষ’ পরিচয়েই চেনা যায় না? ধর্ম ও জাতির এই ভাগাভাগি কি সত্যিই এত জরুরি! যার জন্য মানবতা ঢাকা পড়ে গেলে যাক?!
হয়তো আমেরিকায় বেড়ে উঠেছি বলেই এমনটা ভাবি। লাখ লাখ তরুণের মতো আমিও ধর্মকে কেবল একটি বিধিনিষেধের ভান্ডার হিসেবেই দেখি।
বর্তমানে আমাদের ইউনিভার্সিটির মুসলিম কাউন্সিলর⏤আমের বিন হাবিব। অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। এক আরব পরিবারের সন্তান সে।
এই আরব শেখকে এভাবে কনকনে শীতে বা ঠা ঠা রোদে অন্যান্য মুসলিম ছাত্রদের সমস্যা সমাধান করতে, দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে দেখে অবাক হই। ভাবি, এ কোন চক্করে পড়ল এই আমিরজাদা!
আমি আর বাস্সাম তো সবসময় এই আফসোসই করি—‘ইশ, আমাদের যদি এত টাকা থাকত, তাহলে হেভি বাইকের একটা শোরুম খুলে, বাকি জীবন বিলাসে কাটাতাম! কুদরত যখন কাউকে কোনো নেয়ামত দান করে, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মন থেকে ওই নেয়ামতের কদরও কেড়ে নেয়। অথবা কিছু কিছু মানুষ হয়তো তখনই নিয়ামত পায়, যখন ওই জিনিসের গুরুত্ব সে হারিয়ে বসে।’
আমেরের সঙ্গে আমার এমনিই এক-আধ বার ভাসা ভাসা দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। পারতপক্ষে তাকে এড়িয়েই চলি আমি। আজও তার গ্রুপটা দেখেই রাস্তা বদলে সটকে পড়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু তার আগেই আমের তার বিশেষ আরবি টানে দূর থেকেই আমাকে ডেকে উঠল, ‘আয়ান! জাস্ট টু মিনিটস।’
না চাইতেও আমি থেমে গেলাম। আমের তার চারজন সঙ্গী-সহ আমার দিকে এগিয়ে এলো। তাতে ফিলিস্তিনি ছেলে বাবরও আছে। কী জানি কেন, প্রথম দিন থেকেই বাবরের সাথে আমার বনিবনা হয় না। তিন-চারবার হাতাহাতিও হয়েছে আমাদের। সেও আমার মতোই তেজ-মেজাজ আর নগদ হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার মানুষ।
আমের কাছে এসে আমাকে সালাম দিল। বলল, ‘নিউ ইয়র্ক পুলিশ আমাদের ধরপাকড় শুরু করছে। ক্র্যাকডাউনের প্রতিবাদে কাল থেকে আমরা শহরজুড়ে বিক্ষোভ শুরু করছি। আমাদের সাথে থাকবে না তুমি?’
তাদেরকে বিদ্রুপ করলাম আমি, ‘পরের বিয়েতে আব্দুল্লাহ দেওয়ানার মতো নাচানাচির অভ্যাস কবে যাবে তোমাদের? নিউ ইয়র্ক পুলিশকে তাদের কাজ করতে দাও। যে নির্দোষ, সে এমনিতেই ছাড়া পাবে।’
আমার কড়া জবাবে বাবর নিজেকে সামলাতে পারল না, ‘আমি তোমাদেরকে আগেই বলেছিলাম, ওর সঙ্গে কথা বলা বেফায়দা। কিন্তু তোমরা আমার কথা শুনলে না!’ গজগজ করতে করতে বলল বাবর।
আমি বাবরের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালাম, ‘তোমার জন্যও আমার এই একই পরামর্শ—আপন চরকায় তেল দাও, পরের চরকায় তেল দিতে গিয়ে নিজে মরো না।’
বাবর বুক চিতিয়ে এগিয়ে এলো। কিন্তু আমের দ্রুত মাঝখানে এসে বিবাদ থামাল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। কোনো জোরাজুরি নেই। কিন্তু আয়ান! কেন জানি আমার মন বলছে, একদিন তুমি ঠিকই আমাদের সঙ্গে আসবে।’
এরপর তারা তাদের পথে এগিয়ে গেল, আর আমি আমার পথে।
অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসেছি। অনেক রাত হয়ে গেছে। অথচ বাস্সাম এখনো ফিরছে না। সে হয়তো আমার ভাঙা বাইক আর বাজির ক্ষতি পোষাতে ওভারটাইম করছে। লাউঞ্জে বসে বসে টিভি-চ্যানেল পাল্টাচ্ছি আর অলস সময় কাটাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর তন্দ্রামতন ছেয়ে গেল চোখে। ওখানেই সোফায় আধশোয়া হয়ে এলিয়ে পড়লাম আমি।
হঠাৎ একটা পালটে-যাওয়া চ্যানেল দেখে এক ঝটকায় উঠে বসলাম। মূলত উঠে বসতে বাধ্য করল আমাকে। পেছনে এসে আবারো সেই চ্যানেলটা প্লে করলাম। বাস্সাম যে রেস্টুরেন্টে কাজ করে, ওটা ক্যাফে পিনোলি এলাকায়। আর চ্যানেলটিতে এই মুহূর্তে নিউ ইয়র্ক পুলিশের অভিযানের প্রতিবেদন চলছে। পুলিশ ওখান থেকে লোকেদের গ্রেফতার করে করে গাড়িতে তুলছে। সেখানে বাস্সামকে দেখেই আমার হাত থেকে রিমোট পড়ে গেল। মুহূর্তেই আমেরের কথাটি আমার মাথায় খেলে গেল—‘নিউ ইয়র্ক পুলিশ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্র্যাকডাউন করছে।’ কথাটা ভাবছি আর তখনই বাইরে থেকে উত্তেজিত হয়ে দরজা ধাক্কার আওয়াজ আসতে লাগল, ধুপধাপ! ধুপধাপ!!
চলবে…