মাওলানা আবুল কালাম আজাদ : কর্মমুখর সংগ্রামীজীবন (প্রথম পর্ব)

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়— ভারতীয় রাজনীতিবিদদের মধ্যে এমন এক মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যার সামনে অন্য সব রাজনীতিবিদকে নিতান্তই ক্ষুদ্র বলে মনে হতো। প্রজ্ঞা, সূক্ষ্মদৃষ্টি, গভীর বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা, পরিস্থিতি ও পরিবেশের নাড়ি-নক্ষত্র বোঝার ক্ষমতা সমস্ত গুণ ছিল তার মধ্যে। জটিলতম সমস্যাকেও তার প্রখর মেধা এমনভাবে সমাধান করত, যেন তা অত্যন্ত সহজ একটি বিষয়। রাজনীতির জটিল গিঁট ও সমস্যার জটিলতা তিনি এমনভাবে খুলে দিতেন, যেন তার কাছে এগুলো কোনো জটিলতাই নয়।

তাঁর বক্তৃতা ও লেখনী উভয়ই ছিল অনন্য ও আকর্ষণীয়। এগুলো ছিল আল্লাহপ্রদত্ত প্রতিভা। তার কলম ছিল শিলাভেদী; মানুষের অন্তরজগৎকে ওলটপালট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখত। তিনি যে বিষয়েই কলম ধরতেন, তা সমগ্র দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করত। তার পত্রিকার পাতাগুলো প্রকাশভঙ্গির অভিনবত্ব, মহিমা ও লেখনীর দাপটে যেন জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো দাউদাউ করে জ্বলত। সেই পাতাগুলো সাধারণ ও বিশেষ মানুষের সভায় পৌঁছলে সেই আগুন হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে জ্বলে উঠত। তার লেখনীর জাদুশক্তি ও সাহসিকতা তাকে ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল করে তোলে। এজন্য তাকে বাংলা ভূমি থেকে নির্বাসিত করা হয়।

আবার সেই একই ব্যক্তি যখন বক্তৃতার আসনে বসতেন এবং তার বজ্রনিনাদ কণ্ঠ আকাশে গর্জে উঠত, তখন ব্রিটিশরাজের কাঁচের প্রাসাদের দেয়াল পর্যন্ত কেঁপে উঠত। শ্রোতাদের মনে হতো যেন এক প্রবল ঝড় বইছে, যা গর্জন করতে করতে, তাণ্ডব চালাতে চালাতে হতাশা ও পরাজয়ের সমস্ত চিহ্নকে ভাসিয়ে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। নির্বাচিত শব্দ, তীরের মতো তীক্ষ্ণ বাক্য, হৃদয়কে আলোড়িত করা বর্ণনাশৈলী, কণ্ঠের ওঠানামা, সুরের ধারাবাহিকতা, ভাষার স্বচ্ছতা ও বক্তৃতার জাদুকরী আকর্ষণ সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি হতো যে, শ্রোতারা নিজেদের চারপাশের জ্ঞান হারিয়ে ফেলত। পুরো সভা যেন মোহাবিষ্ট হয়ে যেত।

তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছিল আল্লাহপ্রদত্ত। তার অধ্যয়ন ছিল এত বিস্তৃত, যেন তার মস্তিষ্ক একটি বিশাল গ্রন্থাগার, যেখানে প্রতিটি বিষয়ে গবেষণামূলক উপকরণ বিদ্যমান।

এই মহান ব্যক্তিত্বের সুউচ্চ মর্যাদা পরিমাপ করতে গিয়ে বড় বড় জ্ঞানীগুণীও যখন মাথা উঁচু করতেন, তখন তাদের পাগড়ি যেন খসে পড়ত এবং হীনমন্যতায় তাদের দৃষ্টি নত হয়ে যেত। এই অনন্য প্রতিভাবান, যুগস্মরণীয় বিস্ময়কর ব্যক্তিত্বকে সমগ্র দেশ গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নামে স্মরণ করে এবং তার প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে। তার সভায় বড় বড় বিদ্বান ও রাজনৈতিক নেতাও কথা বলার সাহস পেতেন না। তার জ্ঞান, গুণ, মহিমা ও প্রভাবের দরবারে প্রতিটি মাথা নত হতো; শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে প্রতিটি কপাল ঝুঁকে পড়ত এবং গর্বভরে উঁচু করে থাকা মাথাগুলোও এমনভাবে নত হয়ে যেত, যেন তা এক ভারী বোঝা।

কুদরতের উদারতা

মাওলানা আজাদের ব্যাপারে কুদরত কতটা উদার ছিল—তা বুঝতে একটি ঘটনা উল্লেখ করাই যথেষ্ট। সেসময় তার বয়স ছিল মাত্র তেরো-চৌদ্দ বছর। কিন্তু তার বক্তৃতার শক্তি ও কলমের জাদুময়তা এমন ছিল যে, সমগ্র দেশের বিদ্বান ও চিন্তাবিদদের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিল। তাদের সভাগুলোতে এই কিশোরের জন্য সভাপতির আসন খালি করে দেওয়া হতো। এত অল্প বয়সেই বড় বড় চিন্তাবিদ ও আলেমরা তাকে ‘মাওলানা’ ও ‘আবুল কালাম’-এর মতো সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করেন। অথচ বয়সের দিক থেকে তখনো তিনি শৈশবের সীমা অতিক্রম করেননি।

এই অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তিই হলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ।

জনাব হালির বিস্ময়

মাওলানা আজাদ স্বভাবগতভাবেই অত্যন্ত মেধাবী ও প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন। মাত্র বারো-তেরো বছর বয়সেই যখন তিনি নিজের প্রতিভার পরিচয় দিতে শুরু করেন, তখন তৎকালীন স্বীকৃত বিদ্বানরাও তাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতেন। ১৯০১ সালে নদওয়াতুল উলামার অধিবেশনের মাধ্যমে তিনি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন এবং লাহোর থেকে প্রকাশিত ‘মাখজান’ নামক হিন্দুস্তানের বিখ্যাত সাময়িকীতে তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। এসব প্রবন্ধ ছিল ভাষার শক্তি, শব্দের মহিমা ও সাংবাদিকতামূলক লেখনীর অনন্য নিদর্শন, যা তাকে বিদ্বান মহলে সুপরিচিত করে তোলে। কিন্তু যখন এই লেখাগুলোর পাঠকদের সামনে মাওলানা আজাদের পরিচয় তুলে ধরা হতো, তখন আলতাফ হুসাইন হালি ও শিবলি নোমানি-এর মতো মহান ব্যক্তিরাও বিশ্বাস করতে পারতেন না যে, এত অল্প বয়সের একটি ছেলে এমন গভীর ও শক্তিশালী প্রবন্ধ লিখতে পারে। কিন্তু সত্য তো এটাই ছিল। এজন্য শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সবাইকে তা মেনে নিতেই হতো।

১৯০২ সালের ২০ নভেম্বর ‘লিসানুস সিদক’ পত্রিকা মাওলানা আজাদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। অল্প সময়ের মধ্যেই এই পত্রিকা বিদ্বান মহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর প্রধান কারণ ছিল, মাওলানা আজাদের কলম থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে গবেষণামূলক প্রবন্ধ তার বক্তৃতার মতোই শক্তিশালী ভাষায় প্রকাশিত হতো।

১৯০৩ সালের মে মাস থেকে তিনি জনাব হালির বিখ্যাত গ্রন্থ হায়াতে জাবেদ-এর ওপর সমালোচনা লেখা শুরু করেন এবং ধারাবাহিকভাবে বহু কিস্তিতে তা প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধমালা জনাব হালি ও তার বৃত্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তী সময়ে যখন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ লাহোরে আঞ্জুমানে হিমায়াতে ইসলাম-এর বার্ষিক অধিবেশনে অংশ নেন, তখন জনাব হালিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। মৌলভি ওয়াহিদউদ্দিন জনাব হালিকে মাওলানা আজাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এ কথা বলে যে, ‘এই হলেন ‘লিসানুস সিদক’ পত্রিকার সম্মানিত সম্পাদক আজাদ।’ এ কথা শুনে হালি বিস্ময়ের সঙ্গে সেই কিশোরের দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং বারবার জিজ্ঞেস করতে থাকেন, ‘এই কি আজাদ?’ অতঃপর তিনি নিজেই মাওলানা আজাদের কাছে তার বয়স জানতে চান এবং তারপর বলেন, ‘তুমি এখনো অনেক ছোট!’

সভাপতির আসনে মাওলানা

মাওলানা আজাদ ‘লিসানুস সিদক’ ছাড়াও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন। তার প্রতিটি লেখাই বিদ্বানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। কোনো পত্রিকা বা সাময়িকীতে তার লেখা প্রকাশিত হলেই মানুষ আগ্রহভরে তা সংগ্রহ করত এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশংসা করত।

শুধু কলমের শক্তিই নয়, কুদরত তাকে দিয়েছিল অসাধারণ বক্তৃতা-দক্ষতাও। তার বক্তৃতার জাদুকরী প্রভাবের সাক্ষী সেই সকল মানুষ, যারা একবার হলেও তার ভাষণ শুনেছেন।

১৯০৪ সালে আঞ্জুমানে হিমায়াতে ইসলাম, লাহোর-এর বার্ষিক অধিবেশনের একটি সভার সভাপতিত্ব দেওয়া হয় মাত্র ষোল বছর বয়সী মাওলানা আজাদকে। তার সভাপতির ভাষণ—বক্তব্যের শক্তি, শব্দের মহিমা, ভাষার সাবলীলতা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও চমৎকারিত্ব এবং সমকালীন পরিস্থিতি ও সমস্যার ওপর নির্ভীক ও দৃঢ় মতামত—এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, সেই ভাষণের পর একজন বিচক্ষণ ও গুণগ্রাহী ব্যক্তি এই কিশোরকে ‘আবুল কালাম’ নামে অভিহিত করেন। তার আলেমসুলভ বর্ণনাশৈলী এত অল্প বয়সেই তার মাথায় ‘মাওলানা’-র মর্যাদার পাগড়ি বেঁধে দেয়। এরপর থেকেই তিনি সারা দেশে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ নামে পরিচিতি লাভ করেন।

এই নামই ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ের তারে যেন সুর তোলে। তার লেখনী থেকে রস আস্বাদনকারীরা তৃপ্ত হওয়ার আগেই শ্রোতারা এগিয়ে এসে তার কথার মুক্তোগুলো নিজেদের আঁচলে ভরে নিতে শুরু করে।

আল্লামা শিবলি ও মাওলানা আজাদ 

আল্লামা শিবলি নোমানি তখন মুম্বাইয়ে অবস্থান করছিলেন। একই সময়ে মাওলানা আবুল কালাম আজাদও মুম্বাই সফরে ছিলেন। তখন তার বয়স প্রায় সতেরো বছর। এক সভায় তাদের সাক্ষাৎ হয়।

আল্লামা শিবলি তাকে দেখে মনে করেছিলেন, তিনি হয়তো মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ছেলে। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবুল কালাম আজাদ কি আপনার পিতা?’ মাওলানা আজাদ মুচকি হেসে বললেন, ‘আমিই আবুল কালাম।’ এ কথা শুনে আল্লামা শিবলি অত্যন্ত বিস্মিত হন। কেননা এর আগে তিনি পত্রিকায় লেখা পড়ে মাওলানা আজাদের কবিতা ও তার মুগ্ধকর গদ্যের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। সেই ধারণা থেকে তিনি ভেবেছিলেন, মাওলানা আজাদ নিশ্চয়ই একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি। কিন্তু বাস্তবে যখন দেখলেন তিনি একজন কিশোর, তখন তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। তবে এই বিস্ময় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। একবার একটি সভায় মাওলানা আলি মাহমুদ, পাঞ্জাবের মাওলানা নিজামউদ্দিন ও আল্লামা শিবলির উপস্থিতিতে এক বিতর্ক চলছিল। সেখানে ‘রশীদিয়া’ গ্রন্থের একটি অংশ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। আল্লামা শিবলি মাওলানা আলি মাহমুদকে রশীদিয়া গ্রন্থের কিছু বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু মাওলানা আলি মাহমুদ বারবার আপত্তি তুলছিলেন এবং বিতর্ক জটিল হয়ে উঠছিল। এ অবস্থায় মাওলানা আজাদ আলোচনায় অংশ নেন এবং শক্তিশালী যুক্তি ও প্রমাণের মাধ্যমে মাওলানা আলি মাহমুদকে সন্তুষ্ট করেন। ফলে তিনি নীরব হয়ে যান। এতে আল্লামা শিবলি খুবই আনন্দিত হন এবং আজাদকে বলেন, ‘তুমি তোমার বক্তব্য চালিয়ে যাও।’ এরপর মাওলানা আজাদ একটি জোরালো ও প্রভাবশালী বক্তৃতা দেন। এতে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লামা শিবলি বলেন, ‘বেটা, তোমার মস্তিষ্ক যুগের বিস্ময়। তোমাকে কোনো জ্ঞান-প্রদর্শনীতে এক আশ্চর্য নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত।’

এই সাক্ষাৎ ও অভিজ্ঞতার প্রভাবেই আল্লামা শিবলি মাওলানা আজাদের এত অল্প বয়স হওয়া সত্ত্বেও তাকে ‘আন-নাদওয়া’ পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত করেন।

আপন পথের কারিগর

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯০৪ সালে মৌলভি মুহাম্মদ ইউসুফ জাফরির কাছে ইংরেজি শেখা শুরু করেন। তার মেধা ছিল অত্যন্ত প্রখর এবং বুদ্ধিমত্তা ছিল জন্মগত। এজন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইংরেজি বই পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজিতে লেখা বই অধ্যয়ন শুরু করেন। যদিও জীবনে কখনোই তিনি ইংরেজিকে নিজের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেননি, তবুও ভাষাটির ওপর তার ছিল পূর্ণ কর্তৃত্ব। ইংরেজি শেখার পেছনে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশ সফর করা এবং ভারতে দ্রুতগতির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। এর একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনাও তিনি মনে মনে তৈরি করে রেখেছিলেন।

ভারতে তার জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। অমৃতসরের বিখ্যাত পত্রিকা ‘ওয়াকিল’-এর মালিক তাকে জোর দিয়ে আন-নাদওয়া পত্রিকার দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন এবং ওয়াকিল পত্রিকার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার হাতে তুলে দেন। সেই সময়ে ওয়াকিল ছিল উর্দু ভাষার অন্যতম প্রসিদ্ধ পত্রিকা। এই পত্রিকার মাধ্যমে মাওলানা আজাদ আলিগড় আন্দোলন এবং তুরস্ক-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে তার মতামত অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রকাশ করেন। এতে পত্রিকার প্রচার কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়।

বিপ্লবীদের অগ্রসেনানী

মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বয়স তখন প্রায় সতেরো বছর। ইতোমধ্যে তিনি সমগ্র ভারতে সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। পত্রিকার পাতা ও বক্তৃতার মঞ্চ—উভয় ক্ষেত্রেই তার প্রতিভা, যোগ্যতা, চিন্তার গভীরতা, সমস্যার বিশ্লেষণ ও ফলাফল নির্ণয়ের অসাধারণ ক্ষমতা সবার কাছে স্বীকৃত। এই অল্প বয়সেই তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব ও গভীরতার সঙ্গে চিন্তা করতে শুরু করেন। তিনি মুসলমানদের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি এবং জিহাদের চেতনা জাগিয়ে তোলার উপায় নিয়ে ভাবতে থাকেন। তখনো পর্যন্ত মুসলমানদের কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক দল সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মাঠে নামেনি। অপরদিকে অন্যান্য ভারতীয়দের মধ্যেও এমন কোনো শক্তিশালী সংগঠন ছিল না, যারা স্পষ্টভাবে স্বাধীনতাকে তাদের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিল। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস তখনো সরকারপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। অবশ্য গোপনে কিছু বিপ্লবী কার্যক্রম বাংলায় চলছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের পথে বাধা সৃষ্টি করা, যেমন থানায় হামলা করা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা ইত্যাদি।

মাওলানা আজাদও দ্রুততর রাজনৈতিক আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু তখনো তার সামনে সুস্পষ্ট কোনো পথ নির্ধারিত ছিল না। এমন সময়ে জানুয়ারি ১৯০৫ সালে তার পরিচয় হয় বাংলার বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা শ্যাম সুন্দর চক্রবর্তী-এর সঙ্গে। মিস্টার চক্রবর্তী মাওলানা আজাদের চিন্তা, আবেগ ও বক্তব্যে গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং তাকে অন্যান্য বিপ্লবীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু গোপনে কাজ করা বিপ্লবীরা নতুন কাউকে সহজে বিশ্বাস করত না। কেননা তারা আশঙ্কা করত, ব্রিটিশদের গুপ্তচর হতে পারে। তাই প্রথমদিকে তারা মাওলানা আজাদের প্রতিও সন্দিহান ছিল।

তৎকালীন বাংলার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে মুসলমানদের অংশগ্রহণ প্রায় ছিল না বললেই চলে। এজন্য অনেকের মনে এই ধারণা জন্মেছিল যে, মুসলমানরা ইংরেজ সরকারের সমর্থক। স্যার সাইয়েদ আহমদ খান এবং তার অনুসারীদের চিন্তাধারা ও কার্যক্রম তাদের সামনে ছিল, যা তাদের মনে এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করেছিল। এজন্য বিপ্লবী হিন্দু বাঙালিরা সাধারণত মুসলমানদের প্রতি আস্থা রাখত না।

মাওলানা আজাদও এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। বিপ্লবীদের সাধারণ বৈঠকে তার প্রবেশাধিকার থাকলেও বিশেষ বৈঠকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হতো না। তাদের মনে সন্দেহ ছিল, হয়তো তিনিও স্যার সাইয়েদের অনুসারীদের মতোই হবেন। মাওলানা আজাদ এই অবস্থাকে গভীরভাবে অনুভব করেন। এতে তার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে। তিনি বিপ্লবীদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন, তর্ক-বিতর্ক করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদেরকে এই সত্য মেনে নিতে বাধ্য করেন যে, কয়েকজন সরকারি পদধারী মুসলমানকে দেখে পুরো মুসলিম জাতির প্রতি অবিশ্বাস জিইয়ে রাখা ভুল। তিনি যুক্তি দেন যে, মিশর, ইরান ও তুরস্কসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমানরা জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করছে, তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব যে, ভারতের মুসলমানদের অন্তরে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নেই? তিনি বিপ্লবীদের এই ভুলও তুলে ধরেন যে, তারা মুসলমানদের মধ্যে কাজ করছে না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তাদেরকে রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে রাখছে। মাওলানা আজাদ তাদেরকে এই বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য করেন যে, যদি মুসলমানদের রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় এবং তাদের ছাড়া স্বাধীনতার সংগ্রাম চালানো হয়, তাহলে তা কখনোই সফল হবে না। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য হিন্দু-মুসলমান উভয়ের যৌথ সংগ্রাম অপরিহার্য। এ ছাড়া স্বাধীনতার কল্পনাও অসম্ভব।

শুরুর দিকে তারা মওলানা আজাদের কথায় বিশ্বাস করতে পারেনি, কিন্তু ধীরে ধীরে বিপ্লবীরা তার চিন্তাধারা ও বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে শুরু করে এবং তার সহচর ও সহমনা হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ মুসলিম যুবকদের মধ্যে কাজ শুরু করেন। তাদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা ও কর্মস্পৃহা জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি তার অগ্নিময় বক্তৃতা ও প্রভাবশালী ভাষা ব্যবহার করেন। এভাবে মুসলিম যুবকদের হৃদয় ও মননে কর্মোদ্দীপনার আগুন জ্বলে ওঠে। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একদল উদ্দীপ্ত মুসলিম যুবক স্বাধীনতার পতাকা দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে তুলে নেয়। এভাবে হিন্দু বাঙালি বিপ্লবীদের মনোভাবও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।

মুসলিম বাঙালি বিপ্লবীরা বাংলায় এমন তীব্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যে, পুরো বাংলা যেন এক অগ্নিগর্ভ ভূমিতে পরিণত হয়। শত শত যুবক কারাবাসকে হাসিমুখে গ্রহণ করে এবং অনেকেই এগিয়ে এসে ফাঁসির মঞ্চকে আলিঙ্গন করে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে।

ইউরোপ ও মুসলিম দেশগুলোতে সফর

১৯০৭ সালের শুরুতে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইরাক, শাম (সিরিয়া), তুরস্ক ও মিশর সফরে যান। একই বছরে তিনি ইউরোপের কয়েকটি দেশও ভ্রমণ করেন। এই সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি নিজে স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি। তবে বিভিন্ন আলামত থেকে এর উদ্দেশ্য অনুমান করা যায়।

ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ইতোমধ্যেই বিপ্লবীদের অগ্রগামী দলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের সঙ্গে বিপ্লবীদের তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। ভবিষ্যতে এর ফলাফল কী হতে পারে, তিনি তা দূরদৃষ্টির মাধ্যমে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই প্রথমেই তিনি বিপ্লবীদের সঙ্গে নিজে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজের আন্তরিক অংশগ্রহণের ব্যাপারে তাদের পূর্ণ আস্থা অর্জন করেন। এরপর তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন যে, স্বাধীনতাকামীদের দ্রুত সংগঠিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে তিনি নিরলস চেষ্টা চালান। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রশ্নে হিন্দু-মুসলমানের যে যৌথ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, তা ছিল তার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল।

কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে কীভাবে সুসংগঠিতভাবে কাজ করা যায়, এ বিষয়ে তখনো কোনো সুস্পষ্ট পথ নির্ধারিত ছিল না। সেই পথের সন্ধানেই তিনি মুসলিম দেশসমূহ ও ইউরোপ সফর করেন। এই সফরে তিনি বিশেষভাবে সেই ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যারা এই দেশগুলোতে বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন।

তুরস্কে তিনি ‘ইয়ং তুর্কস’ আন্দোলনের সদস্যদের এবং মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক-এর সহচরদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইরাকে বিপ্লবী চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তুরস্কে বিপ্লবীদের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ভারতে ফিরে আসার পরও এসব দেশের আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। তাই বলা যায়, তিনি এসব দেশে গিয়েছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য নেতৃত্ব ও কৌশল শেখার উদ্দেশ্যে। তিনি সেসব অভিজ্ঞতা গভীরভাবে আত্মস্থ করেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতার আলোকে কাজ শুরু করেন। এমনকি তার চিন্তাধারা, ভাষাশৈলী ও বক্তব্যের ধরনেও সেইসব মুসলিম দেশের প্রচলিত রীতি ও ধারা প্রতিফলিত হতে থাকে।

আল-হিলাল প্রতিষ্ঠা 

মাওলানা আজাদ যদিও দ্রুততর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছিলেন, তবুও তিনি তখনো পর্যন্ত নিজের কার্যক্ষেত্রকে সঠিকভাবে গুছিয়ে তুলতে পারেননি। তাঁর প্রখর বোধশক্তি, তীক্ষ্ণ প্রজ্ঞা ও অসাধারণ মেধা-মনন যে জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান করেছিল এবং স্বাধীনতা আন্দোলনকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং এর জন্য একটি উদ্দীপ্ত দল গঠন করার যে রূপরেখা তাঁর মনে ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য তাঁর এমন একটি পত্রিকার প্রয়োজন ছিল, যেটাকে তিনি স্বাধীনভাবে একটি নির্দিষ্ট নীতির ওপর পরিচালনা করতে পারবেন এবং যার মাধ্যমে তিনি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হবেন। এই উদ্দেশ্যে মি. মুহাম্মদ আলি যখন ১৯১১ সালের জানুয়ারিতে কমরেড পত্রিকা প্রকাশ করেন, তখন মাওলানা আজাদের এই আবেগ যেন আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে এবং তিনি অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে এই দিকটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। সেসময় পাঞ্জাব ও ইউপি থেকে বহু দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো, কিন্তু সেগুলোর উর্দু লিপি ও মুদ্রণের দিক থেকে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি এতে নতুনত্ব আনতে বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্য তিনি নস্তালিক লিপির পরিবর্তে উর্দু টাইপকে অগ্রাধিকার দিতেন এবং এমন একটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন, যেখানে উর্দু টাইপে সংবাদপত্র মুদ্রণ করা যাবে এবং পত্রিকায় ছবিও প্রকাশ করা সম্ভব হবে। এ কারণেই তিনি কলকাতায় ‘আল-হিলাল’ নামে একটি প্রেস প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

মাওলানা আজাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই প্রকৃতপক্ষে কর্মের সূচনা বিন্দুতে পরিণত হতো। তিনি নিজের ইচ্ছামতো টাইপ প্রেস প্রতিষ্ঠা করলেন এবং ১৩ জুলাই, ১৯১২ সালে ‘আল-হিলাল’ নামে তাঁর অনন্য সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করলেন। সংবাদপত্রের জগতে এই পত্রিকা এমনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, যেন ধূলাবালির স্তূপের মধ্যে হঠাৎ হীরা-জহরত খচিত এক সোনার মুকুট জ্বলজ্বল করছে। আল-হিলাল পত্রিকার প্রথম সংখ্যাই সারা দেশকে চমকে দিয়েছিল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এই পত্রিকা এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করে, যা এর আগে কোনো উর্দু পত্রিকা লাভ করতে পারেনি।

‘আল-হিলাল’-এর পাঠকরা এর প্রকাশের তারিখে অধীর হয়ে ডাকপিয়নের অপেক্ষা করত, আর হাতে পাওয়ার পর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত না পড়া পর্যন্ত অন্য কোনো কাজে হাত দিত না। অল্প সময়েই এর প্রচারসংখ্যা ২৮ হাজারে পৌঁছে যায় এবং অনেক সংখ্যা পুনরায়, এমনকি বারবার ছাপাতে হয়। এই পত্রিকার এমন প্রভাব ছিল, সাধারণ ভোগ-বিলাসে লিপ্ত মানুষ থেকে শুরু করে আলেম-ওলামা ও মাশায়েখের নির্জন আসর পর্যন্ত সর্বত্র এর সমাদর ছিল। এমনকি এতে ছবি থাকা সত্ত্বেও ফতোয়াদানকারী আলেমরাও এই পত্রিকা পাঠ করতেন।

ইতিপূর্বে রাজনৈতিক কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; রাজনীতি ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা তখনো নির্জন কক্ষ থেকে বের হয়ে রাস্তাঘাট ও বাজারে পৌঁছায়নি। ‘আল-হিলাল’ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার আগুনকে এমনভাবে প্রজ্বলিত করেছিল যে, লক্ষ লক্ষ হৃদয় তার চুল্লিতে পরিণত হয়েছিল। আস্তে আস্তে অভিজাত শ্রেণি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের বুকেও যেকোনো বিপদের সঙ্গে লড়াই করার সাহস জন্ম নিতে থাকে। মাওলানা আজাদ এই পত্রিকার পাতাগুলোকে ব্যবহার করেছিলেন এক জ্বলন্ত ভাষণের মঞ্চ হিসেবে; তিনি ছিলেন যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়ানো বক্তা ও উদ্দীপ্ত খতিব।

এটি সেই সময়ের কথা, যখন তুরস্কের খিলাফতের সঙ্গে ভারতীয় মুসলমানদের আবেগঘন সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এবং প্রত্যেকের হৃদয় তুর্কিদের প্রতি সহানুভূতিতে ভরপুর ছিল। এখানকার দরিদ্র জনগণও তুর্কিদের সহায়তায় চাঁদা তুলত। যুদ্ধাহতদের সেবা-চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক দল পাঠানো হতো, যেন তুর্কিদের সমস্যা ভারতীয়দেরই সমস্যা। এমন এক প্রবল উদ্দীপনা সর্বত্র বিরাজ করছিল। সেবার এক নেশা যেন সবার ওপর চেপে বসেছিল, আর ‘আল-হিলাল’ সেই নেশাকে দ্বিগুণ তীব্র করে তুলেছিল। কেননা এতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণার একটি প্রবল সুরও ছিল।

এ সময় বিশ্ব রাজনীতির ওপর গভীর দৃষ্টি রাখতে চাইলে ‘আল-হিলাল’-এর পাতায় নজর বুলাতে হতো। এজন্য ভারতবর্ষের জ্ঞানী মহল, বিশেষত শিক্ষিত সমাজ, এর প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট ছিল। সমসাময়িক বিষয়গুলোতে এই পত্রিকা অত্যন্ত পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ মতামত প্রদান করত। এর প্রতিটি প্রবন্ধে আন্তরিকতা, গভীর চিন্তা ও প্রজ্ঞার আলো ঝলমল করত। আর আবেগময় প্রসঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের অহংকারের প্রাসাদে ঘৃণা ও ক্রোধের আগুন নিক্ষেপ করতে এই পত্রিকা কখনোই ত্রুটি করেনি। এমন বিষয়ে ‘আল-হিলাল’-এর কলম যেন পাথর দ্বিখণ্ডিতকারী ধারালো অস্ত্রে পরিণত হতো।

১৯১৩ সালের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে কানপুর মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা এবং আল্লামা শিবলি ও নাদওয়াতুল উলামার মধ্যে চলমান শীতল দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটনার সময় ‘আল-হিলাল’ যা লিখেছিল, তা ছিল চূড়ান্ত রায়ের মতো। বিশেষ করে কানপুর মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় এই পত্রিকা মুসলমানদের আত্মমর্যাদা ও সম্মানের শিরায় প্রতিশোধস্পৃহার উষ্ণ রক্ত সঞ্চালিত করেছিল।

‘আল-হিলাল’-এর ‘আকবরের সমাধির হৃদয়বিদারক দৃশ্য’ শীর্ষক প্রবন্ধটি হাজারো জ্বালাময়ী বক্তা ও বজ্র কন্ঠের খতিবদের চেয়েও অধিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই লেখাটির কারণে সরকারী অঙ্গনে যেন ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়, ক্ষমতার অহংকারী কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। ব্রিটিশদের স্বৈরাচারী শাসন ‘আল-হিলাল’-কে দমন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য আল-হিলাল পত্রিকার কাছ থেকে দুই হাজার রুপি জামানত দাবি করে।

১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯১৩ সালে জামানত চাওয়া হয় এবং ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯১৩ সালে দুই হাজার রুপি জামানত জমা দেওয়া হয়, যা সরকার বাজেয়াপ্ত করে। এর কিছুদিন পর আবার ‘আল-হিলাল’-এর কাছ থেকে দশ হাজার রুপি জামানত দাবি করা হয়। মাওলানা আজাদ এই জামানতও প্রদান করেন এবং পত্রিকাটি চালু রাখেন; কিন্তু পরে এটিও বাজেয়াপ্ত করা হয়।

এরপর তিনি ‘আল-বালাগ’ নামে আরেকটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘আল-বালাগ’ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। ১২ নভেম্বর, ১৯১৫ সালে এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাটিও ‘আল-হিলাল’-এরই প্রতিচ্ছবি ছিল; একই ভাষা, একই তেজ, একই ভঙ্গি, একই আবেগ, একই চিন্তা ও একই নীতি। তাই আগেই ধারণা করা হয়েছিল, এর সময়ও দীর্ঘ হবে না। অবশেষে ৩১ মার্চ, ১৯১৬ সালে মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শিকার হয় এবং পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

মাওলানার নির্বাসন 

সংবাদপত্র বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি মাওলানা আজাদকে পুরো বাংলা প্রদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। পাঞ্জাব ও ইউপিতে তাঁর প্রবেশ আগেই নিষিদ্ধ ছিল, তাই তিনি বিহারের একটি স্থান—রাঁচি—নির্বাচন করেন। পরবর্তীকালে এই নির্বাসন গৃহবন্দিত্বে রূপ নেয় এবং তাঁর ওপর সব ধরনের আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এই বন্দিদশায় গান্ধিজি মাওলানা আজাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে সরকার তাকে অনুমতি দেয়নি। কেননা মাওলানা আজাদকে গান্ধিজির চেয়েও সরকারের বড় শত্রু মনে করত।

আত্মজীবনী রচনা

১৯১৬ সালের আগস্ট মাসে মাওলানা আজাদের আত্মজীবনী ‘তাযকিরা’ নামে প্রকাশিত হয়। এ সময় তিনি রাঁচিতে গৃহবন্দি ছিলেন। বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। ভাষা ও সাহিত্যের মাধুর্য, বর্ণনার চপলতা, রূপক ও ইঙ্গিতের বাহার, জ্ঞান ও সত্যের আলোচনা এবং সত্যদর্শনের অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে ভাষা ও সাহিত্যের রসাস্বাদনকারীদের জন্য এই গ্রন্থটি অসংখ্য নিয়ামতের ভান্ডার।

যদিও এটি একটি আত্মজীবনী, অর্থাৎ ব্যক্তিগত জীবনের বিবরণ; কিন্তু এতে রূপক ও ইঙ্গিতের এত ঘন পর্দা রয়েছে যে, প্রকৃত ঘটনা ও বাস্তবতা অনুধাবন করা কঠিন। সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবেই এমনটি করা হয়েছে। কেননা ভারতবর্ষ বরাবরই বিস্ময়প্রিয়; সরল ও স্পষ্ট সত্য তাকে দ্রুত আকৃষ্ট করে না, বরং যে বিষয় জ্ঞান ও উপলব্ধির সীমা অতিক্রম করে, অন্ধকারের স্পর্শের মতো যার অস্তিত্ব অনুভূত হয়, সেই দিকেই মানুষের হৃদয় বেশি আকৃষ্ট হয় এবং এক ধরনের মুগ্ধতা তাকে নতজানু করে ফেলে। অথবা তাঁর সৃজনশীল চিন্তাধারা হয়তো আত্মজীবনী লেখার এক নতুন ধারা উদ্ভাবনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেখানে প্রত্যেক পাঠক নিজের বিবেচনায় এর অর্থ অনুধাবন করবে। মোটকথা, পুরো বইটি পড়লে মনে হবে যেন কোমল, মসৃণ, সুন্দর, রঙিন ও আকর্ষণীয় রেশমি কাপড়ের থান একের পর এক উল্টানো হচ্ছে। রেশমের কোমল স্পর্শ আঙুলে শিহরণ জাগাবে, চোখ তৃপ্তি পাবে; কিন্তু যখন শেষ পর্দাটি সরানো হবে, তখন বোঝা যাবে যে, সেই সূক্ষ্ম মসলিনের অস্বিত্ব সেখানে নেই, যার খোঁজ পাঠকের মনে ছিল। কেননা তা আদৌ সেখানে লুকানো ছিল না। রেশমের দোকানের দিকে তাকিয়ে চোখ আনন্দ পেতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের তৃষ্ণা এতে মেটে না।

গৃহবন্দিত্বের স্মৃতি

রাঁচিতে মাওলানা আজাদের গৃহবন্দিত্ব দীর্ঘতর হচ্ছিল। কিন্তু মাওলানা আজাদের মতো কলমের জাদুকর এবং কর্মমুখর ব্যক্তিত্ব এমন অনুর্বর পরিবেশ থেকেও নিজের আগ্রহ ও কর্মের উপকরণ খুঁজে নিতে সক্ষম হন। ‘তাযকিরা’ গ্রন্থের সংকলনের পাশাপাশি ১৪ অক্টোবর, ১৯১৯ সালে রাঁচিতে আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া-র দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই সংগঠনটি তিনি মূলত নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্য সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে চরিত্র গঠন ও কর্মচেতনা নির্মাণের চেষ্টা করেন। তাঁর দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ অনুযায়ী সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এই সংগঠনটিকে মাওলানা আজাদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটি কলেজে রূপান্তরিত করেন। আজও রাঁচিতে সেই প্রতিষ্ঠানটি মাওলানা আজাদের গৃহবন্দিত্বের স্মৃতিকে জীবন্ত করে রেখেছে।

খাঁচার ভেতর থেকে 

মাওলানা আজাদ রাঁচির ছোট্ট এক জগতে আবদ্ধ হয়ে আছেন। অন্যদিকে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিবেশে একের পর এক পরিবর্তন ঘটছে, যা মানুষের মনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে চলেছে। তারা নতুন ও অনুকূল পরিবেশের খোঁজে পাগলের মতো রাস্তায় নেমে পড়ছে। খিলাফত কমিটি গঠিত হচ্ছে, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, আর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর ওপর স্বাধীনতাকামীদের প্রভাব ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

মহাত্মা গান্ধি আফ্রিকার মাটি থেকে ভারতে ফিরে এসেছেন। হিন্দু সম্প্রদায় তখনো তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেনি, কিন্তু মুসলমানরা তাঁকে মাথায় তুলে নিয়েছে। খিলাফত তহবিলের মাধ্যমে তাঁর সফরসমূহ আয়োজিত হচ্ছে। মাওলানা মুহাম্মদ আলি জওহর-এর পত্রিকার ভাষা ও সুর ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে, এমনকি কখনো কখনো তা আগুন ঝরাতে থাকে। হসরত মোহানী চরমপন্থীদের নেতা হয়ে উঠছেন, এবং দেশজুড়ে রাজনৈতিক সচেতনতা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। কিন্তু মাওলানা আজাদ তাঁর বন্দিত্বের ক্ষুদ্র জগতের ভেতর থেকে শুধু এসব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর অন্তর ছটফট করে, ইচ্ছে হয় এগিয়ে গিয়ে রাজনীতির এই অগ্রবর্তী দলটিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে। বন্দিত্বের যাতনা ও দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও তাঁর চিন্তা-চেতনা যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে, তার মাধ্যমে তিনি দেশকে দিকনির্দেশনা দিতে চান। কিন্তু বন্দিত্বের কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করার কোনো উপায় নেই। এজন্য তিনি নীরব দর্শক হয়ে থাকতে বাধ্য হন।

বন্দিত্ব থেকে মুক্তি

১৯২০ সালের পহেলা জানুয়ারি এক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে মাওলানা আজাদের রাঁচির নজরবন্দি অবস্থা শেষ করা হয়। চার বছরের দমবন্ধ করা জীবন থেকে তিনি মুক্তি লাভ করেন। রাঁচির বন্দিত্ব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সরাসরি দিল্লিতে পৌঁছেন এবং হাকিম আজমল খান-এর বাড়িতে মহাত্মা গান্ধি-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।

প্রথম সাক্ষাতেই এই দুই শীর্ষ নেতাকে মাওলানা আজাদ পরামর্শ দেন, ‘অবিলম্বে একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিনিধি দল ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দেশের সমস্যাগুলো তাঁর সামনে উপস্থাপন করুক এবং এরপর একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ শুরু হোক।’

অতঃপর ১৯ জানুয়ারি, ১৯২০ সালে ডা. মুখতার আহমদ আনসারি-এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এই দলে দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ২০ জানুয়ারি ডা. আনসারির সভাপতিত্বে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ-এর একটি যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় মাওলানা আজাদ, হাকিম আজমল খান, বাল গঙ্গাধর তিলক, মুহাম্মদ আলি জওহর, শওকত আলি, মহাত্মা গান্ধি ও হসরত মোহানি-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন।

সভাপতির ভাষণের সুর এতটাই উত্তপ্ত ছিল, সরকার তা সহ্য করতে পারেনি এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা জব্দ করা হয়। সভায় সরকারবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা হয়, অর্থাৎ ‘তর্কে-মুওয়ালাত’ (সম্পর্ক বর্জন)-এর অস্ত্র ব্যবহার করে অহিংস সংগ্রাম শুরু করার প্রস্তাব ওঠে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

যুদ্ধের ঘোষণা

মাওলানা আজাদ ১৯২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে প্রাদেশিক পর্যায়ে একটি সভার আহ্বান করেন। সেখানে মহাত্মা গান্ধি তাঁর স্বভাব ও মেজাজের বিপরীতে এক উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘এখন আর দরখাস্ত করা, প্রতিনিধি দল প্রেরণ কিংবা তোষামোদপূর্ণ সাক্ষাতের যুগ নেই; এখন সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসে গেছে। আমাদের উচিত সরকারের সব উপাধি ত্যাগ করা, চাকরি ছেড়ে দেওয়া এবং ‘তর্কে-মুওয়ালাত’ (সম্পর্ক বর্জন) দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করা। এসব অস্ত্র ছাড়া স্বাধীনতার সংগ্রাম জয় করা সম্ভব নয়।’

গান্ধিজির এই আহ্বান ছিল যেন এক জাগরণী ধ্বনি, যা পুরো কাফেলাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগালো। মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত শ্রেণি ছিল আলেম সমাজ। তারা শুরু থেকেই ব্রিটিশ শাসন মেনে নিতে পারেননি এবং স্বাধীনতার সন্ধানে বিশ্বজুড়ে সংগ্রাম করে বেড়াচ্ছিলেন। তারা যেন কাফন বেঁধে স্বাধীনতার বিভিন্ন ময়দানে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলেন।

কংগ্রেসের এই সিদ্ধান্তের পর আলেমরা ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সহযোগিতাকে হারাম ঘোষণা করেন। পাঁচ শতাধিক আলেমের স্বাক্ষরে একটি ফতোয়া প্রকাশিত হয়, যেখানে বলা হয়, সরকারি কাউন্সিলের সদস্য হওয়া, আদালতে আইনজীবী হিসেবে কাজ করা, সরকারি বা আধা-সরকারি মাদ্রাসা, স্কুল ও কলেজে শিক্ষকতা করা, সম্মানসূচক পদ ও সরকারি উপাধি গ্রহণ করা সবই নাজায়েজ। বিশেষভাবে বলা হয়, ব্রিটিশ সরকারের এমন সব চাকরি—যেগুলো সরকারের শক্তি বৃদ্ধি করে—সবই হারাম। বিশেষ করে পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে চাকরি করা হারাম এবং গুরুতর গুনাহ। কেননা তারা নিজেদের ভাইদের ওপর গুলি চালায়।

এই ফতোয়াটি বড় আকারে মুদ্রণ করে দেশের সমস্ত শহর ও জনপদে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সারা দেশে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। ভারতের রাজনীতিতে এক ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। এরপর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা পর্যন্ত এ নির্দেশনার ওপর আমল করে প্রমাণ করে দেন, মুসলমানরা স্বাধীনতার সন্ধানে কতদূর যেতে পারে!

মাওলানাকে ‘ইমামুল হিন্দ’ উপাধি প্রদান

তর্কে-মুওয়ালাত (অসহযোগ) আন্দোলন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল। এ সময় ‘রেশমি রুমাল আন্দোলন’-এর নেতা শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী ও মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি ১৯২০ সালের ১৮ জুন মাল্টার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে মুম্বাইয়ের ইন্ডিয়া গেটে অবতরণ করেন।

যখন ভারতে ‘ইমামুল হিন্দ’ পদ প্রস্তাব করে শাইখুল হিন্দের কাছে তা গ্রহণ করার অনুরোধ করা হয়, তখন তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর চেয়ে এই মহান পদের জন্য আর কেউ অধিক যোগ্য নন।’ যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদ ঘোষণা করা হয়নি, কিন্তু শাইখুল হিন্দের মুখ থেকে বের হওয়া এই কথা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অধিকাংশ পত্র-পত্রিকায় মাওলানা আজাদের নামের সঙ্গে ‘ইমামুল হিন্দ’ উপাধি যুক্ত করা হতে থাকে।

অসহযোগের প্রথম নিদর্শন

মাওলানা আজাদ ও মহাত্মা গান্ধি একত্রে কংগ্রেসের অধিবেশনে খিলাফত আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতার প্রস্তাব পাশ করান এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের লক্ষ্যে সারা ভারত সফর করেন। এই সফরগুলোর মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে অসহযোগের চেতনাকে আগুনের মতো ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর আলিগড়ে শাইখুল হিন্দের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মাওলানা আজাদ বিপ্লবী ভাষণ প্রদান করেন। একইসঙ্গে একটি জাতীয় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন, উভয়ই একসঙ্গে কার্যকর করা হয়। সেই দিনই এই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করা হয়, যার বাস্তব রূপ পরে দিল্লিতে প্রকাশ পায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, মাওলানা আজাদ এই নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম রাখেন জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া।

একইভাবে কলকাতার ‘মাদ্রাসা-ই-আলিয়া’-র বিপরীতে ‘জামিয়া ইসলামিয়া’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কেননা মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় যদিও প্রাচ্যের বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হতো, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাপনা ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণে। মাওলানা আজাদের আত্মমর্যাদা তা মেনে নিতে পারেনি। তাই তিনি প্রাচ্যের বিদ্যার জন্য একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যার প্রথম শায়খুল হাদিস হন ভারত ও আরবের খ্যাতনামা আলেম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি।

সেইসব দিনরাত্রি

মাওলানা আজাদ প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসাটি দেখতে মহাত্মা গান্ধি কলকাতায় যান। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এই মুহূর্তে আপনার সামনে যে ছাত্রসমাজ উপস্থিত এবং যাদের দৃষ্টি আপনার মুখের দিকে নিবদ্ধ, এরা সেই দল, যারা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের (অসহযোগের) প্রথম দিন যে অঙ্গীকার করেছিল, আজ পর্যন্ত তারা পূর্ণ শক্তির সঙ্গে সেই অঙ্গীকারে অটল রয়েছে।’

এর জবাবে গান্ধিজি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে যে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন, তা তাঁর মহত্ত্ব প্রকাশের জন্য যথেষ্ট। তিনি বলেন, ‘এই সময় ইসলাম বিপদের মুখে। ইসলামী খেলাফত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, পবিত্র স্থানসমূহ দখল করে নেওয়া হয়েছে এবং ভারতের জাতীয় স্বাধীনতাকে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডে পদদলিত করা হয়েছে। সুতরাং তোমাদের কর্তব্য হলো, এই বিষয়গুলোকে সামনে রেখে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হওয়া এবং ইসলাম ও ভারতের প্রতি তোমাদের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা যথাযথভাবে পালন করা।’

১৯২০ সালের ২৬ ডিসেম্বর কংগ্রেসের অধিবেশনের পর মাওলানা আজাদকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে আলিপুর কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

সরকার বয়কটের ঘোষণা : একটি চ্যালেঞ্জ

এটি ছিল সেসময়ের ঘটনা, যখন খেলাফত আন্দোলন চরমে পৌঁছেছিল। জনসাধারণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল, তা মূলত খেলাফত আন্দোলনেরই ফল ছিল। রাজনৈতিক কার্যক্রম দ্রুত থেকে আরও দ্রুততর হচ্ছিল এবং এমন মনে হচ্ছিল যে, মুসলমানরা রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে বিদ্রোহের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে ১৮ জুলাই, ১৯২১ সালে করাচিতে মাওলানা মুহাম্মদ আলির সভাপতিত্বে খেলাফত কমিটির সর্বভারতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল, কোনো ঈমানদার মুসলমানের জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করা হারাম এবং ইংরেজ সরকারকে কোনো ধরনের সাহায্য করা বড় গুনাহ। মুসলমানদের উচিত, ইংরেজ সেনাবাহিনী থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া। এই প্রস্তাব উপস্থাপন ও সমর্থনকারীদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি, মাওলানা শওকত আলি, পীর গোলাম মুজাদ্দিদ, শংকর আচার্য, মাওলানা মুহাম্মদ আলি প্রমুখ।

এই সময়ে কেরালা ও মালাবার পাহাড়ি অঞ্চলের মাপ্পিলা কৃষকরা খেলাফত আন্দোলন এবং ইংরেজদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ফতোয়া প্রচারে সরকারি দপ্তর ও ভবনগুলোতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। করাচি সম্মেলনের পর মাওলানা মুহাম্মদ আলি কেরালায় যাওয়ার পথে সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। মাওলানা মাদানিকে দেওবন্দ থেকে এবং অন্যদের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়।

এ সময় গান্ধিজি ত্রিচিনোপলিতে ছিলেন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি করাচির প্রস্তাবটি সর্বত্র প্রচারের ঘোষণা দেন এবং মাওলানা আজাদকে বলেন, তিনি যেন দ্রুত কলকাতায় গিয়ে এই প্রস্তাবকে এগিয়ে নেন। 

পরবর্তীকালে মাওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানি, মাওলানা মুহাম্মদ আলি, মাওলানা শওকত আলি, পীর গোলাম মুজাদ্দিদ ও মাওলানা নিসার আহমাদের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে তাদের দুই বছরের কঠোর কারাদণ্ড দিয়ে সাবরমতী জেলে পাঠানো হয়।

খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে নতুন প্রাণ সঞ্চারের জন্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯২১ সালে ‘পয়গাম’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর একটি সংখ্যায় তিনি ‘শেষ গন্তব্য কি এসে গেছে?’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখে জনগণকে উপদেশ দেন, জেলখানাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কেননা স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং জেলখানায় নির্ধারিত হবে। বর্তমান সংগ্রামের শেষ গন্তব্য হলো জেলখানা।

এর পরের মাসে মাওলানা আজাদকে আবার গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। কিন্তু শীঘ্রই সরকারের কঠোরতা কমতে শুরু করে। সরকার পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য’কে ডেকে সরকার ও কংগ্রেসের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য মাওলানা আজাদ ও গান্ধিজির সঙ্গে আলোচনা করার উদ্যোগ নেয়।

মালব্যজি প্রথমে জেলে গিয়ে মাওলানা আজাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি জবাব দেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পুরো ওয়ার্কিং কমিটির মুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত না হবে, ততক্ষণ তাঁর একক মুক্তির কোনো অর্থ নেই। এরপর মালব্যজি ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে ভাইসরয় গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন। গান্ধিজি মালব্যজিকে জানান, মাওলানা আজাদের মতামত সঠিক এবং এর সঙ্গে আলি ভ্রাতৃদ্বয়ের মুক্তিও জরুরি।

এই শর্তগুলো দেখে ভাইসরয় সরাসরি গান্ধিজির সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেন। পরে গান্ধিজি ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং শেষ পর্যন্ত সবার মুক্তি একসঙ্গে কার্যকর হয়।

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মাওলানা আজাদ সরাসরি লাহোরে চলে যান, যেখানে ১৮ নভেম্বর, ১৯২১ সালে অনুষ্ঠিতব্য জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বার্ষিক সম্মেলনে তাঁর সভাপতিত্ব করার কথা ছিল।

প্রিন্স অব ওয়েলসের আগমন

একই নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ যুবরাজ প্রিন্স অব ওয়েলস ভারতে আসেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ ভারতবাসী তাঁকে উপযুক্ত সংবর্ধনা জানাতে কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিল না। কিছু স্বার্থান্বেষী ও সরকারের তোষামোদকারী লোক সংবর্ধনা মিছিলে অংশ নেয়। আবেগপ্রবণ রাজনৈতিক কর্মীরা সেই মিছিলে হামলা চালায়। এতে দাঙ্গা বেঁধে যায়; প্রায় পঞ্চাশ জন নিহত হয় এবং চারশোর মতো মানুষ আহত হয়, যাদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ ছিল কংগ্রেসের কর্মী।

সরকার কংগ্রেসের স্বেচ্ছাসেবক দলকে অবৈধ ঘোষণা করে। অতঃপর ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার শুরু হয়। জওহরলাল নেহরুও এই গ্রেপ্তারের আওতায় পড়েন। কেননা হরতাল পালনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। সরকার চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে পাঞ্জাব, ইউপি, বাংলা, বিহার ও বোম্বাইয়ে সভা-সমাবেশ ও মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

মাওলানা আজাদের গ্রেপ্তারের গুঞ্জন তীব্র হয়ে ওঠে। কেননা যখন যুবরাজ কলকাতায় আসেন, তখন জনগণ এমন কঠোর বয়কট করে যে, জনাকীর্ণ কলকাতা শহর প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে; রাস্তায় একজন মানুষও দেখা যাচ্ছিল না। এতে ভারত সরকারের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি হয় যে, যুবরাজকে উপযুক্ত অভ্যর্থনা জানানো হয়নি। তাই মাওলানা আজাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তাঁর গ্রেপ্তার খুব শিগগিরই হবে। কেননা তাঁর সহযোদ্ধা প্রায় সব নেতাই তখন কারাগারে ছিলেন। ৭ ডিসেম্বর, ১৯২১ সালে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। একই সময় বদায়ুনে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের একটি সম্মেলন চলছিল, যেখানে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে যাননি। ততদিনে বাংলায় এক হাজার স্বেচ্ছাসেবক গ্রেপ্তার হয়ে গিয়েছিল।

৯ ডিসেম্বর রাতে মি. করণ শঙ্করের বাড়িতে একটি গোপন বৈঠকে মাওলানা আজাদ অংশ নেন। পরদিন বিকেল চারটায় একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর বাসস্থানে এসে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। একই দিন সি. আর. দাসকেও গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পরের দিন একটি বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মাওলানা জাফর আলি খান জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। ফলাফল স্বাভাবিকই ছিল; তাঁকেও গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

ফুল হলো কাঁটা

ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণার আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল যে, পুরো দেশ যেন এক অগ্নিগিরিতে পরিণত হয়েছিল। পুরুষেরা যেমন তাদের স্বাভাবিক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল, তেমনি নারীরাও এগিয়ে এসে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, ফুলের পাপড়ি দিয়েও হীরার মতো কঠিন হৃদয় বিদীর্ণ করা যায়। ফুলকে শুধু আঙুলের চাপে মাড়িয়ে ফেলা যায় না; তার কোমল, নরম ও মসৃণ পাপড়িগুলোও একসময় তীক্ষ্ণ কাঁটার রূপ ধারণ করতে পারে।

৩০ ডিসেম্বর, ১৯২১ সালে আহমেদাবাদে আলি ভ্রাতৃদ্বয়ের মাতা ‘বিবি আম্মা’-র সভাপতিত্বে সর্বভারতীয় নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের নারীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী হিন্দু নারীদের মধ্যে ছিলেন, শ্রীমতি কস্তুরবা গান্ধি, মিসেস সরোজিনী নাইডু, শ্রীমতি চৌধুরাণী, শ্রীমতি অনুসুয়া বাই, শ্রীমতি সরলা দেবী। অন্যদিকে মুসলিম নারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন, মুহতারামা আমজাদি বেগম (মাওলানা মুহাম্মদ আলির স্ত্রী), মুহতারামা শামসুন্নিসা বেগম (ডাক্তার আনসারির স্ত্রী), হাসরাত মোহানীর স্ত্রী, বেগম খাজা, বেগম সাইফুদ্দিন কিচলু প্রমুখ।

বিবি আম্মা তাঁর সভাপতির ভাষণ এই বার্তা দিয়ে শেষ করেন—

‘হে আমার প্রিয় বোনেরা! জেলখানাকে ভয় পেয়ো না। যখন আমাদের দেশের পুরুষেরা কারাগারে চলে যাবে, তখন আমাদেরই স্বাধীনতার পতাকা উড়াতে হবে। উঠে দাঁড়াও এবং সরকারকে জানিয়ে দাও যে, আমরা যেকোনো মূল্যে স্বাধীনতার এই পতাকা উড়াবই, যদিও এই পথে আমাদের দেহ টুকরো টুকরো হয়ে যায়।’

কাঠগড়ায় মাওলানা

মাওলানা আজাদের শাস্তির রায় বহুবার শুনানি হওয়ার পর তখনো চূড়ান্ত হয়নি। তৃতীয় মাসে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদান করেন, যা ‘কওলে ফয়সাল’ (ফয়সালাকারী বক্তব্য) নামে সারা দেশে পরিচিত। এই বক্তব্য ছিল সত্যের সাহস, কর্মের নিষ্ঠা এবং নিজের আদর্শের সত্যতার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। এটি একদিকে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তরে গভীর প্রভাব বিস্তার করে, অন্যদিকে সাহিত্যের দিক থেকে এমন এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয় যে, এই বক্তব্যকে উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়। আদালত তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয় এবং আলিপুর জেলে পাঠায়।

মাওলানার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত

খেলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করে কংগ্রেস ক্রমেই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই সংগঠনের ওপর ক্রমশ প্রগতিশীল ও স্বাধীনতাকামী ব্যক্তিদের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কংগ্রেসের ইতিহাসে এমন এক সময় আসে, যখন মনে হচ্ছিল, এই বৃহৎ সংগঠনটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে এবং সরকারে কাছে তার মর্যাদা হারাবে।

২৬ ডিসেম্বর, ১৯২২ সালে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মাওলানা আজাদ জেলে ছিলেন। অধিবেশনে এ বিষয় নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়, আইনসভায় অংশগ্রহণ করা হবে কি না। একদল বলছিল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা উচিত। এই দলে ছিলেন সি. আর. দাস, মতিলাল নেহরু, হাকিম আজমল খান প্রমুখ। তারা কংগ্রেস থেকে আলাদা হয়ে ‘স্বরাজ পার্টি’ গঠন করেন। এই ঘটনা ঘটে পহেলা জানুয়ারি।

২৬ জানুয়ারি মাওলানা আজাদ আলিপুর জেল থেকে মুক্তি পান। একই দিনে জওহরলাল নেহরুও জেল থেকে মুক্ত হন। এরপর দ্রুত গয়া’য় কংগ্রেসের অধিবেশন আহ্বান করা হয় এবং উভয় দলকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব মাওলানা আজাদের হাতে তুলে দেয়। তৎকালীন শীর্ষস্থানীয়, অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতারা দু’টি আবেগপ্রবণ দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। এই দুই দলকে একসূত্রে গাঁথার জন্য মাত্র ৩৫ বছর বয়সী তরুণ নেতা মাওলানা আজাদকে নির্বাচিত করা হয়। এটি ছিল তাঁর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার এক কঠিন পরীক্ষা, এবং তিনি এতে সফল হন। তিনি সমস্যার সমাধান এভাবে দেন যে, যারা কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নিতে চায়, তারা তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ৩ এপ্রিলের মধ্যে ২৫ লাখ টাকা চাঁদা সংগ্রহ করবে এবং ৫০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করবে এবং কোনোভাবেই বিরোধী প্রচারণা চালাবে না। একইসঙ্গে এ নির্দেশও দেওয়া হয় যে, যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধী, তারা কোনো ধরনের বিরোধিতা করবে না এবং এসব কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।

এই সিদ্ধান্ত উভয় পক্ষই মেনে নেয় এবং কংগ্রেস ভাঙন থেকে রক্ষা পায়।

বদলে যায় আকাশের রং

মাওলানা আজাদ কংগ্রেসে যোগ দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মিছিলগুলোতে ‘নাড়ায়ে তাকবীর’ ধ্বনিতে হিন্দুরাও উচ্চস্বরে ‘আল্লাহু আকবার’ বলত। এই ঐক্যই ছিল সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এজন্য সরকার ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি অনুসরণ করে ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৩ সালে কংগ্রেসের এক হিন্দু নেতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দকে জেল থেকে মুক্তি দেয়, যিনি হিন্দুদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। 

ভাইসরয় তাঁকে ভাইসরয় হাউসে ডেকে গোপনে আলোচনা করেন। ভাইসরয় স্বামীজিকে বলেন, ‘এই দেশে যারা মুসলমান হয়ে গেছে বা করা হচ্ছে, তাদের আবার হিন্দু বানাতে হবে এবং হিন্দুদের ধর্মীয় সংগঠনকে সামরিক ও যুদ্ধের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে; নতুবা মুসলমানরা এই দেশে প্রাধান্য অর্জন করবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের হাতেই থাকবে।’ এগুলো ছিল লর্ড হার্ডিঞ্জের সেই জাদুকরী কথাবার্তা, যা মানুষের ভেতরের মানবিকতাকে মুহূর্তেই পশুত্বে রূপান্তরিত করতে পারে। এমনকি বাংলার জাদুও যেন ইংরেজদের এই কৌশলের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। এক ইংরেজ কীভাবে কয়েক মুহূর্তে ভারতের ৩৫ কোটি মানুষকে মানবতা থেকে নামিয়ে পশুত্বের নিম্নস্তরে নিয়ে যেতে পারে, এটা কি কেউ ভাবতে পেরেছিল? কিন্তু বাস্তবে তাই ঘটল।

বিশ্ব দেখল, ভারতের দুই বৃহৎ জাতি—হিন্দু ও মুসলমান—যারা ভিন্ন ধর্ম অনুসরণ করেও এতদিন প্রকৃত ভাইয়ের মতো একসাথে বাস করে আসছিল, তারা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এমনভাবে একে অপরের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হলো, যেমন অপরিচিত কুকুর একে অপরকে আক্রমণ করে। চারদিকে হট্টগোল, চিৎকার আর বিশৃঙ্খলা পরিবেশকে বিষিয়ে তুললো। স্বামীজি ‘হিন্দু সংগঠন’ আন্দোলন শুরু করে সারা ভারতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সূচনা করেন। সর্বত্র অশান্তির আগুন জ্বলে ওঠে এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হিন্দু-মুসলিম ঐক্য সম্পূর্ণভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

মাওলানা আজাদ গভীর দুঃখের সঙ্গে এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই আগ্রার উদ্দেশ্যে রওনা হন, যেখানে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ বংশগত মুসলমানদের জোর ও প্রলোভনের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মাওলানা আজাদ আগ্রায় পৌঁছালে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ সেদিনই সেখান থেকে চলে যান, যাতে তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি হতে না হয়। মাওলানা আজাদ জোর করে তাঁকে থামাতে চাইলেও তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি কংগ্রেসের অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতাদের, যারা ‘শুদ্ধি’ ও ‘হিন্দু সংগঠন’ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, ডেকে এনে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তারা স্বীকার করেন যে, এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য তাদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ সময় মাওলানা আজাদ বুঝতে পারলেন, মানুষের পাগল হয়ে যেতে দীর্ঘ সময় লাগে না; কয়েক মুহূর্তেই মস্তিষ্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই উন্মত্ততার প্রভাব বহু বছর ধরে স্থায়ী হয় এবং হিন্দু-মুসলিম বৈরিতা ও পারস্পরিক দূরত্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

[বাকি অংশ পড়বেন পরের সংখ্যায়]

মন্তব্য লিখুন (2)
  1. উবাইদুল্লাহ নাঈম সিরাজী

    সবটুকু পড়লাম! বাকিটুকুও পড়ার লোভ হচ্ছে। কেন পুরোটা একসাথে দিল না আফসোস হচ্ছে। দ্বিতীয় কিস্তি আসতে আসতে তো প্রথম কিস্তি ভুইলা যামু। সুন্দর অনুবাদ করেছেন। অনুবাদ না মৌলিক রচনা পড়লাম পার্থক্য বুঝিনি। আল্লাহ আপনার ইলম-আলম, কলম ও জীবনে বরকত দিন।

    1. Hossain Ahmad Khan

      আমিন! শুকরিয়া। নিয়মিত পড়বেন আশা করি।

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *