নবিসাবের কবির পরিচয়
হাসসান ইবনু সাবিত। তাঁর নামটা যেমন ভারী, বংশটাও তেমন জাঁদরেল। বাবা সাবিত, দাদা মুনজির। আরও পেছনে গেলে মিলবে হারাম আর আমরের নাম। এভাবে সোজা চলে যান মালিক বিন নাজ্জার পর্যন্ত। তাঁরও আগে ছিলেন আমির বিন মাউস সামা। এই আমিরের বংশ গিয়ে মিশেছে কাহতানের সাথে।
হাসসানকে সবাই চিনত আবুল ওয়ালিদ নামে। কেউবা ডাকত আবুল হুসাম বা আবু আবদির রহমান। তাঁর মায়ের নাম ফারিআ বিনতু খালিদ। মায়ের দিক থেকে তিনি খাজরাজ গোত্রের মানুষ। ফারিআ ইসলাম বরণ করেছিলেন।
হাসসান ছিলেন বানু নাজ্জারের সন্তান, খাজরাজ গোত্রের লোক। আদি বাড়ি ইয়েমেনে। মজার ব্যাপার হলো, শামের গাসসানি রাজা আর ইরাকের লাখমি রাজাদের সাথে তাঁর রক্তের সম্পর্ক। সবাই এক সুতোয় গাঁথা—ওই আমর বিন আমিরের ওয়ারিশ।
সে অনেক কাল আগের কথা। ইয়েমেনে তখন আমর বিন মাউস সামার বিরাট প্রতিপত্তি। তাঁর মতো ধনী আর কেউ নেই। মাইলের পর মাইল জুড়ে তাঁর বাগান আর অফুরন্ত সম্পদ।
একদিন এক নারী গণক এসে ভয়ানক এক খবর দিল। মারিবের বাঁধ নাকি নড়বড়ে হয়ে গেছে, যেকোনো সময় ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে সব।
আমর ছিলেন বুদ্ধিমান। তিনি ভাবলেন, জান নিয়ে পালানোই ভালো। কিন্তু এমনি এমনি গেলে তো লোকে সন্দেহ করবে। তিনি ভাতিজাদের সাথে ঝগড়ার নাটক সাজালেন। এমন ভাব দেখালেন যেন রেগেমেগে সব সম্পত্তি বেচে দিচ্ছেন।
হিমিয়াররা ভাবল, এই তো মওকা! তারা সব বাগান আর প্রাসাদ কিনে নিল। আমর তখন তাঁর দলবল নিয়ে ইয়েমেন ছাড়লেন। একেকজন একেক দেশে পাড়ি জমাল।
সালাবা আনকা বিন আমর দলবল নিয়ে যেখানে বসলেন, সেখানেই পরে আউস আর খাজরাজ গোত্রের শুরু। হারিসা বিন আমর গেলেন মক্কায়, এদের বলা হয় খুজাআ। ইমরান বিন আমির পাড়ি দিলেন ওমানে। জাফনা গেলেন শাম দেশে, তারাই হলো গাসসানি রাজা। আর লাখম ইরাকে গিয়ে রাজত্ব শুরু করলে।
এই পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটলাম কেন জানেন? যাতে বুঝতে পারেন, আমাদের কবি হাসসান ইবনু সাবিত ছোটখাটো কোনো ঘরের ছেলে নন। গাসসানি আর লাখমি রাজারা যে তাঁর জ্ঞাতিভাই, সেটা জানলে তাঁর কবিতার কদর আরও বাড়বে।
রঙিন জীবন
আমাদের কবির ধমনীতে ইয়েমেনি রক্ত, কিন্তু বেড়ে ওঠা আদনানি আবহে। খাজরাজ আর আউস—এই দুই গোত্র মিলেই ছিল ইয়াসরিবের যত লোকলস্কর। পরে আল্লাহর রাসুলকে সাহায্য করে তারা পেল এক দারুণ খেতাব—‘আনসার’।
হাসানের কপালে লেখা ছিল অনেক চড়াই-উতরাই। আউস আর খাজরাজের মধ্যে লেগে থাকা পুরোনো কাজিয়াগুলো তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। মদিনার ইহুদিরা তলে তলে এই বিবাদের আগুন উসকে দিত। হাসানের কবিতায় সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা বারবার এসেছে। ইাউমু বুআস, সুমাইহা, দারাক, রাবি কিংবা বাকির যুদ্ধ—বাদ যায়নি কিছুই।
তবে হাসসান তো আর দশজনের মতো ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাত শিল্পী। তাঁর শিরায় শিরায় বইত কবিতার নেশা। যুদ্ধের দামামা তাঁর কানে বাজত অন্য সুরে। সেই সুর, সেই অনুভূতি তাকে নিয়ে যেত এক অন্য জগতে—যেখানে তিনি ধীরলয়ে আপন মনে কবিতার জাল বুনতেন।
গাসসানি ও লাখমি রাজদরবারে
অজমূর্খতার যুগেই কবি হিসেবে বেশ নামডাক কামিয়েছেন হাসসান। তখন শামের গাসসানি রাজাদের সাথে তাঁর বেশ দহরম-মহরম। তিনি তাদের শানে কবিতা লিখতেন। তারা দুহাতে তাঁকে উপহার দিত।
ইসলামবরণের পরও এই খাতির কমেনি। এমনকি হাসসান যখন বুড়ো, চোখে ভালো দেখেন না, তখনো একই রকম খাতির করতেন তারা। একটা ঘটনার কথা বলি, তাহলেই বুঝবেন।
খলিফা উমারের সময়কার কথা। তিনি জাসসামা বিন মাসাহিকে পাঠালেন রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে একটা চিঠি দিয়ে। কাজ শেষে হিরাক্লিয়াস জাসসামাকে বললেন, ‘তোমার ওই ভাইয়ের খবর জানো? আমাদের ধর্ম গ্রহণ করে এখানেই থেকে গেছে ও?’
জাসসামা বললেন, ‘না তো।’
সম্রাট বললেন, ‘যাও, দেখা করে এসো।’
জাসসামা গেলেন। গিয়ে তো তাঁর চক্ষু চড়কগাছ! হিরাক্লিয়াসের প্রাসাদেও এমন জাঁকজমক দেখেননি। বিশাল হলঘর, দেয়ালজুড়ে কারুকাজ। গৃহকর্তা বসে আছেন কাঁচের এক সিংহাসনে। পায়াগুলো সোনার তৈরি সিংহের মূর্তিতে গড়া। চারদিকে দাসদাসী আর বিলাসিতার ছড়াছড়ি।
জাসসামাকে খুব সমাদর করে বসানো হলো। কিছুক্ষণ গল্পগুজবের পর গৃহকর্তা দাসীদের গান গাইতে বললেন। ওদ ও সুরায় টান দিয়ে তারা গেয়ে উঠল সেই পুরোনো দিনের গান—
“হায় রে জল্লাক!
দামেস্কের সেই পুরোনো দিনের কাল,
বন্ধুদের সনে পানের আসর, খুশিতে মাতাল।”
সুরের জাদু আর কবিতার কথা শুনে গৃহকর্তা আবেগে দুলতে লাগলেন। বললেন, ‘আরও শোনাও!’
তারা আবার ধরল—
ওমানের বুকে কার এই ঘর,
শূন্য খাঁ খাঁ করে?
ইয়ারমুক আর সাম্মানের মাঝে,
কে বা ছিল ঘরে?
গান শেষে গৃহকর্তা জাসসামাকে শুধালেন, ‘জানো এগুলো কাদের বাড়ি?’
জাসসামা মাথা নাড়লেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘এগুলো দামেস্কে আমাদেরই বাড়ি ছিল। আর এই যে কবিতা, এ তো নবিসাবের কবি হাসসান বিন সাবিতের লেখা। আচ্ছা, হাসসান এখন কেমন আছে?’
জাসসামা বললেন, ‘তিনি এখন অনেক বুড়ো, চোখেও দেখেন না।’
শুনে গৃহকর্তা ডাক দিলেন, ‘এই কে আছিস! নিয়ে আয় তো ৫০০ দিনার আর পাঁচ প্রস্ত রেশমি পোশাক।’
তারপর জাসসামার হাতে দিয়ে বললেন, ‘হাসসানকে আমার সালাম দিয়ে এগুলো পৌঁছে দিয়ো।’
মদিনায় ফিরে জাসসামা খলিফাকে সব খুলে বললেন। খলিফা উমার উপহারগুলো আনতে বললেন। খবর পাঠালেন হাসসানকে।
বয়সের ভারে হাসসান তখন একা চলতে পারেন না। কেউ একজন তাঁকে হাতে ধরে নিয়ে আসছে।
দরবারের কাছে আসতেই তিনি বললেন, ‘আমিরুল মুমিনিন! জাফনা পরিবারের খুশবু পাচ্ছি যেন!’
খলিফা বললেন, ‘আল্লাহ আপনার রিজিক ঠিকই পাঠিয়ে দিয়েছেন। উপহারদাতা ভিনদেশী যদিও।’
হাসসান উপহার পেয়ে পুরোনো বন্ধুর প্রশংসায় তখনই আবৃত্তি করলেন:
জাফনা-বংশের ছেলে সে তো ভাই,
খাঁটি তাঁর খানদান,
বাপ-দাদাদের নামের বড়াই,
রাখে সে অটুট মান।
শামের যখন ছিল সে রাজা,
কিংবা এখন রোমে,
ভোলেনি আমায় সুখের দিনেও,
ভোলেনি দুঃখ-ভ্রমে।
দুহাত ভরে দেয় সে দান,
তবু ভাবে—এ তো অল্প,
কিপ্টের দান মনে করে লাজে,
থামায় নিজের গল্প।
একদিন আমি গিয়েছিলাম
তাঁর রাজকীয় দরবারে,
কাছে টেনে নিয়ে সুধাসম
পান করাল পেয়ালা ভরে।
গাসসানিদের মতো ইরাকের লাখমি রাজাদের সাথেও হাসানের জানাশোনা ছিল। তবে গাসসানিদের মতো লাখমিরা তাঁকে অতটা মাথায় তুলে রাখত না।
লাখমিদের শেষ রাজা নোমান বিন মুনজিরের প্রিয় পাত্র ছিলেন আরেক কবি—নাবিগা জুবিয়ানি। তাই সেখানে হাসানের চেয়ে নাবিগার কদরই ছিল বেশি। উকাজের মেলায় নাবিগা যখন বিচারক হতেন, তখন হাসসানও যেতেন সেখানে নিজের কবিতা শোনাতে।
কবিতার ভুবন
হাসসানের কবিতার ঝুলিটা ছিল হরেক রংয়ে ভরা। কখনো প্রশংসা, কখনো কড়া সমালোচনা, কখনো শোকের মাতম, আবার কখনো প্রেম বা গর্ব—কী ছিল না সেখানে!
তাঁর এমন কিছু কবিতা আছে, যেগুলো এতটাই জাঁদরেল, সুন্দর আর ঝরঝরে—লোকে বলে ওগুলো সোনার পানি দিয়ে লিখে রাখার মতো। নিজের জোর আর হিম্মত দেখাতে গিয়ে এক কবিতায় তিনি বুক ফুলিয়ে বলেছিলেন—
তোমার বাবার কসম হে শিস!
শুনে রাখো ভালো করে,
বিপদ যত আসুক ধেয়ে,
আসুক যত জোরে।
আমার জবান, আমার এ হাত,
কাঁপবে না তো কভু,
হটাবে না এই আমাকে,
সহায় আমার প্রভু।
কবিতার ধার কি কমে গেল?
একটা কথা খুব চালু আছে—মুসলিম হওয়ার আগে নাকি হাসসানের কবিতার ধার বেশি ছিল। আসমায়ি নামের এক বড় পন্ডিত তো সোজাসাপ্টা বলেই বসলেন, ‘কবিতা জিনিসটাই এমন—একটু শয়তানি বুদ্ধি, একটু প্যাঁচ না থাকলে ঠিক জমে না। ভালো কথায় কি আর কবিতা হয়? হাসসান ছিলেন জাহেলি যুগের বাঘা কবি, কিন্তু ইসলামে এসে তাঁর কবিতা যেন ঝিমিয়ে পড়ল।’
লোকে হাসসানকেও মাঝে মাঝে খোঁচা দিয়ে বলত, ‘কী হে আবুল হুসাম! ইসলামে এসে কি কবিতার তেজ কমে গেল, নাকি বয়সের ভারে নুয়ে গেলেন?’
হাসসান তখন মুচকি হেসে জবাব দিতেন, ‘আরে ভাই, কবিতার আসল মশলাই তো হলো বানিয়ে বানিয়ে বাড়িয়ে বলা, সোজা কথায়—মিথ্যা বলা। আর ইসলাম তো মিথ্যার ধারেকাছেও যেতে দেয় না, তাই আমার কবিতাও এখন সত্যের শিকলে বাঁধা।’
আসলে মুসলিম হওয়ার পর তিনি আর কল্পনার ঘোড়ায় লাগামহীন ছুটতেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সত্যের চিত্রকর, ইতিহাসের লিপিকার। তবে সব ছাপিয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন ‘শায়িরুন নবি—নবিসাবের কবি।’
কবির কদর
আবু উবাইদা তো হাসসানের শানে বিশাল এক সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলতেন, ‘হাসসান একাই তিন ময়দানের সেরা। অজমূর্খ যুগে তিনি ছিলেন আনসারদের মুখপাত্র। নবুয়তের যুগে খোদ নবিসাবের কবি। আর ইসলামি যুগে তিনি হয়ে ওঠেন সমস্ত ইয়েমেনিদের গর্ব।’
আরবদের মুখে মুখে একটা কথা ফিরত—শহর বা লোকালয়ে যারা বাস করে, তাদের মধ্যে হাসানের চেয়ে বড় কবি আর কেউ নেই।
হুতাইয়া নামের এক সমালোচক আনসারদের বলে পাঠিয়েছিলেন, ‘তোমাদের কবিই সেরা! আরবদের মধ্যে তাঁর তুলনাই হয় না।’
কেন জানেন? হাসসানের একটা লাইনের জন্য। লাইনটা এমন চমৎকার—
অতিথির আনাগোনা এত বেশি মোর ঘরে,
কুকুরেরা তাই আর ঘেউ ঘেউ না করে।
কে এল বা গেল—নাহি জানিতে চায়,
আজনবি দেখেও যে চুপটি করে রয়।
ভাবুন একবার! মেহমানদারির কী চরম নমুনা হলে বাড়ির পাহারাদার কুকুরও আজনবি দেখে ডাকাডাকি বন্ধ করে দেয়!
আর খোদ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কী বলতেন জানেন? তিনি হাসসানকে উৎসাহ দিতেন এই বলে—‘তুমি ওদের ধুয়ে দাও! আল্লাহর কসম, তোমার কবিতা ওদের বুকে কী যে জ্বালা ধরাবে—অন্ধকারে আসা তীরের চেও বেশি।’
নবিজি আরও বলতেন—‘জাহেলি কবি ইমরুল কায়েস তাঁর অনুসারীদের নিয়ে যাবে জাহান্নামে। আর হাসসান ইবনু সাবিত কবিদের সর্দার হয়ে আসবে জান্নাতে।’
কুরআনে আল্লাহ কবিদের নিন্দা করেছেন বটে, কিন্তু মুমিন কবিদের আলাদা করে দিয়েছেন—হাসসান হলেন সেই দলেরই মধ্যমণি।
এই হলেন আমাদের হাসসান ইবনু সাবিত। এবার আমরা জানব তাঁর জীবনগল্প—যে জীবনে তার দিকদর্শী হয়ে আছেন প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। আমরা দেখব নবিজির শানে তাঁর সেই অমর সব পঙ্ক্তি। দুশমনের বিরুদ্ধে তাঁর লাভার মতো সব চরণ। আর নবিজির সাথে কাটানো তাঁর জীবনের মখমল ছবিগুলো।
আবছায়া আগন্তুক
গিরিকন্দর থেকে বেরিয়ে এলেন মুহাম্মাদ। রোজ যেরকম শান্ত ধীরস্থির হয়ে বেরোন, আজ কিন্তু সেরকম নেই তিনি। একটা ভয় একটা বিস্ময় চেপে ধরেছে তাঁকে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়ফড় করছে—এমন তো হয়নি আগে!
তিনি দৃষ্টি মেলে দিলেন দূরে। সামনে ওই ঝিম মেরে থাকা পাহাড়ের সারি, দিগন্তজোড়া ধু-ধু বালুচর। পুবের আকাশটা লালচে হয়ে এসেছে। ভোরের আলো ফুটব ফুটব করছে।
একবার ওই অসীম শূন্যতার দিকে তাকান, পরক্ষণেই ফিরে তাকান হেরা গুহার দিকে। প্রতি বছর রমজান মাসে তো এখানেই তিনি মগ্ন থাকেন ধ্যানে। স্বজাতির মূর্তিপূজা ছেড়ে তিনি ভাবেন আসমান-জমিনের সৃষ্টিরহস্য নিয়ে।
কিন্তু আজ? আজ আর সেসব ভাবনা মাথায় আসছে না। গত রাতের সেই আচমকা গায়েবি ডাকের রহস্য কিছুতেই তিনি ভেদ করতে পারছেন না। ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি যেন টলছেন। নিজের চোখ আর কানকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না।
কী শুনলেন তিনি? কী দেখলেন? এমন অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড তো জীবনেও ঘটেনি। কী শান্তির ঘুমটাই না ঘুমোচ্ছিলেন! তার মাঝেই হুট করে ওই ঘটনা। সেই আগন্তুক আর তাঁর মাঝের কথোপকথনটা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে এখন।
চোখের সামনে ভাসছে সেই আবছা ছায়ামূর্তি। ঠিক যেন কুয়াশার মতো এসে দুই চোখ ঢেকে দিল তাঁর। আশেপাশে আর কিচ্ছুটি দেখার জো নেই। ভালো করে তাকাতেই দেখলেন, ওই ছায়ামূর্তির হাতে ধবধবে সাদা এক ফলক।
আচানক এগিয়ে এলো ছায়ামূর্তি। দুহাতে জাপটে ধরল মুহাম্মাদের গলা। শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়! দম আটকে আসছে, এমন সময় সেই ছায়া বলে, ‘পড়ো!’
মুহাম্মাদ তো হতভম্ব! কী পড়বেন? তিনি যে হরফ চেনেন না। দিশাহারা হয়ে বললেন, ‘আমি তো পড়তে জানি না।’
সাদা ফলকওয়ালা আগন্তুক নাছোড়বান্দা। আবারও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন তাঁকে। মনে হলো, এই বুঝি জানটা বেরিয়ে গেল!
একটু পর অবশ্য বাঁধন আলগা করে দিলেন। খুব আলতো করে ছেড়ে দিলেন তাঁকে। ছেড়ে দিয়ে আবারও সেই একই হুকুম—‘পড়ো!’
মুহাম্মাদের বুক তখনো দুরুদুরু। আবারও যদি ওভাবে চেপে ধরে? সেই ভয়ে ভয়েই জানতে চাইলেন, ‘কী পড়ব?’
আগন্তুক পড়তে শুরু করলেন—
“পড়ো তোমার স্রষ্টা প্রভুর নাম নিয়ে—মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তকণা থেকে। পড়ো—তোমার প্রভু যে বড় মহীয়ান। কলমের ব্যবহার তিনি শিখিয়েছেন; শিখিয়েছেন এমন কিছু যা সে জানত না।”
হেরা কন্দরের মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন মুহাম্মাদ। মুখে বিড়বিড় করে আওড়ে চলেছেন সেই কথাগুলো। কখনো গভীর বিশ্বাসে, কখনো-বা নতশিরে। আবার পরক্ষণেই মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে হাজারো প্রশ্ন। ঠিক শুনেছেন তো?
মনের ভেতরটা তোলপাড় করছে। এক অদ্ভুত ঘোরের মাঝে পড়ে গেলেন তিনি। আর এখানে নয়। বেরিয়ে পড়তে হবে। গিরিকন্দর ছেড়ে তিনি নেমে এলেন মক্কার পাহাড়তলিতে।
খোলা প্রান্তরে কোথাও নেই কেউ। তিনি হাঁটছেন ভবঘুরের মতো। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে তাঁর চোখ। নতুন কোনো সত্য যেন খুঁজে পেয়েছেন। এরই তালাশে তো ছিলেন আজীবন।
কিন্তু মনের খটকা যে কাটে না! রাতের সেই আচমকা গায়েবি ডাক কি সত্যি? নাকি নিজেরই কোনো ভ্রম? সত্যের হদিসেই তো ফিকিরে বসেছিলেন। কিন্তু যা পেলেন, তা কি আসলেও সত্য?
সব গুলিয়ে যাচ্ছে কেমন। নিশ্চয় মনেরই কোনো ভুল হবে। অজানা কিছুকে মেনে নেওয়ার আগে মন তো খুঁতখুঁত করবেই।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। বাড়ির কথা, বিবি-বাচ্চাদের কথা সব বেমালুম ভুলে আছেন। তিনি ঘুরছেন পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে।
ওদিকে বিবি খাদিজা চিন্তায় অস্থির। লোক পাঠালেন গুহায়। কিন্তু সেখানে তো তিনি নেই! খুঁজে না পেয়ে লোকটা ফিরে গেল।
মুহাম্মাদ তখনো পাহাড়ের আনাচকানাচে ঘুরছেন। ভয়ের চাদরে জড়িয়ে আছে মনটা। তবুও অদ্ভুত এক ভালো লাগার আবেশে ডুবে আছেন।
ঠিক তখনই—আবার সেই ডাক! তবে এবার আর ভয় জাগছে না। বড় দরদি মায়াময় সুর এখন। মুহাম্মাদ চমকে গিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। ওই তো! সেই আগন্তুক। এবার আর চিনতে ভুল হলো না—এ যে জিবরিল!
কিছুক্ষণ পর ফেরেশতা চোখের আড়াল হলেন। কিন্তু মুহাম্মাদের মনটা এবার শান্ত হয়ে গেল। এতক্ষণের অস্থিরতা কেটে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিল এক অথই সুকুন।
অর্পিত দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন পুরোপুরি। পূর্ণ আস্থায়, পরম মমতায় তিনি আবৃত্তি করতে লাগলেন—
“পড়ো তোমার স্রষ্টা প্রভুর নাম নিয়ে—মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তকণা থাকে…”
পবিত্র কথামালা বিড়বিড় করে আওড়াতে আওড়াতে বাড়ির পথ ধরলেন মুহাম্মাদ। এখন তাঁর একটাই চাওয়া—একটু আশ্রয়, একটু নিরাপত্তা। আর এই আশ্রয় পাওয়ার জন্য বিবি খাদিজার চেয়ে আপন আর কে আছে!
বাড়িতে ঢুকেই তিনি খাদিজা কুবরাকে খুঁজলেন। ভালোবাসার একটুকরো আলয় তিনি। কিন্তু শরীরটা যে বড্ড অবশ হয়ে আসছে! হঠাৎ করেই যেন কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো। হাড়কাঁপানো শীতে মানুষ যেভাবে ঠকঠক করে, সেভাবে কাঁপছেন তিনি। নিজের শরীরের ওপর আর কোনো জোর পাচ্ছেন না। কোনো রকমে ঢোক গিলে বললেন, ‘ঢেকে দাও। আমাকে ঢেকে দাও কম্বলে।’
স্বামীর এই হাল দেখে খাদিজা তো অস্থির। তড়িঘড়ি করে তাঁকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। সেবা করে জানতে চাইলেন কী হয়েছে।
ধীরে ধীরে গায়ের কাঁপন থামল। এখন ভালো লাগছে একটু। গিরিকন্দরে হওয়া সব অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা খুলে বললেন। মনের ভেতর জমে থাকা ভয়ের কথাটাও আর গোপন রাখলেন না, ‘বড্ড ভয় করছে, খাদিজা! আমি কী মরে যাবো?’
খাদিজার চোখে তখন অপরিসীম মায়া, মুখে পবিত্রতার আভা। স্বামীর কাঁধে হাত রেখে পরম মমতায় তিনি অভয় দিলেন, ‘দূর ছাই কীসব বলেন আপনি! আল্লাহ কক্ষনো আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক রাখেন। হামেশা হক কথা বলেন। অন্যের বোঝা নিজে বয়ে নেন। আপনি তো মেহমানদারিতে দরাজদিল। বিপদে-আপদে মানুষের ঢাল হয়ে দাঁড়ান। আপনার কীসের ভয়?’
খুব ভোরে চারিদিক যেমন স্নিগ্ধ থাকে, বিবির কথাগুলো আজ ঠিক তেমনই লাগল। ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলেন মুহাম্মাদ। যে দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসেছে, তা সত্য। এই সত্যকে ধারণ করার যোগ্যতা তাঁর আছে। ভয় কেটে মনের কোণে ফিরে এল স্বস্তি।
ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলেন বিছানায়। বিবির কোলে ঘুমিয়ে পড়লেন বেফিকিরে। সামনে যে কঠিন সংগ্রামের জীবন আসছে সে ব্যাপারে বেখবর।
চলবে…
মা শা আল্লাহ, লেখাটা দারুণ লাগল! ‘হাসসান ইবনু সাবিত’ (রাঃ)-এর কথা পড়তে পড়তে নিজের নাম নিয়েই একটু গর্ব হচ্ছিল 😄
তবে আফসোস, আমি ‘হাসান সাবিত’ হয়েও এখনো কবিতার কোনো আলামত খুঁজে পেলাম না নিজের মধ্যে!
মনে হচ্ছে নামের বরকতটা এখনো পথে আছে। চমৎকার লেখা, পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।