খোকন মোট দুটি জগতে বাস করে। একটা প্রতীক ও চিত্রের জগতে। আরেকটা বাস্তব জগতে বা আমরা যে জগতটা সরাসরি দেখি সেটায়। সুফিবাদীরা প্রথম জগতকে আলামুল মেছাল আর দ্বিতীয় জগতকে আলামুল ওয়াকে বলে থাকে। আলামুল মেছালে যেটা ঘটে সেটা আলামুল ওয়াকেতে ঘটা জিনিসগুলোর প্রতিচ্ছবি বা প্রতীকী চিত্র। সেটা স্বপ্নের মতো হতে পারে অথবা আত্মিক শক্তির মাধ্যমে কল্পনায় হাজির হওয়া কোনো ছবিও হতে পারে। এইসব প্রতিচ্ছবির কোনো ম্যাটারিয়াল শরীর নাই। প্রত্যেকটা ঘটনা বাস্তব জগতে ঘটার ন্যানো মুহূর্ত আগেই প্রতীকী জগতে ঘটে যায়। খোকনের বসবাস উভয় জগতেই। আপনি পড়লেই বুঝতে পারবেন সে যেমন ‘মেছালপুরে’ বাস করে, তেমনি ‘ওয়াকেগঞ্জে’ও বাস করে। আপনি এটাও লক্ষ করবেন যে, তার মেছালপুরে ঘটা ঘটনাগুলো ওয়াকেগঞ্জে ঘটা ঘটনাগুলোর চেয়ে কতটা আলাদা ও অদ্ভুত।
খোকন ভোররাতে ঘর থেকে বের হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ রগড়ে বোঝার চেষ্টা করছে সে কোথায় আছে। ঘুমিয়ে যাওয়ার সময় ও ঘুম থেকে ওঠার সময় তার স্মৃতি বিস্মৃত থাকে। হালকা অন্ধকারে খোকন জায়গাটা নির্ণয় করতে পারছে না। সে ডান অথবা বাম দিকের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করল। আলো কিছুটা ফুটলে সে অনুধাবন করতে পারল, সে মেছালপুরে অবস্থান করছে। খোকনের ইন্দ্রিয়গুলো একটু একটু অনুভূতি পাওয়া শুরু করল। তার ডানদিকের দাঁতের মাড়িতে ব্যথাটা মোচড় দিয়ে উঠছে। ব্যথাটা বিদ্যুতের মতো তরঙ্গায়িত হয়ে অন্য দাঁতগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যথার তরঙ্গ পিছনে ব্যাক করে আবার আক্রান্ত দাঁতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। সেখানে আবার ব্যথার ঢেউ নতুন উদ্যমে জেগে উঠছে এবং ঢেউয়ের রেশ মুখগহ্বর ছাড়িয়ে মাথার তালু পর্যন্ত টোকা দিচ্ছে। খোকনের বুকের ভিতরে চুরচুর করছে। বুকের ভাঁজের অতল থেকে চুরচুর ভাঙার শব্দ ভেসে আসছে।
খোকন হেঁটে মেছালপুরের গভীরে ঢুকে পড়ছে। তার মনে হচ্ছে একটা আগামাথাহীন রাস্তায় হাঁটছে। মেছালপুরে ধূসর আলো ছেয়ে আছে। যেন আকাশ থেকে ছাইয়ের রেণু ঝরছে। সূর্যগ্রহণের মতো সূর্যের আলো নিস্তেজভাবে পড়ছে। গাছপালা, পশুপাখিগুলো ভীষণ রকম আবছা লাগছে। এগুলো দেয়ালে ঝোলানো চিত্রের মতো দেখাচ্ছে।
ধানভরতি একটা টলি ভটভট শব্দ তুলে খোকনের পাশ দিয়ে সামনে ছুটে যাচ্ছে। তার মনে পড়ছে শীতের সকালে ঘর থেকে বের হয়ে সে ও খাব্বাব রাস্তার ড্রেনে মুতত। পেশাব থেকে উদ্গত ধোঁয়ার ওড়াউড়ি দেখত। প্যান্টের চেইন লাগিয়েই দুজনে লাফিয়ে টলির পিছনে ঝুলে যেত। ধান বেঁধে রাখা রশিগুলি শক্ত করে ধরে থাকত। কিন্তু মাঝপথে খাব্বাবের ঘাড় থেকে স্কুলব্যাগ পড়ে যেত। সে ওটা তোলার জন্য নেমে যেত। ততক্ষণে টলি তার হাতের নাগালের বাইরে চলে যেত। খোকন একলাই ঝুলে ঝুলে স্কুলে যেত।
খোকন স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ল। সে দৌড়ে গিয়ে টলির পিছনে চড়তে চাইল। টলির পিছনে পা রাখতেই টলিটি গলে গেল। এটা অদৃশ্য হয়ে গেল৷ তার পা বেকায়দাভাবে মাটিতে পড়ল। তার অনেক ব্যথা লাগল। সে অস্থিরতা নিয়ে দৌড়াতে লাগল। সে লক্ষ করল মেছালপুরের জিনিসগুলো পুরাপুরি গঠিত নয়। গাছপালা, বাড়িঘরগুলো সামনে থেকে পিছনের দিকে ধেয়ে আসছে। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে একটা বাড়ির বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে। অংশগুলো ধীরে ধীরে গঠিত হচ্ছে এবং তার কাছে এসে পূর্ণ বাড়ির রূপ নিচ্ছে। সে পিছন ফিরে দেখছে বাড়িটির আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে। এবং দূরে গেলে সেটা ক্ষুদ্রতর হয়ে পড়ছে, লম্বা রেখার রূপ নিচ্ছে।
খোকন ক্লান্ত হয়ে একটা খালের পাশে গিয়ে থামল। সে দেখল খালের ওপাশ থেকে একটা মেয়ে এদিকে আসছে। ওর ভেজা হাঁটু ও উরু দেখে খোকনের ভিতর কামুকতা জাগছে। মেয়েটির থুতনি ও বুক বেয়ে পড়া পানির কাতরা মাটিতে পড়ছে টপাস টপাস করে। খোকনের বুকের চুরচুরে ভাঁজগুলোতে টপাস টপাস শব্দ তরঙ্গায়িত হচ্ছে। তার বুকের চিকন চিকন ফাটলগুলো মেয়েটির গা বেয়ে পড়া কাতরায় সিক্ত হচ্ছে, ছিদ্রে পুটিং করার মতো এঁটে ধরছে। খাল থেকে উঠে মেয়েটি তার দিকে কাতর নজরে চেয়ে আছে। খোকন এগিয়ে গেল, কারণ তার বুকের ফাঁটা রেখাগুলি গিটারের তারের মতো ওঠানামা করছে। সে বলল, তুমি কে, তুমি এত ধূসর কেন, তোমাকে চিনলাম না গো দেবী? মেয়েটি কিছু বলছে না। খোকন ওর গাল ও থুতনি নাড়ছে। মেয়েটির যোনিতে হিড়হিড় করে ঢুকে পড়ছে। মেয়েটির তালের মতো ভারী পাছা খোকনের হাতে আটছে না। খোকনের মনে হচ্ছে মেয়েটি বিশাল হচ্ছে। সে বিরাট হয়ে উঠছে, খোকনকে ওর ভিতরে ঢুকিয়ে নিচ্ছে চিরকালের মতো। সে মেয়েটিকে ঠেলছে, মেয়েটি প্রসারিত হচ্ছে, প্রসারিত হওয়ার যন্ত্রণায় ওর কাঁধ বেয়ে ঘাম ঝরছে। ঘামের গন্ধ শুঁকে খোকন মাতাল হয়ে বলল, তুমিই মাসুমা হয়ে থাকবে। তুমি এটা নও কি? মেয়েটি বলল, হ্যাঁ আমিই এটা। এসো ঢুকে পড়ো। খোকন ওর কুসুমিত স্তনে হাত দিতেই সেগুলো গলে গেল। মেয়েটির কাঁধ ও পাছা সব অদৃশ্য হয়ে গেল। খোকনের বুকের গিটারে মাসুমা শব্দটি ডুকরে বেজে উঠল। গিটারের তারগুলি করুণভাবে থেমে যাওয়ার মধ্য দিয়ে গানটি সমাপ্ত হলো।
খোকন অস্থির হৃদয় নিয়ে খাল পার হচ্ছে। তার বুকের চুরচুরে ভাঙন বেড়ে যাচ্ছে। দাঁতের ব্যথা মাথার তালু ছিবড়ে খাচ্ছে। সে দৌঁড়াচ্ছে, এতে তার ব্যথা কম লাগছে। সে দৌঁড়াচ্ছে। তার মনে হচ্ছে পিছন থেকে তাকে সবকিছু ধাওয়া করছে।
ওয়াকেগঞ্জের ঘটনাগুলো
তীব্র মশার কামড়ে খোকনের ঘুম ভাঙল। তার গা ঘেঁষে একটা কুকুর ঘুমাচ্ছে দেদারসে। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এমাথা ওমাথা হেঁটে সে বোঝার চেষ্টা করছে সে কোথায় আছে। সে বুঝতে পারল এটা একটা স্টেশন। ধীরে ধীরে স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা চা-স্টল দেখে বসল। গপগপ করে একটা রুটি খেল। চায়ে চুমুক দেওয়ার পর তার মাথা খোলা শুরু করল। দোকানে একতালে লোকাল গান বাজছে। খোকন মনযোগ দিয়ে এক ট্রাক ড্রাইভারের চা খাওয়া দেখছে। লোকটি চা শেষ করে আরেকটা চা নেবে কি না দ্বিধা করছে। গুলের কৌটায় টোকা দিয়ে দিয়ে আঙুলের মাথায় গুল ঢালছে। আঙুলে গুল জমে ঢিবির মতো উঁচা হচ্ছে। তারপর আঙুলটা মাড়ির ফাঁকে ঢুকিয়ে টাইট করে ঘষা দিচ্ছে।
একটা পান খেলে খোকনের ভালো লাগত। কিন্তু পকেট থেকে টাকা বের করে হিসাব করে দেখল, পান খেলে বিলাসিতা হয়ে যাবে। সে বেঞ্চে মাথা নিচা করে বসে আছে। সে তার হাত-পাগুলো দেখছে, সারা রাত মশা কামড়ে চামড়া ছিলে ফেলেছে। সে গত রাতের তেমন কিছু মনে করতে পারছে না। তার শুধু মনে আছে অনেকগুলো মানুষ গিজগিজ করছিল, কথা বলছিল। সে এত হট্টগোল এত আওয়াজ কখনোই দেখেনি। তার মাথা ধরে আসছিল। সে ক্লান্ত ছিল। সে ফাঁকা একটি বেঞ্চিতে ঘুমিয়ে পড়ছিল।
অবশ্যই সে কোথায় বসে ছিল সে ব্যাপারে সে কিছুই জানত না। ঘুম আসার আগের মুহূর্তটা তার খুবই ক্রিটিকাল। তার বুকের ভিতরে শুধু চুরচুর করে। সে তখন সবকিছু বিস্মৃত হয়। একারণেই ঘুমের মধ্যে থাকা তার সবচেয়ে পছন্দের কাজ। খোকন বাড়ি থেকে পালানোর সময়ে বন্ধু খাব্বাব নসিয়ত করেছিল, যেখানে মানুষের ভিড় দেখবা ব্যাগ, পকেট সাবধানে রাখবা। খোকন এটা ভেবে খুশি হলো, ঘুম থেকে উঠে সে তার জিনিসপত্র ঠিকঠাক পেয়েছে।
সে চায়ের বিল শোধ করে দোকান থেকে বের হয়ে দাঁড়াল। গাছগুলো পাখিদের কোলে নিয়ে অনন্ত ঘুমে আবিষ্ট হয়ে আছে। পাতাগুলো কত কোমলভাবে মাথা নুইয়ে রেখেছে। গাছের টিকিতে নিয়ন আলোর ছটা ডিম লাইটের রূপ নিয়ে ডালে ডালে মৃদু আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। খোকনের মনে হচ্ছে গাছ আর এর বাসিন্দাগুলো পৃথিবীর বাইরের একটি জগৎ। এরা একই রূপে ঘটেই চলছে। এভাবেই এরা ছিল, আছে এবং থাকবে। এরা নিজেরাই অনাদি সময়। এরা সময়ের মধ্যে আলাদা বস্তুরূপে বাস করছে না। বরং এরাই অনাদি কাল। অনন্তের একটি প্রকাশ।
ফজরের আজান হচ্ছে। খোকন স্টেশনের প্রবেশমুখে ঢুকতে গিয়ে লোহার দরজায় পাঠ করল সান্তাহার স্টেশন। প্লাটফর্মে সে এলোমেলো হাঁটল। এরপরে রেললাইনে নেমে পড়ল। স্টেশন পিছনে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পর্যন্ত হাঁটল। গ্রামের কাঁচা রাস্তায় নেমে পড়ল। অন্ধকার ও আলোর মিলনঘনিষ্ঠ দৃশ্যপটে বয়স্ক মুসল্লিগণ ঘর থেকে বের হচ্ছে। আলো-আঁধার দুজনা এত গাঢ়ভাবে প্রেম করছে যে, কিছু ঘুমন্ত মানুষ এদের ফুলশয্যায় ফুল ছিটাতে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে পড়ছে। নীরবে নীরবে আলো, অন্ধকার আর ঘোরগ্রস্ত প্রেমিকদের এই ইশক উদ্যাপন ঘটে যাচ্ছে, মোলায়েম দৃশ্যটি দেখে খোকনের হৃদয়ে আসক্তি ফাল পেড়ে উঠছে। সে বিদ্যুতায়িতের মতো মুসল্লিদের পিছনে পিছনে হাঁটছে। মসজিদের এককোণে বসে সে নক খুটছে, আঙুল ফোটাচ্ছে। সুন্নত পড়ারত মুসল্লিদের রুকু-সেজদা দেখছে। তার মনে হচ্ছে এখানে সবার আত্মায় আত্মায় একটা কানেকশন চলছে, জালের মতো কানেকশনটা বিস্তার করে আছে। তার আত্মাও জালের কোনো বন্ধনে ঝুলছে। ওপর থেকে খোদায়ি সুকুন নেমে ছড়িয়ে পড়ছে জালের প্রান্তে প্রান্তে, জালের বিভিন্ন সুতায় ঈমানি স্পিরিট দোলা দিচ্ছে। আত্মাগুলি ভিতর থেকে ঝংকার দিয়ে উঠছে, আত্মার দুয়ারগুলি ফটফট খুলে যাচ্ছে।
গ্রামটা সে সারাদিন ঘুরল। রাত বাড়তে থাকলে চা-দোকানের বেঞ্চিতে বসে সে ভেবে দেখল, সারাদিন কোনো মানুষের সাথে তার কথা হয়নি। মানে লোকেরা তাকে দেখে অপরিচিত মনে করেনি। কেউ হয়তো সর্বোচ্চ ভাবলে ভেবেছে, স্থানীয় কোনো লোকের আত্মীয় বেড়াতে এসেছে। সে ভেবে দেখল, সে নিজেকে নিয়েও কিছু ভাবেনি। তার কিছু একটা করা যে দরকার সেটাও ভাবার সময় পায়নি। দোকানি ও দোকানের শেষ কাস্টমাররা দোকান বন্ধ করে উঠে যাচ্ছে। খোকনকে উঠতে না দেখে অলস ভঙ্গিতে লুঙ্গি টাইট দিতে দিতে এক কাস্টমার বলল, বেশি রাতত বাহিরে থ্যাকো না বা। ইদানিং চুরি-চামারি বাড়ে গেছে।
খোকন ব্যাগ বালিশ বানিয়ে বেঞ্চে শুয়ে আছে। আকাশ দেখছে। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে দেখছে না। আজকের আকাশ দেখায় তার তারা গুণে শেষ করবার তাড়না জাগছে না। সে একটা জিনিস ভাবা শুরু করছে, সেটা অর্ধেক রেখেই আরেকটা জিনিস চিন্তায় ঢুকে পড়ছে, সেটাও অর্ধেক রেখেই আরেকটায় শিফট করছে।
মুহিত এইদিক দিয়ে ঘরে ফিরছিল। বেঞ্চে অদ্ভুতভাবে ঘুমাতে থাকা খোকনকে দেখে সে তব্দা খেল। সে তাকে ঘুম থেকে উঠানোর যাবতীয় নিয়মে চেষ্টা করল। তাকে কিল ঘুষি দিয়ে অবশেষে তুলতে পারল। কারণ আমরা জানি যে, তার ঘুম ধরার ব্যাপারটি ক্রিটিকাল। ঘুমের আগে বেশখানিক সময় সে বিস্মৃত থাকে, বুক চুরচুর করে। বুকের যন্ত্রণা ও বিস্মৃতির তীব্র চাপ নিয়ে সে ঘুমে প্রবেশ করে। তাই ঘুম তার প্রগাঢ় হয়।
খোকন মুহিতের সাথে বসবাস শুরু করল। মুহিত ছোট জিরজিরে টিনের একটি ঘরে থাকে। মুহিতও লিকলিকে। হালায় খায়ও কম। তাকে রুটিরোজগার করতেও দেখা যায় না। তাকে দুপুরে বুয়া টাইপ এক মহিলা এসে খাবার দিয়ে যায়। প্রথম রাতে সে খোকনের ব্যাপারে মোটামুটি বিস্তারিত শুনেছে। বাকি সে নিজে তেমন একটা কথা বলে না। মানুষদের থেকে সে আলাদা থাকতে পছন্দ করে।
মুহিতের ঘরে খাট নাই। প্রচুর নতুন-পুরানা ছেঁড়াফাটা বইয়ে ঘরের দেয়ালগুলি ভরতি। বইয়ের সেল্ফ নাই। মেঝেতে বই ছিটিবিটি হয়ে আছে। সে এভাবেই শোয়, বগলের তলে একটা বই হাঁটুর ওপরে আরেকটা বই, যা তা হয়ে শুয়ে থাকে। এমন না যে সে খুব সিরিয়াস পাঠক। বরং বই পাঠের সময় তার চেহারায় ভাসা বিরক্তিবোধ বোঝা যায়। তবে কোনো এক চাপে বা অভ্যাসে এটা কন্টিনিউ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারটা খোকনকে অবাক করে প্রথমে, পরে বুঝতে পারে প্রতি সপ্তাহ মুহিতের ঘরে একটা পাঠচক্র বসে। মূল এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ঘরটা ওদের জন্য নিরিবিলি বান্ধব।
খোকনও পাঠচক্রে জড়িয়ে পড়ে। প্রথম প্রথম সে তেমন আলাপ দিতে পারত না, নিজের জানাশোনার কমতির জন্য লজ্জা লাগত। কিন্তু একটা সময়ে পাঠচক্রে সে ভিন্নধর্মী সব আলাপ দেওয়া শুরু করল। সে হয়ে উঠলো পাঠসার্কেলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
আমরা একটু খোকনের এলাকায় ফিরে যাব। বাড়ি থেকে সে পালিয়ে আসার আগে প্রেক্ষাপট কী ছিল, ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখব। খোকন এখানে জন্ম নেয় একটা নিম্নশ্রেণি ঘরে। তার মা থালাবাসন মাজা ও ঘর মোছার কাজ করে প্রতিবেশী বাড়িতে। এমন না যে তার বাবার আয় রোজগার খুব খারাপ। তার বাবা একটা প্রতিষ্ঠিত মুদি দোকানের মালিক। তথাপি ওয়াকেগঞ্জে খোকনদের শ্রেণি হিসাবে এটাই ঐতিহ্য চলে আসছে। যেহেতু তাদের বংশধারা এখানে বহিরাগত, তাই তারা স্থানীয় উচ্চবংশীয়দের টুকিটাকি হুকুম তামিল করে নিজেদের বসবাস বৈধতা প্রমাণ করে।
খোকন ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ছে। সে মালিকদের বাসায় যায় তার মায়ের সাথে। মালিকের ছেলে চেয়ারে বসে খায়। সে বারান্দায় বসে অমায়িক চিত্রটি দেখে। একটি বিলাই ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে ওর খাওয়ার দিকে, হাড্ডি-কাঁটা পাওয়ার অপেক্ষায়। খোকন ভাবে বিলাইটিও কেন চেয়ারে উঠে খাবার খেতে পারছে না। বা বিলাইটি খাবারের জন্যে নিচে বসে অপেক্ষা করছে, দৃশ্যটি দেখে খোকনের মাথায় বসে যায় উঁচা-নিচার একটি ধারণা। বিলাইকে নিচে বসতে হয়। মালিকের ছেলেকে ওপরে বসতে হয়। এটাই নিয়ম। সে কল্পনায় বিলাইটিকে লাফিয়ে লাফিয়ে টেবিলে উঠাচ্ছে। না, দৃশ্যটা মানাচ্ছে না। সে বিলাইটিকে লেখাপড়া করিয়ে কাঁধে বইয়ের ব্যাগ চড়িয়ে মানুষের বাচ্চার মতো কল্পনা করছে। তারপর তাকে চেয়ারে বসাচ্ছে। না এই দৃশ্যটাও মানাচ্ছে না। সে ভাবছে বিলাইকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ বানিয়েই বা কী লাভ। বিলাই বিলাইরূপেই সুন্দর। নিচে বসে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকাতেই ওকে সুন্দর লাগে।
আরেকদিন সে মালিকের ছেলের সাথে কি একটা খেলা খেলছে। ফিরদাউস চাচী যিনি খোকনদের মতোই নিম্নশ্রেণির, যিনি মাঝেমধ্যে এসে মালকিনের আচার বানিয়ে দেন, গপ্পসপ্প করেন। মালিকের ছেলে খাবার খেয়ে তোয়ালে দিয়ে হাত মুছছে না। তার মা তাকে জিজ্ঞাস করলে সে বলে, আমি দেখেছি ফিরদাউস বুড়ি এতে মুখ মুছেছে। আমাকে নতুন তোয়ালে দাও। খোকন এটা দেখে অনেক অবাক হয়। তার বুকের ভিতরে খুব খারাপ লাগে।
খোকন বেড়ে ওঠে। মালিকের বাসায় যাওয়া বাদ দেয়। সে প্রতিদিন দুপুরে তাদের ঘরের পিছনে চলে যায়। সে সেখানে মালিকদের বাসার টিনের বেড়ার ভেঙে পড়া ফাঁক দিয়ে মুগ্ধকর এক দৃশ্য দেখতে পায়। মালিকের মেয়ে বাড়ির উঠানে গোছল করে লাফিয়ে লাফিয়ে। সে মেয়েটির বুকে সদ্য ফোটা শাদা ফুলবৃন্ত দুটি দেখে কেঁপে ওঠে। সারা রাত ঢিপঢিপ করে বুক। সে সুখের চোটে বুকে বালিশ চাপা দেয়, মুচকি হাসে, এপাশ ওপাশ করে।
স্কুলে সে মনোযোগ পাচ্ছিল না। কারণ তার মাথায় বিড়ালকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ বানানোর কল্পনাটি বসে গেছে। সে ভাবে বিড়াল পড়াশোনা করলেও উঁচায় উঠতে পারবে না। বিলাই চেয়ারে বসলেও তাকে মানাবে না। আমি বসলেও দেখতে ভালো লাগবে না। সে পড়াশোনা করে চেয়ারে উঠার কথা ভেবে আতঙ্কিত হয়। কিন্তু গোসলরত লাফানো মাসুমাকে দেখার পর থেকে সে স্কুলে নিয়মিত যাওয়া শুরু করে। তার ভিতরে কৈশরিক উত্তেজনা শুধু ফরফর করে। সে স্কুলে গিয়েই খাব্বাবের কাছে প্রেম বিষয়ে জানতে চায়। সে মাসুমার প্রতি তার কোমল অনুভূতিগুলো খাব্বাবকে খুলে বলে। মাসুমা তার চেয়ে নিচের ক্লাসে পড়ে। খাব্বাব তাকে বলে দেয় স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তায় মাসুমাকে অনুসরণ করতে। সে তা-ই করে। মাসুমা পিছনে অনবরত পায়ের শব্দ বুঝতে পেরে পিছন ফিরে। খোকন ইতস্তত হলো, কিন্তু তার হাত যন্ত্রচালিতের মতো পকেটে ঢুকে চকলেট বের করল। বইয়ের ভাঁজ থেকে ময়ূরের পাখা বের করল। সে জিনিসগুলো মাসুমাকে দিচ্ছে, তার দুই হাঁটু দুর্দান্তভাবে কাঁপছে। মেয়েটি বলে, এগলা হামাক দিলেন ক্যান। সে বলে, তোমাক হামার ভালো লাগে। মেয়েটি মৃদু হাসে, মুখ লাল হয়, লজ্জা পায়, ওড়নায় ঢাকে নাক।
খোকন স্কুলে যায় না। সকাল এগারটায় ঘর থেকে বের হয়ে চা স্টলে ঢোকে। চাঅলা চ্যাংড়া আব্দুল কাদেরকে লাল চা দিতে বলে। দূরে মাচানে বসে আড্ডা দিচ্ছে উঁচাবংশীয়রা। তারা কাদেরকে ডাকে। কাদের খোকনকে চা না দিয়েই মাচানের দিকে ছুটে যায়। সে বিষণ্ণ মুখে ফিরে আসে। সে বলে, হো মুই তোর পাইট শালা। তোর সদাই কিনতে ডাকিস। চায়ের অর্ডার দিলে দে, নাইলে মুই তোর চাকর লয় দি যখন কবু তখনই বাজারত যামু। মোর মেলা কাস্টমার বসে আছে এটি। মাচানের লোকটা ছুটে এসে বলে, যাবু লা তাইলে। কাদের বলে, না। লোকটা তাকে থাপ্পড় লাগায়। খোকন বলে, অই তো ঠিকই কইছে। প্রথমে খোকনের চাচা তাকে চড় মারে : বেয়াদবি কুন্টি শিখছি, বইয়োত? স্কুলত না যায়ে এটি বসে ফুটানি দেখাস? এরপরে অন্য বড়লোকরাও তাকে একটা করে মাইর লাগায়।
খোকন চায়ের দোকানেও যাওয়া বাদ দেয়। দূরে ভূঁইবাড়ি চলে যায়। বসে থাকে। লাড়ার ফাঁক দিয়ে ইন্দুরের দৌড়াদৌড়ি দেখে। ইন্দুর ঠোঁটে ধানের শিষ নিয়ে গর্তে ঢোকে। আবার বের হয়। বিকাল হলে মাসুমা যখন স্কুল থেকে ফেরে, তার সাথে সে কিছু রাস্তা হাঁটে। তার হাত ধরে। হাতে চুমা দিয়ে তাকে বিদায় জানায়। তার ভালো লাগে। মাসুমা তার প্রিয়তম ফুল। প্রতিদিন একবার করে ঘ্রাণ নেয়। কিন্তু খাব্বাব হালায় বড়লোকের ছেলে। সে কিনা বলে, সে চেয়ারম্যানের মেয়ের সাথে প্রেম করে তাকে খেয়ে দিয়েছে। তাদের বাড়ির পিছনে সে তার স্তন টিপে দিয়েছে। খোকন মেয়েদেরকে এভাবে দেখে না। সে এটাকে ফুলের মতো দেখে। ফুল পরিচর্যা করতে হয়। দিনশেষে সমস্ত ক্লান্তি, পরিশ্রম, যুদ্ধ ফুলের কাছে এসে ঝেড়ে ফেলা যায়। ফুলের কাছে গ্লানি মুছে সাহস ও বিশুদ্ধতা সঞ্চয় করা যায়।
খোকন মনে করে এত ছেলেমেয়ের স্কুলে যাওয়া উচিত না। সে ভাবে যে তার ক্লাসের সকল ছাত্র পড়াশোনা শেষ করলেই মানুষ তাদেরকে শিক্ষিত বলবে না। যেসব ছাত্র পড়ালেখা শেষ করে চাকুরি করতে পারে না, উঁচা বাড়ি বানাতে পারে না, তাদেরকে কেউ শিক্ষিত বলে না। এটা সে দেখেছে।
লেখাপড়া করে কেউ চা-বিক্রেতা হতে চায় না, ভাতের হোটের দিতে চায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। সে এটা দেখেছে।
খোকন মনে করে আমি স্কুলে না গেলেও সহপাঠীদের থেকে বেশি জ্ঞানী। আমি স্কুলের বইসহ অনেক আউট বই পড়ি৷ আমি লাইব্রেরি থেকে ও মাস্টারদের থেকে প্রচুর বই চুরি করে এনেছি৷ এগুলির মধ্যে একটা বই আমাকে ভাবতে শেখায়, স্কুলে যাওয়া একটা ফাও কাম। বইটি আমার সংগ্রহে থাকায় আমি খুব গর্ববোধ করি।
খোকন মাসুমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে একদিন বেশিই হেঁটে ফেলে। ওদের বাড়ির কাছাকাছি এসে যায়। মাসুমার বাবার কাছে ধরা পড়ে। মাসুমা বলে, আমি তার সাথে প্রেম করি না। খোকন ভাই এমনি আমাকে এগিয়ে দিয়ে যায়।
খোকনের মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে। বুকে চুরচুর করার আরম্ভ হয় সেদিন থেকেই। সেদিন সন্ধ্যায় মাসুমার ভাইরা তাকে ধরে আমগাছে বাঁধে। বাগানের নির্জনতায় ওরা তার পাছায় ব্যাট দিয়ে আচ্ছা তিরকে পিটায়। থপাস থপাস বাড়ি ভূঁইবাড়িতে মিলিয়ে যায়। তার গোঙরানি শোনার কেউ নাই। গাছের কাণ্ডে তার বিচি চাপ খায়। ওগুলো ফুলে যায়।
সেদিন রাতে বাবার মার খাওয়া জরুরি ছিল। সেদিন রাতে তার ঘুম ভেঙে ভেঙে যায়। ঘুমের মধ্যে শুধু থপাস থপাস শব্দ শোনে।
পরদিন দুপুরে বন্ধু খাব্বাব তাকে বিদায় দেয়। সে এলাকা ত্যাগ করে।
**
পাঠচক্রের উন্মাদনার ফাঁকে খোকন মুহিতের প্রতি খেয়ালই করে ওঠে নাই। মুহিত তাকে নিজের ব্যাপারে কিছুই জানায় না। মুহিত সারাদিন ঘুমায়, সন্ধ্যায় কই জানি যায়, আর রাতভর করে সাধনা। রাতে তার ঘরের বাতি বন্ধ হয় না। এক সন্ধ্যায় খোকন তার পিছু নেয়। মুহিত যায় লালন সাধনার মজলিসে। সেখানে জিকির হয়, গান হয়, গাঁজার বসে আসর। রাত বেড়ে গেলে আয়োজন হয় গণখাবারের। খোকন প্রথমদিকে এই পেটপূর্তি খাবারের জন্যেই সেখানে যেত। কারণ রাতে মুহিত খায় না। তার না খাওয়া দেখে নিজেরও খেতে ইচ্ছা হয় না। হ্যাঁ বুয়া টাইপ মহিলা খাবার দিয়ে যায়। বাকি সে সেটা খেলেও মনভরে খেতে পারে না।
সে লালন মজলিসে লোকজ গানগুলির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। সে এই-টাইপ গানের কিছু বই পাঠ করে ফেলে। তার মনে পড়ে যায় প্রথম দিন ফজরের সলাত পাঠের আধ্যাত্মিক মাদকতার কথা। সে ফজরে ওই মসজিদে যাওয়া শুরু করে। সেখানে পির সাহেবের আলাপ শুনতে তার ভালো লাগে। আত্মশুদ্ধি নিয়ে তার সাথে তর্ক করে।
সে মুহিতের সাথে রাত জেগে সাধনা করে। সে মসজিদ ও লালন মজলিস দুই জায়গাতেই আসা যাওয়া করে। সে দুটির মাঝে মিক্সড এক আধ্যাত্মিক ভার্সন নিজের মধ্যে ফিট করে।
মেছালপুরের ঘটনাগুলো
খোকন খাল পার হয়ে অবিশ্রান্ত দৌড়াচ্ছে। মেছালপুরে সন্ধ্যা নামার পরেও সে অনেকখানি দৌড়ায়। শরীরের রগগুলো ক্লান্তিতে ফেটে পড়ে এবং ধান কাটা জমির খরখরে লাড়ার ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। সে কাঁদছে, মাটিতে নাক ঢুকিয়ে মাটির গন্ধ নিচ্ছে, সে শীতে কাঁপছে। সে ধীরে ধীরে বিস্মৃত হচ্ছে।
মেছালপুরে তখন শুভ্র দুপুর। তার ঘুম ভাঙল। সে দুহাতে ভর দিয়ে বহুত কষ্টে উঠতে পারল। কোমরে ঝটঝট ব্যথা, ব্যথাটি নিচের দিকে টেনে ধরছে, তাকে মাটিতে দাবিয়ে নিতে চাচ্ছে।
সে হাঁটছে। মেছালপুরে ভীষণ শাদা রোদ উঠেছে। তার চোখ ধাঁধিয়ে যায়, চোখে অন্ধকার দলা পাকিয়ে নামে। রোদের গাঢ়তায় তার গায়ের চামড়া চচ্চড়িয়ে উঠছে। গাছপালা, বাড়িঘর রোদে সিদ্ধ হয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে দেখছে, সামনের দৃশ্যগুলো মুচড়ে যাচ্ছে, স্মোকড হচ্ছে। প্রতিটা বস্তু থেকে ধোঁয়া উড়ছে, ধোঁয়ার সাথে সূর্যের কিরণ মিশে চিকমিক ঝলকানি উঠছে। পৃথিবীব্যাপী ঝুলে আছে অনবরত ঝলকানি।
ধোঁয়া আর ঘামের গন্ধে তার জি ঘেটে উঠছে।[1]
সে হাঁটতে হাঁটতে প্রাচীন আদলের একটি ঘর দেখল। ঘরের পাশে বয়স্ক এক লোক গাছের ওপর বসে আছে। গাছের নিচে কিছু মানুষ তাকে ঢিল মারছে, বাঁশ দিয়ে গুঁতা মারছে, দড়ি পেঁচিয়ে ঝটকা মেরে তাকে নামানোর চেষ্টা করছে। লোকটি খিকখিক হাসছে। লোকটি বলছে, খাহ ভরর ভরর লে লে ভরর খাহ। অচেনা ভাষায় আরও কি কি বকছে। সমবেত লোকেরা আরও তেতে উঠছে। দুচারজন কিলবিল করে উঠে পড়ছে গাছে। ঘামার্দ্র পিছলা শরীরে একজন আরেকজনের ওপর পড়ে যাচ্ছে।
খোকন প্রাচীন-আদল ঘরটিতে ঢুকল৷ সে দেখল ছেঁড়া কাগজের স্তূপ। সে ভাঙা কাঠ, টিন, হার্ডবোর্ড, কাগজের দলা পাকানো ঢিবিতে ওঠার চেষ্টা করল। ঢিবির ভিতর থেকে বিচ্ছু, কেঁচো, টিকটিকি, ইন্দুর কিলবিলিয়ে বের হয়ে আসল। ঘরের চারকোনা থেকে পোকামাকড়গুলি বের হয়ে হৈ-হুল্লোড় বাঁধিয়ে দিল। সে কাগজগুলি তুলে পড়তে চাচ্ছে। কিন্তু এগুলি মাটি খেয়ে ঝুরঝুরে করে ফেলেছে। সে কী লেখা আছে তা পড়তে পারছে না। পোকামাকড় তার পায়ে উঠে পড়ছে। কামড়াচ্ছে। সে চিৎকার দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
ওয়াকেগঞ্জের ঘটনাগুলো
সান্তাহার এলাকা ছেড়ে খোকন বাড়িতে ফিরে আসে। সে ইয়া বড় তসবিহ টিপতে টিপতে রাস্তায় হাঁটে। সামাজিক ক্রিয়াকলাপে নির্লিপ্ততা পালন করে। সে আছর টু মাগরিব সময়ে মসজিদে মূর্তির মতো বসে তসবিহ টেপে।
সে এক বিকালে হাঁটতে হাঁটতে ওয়াকেগঞ্জের শেষপ্রান্তে আসে। সেখানে জিরজিরে একটি ঘরের সামনে রাস্তায় চেয়ার পেতে এক সাইকো বুড়ো বক্তৃতা করছে। রাস্তা অতিক্রমরত লোকেরা তাকে ঠাট্টা করছে : এই ডোগার ব্যাটা তুই এগলা কি বকিস, মাথা খারাপ হয়ে গেছে? খোকন বক্তৃতা শেষ হওয়া পর্যন্ত দৃশ্যটি উপভোগ করে। তারপর বুড়োর সাথে চিনপরিচয় ঘটায়। বুড়ো তাকে জীর্ণ ঘরটিতে প্রবেশ করায়। একটি পরিত্যক্ত লাইব্রেরি ধুলা ঝেড়ে ঝেড়ে দেখায়। বুড়ো এতক্ষণ বই পাঠের গুরুত্ব বিষয়ক বক্তৃতা করছিল
চা-স্টলে বসে বুড়ো ও খোকন চা খায়। খোকন একনাগাড়ে এটাসেটা বলতে থাকে। বুড়ো অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে একটা বিড়ি ধরিয়ে বলে, তুমি মূলত কমিউনিজম চুদতে চাইতেছ। কিন্তু এগুলি পাইনসা মাল। আমরা মানুষকে মানুষের পুজা করা থেকে বের করে আনব। তুমি এসলামি খারেজিয়ত চর্চায় এসে যাও।
বুড়ো তাকে বাসায় নিয়ে যায়। তাকে একগাদা বই ধরিয়ে দেয়। বই শেষ করে সে বুড়োকে বলে খারেজিয়ত ইন্টারেস্টিং লাগছে। আরও বই দেন। বুড়ো বলে, আরবিটা শিখে ফেলো, মূল মজা আরবিতে।
লাইব্রেরিতে বসে সে বুড়োর কাছে আরবি শেখা শুরু করে। ধীরে ধীরে সিদ কুতব, আবু মুহাম্মাদ মাকদিসি, বিন লাদেনের বক্তৃতা সমগ্র পড়ার যোগ্যতায় উপনীত হয়। কিন্তু ওইদিনই মুক্তিযুদ্ধ লীগের চেয়ারম্যান তাদেরকে ধাক্কা দিয়ে লাইব্রেরি থেকে বের করে দেয়৷ তারা এটাকে পার্টি অফিস বানাবে।
ইন্টারেস্টিং সব আরবি বইগুলি লাইব্রেরিতে রয়ে গেছে। কিন্তু তার বুকে জ্বলে বই পড়ার আগুন। সে আবার বইচুরিতে নামে। সে সন্ধ্যার পর লাইব্রেরির পিছনে যায়। কয়েকদিন লাগিয়ে নিপুণভাবে একটি জানলা ভাঙে। একবস্তা বই সরিয়ে ফেলে।
সে এগুলি পাঠচক্র করে পড়ে। খারেজিয়তপন্থি একদল সাঙ্গোপাঙ্গ তৈরি হয়।
নির্জীবতা কাটিয়ে সে অদ্ভুত রকম সচল হয়ে ওঠে। সে বাঁচার একটি মহান মানে খুঁজে পায়। তীব্র উত্তেজনা নিয়ে সে সলাত পাঠ করে। নফল পড়ে। কোরান তেলাওয়াতে মজে যায়।
শহরে শহরে ছাত্ররা বিপ্লবের ডাক দেয়। বাতাসে ওড়ে ছাত্রদের লাশ পড়ার খবর। রংপুরে, চট্টগ্রামে, ঢাকায় রক্তের ভ্যাপসা গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ লীগরে পুটকি মাইরা দেওয়ার উন্মাদনা জনগণরে মোহগ্রস্ত কইরা ফেলে। মানুষদের রক্তে প্রবাহিত হয় সন্ত্রাসী পুলিশরে মাইরা ফেলার বিহ্বলতা।
খোকনের সাঙ্গোপাঙ্গ বাজারে বক্তৃতা করে চ্যাংড়াদের উত্তেজিত করে তোলে। ‘মুক্তিযুদ্ধ লীগ চুদি না’ ‘ফেসিস্ট আপা, ফাকিউ’ ইত্যাদি লেখে তারা ওয়াকেগঞ্জের রাস্তা আর দেয়াল ভরে ফেলে।
উত্তেজিত চ্যাংড়ারা রং স্প্রে করে লিখছে। লেখে ওয়াকেগঞ্জ রঙিন করে ফেলছে। তাদের পিছনে পিচ্চিরা লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ লীগের চেয়ারম্যান তাদেরকে ঘিরে ধরে। তাদের ছবি তুলে পুলিশদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। তাদের বলে গ্রামত এগলা চলবে না বা, আন্দোলন করবু তে শহরত যা।
হ্যাঁ, তারা শহরেই যায়। পরদিনই সেখানে তাদের একজন সঙ্গীর লাশ পড়ে যায় পুলিশের গুলিতে। তার সাথিরা বর্ণনা করে, আন্দোলনে সে রক্তের নজরানা দিতে উন্মাদ ছিল। সে আমাদের ছেড়ে সামনের কাতারে চলে গেছিল। সে পাগলের মতো ইট মারছিল পুলিশকে।
খোকন ওয়াকেগঞ্জে গায়েবানা জানাজা পড়ার আয়োজন করে। চেয়ারম্যান জানাযার সলাত বানচাল করে দেয়। খোকনের বুকে চুরচুর করে ওঠে।
পাঁচ আগস্ট বিপ্লব সুসম্পন্ন হয়। ওয়াকেগঞ্জের বাজারে আবালবৃদ্ধরা জড় হয়। তারা কানতে কানতে হাসে, হাসতে হাসতে কান্দে। মিষ্টি খায়, আনন্দের হেঁচকিতে মিষ্টি উগরে আসতে চায়।
রাতজাগা প্রতীক্ষারত বিপ্লবীরা ক্লান্তিতে একটি ঘুম দিতে যায়।
খোকন ছোটে শহরে। সঙ্গীদের সাথে মুয়ানাকা করে। ছেঁড়া জামা, ধুলা মাখা, ঘাম মাখা, জখম কাঁধে পায় টিয়ারশেলের গন্ধ। শহিদ সাথি কবরে দাঁড়িয়ে পড়ে ফাতেহা।
সপ্তাহ খানেক পর খোকনকে ঘর থেকে টেনে বের করে একদল ছেলে। সে ঘুমাচ্ছিল। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সেই লাইব্রেরিতে।
মুক্তিযুদ্ধ লীগের পার্টি অফিসের সামনে পাঁচ তারিখ মানুষ আগুন লাগিয়ে দেয়। অফিসে চালায় ভাঙাভাঙি। কয়েকদিন পর দরজা কপাটহীন ঘরটি থেকে বইটই, চেয়ার, টেবিল চুরি করে নিয়ে যায় গাঞ্জাখোরেরা। তারা কটকটিতে বেচে দেয় সব বই। খোকন খাঁখাঁ ভগ্নস্তূপ ঘরে দাঁড়িয়ে একটি লাইব্রেরি হত্যার দৃশ্য উপভোগ করছে! কতশত লেখকের রাতভর চিন্তা, কতশত জ্ঞানপিপাসুর পৃষ্ঠা উলটানোর মেহনতের হত্যা একটি মাত্র দৃশ্যের মধ্যে কীভাবে আটকে গেছে! তারা খোকনকে বলে, তারা এটা আবার লাইব্রেরিরূপে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সে বলে, এগুলি করে কী লাভ!
এক বিকালে খোকন আধা সাইকো হয়ে বাজারে হাঁটে। দেখে বাচ্চারা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার জন্য দোকানে দোকানে চাঁদা তুলছে। লোকেরা বলছে, টাকা পরে দিব, পরে আসো। সে বাচ্চাদের ডেকে বলে, এসব করে কী লাভ?
খোকনের সাঙ্গোপাঙ্গরা একদিন তার দরজায় এসে বাড়াবাড়ি শুরু করে দেয়। সে বারান্দায় এসে চেয়ার পেতে বসে। লম্বা তসবিহ টেপে। তারা বলে, আপনি ফেসবুক টেসবুক দেখেন না? জাতীয়তাবাদী লিবারেশন দল বলতেছে মুক্তিযুদ্ধ লীগকে নিষিদ্ধ করা যাবে না। থানা ভাঙচুরের অভিযোগে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে বিপ্লবী গাজীদের। সে বলে, হে হে আগে মুক্তিযুদ্ধ লীগ তাগুত আছিল, এখন ওই তাগুতের স্থান পূরণ করা তো লাগবে নাকি? বাচ্চারা যাও, উঠতি তাগুতের হোগা মেরে দাও। হে হে এভাবেই মুসলমানের বাচ্চাকে টিকে থাকতে হয়। এটাই নিয়ম। নাইলে মুছে যাবা।
খোকনের সাইকো হওয়ার মাত্রা বেড়ে যায়। সে ভোরে তসবিহ নিয়ে এক দৌঁড়ে মসজিদে ঢোকে। সন্ধ্যায় আরেক দৌঁড়ে ঘরে ফেরে। খোকনের সাঙ্গোরা তাগুতের হোগামারার পয়লা কার্যক্রম হাতে নেয় লাইব্রেরিটি দখলে নেওয়ার মাধ্যমে। যারা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, ওইসব বাচ্চারা খোকনের সাঙ্গোদের হাতে লাইব্রেরির ভার হস্তান্তর করে হাঁফ ছাড়ে। সাঙ্গোরা বৃহৎ এক পাঠসার্কেল গড়ে তোলে। নবীনদের ভিতরে আসে চিন্তার এক জোয়ার। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে। ওয়াকেগঞ্জের সকল চা-স্টলে তারা গ্রুপ গ্রুপ হয়ে ছড়িয়ে যায়। চা-স্টলে প্রবীণরা আলাপ করে আরাম পায় না। নবীনরা তাদের মুখের কথা কেড়ে নেয়। বুড়োরা ছোটদের থাপ্পড় লাগায়। ছোটরা তাগুত! তাগুত! শ্লোগান দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যায়।
প্রবীণরা ত্যাক্ত হয়ে গিয়ে নালিশ দেয় জাতীয়তাবাদী লিবারেশনের চেয়ারম্যানকে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রফ্রন্ট মিছিল নিয়ে গিয়ে নবীনদের ধরে। গাছে বেঁধে পিটায়।
নবীনরা ঘোষণা দেয় আজ থেকে ওয়াকেগঞ্জের যাবতীয় বিচার শালিস করবে ‘খারেজি ইনসাফ’ দল। এরপর থেকে খারেজি ইনসাফ দলের কাছেই লোকজন বিচার শালিস নিয়ে বেশি ভিড় করে। বিশেষত যারা কোনোদিন ন্যায়বিচার পায় না।
জাতীয়তাবাদী চেয়ারম্যান নেতাকর্মীদের নিয়ে পরামর্শের ডাক দেয়। তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় গুরুতর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া গতি নাই। তারা বিশ্লেষণ করে দেখল, লাইব্রেরি দখলে নেওয়া জরুরি। তবে এটা করতে হবে পরোক্ষভাবে।
লাইব্রেরি দোতলা পাকা বিল্ডিং হয়। কাঁচের দরজা লাগানো হয়। সরকারি বেসরকারি নানান প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন নতুন বইয়ের অনুদান আসতে থাকে। বুড়ো সাইকো ও খোকনের খারেজি বইগুলি চাপা পড়তে থাকে নতুন বইয়ের তলে। এসি আসে, আইপিএস লাগানো হয়, লাইব্রেরি সাজানো হয় বিলাসিতার সর্বাধুনিক সব সামগ্রী দিয়ে।
খোকনের সাঙ্গোরা ব্যস্ত ছিল ‘খারেজি ইনসাফ’ আদালতের কার্যক্রম নিয়ে। তারা তেমন খবর রাখতে পারে না লাইব্রেরির পাঠচক্রের। পাঠকেরা নতুন নতুন বইয়ের গন্ধে মেতে ওঠে। ছিঁড়াফাড়া খারেজি বইপত্তর পড়া কমে যায়। কেউ কেউ লাইব্রেরিতে পড়তে আসে না, বিলাসিতা করতে আসে।
খোকনের সাঙ্গোরা হঠাৎ অনুধাবন করে তাদের নতুন সদস্য তৈরি হচ্ছে না। এমন মোক্ষম সময়ে জাতীয়তাবাদী লিবারেশন লাইব্রেরিটি দখল করে নেয়। পার্টি অফিস বানায়। খোকনের সাঙ্গোরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। মানুষেরা ন্যায়বিচারের জন্য তাদের খু্ঁজে বেড়ায়। চা-স্টলে তাদের স্মরণ করে, স্তুতি গায়। জাতীয়তাবাদী লিবারেশন চা-স্টলে তাদের নিয়ে গল্প করা নিষিদ্ধ করে দেয়।
মাসুমার সখীরা তাকে ভর্ৎসনা করে। খোকনের সাইকো হওয়ার পিছনে তারও দায় আছে বলে তারা উল্লেখ করে। তাকে খোকনের কাছে গিয়ে মাফ চাইতে বলে। অবশ্যই মাসুমার বিয়ে হয় উচ্চবংশীয় একটি ছেলের সাথে। এবং বিয়ের দুদিন পরে সে তালাক নেয়।
খোকন মাসুমাকে বলে, হে হে! নারী কত কোমল অ্যা। মূলত অন্য মরদ নারীর যোনি চেটে দেওয়ার আগে প্রেমিকের ওপর নারীর কনফিডেন্স আসে না। নারী এমনই কোমল। হে হে, নারীর কোমলতা এমনই।
খোকন প্রতিদিন বিকালে পুরোদমে ন্যাংটা হয়ে লাইব্রেরির পিছনের গাছটিতে উঠে বসে থাকে। পা দোলায়। লাইব্রেরির জানলায় একটা একটা করে ঢ্যাল মারে। ফুরিয়ে গেলে আবার ঝোলা ভরে ঢ্যাল নিয়ে গাছে ওঠে। থেমে থেমে, খুব যত্নের সাথে ঢ্যালগুলো মারে। খিকখিক হাসে।
খোকন একদিন সবার অগচরে গায়েব হয়ে যায়।
**
শোনা যায় সে সান্তাহার সেই গ্রামের লালন মজলিসে গিয়ে প্যান্ট-শার্ট পরুয়া এক মেয়েকে বিয়া করে। তাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যায়। আগেরবার যখন সে সান্তাহার গিয়েছিল, তখন এক শুক্রবার লালন মজলিসে মেয়েটির সাথে পরিচয় হয়েছিল এবং মেয়েটি তাকে প্রস্তাব দিয়েছিল। সে রিজেক্ট করেছিল।
শোনা যায় সে সান্তাহারে যায়নি। সে কোথাও অপঘাতে মারা গেছে। তার গায়েবানা জানাযা পড়ার সুবাদে ওয়াকেগঞ্জে সাঙ্গোপাঙ্গরা আবার জড়ো হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু জাতীয়তাবাদীরা তাদের তাড়িয়ে দেয়।
আমাকে গল্পটা বলেছে খোকনের এক চাচাতো ভাইয়ের নাতি, যার নামও খোকন। খোকনের একাধিক চাচাতো ভাই আছে এবং তাদেরও একাধিক নাতি আছে। সব নাতিদের নাম খোকন। লোকেরা গল্পটা আরও ভিন্ন ভিন্নভাবে বর্ণনা করে। অনেকে বলে বুড়ো সাইকোর নামও খোকন ছিল। অনেকে বলে বুড়ো সাইকোই খোকনকে খোকন নামটি দিয়েছে। অনেকে বলে খোকন ও বুড়ো সাইকো গল্পের চরিত্র নয়, বরং তারা গল্পটা বর্ণনা করেছে মাত্র। গল্পটা মূলত তারও আগের, বুড়ো সাইকোর দাদার।
এভাবে দেখা যায়, খোকনের চাচাতো ভাই তার ছেলেকে গল্পটা একভাবে বলেছে। আবার সে তার ছেলেকে গল্পটা বলেছে আরেকটু ভিন্ন আঙ্গিকে। গল্পের আসল রূপ মূলত কোনটা সেটা আল্লাই ভালো জানেন।
[1] জি ঘাটা : বমি ভাব হওয়া।