জীবনের প্রথম লেখাটি লিখেছিলাম তৃতীয় শ্রেণিতে যখন পড়ি। নানাবাড়ি বেড়ানোর নস্টালজিয়া নিয়ে একটি গল্প। আয়তনে ছোট এবং আধখ্যাঁচড়া। আদতে সেটি কোনো গল্পই হয়নি, কিন্তু প্রথম বলে তার প্রেম এখনো প্রাণ আকুল করে। এরপর বছর দুয়েক চুপসে ছিল লেখার ইচ্ছা। পঞ্চম শ্রেণিতে যখন পড়ি, বছরের মাঝামাঝি সময়, মনের নদীতে হঠাৎ উথলে উঠল চোরাস্রোত, প্লাবিত করল আমার লেখকমন। তার গহিনে ভাসিয়ে দিলাম কলমডিঙিটি। রোলটানা খাতায় খেলে যেতে লাগল কবিতার ঢেউ—ছড়ার সুরে, ছন্দের ঝংকারে। তারপর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শুরু হলো নানামাত্রিক রচনার যাত্রা।
তখনো আমার কাছে লেখালিখির ব্যাপারটি ডাংগুলি খেলার মতোই—বালকতায় উচ্ছ্বসিত, প্রফুল্লময়। লিখতে পারলে জেতার মতো আনন্দ হয়, কিন্তু লিখতে না পারলে মন কেমন ভার হয়ে থাকে। মনে হয়, আমি বুঝি দানে হেরে গেলাম। এখন আমাকে কাক হয়ে বয়ে বেড়াতে হবে পরাজয়ের বেদনা। তবে চাল চেলে যদি বাগিয়ে নিতে পারি কোনো দান, ফিরবে সুসময়। আমি উতরে যাব সব বাধা, হয়ে উঠব রাজা। এই ভাবনায় ডুব দিতাম লেখার মগ্নতায়। আর এভাবেই পেয়ে যেতাম প্রতীক্ষিত নার্গিস ফুলটির দেখা। তার শোভা ও সৌরভে মন এমন বিমোহিত হতো—যেন আরব্য রজনীর দিঘল কাহিনির মুগ্ধতা।
প্রথমদিকে ছড়া-কবিতা আর রকমফের গদ্যের শীলন হতো বেশি। এসব দিয়ে স্ফীত হয়ে আছে ডজনখানেক ডায়েরি। প্রতিদিন দুয়েকটি ভাংতি পঙক্তি, খুচরো গদ্য লেখা হতো। এর জন্য বেছে নিতাম ঘুমের আগের সময়টা। রাত যখন নিশুতি হতো, মায়াবী আঁধারে ঢেকে যেত পৃথিবী, তখনই জেগে উঠত লেখার মনন—অপার্থিব আলোর ঝলক নিয়ে। ক্লাসরুমে বসে লিখে যেতাম একটানা—পুরোনো পুথির মতো দীর্ঘ সব লেখা, আর দিনমান পড়ে থাকতাম এর সুন্দরতার পেছনে। এক একটি শব্দ ধরে, বাক্যগুলো নেড়েচেড়ে ঠিকঠাক করতাম। কখনো একটি লেখা কপি করতে গিয়ে ভরে ফেলতাম পুরো খাতা।
লেখালিখির মগ্নতার ভেতর দিয়ে কেটেছে আমার কৈশোরের দিনগুলো। তখন কলম পেয়েছিল ঝরনার গতি। কালির ধারা একবার ছুটলে প্লাবিত হতো কাগজের দিস্তা। চাইলেই লিখতে পারতাম অনায়াসে—অভিনব বিষয়ে, চমৎকার শৈলীতে। ডায়েরিতে লিখতাম গদ্য ও কবিতা, খাতায় গল্প ও উপন্যাসিকা; চিরকুটেও গেঁথে রাখতাম অনুভূতির আলপিন। প্রতিটি লেখা রেখে দিতাম সযতনে—ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা ফুলের তোড়ার মতো। সেই প্রচেষ্টার প্রতীকগুলো এখনো সংরক্ষিত আছে। ছুটিছাটায় বাড়িতে গেলে স্মৃতির তোরঙ্গ খুলে বসি। অক্ষরের আয়নায় দেখি বিগত জীবনের মুখ, হারানো দিনের ছবি।
নতুন পলির ছোঁয়ায় মাটি যেমন উর্বর হয়ে ওঠে, তেমনই সৃজনশীল হয়ে উঠছিল আমার লেখাজোখা। মূলত লেখার মাঝে আমি খুঁজে পেতাম জীবনের আনন্দ, এঁকে রাখতাম যাপনের চিহ্ন। হাসির ছটা, কান্নার বেগ, খুশির দোলা, ব্যথার দান—সব গচ্ছিত রাখতাম লেখার সিন্দুকে। তখনো কৈশোরের উচ্ছলতায় মন কানায় কানায় ভরপুর, কিন্তু লেখার চিন্তা মাথায় এলে হয়ে যেতাম শান্ত দিঘির মতো। সঙ্গতার চেয়ে মৌনতাকে মনে হতো বড় আপন। লেখার সাথে চলত তুমুল প্রেম। মানুষের ভালোবাসায় স্বার্থ থাকে, লেখার ভালোবাসা নিখাদ। কলমের আঁচড়ে ভেঙে যায় অভিমানের অনুস্বার, কাগজের বুকে ভরাট হয় বেদনার বিসর্গ।
শিশু যেমন পিতার অন্তরে ঘুমিয়ে থাকে, তেমনই আমার ভেতরেও অনুভব করি একটি লেখাশিশুকে। আধো ঘুম আধো জাগরণে কাটে তার প্রহর। শিশুটিকে কখনো ঘুমপাড়ানি শোনাই না, আমি চাই সে জেগে থাকুক। মনের উঠানে হেসেখেলে বেড়াক, ভাবনার আকাশে উড়াক ইচ্ছাঘুড়ি। তার জন্য শব্দের ফুল ফোটাই, বাক্যের মালা গাঁথি; প্রতিদিন পালন করি তার জন্মদিন। সে এসে ভরিয়ে দেয় শূন্য বুক, জুড়িয়ে দেয় তৃষিত চোখ। কখনো হঠাৎ করে ঘুমিয়ে পড়ে শিশুটি, তখন তার জন্য গাইতে হয় জাগরণী। দিন কেটে সন্ধ্যা নামে, রাত ফুরিয়ে ভোর আসে—আমি বসে থাকি শিয়রে, সে জাগবে বলে।
লেখালিখি কারও কাছে নেশার মতো, কারও জন্য পেশা; আমার কাছে এর চেয়েও বড় কিছু। কৈশোরের প্রারম্ভ থেকে এই পরিণত বয়সে এসে কখনোই মনে হয়নি—আমি লেখা ছেড়ে দেব। বরং বোধ করি, লেখালিখি নিয়ে আমি জীবনের চেয়েও বেশি সিরিয়াস। শরীরের এত যত্ন নিই না—যত প্রযত্ন দিই লেখার সুষমায়। মানুষের সাথে স্বার্থপরের মতো আচরণ করি—লেখায় নিজেকে সঁপে দেব বলে। কারও আঘাতে যদি ভেঙে পড়ি, তবে লেখার মধ্যে পাই সেরে ওঠার দাওয়াই। আমার কলমের নিব বেয়ে নেমে আসা, কীবোর্ডে স্ফুরণ তুলে ভেসে ওঠা প্রতিটি অক্ষর-যতি, শব্দ-বাক্য থেকে পাই বেঁচে থাকার রসদ।
সব লেখা কি হৃদয়ে দাগ কাটে? সব শব্দ কি মনের উঠোনে এলোমেলো দৌড়ে বেড়ায়? সব লেখা পাঠ শেষে কি তৃপ্ত হয় সাহিত্যে পিপাসার্ত আত্মা? না, তা মোটেই নয়।
কিছু লেখা তো অবশ্যই আছে—যা পড়লে মনে হয়, লেখক যেন স্মৃতির আঙিনা থেকে শব্দ কুড়িয়ে গড়েছেন এক ‘জীবন্ত গদ্য’। ঠিক সেই পথ ধরেই হেঁটে বেড়ানো যায় নিজের জীবনের অতীতে। যেন নিজের স্মৃতিগুলো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে লেখকের কুড়ানো শব্দমালায়। সেই লেখা পাঠ শেষে তৃপ্তির ঢেকুর জানান দেয়—সাহিত্য-তৃষ্ণার্ত অন্তর প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ। সেই লেখাই দাগ কেটে রেখে যায় লেখাপ্রেমীর হৃদয়ে। ঠিক তেমনি ‘এ আমার ব্যথার দান’ লেখাটি ছুঁয়ে গেলো হৃদয়ের পাপড়ি। রেখে গেলো অযাচিত মুগ্ধতার রেশ। লেখকের প্রতি অজস্র দোয়া ও ভালোবাসা, ক্ষুদ্র নগণ্য পাঠকের।
কিছুক্ষণের জন্য স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি। শৈশবের লেখালেখির হাজার দিন-ক্ষণ ভাসছে চোখে। নেশার মত এখনো জিইয়ে আছে লেখার ঝোঁক। তবে আপনার মত সযত্নে লালান করতে পারিনি আমি…