এক আরব বণিকের চোখে বারোশো বছর আগের বাংলাদেশ

আরব বণিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণ

আরব পর্যটকদের পৃথিবী ভ্রমণের ইতিহাস কেবল এক-দুই হাজার বছরের নয়; বরং মানবসভ্যতার সূচনাকাল পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের ভ্রমণের ইতিহাস। তাদের ভ্রমণকাহিনীও কেবল কয়েক শতাব্দীর নয়, বরং দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো তাদের অজেয় যাত্রার মহাকাব্য। গ্রিক-রোমান বা অন্যান্য প্রাচীন জাতির ভ্রমণবৃত্তান্ত পরিষ্কারভাবে পাওয়া না গেলেও প্রায় বারোশো বছর আগের আরব বণিকদের বাংলা ভ্রমণের পাণ্ডুলিপি রয়েছে আমাদের হাতে। তবে যেসব আরব পর্যটক বাংলা ভ্রমণ করেছেন, তাদের মধ্যে আমরা আলোচনা করি কেবল ইবনে বতুতার সফরনামার; আলোচনা করি না হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর ওমানের বণিক নাদর ইবনে মায়মুনের সফরের কথা, যিনি ভারতবর্ষ (বাংলাদেশ) ও চীনের সমুদ্রপথে বাণিজ্য করেছিলেন। আলোচনা করি না ইবনে ওয়াহাব কুরাইশির সফরের কথা, যিনি হিজরি ২৫৭ সালে (৮৭১ খ্রিস্টাব্দ) বাগদাদ থেকে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে চীনে গিয়েছিলেন বাণিজ্য ও ইসলাম প্রচারে। একইভাবে আমাদের আলোচনায় এখনো জায়গা করে নিতে পারেননি ইরাকের বণিক সুলাইমান, যিনি হিজরি ২৩৭ সালে (৮৫১ খ্রিস্টাব্দ) পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করে সুদূর চীনে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে একাধিকবার সফর করেছিলেন এবং সফরনামা লিখেছিলেন। এমন আরও বহু আরব নাবিক ও পর্যটক আছেন, যারা ইতিহাসের ধূসর পাতায় রেখে গেছেন নিজেদের পদচিহ্ন; তবে তাদের লেখাগুলো সেই জনপ্রিয়তা পায়নি, যা ইবনে বতুতার সফরনামা পেয়েছে। এর কারণ সম্ভবত, ইবনে বতুতার সফরনামা তুলনামূলকভাবে পরে রচিত এবং আমাদের নিকট অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাসের পরম্পরায় সংযুক্ত। ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আপন জায়গায় বহাল রেখেও বলা যায়, বারোশো বছর আগের আরব পর্যটক সুলাইমান সিরাফির ভ্রমণবিবরণ আমাদের ইতিহাসের অমূল্য নথি এবং বারোশো বছর আগের বাংলার সমাজজীবনের এক দুর্লভ দলিল।

আরব বণিক সুলাইমান সিরাফি

আমাদের ইতিহাসে সুলাইমান আত-তাজির আস-সিরাফি বা বণিক সুলাইমান সিরাফি প্রথম আরব পর্যটক, যার ভ্রমণকাহিনি আমাদের হাত পর্যন্ত এসেছে। হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমভাগে তিনি পারস্যের ‘সিরাফ’ সমুদ্রবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে সুদূর চীন পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের উপকূলীয় অঞ্চলসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলও ভ্রমণ করেন। তার এই ব্যবসায়িক ভ্রমণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তিনি লিপিবদ্ধ করেন হিজরি ২৩৭ সালে (৮৫১ খ্রিস্টাব্দ), যখন মুসলিম বিশ্বে আব্বাসি খলিফারা এবং বাংলায় পাল রাজারা শাসন করছিলেন। ক্যালেন্ডারের পাতা উড়িয়ে আজ আমরা দাঁড়িয়েছি হিজরি ১৪৪৭ এবং ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে; অর্থাৎ সেই বণিকের বাংলা ভ্রমণের পর কেটে গেছে প্রায় বারো শতাব্দীরও বেশি সময়—হিজরি ক্যালেন্ডারের ১২১০ বছর এবং ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ১১৭৫ বছর।

বণিক সুলাইমান ছিলেন পারস্যের সিরাফ এলাকার অধিবাসী। সিরাফ ছিল তৎকালীন পারস্য উপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর, যা বর্তমান ইরানের বুশেহের জেলার অন্তর্গত। ‘সিরাফ’ শব্দটির মূল ফারসি রূপ ‘শীরাব’। ফারসি ‘শীরাব’ শব্দটি আরবিতে রূপান্তরিত হয়ে ‘সিরাফ’ হয়েছে। আরবরা ফারসি শব্দটির প্রথম ‘শ’ বর্ণকে ‘স’ এবং শেষের ‘ব’ বর্ণকে ‘ফ’ দিয়ে পরিবর্তন করেছে। ফারসি ভাষায় ‘শীর’ মানে দুধ এবং ‘আব’ মানে পানি বা নদী; ফলে ‘শীরাব’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘দুধেল নদী’। এই শব্দটির প্রভাব ভাষাগত বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমাদের বাংলাকেও সমৃদ্ধ করেছে। শীর শব্দটি বাংলায় শীরা বা সিরা রূপে এসে মিষ্টি রসের অর্থ ধারণ করেছে এবং দুধের উপরে গিয়ে ‘সর’ হয়ে বিরাজ করছে। ‘শীর’ শব্দটি সংস্কৃত ভাষায় এসে হয়েছে ‘ক্ষীর’। ক্ষীর মানেও ‘দুধ দিয়ে তৈরি খাবার’। ‘ক্ষ’ অক্ষরটির মূল রূপ হচ্ছে ‘ক+ষ’। সংস্কৃত ভাষায় উভয় অক্ষর উচ্চারিত হলেও বাংলায় এসে ‘খ’ হিসেবে উচ্চারিত হয়। অবশ্য, বাংলায় ‘ক+ষ’ যুক্ত করেও আখ অর্থে ব্যবহৃত হয় ‘কুশের’ শব্দটি। ভারতের আসাম ও বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে প্রবাহিত ‘কুশিয়ারা’ নদীর নামের সঙ্গেও এই ভাষাগত ধারার একটি সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়, যা ফারসি ‘শীরাব’ বা আরবি ‘সিরাফ’ শব্দের বিবর্তিত প্রতিধ্বনি বহন করে। আরবি ভাষায় ‘সিরাফ’ শহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা বিষয়কে বলা হয় ‘সিরাফি’। এই কারণে বণিক সুলাইমানের নামের শেষে ‘সিরাফি’ উপাধি যুক্ত করা হয়।

পারস্যের সেই সিরাফ বন্দরে বসবাস করতেন আরেকজন গ্রন্থপ্রেমিক, নাম আবু জায়েদ সিরাফি। ২৩৭ হিজরিতে রচিত বণিক সুলাইমানের ভ্রমণকাহিনীর একটি পাণ্ডুলিপি তার হস্তগত হয় ২৬৪ হিজরিতে। বণিক সুলাইমানের ভারতবর্ষ ভ্রমণের প্রায় ২৭ বছর পর আবু জায়েদ এই পাণ্ডুলিপি পাঠ করে মুগ্ধ ও সমৃদ্ধ হন। সিরাফ বন্দরে অবস্থানকালে তিনি ভারতবর্ষ ও চীন ভ্রমণকারী আরও কয়েকজন বণিকের সঙ্গে আলাপ করেন এবং তাদের অভিজ্ঞতাও সংগ্রহ করেন। হিজরি ৩০০ সালে (৯১৫ খ্রিস্টাব্দে) বিখ্যাত আরব পর্যটক ও ভূগোলবিদ মাসউদীর (৮৯৬-৯৫৬) সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয় সিরাফে। এসব অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি নিজেও আরেকটি সমৃদ্ধ ভ্রমণবৃত্তান্ত রচনা করেন এবং সুলাইমানের ভ্রমণকাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করেন। এভাবে তিনি একটি যৌথ ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রস্তুত করেন। এই পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠায় ভর করে আমরা ভ্রমণের সুযোগ পাই বারোশো বছর আগের বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে।

রিহলাহ সুলাইমান আত-তাজির আস-সিরাফি

‘রিহলাহ সুলাইমান তাজির আস-সিরাফি’ অর্থ ‘বণিক সুলাইমান সিরাফির ভ্রমণ’। ঐতিহাসিক মাসউদী ও আল-বিরুনীসহ অনেক মনীষী তাদের গ্রন্থে বণিক সুলাইমান সিরাফির বিভিন্ন তথ্য উদ্ধৃত করেছেন। এই ভ্রমণবৃত্তান্তের ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটা প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যুদ্ধসহ বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে আন্দালুস ও উসমানি খেলাফত আমলের বহু দুর্লভ আরবি পাণ্ডুলিপি স্থানান্তরিত হয় প্যারিসের জাতীয় গ্রন্থাগারে। সেখানকার একটি দুর্লভ পাণ্ডুলিপি থেকে ১৭১৮ সালে প্রথম এর ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৮১১ সালে এর মূল আরবি পাণ্ডুলিপি ‘সিলসিলাতুত তাওয়ারিখ’ (ইতিহাসসমূহের ধারাবাহিকতা) নামে প্রকাশিত হয় ফরাসি প্রাচ্যবিদ জোসেফ রেইনোর (১৭৯৫-১৮৬৭) সম্পাদনায়। এই ভ্রমণকাহিনির পাণ্ডুলিপি নিরীক্ষণের প্রথম কৃতিত্ব তারই। তারপর আরেক ফরাসি প্রাচ্যবিদ গ্যাব্রিয়েল ফেরান্দ (১৮৬৪-১৯৩৫) পাণ্ডুলিপিটির পুনঃনিরীক্ষণ করে আরও উন্নত একটি অনুবাদ প্রকাশ করেন, এজন্য তিনিও স্মরণীয়। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে উভয় আরবি সংস্করণ পর্যালোচনা করে, প্রয়োজনীয় টীকা ও ব্যাখ্যা সংযোজনের মাধ্যমে আবুধাবির সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে আরব গবেষক আবদুল্লাহ আল-হাবাশি একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল আরবি সংস্করণ প্রকাশ করেন, এজন্য তিনি সর্বোতভাবে কৃতজ্ঞতার হকদার। এই দীর্ঘ সংরক্ষণ ও সম্পাদনার ধারার মধ্য দিয়ে গ্রন্থটি পরিপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ রূপ লাভ করে। 

এই গ্রন্থে মূলত দুটি অংশ রয়েছে—প্রথমটি বণিক সুলাইমানের ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘রিহলাহ সুলাইমান তাজির’, এবং দ্বিতীয়টি আবু জায়েদ সিরাফির ব্যাখ্যাগ্রন্থ। উল্লেখ্য, আবু জায়েদ নিজে ভ্রমণকারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভ্রমণকাহিনির প্রতি আগ্রহী এক অনুসন্ধিৎসু পাঠক ও গবেষক। সিরাফ ও বসরা নগরীতে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেছিলেন। হিজরি ৩০০ সালে (৯১৫ খ্রিস্টাব্দে) সিরাফ বন্দরে তার সাক্ষাৎ হয় বিখ্যাত পর্যটক ও ভূগোলবিদ মাসউদীর সঙ্গে। এছাড়া বণিক সুলাইমানের ভ্রমণের প্রায় বিশ বছর পর একই বন্দরে তার সাক্ষাৎ হয় ইবনে ওয়াহাব কুরাইশির সঙ্গে, যিনি ২৫৭ হিজরিতে (৮৭১ খ্রিস্টাব্দে) বসরার সংঘর্ষের সময় মাতৃভূমি ত্যাগ করে সমুদ্রযাত্রায় বের হন এবং সিরাফ বন্দর থেকে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে চীন পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। বসরার অধিবাসী আবু জায়েদ এই সব ভ্রমণকাহিনি সংগ্রহ, বিন্যাস ও সম্পাদনার মাধ্যমে আমাদের জন্য সংরক্ষণ করেছেন এক অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ; এটা তার অমর কৃতিত্ব।

বইটির ওপর ইরানেও ফারসি ভাষায় বহু গবেষণাকর্ম হয়েছে। ১৯৫৫ সালে তুরস্কের একটি লাইব্রেরি থেকে উদ্ধারকৃত আরেকটি দুর্লভ পাণ্ডুলিপির সাহায্যে মুহাম্মাদ আব্বাসি একটি ফারসি অনুবাদ করেন; তারপর ২০০২ সালে ড. হুসাইন কারচানলুর বিস্তৃত টীকা ও ব্যাখ্যাসহ আরেকটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। তারপর ২০০৫ সালে জাওয়াদ সুফিনেজাদ আরেকটি পরিমার্জিত অনুবাদ প্রকাশ করেন। গ্রন্থটির রচনাকাররা যেহেতু প্রাচীন ইরানের সিরাফ বন্দরের অধিবাসী ছিলেন, তাই ইরানি গবেষকগণ তাদের বর্ণনাকে সূক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসা ও গভীর দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংযোজন করেছেন। ফারসি অনুবাদ ও টিকাভাষ্যের আলোকে ভোরের মতো ফর্সা হয়ে ওঠেছে আরবি পাণ্ডুলিপির অনেক জটিল বিবরণ। পরবর্তীতে এই গ্রন্থ অবলম্বনে ইরানে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ‘রাহে আবিয়ে আবরেশম’ (The Maritime Silk Road) বা ‘সামুদ্রিক রেশম পথ’ নামে। প্রাচীনকালে চীন থেকে মিসর পর্যন্ত স্থল ও জলপথে বণিকরা মূল্যবান রেশম নিয়ে যাতায়াত করতেন, যা দিয়ে তৈরি হতো কাপড়, কাগজ ও নিত্যপণ্য। এজন্য চীন সাগর, বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর ও পারস্য উপসাগরের সেই বিস্তৃত জল-বাণিজ্যপথ ইতিহাসে পরিচিত হয় ‘সামুদ্রিক রেশম পথ’ বা ‘মেরিটাইম সিল্ক রোড’ নামে। ২০১১ সালে ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান বেশকুফের প্রযোজনায় এবং মুহাম্মাদ বুজুর্গানিয়ার পরিচালনায় তেহরান থেকে এই ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রটি প্রকাশিত হয়, যাতে বারোশো বছর আগের ধূসর পাণ্ডুলিপিটি জীবন্তরূপে দৃশ্যমান হয়। এসব গবেষণা ও পুনর্নির্মাণের পথ ধরেই আমরা অতীতের সেই বিস্মৃত জগতে ভ্রমণ করি।

বাংলাদেশের পথে আরব বণিক সুলাইমান

আরবের তাজির ও বণিক সুলাইমান সিরাফি ২৩৭ হিজরির (৮৫১ খ্রিস্টাব্দ) দিকে ভারতবর্ষ, বাংলাদেশ ও চীন ভ্রমণ করেন। তবে এটা তার একমাত্র সফর নয়; এর আগে-পরে তিনি আরও বহুবার ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষ, বাংলাদেশ ও চীনে যাতায়াত করেছেন। যাতায়াতের পথে ভারত বা বাংলাদেশের একটি জনপদে ১৬ বছরের ব্যবধানে একই দৃশ্য দুইবার দেখেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তার ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং আধুনিক মানচিত্রের সঙ্গে সেসব পথরেখা মিলিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন ফরাসি প্রাচ্যবিদ গ্যাব্রিয়েল ফেরান্দ। সবকিছু বিচার করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এই ভ্রমণকাহিনীতে নির্ভরযোগ্য ও যথার্থ তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “প্রাচীনকালে যেসব আরব-পারস্যের ব্যবসায়ীরা চীন অভিমুখে বাণিজ্যযাত্রা করেছেন, তাদের মধ্যে বণিক সুলাইমানের এই ভ্রমণকাহিনী একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।” তার সম্পাদিত আরবি পাণ্ডুলিপিতে আমাদের বর্তমান বঙ্গোপসাগরের চিত্রও এঁকেছেন, যেখানে আরবি বর্ণমালায় দুলতে দেখা যায় ‘বাহরু হারকুন্দ’ বা হরিখণ্ড সাগর।

বণিক সুলাইমান আরব থেকে চীন পর্যন্ত যে সমুদ্রপথে ভ্রমণ করেছিলেন, তার সম্ভাব্য পথরেখা ছিল এমন—তিনি সিরাফ থেকে যাত্রা করে মাসকট পর্যন্ত আরব উপসাগর অতিক্রম করেন; সেখান থেকে দক্ষিণ ভারতের কোল্লাম হয়ে মালাবার উপকূলে পৌঁছান। তারপর তামিলনাড়ুর প্রণালী পাড়ি দিয়ে সিলন দ্বীপের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) উত্তরে যান। সেখান থেকে বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। তারপর কালাহবার (মায়ানমার) হয়ে মালয় (মালয়েশিয়া) উপকূলে অগ্রসর হন এবং সেখান থেকে তিউমান দ্বীপে যান, যা মালাক্কার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। তারপর তিনি সেইগানের নিকটবর্তী অঞ্চল অতিক্রম করে হাইনান (চীন) দ্বীপে পৌঁছান এবং শেষে চীনের বিচ্ছিন্ন প্রণালী পার হয়ে ‘খানফু’ (ক্যান্টন) বন্দরে পৌঁছান। সে সময় সমুদ্রযাত্রায় মাসকট থেকে চীন পর্যন্ত পৌঁছাতে চার মাসেরও বেশি সময় লাগত। সুলাইমান তার বর্ণনায় কেবল ভ্রমণের বিভিন্ন মনজিল, দিনের হিসেবে দূরত্ব কিংবা কখনো ফারসাখে দূরত্বের হিসাবই দেননি; বরং উপকূল, দ্বীপপুঞ্জ, বন্দর, শহর, সেখানকার অধিবাসী, কৃষিপণ্য, উৎপাদন এবং বাণিজ্যপণ্যের বিস্তারিত বিবরণও তুলে ধরেছেন।

প্রাচীন বঙ্গের রাজ্য হরিকেল

বণিক সুলাইমানের ভ্রমণকাহিনীই প্রথম উৎস, যেখানে ভারত মহাসাগরের একটি অংশের নাম দেখা যায় ‘বাহরু হারকুন্দ’। আরবি ‘হারকুন্দ’ শব্দটির বাংলা রূপ ‘হরিখণ্ড’ হিসেবে ধরা যেতে পারে, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘হরি’ বা বিষ্ণুর অংশবিশেষ। একইসঙ্গে আমরা প্রাচীন বঙ্গের ইতিহাসের অন্যান্য সূত্র থেকেও ওই সময়ের বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত প্রাচীন হরিকেল রাজ্যের কথাও জানতে পারি। সেই প্রেক্ষিতে ধারণা করা যায়, ভারত মহাসাগরের দক্ষিণ-পূর্বাংশকেই তিনি ‘বাহরু হারকুন্দ’, অর্থাৎ ‘হরিখণ্ড সাগর’ বা ‘হরিকেল রাজ্যের সাগর’ বলে অভিহিত করেছেন। বণিক সুলাইমান লিখেছেন—

“তৃতীয় সাগরের নাম ‘বাহরু হারকুন্দ’ বা হরিখণ্ড সাগর। হরিখণ্ড সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি জুড়ে আছে অসংখ্য দ্বীপ-উপদ্বীপ। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এসব দ্বীপের সংখ্যা প্রায় এক হাজার নয়শো। এই দ্বীপগুলো হরিখণ্ড সাগর এবং লাক্ষাদ্বীপের মধ্যে বিভাজন রেখা তৈরি করেছে। এই দ্বীপসমূহের শাসক একজন নারী। এই সাগরে এক প্রকার মূল্যবান সুগন্ধি আম্বর পাওয়া যায়, যার একেকটি টুকরো ঘরের মতো বিশাল। এই আম্বর সমুদ্রের তলদেশে জন্মায়; তারপর সাগর উত্তাল হলে তা মাশরুম বা মটির নিচে জন্মানো খাদ্যের মতো উপরিভাগে ভেসে ওঠে।

হরিখণ্ড সাগরের এসব দ্বীপে প্রচুর নারিকেল গাছ রয়েছে। প্রতি দুই দ্বীপের মধ্যে প্রায় দুই থেকে তিন-চার ফারসাখ দূরত্ব। প্রতিটি দ্বীপই মানুষের পদচারণায় মুখরিত। দ্বীপবাসীরা ঝিনুক সংগ্রহ করে এবং রাণি সেগুলো তার কোষাগারে সঞ্চয় করে। ঝিনুকগুলো সাগরের পানিতে ভেসে আসে এবং তার মধ্যে জীবন্ত সত্তা থাকে। এগুলো ধরার জন্য তারা নারিকেল গাছের ডাল কেটে সাগরে নিক্ষেপ করে, যাতে ঝিনুকগুলো তাতে আটকে যায়। স্থানীয়রা এটাকে ‘কাবতাহ’ বলে। এখানকার মানুষের দক্ষতার তুলনা নেই। তারা সম্পূর্ণ বোনা জামা তৈরি করতে পারে—যাতে হাতা, সামনের খোলা অংশ ও গলার অংশও থাকে। তারা ‘সিনায়ি’ (আরবি ‘সিনাআহ’ অর্থ নির্মাণশিল্প) কাজে পারদর্শী। তারা জাহাজ ও গৃহ নির্মাণসহ অন্যান্য শিল্পকর্ম অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করে। তারা পরিধেয় বস্ত্রের দুই প্রান্ত সামনে-পিছনে বেঁধে জাহাজ নির্মাণের (দারুস সিনায়ি>দারুচিনি=জাহাজ নির্মাণস্থল) কাজ করে।

হরিখণ্ড সাগরে অবস্থিত এসব দ্বীপের মধ্যে সর্বশেষ দ্বীপটির নাম স্বর্ণদ্বীপ (শ্রীলঙ্কা), যা একেবারে প্রান্তসীমায় অবস্থিত। স্থানীয় ভাষায় এসব জলবেষ্টিত ভূখণ্ডকে ‘দ্বীবাজাত’ (দ্বীপসমূহ) বলা হয়। স্বর্ণদ্বীপের পুরোটা জলাভূমি ও সৈকত মণি-মুক্তার খনিতে সমৃদ্ধ। এই দ্বীপে ‘রাহুন’ নামে একটি পাহাড় রয়েছে, যেখানে হজরত আদম আ. অবতরণ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। পাহাড়ের চূড়ায় একটি পাথরে তার একটি পায়ের ছাপ গেঁথে আছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় সত্তর হাত। বলা হয়, তিনি জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণের সময় এক পা ওই পাহাড়ে এবং অন্য পা সাগরে রেখেছিলেন। পাহাড়ের চারপাশে লাল, হলুদ ও নীল বর্ণের ইয়াকুত পাথর এবং হীরা-জহরতের খনিও রয়েছে।

হরিখণ্ড সাগরের মূল কেন্দ্র থেকে স্বর্ণদ্বীপের দিকে যাত্রা করলে আরও কয়েকটা দ্বীপ পাওয়া যায়, যদিও সেসব সংখ্যায় খুব বেশি নয়। তবে দ্বীপগুলো আয়তনেও বিশাল, বিস্তারিত তথ্য জানাও সহজ না। তন্মধ্যে একটি দ্বীপের নাম ‘রামনি’ (রামু, পার্বত্য চট্টগ্রাম)। সেখানেও আছে একাধিক রাজ্য, আছেন একাধিক রাজা। এর আয়তন প্রায় আটশো থেকে নয়শো ফারসাখ বলে ধারণা করা হয়। এখানেও সোনার খনি আছে। এই সাগরের কাছাকাছি আরেকটি প্রাকৃতিক সম্পদের খনি আছে, যার নাম ‘ফানসুর’। এখানে উৎকৃষ্ট মানের কর্পুর উৎপন্ন হয়। রামনি দ্বীপে প্রচুর হাতি এবং ঘন বাঁশঝাড় ও জঙ্গল রয়েছে। সেখানে বহু প্রকার বনজ উদ্ভিদ জন্মে। তবে কিছু অধিবাসী মানুষের মাংস ভক্ষণ করে বলেও শোনা যায়। রামনি দ্বীপের অবস্থান হরিখণ্ড সাগর ও সিলেট সাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে।”

সুলাইমান সিরাফির এই বর্ণনা প্রাচীন বঙ্গোপসাগরের ভূগোল, সামুদ্রিক সম্পদ এবং দ্বীপভিত্তিক জীবনযাত্রার এক জীবন্ত দলিল। ‘বাহরু হারকুন্দ’, ‘রামনি’ এবং ‘সালাহাত’ নাম তিনটি আমাদের সামনে তুলে ধরে প্রাচীন বঙ্গের ‘হরিকেল’ রাজ্য, চট্টগ্রামের রামু এবং সিলেট প্রভৃতি এলাকার বারোশো বছর আগের ছবি। তার বিবরণে নারীশাসিত দ্বীপ, ঝিনুক সংগ্রহের পদ্ধতি এবং জাহাজ নির্মাণশিল্পের উল্লেখ থেকে বোঝা যায় যে, হাজার বছর আগের বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এলাকা কেবল কৃষিনির্ভর ছিল না; বরং সমুদ্রকেন্দ্রিক একটি সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠিত ছিল।

বঙ্গোপসাগরের পথে

সুলাইমান সিরাফি লিখেছেন, “কোল্লাম বন্দর (দক্ষিণ ভারত) থেকে ছেড়ে আসা জাহাজগুলো সোজা হরিখণ্ড সাগরের (বঙ্গোপসাগর) দিকে যাত্রা করে। এই সাগর পাড়ি দেওয়ার সময় তারা একটি স্থানে পৌঁছায়, যার নাম ‘লনজবালোস’ (নিকোবর)। স্থানীয়রা আরবি ভাষা বোঝে না; এমনকি আরব বণিকরা অন্য কোনো ভাষায় কথা বললেও তারা বুঝতে পারে না। তারা এমন এক জাতি, যারা বস্ত্র পরিধান করে না। তাদের গায়ের রং উজ্জ্বল, তবে চুল ও দাড়ি মুণ্ডিত। আরব বণিকরা তাদের নারীদের দেখার সুযোগ পায় না; নারীরা দ্বীপের অভ্যন্তরে অবস্থান করে। কেবল পুরুষরাই কাঠের নৌকায় করে দ্বীপের বাইরের অংশে আসে। তারা নৌকা ভরে সঙ্গে নিয়ে আসে নারিকেল, আখ, কলা এবং নারিকেলের শরাব। নারিকেলের শরাবের বিভিন্ন রূপান্তর আছে। প্রথমত সেটা নারিকেলের ভেতরে থাকা এক প্রকার সাদা পানি। পান করলে মনে হয় যেন মধুর মতো একটি মিষ্টি পানীয়। তবে না খেয়ে কিছু সময় রেখে দিলে সেটা হয়ে যায় শরাব। আরও কিছুদিন রেখে দিলে হয়ে যায় সিরকা (ভিনেগার)। তখন সেটা তারা লোহার বিনিময়ে বিক্রি করে। যেহেতু তারা আরব বণিকদের ভাষা বোঝে না, তাই ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন হয় ইশারা ও সাংকেতিক ভাষার মাধ্যমে। তারা সাঁতারে অত্যন্ত দক্ষ; কখনো কখনো সুযোগ পেলে বণিকদের লোহা চুরি করে নিয়ে যায়, বিনিময়ে কিছুই পরিশোধ করে না। হরিখণ্ড সাগরের এক প্রান্তে কোল্লাম বন্দর (দক্ষিণ ভারত) এবং অন্য প্রান্তে কালাহবার বন্দর (মায়ানমার) অবস্থিত। কোল্লাম থেকে কালাহবারে পৌঁছাতে প্রায় এক মাস সময় লাগে।”

আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ আমাদের বঙ্গোপসাগরের জলরাশিতে অবস্থিত ভারত শাসিত বিখ্যাত স্থান। ব্রিটিশ আমলে এটা ‘কালাপানি’ বা নির্বাসনের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানকার সেলুলার জেলে নির্বাসন দেওয়া হয় ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের অনেক আলেম ও বিপ্লবীদের। এখনো এই দ্বীপপুঞ্জের প্রধান ভাষা বাংলা। এই দ্বীপপুঞ্জ বঙ্গোপসাগরের সীমানাভুক্ত হয়েও ভারতের অধীনে শাসিত। বারোশো বছর আগে আমাদের এই আরব বণিক তুলে ধরেছেন তার সেই দ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

সাগর পথের স্মৃতি

সুলাইমানের ভ্রমণবৃত্তান্তে তৎকালীন বঙ্গোপসাগরের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের বিচিত্র চিত্র পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেন, “সাগরের তীরে এমন এক ধরনের মাছ দেখা যায়, যা পানির উপর দিয়ে উড়তে পারে”। তিনি এটাকে ‘জল ফড়িং’ (চিংড়ি) নামে অভিহিত করেছেন। আবার এমন মাছও রয়েছে, যা সাগর থেকে উঠে নারিকেল গাছে উঠে তার পানি পান করে পুনরায় সাগরে ফিরে যায়। তিনি আরও বলেন, “সাগরে কাঁকড়ার মতো এক ধরনের প্রাণী আছে, যা তীরে উঠে পাথরের মতো কঠিন হয়ে যায়। এগুলো গুড়া করে সুরমা তৈরি করা হয় এবং চোখের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।” এই বর্ণনা মিলে যায় আমাদের সেন্টমার্টিন দ্বীপের প্রবালের সাথে; যা সাগরের জলে জীবন্ত থাকে, সৈকতে উঠে পাথর হয়ে যায়।

সুলাইমান তার ভ্রমণকাহিনীতে আরও লিখেছেন, “সাগরপথে চলার সময় ‘জায়িজ’ নামক একটি পার্বত্য এলাকা পড়ে। সেখানে একটি পাহাড়ের নাম ‘আগুন পাহাড়’। এর কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। দিনে এই পাহাড় থেকে ধোঁয়া বের হয় এবং রাতে আগুনের শিখা দেখা যায়। পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত হয় একটি ঠাণ্ডা মিঠা পানির ঝরনা এবং একটি গরম মিঠা পানির ঝরনা।” আমাদের দেশের সিলেট ও চট্টগ্রামে এখনো এমন কিছু আগুন-পানির পাহাড় রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা ঘুরতে যান। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে হাঁটলেই দেখা যায় ছোট ছোট জলাশয়, যাতে বুদবুদের মতো বেরুতে থাকে জলীয় তরল গ্যাস। দেয়াশলাই ফেললেই জলের ওপর জ্বলে উঠে আগুন।

চট্টগ্রামের রামু

হরিখণ্ড সাগর তথা বঙ্গোপসাগরে ভ্রমণের প্রসঙ্গে সুলাইমান সিরাফি লিখেছেন, “এরপরের রাজ্য শাসন করেন যে রাজা, তার নাম ‘দরহরম’ (রাজা ধর্মপাল)। তিনি গুর্জরের রাজার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। তিনি খুব অভিজাত শ্রেণির রাজা না হলেও বল্লভ রায়ের মতো শক্তিশালী রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। তার সেনাবাহিনী বল্লভ রায়, গুর্জর রাজা এবং তপনের রাজার বাহিনীর চেয়েও শক্তিশালী। আমি শুনেছি, তিনি যুদ্ধ করতে বের হলে প্রায় পঞ্চাশ হাজার হাতির বিশাল বাহিনী সঙ্গে নেন। তবে তিনি কেবল শীতকালে যুদ্ধ করেন, কারণ হাতিরা তৃষ্ণা সহ্য করতে পারে না; ফলে গ্রীষ্মকালে যুদ্ধ করা সম্ভব হয় না। তার সেনাবাহিনীর প্রতিটি দলে প্রায় দশ থেকে পনেরো হাজার যোদ্ধা থাকে।”

‘রাহমি’ রাজ্যের এই বর্ণনা আমাদের সামনে প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক শক্তি ও সামরিক ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। এতে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বাংলার পাল বংশের প্রভাবশালী রাজা ধর্মপাল (রাজত্বকাল ৭৮১-৮২১ খ্রিস্টাব্দ) বিহার ও কনৌজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকূট ও গুর্জর প্রতিহারদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সংঘাতে লিপ্ত ছিলেন। সম্ভবত এই কারণেই তৎকালীন পাল শাসিত রাজ্যকে ‘রাহমি’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণনা অনুযায়ী, রাহমি রাজ্যের সীমানা বাংলার ভৌগোলিক পরিসরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ—একদিকে হরিখণ্ড সমুদ্র (চট্টগ্রাম), অন্যদিকে কামরূপ (সিলেট)। ধারণা করা হয়, ‘রাহমি’ নামটি চট্টগ্রামের ‘রামু’ অঞ্চল থেকে উদ্ভূত। বর্তমান কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত এই প্রাচীন জনপদটি ষোড়শ শতকেও চট্টগ্রাম ও আরাকানের মধ্যবর্তী অঞ্চল হিসেবে ‘রামু’ নামেই পরিচিত ছিল। উপকূলীয় অবস্থানের কারণে এটা আরব বণিকদের সরাসরি যোগাযোগে আসে এবং তাদের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে তারা সমুদ্র থেকে কামরূপ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকেই এই নাম দ্বারা অভিহিত করতে শুরু করেন।

অন্যদিকে, পাল বংশের রাজারা ওই সময় নিজেদের ‘গৌড়ের রাজা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন, যা ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজি জয় করেন; ফলে তখনো ‘বাঙলা’ বা ‘বাঙ্গালাহ’ নামের ব্যাপক প্রচলন ঘটেনি। ‘বাংলা’ নামের রাষ্ট্রীয় ব্যবহার শুরু হয় অবিভক্ত বাংলার স্থপতি ও প্রথম স্বাধীন মুসলিম শাসক সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের (১৩৪২-১৩৫৮) সময় থেকে। ফলে সুলতানি আমলের পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ সালে বাংলা সফরকালে তার লেখায় ‘বাংলা’ নামের উল্লেখ করেন; আর তার বহু আগে ৮৫১ সালে পাল আমলের (৭৫০-১১৬১) পর্যটক সুলাইমান তার বর্ণনায় ‘হরিখণ্ড সাগর’, ‘রামু’, ‘সিলেট’, ‘কামরূপ’ ইত্যাদি নাম ব্যবহার করেন। সুলাইমানের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, আরব বণিকরা সেই সময়ও মেঘনার মোহনা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে নিয়মিত আগমন করতেন। তারা এখান থেকে বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য, বিশেষত মসলিন কাপড় ও আগরকাঠ সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের গণ্ডার

সুলাইমান সিরাফি লিখেছেন, “রাহমি রাজ্যে ‘বুশান’ নামে এক ধরনের গণ্ডার পাওয়া যায়। প্রাণীটির আকৃতি কিছুটা মানুষের মতো মনে হয়। কপালের সামনে একটি শিং থাকে, যার গোড়ায় একটি সাদা চিহ্ন এবং শিংটি কালো। আকারে হাতির চেয়ে ছোট, তবে অত্যন্ত শক্তিশালী; দেখতে মহিষের মতো। এর পায়ে আলাদা গিড়া নেই; রানের ওপর থেকে নখ পর্যন্ত একটি অভিন্ন হাড়ের মতো গঠন। এর ভয়ে হাতিও পালিয়ে যায়। এটাও গরু ও উটের মতো জাবর কাটে। এর মাংস হালাল, আমরা তার মাংস খেয়েছি। এই প্রাণী বনাঞ্চলে বেশি দেখা যায়। ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানেও এটা পাওয়া যায়, তবে এখানকার গণ্ডারের শিংয়ের গুণগত মান উৎকৃষ্ট এবং তা উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। এসব শিংয়ে মানুষের, ময়ূরের, মাছের ইত্যাদি নকশা খোদাই করে বিক্রি করা হয়। চীনে এই শিং দিয়ে বেল্ট তৈরি হয়, যার মূল্য দুই থেকে তিন হাজার দিনার পর্যন্ত হয়। এসব পণ্য রাহমি রাজ্য থেকে চীনে রপ্তানি হয় এবং ‘ওয়াদা’ নামক স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য সম্পন্ন হয়।” এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়, তৎকালীন বঙ্গোপসাগর অঞ্চল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের অংশ ছিল। এখানকার পণ্যদ্রব্য সমুদ্রপথে দূরদেশেও পৌঁছে যেত এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে এই ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।

প্রাচীন ঢাকার বিখ্যাত মসলিন কাপড়

মসলিন আমাদের প্রাচীন বাংলার কারুশিল্প ও নান্দনিকতার গৌরবময় প্রতীক। প্রাচীন যত পর্যটক বাংলায় এসেছেন, তারা সবাই এক কথায় মসলিনের প্রশংসা করেছেন। আমাদের এই লেখকও মসলিনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “এই রাজ্যে এমন সূক্ষ্ম ও মিহি কাপড় তৈরি হয়, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। একটা পূর্ণাঙ্গ কাপড়ের থান সহজেই আঙটির ভেতর দিয়ে প্রবেশ করানো যায়। অত্যন্ত সূক্ষ্ম তুলা দিয়ে এটা বানানো হয়। আমি নিজ চোখে এই মিহি কাপড় দেখেছি। এখানে লেনদেন হয় ‘ওয়াদা’ নামক মুদ্রায়। এ দেশের প্রধান সম্পদ হলো সোনা, রূপা, আগরকাঠ, মসলিন (মিহি) কাপড় এবং ‘সুমর’, যা থেকে বানানো হয় উন্নত মানের সুগন্ধি।”

বাংলার মসলিন বিশ্বের বিস্ময় ও প্রশংসার বিষয় হয়ে আছে দুই হাজার বছরের পুরোটা সময় জুড়ে। আমাদের খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের প্রথম শতাব্দীর গ্রিক ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘দ্য পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিত্রিয়ান সী’-তে উল্লেখ পাওয়া যায় গঙ্গাতীরবর্তী অঞ্চলের মসলিনের, নবম শতাব্দীর আরব পর্যটক সুলাইমান সিরাফির ভ্রমণবৃত্তান্তে উল্লেখ পাওয়া যায় রামু অঞ্চলের মসলিনের, ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণবৃত্তান্তেও উল্লেখ পাওয়া যায় মেঘনা তীরবর্তী এলাকার মসলিনের। মোগল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজলও তার রচনায় সোনারগাঁওয়ে প্রস্তুতকৃত মসলিনের প্রশংসা করেছেন। এভাবে ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় বাংলাদেশের মেঘনা অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল—সোনারগাঁও, ঢাকার দোহার-নবাবগঞ্জ, কুমিল্লা প্রভৃতি এলাকায় মসলিন শিল্পের প্রমাণ ও নিদর্শন পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৬১০ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার ইসলাম খান চিশতী রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করলে ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে ঢাকা। ওই সময়ে ঢাকায় উৎপাদিত মসলিন ‘ঢাকাই মসলিন’ নামে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে। সে যুগের মসলিনের একটি নিদর্শন আজও সংরক্ষিত আছে ঢাকার শাহবাগ জাদুঘরে। সেই এক খণ্ড মসলিন কাপড়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ গজ এবং প্রস্থ ১ গজ, যা অনায়াসেই একটি আঙটির ভেতর দিয়ে পার করা যায়। তবে ব্রিটিশরা এসে এই বিশ্ববিখ্যাত শিল্প ধ্বংস করে দেয়, তাঁতিদের আঙুল পর্যন্ত কেটে দেয়; বিপরীতে তারা প্রতিস্থাপন করে গার্মেন্টস শিল্প, স্বল্প সময়ে তৈরি পোশাকের কারখানা।

চীন থেকে এলো চা

আমাদের জনপ্রিয় পানীয় ‘চা’ এসেছে চীন থেকে—এ তথ্যও পৃথিবীর সামনে প্রথম তুলে ধরেন আরব বণিক সুলাইমান। তিনি একে ‘সাখ’ নামে উল্লেখ করেছেন, যা আধুনিক আরবিতে ‘শাই’ এবং বাংলায় ‘চা’ নামে পরিচিত। তিনি লিখেছেন, “যখন বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন রাজা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খাদ্য সরবরাহ করে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি করেন; ফলে দ্রব্যমূল্যের সংকট দেখা দেয় না। রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস হলো জনগণের জিযিয়া। আমার মনে হয়, শুধু ক্যান্টন রাজ্যের কোষাগারেই প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার দিনার জমা হয়, যদিও এটা চীনের সবচেয়ে বড় রাজ্য নয়। রাজা খনিজ সম্পদ থেকে নিজের জন্য বরাদ্দ রাখেন কেবল লবণ এবং একটি উদ্ভিদের পাতা, যা চীনের মানুষ গরম পানিতে ফুটিয়ে পান করে। চীনের প্রত্যেক রাজ্যেই এই উদ্ভিদ পাতা চড়া দামে বিক্রি হয়। স্থানীয় ভাষায় উদ্ভিদটি ‘সাখ’ নামে পরিচিত, যা তুলসী পাতার চেয়েও বেশি পাতাযুক্ত এবং সুগন্ধে ভরা। এর মধ্যে কিছুটা তিতকুটে স্বাদ রয়েছে। গরম পানিতে ফুটিয়ে পান করলে শরীরের উপকার হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রধান আয় আসে তিনটি উৎস থেকে—জিযিয়া, লবণ এবং সাখ পাতা (চা-পাতা)।”

চীন থেকে আরব বণিকরা এই চা-পাতা নিয়ে যেতেন আরবের বাজারে, সেখান থেকে তা ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে পৌঁছাত ইউরোপে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বৃটেনে যখন শিল্পবিপ্লবের জোয়ার শুরু হয়, তখন বৃটিশরা চা-কে একটি বিশেষ ‘ব্র্যান্ড’ হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাদের উপনিবেশগুলোতে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। বাংলাদেশে প্রথম পরীক্ষামূলক চা-বাগান স্থাপিত হয় ১৮২৮ সালে চট্টগ্রামে। পরবর্তীতে ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামের লালখান বাজারের টিলায় গড়ে উঠে আরেকটি চা-বাগান। তারপর ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সিলেটের মালনিছড়া চা-বাগান। সিলেটের পার্বত্য ভূমি চা-বাগানের জন্য অনুকূল প্রমাণিত হওয়ার পর সিলেট জুড়ে গড়ে তোলা হয় চা-শিল্প অঞ্চল, যাকে প্রাচীন আরব বণিকরা অভিহিত করতেন ‘কামরূপ’ নামে।

মাছে ভাতে বাঙালি

সঙ্গত কারণেই আরব বণিকদের বর্ণনায় ‘বাংলাদেশ’ বা ‘বাঙ্গালা’ নামের কোনো স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের উল্লেখ নেই। তারা সিন্ধু নদ থেকে চীন সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সমগ্র অঞ্চলকে এককভাবে ‘হিন্দ’ নামে অভিহিত করেছেন, যার অনুবাদ আমরা ‘ভারতবর্ষ’ বা ‘উপমহাদেশ’ হিসেবে করি। তবে তাদের ভ্রমণবিবরণে নজর দিলে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই বিস্তীর্ণ ‘হিন্দ’ভূমির অন্তর্গত কোনো স্থানে আমাদের আজকের বাংলাদেশের কথাই বলা হচ্ছে। আবু জায়েদ সিরাফি তার ভ্রমণবৃত্তান্তে লিখেছেন, “হিন্দ মুলকে রাজা নির্বাচনের একটি প্রথা আছে। রাজা নির্বাচনের সময় রাজপ্রাসাদের রান্নাঘরে প্রায় তিন-চারশো মানুষের জন্য ভাত রান্না করা হয়। রাজ-অভিষেক অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছায় তিন-চারশো মানুষ উপস্থিত হয়। রাজার সামনে কলাপাতা বিছিয়ে সেখানে ভাত রাখা হয়। প্রথমে রাজা সেখান থেকে কিছু আহার করেন। তারপর উপস্থিতদের মধ্য থেকে একজন একজন করে রাজার সামনে যায়, আর রাজা তাদের কিছু ভাত খাইয়ে দেন। এই লোকগুলো রাজার নিজস্ব লোক বলে গণ্য হয়। যখন রাজা মৃত্যুবরণ করেন, রাজার মৃতদেহ চিতায় পোড়ানোর পর তাদেরও সেদিন সহমরণ বরণ করতে হয়, স্বেচ্ছায় আগুনে আত্মাহুতি দিতে হয়।” এ অঞ্চলের প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি আরও লিখেছেন, “এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, আর বৃষ্টি ও বর্ষাকালকে কেন্দ্র করেই কৃষিকাজ আবর্তিত হয়।”

বাংলাদেশের একটি বিষয় তাকে বিস্মিত করেছিল, এখানে দুইজন মানুষ একসঙ্গে খাবার খেতে বসলেও তারা এক পাত্রে খাবার ভাগাভাগি করে না; বরং প্রত্যেকে আলাদা পাত্রে নিজ নিজ খাবার গ্রহণ করে। তিনি এই প্রথাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং একে অপছন্দনীয় বলে মনে করেছেন। কারণ, আরবরদের খাবারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শুকনো এবং সম্মিলিত। অপরদিকে বাঙালিদের খাবারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তরল এবং আলাদা। আরবের প্রধান খাবার রুটি ও আগুনে ঝলসানো মাংস, যা দশজন এক পাত্র থেকে একত্রে ভাগাভাগি করে খাওয়া যায়। পক্ষান্তরে ভাত-ঝোল খাওয়ার জন্য আলাদা আলাদা পাত্র হলেই সুবিধা। পাত্র আলাদা হওয়ার কারণে মাছ-মাংস কেটে টুকরো করতে হয়। ফলে, এখানে বরং একত্রে খাওয়াটাই কষ্টকর। কুরআনেও দুইভাবে খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে আমাদের আরব বণিকের কাছে বিষয়টা বিস্ময়কর মনে হয়েছে। 

শেষের কথা

বারোশো বছর আগের এক আরব বণিকের চোখে দেখা বঙ্গভূমি—এই বর্ণনাগুলো কেবলই ভ্রমণকাহিনী নয়; এগুলো আমাদের অতীত দর্শনের ধূলোর আস্তর জমা আয়না। ধূলোর আস্তর সরালেই পরিষ্কার দেখতে পাই আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ; বাংলার মাটি ও মানুষের ছবি। সুলাইমান সিরাফি এবং আবু জায়েদ সিরাফি হয়তো ইতিহাস রচনার উদ্দেশ্যে কলম ধরেননি; তবুও তাদের রোজকার খাতার ভাঁজে ভাঁজে আপনাতেই সংরক্ষিত হয়েছে এক বিস্মৃত ভূগোল এবং এক জীবন্ত সমাজের ছায়াচিত্র। এই ভ্রমণবৃত্তান্ত আমাদের জানায়, ‘বাংলা’ নামটির প্রচলনের আগেই এই ভূখণ্ড ছিল সমুদ্রবাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে ছিল উন্নত কারুশিল্প, শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামো এবং বৈচিত্র্যময় সামাজিক প্রথা। আরব বণিকদের কাছে এটা ছিল ‘রাহমি’ বা ‘হরিখণ্ড’; কিন্তু সেই নামের আড়ালে লুকিয়ে আছে আমাদের আজকের বাংলারই প্রাচীন প্রতিচ্ছবি। এই ঐতিহাসিক ভ্রমণবৃত্তান্ত আমাদের সামনে কেবল কিছু তথ্যের যোগান দেয় না; বরং আমাদের হাত ধরে নিয়ে দাঁড় করায় ইতিহাসের গ্যালারিতে ঝুলে থাকা এক জীবন্ত ক্যানভাসের সামনে। সেই ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা আবিষ্কার করি আমাদের বিস্মৃত পথরেখা; জিজ্ঞাসা করি—আমরা কোথা থেকে এসেছি, আমাদের অতীত কেমন ছিল এবং কীভাবে আমরা বিশ্বসভ্যতার সুবিশাল রাজপথের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এক কথায়, ‘রিহলাহ সুলাইমান তাজির’ কেবল একটা পাণ্ডুলিপি নয়; বরং সময়ের সীমানা পেরিয়ে হেঁটে আসা এক জীবন্ত সাক্ষী, যার হাত ধরে চলতে চলতে আমরা খুঁজে পাই আমাদের সমুদ্রতীর, আমাদের বনভূমি, আমাদের বাজার, আমাদের মানুষ; এবং খুঁজে পাই আমাদেরই হারিয়ে যাওয়া এক খণ্ড প্রাচীন মানচিত্র।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *