উতরোল

ঘোলা পানিতে দাঁড়িয়ে বুলু দেখে তাদের জানলাটা বন্যায় ধীরক্রমে ডুবে যাচ্ছে। বুলুর চোখে অশ্রু জমে। দ্রুত পানিতে মাথা ডোবায় সে। সাঁতরে ওঠে। পায়ের তালু আছাড় মারে বন্যার টইটই জলে। আর তৎক্ষণাৎ পানির বুক ভেঙে থপাথপ জোরালো শব্দ হতে থাকে। সে শব্দ ছুড়ে ছুড়ে ঘরের কাছটিতে এগিয়ে যায়। পাশে পানিতে একটা টিনের পাতিলে ভাসতে থাকে প্যাকেট করা ত্রাণের চাল-ডাল। বুলু হাত দিয়ে পাতিলটাকে সামনে এগিয়ে দেয়। কাঁপতে থাকা পানির ওপর পাতিল ভাসতে ভাসতে দোলে। বুলু তাদের চালের ওপর উঠে আসে। চালের উঁচুতে দাঁড়িয়ে সে উত্তরে তাকায়। সূর্যের কড়া রোদে চালটা তেতে আছে বলে একবার একেক পায়ে দাঁড়ায়। কুঞ্চনে চোখ দুটো ছোট হয়ে আসে।

অদূরে পুরান বাড়ির চাতালে কলাগাছের একটা ভেলা ভাসছে। আর ভেলায় সাদা চাদরে ঢাকা লাশ। মৃত লোকটার নাম রহিম বকশ। গত রাতে কে জানি খুন করে চলে গেছে। সকালে তার ছেলে রুমে গিয়ে দেখে রহিম বকশের নাকে আর নিশ্বাস নাই। শরীর ভাউয়া ব্যাঙের গায়ের মতো ঠান্ডা!

গ্রামে বন্যা এসেছে। একদিকে দিনের পর দিন লাগাতার আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে, অন্যদিকে ভারত বান ছেড়ে দিল। বুলু হঠাৎ চালের ওপর দাঁড়িয়ে হাহা করে আকাশ ফাটিয়ে হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে সে জল তুলে টিন ভেজায়। ভেজা টিনে বসে কাঁচা চাল-ডাল চিবাতে থাকে। পানির স্রোতে কত কিছুকে যে ভাসতে ভাসতে চলে যেতে দেখে সে। রহিম বকশের অজু করার বদনাটা তার চালের নিচে এসে খাবি খায়। লোকটা অবশ্য খুব যে নামাজি ছিল, তা না। মাঝে মাঝে লোটা নিয়ে অজু করতে দেখা যেত যা। পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে লুঙ্গি উসকিয়ে হাঁটা একজন সুখী সুধী মান্যবর ছিলেন তিনি।

বুলু হঠাৎ একটা কান্না শোনে। তাকিয়ে দেখে ভেলার পাশে পানিতে দাঁড়িয়ে রহিম বকশের পায়ের ওপর হাত পা ছুঁড়ে আহাজারি করে তার ছেলে মঞ্জু। এছাড়া চারিপাশে আর কোনো লোক নেই। রহিম বকশ জীবনভর খেটে তার জন্য মঞ্জু ছাড়া আর কোনো কান্নার মানুষ তৈরি করে যেতে পারেননি।

বন্যা আসার পর থেকে চাচাতো বোন কালিকে তেমন একটা দেখতে যাওয়া হচ্ছে না বুলুর। দুধে আলতা রঙের চমৎকার মেয়ে। পুতুলের মতো নীলাদ্র চোখ। কালি হাসে ফুলের মতো, আকাশে ভাসতে থাকা পেঁজা মেঘের মতো চুল তার। কালির সৌন্দর্য মোমের মতো, যেটা গললেও মোম, না গললেও মোম। সরল মেয়ে। এমন সরলতার সুযোগ নিয়ে বুলু কালিকে ভালোবাসে। শীতের নরম দিনে উঠোনে বসে বসে নখ কেটে দেয়। কালির মা নেই। ছেলেবেলায় একবার নুরানি মাদরাসা কামাই দিয়ে দুজন কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে অভূতপূর্ব এক গ্রামে বেড়াতে যায়। সেখানে আছে সারি সারি খেত। খেতের মাঝে ঘাস বা কাদা-থিকথিকে আইল। ধানহীন খালি খেতে মাথা ডোবানো কতক কালো মহিষ। বুলুর চোখ বড় হয়ে যায়, যখন দেখে মহিষের মাথায় প্রজাপতির মতো বসে আছে ফিঙে।

সেবার বুলু কালির বাপের বাড়িতে গেল। কালির সৎমায়ের ঘরে পাঁচ মেয়ে। বুলুকে তারা নেমন্তন্ন করে। সে দেখে সৎমায়ের মুখটা বেজার। পাকঘরে কালো ভীমরুল হয়ে বসে বসে পাটায় আদা পিষে। অথচ বাবা কলিম মুনশি উচ্ছল। তার আনন্দ ধরে না।

এক শবে বরাতের দিন। কালি তখন বড় হয়েছে। খুব গা ছেপে জ্বর আসে তার। চৌকিতে কাঁথার ওপর কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে সে। বুলুর সাত বছরের ছোট ভাই রাতুল তাকে আয়াতুল কুরসি পড়ে ফুঁ দেয়। কালি আনন্দ করে। বাচ্চাটাকে আদর করে ডাকে, হাত ধরে, নাক ধরে। রাতুলের মাথার চুলের দুটো প্যাঁচালো ঘূর্ণি। কালি ঘূর্ণি ছুঁয়ে বলে দেয়, ‘রাতুল! তোর বউ হইবে দুইটা।’

রাতুল খুশিতে নির্বাক হয়। তার চেহারার ভাঁজ অনেকটা বুলুর মতো। কালির জ্বর বাড়তে থাকে। শরীরের গেরোয় গেরোয় যন্ত্রণা।

‘রাতুল!’

‘জি আপু।’

‘বুলুরে ডাক দে।’

‘তুমি না কইলা ভাইয়ার লগে আর কোনু সময় কতা কইবা না!’

‘গত তিন দিন কইনি তো।’

কালির হাসি পায়। চোখ বুজে সে নিঃশব্দে হাসে। বুলু এসে পাশে বসল। কপালে হাত দিয়ে দেখে প্রচুর জ্বর। কালির কথা সরে না অভিমানে। তারপরেও সে নীরবতা ভাঙে—‘জানস বুলু আজ কী হইসে!’

‘কী হইসে?’

এ সময়টা বুলুর উপভোগের। কালি যখন টানা কয়েকদিন ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে হঠাৎ অভিমান ভেঙে এই কথা ওই কথা পেড়ে বসে। বুলু তখন নিরুত্তাপ থাকে। হয়তো তখন তার প্রচুর রাগ পেয়ে বসে, অথবা আনন্দ। এবং খানিকটা ঠান্ডা গলায় মুহূর্তটাকে সে উপভোগ করতে থাকে।

কালি বলে, ‘পুরান বাড়িত বেদেরা আইছে, রহিম বকশের নাতনি ফাতেমা আছে না? হের দাঁতের তলে তুলা দিয়া দিয়া যা পোক বাইর কইরছে! ওয়াক!’

কালি বিরতি নেয় কিছু সময়। নিজের ভেতর নকশি কাঁথার ফুল কীর্তন করে। তারপর কেমন আবদেরে গলায় বলে, ‘তোর হাতটা দে না। ধরমু।’

বুলু হাত দেয় না। কালি নিজ থেকে বেড়ে গিয়ে বুলুর হাত ধরে। হাতটা ধরে সে চোখ বুজে শুয়ে থাকে। তার ভালো লাগে বুলুকে আঁকড়ে রাখতে। বুলু পাকঘরে গিয়ে কালির জন্য ভাত বাড়ে। ড্রয়ার ঘেঁটে নাপার পাতা বের করে আনে।

মঞ্জু নৌকার এক কোণে বসে বসে কাঁদছে। রহিম বকশ তার বাবা। বাবাকে খুন করবে, এমন কোনো শত্রুর নাম তার মনে পড়ে না। ভোলাভালা একটা লোকের সাথে কেউ কেন এমন করল! বুলু শাবল আর ডালা নিয়ে নৌকা থেকে নামে। শহিদুল থাকে নৌকার ওপর।

পানি ক্রমশ বাড়ছে। বুলুদের চালাটাও ডুবে গেছে। উদ্ধারকর্মীরা এসে এসে নৌকায় তুলে মানুষজনকে আশ্রমকেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছে। মঞ্জুর বাবাকে কবর দিতে হলে মাটি ফেলে ফেলে কবরস্থান উঁচু করতে হবে। লম্বা সময়ের কাজ। মঞ্জুকে নিয়ে বুলু আর শহিদুল মাটি তুলতে আসে। বুলু পানিতে ডুব দিয়ে শাবল মারে খেতের নরম মাটিতে। যথাসম্ভব বড় করে একটা চাক তোলার জন্য সে মরিয়া হয়ে ওঠে।

রহিম বকশ তার দাদার চাচাতো ভাই। দাদা মারা গেছে সেই কবে। মনে পড়ে দাদার দাফন শেষে বুলুদের বাড়ির রাস্তায় একটা চেয়ারে বসে ছিল সাদা দাড়ির হুজুর শিব্বির মাওলানা। পাশে আরও একটি চেয়ারে রহিম বকশ। রহিম বকশের গায়ে আয়রন ছাড়া সাদা সুঁতি পাঞ্জাবি। সেবার শিব্বির মাওলানার জন্য গাছ থেকে ডাব পেড়ে পানি আনলে রহিম বকশকেও এক গ্লাস দেয় বুলু।

বুলু শাবলটা ওপরে তুলে পা বাঁচিয়ে জোরেশোরে মাটিতে আবার আঘাত করে। নিচে ডুবে যাওয়া বড় বড় ধানগাছ। ধানগাছের কারণে সুবিধে করা যাচ্ছে না। বিল আখের সে বড়সড় একটা চাক তুলতে সক্ষম হয়। তুলে নৌকায় বসে থাকা শহিদুলকে ছুঁড়ে মারে। শহিদুল মাটির বড় চাকটা গলুইয়ে রাখে। আবার বৃষ্টি নামছে। আকাশ কালো হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। শহিদুল আকাশ দেখে। হঠাৎ হঠাৎ বিজলি নামে, আকাশ দুই ফালি হয়ে যায়। যেন একটা শিমুল হৃদয়ের তাপে ফেটে গেল। তৎক্ষনাৎ খোদা তায়ালা তাঁর স্পর্শ বুলিয়ে দেন, আর পৃথিবী পুন মিলে যায় পরস্পরে।

বানের স্রোতে ভেসে চলে যাচ্ছে গরুর ছানা। শহিদুল ভাঙা ভাঙা গলায় বুলুকে বলে, ‘বুলু, থাক, কবর দিয়া কাম হইব না। হানি কেরমে বাড়তেই আছে। চল মোরা জলদি জানাজার ব্যবস্থা কইরা ফালাই। কবরস্থানে মাটি ফালাইতে ফালাইতে ম্যালা সময়, তার উপ্রে পানি উইঠ্যা পড়লে লাশ আবার ভাইসা পড়বে।’

মঞ্জুও এ ছাড়া আর কোনো উপায় দেখে না। তারা মঞ্জুকে অপর একটা নৌকায় উঠিয়ে দিয়ে বাজারের দিকে রওনা হয়। সাত-আটটা নৌকা ভাড়া করতে হবে। নৌকাগুলো পরস্পরে বেঁধে তার ওপর রহিম বকশের জানাজা কায়েম করা হবে। কলিম মুনশিকে বাজার থেকে খুঁজে বের করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। বুলুর সাথে মুনশির খাতির ভালো। লোকটারে বললে পাঁচ ছয়টা নয় কেবল, হাজারটা নৌকা তার জন্য ভাড়া করে দিতে পারবে।

কলিম মুনশি আজ তিন দিন ধরে ঘরে আটকা। লোকটা কালির বাবা। পুরো ঘরে তিনি একা বন্দি হয়ে আছেন। হড়বড়িয়ে পানি ঢুকতে দেখে তার বউ পাঁচ মেয়েকে নিয়ে বাইর থেকে তালা আটকে আশ্রম শিবিরে চলে গেছে। বউয়ের ধারণা ছিল কলিম মুনশি ঘরে নেই, বাজারে। গত তিন দিনে সে ঘরের সবকটা কাঠের দরজার তালা ভেঙেছে সে। পানিতে ভেসে ভেসে রান্না ঘরে গেল। কাঁচা আলু, চাল-ডাল যা ছিল সব একে একে খেয়ে শেষ করল। আজ সকাল থেকে আর কোনো খাবার বাকি নেই।

লোকটা বহু কষ্টে সাঁতরে ভেসে আছে। তার মাথার এক হাত ওপরে ছাদ। সাঁতরে সে ক্লান্ত হয়ে গেলে সারাদিন সিলিঙে জবুথবু বসে থাকে। চারজানু ডুবে থাকে ময়লা পানিতে। সিলিঙে বসতে বসতে পা ধরে গেলে সে ঝুল পাখার ডাঁট ধরে তামা ভরা বৃত্তের পিঠে বসে। পাখার তিনটে ডানার একটায় তার নিতম্বের কিছু অংশ, আর দুটো ডানার ওপর থেকে উভয় পা ঝুলতে থাকে নিচে। রাত কী দিন, কিছুই বোধগম্য হয় না। কলিম মুনশির ঘোর লাগে। হ্যালুসিনেশনে সে বারবার কালিকে তার পাশে সাঁতরাতে দেখে। পানিতে লাগাতার ডুবে থাকার কারণে তার মতো কালিরও সারা শরীর বাজেভাবে ফুলে গেছে।

কলিম মুনশিকে কালি ডাকে। মুনশির তন্দ্রা ছুটে যায় বিস্ময়ে। দেখে, কালি হাসছে। তার মুখে শবনমের হাসি। ফাগুনের রেণুমহাল। কালি বলে, ‘আইয়ো বাবা, তোমারে বাইরে লয়া যাই।’

মুনশি আনন্দে পাগলের মতো হাসতে থাকে—‘মা তুই মোরে ক্ষুমা কইরা দিছস?’

মুনশির দাঁত বত্রিশটা বেরিয়ে আসে। দাঁতগুলোয় আঁশটে আছে সাদা সাদা ময়লা।

কালি সাঁতার কেটে দরজার কাছে গিয়ে পেছনে তাকায়, মুনশিকে দেখে। মুনশি জিজ্ঞেস করে, ‘তুই অহনো মঞ্জুরে ভালোবাসোস ময়না? অহনো রমজানের সুমায় বেয়ানবেলায় যহন হগ্গলে ঘুমায়, তোরা দুইজন মিল্লা বাড়ির রাস্তায় দাঁড়াইয়া কথা কস?’

কালি হাহা করে হাসে। ডুব দিয়ে সে দরজা পার হয়, ওপারে মাথা তুলে শ্বাস নেয়।

কলিম মুনশিও ডুব দিয়ে রুমের দরজা থেকে বের হয়। চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘বাইরে কেউ আছেন গো?’

আবার গলা ফাটিয়ে আওয়াজ করে, ‘কেউ আছেন? আমগোরে এহান থিকা বাইর করেন।’

কালি এঘর থেকে ওঘরে যায়৷ ওঘর থেকে এঘরে আসে। কলিম মুনশিও তার পিছুপিছু ঘুরতে থাকে। পানিতে একটা কোলা ব্যাঙ ভেসে ওঠে, কালি সেটাকে ধরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে। কলিম মুনশি ওয়াক করে বমি করে দেয়। হঠাৎ কালি গায়েব। তাকে আর কোথাও খুঁজে পায় না মুনশি।

মুনশি অসহায়তায় গলা ফাটিয়ে কান্না করতে থাকে। হাতড়ে হাতড়ে সে জানলা খোঁজে। গ্রিল স্পর্শ করে। জানলার হাতল মুচড়ে কবাট খোলে। ওপাশে হাত বের করে দেখে সব পানি আর পানি। পায়ের তলায় কিছু একটা বাঁধল। উবু হয়ে তলায় হাত দেয় সে। বস্তুটা ওপরে তুলে দেখে বিলকুল কালো একটা শিং মাছ। মুনশির আঙুলে হুল ঢুকিয়ে মাছ লাফিয়ে পানিতে পড়ে। সে প্রচণ্ডভাবে কাটা আঙুলটা চেপে ধরে। রক্তে ঘোলা পানি লাল হয়ে যাচ্ছে।

ছাদে কারও পায়ে হাঁটার শব্দ হচ্ছে। কলিম মুনশির চোখে আলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে৷ সে নেচে ওঠে, ছাদের সাথে কান ভেজিয়ে আওয়াজটা শোনার চেষ্টা করে। তারপর ঘনঘন লোকটাকে ডাকতে থাকে। ডেকে ডেকে মুনশি নেতিয়ে পড়ে। পায়ের আওয়াজটাও মিলিয়ে গেল।

এক সময় হঠাৎ সে কালির গলা শোনে—‘বাবা!’

মুনশি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কালি, কালি! তুই কোতায়? মোকে এহান থিকা লয়া যা!’

কালি দম ফাটিয়ে হাসে। ‘বাবা, মুই যহন মঞ্জুর লগে বিয়ে কইরবার লাগি ঘর পালাই, কী অইছে জানো?’

প্রশ্ন করেই কালি আর অপেক্ষা করে না। খিক করে হেসে পালিয়ে যায়। কলিম মুনশি জানে কালির সাথে কী হয়েছিল সেদিন। সে স্থবিরের মতো বসে আছে ফ্যানের ডানায়।

শহিদুলকে নিয়ে বাজারে গিয়ে বুলু কলিম মুনশির খোঁজ পায়নি। পরে তারা লম্বা পথ অতিক্রম করে মুনশিদের বাড়িতে আসে। বাড়ি পুরোটা ফাঁকা। বুলু কয়েক বার কলিম মুনশির নাম ধরে ডাকে। শহীদুল চারদিকে নজর ঘুরিয়ে চায়। কেউ নাই। তারা ফিরতি পথ ধরে।

হঠাৎ বুলু ঘর থেকে চাপা আওয়াজ শুনতে পায়। বুলুর শরীর শিউরে ওঠে। শহীদুলকে থামিয়ে দেয়। কী মনে করে সে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ওর কানে বাজতে থাকে লোহার দরজায় আংটা বাড়ি দেওয়ার ঘনঘন শব্দ। বুলু দরজা ভেঙে মুনশিকে ছাদে তুলে আনে। নৌকায় চড়িয়ে গা মুছে দেয়। শুকনো কাপড় পরায়। মুনশি শুয়ে পড়ে। তার দাঁড়ানো শক্তি নেই।

রহিম বকশের জানাজার ব্যবস্থা করা হলো। ইমামতি করল বুলু। বুলু মাদরাসায় পড়া ছাত্র। জানাজা পড়াতে জানে সে। জানাজায় মঞ্জু ছিল না। বুলু অনেক খুঁজেও পায়নি তাকে। নামাজিদের সামনে দাঁড়িয়ে বাপকে ক্ষমা করে দেওয়ার আবেদনসহ মঞ্জুর কিছু কথা বলা প্রয়োজন ছিল৷ কিন্তু মঞ্জু ছিল না।

বুলুর কেন যেন মনে হলো মঞ্জু কালির কাছে গেছে। কালি বুলুকে ভালোবাসেনি কখনো। একদা সে গভীরভাবে মঞ্জুর প্রেমে পড়ে। মঞ্জুকে না দেখলে তার ভালো লাগে না। চিঠি না লিখলে খাবার রুচে না। পড়ালেখায় মন বসে না।

জানাজার পর রহিম বকশের লাশ আয়োজন করে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হলো। কবর দেওয়ার উপায় নেই।

রহিম বকশকে খুন করার সময়টা ছিল রাতদুপুর। সব কিছু শান্ত। মাঝে মাঝে দামি তৈজসপত্র পানির বৈরি স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল। মানুষের কান্না ক্ষীণ করে শোনা যায়। খুনি পানিতে ডুবে ছিল। কেবল মাথাটা দেখা যায়। যারা রোডে দড়ি হাতে সমান্তরাল দাঁড়িয়ে দূরপাল্লার বড় বড় বাসগুলোকে পথ নির্দেশ করছে, তাদের হইহল্লা কানে ভেসে আসছে মৃদু করে। খুনি স্রোতের সাথে ভেসে ভেসে রহিম বকশের বাড়ি যাচ্ছে। হঠাৎ স্রোতের তীব্র ধাক্কায় নিজেকে সামাল দিতে না পেরে খুনি কয়েকবার চুবানি খায়। কাত হয়ে পড়ে থাকা একটা গাছ ধরে সামলে উঠে খুকখুক কাশল সে। সামনে রাস্তার পাশে গুয়ের গড়। গড়ের ওপাশে পুরানা কাঁচা টয়লেট। চালের একাংশ স্রোতে উলটে থাকায় টিনের এক কোণ দেখা যাচ্ছে কেবল।

খুনি দ্রুত জায়গাটার পাশ কাটল। রাস্তায় সেনাবাহিনীর উদ্ধারকর্মীদের বোটের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তারা বোট নিয়ে বিপন্নদের উদ্ধার কাজে সারা গাঁ ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুনি একটা কলাবাগানে লুকিয়ে পড়ল। কলাগাছগুলোর কেবল মাতি ভেসে আছে। কোনোটি খানিক ওপরে, কোনোটি নিচে। তাই সহজে মাথাটাকেও মাতি হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। সেনাবাহিনীরা কয়েকবার খুনির দিকে টর্চ মারল। এ জায়গায় তারা যেন কিছু একটা আন্দাজ করতে পারল। বোট থামিয়ে সবাই মিলে নজর করার চেষ্টা করছে। খুনি মাথাটা নিচে চুবিয়ে নাক তুলে রাখে। বোটটা চলে যাচ্ছে বোধ হয়। পানির নিচ থেকে বোটটাকে একটা রঙিন ছায়ার মতো লাগছে। যেটার বডি ঢেউয়ের মতো টলটল করছে।

রহিম বকশের বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। বাড়ির সামনে একটা টিনের বেড়া। বেড়াটা এখন পানির নিচে। সাবধানে পার হতে হবে। না হলে দুই পিস করে ঝুলিয়ে দেবে আগায়। ঘরটা টিনের, সাধারণত পাড়ার ঘরগুলো থেকে অনেকটা উঁচু। রহিম বকশরা আজ মাচা বানিয়ে ঘরে শুয়েছে। কুপির আলো দেখতে পাচ্ছে খুনি । বকশের নাক ডাকার আওয়াজও শুনতে পাচ্ছে সে। ঘরের অতি কাছে এসে কিছুক্ষণ থম মেরে থাকল। দরজাটা বন্ধ। ভেতরে ঢোকার ব্যবস্থা নাই। সিঁধ খুঁড়ে ঘরে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু ঝামেলার ব্যাপার; পানিতে নিশ্বাস রাখা যায় না।

চালের কিনারায় ভেন্টিলেটরের জায়গাটা অনেক ফাঁকা। একজন মানুষ গলে ঢুকে যাবার মতো। পানি টলছে। খুনির নিশ্বাসটাও সেইসাথে বাড়ছে দ্রুত। একটা জলজ্যান্ত মানুষকে সে খুন করবে। এত সাহস তার কখনোই হয়নি। তারপরও সে কাজটা করবে।

হঠাৎ খুব ঠান্ডা বেড়ে গেল যেন। সারা শরীর পানিতে কাঁপছে। দাঁতের পাটায় দাঁত লেগে শব্দ হচ্ছে। চারিদিকটা দেখে নিল। কেউ নেই। খুনি চালের কাঠটা মজবুত করে ধরল। এক পা গলিয়ে দিল ভেতরে। শরীর যাচ্ছে না আর। আটকা পড়েছে আধাআধিতে। দ্বিতীয় পা-টাও গলিয়ে দিয়ে সেখানেই কিছুক্ষণ আরাম করল।

রহিম বকশ একা শুয়ে আছে মাচায়। খুনির গা ঘেমে পানি পড়ছে। আরেকবার হালকা চালে ঠেলা দিলে শরীরটা গলিয়ে নিতে পারল। রুমের ভেতর পানিতে নামল। ঝপাস করে পানিতে পড়ার শব্দ হলো। সেই শব্দে রহিম বকশ হালকাচালে জেগে নড়াচড়া করলেন। খুনি ধীরে ধীরে সাঁতরে এগুলো। মাচায় হাত রেখে পালায় পা ঠেক দিয়ে মাচার ওপরে উঠে পড়ল। মাচা মজবুত বিধায় দুলছে না।

দুটো বালিশ ছিল সে রাতে। খুনি একটা বালিশ নিয়ে রহিম বকশের নাকের ওপর চেপে ধরল। লোকটা নিশব্দে তড়পাচ্ছে। তার পা দুটো উলটো সাঁতারের মতো করে আছাড় খাচ্ছে। খুনি আরও তীব্র করে বালিশটা চেপে ধরে রাখে। ক্রমশ রহিম বকশের শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে!

কালি আমগাছের ওপর মোটা ডাল ধরে বসে আছে। গায়ের সমস্তটা কাপড় ভেজা। সামনে তার দোচালা ঘরটা কাত হয়ে পড়ে আছে। দু-একটা বেড়া ভেসে গেছে স্রোতের টানে। বাজারের একপাশে এই ছোট ঘরটা সে দিয়েছে বছর দুই আগে। সরকারি জায়গা। হাটবারে তার ঘরের সামনে বিরাট হাট বসে। ওইদিন শোরগোলের কারণে সে ঘর থেকে বের হতে পারে না। মাঝেমধ্যে দরজা খুলে তাকিয়ে তাকিয়ে খদ্দের খুঁজে।

এই ঘরে সে একা থাকে, ভীষণ একা। মঞ্জুর সাথে ভাগার পর সে প্রতারণার স্বীকার হয়। মঞ্জু আর তার বাবা রহিম বকশ লাগাতার কয়েকদিন কালিকে ভোগ করে ছেড়ে দেয়। ফলে কালি দিশেহারা হয়ে এই বাজারে ঘুরতে থাকে। গ্রামের এক লোক তাকে দেখে হুন্ডায় বসিয়ে নিয়ে আসে বাড়িতে। বিচার বসে। মজলিসের সিদ্ধান্ত মান্য করে কালিকে জলদি বিয়া দিয়ে দেওয়া হয় পাশের গ্রামের এক বুড়োর সাথে!

ঘরটার উত্তরে বিশাল বাগান। ঘন ঝোপজঙ্গলে ঢাকা। বন্যায় বাগান ডুবে গেছে। সে কারণে জঙ্গল আর গাছপালাটা এখন হালকা হালকা লাগছে। কালি বাগানের দিক থেকে একটা শিস শুনতে পায়। তার শরীর হালকা কেঁপে ওঠে। সে দুহাত দিয়ে মোটা একটা ডাল জাপটে ধরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। নরম দুধ নিয়ে বুকটা সাপটে আছে গাছের খরখরে চামড়ায়। আর দুটো পা ঝুলে আছে পানিতে। মাথাটা তুলে সে একবার বাগানের দিকে চাউর করে। তারপর কাউকে না দেখে মাথা আবার নামিয়ে দেয় গাছে।

তার খুব ক্ষুদা লাগছে। কয়েকদিন থেকে না খেয়ে আছে। বুলু এসে এসে খাওন দিয়ে গেল দুই একবার। এখানে তার আসা মানা। মাতুব্বররা জানতে পারলে তাকেও গেরাম ছাড়া করবে কালির মতো। বন্যায় সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। কালির খদ্দের জুটে না। তার না খেয়ে থাকতে হয়। কালির মনে আনন্দ জেগে ওঠে। বেশ কিছু দিন পর একজন খদ্দের এসেছে। পেটে কিছু খাওন জুটবে।

মাকে তার মনে পড়ে। অনেকদিন আগে, ছোটোবেলায় মা যখন তারে ফেলে নাগরের সাথে পালিয়ে যায়, কালির খুব ঘৃণা এসেছিল। তারপর একদিন কালিও মঞ্জুর জন্য পালাল। আর ভীষণ ঠকে গেল। মায়ের প্রতি এখন ঘৃণাটা আর নেই।

কিছু পর বাগান থেকে আবারও শিস বাজায় মঞ্জু। বাগানের ভেতর অস্থির হয়ে বসে আছে সে। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে কালির সামনে দাঁড়াবার ভয়ে। সেই যে কালিকে ভোগ করল, তারপর আর কখনো তার মুখোমুখি হয়নি। বাবা খুন হওয়ায় তার হঠাৎ পুরোনো সেই কামভাব জেগে উঠেছে। বুকের বীণায় আবার উদ্বেল স্ফূর্ত এসেছে।

কালি একটা খাসা মাল। যাকে কমলার খোসার মতো ছিলে ছিলে খেতে আনন্দ। যার নাভী যেন মৃগকস্তুরি; কামনার সুগন্ধিতে ঠাঁসা। মঞ্জুর শার্টের পকেটে হাজার কিছু টাকা। এই টাকা ছুঁড়ে দিয়ে সে কালিকে অধিকারে নেবে একটি রাতের জন্য। সেই কতক বছর আগেকার দিনটির মতোন।

বিয়ের কয়েক মাস পর কালির বুড়ো জামাই মারা গেছিল। তারপর তার আর কোথাও জায়গা হয়নি। মাতুব্বররা নির্বাসন দেয়। সৎমা ও বাবা কলিম মুনশি তাকে ঘরে জায়গা দেয়নি। কালি বাজারের এইখানে একটা ঘর তোলে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে সে বেশ্যাবৃত্তি শুরু করে। কালির এছাড়া দ্বিতীয়টি উপায় ছিল না। আজকাল আগের সেই রূপ নেই। শরীর ভেঙে গেছে। মুখে কালো কালো দাগ পড়েছে। পেশিগুলো হয়ে গেছে এঁটো বাসনের মতো থিকথিকে।

মঞ্জু হঠাৎ চমকে উঠল। তার নাকে তরকারির দারুণ খুশবু বিঁধছে। সাথে গরম ভাতের মৌ মৌ সুগন্ধি। বাগানে গাছের আড়ালে কে একজন যেন লুকিয়ে আছে। এক পলকের জন্য সে লোকটার মুখ দেখতে পায়। মুখে শয়তানের একটা সাদা মুখোশ। কুঁচকানো চোখ। দুটো ঠোঁটের কিনারা ভয়ঙ্কর লম্বা হয়ে কান ছুঁই ছুঁই। কপালের দুই দিক থেকে দুটো শিং বেরিয়ে বাঁকা হয়ে নেমে এসেছে পেছনে। লোকটা ঝোপের আড়ালে চলে গেল।  মঞ্জুর বুকের ভেতর ধুবধুব শুরু হয়। সে আতিপাতি করে নৌকা হাতড়াতে থাকে। আত্মরক্ষার কোনো কিছু পায় না। কালি কাছেধারে আছে। তাকে ডাকলে হয়তো বাবার খুনি লোকটা আর ঘনাবে না। মঞ্জু কালিকে নাম ধরে ডাকে।

অনেক অনেকদিন পর মঞ্জুর ডাক শুনে কালি সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। সেই প্রিয় নামে ডাকছে মঞ্জু; যা শোনার জন্য কালি চাতকের মতো তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠত একেকটা মুহূর্ত। কালি ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। আমগাছটার একেকটা ডাল বেয়ে বেয়ে সে ওপরে উঠতে থাকে মঞ্জুকে দেখার জন্য। চোখের দুধার ধরে লতিয়ে লতিয়ে নেমে যাচ্ছে জল। তার এক ঢাল চুল দুগণ্ডের পাশ আবৃত করে রেখেছে ঝোপের মতো। কতদিন চুল আঁচড়ানো হয় না। মঞ্জু তার চুলগুলো খুব পছন্দ করতো। মুঠি মুঠি করে নাকের সামনে নিয়ে ঘ্রাণ নিত।

মঞ্জু কালির সাড়া পায় না। কালি আজ কোনো উত্তর করে না। অথচ তাদের মহাকাব্যিক প্রেমকালে এমনটি কখনো হয়নি। তাকে কালি এখন ঘৃণা করে। প্রচণ্ড ঘৃণা। মঞ্জু নৌকার বৈঠা খুঁজে পায় না। হাত দিয়ে পানি ঠেলে ঠেলে নৌকা ভাগাতে শুরু করে। দ্রুত তাকে জঙ্গল থেকে বেরুতে হবে। নৌকা বশ মানছে না। গাছে, ডালে ধাক্কা খেয়ে গোলাকার হয়ে ঘুরছে। মঞ্জু থুক করে ছেপ ফেলে বুকে। বাবার খুনের কথা বারবার মনে পড়তে থাকে।

কালি গাছের শেষ ডালে উঠে বাগানের ওপর চোখ বোলাতে থাকে। বৃষ্টিতে ভিজে গাছের মাতিগুলো কী সুন্দর সবুজ চকচকে হয়ে আছে। বাগানের মাঝখানে একটা ছোট নৌকা খালি পড়ে আছে। নৌকাটা দুলছে জোরে জোরে। যেন এই মাত্র কেউ সেটা থেকে লাফ দিয়ে পানিতে নেমে গেছে। নৌকার পাটাতনে এক প্লেট ভাত। খুব সুন্দর করে সাজানো। তরকারির ঘ্রাণটা কালি এখান থেকেই পাচ্ছে। কালির পেটটা ক্ষুধায় মোচড় দিয়ে ওঠে। পাতালতা কম খাওয়া হয়নি। এবার তাকে ধোঁয়া ওঠা ভাত খেতে হবে।

ভেজা গাছে শরীর ঘষটে নামতে নামতে কালির বুক ছুলে যায়। পানিতে ঝাঁপ দিলে সারা বুক চিনচিন করে জ্বলে ওঠে। কালি নৌকার কাছে যায়। লাফিয়ে ওঠে নৌকার গলুইয়ে। টাল সামলাতে না পেরে আরেকটুর জন্য নৌকা উলটে যায়নি। প্লেটে চেপে চেপে রাখা এক গাদা মোটা ভাত। ঝুরঝুরে এবং জোছনার মতো ধবধবে সুন্দর। পাতের ওপর ঝোলে ভাসানো কচুর ছড়া। মাছের ভর্তা আর মুসুর ডাল। বুলু ছাড়া কেউই জানে না কালির প্রিয় তরকারি হলো কচুর ছড়া। কালি ডেকে ওঠে, ‘বুলু! বুলু!’

বুলু তখন সেই নৌকাটারই নিচে, কয়েক ফিট পানির তলে মঞ্জুকে দা দিয়ে কোপাচ্ছে। মঞ্জু স্পষ্টভাবে বুলুকে দেখতে পারছে। দুজনের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে এদিক-ওদিক ভাসে। মঞ্জুর গালের বাতাস সব বেরিয়ে যায়। বোটকা মেরে মেরে বুদবুদ ওপরের দিকে উঠে আসে। তার চোখগুলো ভয়ে টপকে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছে। মঞ্জু দা’র আঘাতে বারবার নড়ে উঠছে। তার শরীরখানা প্রথমে একটা গাছের গোড়ায় গিয়ে বসে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে। মুখ দিয়ে ধোঁয়ার মতো গলগল করে বেরিয়ে যাচ্ছে রক্তের নলা!

সেবার কালি দ্বিতীয়বারের মতো বুলুর সাথে ঘর পালাল।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *