আমার পাঠাভ্যাসের অত্যন্ত পছন্দের একটি জনরা কথাসাহিত্য। কথাসাহিত্যের ধ্রুপদি ও আধুনিক পাঠ আমাকে আমোদিত করে। বিগত ও সমকালীন কথাসাহিত্যিকদের লেখাজোখা পড়ে তাদের ব্যক্তিজীবন, চিন্তাদর্শন ও অভিরুচি সম্পর্কে জানার একটা আগ্রহ সবসময় থাকে। অক্ষরের আয়নায় তাদেরকে দেখার চেয়ে মুখোমুখি বসে চোখে দেখে জানার ইচ্ছাটা থাকে তীব্র। কিন্তু এমন ইচ্ছা কখনো পূরণ হয়নি!
ভেবে পেলাম, একজনকে দিয়ে এই ইচ্ছাপূরণ সম্ভব। সাব্বির জাদিদ—সমকালীন কথাসাহিত্যের এক বরিত নাম। তার লেখার অনুরক্ত পাঠক আমি। তার কথাসাহিত্যিক হয়ে ওঠার জার্নিটা নিজের চোখে দেখা! সেই কিশোরবেলা থেকে তাকে পড়ছি; এখনো বইয়ের তাকে পড়ে আছে তার বই। তাকে আরেকটু কাছ থেকে জানতে চাই। ঠিক করলাম, সাব্বির ভাইয়ের সাথে একটা মুখাড্ডা দেব। আলাপনে জানব তাকে।
এক রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় তাকে দাওয়াত করলাম আমার বাসায়। তিনি বেশ সানন্দে এবং আন্তরিক হয়েই এলেন। আমার নিরামিষ রান্না খেয়ে তার ভালোমন্দ কিছু বোধ হলেও আমার লব্ধ হয়েছে দারুণ কিছু। ঘণ্টাখানেকের আলাপে তিনি নিজের জীবন ও লেখালেখিকে মেলে ধরেছেন এই সাক্ষাৎকারে। তার এবং আমার দুজনেরই প্রথম সাক্ষাৎকার এটি। কেয়ারির সুবাদে একটি চমৎকার কাজ হয়ে গেল!
দুজন মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা না জানালেই নয়। মীর তারেক, এই সাক্ষাৎকার ধারণ ও অনুলিখনে তার উদ্যমতা আমাকে আনন্দিত করেছেন। হৃদয়জ ভালোবাসা তাকে। জাবির মাহমুদ, তার প্রযত্ন গ্রন্থনায় সাক্ষাৎকারটি সুখপাঠ্য হয়েছে। প্রিয়জন আমার, ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে বিব্রত করতে চাই না।
—মুজিব হাসান
মুজিব হাসান : সাব্বির ভাই, প্রথমে যেটা জিজ্ঞাসা করব ভাবছি, কথাসাহিত্যের ব্যাপারটা। বিষয়টা আসলে কী? হয়তো পড়েছেন, এ নিয়ে হাসান আজিজুল হকের দুইটা চমৎকার বই আছে। বুদ্ধদেব বসু এবং আরও অনেকেই লিখেছেন এটা নিয়ে। তো কথাসাহিত্য নিয়ে আপনার ভাবনাটা আসলে কী? বা এই জনরাটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
সাব্বির জাদিদ : কথাসাহিত্য বলতে গল্প এবং উপন্যাস—এই দুইটাকেই বলে, আমি যতটুকু জানি। এটা নিয়ে আমার ভাবনা বলতে—আমাদের যাপিত জীবনের যেসমস্ত গল্প আছে, এগুলোই তুলে ধরা। মানে আমার ভেতরে যে গল্পগুলো আছে, গল্পের যে ভাবনাগুলো আছে, সেগুলো কখনো ছোটগল্পের আকারে, কখনো উপন্যাসের আকারে বের হয়। অনেক কথা আছে যেগুলো আমি বলতে চাই, কিন্তু কোনো মাধ্যমে বলতে পারি না। আমি তো আসলে বক্তা না যে মাইকের সামনে বসে গল্পগুলো শোনালাম, আর এটা সম্ভবও না। তো আমি আমার ভেতরকার তাড়িত কথাগুলো মানুষকে বলার জন্য কখনো ছোটগল্প লিখি, কখনো উপন্যাস লিখি। এটাই মূলত আমার কথাসাহিত্যের ভাবনা।
মুজিব হাসান : গল্প এবং উপন্যাস, এই দুইটার কোনটাতে আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? সম্ভবত আপনার একটা লেখায় এরকম পড়েছিলাম—উপন্যাসের চেয়ে ছোটগল্প নিয়ে আপনি বেশি উচ্ছ্বসিত…
সাব্বির জাদিদ : আমার কাছে মনে হয়, উপন্যাস হচ্ছে একটা দীর্ঘ জার্নির বিষয়। উপন্যাস কখনো এক বছর, দুই বছর, তিন বছর ধরেও লেখা হয়। সাধারণত আমার এক একটা উপন্যাস লিখতে হয়তো এক বছর, দেড় বছর বা ছয় মাস লাগে। লেখা শেষ হওয়ার পরে যে একটা আনন্দ কাজ করে, উপন্যাস লিখতে গেলে দেখা যায় আমি এক বছর পরে এই আনন্দটা পেলাম। ওই সময় কিন্তু এটা এত অনুভব হয় না। মানে উপন্যাসের প্রেক্ষাপট যেহেতু বিস্তৃত, ফলে এর ভালো লাগাটা একবারে পুরোপুরি ধরে ওঠা যায় না। তখন মনে হয় ঘাড়ের ওপর থেকে একটা বোঝা নামানো গেল, নিজেকে খুবই নির্ভার লাগে।
কিন্তু ছোটগল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয় ভিন্ন। একটা ছোটগল্প লিখতে হয়তো একদিন, দুইদিন বা কয়েকদিন লাগে। দুই হাজার, পঁচিশশো শব্দ। ফলে এটা যখন শেষ করি, তখন অন্যরকম একটা আনন্দ কাজ করে। এখানে খুব অল্প সময়ে আমার অব্যক্ত অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করতে পারি। ছোটগল্পের শেষদিকে একটু ধাক্কা, একটু চমক, একটু টুইস্ট থাকে। অল্প পরিসরে হওয়ায় একে একটা ভালো লাগার প্যাকেজ মনে হয়। এজন্য ছোটগল্পের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব একটু বেশি। কারণ এটা আমাকে বেশি আনন্দ দেয়।
মুজিব হাসান : আপনার প্রথম গল্পের বই ‘একটি শোক সংবাদ’। তারপরে অনেকগুলো বই এসেছে। তো এগুলোর মধ্যে কি আসলে মানগতভাবে একটা আরেকটার থেকে এগিয়ে? না সবগুলোই এক? গল্পের ধারা, চরিত্র বা মানের কথা বললে মাহমুদুল হকের ক্ষেত্রে যেমনটা দেখি—তার একটা বই থেকে আরেকটা বইয়ে চরিত্র, গল্পকাঠামো, ভাষাশৈলী ছাড়াও খুঁটিনাটি বিষয়ের যে উন্নতি বা বৈচিত্র্য দেখা যায়, আপনার ক্ষেত্রে সেটা আছে কি না? বা খানিকটা হলেও স্বাতন্ত্র্য আনার চেষ্টা?
সাব্বির জাদিদ : হ্যাঁ, সেটা তো সবসময় করা হয়। এটা ধারাবাহিকভাবে কেউ যদি আমার ছোটগল্পের বইগুলো পড়ে, তাহলে সে বুঝতে পারবে। আমি নিজেও বুঝি। মানে গদ্যের যে একটু পরিবর্তন, হয়তো খুব বেশি চোখে পড়ার মতো না, কিন্তু কোনো পাঠক যদি নিবিষ্ট মনে বা যাচাই করার উদ্দেশ্যেও পড়ে, আমার প্রথম ছোটগল্পের বইটা থেকে শেষ ছোটগল্পের বইয়ের উন্নতির দিকটা বা খুঁটিনাটি পার্থক্যগুলো সে ধরতে পারবে।
মুজিব হাসান : উন্নতিটা কী গল্পের প্লটে? নাকি ভাষা, গদ্য বা প্রাসঙ্গিকতায়?
সাব্বির জাদিদ : গদ্য বা ভাষিক উন্নতির কথাই বললাম আরকি। সমকালকে উন্নতভাবে ধারণের দিকটাও আছে।
মুজিব হাসান : আপনার একটা গল্পে এমন একটা উপমা পড়েছিলাম—জামের মতো পেকে ওঠা রাত… এরকম আরও আছে, নিসর্গকে জীবনবাস্তবতার সাথে মেলানো, জীবনের সঙ্গে মাপা বা একটা সমাজকে নিরীক্ষণ করার দিকটা অথবা রাজনৈতিক একটা দর্শনকে নিসর্গের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া—এরকম অনেক উপমা আপনার লেখায় পেয়েছি। উপমার ব্যাপারটা আপনার ভেতর কীভাবে কাজ করে?
সাব্বির জাদিদ : উপমা তো লেখার সৌন্দর্য, একটা অলংকার। আমি সোজাসাপ্টা শুধু বলে গেলাম—সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম, মুজিব ভাইয়ের সাথে দেখা হলো, তার বাসায় ভাত খেলাম। এগুলো তো সাদাসিধা কথা। আমি যে সিঁড়ি ভেঙে উঠলাম, সিঁড়িটা কেমন? আমি যদি সেটুকু বলি, মানে সিঁড়ি দিয়ে শুধু না উঠে আমি বললাম—সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, সিঁড়িটা আমার কাছে মনে হচ্ছে যেন পাহাড় ডিঙোচ্ছি। এটা একটা উপমা। এভাবে গল্প বা উপন্যাসের ভাষায় এক ধরনের অলংকার জুড়ে যায়।
আমার উপমা নিয়ে অনেকেই কথা বলেন। আমি খুব সতর্ক হয়েই যে এটা করি, মানে এই গল্পের মধ্যে বা উপন্যাসের এই অংশে আমি দুই-তিনটা উপমা আনব, এমন না। এটা অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলে আসে। পরবর্তীতে যখন এই উপমাগুলো পড়ি, তখন নিজেই অবাক হয়ে যাই। মানে আমি ভুলে যাই। কিন্তু পরে চোখে পড়লে ভাবি, এটাও আমি লিখেছিলাম!
আমার সম্প্রতি লেখা ‘পা ও প্রণতির গল্প’—যেটা প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়েছে। সেখানে আছে একজন বীরাঙ্গনা নারীর চরিত্র, যার ওপর অনেক অত্যাচার করা হয়েছে। ধর্ষণ না, এমনিতে মারধর আরকি। ফলে তার শরীরটা নেতিয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে মানুষ ক্লান্ত হয়ে গেলে বা বিধ্বস্ত হলে শরীর নেতিয়ে যায়। তো আমি তাকে উপমিত করেছি এভাবে—‘আঘাতে আঘাতে জরিমন কয়েক দিনের বাসি শাকের আঁটির মতো নেতিয়ে পড়ে মাটিতে।’ মানে শাকের আঁটির লতাগুলো বাসি হয়ে গেলে যেমন নেতিয়ে পড়ে, মানুষের শরীরও সেভাবে নেতিয়ে যায়। পরে দেখলাম, একজন লেখক এটা নিয়ে ফেসবুকে আলাপ তুলেছেন। তখন আমি নিজেও একটু চমকে গেছি যে এগুলো আমি লিখেছি!
বলতে চাচ্ছি, আসলে এটা ভেতর থেকে আপনাআপনি চলে আসে। আমি যে খুব সতর্ক বা সচেতন হয়ে উপমাগুলো লেখার ভেতর ঢুকিয়ে দিই, এমন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এভাবেই চলে আসে। এটা গল্পের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
মুজিব হাসান : আচ্ছা, একটা গল্প কীভাবে গল্প হয়ে ওঠে? এ নিয়ে আপনার ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি কী?
সাব্বির জাদিদ : আসলে গল্প তো অনেক ধরনের হয়। তবু মোটাদাগে দুই ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। একটা হচ্ছে আখ্যানপ্রধান, আরেকটা অনুভূতিপ্রধান। কিছু গল্প আছে যেগুলো শুধু অনুভূতির খেলা। মূলত সেটার ভেতর তেমন কোনো গল্প নেই। তুচ্ছাতিতুচ্ছ, ছোট্ট বা একেবারে মামুলি বিষয় নিয়ে নানা অনুভূতি ছড়িয়ে আছে। এটা একটা ধারা। অনেকেই এই ধারায় লিখেছেন। যদিও সেটা একটু কম জনপ্রিয়। কারণটাও খুব সিম্পল। এ ধরনের অনুভূতি ধারণ করার মতো পাঠক কম।
আমি আসলে ওই ধারার লেখক না। আমার গল্পের মধ্যে একটা গল্প থাকে। মানে আখ্যানপ্রধান যে ধারা, সেই ধারাতেই আমি লিখি। তবে উত্তর-আধুনিক লেখক বা পাঠকেরা হয়তো এটাকে একটু পশ্চাৎপদ ধারা বলবেন। যেটা কি না প্রাচীন। রবীন্দ্রনাথ করেছেন, মানিক করেছেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এই ধারার গল্প মানুষ বেশি মনে রাখে। অনুভূতিসর্বস্ব গল্পে কেবল লাইনে লাইনে অনুভূতি। কিন্তু অনুভূতি তো সামগ্রিকভাবে মনে রাখার বিষয় না। মনে থাকেও না মানুষের। ভুলে যায়।
কিন্তু আপনি যদি হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার মতো একটি ভালো গল্প পড়েন, যেমন ধরেন রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’ যদি পড়েন, আমৃত্যু মনে থাকবে। আমিও ছোটবেলায় এমন অনেক গল্প পড়েছি, বিশেষ করে ‘ছুটি’ গল্পটা ছোটবেলায় পড়া, কিন্তু এখনো মনে আছে। অথবা ধরেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’, মানিকের ‘প্রাগৈতিহাসিক’—এ ধরনের গল্প মানুষ মনে রাখে। আমি এই ধারার গল্পই লিখি। এটাই আমার পছন্দ।
মুজিব হাসান : গল্প লেখার ক্ষেত্রে আপনি আসলে গল্পের চরিত্রগুলোকে কীভাবে শাসন করেন?
সাব্বির জাদিদ : চরিত্রগুলোকে তো আমি শাসন করি না, বরং চরিত্ররাই অনেক সময় আমাকে শাসন করে। হয়তো একভাবে লিখতে চাচ্ছি, সেভাবে হচ্ছে না। চরিত্র নিজেই একটা রক্তমাংসের মানুষ হয়ে নিজের পথ বেছে নিচ্ছে, এমন হয়। মানে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না আরকি।
তবে চরিত্রদের ক্ষেত্রে যেটা সবসময় করতে চাই—শিল্পের জন্য শিল্প না করে আমি মানুষের জন্য শিল্প করি। মানে মানবিক মূল্যবোধ বা কল্যাণের দিকে যাত্রা। আমার গল্প বা উপন্যাস পড়ে মানুষ যেন একটা ভালো মেসেজ পায়। শুধু শিল্পের জন্যই শিল্প না; ভালোর জন্য শিল্প, কল্যাণের জন্য শিল্প, মানুষের জন্য শিল্প—এটা আমি করতে চাই। এজন্যই আমার গল্প বা উপন্যাসের চরিত্রগুলো হয়তো ভালো কিছু মেসেজ দেয়।
ভালো আর মন্দের ব্যাপারটা যদিও আপেক্ষিক। মানে সমাজভেদে, মানুষভেদে আমার কাছে যেটা ভালো, হয়তো আরেকজনের কাছে সেটা ভালো নাও হতে পারে। তারপরেও চিরায়ত ভালো এবং চিরায়ত মন্দের একটা সংজ্ঞা আছে। সেই জায়গা থেকে আমি চেষ্টা করি, আমার লেখা পড়ে যেন মানুষের মধ্যে ভালোর দিকে যাত্রা করার একটা চেতনা তৈরি হয়, প্রেরণা কাজ করে। খারাপটাকে খারাপ হিসেবে জানা, ঘৃণা করা বা ওই খারাপ থেকে দূরে থাকার একটা প্রবণতা যেন তাদের ভেতর আসে। এই চেষ্টাটা আমি করি।
মুজিব হাসান : আচ্ছা, লেখালেখির ক্ষেত্রে ঘরানার যে একটা বিভক্তি আছে, যেমন ধরেন মাদরাসা থেকে উঠে আসা, বামধারার বা শাহবাগি—এই যে ট্যাগিং, এই ব্যাপারগুলোকে কীভাবে দেখেন?
সাব্বির জাদিদ : আমি মাদরাসায় পড়াশোনা করেছি। ছোটবেলা থেকে আমার টার্গেট ছিল, আমি কোনো ঘরানা কেন্দ্রিক লেখক হব না। এটা একেবারে ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতর ছিল। মানে একটু বুঝতে শেখার পর যখন লেখালেখি শুরু করি, তারপর থেকে আমার টার্গেট ছিল—আমি সর্বসাধারণের জন্য লিখব।
সাহিত্য বা শিল্প তো আসলে ঘরানা কেন্দ্রিক হওয়াটা ঠিক না। আমি আমার মতো করে লিখব। কিন্তু আমি চাইব, আমার লেখাটা যেন সবশ্রেণির মানুষের কাছে যায়, সব মানুষ পড়ে। ঘরানার মধ্যে বন্দি হয়ে থাকলে তো আমি আমার পৃথিবীটাকে ছোট করে ফেললাম। আর দেখার পৃথিবী যখন আমি ছোট করে ফেলব, তখন আমার প্রতিযোগিতার মাঠটাও ছোট হয়ে যাবে।
এখন বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটারের ধ্যানজ্ঞান যদি হয় কেবল জাতীয় দলে চান্স পাওয়া, তাহলে সে কিন্তু বড় হতে পারবে না। কারণ বাংলাদেশ একটা ছোট্ট রাষ্ট্র, এখানে প্রতিযোগিতা কম। মাত্র কয়েক হাজার মানুষের ভেতর থেকে প্রতিযোগিতা করে সে এগারো সদস্যের দলে চান্স পাচ্ছে। কিন্তু তার যদি টার্গেট থাকে আমি সারা পৃথিবীর ভেতর একজন ভালো খেলোয়াড় হব, বিশ্বক্রিকেটের ইতিহাসে যেন আমার নাম লেখা থাকে। সে যখন এই টার্গেট করবে, তখন তার প্রতিযোগিতার ময়দানটাও অটোমেটিক বড় হয়ে যাবে। তাকে চেষ্টাও বেশি করতে হবে তখব। সে যদি সফল হয়ে যায়, তাহলে অনেক সাড়া জাগিয়ে সফল হবে।
তো ঘরানা কেন্দ্রিক থাকা মানে স্বেচ্ছায় আমি আমার স্বপ্নের পৃথিবীটাকে একটা সীমাবদ্ধ জায়গার মধ্যে, ক্ষুদ্র একটা গণ্ডির ভেতর বন্দি করে ফেললাম। এটা তো ভালো লক্ষণ না।
মুজিব হাসান : এবার আপনার লেখালেখির জার্নিটা জানতে চাই। কখন থেকে আপনার মনে হলো যে আমার গল্প লেখা উচিত? অনেকেই তো ছড়া-কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু করে। আপনিও কি ছড়া-কবিতা দিয়ে শুরু করছিলেন? নাকি গল্পটা দিয়েই?
সাব্বির জাদিদ : আসলে আমার মনে হয় কী জানেন, আল্লাহ একেকজনের ভেতর একেক বিষয়ের আগ্রহ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান। আমার মনে হয় জন্মগতভাবেই গল্পের প্রতি একটা দুর্বলতা ছিল। আমি তখনো স্কুলে ভর্তি হইনি। মানে স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স হয়নি তখনো; সাড়ে চার কি পাঁচ বছর। ওই সময়ের একটা আবছা স্মৃতি বেশ মনে পড়ে। সেটা হচ্ছে, যৌথ পরিবারে বড় হওয়ার স্মৃতি। গ্রামে এখনো বেশিরভাগ পরিবারই যৌথ। আমার চাচা আর আমাদের ছিল এক উঠানের বাড়ি। আমরা একসাথে থাকতাম।
ওই সময় আমার চাচার ঘরে একটা ম্যাগাজিন পাই। এখন আর ম্যাগাজিনটার নাম মনে নেই। কোনো একটা ঈদ সংখ্যা হবে। খুব গুরুগম্ভীর লেখাজোখা দিয়ে ভরপুর। ওটা হাতে পাওয়ার পরে ভেতরে দেখি একটা উপন্যাস, একেবারে বড়দের জন্য। আমি এটা পড়তে শুরু করি। কাহিনিটা পুরোপুরি আমার মনে আছে। যদিও দুর্ভাগ্যবশত লেখকের নাম মনে নেই। লেখকের নাম মনে থাকলে আর তিনি জীবিত থাকলে হয়তো তার সাথে সাক্ষাৎ করে বলতাম—আপনার উপন্যাসটা আমি অমুক ঈদ সংখ্যায় এই বয়সে পড়েছি।
তো ওই উপন্যাসের কাহিনির মধ্যে দেখা যায়—একজন মা, তার গর্ভে সন্তান এসেছিল। কোনো কারণে সন্তানটা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সে অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। একজন নারীর ভেতর যখন মাতৃত্বের ক্ষুধা থাকে, তার গর্ভে সন্তান আসে। আর সেই সন্তান যদি ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যায়, কী যে কষ্ট! মা ডাক শোনার জন্য সে পাগল হয়ে ওঠে। তার ভেতর এক ধরনের মানসিক বিপর্যয় ঘটে। ভারসাম্য হারিয়ে যায়। সব জায়গায় সে শুধু মা মা ডাক শোনে। তার এই মানসিক বিকার থেকে উত্তরণের জন্য, একটা সুন্দর পরিবেশ বা হাওয়া বদল করার জন্য তার স্বামী তাকে কোনো একটা পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে ঘুরতে গিয়েও সে ওই পাহাড়ের একটা গিরিপথের ভেতর থেকে মা মা ডাক শুনে! কাহিনিটা এমনই ছিল।
ওই বয়সে ছেলেপুলেরা যখন রঙিন রঙিন শব্দ, কার্টুন বা ছবিওয়ালা বই পড়ায় অভ্যস্ত, তখন আমি পুরো একটা উপন্যাস ঈদ সংখ্যা থেকে পড়ে ফেলি। এটা এখন ভাবলে বিস্ময়কর লাগে। এর থেকে মনে হয়, আমি হয়তো গল্প-উপন্যাসের প্রতি তীব্র একটা আগ্রহ নিয়েই জন্মেছিলাম, যার ফলে এটা হয়েছে।
আর যখন হিফজখানায় পড়ি, তখন থেকেই আমার মধ্যে গল্প পড়ার তুমুল ঝোঁক তৈরি হয়। গল্পের বই দেখলে পড়ার জন্য মাথা খারাপ হয়ে যেত। লিখতেও চাইতাম। হিফজখানায় থাকতে একটা খাতা বানিয়েছিলাম, সেখানে লিখতাম। তখনো খুব বেশি বয়স না, কেবল শৈশব পার করে কৈশোরে পা দিয়েছি। এভাবেই আমার লেখালেখিতে আসা। অনেকেই হয়তো ছড়া-কবিতা দিয়ে শুরু করেছে। কিন্তু আমি ছড়া-কবিতা দিয়ে শুরু করিনি, গল্প দিয়েই শুরু করেছিলাম।
মুজিব হাসান : তখন আসলে আপনার গল্পের প্লটগুলো কেমন ছিল? ওই বয়সে তো মাদরাসাজীবন বা কিছু একটা দেখা হলে সেগুলোকে গল্পে রূপ দেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। এরকম কিছু?
সাব্বির জাদিদ : হ্যাঁ, সেরকমই। যা দেখতাম সেগুলোই গল্পের মধ্যে আনার চেষ্টা করতাম। একটু বড় হওয়ার পরে প্রচুর নসিম হিজাজি পড়া হয়েছে। এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ, শফিউদ্দিন সরদারকেও পড়া হয়েছে। মানে যে বয়সে সবাই তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা পড়ে, আমি তখন সেগুলো পড়েছি। তিন গোয়েন্দা হয়তো সাকুল্যে দুই-তিনটা পড়েছি। মাসুদ রানা একটাও না। তো সেগুলো পড়ার ফলে আমার মধ্যে একটা জজবা তৈরি হয়েছিল। সেটাকে মুসলিম উম্মাহর প্রতি দরদ বা প্রেমও বলতে পারি। সেই জজবাকে পুঁজি করে কিছু খসড়া গল্প লিখেছি৷ একটা গল্প লিখেছিলাম হিফজখানায়, সেটা কোথাও ছাপিনি। তখন তো আসলে প্রকাশ হওয়ার মতো বয়সও না। তো ওই ধরনের কিছু চর্চা করেছিলাম আরকি। তারপর নানা পথ ঘুরে আস্তে আস্তে এই পর্যায়ে এসেছি।
মুজিব হাসান : পত্রিকায় লেখার জার্নিটা কীভাবে শুরু হয়েছে? প্রথম লেখা প্রকাশ কোথায়, কীভাবে?
সাব্বির জাদিদ : আসলে লিখলে তো স্বাভাবিকভাবে একটা বাসনা থাকে—আমার লেখাটা শুধু আমার কাছেই না থাকুক, আরও দশজনের কাছে যাক। আমার কৈশোর আর তারুণ্য মাদরাসায় কেটেছে। ওই সময় মাদরাসা রিলেটেড যেসমস্ত পত্রিকা ছিল—‘আদর্শ নারী’ ‘রাহমানী পয়গাম’ ‘নকীব’ সব সংগ্রহ করে পড়তাম।
যখন মিজান জামাতে পড়ি, তখন ‘আদর্শ নারী’র খুব জয়জয়কার। আমি নিয়মিত আদর্শ নারী কিনতাম। সেখানে ‘সবুজ কুঁড়ি’ নামে একটা বিভাগ ছিল। ১৮ টাকা দিয়ে সদস্য হওয়া যেত। আমি ১৮ টাকা মানি অর্ডার করে সদস্য হয়ে গেলাম। আমার সদস্য নাম্বার ৫২৭৫ ছিল সম্ভব। সেখানে টক-মিষ্টি-ঝাল, ছড়া-কবিতা, ক্ষুদে প্রবন্ধ, একটুখানি হাসির ঝিলিক, নাসির গাজির ঝুলি এরকম অনেক বিষয় ছিল। এগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছিল, আমিও লেখা পাঠাব। পাঠিয়েছিলাম ছোট কৌতুক-টৌতুক কিছু একটা।
যখন একটু বড় হলাম, ২০০৬ সালের দিকে সম্ভবত, একটা রহস্য গল্প লিখেছিলাম। সেটা ‘পোড়ো বাড়ির বদ্ধ কুটির’ নামে আদর্শ নারীর দুই পৃষ্ঠা জুড়ে ছাপা হয়েছিল। একটু বড় অবস্থায় এটাই আমার প্রথম ছাপা হওয়া গল্প। এরপরে ‘মাসিক নকীবে’ লিখেছি, ‘রাহমানী পয়গামে’ও লিখেছি অনেক।
যখন আরেকটু বড় হলাম, সবকিছু বুঝতে শিখলাম, তখন মনে হলো এগুলো তো আসলে ঘরানা কেন্দ্রিক পত্রিকা। মানে এখানে লিখলে আমার লেখাগুলো শুধু মাদরাসা বা এই ধরনের পাঠক যারা তাদের কাছেই যাচ্ছে। তখন মনে হলো, একটু বাইরেও চেষ্টা করা উচিত। তারপরেই বাইরের যেসমস্ত লিটল ম্যাগাজিন আছে বা যারা লিটলম্যাগের চর্চা করে, তাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করলাম। এরপর ফেসবুক এলো, ফেসবুকে ঢুকলাম, বিভিন্ন লেখকদের সাথে পরিচয় ও যোগাযোগ শুরু হলো। এভাবেই মাদরাসার পত্রিকা দিয়ে শুরু, তারপরে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন আর এখন জাতীয় দৈনিকে লিখছি।
মুজিব হাসান : আপনার শুরুর দিকে অনেক গল্প ‘রাহমানী পয়গামে’ পড়েছি। তখন আমিও লেখালেখি শুরু করেছি। মাসিক পত্রিকাগুলোতে নিয়মিতই আপনার গল্প ছাপা হতো। তখন দেখতাম, আপনার সব লেখায় হুমায়ূনের একটা টোন ছিল। এটা কীভাবে এসেছিল?
সাব্বির জাদিদ : ওই সময় আমি ইচ্ছা করেই এরকম লিখতাম। সেটা ২০১৩ এবং ১৪ সাল। (মৃদু হেসে) এই দুইটা বছর আমার পথভ্রষ্টতার বছর। তখন আমার এক উস্তাদ বলেছিলেন, হুমায়ূন খুব ভালো লেখক, তাকে পড়ো। সবাই যখন হুমায়ূন পড়ত, আমি তখন নসিম হিজাজি, শফিউদ্দিন সরদার পড়েছি; হুমায়ূন পড়া হয়নি। একটু বড় হওয়ার পরে যখন শুরু করলাম, দেখরাম হুমায়ূন বেশ ভালোভাবে গ্রাস করল আমাকে। যার ফলে এত বেশি পড়েছি, আমার গদ্যের মধ্যে হুমায়ূন চলে আসত। লিখতেও ভালো লাগত। অনেক সময় ইচ্ছা করেই তার ধাঁচে লিখতাম। মানে দেখতাম আমার লেখা আর হুমায়ূনের লেখা একরকম হচ্ছে কি না; একটা জাজমেন্টাল ব্যাপার আরকি। ওই সময়ের আমার যত গল্প আছে, বেশিরভাগ হুমায়ূনীয় টোনে লেখা।
এরপরে ২০১৫ সালে আহমাদ মোস্তফা কামাল ভাইয়ের একটা বই পড়লাম—‘বাংলা গল্পের উত্তরাধিকার’। এই বইয়ে প্রায় দশ-বারোজন ছোটগল্পকারের জীবনী ছিল। এই বইটাই মূলত আমার চোখ খুলে দেয়। আমি বুঝতে শুরু করি, সাহিত্য আসলে ছেলেখেলা না। যা খুশি তাই করা যায় না। এটা একটা ঐতিহাসিক ব্যাপার। আমি যদি প্রতিষ্ঠিত লেখক হতে পারি, তাহলে আমার সবকিছুই হয়তো ইতিহাসে স্থান পাবে। তখনই আমি লেখালেখি নিয়ে খুব সিরিয়াস হই। তখন থেকেই আমার মতো করে লেখার চেষ্টা শুরু করি। সেই চেষ্টাটা এখনো অব্যাহত আছে।
মুজিব হাসান : আপনার এই প্রচেষ্টার সাক্ষীই কী ‘একটি শোক সংবাদ’?
সাব্বির জাদিদ : হ্যাঁ, ‘একটি শোক সংবাদ’-এর ভেতর দিয়েই চেষ্টাটা দৃশ্যমান হয়েছে। এই বইয়ের মধ্যে দশটা গল্প আছে। কোনো গল্পের মধ্যেই হুমায়ূনের কোনোরকম ছাপ নেই।
মুজিব হাসান : হুম, আপনার এই বইটা যখন পড়ি, তখন মনে হয়েছিল, উনি তো আগে হুমায়ূনের মতো লিখতেন! এখন দেখি অন্যরকম করে লিখছেন! তো এটা ১৬-তে প্রকাশ হয়েছিল নাকি ১৭-তে?
সাব্বির জাদিদ : ১৭-তে। তখন তো সাহিত্য ব্যাপারটাও নিজের কাছে ওইভাবে পরিস্কার ছিল না। তখন মনে হতো, এই ঢঙে লেখাটা তো ভারি চমৎকার। নিজের কাছেও ভালো লাগে। আবার এগুলোর দেখি পাঠকপ্রিয়তাও আছে। মানে হুমায়ূনের পাঠকরা এই ধরনের লেখা পছন্দ করে। খুব সহজ, তরতর করে পড়া যায়। লেখাও যায় দ্রুত। আমি দ্রুত লিখে ফেলতে পারতাম আরকি। বেশি ভাবনাচিন্তা করা লাগে না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়েও বলা লাগে না তেমন। সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া যায়—বদরুল সাহেব বাজার করতে যাচ্ছেন। হঠাৎ করে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। এই টাইপের সহজ গদ্য আরকি। যাহোক, তখন বুঝতাম না বলে ইচ্ছা করেই চর্চাটা করেছি। পরে যখন বুঝতে শিখি, তখন আর কন্টিনিউ করিনি। ছেড়ে দিয়েছি৷
মুজিব হাসান : লেখালেখির শুরুর দিকে সম্ভবত সাব্বির আহমদ নামে লিখতেন, তারপর হুট করেই সাব্বির জাদিদ! আপনার নাম পরিবর্তনের ব্যাপারটা জানতে চাই!
সাব্বির জাদিদ : অনেক লেখকেরই এমন হয়, একটু বুঝতে শেখার পরে অনেকে নাম পরিবর্তন করে। শহীদুল জহিরের নাম ছিল শহীদুল হক। তার বই ‘পারাপার’ শহীদুল হক নামে ছাপা হয়েছে। এমন অনেকেরই নামের জটিলতা আছে। কবি আবুল হাসানের নাম ছিল আবুল হোসেন। তিনি এই নামেও লিখেছেন। পরে দেখেন আবুল হোসেন নামে তার থেকেও প্রবীণ একজন কবি আছেন। এই জটিলতাটা অনেকের বেলায়ই সত্য। অধিকাংশ লেখকই দেখা যায়, তাদের নামটা পুরোপুরি পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া না।
আমার নাম মূলত সাব্বির আহমদ। বাঙালি মুসলমানের নামের শেষে আহমদ, হাসান, হোসেন, আলি এগুলো তো খুব কমন। আমি শুরুতে সাব্বির আহমদ নামেই লিখতাম। এই নামে আমার প্রচুর গল্প মাদরাসা রিলেটেড পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। ‘আল-আমানা’ নামে একটা পত্রিকা ছিল। সেখানে ২০০৯, ১০, ১১ সালের প্রায় প্রত্যেক সংখ্যায় আমি গল্প লিখেছি। সেগুলো সব সাব্বির আহমদ নামে। তারপর ১৩ সালে আমার মনে হলো, নামটা পরিবর্তন করা দরকার। তখন সাব্বির আহমদ নামে আরেকজন লেখক ছিলেন। তাকে এবং আমাকে নিয়ে অনেক পাঠকই বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন। তাই মনে হলো, নামটা পরিবর্তন করা দরকার।
মুজিব হাসান : নতুন নাম নেওয়ার ভাবনা থেকেই কি বেছে নিলেন—সাব্বির জাদিদ?
সাব্বির জাদিদ : হ্যাঁ। ‘জাদিদ’ শব্দটার প্রতি আগে থেকে আমার একটা দুর্বলতা ছিল। যখন মনে হলো নাম পরিবর্তন করব, তখন নামের শেষে জাদিদ শব্দটা লাগিয়ে দিই। ওই সময় এর জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। ত্যাগ স্বীকার বলতে, সাব্বির আহমদ নামে অনেক গল্প আমি লিখেছি। অনেক মানুষ এই নামেই আমাকে চেনে। এখন হুট করে আগের সবকিছু বাদ দিয়ে নতুন নামে আসা মানে নতুন লোক। আগের সবকিছু আমি বিসর্জন দিচ্ছি এমন একটা ব্যাপার। তারপরেও আমি ওই ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম। আমার কাছে এখন মনে হয়, ঝুঁকিটা নিয়ে খুব একটা খারাপ করিনি।
মুজিব হাসান : আপনার প্রথম উপন্যাস সম্ভবত ১৩ সালে একটা ঈদ সংখ্যায় ছাপা হয়। সেটাই কি প্রথম?
সাব্বির জাদিদ : হ্যাঁ।
মুজিব হাসান : পরে কি সেটাই ‘জীবনঘড়ি’ নামে ছাপা হয়েছে?
সাব্বির জাদিদ : না না। ‘আনতারা’ নামে একটা সাহিত্য পত্রিকা ছিল। দুইটা সংখ্যা বের হয়েছিল। সেখানে ‘অভিমানী কিশোর’ নামে একটা কিশোর উপন্যাস লিখেছিলাম। তারপরে ‘লিখনী’র পরপর দুই ঈদ সংখ্যায় দুইটা উপন্যাস ছাপা হয়। ১৩ সালে ‘পথভুলিবার খেলা’ এবং ১৪ সালে ‘জীবনঘড়ি’। আমার জায়গা থেকে উপন্যাসগুলো অনেক সাড়া ফেলেছিল। ‘লিখনী’র সার্কুলেশনও অনেক ছিল তখন। ‘জীবনঘড়ি’ বেশ সাড়া ফেলেছিল। প্রচুর মানুষ পড়েছিল বইটা। কান্নাও করেছে।
মুজিব হাসান : কথাসাহিত্যে আত্মপ্রকাশ হিসেবে আপনার প্রথম উপন্যাস ‘পাপ’। এর কাহিনিটা আমার কাছে আদম-হাওয়া রিলেটেডে একটা ব্যাপার বলে মনে হয়েছে। নায়ক-নায়িকা দুজনে একটা অচিন দেশে চলে গেছে। যেখানে সূর্যটা সবুজ ডিমের মতো আর সবকিছু হলুদ। এই থিমটা কীভাবে মাথায় এলো?
সাব্বির জাদিদ : সেখানে আমি একটা জিনিস দেখাতে চেয়েছিলাম, এই পৃথিবীর সকল পাপের উৎস হচ্ছে ক্ষুধা এবং যৌনতা। মানে দুইটা ক্ষুধা। সেটা মূলত ফ্যান্টাসি ধারার উপন্যাস। ভিন্ন একটা জগৎ আমি তৈরি করেছিলাম। এমন একটা পৃথিবী, যেখানে মানুষের ক্ষুধাও লাগে না এবং তাদের কোনো যৌনতাড়নাও নেই। এই দুইটা না থাকার ফলে তাদের ভেতরে কোনো ধরনের অপরাধ, হানাহানি, মারামারি কিছুই নেই। তারা খুব ভালোভাবে বসবাস করছে। কোনো একটা কারণে এই দুইটা জিনিস তাদের মধ্যে চলে আসে। তাদের ক্ষুধা লাগতে শুরু করে এবং তারা যৌনতাড়িত হয়। এই দুইটা আসার পরেই নানারকম বিশৃঙ্খলা, ধর্ষণ বা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে। এইটাই ছিল ‘পাপ’ উপন্যাসের মূল বিষয়। সেখানে আমি বলতে চেয়েছি, পৃথিবীর এই দুইটা ক্ষুধাই সব অনিষ্টের মূল। এই বলতে চাওয়া থেকে উপন্যাসটার সৃষ্টি।
মুজিব হাসান : আপনার অমর সৃষ্টি ‘পিতামহ’র প্লটটা কীভাবে ভেবেছিলেন?
সাব্বির জাদিদ : ‘পিতামহ’-কে বলা যায় আমার লেখালেখি-জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট। আমি আগে বলেছিলাম, ২০১৫ সালে আমার যে বোধোদয়টা হয় সেটা মূলত ছোটগল্পের বোধোদয়। ‘বাংলা ছোটগল্পের উত্তরাধিকার’ বইটা পড়ে আমার ছোটগল্পের চেতনাটা আসে। মানে ছোটগল্প কীভাবে লিখতে হবে বা এর সচেতনতার বিষয়টা আমার ভেতর তৈরি হয়। কিন্তু তখনো পর্যন্ত উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমি সেভাবে সচেতন হয়ে উঠতে পারিনি। পিতামহটা ওই অসচেতন অবস্থাতেই লিখে ফেলি। তারপরে আমি বুঝতে পারি, আসলে উপন্যাস একটা আলাদা জার্নি।
‘পিতামহে’ মূলত আমি লিখতে চেয়েছিলাম আবরাহা এবং আব্দুল মুত্তালিব, মানে কাবাঘর ধ্বংসের যে প্রেক্ষাপট, শুধু ওই অংশটুকু নিয়ে। আব্দুল মুত্তালিব মক্কা নগরীর একজন মান্যবর নেতা, সর্দার। ওই সময় আবরাহা ইয়েমেন থেকে কাবাঘর ধ্বংস করার জন্য আসছে। ওই সময়কার যে টানটান একটা অবস্থা, ওই মুহূর্তটা নিয়েই মূলত লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন আমি এটার জন্য আব্দুল মুত্তালিবের জীবনের ওপর পড়াশোনা শুরু করি, তখন দেখি যে তার পুরো জীবনটাই খুব ইন্টারেস্টিং। ওই সময়কার ঘটনা, মানে আবরাহার হস্তীবাহিনীর ঘটনার মতোই তার পুরো জীবনটা রোমাঞ্চকর। তখন মনে হলো, আব্দুল মুত্তালিবের পুরো জীবন নিয়ে আমি লিখতে পারি।
মুজিব হাসান : সম্ভবত উপন্যাসটার প্রথম নাম দিয়েছিলেন ‘নগরপিতা’?
সাব্বির জাদিদ : হ্যাঁ, শুরুতে ‘নগরপিতা’ দিয়েছিলাম পরে ‘পিতামহ’ নামটাকে উপযুক্ত মনে হয়েছে। এই বইয়ের পুরোটা লিখছি-পড়ছি, লিখছি-পড়ছি করে লেখা হয়েছে। মানে একটু একটু করে জানছি আর একটু একটু করে লিখছি। এভাবেই লিখতে লিখতে অনেক বড় হয়ে গেছে। প্রায় সাড়ে পাঁচশো পৃষ্ঠার উপন্যাস।
মুজিব হাসান : উপন্যাসটা লেখার সময় আপনার পাড়াপড়শিরা বলাবলি করছিল, আপনি নাকি বাড়িতে বসে কুরআন শরিফ লিখছেন। লম্বা একটা সময় লেগেছিল বোধহয়!
সাব্বির জাদিদ : শুধু এটার প্রেক্ষাপটই এমন না। মানে লেখা বলতে তো ‘পিতামহ’ যখন লিখি, তখনই শুধু লেখার টেবিলে আছি, এমন না। যখন আমি গল্প লিখছি বা অন্য লেখা লিখছি, তখনো তো আমি লেখার টেবিলেই আছি। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ যারা, যাদের অক্ষর জ্ঞান নেই, তারা মনে করত—এই ছেলেটা হুজুর মানুষ, এ নাকি সারাদিন ঘরের মধ্যে থাকে আর কী যেন লিখে। তো হুজুর মানুষ আবার গল্প-উপন্যাস লিখবে, তারা হয়তো সেভাবে জানে না বা ভাবে না। তাই হুজুর মানুষ যখন লিখছে, হয়তো কুরআন শরিফই লিখছে। এরকম একটা ব্যাপার বোধহয় কাজ করেছিল সবার মনে।
মুজিব হাসান : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখার তাড়নাটা কীভাবে আসে?
সাব্বির জাদিদ : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আমার সবেচেয়ে প্রিয় কথাশিল্পী, এটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ হচ্ছে, মানিকের পুরো জীবনই ছিল অভাবের তাড়না আর যন্ত্রণায় বিদগ্ধ। তিনি যে সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশার ভেতর দিয়ে গেছেন, মানে লেখালেখি করবেন বলে তিনি স্বেচ্ছায় একটা অসীম সম্ভাবনাময় জীবনকে বাদ দিয়ে ভয়ংকর একটা জীবন বেছে নিয়েছিলেন। আমি চেয়েছিলাম আমার প্রিয় এই লেখকের জীবনীটা মানুষ জানুক। সেজন্যই আমি উপন্যাসটা লিখেছি।
তার প্রতি আমার ভালোবাসা বা তার লেখালেখির প্রতি আমার যে একটা ঋণ আছে—বিশেষ করে তার ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ আমার কাছে এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। তো এমন একটা উপন্যাস যিনি লিখেছেন, তার প্রতি আমার একটা দায় আছে। সেই দায়টা শোধ করবার জন্য এবং তার জীবনটাকে আমার পাঠকদের সামনে তুলে ধরতেই আমি মূলত উপন্যাসটা লিখেছি।
মুজিব হাসান : প্রত্যেক লেখকের কাছেই নিজের লেখাগুলো অতি আদরের জিনিস। তো আপনার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কথাসাহিত্যের কোন বইগুলোকে আপনি এগিয়ে রাখবেন—যেগুলো আপনার নিজের কাছেও ভালো লাগে, পাঠকদেরও হৃদয় ছুঁয়ে গেছে এবং বাংলা সাহিত্যে টিকে থাকার মতো?
সাব্বির জাদিদ : টিকে থাকার মতো যদি বলেন, তাহলে বলব এটা আমি এখনো লিখিনি। আর যদি বলেন প্রিয়, তাহলে প্রায় সবই আমার প্রিয়। একটু পুরনো হয়ে গেলে যে বইগুলো পেছনে চলে যায়, সেগুলোকে মনে হয় কী লিখেছি এটা তো ভালো হয়নি। লেটেস্টগুলোই ভালে মনে হয়। পরে এগুলোও যখন আবার পুরনো হয়ে যায়, তখন মনে হয় যে আরও ভালো লেখা যেত।
মুজিব হাসান : লেখালেখিতে আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
সাব্বির জাদিদ : এটা আমার নতুন চিন্তা। সেটা হচ্ছে, আমি ভালো লিখে জনপ্রিয় লেখক হতে চাই। মানে জনপ্রিয় লেখক হতে গেলে অনেক সময় দেখা যায় জনরুচির কাছে আত্মসমর্পণ করা, লুতুপুতু প্রেমকাহিনি বা খুবই তরল গল্প লিখে উঠতে হয়। এগুলো না করে আমি আমার মতো করে লিখে জনপ্রিয় লেখক হতে চাই। ধ্রুপদি সাহিত্যের লেখকগণ যে ধারায় লিখে গেছেন, আমি তাদের উত্তরাধিকার বহন করতে চাই।
মুজিব হাসান : সময় দেওয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
সাব্বির জাদিদ : আপনাকেও ধন্যবাদ৷ কেয়ারির জন্য শুভকামনা।
সাক্ষাৎকার আমার প্রিয় জনরা। প্রথমেই পুরো সাক্ষাৎকারটা পড়লাম।
সাব্বির জাদিদ ভাইর লেখার আমি একজন একজন অপেক্ষাকৃত ভক্ত। সবসময়ই অপেক্ষায় থাকা হয়, তাঁর নতুন লেখা পড়ার জন্য। উপন্যাস দিয়েই শুরু। গোত্রহীনের ইতিকথা দিয়ে শুরু, তারপর পরপর বেশ ক’টা উপন্যাস পড়া হয়েছে। দুইটা পুরোপুরি শেষ দিয়েছি, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাতিঘর, ঢাকা। পাশাপাশি তার ফেইসবুকের গদ্য লেখাও পড়া হয়ে থাকে।
“ওই সময় আমি ইচ্ছা করেই এরকম লিখতাম। সেটা ২০১৩ এবং ১৪ সাল। (মৃদু হেসে) এই দুইটা বছর আমার পথভ্রষ্টতার বছর।” এটুকু পড়ার সময় পুরনো স্মৃতি তাজা হয়ে গেলো। সাব্বির আর আমি একই বছরের ফারেগ। ফেসবুকে তার গল্প পড়তাম। লেখক তো আমি কোনো কালেই ছিলাম না; লেখার সাধ হতো মাঝে মাঝে। একবার একটা গল্প লিখে ওকে মন্তব্য করতে বলেছিলাম। সে বলেছিল, আপনার লেখায় হুমায়ুনীয় টান। আমার জন্য বেশ হতাশাজনক মন্তব্য ছিল। কারণ, এতটুকু তখন জানতাম, লেখায় নিজস্বতা না থাকা দূষনীয়।
মাশাআল্লাহ, সাব্বির অনেক বড় লেখক হয়েছে। রব্বে কারিম তাকে আরও তাওফিক দান করুন। আমি তার গল্পের অনুরাগী পাঠক সেই ১৩ থেকে। তার উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করছি।