মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি : মনীষার আলোয় প্রদীপ্ত জীবন

বলা যায়, দীর্ঘ এক জীবনই পেয়েছিলেন তিনি—যে জীবন জ্ঞান, সাধনা, শিক্ষকতা ও সৃষ্টিশীলতার বিস্তৃত এক যাত্রাপথ। ১৯০০ থেকে ১৯৭২—সময়ের এই দীর্ঘ পরিসর যেন তাঁর জীবনকে শুধু কালগত নয়, বৌদ্ধিক অর্থেও প্রসারিত করেছে। বেঁচে থাকলে এ বছর তাঁর বয়স দাঁড়াত একশ ছাব্বিশে; সময়ের আরও বহু সীমা অতিক্রম করতেন তিনি। কিন্তু, এখানে একটু থামা দরকার—‘বেঁচে থাকলে’ কথাটি কি সত্যিই যথাযথ?

প্রচলিত ব্যবহারে বহু শব্দ জীর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেই জীর্ণ শব্দই সবচেয়ে গভীর সত্যকে বহন করে। মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি কি সত্যিই আর বেঁচে নেই? তাঁর ইন্তিকালের অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরেও?

যাঁরা মানুষকে কেবল শরীরের উপস্থিতিতে মাপেন, তাঁরা হয়তো বলবেন—না, তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু যাঁরা জানেন, চিন্তারও জীবন আছে; কলমেরও আয়ু আছে; ভাষারও উত্তরাধিকার আছে—তাঁরা এ কথায় সহজে সম্মত হবেন না। নূর মোহাম্মদ আজমির মতো মনীষারা শরীরের অবসানে নিঃশেষ হন না; তাঁরা ছড়িয়ে পড়েন তাঁদের রেখে যাওয়া কীর্তির ভেতর—ছাত্রদের স্মৃতিতে, পাঠকের মননে, প্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় এবং সবচেয়ে গভীরে—একটি ভাষার বুদ্ধিবৃত্তিক সঞ্চয়ে।

বাংলা ভাষায় ইসলামি জ্ঞানভান্ডার নির্মাণের ইতিহাস যখনই আলোচনায় আসে, প্রথম সারির মনীষীদের ভেতর তাঁর নাম উচ্চারিত হওয়া এক অনিবার্যতা। কারণ তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক ‘ইন্টেলেকচুয়াল আর্কিটেক্ট’—যিনি ভাষার ভেতরে একটি জ্ঞানভুবনের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন।

আমাদের ভাষায় বহু লেখক এসেছেন, বহু আলিম কলম ধরেছেন, বহু শিক্ষক পাঠদান করেছেন; কিন্তু সবাই ইতিহাসে স্বতন্ত্র আসন তৈরি করতে পারেননি। নূর মোহাম্মদ আজমি পেরেছিলেন। কেননা তিনি কেবল লিখেননি—একটি অভাব অনুভব করেছিলেন; কেবল পাঠদান করেননি—একটি প্রজন্মকে চিন্তার উপকরণ দিতে চেয়েছিলেন; কেবল অনুবাদ করেননি—জ্ঞানকে মানুষের ভাষায় নামিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।

বাংলা ভাষায় হাদিসশাস্ত্রের প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা, মেশকাত শরীফের বঙ্গানুবাদ, ইসলামি সমাজচিন্তা, শিক্ষাচিন্তা, ইতিহাস ও সাহিত্যবিষয়ক বহুমাত্রিক রচনাকর্ম—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক নীরব নির্মাতা। তাঁর কাজের ভেতরে উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা ছিল না বটে; তবে গভীর মনোযোগ, পদ্ধতিগত শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধের স্বচ্ছ দীপ্তি ছিল।

আজ তাঁর নাম হয়তো সর্বসাধারণের আলোচনায় ঘন ঘন উচ্চারিত হয় না; তাঁর গ্রন্থসমূহ হয়তো বাজারি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু নয়; তাঁর জীবনকে ঘিরে প্রচারণার ঢেউও তেমন ওঠে না। কিন্তু এ-ও সত্য, বাংলা ভাষায় ইসলামি মননচর্চার ভিত কোথায়—এই প্রশ্নটি কেউ যদি আন্তরিকভাবে করতে শুরু করে, তবে খুব বেশিক্ষণ লাগবে না তাঁর নামের কাছে পৌঁছাতে।

আর একবার সেই নামের সামনে দাঁড়ালে, তাঁর জীবন ও কর্মের ব্যাপ্তি মানুষকে বিস্মিত করবেই। তখন তিনি আর কেবল একজন আলিম বা লেখক নন; তিনি হয়ে ওঠেন এক অনিবার্য উপস্থিতি, এক বৌদ্ধিক আস্থা, এক নীরব ভালোবাসার নাম।

তাঁকে নতুন করে স্মরণ করার প্রয়োজন এখানেই। কারণ নূর মোহাম্মদ আজমিকে স্মরণ করা মানে কেবল অতীতের একজন মনীষীর জীবনী পুনরুদ্ধার করা নয়; বরং এমন এক জ্ঞানঐতিহ্যের সামনে ফিরে দাঁড়ানো—যা গড়ে উঠেছিল অধ্যয়ন, নিষ্ঠা, ভাষাপ্রীতি, দায়িত্ববোধ এবং নিভৃত সাধনার ওপর। তাঁর জীবন তাই নিছক জীবনের বিবরণ নয়—তা এক আলোকিত মানসের ইতিহাস; এক ভাষার জাগরণের নীরব উপাখ্যান।

দুই.

মানুষের জীবন কেবল সময়ের পরিমাপে বড় হয় না; বড় হয় তার চিন্তায়, চরিত্রে, সৃষ্টিতে এবং প্রভাবের বিস্তারে। এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের জীবনকে নিছক ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সীমানায় আবদ্ধ রাখেন না; বরং জ্ঞান, সাধনা, চরিত্র ও সৃষ্টিশীলতার সমন্বয়ে একটি সময়কে আলোকিত করে তোলেন।

কালের প্রবাহে কিছু মানুষ ব্যক্তি থেকে উত্তীর্ণ হয়ে আদর্শে রূপ নেন, উত্তরাধিকার হয়ে ওঠেন, বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হন। তাঁদের জীবনকে জন্ম-মৃত্যুর সরল রেখায় মাপা যায় না; মাপতে হয় চিন্তার প্রসার, চরিত্রের ঔজ্জ্বল্য, সাধনার গভীরতা এবং সমাজে রেখে যাওয়া স্থায়ী প্রভাব দিয়ে। মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি ছিলেন তেমনই এক মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব—যাঁর জীবন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিক্ষকতা, সৃজনশীলতা ও দায়বদ্ধ মননের এক উজ্জ্বল সমাহার।

মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে ফেনী জেলার সিলোনিয়া অঞ্চলের নেয়াজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শেখ আলি আজম এবং মাতা শেখ রহিমুন নেসা। জন্মের পরিবেশ ছিল সরল; কিন্তু সেই সরলতার ভেতরেই ছিল নৈতিকতা, ধর্মীয় চর্চা ও শিক্ষাপ্রীতির এক স্নিগ্ধ আবহ। এই পারিবারিক পরিমণ্ডলই তাঁর শৈশবকে একটি দৃঢ় নৈতিক ও মানসিক ভিত্তি প্রদান করে।

শিশুকালের শিক্ষাই মানুষের চরিত্র ও চিন্তার প্রথম বীজতলা। তাঁর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনি তাঁর নানা মুন্সি মুহাম্মদ হাতেম এবং পিতার নিকট কুরআনের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি বাংলা ও ফারসি ভাষারও প্রাথমিক পাঠ লাভ করেন। গ্রামের নৈশ বিদ্যালয় এবং আবদুল লতিফ মোল্লার কাছে তাঁর বাল্যশিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। এই প্রাথমিক শিক্ষাপর্বেই তাঁর মধ্যে যে পাঠপ্রবণতা, ভাষাবোধ ও জ্ঞানানুরাগ জন্ম নেয়—সেটিই পরবর্তীকালে এক গভীর মনীষার ভিত রচনা করে।

মাওলানা আজমির শিক্ষাজীবন ছিল এক ধারাবাহিক সাধনার নাম। তিনি প্রথমে দাগনভূঁইয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিন বছর অধ্যয়ন শেষে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের আবুর হাট মাদ্রাসায় গমন করেন এবং জামাতে শশম পর্যন্ত পাঠ সম্পন্ন করেন। এই পথচলা তাঁকে ধীরে ধীরে প্রথাগত ইসলামি শিক্ষার উচ্চতর স্তরে পৌঁছে দেয়।

১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চট্টগ্রামের দারুল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে আলিম ও ফাজিল পাস করেন। কিন্তু এখানেই তাঁর শিক্ষাযাত্রার সমাপ্তি ঘটেনি; বরং এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর প্রকৃত জ্ঞানসাধনা। তিনি নিজ উদ্যোগে কলকাতার ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি এবং ঢাকা আলিয়া লাইব্রেরিতে বসে কুরআন, হাদিস, ফারসি, বাংলা সাহিত্য ও অন্যান্য জ্ঞানশাখার অসংখ্য গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন।

অনেকেই শিক্ষা অর্জন করেন; কিন্তু অল্পসংখ্যক মানুষ শিক্ষা-পরবর্তী সময়েও নিজেদের ভেতর জ্ঞানের ক্ষুধাকে জীবন্ত রাখেন। মাওলানা আজমি ছিলেন সেই বিরল মানুষের একজন। তাঁর পাঠ ছিল আত্মগঠনের জন্য; তাঁর অধ্যয়ন ছিল সত্য ও প্রজ্ঞার অনুসন্ধানের জন্য। এই কারণেই তিনি কেবল একজন প্রাতিষ্ঠানিক আলিম নন; তিনি ছিলেন এক স্বনির্মিত মনীষী।

একজন মানুষের মনীষা কেবল তার পাঠ ও পাণ্ডিত্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা প্রতিফলিত হয় চরিত্র, নৈতিকতা ও অন্তর্গত শুদ্ধতায়। মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমির জীবনেও এই দিকটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ফকিহুন নফস মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি-এর খলিফা মাওলানা জমিরুদ্দিন আহমদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। এই আধ্যাত্মিক সংযোগ তাঁর জীবনকে সংযম, শৃঙ্খলা ও নৈতিক দৃঢ়তার এক ভিন্ন মাত্রা প্রদান করে।

তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল এক ধরনের নীরব ঔজ্জ্বল্য—তিনি উচ্চকণ্ঠ প্রচারের মানুষ ছিলেন না; বরং তাঁর শক্তি ছিল গভীরতা, সংযম এবং অধ্যয়ননিষ্ঠায়। তিনি যে ধারার মানুষ, তাঁদের প্রভাব বাহ্যিক কোলাহলে নয়; বরং বোধ, আচরণ ও কর্মের গভীরতায় অনুভূত হয়। তাঁর জীবন তাই এক অর্থে জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সমন্বয়।

১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বালুয়া চৌমুহনী মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী বছর থেকেই তাঁর দীর্ঘ কর্মপরিসর হয়ে ওঠে ফেনী আলিয়া মাদ্রাসা, যেখানে ১৯২৮ থেকে ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতা করেন এবং পরবর্তীকালে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনোই পাঠ্যবইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেন না; তিনি মানুষ গড়েন, দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেন, ভবিষ্যৎ প্রস্তুত করেন। মাওলানা আজমি ছিলেন সে অর্থেই একজন প্রকৃত শিক্ষক। শিক্ষকতা তাঁর কাছে পেশা ছিল না; ছিল এক বৌদ্ধিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র।

ফেনী আলিয়া মাদ্রাসায় তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতি নিঃসন্দেহে বহু শিক্ষার্থীর জীবনগঠনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। তাঁর পাঠদানের ভঙ্গি, তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ, তাঁর অধ্যয়নরুচি—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক আদর্শ শিক্ষক-ব্যক্তিত্ব, যাঁর প্রভাব সময় পেরিয়ে আজও অনুভূত হয়।

তিন.

মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমির মনীষার আরেকটি উজ্জ্বল দিক তাঁর শিক্ষাচিন্তা। তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন—মাদ্রাসা শিক্ষা কেবল অতীতের উত্তরাধিকার বহন করলেই যথেষ্ট নয়; বরং তাকে সময়ের প্রয়োজন, সমাজের বাস্তবতা এবং জ্ঞানের ক্রমবিবর্তিত পরিসরের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে। এই উপলব্ধিই তাঁকে শিক্ষাসংস্কারের প্রশ্নে সক্রিয় ও প্রস্তাবনামুখী করে তোলে।

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর মোয়াজ্জম হোসাইনের সভাপতিত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হলে, তিনি মাদরাসা শিক্ষার সংস্কার-প্রস্তাব হিসেবে উর্দু ভাষায় ‘মাদারিসে আরবিয়া কা নেজামে তালীম’ রচনা করেন। এই রচনা নিছক একটি প্রশাসনিক প্রস্তাব ছিল না; বরং তা ছিল তাঁর শিক্ষাদর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক বোধ এবং ভবিষ্যৎ-দৃষ্টির এক সুসংহত দলিল।

এই গ্রন্থে তিনি যে ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তা গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ—শিক্ষা হতে হবে শিকড়সংলগ্ন, কিন্তু স্থবির নয়; ঐতিহ্যনিষ্ঠ, কিন্তু অচল নয়; দ্বীনি, কিন্তু জগতবিমুখ নয়। এই সমন্বয়ী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে তাঁর সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে এক দূরদর্শী শিক্ষাবিদে পরিণত করেছে। বলা যায়, তিনি মাদ্রাসা শিক্ষাকে একটি ‘ডায়নামিক নলেজ সিস্টেম’ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন—যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়, বরং সৃজনশীল সমন্বয় সম্ভব।

মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমির সবচেয়ে স্থায়ী ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষায় ইসলামি জ্ঞানভান্ডার নির্মাণে। তিনি এমন এক সময়ে কাজ করেছেন, যখন বাংলাভাষী মুসলিম সমাজের জন্য প্রামাণ্য, সুসংহত এবং উচ্চতর ইসলামি গ্রন্থের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার বিস্তৃত জ্ঞানভুবন সাধারণ বাঙালি পাঠকের নাগালের বাইরে রয়ে যাচ্ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে তিনি উপলব্ধি করেন—মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা ছাড়া কোনো জাতির বৌদ্ধিক ভিত্তি সুদৃঢ় হতে পারে না। এই উপলব্ধিই তাঁকে এক অনন্য সাধনায় উদ্বুদ্ধ করে—জ্ঞানকে ভাষান্তর নয়, ভাষায় প্রতিষ্ঠার সাধনা।

এই সাধনার ফলস্বরূপ তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা ও অনুবাদ করেন। তাঁর রচনাসম্ভার কেবল সংখ্যায় নয়, বিষয়বৈচিত্র্য ও দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তারে অনন্য—

  • হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস
  • মেশকাত শরীফের অনুবাদ
  • উনবিংশ শতাব্দীর আলেম সমাজ ও রাজনীতি
  • খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ
  • ইসলামের সমাজ ব্যবস্থা
  • ইসলামের অর্থব্যবস্থা
  • ইসলামের ভূমি ব্যবস্থা
  • ইসলাম ও পাশ্চাত্য জগত
  • বাংলা সাহিত্যে ইসলামের প্রচার
  • নেজামে তালীম
  • আদাবে তারবিয়ত
  • তারীখে ফনুনাত তাফসীর

এই তালিকা তাঁর মননের পরিধি, অধ্যয়নের গভীরতা এবং সমাজ-সচেতন বৌদ্ধিক অবস্থানের এক সুস্পষ্ট দলিল।

তাঁর রচনাবলির মধ্যে ‘হাদীছের তত্ত্ব ও ইতিহাস’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা ভাষায় হাদিসশাস্ত্র বিষয়ে এটিই ছিল প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও সুসংহত গ্রন্থ। এই একটি কাজই তাঁকে বাংলা ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে স্থায়ী আসন দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

হাদিসশাস্ত্র কেবল কিছু বাণীর সংকলন নয়; এর পেছনে রয়েছে একটি সুবিশাল শাস্ত্রীয় কাঠামো—সংরক্ষণপ্রক্রিয়া, বর্ণনাপদ্ধতি, রাবি-পরম্পরা, বিশুদ্ধতা যাচাই, সংকলনের ইতিহাস এবং তাত্ত্বিক ভিত্তি। এসব জটিল বিষয় বাংলাভাষী পাঠকের সামনে সুস্পষ্ট ও সহজভাবে উপস্থাপন করা ছিল এক বিরাট বৌদ্ধিক কাজ। মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি সেই কাজটি করেছিলেন পথিকৃতের সাহস, পদ্ধতিগত শৃঙ্খলা এবং দায়বোধের গভীরতায়। তাই যদি বলা হয়, এই গ্রন্থ ছিল মাতৃভাষায় ইসলামি উচ্চশিক্ষাকে প্রতিষ্ঠা করার এক ঐতিহাসিক সূচনা—তাহলে তা অত্যুক্তি হবে না।

তাঁর আরেকটি অনন্য কীর্তি হলো মেশকাত শরীফের বঙ্গানুবাদ। উপমহাদেশের মাদ্রাসা-শিক্ষায় বহুলপাঠ্য এই গ্রন্থটি ভাষা ও বিন্যাসের জটিলতার কারণে সাধারণ পাঠকের নাগালের বাইরে ছিল। তাঁর অনুবাদকর্ম সেই দূরত্ব অনেকাংশে দূর করে।

তাঁর অনুবাদ স্রেফ ভাষান্তর নয়; বরং তা ছিল এক বৌদ্ধিক রূপান্তর—জ্ঞানকে মানুষের ভাষায় নামিয়ে আনার এক গভীর সাংস্কৃতিক সাধনা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—যে জ্ঞান মানুষের ভাষায় কথা বলে না, সে জ্ঞান সমাজে গভীর শিকড় গেড়ে বসতে পারে না।

মাওলানা আজমির রচনাবলির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর ইতিহাসবোধ ও সমাজবিশ্লেষণ। ‘উনবিংশ শতাব্দীর আলেম সমাজ ও রাজনীতি’ গ্রন্থে তিনি আলিমসমাজের ভূমিকা, অবস্থান ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। এটি প্রমাণ করে, তিনি নিছক ধর্মীয় পাঠের মানুষ ছিলেন না; বরং তিনি ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি ও সমাজের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন।

অন্যদিকে ‘বাংলা সাহিত্যে ইসলামের প্রচার’ তাঁর সংস্কৃতিবোধের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। ধর্ম, ভাষা ও সাহিত্য—এই তিনটির আন্তঃসম্পর্ক অনুধাবন করার ক্ষমতা তাঁকে একজন বহুমাত্রিক চিন্তাবিদে পরিণত করেছে।

তাঁর ‘ইসলামের সমাজ ব্যবস্থা’, ‘ইসলামের অর্থব্যবস্থা’, ‘ইসলামের ভূমি ব্যবস্থা’ এবং ‘ইসলাম ও পাশ্চাত্য জগত’ প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর চিন্তার আরেকটি গভীর মাত্রা উন্মোচন করে। এখানে তিনি ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং সমাজ, অর্থনীতি, সভ্যতা ও জীবনব্যবস্থার বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বিশ্লেষণ করেছেন।

এ ধরনের রচনা প্রমাণ করে—তিনি ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন হিসেবে উপলব্ধি করতেন। তাঁর মনীষার স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, তিনি দ্বীনকে সংকীর্ণতায় আবদ্ধ করেননি; বরং মানবজীবনের সার্বিক প্রশ্নের সঙ্গে একে যুক্ত করে দেখেছেন।

মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমির রচনাবলি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়—

প্রথমত, বিষয়বৈচিত্র্য—তিনি একক বিষয়ের লেখক নন; বরং বহুমাত্রিক জ্ঞানভুবনের অভিযাত্রী।

দ্বিতীয়ত, গবেষণামুখিতা—তাঁর রচনার পেছনে রয়েছে গভীর পাঠ, অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ।

তৃতীয়ত, ভাষাবোধ—তিনি জ্ঞানকে মাতৃভাষায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।

চতুর্থত, শিক্ষামূলক প্রবণতা—তাঁর প্রতিটি রচনা নির্মাণধর্মী ও দিকনির্দেশনামূলক।

পঞ্চমত, ঐতিহ্য ও সময়ের সমন্বয়—যা তাঁকে একইসঙ্গে শিকড়সংলগ্ন ও ভবিষ্যতমুখী করে তুলেছে।

বাংলা ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি একটি মর্যাদাপূর্ণ ও স্বতন্ত্র আসনের অধিকারী। তাঁর কাজের গুরুত্ব এখানেই—তিনি জ্ঞানকে পাণ্ডিত্যচর্চার সীমানায় আবদ্ধ রাখেননি; বরং তা ভাষায়, সমাজে, পাঠে এবং চিন্তায় সঞ্চারিত করার এক নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়েছেন। তাঁর এই সাধনাই তাঁকে ইতিহাসে স্থায়ী করে রেখেছে—এক নীরব, কিন্তু অনিবার্য উপস্থিতি হিসেবে।

মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি ১৯৭২ সালের ১৬ আগস্ট ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তাঁর জীবনাবসানের সঙ্গে তাঁর প্রভাবের অবসান ঘটেনি; বরং বলা যায়, সেখান থেকেই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার দৃশ্যমান হতে শুরু করে। কারণ কিছু জীবন আছে, যেগুলো মৃত্যুর পরেই আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে—চিন্তায়, কর্মে, স্মৃতিতে এবং ইতিহাসের নীরব স্তরে।

তাঁর রচনাবলি, শিক্ষাচিন্তা, ভাষাসচেতনতা, সংগঠনমূলক ভূমিকা এবং জ্ঞানচর্চার অনন্য দৃষ্টান্ত আজও তাঁকে জীবন্ত করে রেখেছে। তিনি ব্যক্তি থেকে উত্তীর্ণ হয়ে একটি বৌদ্ধিক ধারায়, একটি উত্তরাধিকারে, একটি মানসিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছেন।

তাঁর উত্তরাধিকার বিশেষভাবে তিনটি স্তরে আজও তাৎপর্যপূর্ণ—

  • বাংলা ভাষায় ইসলামি জ্ঞানভান্ডার নির্মাণে তাঁর পথিকৃত ভূমিকা;
  • মাদ্রাসা শিক্ষা ও শিক্ষাসংস্কারের প্রশ্নে তাঁর দূরদর্শী চিন্তা;
  • আলিম, শিক্ষক, লেখক ও চিন্তক—এই চার পরিচয়ের সমন্বয়ে এক আদর্শ ব্যক্তিত্বের নির্মাণ।

চার.

মাওলানা মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমিকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়—আমরা কেন আমাদের বিস্মৃত মনীষাদের পুনরাবিষ্কার করতে চাই? এর প্রয়োজনই বা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল অতীতচর্চার ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা বর্তমান প্রজন্মের আত্মপরিচয়, বৌদ্ধিক সাহস, ঐতিহাসিক গভীরতা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

আমাদের সময়ের অন্যতম বড় সংকট হলো—আমরা দ্রুত তথ্য আহরণ করি, কিন্তু শিকড়ের কাছে খুব কমই ফিরে যাই। ফলে আমরা অনেক সময় জানতেই পারি না, আমাদের সমাজ, ভাষা, চিন্তা, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা-আন্দোলন, সংস্কার কিংবা সাহিত্য-ঐতিহ্যের পেছনে কারা নীরবে ভিত নির্মাণ করে গেছেন। মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি সেই নীরব নির্মাতাদেরই একজন। তিনি প্রচারের আলোয় খুব বেশি আসেননি; তাঁর নাম নিয়ে উচ্চকণ্ঠ উচ্চারণও হয়নি; কিন্তু বাংলা ভাষায় ইসলামি জ্ঞানভান্ডার নির্মাণ, শিক্ষাচিন্তা, অনুবাদ, গবেষণা এবং বৌদ্ধিক প্রস্তুতিতে তাঁর অবদান উপেক্ষা করার মতো নয়। তাঁকে সামনে আনা মানে কেবল একজন মানুষকে স্মরণ করা নয়; বরং একটি নীরব বৌদ্ধিক ধারার প্রতি ন্যায়বিচার করা।

বিস্মৃত মনীষাদের পুনরাবিষ্কার বর্তমান প্রজন্মকে একটি বড় ভ্রান্তি থেকেও মুক্ত করে—সবকিছু যেন এখন থেকেই শুরু হচ্ছে, এমন এক আত্মবিভ্রম থেকে। আজকের অনেক তরুণ মনে করে, তারা একেবারে শূন্য জমিনে দাঁড়িয়ে আছে; অথচ বাস্তবতা হলো, তাদের পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় চিন্তা, সাধনা, সংগ্রাম ও রচনার এক দীর্ঘ উত্তরাধিকার। নূর মোহাম্মদ আজমির জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। সীমিত উপকরণ, সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং সীমিত প্রচারের মধ্যেও তিনি লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, চিন্তা করেছেন, শিক্ষা নিয়ে ভেবেছেন, সমাজের জন্য কাজ করেছেন। এমন মানুষদের সামনে আনলে বর্তমান প্রজন্ম উপলব্ধি করতে শেখে—স্বীকৃতি না পেলেও প্রকৃত কাজ কখনো বৃথা যায় না; নীরব সাধনাও একদিন ইতিহাসের গভীরে স্থায়ী আসন করে নেয়।

এ ধরনের পুনরাবিষ্কার আমাদের ঐতিহাসিক ন্যায়বোধকেও জাগ্রত করে। কারণ ইতিহাস সব সময় যোগ্য মানুষকে তার প্রাপ্য অধিকার দেয় না। অনেককে আড়াল করা হয়, অনেকের অবদান ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যায়, আবার অনেকের কাজ অন্যের উচ্চকণ্ঠ উপস্থিতির আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। নূর মোহাম্মদ আজমির ক্ষেত্রেও আমরা তার কিছু প্রতিফলন দেখতে পাই। বাংলা ভাষায় ইসলামি জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বহু রচনা আজ অপ্রাপ্য, তাঁর পাণ্ডুলিপির হদিস অস্পষ্ট, তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত সংগ্রহও প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। তাঁকে পুনরাবিষ্কার করা মানে তাই শুধু একটি জীবনকে পুনরুদ্ধার করা নয়; বরং ইতিহাসের এক নীরব অন্যায়কে আংশিকভাবে সংশোধন করা।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য এর আরেকটি বড় শিক্ষা নিহিত আছে—মহত্ত্বের পথ একরৈখিক নয়। আমাদের সমাজে অনুপ্রেরণার উৎস প্রায়ই সীমিত কয়েকটি বহুল প্রচারিত নামের মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু নূর মোহাম্মদ আজমির মতো মানুষ দেখিয়ে দেন, ইতিহাসে প্রভাব বিস্তার করতে হলে সবাইকে আলোচিত মুখ হতে হয় না। কেউ গ্রন্থাগারে বসে একটি ভাষার জন্য জ্ঞানভান্ডার নির্মাণ করেন, কেউ মাদ্রাসার শ্রেণিকক্ষে প্রজন্ম গড়ে তোলেন, কেউ সাময়িকপত্রে চিন্তার বীজ বপন করেন, আবার কেউ নীরবে ভবিষ্যতের জন্য পথ প্রস্তুত করেন। এই উপলব্ধি তরুণদের সামনে অনুপ্রেরণার এক বিকল্প মানচিত্র উন্মোচন করে—যেখানে আলো নয়, কাজই প্রধান।

সবচেয়ে গভীর অর্থে, মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি-কে ফিরে দেখা মানে আমাদের নিজেদের বৌদ্ধিক স্মৃতিকে পুনরুদ্ধার করা। আর যে সমাজ নিজের স্মৃতিকে পুনরুদ্ধার করতে পারে, তার ভবিষ্যৎও হয়ে ওঠে আরও দৃঢ়, আরও আত্মবিশ্বাসী। আত্মবিস্মৃত প্রজন্ম সহজেই অন্যের ভাষা, অন্যের মানদণ্ড, অন্যের বয়ানে নিজেকে মাপতে শুরু করে; কিন্তু যে প্রজন্ম নিজের মাটির মনীষা, জ্ঞানঐতিহ্য ও চিন্তার ধারাকে চিনতে শেখে, সে হয়ে ওঠে আত্মমর্যাদাবান, স্বকীয় এবং সৃষ্টিশীল। এই কারণেই নূর মোহাম্মদ আজমিকে পুনরাবিষ্কার করার মানে হচ্ছে বর্তমানকে গভীর করা এবং ভবিষ্যৎকে সুদৃঢ় করার এক অপরিহার্য বৌদ্ধিক প্রয়াস।

পাঁচ.

মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমির মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ আলিম, লেখক ও শিক্ষাচিন্তক কেন আজ তুলনামূলকভাবে আড়ালে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। সেটি হলো—আমাদের সমাজে স্মৃতির রাজনীতি গভীরভাবে কাজ করে। ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্মীয় চিন্তা, শিক্ষা-আন্দোলন, সমাজসংস্কার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, কিছু মানুষকে ধারাবাহিকভাবে সামনে আনা হয়, আর কিছু মানুষ ধীরে ধীরে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া সব সময় প্রকাশ্য বা পরিকল্পিতভাবে ঘটে না; অনেক সময় এটি গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠান, পাঠ্যক্রম, প্রকাশনা, প্রচারমাধ্যম, গবেষণার প্রবণতা এবং সামাজিক রুচির সম্মিলিত প্রভাবে।

ফলে যাঁরা বেশি সুযোগ পেয়েছেন, বেশি মুদ্রিত হয়েছেন, বেশি পুনর্মুদ্রিত হয়েছেন, বেশি আলোচিত হয়েছেন—তাঁরা স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে গেছেন। আর যাঁদের কাজ হয়তো কম প্রচারিত, কম সংগৃহীত, আঞ্চলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ, কিংবা কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীর ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি—তাঁরা ধীরে ধীরে ইতিহাসের আড়ালে সরে গেছেন। নূর মোহাম্মদ আজমির জীবন ও রচনাবলির বর্তমান অবস্থান আমাদের সেই বেদনাদায়ক বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

আমরা প্রায়ই ইতিহাসকে নিরপেক্ষ দলিলের সমষ্টি বলে ধরে নিতে অভ্যস্ত। কিন্তু বাস্তবে ইতিহাস অনেকাংশেই নির্বাচিত স্মৃতির নির্মাণ। কোন মানুষকে পাঠ্যবইয়ে রাখা হবে, কার জীবনী বারবার লেখা হবে, কার রচনাবলি পুনর্মুদ্রিত হবে, কার নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, কে গবেষণার বিষয় হবে—এসবের মধ্য দিয়েই একটি সমাজ তার স্মৃতির কাঠামো নির্মাণ করে। আর এখানেই রাজনীতি কাজ করে। কারণ স্মৃতি কখনোই কেবল অতীতের সংরক্ষণ নয়; এটি বর্তমানের ক্ষমতা, রুচি ও বয়ানেরও প্রতিফলন।

এই বাস্তবতায় নূর মোহাম্মদ আজমির মতো মানুষদের বিস্মৃত হয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়, যদিও তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি রাজধানীকেন্দ্রিক খ্যাতির মানুষ ছিলেন না; তিনি ছিলেন আঞ্চলিক পরিসরের এক গভীর মনীষী। তিনি হয়তো প্রতিষ্ঠিত স্মারক-সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে ওঠেননি, কিন্তু বাংলা ভাষায় ইসলামি জ্ঞানচর্চার ভিত নির্মাণে তাঁর ভূমিকা ছিল মৌলিক। এ ধরনের মানুষদের সমস্যা হলো—তাঁদের অবদান গভীর, কিন্তু দৃশ্যমানতা কম; তাঁদের কাজ দীর্ঘস্থায়ী, কিন্তু প্রচার সীমিত; তাঁদের প্রভাব নীরব, কিন্তু বাস্তব।

অনেক সময় আবার এই আড়াল হয়ে যাওয়া একেবারেই অনিচ্ছাকৃত। একজন মনীষীর পরিবার তাঁর পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করতে পারেনি, তাঁর রচনাবলি নিয়মিত পুনর্মুদ্রিত হয়নি, তাঁর সমসাময়িকদের স্মৃতিকথা হারিয়ে গেছে কিংবা তাঁর কর্মভূমি দূরে ছিল—এসব কারণেও তিনি বিস্মৃত হতে পারেন। নূর মোহাম্মদ আজমির ক্ষেত্রেও আমরা এই চিত্রের বহু দিক দেখতে পাই। তাঁর বহু গ্রন্থ অপ্রাপ্য, বহু পাণ্ডুলিপির অবস্থান অজানা, তাঁর নামে একসময় যে সংগ্রহশালা বা লাইব্রেরির কথা শোনা যায়, তারও কার্যকর অস্তিত্ব আজ প্রায় নেই। ফলে তাঁর বিস্মৃত হয়ে পড়া শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও দলিল।

তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, অনেক সময় বিস্মরণ কেবল অবহেলার ফল নয়; এটি বাছাই করা স্মৃতিরও ফল। ইতিহাসে যাঁরা কোনো প্রতিষ্ঠিত বয়ানের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খান না, যাঁরা মূলধারার প্রচলিত তালিকায় জায়গা পান না কিংবা যাঁদের কাজ কোনো বড় মতাদর্শিক গোষ্ঠীর ধারাবাহিক প্রচারের মধ্যে পড়ে না—তাঁরা ধীরে ধীরে ‘অস্বস্তিকর’ বা ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে পড়েন। তখন তাঁদের নাম আর উচ্চারিত হয় না, তাঁদের রচনা আর খোঁজা হয় না, তাঁদের অনুপস্থিতিকেই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। এই নীরব প্রক্রিয়াই স্মৃতির রাজনীতির সবচেয়ে কার্যকর রূপ।

এই কারণেই মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমিকে পুনরাবিষ্কার করা এক ধরনের বৌদ্ধিক প্রতিরোধ। এটি সেই একচোখা স্মৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যা কেবল আলোচনায় থাকা মানুষদেরই ইতিহাসের যোগ্য বলে মানতে চায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসের প্রান্তে পড়ে থাকা নামগুলোও কখনো কখনো কেন্দ্রের মানুষদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, কখনো তার চেয়েও বেশি। যে সমাজ তার আড়ালে পড়ে থাকা মনীষাদের পুনরুদ্ধার করতে পারে, সে সমাজই নিজের ইতিহাসকে আরও সৎ, বিস্তৃত ও মানবিকভাবে দেখতে শেখে।

নূর মোহাম্মদ আজমিকে তাই ফিরে দেখা মানে স্মৃতির অসমতা, প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এবং নির্বাচিত ইতিহাসের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব কিন্তু জরুরি সংশোধন শুরু করা। তাঁর জীবন ও রচনাবলি উদ্ধার করার প্রয়াস তাই এক অর্থে ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারেরও অংশ।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *