মাঝে মাঝে আমার লেখা চরিত্রগুলা আমার চরিত্র না

একজন সম্পাদক, একজন কাবালিস্ট (ইহুদি গুপ্তবিদ্যা চর্চাকারী), আর একজন টেম্প্লার বিষয়ক পণ্ডিত কোনো এক মদের বারে ঢুকলেন—এক কথায় এই হলো উমবের্তো একোর জমকালো আড়ম্বরবাদী গুহ্যবিদ্যা বিষয়ক উপন্যাস Foucault’s Pendulum-এর পটভূমি। এই তিন ব্যর্থ কিংবা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাওয়া বুদ্ধিজীবী, ভালো না লাগা বা মরিয়াপনা কিংবা অস্তিত্বগত অবসাদ থেকেই হোক, প্রচলিত নানান কন্সপাইরেসি থিওরি, আর্বান লেজেন্ড, আর হাজার বছর ধরে মানুষের মনে গেঁথে থাকা অতিপ্রাকৃতিক কাহিনির ওপর চরম বিতৃষ্ণাভরা এক অনুসন্ধান চালনা শুরু করেন। 

কাহিনিতে স্বভাবতই হাস্যরসের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু আমি বিতৃষ্ণাভরা এ জন্য বললাম কারণ, এই অনুসন্ধানীরা কেউই, নিজের আত্মপরিচয়ের ভারে, তাদের অনুসন্ধানের অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলোতে বিশ্বাস করেন না, বা অন্তত শুরুতে না। অথচ, তাদের ব্যঙ্গাত্মক পরিশ্রম থেকে যা উঠে আসে, টেম্পলার নাইট, বেভারিয়ান ইলুমিনাতি, রজিক্রুশিয়ান, এবং অন্য সব জনপ্রিয় গুপ্তদল বা জুজুর গল্প সব মিলিয়ে তা পৃথিবীর গুপ্ত ইতিহাসের চেয়ে কম কিছুতে দাঁড়ায় না। 

গল্প, কলাকুশল, চক্রান্ত, আর মাথানষ্ট আজগুবের এমন মিশেলই হলো বিশুদ্ধ একো। তার তৈরি জগতে চরিত্রগুলির আকাশচুম্বী প্রত্যাশা আর ক্যারিয়ারের ব্যর্থতা চলে পায়ে পায়ে, আর নাকউঁচু যুক্তিবাদ নিজেকে আবিষ্কার করে সস্তা চটকদার ভাববাদের ঘিঞ্জিবস্তিতে ঘুরঘুর করতে। যা উর্ধ্ব তা-ই অধঃ, যা কালোই তা-ই সাদা, এবং প্রত্যেকটা জিনিসই বারের টুলে বসা গপ্পোবাজের খেয়ালের বসে বদলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমান। এ ধরনের টানাটানি আর রোমাঞ্চঅলা কাহিনি পড়ার অপার আনন্দ, একোর ভাষ্যমতে, ’৩০ আর ’৪০ এর সময় পিডমন্টে কাটানো শৈশব থেকেই তার মধ্যে আছে। যখন ফ্যাসিস্ট-আক্রান্ত স্কুল ফেলে তিনি তার প্রিয় কমিক আর গল্পের বইগুলোর মধ্যে ডুবে যেতেন। একো ইউনিভার্সিটি অব টুরিনে মধ্যযুগীয় দর্শন পড়াশোনা করেন, এবং অনেকগুলো বছর তিনি ইউনিভার্সিটি অব বলনিয়েতে সংকেতবিজ্ঞান বিষয়ে বহু ছাত্রের প্রিয় অধ্যাপক ছিলেন। অর্ধশতাব্দিধরে তিনি বিশ্বব্যাপি বিখ্যাত আছেন প্রবন্ধকার হিসেবে, প্রায়শই লিখছেন মিডিয়া কালচার এবং সাহিত্যের ওপর। আর ঠিক এই সামর্থ্যকে ভিত্তি করে, বলতে গেলে এক প্রকার সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি পপ কালচার এবং দর্শনের আপাত দৃষ্টিতে পুরোপুরি আলাদা দুই জগতকে এমনভাবে জোড়া দিতে শুরু করেন যেটাকে এখন আমরা আমাদের যুগের চলতি রীতি মনে করি, অথচ তার আগে এমন করে কখনো জগত দুটোকে মেলানো হয়নি—যেমন, এপল কম্পিউটার ক্যাথলিক (অপর দিকে পিসি প্রটেস্টান্ট) এমন থিওরি দাঁড় করানো, অথবা জিন্স পড়ার মানসিক ও নৈতিক প্রতিক্রিয়া বিষয়ে লেখালেখি করা। 

একোর সর্বপ্রথম এবং এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস, The Name of the Rose, একই সাথে একটা হত্যা রহস্য এবং সুস্বাদু এক টুকরো পোস্টমডার্নিজম। গল্পের অবস্থিতি মধ্যযুগের এক বেনেডিক্টিয় মঠে। উপন্যাসটা প্রকাশিত হয় ইতালি থেকে ১৯৮০ সনে, একোর বয়স তখন ৪৮। উপন্যাসটা একোর প্রিয় লেখক জর্জ লুইস বর্জেসের কাছে এত ঋণী যে তাঁর প্রতি প্রত্যেকটা শ্রদ্ধা নিবেদনের ফিরিস্তি করাও দুষ্কর হয়ে পড়ে। তবুও, রোজ নিজ সত্ত্বায় পূর্ণাঙ্গ এবং আনন্দদায়ক একটা উপন্যাস—বিংশ শতাব্দির সর্বোৎকৃষ্ট উপন্যাসগুলোর একটা। প্রকাশের কয়েক বছর পরেই সিন কনারি এবং ক্রিস্টিয়ান স্লেটার একটা চলচ্চিত্রও তৈরি করেছেন উপন্যাসের কাহিনি অবলম্বনে। ১৯৮৯-তে একো প্রকাশ করেন Foucault’s Pendulum, কন্সপাইরেসি থিওরি কল্পকাহিনির উৎকৃষ্টার চূড়ান্ত, এবং আমার নিজের সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর একটা। এই বই আমার কাছে এত বিরাট এবং সর্বব্যাপী ছিল এবং বইটা প্রথমবার পড়তে নেয়ার সময়টাও এত উপযোগী ছিল যে, আমি জানি না গুহ্যবিদ্যা, গুপ্ত দল এবং জীবনের গূঢ়তত্বের অনুসন্ধানের প্রতি আমার জীবনভর মুগ্ধ-আকর্ষণ এই বই থেকেই জন্মেছিল নাকি আমার পছন্দের প্রত্যেকটা বিষয় এই বইয়েতে পেয়েছিলাম দেখেই বইটাকে এত মনে প্রাণে ভালোবেসেছি। এই কাজটা একো খুবই ভালো পারেন, অর্থ এবং যুক্তির সন্ধানে ঘুরে চলার যন্ত্রণায় কাতর চরিত্রগুলোকে তুলে আনা, যেমন তিনি পেন্ডুলাম-এ করেছিলেন তেমনই আবার করলেন The Mysterious Flame of Queen Loana (2005)-য় এক স্মৃতিভ্রষ্ট ব্যক্তির আবার নিজের আত্মপরিচয় তৈরির প্রচেষ্টার গল্প লিখে। 

তার ৮৪ তম জন্মদিনের কয়েক মাস আগ থেকে মার্কিন দেশে (Houghton Mifflin Harcourt) পাওয়া যাচ্ছে একোর সর্বশেষ বই,  Numero Zero. এই বই যন্ত্রণাটাকে তুলে ধরে আবারও ভিন্ন একটা দিক থেকে, যেখানে একজন ব্যর্থ খবরের কাগজ বিক্রেতার পরিচয় ঘটে একটা কানাঘুষার সাথে, ইতালিয়ান রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ খাটায় এমন এক গুপ্ত দলের বিষয়ে কানাঘুষা, মানে আরকি, আমার পছন্দের পছন্দের বিষয়াদি। এই সব বিষয়াদির অর্থ জানার আশায়, জুন মাসে, মিলানে একোর গোলকধাঁধার মতন বাড়ির ফোন নাম্বারে একটা কল দিলাম। যে বাড়িতে তিনি থাকেন এবং তার পঞ্চাশ হাজারের বেশি বইয়ের লাইব্রেরিতে বসে কাজ করেন।

ক্রিস ওয়ালেস : গত মাসে মিলানে ছিলাম সময়, ফুকোর পেন্ডুলামের চরিত্রগুলো যে প্রকাশনী ভবনে কাজ করে সেই ভবনটা খুঁজতে তাদেরই মতন হন্যে হয়ে ছোটাছুটি করেছি। কিন্তু হায় … [দুজনেই হাসল]

উমবের্তো একো : ভবনটার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। আমি ঠিকানাটা বানিয়ে লিখেছি। 

ওয়ালেস : নিউমেরো জিরো-তে একটা লাইন আছে : ‘জানার গণ্ডির সাথে সাথে অসামঞ্জস্যের গণ্ডিও বাড়ে।’ আর কোলনাকে দেখে মনে হয় সে এ ধরনের অতি-নিরীক্ষিত জীবনযাপন করার অশান্তিতে ভুগছে। মানে, লোকটা নিজেকে মজা করে ব্যর্থ বলে বেড়াছে। আপনার প্রত্যেকটা লেখার মধ্যে এই ধারাটা চলমান, যাপিত জীবন দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন বা লেখাপড়া জীবনের মূল্য শোধ করতে হয়। এই ধারাটা লোয়ানা-তে সবচেয়ে প্রকট রূপে চোখে পড়ে। 

একো : আলবৎ। কলোনার ক্ষেত্রে, আমি চেষ্টা করছিলাম জীবনে চরম রকমের ব্যর্থ একটা চরিত্র তুলে আনতে, যে বাস্তব জীবনের চেয়ে নিজের কল্পনা করা কাহিনিতে ডুবে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। আর আপনার প্রশ্ন শোনার পর মনে হচ্ছে ফুকোর পেন্ডুলাম-এর চরিত্রগুলোও আসলে বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে নিজেদের কল্পনার মধ্যে ডুবে যাওয়া একদল বুদ্ধিজীবী। 

ওয়ালেস : হ্যাঁ, আসলেই। তাই তো আমার নিজেকে তাদেরই একজন মনে হয়।

একো : যেটা আমার মাথা ব্যাথার কোনো কারণ না! [দুজনেই হাসলেন] ঠিক যেমন আমি, কন্সপাইরেসি আর প্যারানয়েড (ভয়-বাতিক) চরিত্র নিয়ে গল্প লিখি অথচ, বাস্তবে, আমি নিজে খুবই যুক্তিবাদী লোক। আমি আমার সারা জীবন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সাথে যুক্ত থেকেছি, ফলে বাস্তবতার মুখোমুখি থাকতে হয়েছে। ‘Madame Bovary c’est moi.‘ ফ্লাউবার্টের বলা এই কথাটা মাঝে মাঝে সত্য থাকে না। মাঝে মাঝে আমার লেখা চরিত্রগুলা আমার চরিত্র না।

ওয়ালেস : তো বাস্তবে ফুকোর পেন্ডুলামের চরিত্ররা আপনার এই গ্রামের বাড়িটাতে বসে তান্ত্রিক ক্রিয়াগুলো করেনি। লোয়ানার ইয়াম্বো এই বাড়িতে তার কমিক বইগুলো রাখেনি। সৃষ্টি করার স্বাধীনতা আপনার আছে, যদিও আমার মত পাঠকেরা আপনার সব লেখার মধ্যে আত্মজীবনী পড়ার চেষ্টা করে। কথাটা বলে মনে হচ্ছে, নিউমেরো জিরোতে আপনি খবরের কাগজ আর মিডিয়াকে কটাক্ষ করে বেশ মজা পেয়েছেন। যেটা আপনার বহুদিনের শখ ছিল। বইয়ের এক জায়গায় সম্পাদকদের একজন যেন কিছুটা কথাচ্ছলেই জিজ্ঞেস করেছিল, ”খবরের কাগজ কি ট্রেন্ড ফলো করে নাকি ট্রেন্ড তৈরি করে?” প্রশ্নটা বুঝিয়ে দিচ্ছে আমাদের ঘটনাপ্রবাহ বোঝার ধারা নিয়ন্ত্রণ করে খবরের কাগজ। 

একো : একদম। আপনি তো জানেন, আমি বহু বছর ধরে পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে আসছি, পত্র-পত্রিকার আভ্যন্তরীন ব্যাপারগুলো আমার জানা আছে। সুতরাং খবরের কাগজের সমালোচনা চর্চার অভ্যাসও আমার বহুদিনের। একটা সময় সিদ্ধান্ত নিলাম সমালোচনা চর্চাকে উপন্যাসে রূপ দেব। খবরের কাগজের সমস্যাগুলোর মধ্যে যে সমস্যাটা নিয়ে সব সময়ই কথা বলেছি সেটা হলো ঘটনা এবং মতামতের মধ্যে ফারাক রাখার প্রতি অনিহা। খবরের কাগজ প্রত্যেকটা ঘটনাকে একটা মতামতের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। কোনো একটা দৃষ্টিকোণ প্রতিষ্ঠা না করে নিরপেক্ষভাবে ঘটনা উপস্থাপন করা অসম্ভব। এ কথা মাথায় রেখে দেখা যায়, খবরের কাগজ স্বভাবতই পাঠকের অভিমতটা তৈরি করে দেয়। হ্যাঁ, খবরের কাগজ চাপের কাছে, পাঠকের বাসনার কাছে নমনীয় হতে পারে। যেমন ইংরেজি সান্ধ্য পত্রিকাগুলোর কথাই ধরা যাক—শুধুমাত্র রাজপরিবারের কানাঘুষা নিয়ে পড়ে থাকার সময় পত্রিকাগুলো পাঠকের বাসনার কাছে নমনীয় হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বস্তুনিষ্ঠ, গম্ভীর পত্রিকাটাও নির্ধারণ করে দেয় পাঠক কিভাবে চিন্তা করতে পারে বা করবে। এটা অনিবার্য। 

ওয়ালেস : হ্যাঁ, কথাটা শুনে মনে পড়লো, আপনি প্রায়শই লেখা পাঠান এমন একটা ম্যাগাজিন L’Espresso, ইদানীং জলবায়ুর পরিবর্তন বিষয়ে পোপের বক্তব্য প্রকাশ করে। এই বক্তব্য জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছে—যদিও আমি ঠিক নিশ্চিত না এখানে লেজটা কুকুরটাকে নাড়াচ্ছে নাকি কুকুর লেজ নাড়াচ্ছে। যাই হোক, নিউমেরো জিরোর মূল অবলম্বন হলো এভাবে বাইরে থেকে আমাদের ঘটনাপ্রবাহ বোঝার ধরন, চিন্তা করার ধরন সাজিয়ে দেওয়া। আর আপনার ননফিকশন সহ অনেক লেখাতেই আপনি আমাদেরকে এমন একটা সমাজ হিসেবে দেখিয়েছেন যে সমাজ অনবরত ইতিহাস নতুন করে সাজিয়ে লিখছে, যাচাই করছে, উল্টে দিচ্ছে—ঠিক যেমন নিউমেরো জিরোতে ব্রাগাদোচিও চরিত্রটা মুসোলিনির ইতিহাস পাল্টে লিখছে। আমরা সারাক্ষণই বলতে গেলে ইতিহাস পাল্টাচ্ছি, হালনাগাদ করছি, মার্জিনে টিকা লিখছি। একই কাজ আমাদের নিজের সত্ত্বার সাথেও করছি। আমরা স্বপ্নের তাবির করার মতো করে আমাদের স্মৃতিগুলোর নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে বদলে নিই। 

একো : ভয়-বাতিকে আক্রান্ত লোকের কন্সপাইরেসি গড়ে তোলার ব্যাপারটা আমাকে সব সময়ই দারুনভাবে আকৃষ্ট করে। যৌক্তিক অনুসন্ধানী আকর্ষণ। ফুকোর পেন্ডুলাম এ ধরনের লোকের একটা বিভৎস উদাহরণ, অন্যদিকে ড্যান ব্রাউনের দ্য ভিঞ্চি কোড তাদেরকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছে। আমি একবার বলেও ছিলাম, ড্যান ব্রাউন ফুকোর পেন্ডুলামের একটা চরিত্র। [হাসি] যাক গে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি সব সময়ই এ ধরনের সাংস্কৃতিক বাতিকের বিরুদ্ধে লিখেছি। আপনার কথাটা ঠিক, আমরা সারাক্ষণ ইতিহাস ঢেলে সাজাচ্ছি। আমাদের স্মৃতি হলো অতিতের ব্যাখ্যাত্মক পুনঃসংস্কার, একই ভাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও। কিন্তু আমার তৈরি চরিত্রগুলোই ইতিহাস পাল্টে লিখেছে। [দুজনেই হাসলেন] আমি চেয়েছিলাম ঠিক করে লিখতে। 

ওয়ালেস : আপনার কি মনে হয়, আমরা এ ধরনের কন্সপাইরেসি থিওরির মোহে কেন পড়ি? এই মানসিক অশান্তির যুগে আমাদের স্নায়ুবৈকল্য যেন থিওরিগুলোকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে।

একো : হ্যাঁ হ্যাঁ, ইন্টারনেটে ঢুকলেই এ ধরনের নানান জিনিস আপনার সামনে আসতে থাকবে। মানে বিষয়টা এখন একপ্রকার সামাজিক রোগে পরিণত হয়ে গেছে। জানেন তো, ষাট সত্তর বছর আগে, এক মহৎ দার্শনিক কার্ল পপার কন্সপাইরেসি থিওরিগুলো নিয়ে এক ব্যাপক সাড়া জাগানো প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটা দেখিয়েছিল, প্রতিটা কন্সপাইরেসিই দায়িত্ব ছেড়ে পালানোর একটা উপায়। এই সামাজিক ব্যাধিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাধি, যার বরাতে আমরা বাস্তবতার সামনাসামনি হওয়া এড়াতে পারি এবং একই সাথে আমাদের দায়িত্বগুলোও এড়াতে পারি। একটা খুবই সোজাসাপ্টা উদারহণ দিয়ে বোঝাই : শনিবার বিকেলে ধরুন গাড়ি নিয়ে হাইওয়েতে গেলাম, গিয়ে দেখলাম মারাত্মক যানজট। মনে মনে বলি, “এসবের জন্য দায়ী কে?” দায়ী আমি এবং আমার মতন প্রত্যেকটা মাথামোটা যে শনিবার বিকেলে গাড়ি নিয়ে হাইওয়েতে যায়। কিন্তু দায় এড়ানোর জন্য কোনো একটা লোকের কথা কল্পনা করি যে এর জন্য দায়ী। কন্সপাইরেসি আর কন্সপাইরেসির প্রত্যেকটা থিওরি বানোয়াটের কলের এক একটা কবজা। আর আমি আমার লেখালেখির মাধ্যমে, তাত্বিকের পাশাপাশি গল্পগুলোর মাধ্যমেও, বানোয়াটের কারখানার সাথে জড়িত আছি। আমার দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহে একমাত্র যে বই সত্য বলে না সেগুলোই জায়গা পেয়েছে। [হাসি] এগুলো বানোয়াট। যেমন আমার কাছে গ্যালিলিওর বই নেই কারণ তিনি সত্য বলে গেছেন। কিন্তু আমার কাছে টলেমির বই আছে কারণ তার সব কথা ভুল। আমি বানোয়াট আর ভাওতার ব্যাপারে সব সময় আগ্রহী কারণ দার্শনিক হিসাবে আমি সত্যের অনুসন্ধানের প্রতি আগ্রহী। কিন্তু সত্য প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন। প্রায়শই যা মিথ্যা তা প্রতিষ্ঠা করা অপেক্ষাকৃত সহজ। এবং মিথ্যার ভেতর দিয়ে গিয়েই সত্যের সম্বন্ধে কোনোকিছু উপলব্ধি করা সম্ভব—কথাটা একটা দার্শনিক উক্তি, আপনার যেভাবে নিতে ভালো লাগে নিন। 

ওয়ালেস : আমার মনে হচ্ছে আপনি সৌন্দর্যকেও একইভাবে বর্ণনা করেছিলেন; যে, কদর্যতার বর্ণনা করা সৌন্দর্যের বর্ণনা করার চেয়ে প্রায় সহজ। 

একো : হু, এর একমাত্র কারণ হলো সৌন্দর্যের তুলনায় কদর্যতা বেশি উদ্ভবনী শক্তিসম্পন্ন। [হাসি] সৌন্দর্য সব সময় কোনো না কোনো ঘরানার মধ্যে থাকে। আমার মতে কদর্যতা সৌন্দর্যের তুলনায় বেশি সম্মোহনী।

ওয়ালেস : আপনার লেখাগুলোর মধ্যে কন্সপাইরেসিগুলো চালনার পেছনে যে যে গুপ্ত দল দায়ী বা যাদেরকে দায়ী ভাবা হয় তারাও আমাকে খুব আকর্ষণ করে—প্রায় অনেকটা বর্জেস বা কুব্রিকের গুপ্ত দলগুলোর মতই। প্রত্যেকটা গুপ্ত দল, অন্তত গল্পের বইয়েতে তাদের যেভাবে দেখানো হয়, আমার কছে চিত্তাকর্ষক লাগে, হয়তো এমন বাছাইকৃত কিছু মানুষের দলে থাকতে পারার একটা আকাঙ্ক্ষা মনের মধ্যে থাকেই, যাদের হাতে জীবনযাপনের ব্যাপারে গোপন কোনো বিদ্যা আছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমি তাদের ধারে কাছেও ঘেঁষতে চাইব না। 

একো : শুনুন, কন্সপাইরেসির মতোই গুপ্ত দলেরও অস্তিত্ব আছে। জুলিয়াস সিজারকে হত্যার জন্য একটা কন্সপাইরেসি করা হয়েছিল। উনিশ শতকে অনেক অনেক গুপ্ত দল তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একমাত্র সমস্যা হলো, এগুলো যখন জীবিত থাকে তখন কিছু সময় যেতেই ফাঁস হয়ে পড়ে। কখনো সফল হয়, যেমন জুলিয়াস সিজারের বিরুদ্ধে করা কন্সপাইরেসিটা, ফলে ফাঁস হয়ে যায়, অথবা ব্যর্থ হয়, যেমন তৃতীয় নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে, ফলে ফাঁস হয়ে যায়। গুপ্ত দলের বেলাতেও একই। আমরা জানি, ইতালিতে মি. লিচিও গেলির দ্বারা পরিচালিত একটা গুপ্ত দল ছিল যারা ইতালিয়ান রাজনীতির অনেক ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু আসল সমস্যা হলো যখন এধরনের কোনো দল না থাকতেও আমরা তাদের কল্পনা করে নিই। যেমন ধরুন, বিল্ডারবার্গ গ্রুপ [উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের সামাজিক, রাজনৈতিক, এবং অর্থনৈতিক নেত্রীবৃন্দের একটি দল] এবং তাদের বার্ষিক বৈঠক নিয়ে ইন্টারনেটে অনেক নিবন্ধ এবং সাইট পাবেন, যেগুলো কোনো গোপন বিষয়ই না। মানুষ সেখানে গিয়ে দেখা-সাক্ষাৎ করে। কথা বলে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ডেভোসে গিয়েই, কি জানি, ধরুন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সাথে গোপন শলা করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। তারা টেলিফোনের মাধ্যমেই করে ফেলে। মানুষ ভাবে এই দলগুলো পৃথিবীর নিয়তি নির্ধারণ করছে। কিন্তু গুপ্তদল এবং কন্সপাইরেসি কল্পনা করা আসলে সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনের ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করার উপায়। কারণ তখন বলতে পারা যায়, “কি জানি তারা কারা। না বুঝে তো কিছু করার উপায় নেই।” সুতরাং মানুষকে রাজনীতির বাইরে রাখার এটা একটা উপায়। 

ওয়ালেস : খুবই নিরর্থকতাবাদি, অদৃষ্টবাদি। বলতে গেলে, কোনো গুপ্ত দল সবচেয়ে মারাত্মক যেই কৌশলটা খাটাতে পারে তা হলো মানুষকে এধরনের গুপ্তদলের অস্তিত্বতে বিশ্বাস করানো, যাতে সবাই নিজেদের দুর্বল ভাবে আর নিস্পৃহ অনুভব করে। আপনার কাছে জর্জ লুইস বর্জেস কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

একো : ভীষণ রকমের। আমার ওপর দুইজন লেখকের প্রভাব স্পষ্ট। একজন হলেন জয়স, যাঁকে নিয়ে একটা বইও লিখেছি, আরেকজন হলেন বর্জেস, যাঁকে আমি খুব সম্মান করি। বছর দশেক আগে স্পেনে আমার ও বর্জেসের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে একটা আলোচনা সভা হয়েছিল। বর্জেসের বৌ মারিয়া কোদামাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বর্জেস আমার ওপর গভীর ছাপ ফেলেছেন।

ওয়ালেস : আপনার অভুতপূর্ব স্মৃতিশক্তির কথা সবাই জানে। আপনার প্রচার করা স্মৃতির প্রাসাদের ধারণাটা আমাকে বরাবরই হতবাক করে। ভাবটা এমন, আমার যেন এত কিছু মনে থাকে যে সব ক’টাকে রাখতে এক বিরাট প্রাসাদের দরকার আছে। কিন্তু হতে পারে, অতীতে মানুষের স্মৃতিশক্তি আমাদের এখনকার তুলনায় অনেক অনেক গুণ প্রখর ছিল। এমনকি ইতিহাসে এমন লোকের পরিচয়ও পাওয়া যায় যারা তাদের সময়কার সকল জ্ঞান স্মৃতিতে ধারণ করতেন। আপনিও কি তাদের মতো? বর্তমানে আপনার স্মৃতিশক্তির অবস্থা কেমন?

একো : শুনুন, আমার স্মৃতিশক্তি ভালো। কিন্তু আমার যদি খারাপ স্মৃতিশক্তিও থাকত তবুও আমি স্মৃতির বিষয়ে আগ্রহী থাকতাম কারণ, আমার বিশ্বাস স্মৃতিই আমাদের সত্ত্বা। স্মৃতি যদি পুরোপুরি লোপ পায় তাহলে তখন সত্ত্বাও থাকে না। ঠিক এই বিষয়টাই ইদানীং আমাকে খুব ধাক্কা দেয়—এই যে পুরো গ্রহব্যাপী স্মৃতির দুর্ভিক্ষ, বিশেষত নবীনদের মধ্যে। কারণ আমাদের সময়কার মানুষ তাদের জন্মের ৫০ বছর আগেও কি ঘটেছিল তা বেশ ভালোভাবেই জানতো। আমি এখনকার কুইজ প্রোগ্রামগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখি, কারণ কুইজগুলো বর্তমান প্রজন্মের স্মৃতির পরিধির উৎকৃষ্ট উদাহরণ—এদের জন্মের পরের ঘটনাগুলো এরা ভালোই মনে রেখেছে কিন্তু জন্মের আগের কিছুই জানে না। কিছু ক্ষেত্রে তো জন্মের পরের ঘটনাও ভুলে যায়। আমার কাছে এটা একপ্রকার চিরন্তন বর্তমানে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতন মনে হয়। সম্ভবত এর পেছনে ইন্টারনেটের একটা ভূমিকা রয়েছে কারণ ইন্টারনেট এক চিরন্তন বর্তমানই দেখায় শুধু। একথা সত্য যে, ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে, ইন্টারনেট ব্যবহার করেও অতীতকে তুলে আনা যায়। কিন্তু কাজটা করার জন্য অনুসন্ধানী প্রতিভার অধিকারী হতে হবে। অপর দিকে, দেখা যায়, চিরন্তন বর্তমানের ভেতর লোকজন স্মৃতি হারিয়ে চলেছে। আমি একবার একটা প্রবন্ধ লিখে দেখিয়েছিলাম, উনিশ শতকে আফগানিস্তানে রাশিয়ান আর বৃটিশদের অবস্থার নথিপত্র পড়ে থাকলে একুশ শতকে এসে বুশ যা যা করলো এর কোনোটাই করত না। এই অঞ্চল শাসন করা কতটা দুঃসাধ্য তা তার বুঝতে বাকি থাকতো না। সে নথিগুলো পড়ে নি খুব সম্ভবত। [হাসি] সুতরাং রাজনীতিতেও আমরা এধরনের স্মৃতির ঘাটতি দেখতে পাই। কিন্তু হিটলারের ক্ষেত্রেও, সে যদি রাশিয়া আক্রমণ করতে গিয়ে নেপোলিয়নের কি দশা হয়েছিল সেদিকে একটু মনোযোগ দিতো তাহলে এত সহজে রাশিয়ায় আক্রমণ করে বসতো না। যাক গে, দেখা গেল সব যুগেই মানুষের স্মৃতিভ্রম হয়। কিন্তু আমার মনে হয়, এই যুগে স্মৃতিভ্রম মহামারিতে রূপ নিয়েছে, তাই আমি স্মৃতি নিয়ে এত ব্যস্ত। আমার নাতি-নাতনিদের অবস্থার দিকে খেয়াল রাখি, তারা কি ভালো স্কুলে যেতে পারলো কিনা, আবার, তাদের জন্মের আগের ঘটনাবলি নিয়ে সামান্য ধরণাও কি তাদের আছে কি না, দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু আরো একটা কারণে আমি স্মৃতির বিষয়ে আগ্রহী। আমার দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রহের মধ্যে তথাকথিত স্মৃতিকৌশলের কতগুলো নির্দেশিকা রয়েছে, যেগুলো রেনেসাঁ, বারোক পিরিয়ড ইত্যাদি সময়কালে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ওয়ালেস : স্মৃতি, বলতে গেলে, আমাদের সত্ত্বাই, আপনার এই কথাটা ভাববার বিষয়। ইদানীং অনলাইনে মানুষের নিজের এভাটার বানানোর ধরনটা আমার কাছে বিষ্ময়কর লাগে। বলতে গেলে, তারা পৃথিবীর সামনে নিজের সত্ত্বাকে তুলে ধরার বদলে একটা প্রতীক তুলে ধরছে, আর নিজের ব্যক্তিত্বকে একটা ব্র্যান্ডে রূপান্তরিত করছে। জানেন তো কোন বিষয়টা নিয়ে কথাগুলো বলছি—মানুষ যে নিজের ব্যক্তিত্বের পাটে অভিনয় করছে? 

একো : লোক দেখানো?

ওয়ালেস : হুম, বলা যায়। তারা পৃথিবীর সামনে যে ব্যক্তিত্বটা তুলে ধরা সেটা একপ্রকার লোগো বা এভাটার। 

একো : এক পোলিশ মনস্তত্ববিদ আছেন, জিগমুন্ট বাউমান, যিনি তরল সমাজ বলে একটা বেশ যৌক্তিক তত্ত্ব প্রবর্তন করেছেন। আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যে সমাজ অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র বা জাতির ধারণাটা হারিয়ে ফেলেছে। ইতালির বড় পার্টিগুলো—যেমন খ্রিষ্টান ডেমোক্রেট, কমিউনিস্ট পার্টি— বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সমাজিক জীবনের অক্ষ বলতে কিছু নেই। ফলে এমন প্রসঙ্গ কাঠামো বিচ্যুত এক একটা মানুষের কাছে একমাত্র সমাধান হলো টিভির পর্দায় যাওয়া। টিভির পর্দায় গিয়ে নিজের বৌয়ের পরকিয়ার কথা পর্যন্ত বলতে রাজি, টিভিতে যেতে পারলেই হলো। [দুজনেই হাসলেন] আগে একটা সময় মানুষ যে কথাগুলো লজ্জাভরে গোপন রাখতো সেগুলো এখন জনসম্মুখে বলে বেড়ায়। প্রত্যেকটা ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার, মূলত এধরনের লোকের দ্বারাই তৈরি যারা বানোয়াট হলেও নিজেদের ব্যক্তিগত ঘটনাবলি দেখিয়ে বেড়াতে চায়, নিজে যেমন নয় তেমন দেখাতে চায়, অন্য একটা ব্যক্তিত্ব দাঁড় করাতে চায়, যে চেষ্টার ফল হলো তাদের আপন সত্ত্বাকেই হারিয়ে ফেলা।

ওয়ালেস : আপনার অনলাইন উপস্থিতি আছে কি? টুইটারে যান? আপনার মিডিয়া ডায়েট কেমন?

একো : না, না। আমি কাগজের সেকেলে খরিদ্দার। আমি প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজ না পড়ে থাকতে পারি না। আমি খবর, কুইজ শো, টুকটাক ভালো সিনেমার জন্য টিভি দেখি। আমি ফেসবুক বা টুইটারে নেই, কারণ আমার জীবনের লক্ষ্য হলো মেসেজ এড়ানো। পুরা দুনিয়া থেকে আমি প্রচুর মেসেজ পাই, তাই চেষ্টা করি এড়িয়ে চলতে। আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করি, ইমেইলের জন্য আরকি, যখন দরকার পড়ে। মাঝে মাঝে মানুষের আবিষ্কারগুলোর কি হয় না হয় দেখার জন্য টুইটার, ব্লগ, ইত্যাদিতে ঢুঁ মারি। ইদানীং এক প্রেস কনফারেন্সে আমাকে ইন্টারনেট সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, যেহেতু পৃথিবীতে এখন সাত শ কোটি মানুষ আছে, সুতরাং সেই অনুপাতে গর্দভের জোগানও যথেষ্ট আছে, বুঝলেন। [ওয়ালেস হাসলেন] আগেকার দিনে এই লোকগুলো কেবল মাত্র তাদের বন্ধুবান্ধবের সামনে বা দুই তিন গ্লাস গেলার পর বারের জনাকয়েকের সামনে সঙবাজিটা করতে পারতো, যত রকমের ফালতু কথা বলা যায় বলতো আর লোকজনও হাসতো। এখন তারা ইন্টারনেটে গিয়ে এসব করার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে, ইন্টারনেটে অনেক ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ লোক —খোদ পোপও টুইটারে বার্তা লিখেন— এদের পাশাপাশি বিরাট সংখ্যায় গর্দভও পাওয়া যায়। ইন্টারনেট ব্যবহারের বড় একটা সমস্যা হলো তথ্যগুলোকে ছাঁকা, অপ্রাসঙ্গিক বা ফালতু অংশ বাদ দিয়ে দরকারি তথ্যটুকু নেয়া। কিন্তু আমার এ কথার ফলে ইতালি খবরের কাগজগুলোতে কি বিদ্রোহ চলেছিল আপনার ধারণার বাইরে। 

ওয়ালেস : কনফেডারেট পতাকার প্রতি আমাদের ইদানীং নতুন করে বাড়তি মনোযোগ এবং প্রতীকের ক্ষমতা নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করতে চাচ্ছি। চার্লস্টনে গোলাগুলির ঘটনার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিক্রিয়া কিছু অংশে কনফেডারেট পতাকা নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, দক্ষিণ ক্যারোলাইনার স্টেট হাউজের মাটিতে যেটা উড়ছে—একটা প্রতীককে প্রতিহত করার প্রতীকী চেষ্টা।

একো : কিন্তু জানেন তো, সারা পৃথিবী জুড়েই বর্ণবাদ কিছু পরিমাণে রয়ে গেছে। বিষয়টা হলো, আপনি একটা বৈশ্বিক সমাজে বাস করছেন, ফলে মানুষজন এখান থেকে ওখানে যাচ্ছে, মানুষে মানুষে সাক্ষাৎ হচ্ছে। এই মুহূর্তে সমুদ্র পথে শ’য়ে শ’য়ে আফ্রিকান লোক ইতালির মাটিতে পা রাখছে। ফলে আমাদের দেশে এখন বর্ণবাদীদের একটা পূনর্জাগরণ দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে সব সময়ই ভেতর ভেতর বর্ণবাদের একটা ধারা বয়ে এসেছে। আপনার দেশে আরো একটা সমস্যা হলো, আপনাদের হাতে হাতে প্রচুর বন্দুক। এখানে কারো মাথা খারাপ হলে সর্বোচ্চ গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ মারার চেষ্টা করতে পারে। [দুজনই হাসল] চার্চের ভেতর এতগুলো মানুষ মেরে ফেলা যুবকটার ক্ষেত্রে, তার বাবা-ই খুব সম্ভবত জন্মদিনের উপহার হিসেবে বন্দুকটা দিয়েছিল। সুতরাং এই অভূতপূর্ব সমস্যাটা আপনার দেশে আছে।

ওয়ালেস : এখানে যুক্তরাষ্ট্রে অনেকে আপনাকে যে কারণে চেনে, আমাদের চোখে যা উচ্চ এবং নিম্নমার্গের সংস্কৃতি, এই দুই ধারাকে আপনি একসাথে মিশিয়ে দেন। থমাস একুইনাসের সাথে কমিক বই, এরিস্টোটলের সঙ্গে দ্য কাউন্ট অব মন্তে ক্রিস্তো; সব একই পৃষ্ঠার মধ্যে পাশাপাশি অবস্থান করে। এবং পাশাপাশি অবস্থানে খুব প্রাণোচ্ছল। আমার মনে হয় একটা সংস্কৃতি হিসেবে আমরা এখন এধরনের খিচুড়ি রান্নার অবস্থানে পৌঁছেছি। 

একো : জানেন তো, আমার লেখা Apocalittici e integrati বইটার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন চলছে। ‘৬৪তে বইটা প্রকাশ করি, গত বছর উদযাপন চলেছে, কিন্তু এই মাত্র প্রচুর আলোচনা সমেত বইটা হাতে পেলাম। হ্যাঁ, আমি অবশ্যই চলতি ধারার সংস্কৃতিতে আগ্রহী প্রথম ব্যক্তি নই। আমি সুপারম্যান, চার্লি ব্রাউন, আরো অনেককে নিয়েই লেখালেখি করেছি। আমি বরাবরই জনপ্রিয় সাহিত্য, কাউন্ট অব মন্তে ক্রিস্তো, ইত্যাদির বাইরে আরো কম দরের সাহিত্যের প্রতিও আগ্রহী ছিলাম। একবার বলেছিলাম, বয়স পঞ্চাশের কোটা পেরিয়ে গেলে বর্তমানের আগ্রহ ছেড়ে এলিজাবেথান কবিদের নিয়ে লেখালেখি করা উচিত। আমি কখনো এলিজাবেথান কবিদের নিয়ে লিখিনি, কিন্তু আমি বলবো, আমার ছাত্ররা, কম বয়েসিরা, বর্তমানের ঘটনাবলি বুঝতে বেশি পারদর্শী। আর বয়স বাড়লে পরে যে বিষয়ের ওপর আমার তাদের চেয়ে ভালো জ্ঞান আছে শুধু সেগুলো নিয়ে কথা বলাই শ্রেয়। তাই আমি নতুন প্রকাশিত কমিক বইয়ে কি ঘটছে না ঘটছে তা নিয়ে বেশি খোঁজ রাখি না, আমার কাছে এগুলো বেশিই কঠিন লাগে। [হাসি] আমি জনপ্রিয় সাহিত্য নিয়ে খোঁজখবর রাখি নিজের ভালোলাগা থেকে। রাতে ঘুমুতে না পারলে গোয়েন্দা কাহিনি পড়ি, সব সুস্থ মানুষ যেমন পড়ে। ’৬০ এর দশকে উচ্চমার্গীয় সংস্কৃতির জন্য বরাদ্দকৃত বিশ্লেষণী পদ্ধতি ব্যবহার করে পপ কালচারের ওপর কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম। হয়ে গেল কেলেঙ্কারি। অনেকে বলা ‍শুরু করলো, “ডিভাইন কমেডি মাপার পাল্লায় কিভাবে ‍সুপারম্যানকে মাপতে পারলো?” আমি উত্তরে বলেছিলাম, কোনো অনুসন্ধানের মান অনুসন্ধানের বস্তু না, অনুসন্ধানের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারা হলো আসল। তখন তা-ই করেছিলাম, অনেকের চোখে যা ফেলনা ছিল সেগুলোকে সঠিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা। 

ওয়ালেস : আপনি তখন লিখেছিলেন, সুপারম্যান হলো নব্য ধর্ম, এবং আমেরিকাতে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় পুরাণ—ডিসি এবং মার্ভেল ইউনিভার্সগুলোও। কথাগুলো খুবই উমবের্তো একো সুলভ। আমাদের পছন্দের ব্র্যান্ডগুলোর পতাকা ওড়ানোর ধরন। ১৯৯৪-এ লিখেছিলেন ম্যাক হলো ক্যাথলিক আর আইবিএম প্রটেস্টান্ট, কিন্তু এখন সবগুলো এক একটা কাল্ট, আর সেলিব্রেটিরা আমাদের নতুন দেবতা। 

একো : হ্যাঁ, হ্যাঁ। কিন্তু প্রত্যেক যুগেরই পপ কালচার ছিল। জানেন তো, খুব প্রাচীন একটা রোমান গল্প আছে, কোথাও একটা ট্রেজিডি নাটক চলছিল, তখন খবর পাওয়া গেল এক সার্কাসে ভাল্লুকের নাড়াই হচ্ছে, সাথে সাথে সব দর্শক ট্রেজিডি ছেড়ে ভাল্লুক দেখতে চলে গেল। [দুজনেই হাসলেন] প্রত্যেক সংস্কৃতি ও সভ্যতার বেলাতে এই ব্যাপারটা একই রকম। আমার কাছে এত বেশি দুঃখজনকও লাগে না, কারণ, আমার মনে হয় আপনার দেশে, লোকজন স্রেফ সুপারহিরোদের দেখার জন্যই যাচ্ছে না; বিষয়টা আরো গভীর। আমাদের টিভির পর্দা আবর্জনায় ভর্তি। বার্লুস্কোনি তার দর্শকদের গড় বয়স ১২ বছর ধরে নিয়ে কাজ করতো। 

ওয়ালেস : আপনার প্রত্যেকটা বইয়েই লোকজন ক্যান্টিনাতে যায়, ট্র্যাটোরিয়াতে যায়, কাজ শেষে বারে যায়, গিয়ে জীবন নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, ব্যাপারটা আমার ভালোই লাগে। এই জায়গাগুলোতেই কাহিনির বীজ পোঁতা থাকে, মানুষগুলো বিভ্রান্ত হয়, মাতাল হয়, প্রেমে পড়ে, সম্পর্ক গড়ে ওঠে, মজা করে বা জঘন্য ষড়যন্ত্র পাতে। আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও কি তা-ই? আজকে দিনের কাজ শেষে আপনি কি ছাত্রছাত্রী বা সহকর্মীদের সাথে কোথাও বসতে যাবেন, ওয়াইন খেতে খেতে জিন্স আর রাজনীতি আর পৃথিবীর গোপন নিয়ন্ত্রকদের নিয়ে কথা বলবেন?

একো : হ্যাঁ.. এই বিষয়টা পষ্ট করা দরকার। ইদানীং খাওয়ার অভ্যাস বদলানোর তাগিদে কম বসা হয়। ইউনিভার্সিটি অব বলনিয়েতে পড়াতে আমার বরাবরই ভালো লাগতো কারণ বলনিয়ের সিটি সেন্টারটা খুবই পুরোনো এবং ঐতিহাসিক আর্কেডে ভরা। আর্কেড থাকা মানেই লোকজন, বয়স্কদের পাশাপাশি কম বয়েসিরাও, বৃষ্টি-বাদলার মধ্যেও চলাফেরা করতে পারবে, অনেক রেস্তোরাঁ আর বার থাকবে। ছাত্রছাত্রীরা সেখানে যেতো, আমিও যেতাম। আর আমার ছাত্রছাত্রীদের ডক্টরাল ডেসার্টেশনের ফুট নোটে যখন দেখাতাম অন্য ছাত্রদের ডক্টরাল ডেসার্টেশনের রেফারেন্স দেওয়া অথচ সেগুলোও পুরোপুরি শেষ হয়নি, বিষয়টা আমার ভালো লাগতো। এতে বোঝা যায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে চিন্তা-ভাবনার আদান-প্রাদান হচ্ছে। মধ্যযুগে ইউরোপিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এই একই ঘটনা ঘটেছিল। পানশালায় বসতাম সময় গানও গাওয়া হতো প্রচুর। আমাদের জীবনের অনেকটাই ছিল পানশালাগুলো ঘিরে। এক সাথে থাকা, কথাবার্তা বলা খুবই জরুরি। এখনকার মানুষ যারা বারে যাওয়ার বদলে ইন্টারনেট ঘেঁটে রাত কাবার করে তাদের নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হয়। 

ওয়ালেস : একদম। [হাসি] আমিও এই দলের লোক, যখন বাড়ি থেকে দূরে থাকি, বই পড়ার সুযোগ পাই না। আর আপনার লেখাগুলোয় থাকা দ্বন্দ্বটা বরাবর মনের ওপর ছাপ ফেলে, সুবিবেচনা ও যুক্তিকে প্রতীকের ক্ষমতা, এক প্রকার যাদুর বিপরীতে সহাবস্থান করানো। আর আপনার প্রত্যেকটা চরিত্র আত্মপরিচয় খুঁজছে, নিজের আত্মার গভীরে অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে, দুই জগতের ভারসার্ম ঠিক রাখতে চাইছে। এ কি আপনারই জীবনের গল্প? আপনি কিভাবে অর্থ খুঁজে পান?

একো : উত্তরটা দেওয়া শক্ত কারণ, আমি সারাদিনই খুঁজছি। [হাসি] খবরের কাগজ পড়লে, বই পড়লে, চারপাশের মানুষগুলোকে দেখলে, চেষ্ট করি… বুঝলেন, রোল্যান্ড বার্থস একবার বলেছিলেন যে, সংকেতবিদ, তখন বলা হতো সংকেত বিশারদ, হলেন এমন মানুষ যিনি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অন্যরা যেখানে জিনিসপত্র দেখে, তিনি সেখানে গূঢ় অর্থটা দেখতে পান। এটা খুবই বাস্তব সম্মত মনোভাব—সবকিছুতেই অর্থ দেখতে পাওয়া, সাদামাটা জিনিসগুলোতেও, এবং সেগুলো থেকে জীবনের বড় জিজ্ঞাসাগুলোর উত্তর পাওয়া। পেশাদার দার্শনিক হওয়ার মানে, আমার মতে, ছোট বড় সব জিজ্ঞাসা নিয়ে ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা। এটাই একমাত্র সুখ। [হাসি]

[এই আলাপটি ২রা নভেম্বর ২০১৫ সালে ইন্টারভিউ পত্রিকা প্রকাশিত হয়।]

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *