দূর পৃথিবীর গন্ধে (শেষ পর্ব)

পূর্ব প্রকাশের পর…

রাত দশটার কাছাকাছি সময়ে বাস আমাদের নামিয়ে দেয় দিনাজপুর। বাসস্ট্যান্ড থেকে অটো নিয়ে চলে যাই মাছের পেটের মতো ঘিঞ্জি এক শহরের ভেতর। এদিকটায় আছে পরপর সারি দেওয়া কয়েকটা আবাসিক হোটেল। দেখেশুনে মাঝারি গোছের একটা হোটেলে উঠি। দুই বেডের রুম, হাজার টাকা ভাড়া। পঞ্চগড় থেকে এবারের বাসযাত্রা আরামদায়ক ছিল না। দুই সিটের মাঝে পর্যাপ্ত স্পেস না থাকায় ছড়িয়ে বসতে পারছিলাম না। ভাঁজ করা চিঠির মতো একপ্রকার পড়েছিলাম বাসের ভেতর। দীর্ঘক্ষণ একরকমে বসে থেকে অসাড় হয়ে এসেছে শরীরের নিম্নাংশ। এই রোডে এর চয়ে ভালো বাস ছিল না। হাত-মুখ ধুয়ে বেডে পড়ে খানিকটা বিশ্রাম নিই। এদিকে রাতও বাড়ছে। খাবার খাওয়া হয়নি। জলদি বেরোতে হবে। রাত বেশি হলে ভাতের হোটেলে তালা পড়ে যাবে, অভুক্ত থাকতে হবে তখন। কিন্তু শরীরও সায় দিচ্ছে না সহসা বেরোতে। অগত্যা বেরোতে হলো। ঘড়ির কাঁটা ততক্ষণে এগারোটা পার হয়েছে। বের হয়ে মনোযোগ দিয়ে হাঁটতে থাকি। মার্কেটগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। বাসাবাড়ির বাতিও নিভে গেছে একে একে। থেকে থেকে কিছু ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে পথের মোড়ে। রাতের আলোছায়া প্রকৃতির ভেতর আমরা অবিরাম হাঁটছি আর গল্প করছি—আত্রাই নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন শহরকে নিয়ে। শতাব্দী পুরোনো অনেক ভবন দেখতে পেলাম। এর কিছু এখনো ব্যবহার হচ্ছে নানা কাজে। এর মধ্যে একটি লাইব্রেরির বিলবোর্ড চোখে পড়ল। খুবই পুরোনো জীর্ণশীর্ণ একটি দুতলা ভবন। নিচতলায় লাইব্রেরিটি। এর ক্ষয়ে পড়া স্তম্ভগুলোর গায়ে এখনো ঝলক দিচ্ছে সুন্দর কারুকার্য। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল অনেক আগের এই লাইব্রেরি কালের ইতিহাস মাড়িয়ে আজো টিকে আছে মরে যাওয়া নদীর মতো। আমি এর সময় ও ইতিহাস খুঁজে দেখতে চাইলাম। কিন্তু বাহিরাংশে কোনো উৎস খুঁজে পেলাম না। সামনে এগোই। হাঁটছি। আমরা হাঁটছি মূলত নৈশকালীন ঘুরাফেরার জন্য না। হাঁটতে হাঁটতে খুঁজছি খাবারের হোটেল, কোনো রেস্টুরেন্ট। বহু পথ হেঁটেও সন্ধান মিলল না। আমরা যে এরিয়াতে উঠেছি এটা প্রধানত বাজার। শহরের প্রাণকেন্দ্র। বাজার বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাবারের হোটেলগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। নিজেরা খুঁজে না পেয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। লোকটি আমাদেরকে বাজারের পেছনের দিকে একটি হোটেল দেখিয়ে দিলেন। সেখানে পৌঁছে দেখি খাবার শেষ, বাসনপত্র ধোয়ামোছার কাজ সারছে দুজন বেয়ারা। আমাদেরকে দেখে মালিক গোছের লোকটি এগিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করে যখন জানলেন, এই রাতে আমরা খাবারের জন্য শহরের গলিতে ঘুরছি তখন করুণা প্রকাশ করলেন। একপর্যায়ে বললেন, আপনারা ঢাকা থেকে আসছেন, যদি চান ফ্রিজ থেকে খামিরা বের করে রুটি বানিয়ে দিতে বলব। আমরা দেখলাম, এখানে বসে খাবারের মতো পরিবেশ নাই, মেঝেতে ডিটারজেন্ট ও পানি দিয়ে সাফসুতরো করছে ভেতরে। এই রাতে তাদের বিড়ম্বনায় ফেলতে চাইনি। শেষে ভদ্রলোক আমাদেরকে রেললাইনের ওপারে একটা জায়গার কথা বলে দিলেন, সেখানে রেস্টুরেন্ট আছে, কিসমত ভালো হলে কিছু পেতে পারি। আমরা তাই করলাম, কিসমতের তালাশে হাঁটা দিলাম ওদিকটায়। প্রায়ান্ধকার গলির পর গলি পেরিয়ে পৌঁছুলাম সেখানে এবং এবার কিসমত আমাদের সহায় হলো। ভালোমানের একটা রেস্টুরেন্ট খোলা পেলাম। আমরা হাসলাম এবং খোদাতা’লার শোকর আদায় করলাম। আমরা নিদারুণ ক্ষুধার্ত। সেই যে দুপুরে খেয়েছি পঞ্চগড়ে, মাঝে দানাপানি ছুঁইনি। তারাও আখের গোছানোর প্রস্তুতি সারছিল। আমাদের দেখে হাতির পেটের মতো তন্দুরে আগুন দিল পুনরায়। ক্যাশে বসেছিল আমাদের বয়সেরই এক তরুণ। কথায় কথায় জানা হলো সে-ই মালিক। দরাজদিল এবং সুন্দর ও মার্জিত আচরণ। তার পক্ষ থেকে ওয়েলকাম ড্রিংস দিয়ে আপ্যায়ন করল। উনুনে রুটি হতে হতে ছেলেটির সঙ্গে কথা বললাম। জানতে চাইলাম স্থানীয় কিছু বিষয়ে তথ্য। আগামীকাল দিনাজপুরের যে যে স্পটে যাব, তার দূরত্ব, রোডম্যাপ ইত্যাদির মামুলি একটা ধারণা নিলাম। খাবার শেষে আর দেরি না করে হোটেলে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি আলতো করে।

রাত পেরিয়ে ভোর হলো। এলার্মের কর্কশ ও ধারালো শব্দে চোখ কচলে জেগে বসি বিছানায়। পর্দা সরিয়ে দিই জানালা থেকে। বিলের তলে জমে থাকা শ্যাওলার মতো আবছায়া এক সকাল ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তের অন্ধকার পেট ফুঁড়ে। দেখি কয়েকটা কাক জানালা ছুঁয়ে উড়ে গেল পূবদিকে। নামাজ আদায় করে ব্যালকনিতে বসি চেয়ার পেতে। গাছের পাতা ভেজা কার্তিকের কুয়াশামাখা সকালের স্নিগ্ধ চোখের সামনে ভেসে ওঠে আস্ত শহর—ঘুম না ভাঙা শিশুর মতো শান্ত ও মায়াবী। বহু বছরের প্রাচীন ও মলিন এক মফস্বল। ছড়ানো ঘড়বাড়ি। বাজার। মাছের আড়ত। ক্যামেরার লেন্সের মতো দৃষ্টি যত দূরে নিয়ে যাই গোচর হয় সবুজ বৃক্ষলতা ও তরুসারি। পাখিরা তাদের স্থান পরিবর্তন করছে। কেউ নীড়ে ফিরছে তো কেউ নীড় ছাড়ছে। শীত বহে নিয়ে আসা ভোরের কাঁচা বাতাসে জুড়িয়ে আসে চোখ-মুখ। রাতে ভালো ঘুম হয়েছে। ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছিল তৃপ্তির আনন্দ। প্রতিটি ভোরই আসলে সুন্দর। মনোরম। এবং মনোমুগ্ধকর। ভাবছিলাম, সদাসর্বদা যদি রাতে পর্যাপ্ত ঘুমিয়ে ভোরে জেগে কাজকাম শুরু করে দিতে পারতাম তাহলে কী দারুণই না হতো! কিন্তু প্রায়শই এটা আমার হয়ে ওঠে না। রাতজেগে পাঠদান-প্রস্তুতি, বই পড়া ও লেখালেখি করা অভ্যাস। কে যেন বলেছিল, তোমার সকাল যদি তোমার নিয়ন্ত্রণে না থাকে, মনে করবে তোমার জীবনও তোমার নিয়ন্ত্রণে নাই। কথাটা অবশ্যই ভাবনার। আমিও যখন প্রথম শুনি হৃদয়ে দাগ কেটেছিল। যাইহোক, পাঁচতলার ব্যালকনি থেকে আত্রাই নদীর তীরবর্তী দিনাজপুরের জীবন ও প্রকৃতি সম্বন্ধে আন্দাজ হলো।

শিউলি ঝরা ভোরে বেরিয়ে পড়ি। আমাদের প্রথম গন্তব্য বিখ্যাত কান্তজীউ মন্দির। দিনাজপুর থেকে বাসে করে যাই কাহারোল। প্রায় বিশ কিলোমিটার পথ। উম উম শীতে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি আর ঢেউখেলা সারিসারি লিচুবাগানের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাই সুন্দরপুর ইউনিয়ন। বাকিটা পথ যেতে হবে ভ্যানে চড়ে। দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত—যেন হলুদ বিল ছড়িয়ে আছে দুদিকে। সেই মাঠের বুক চিরে খোলা ভ্যান যখন আমাদের নিয়ে ছুটে চলে, তখন আমার লেখকমনে এসে ভীড় করে অনুভূতির অনিন্দ্য শব্দগুচ্ছ। আমি তাকিয়ে থাকি আকণ্ঠ বিহ্বল হয়ে। আমার বিলি কাটা মন তখন বলে ওঠে—এইতো জসীম উদ্‌দীনের সেই ধানক্ষেত। মনে পড়ে পল্লীকবির অনবদ্য কবিতাখানি—

পথের কেনারে মোর ধান ক্ষেত, সবুজ পাতার পরে,

সোনার ছড়ায় হেমন্তরাণী সোনা হাসিখানি ধরে।

শরৎ সে কবে চরে গেছে তার সোনালী মেঘের ছটা,

আজো উড়িতেছে মোর এই খেতে ধরিয়া ধানের জটা।

মাঝে মাঝে এর পাকিয়াছে ধান, কোনখানে পাকে নাই,

সবুজ শাড়ীর অঞ্চলে যেন ছোপ লাগিয়াছে তাই।

আজান গাঁয়ের কৃষাণকুমারী এইখান দিয়ে যেতে,

সোনার পায়ের চিহ্নগুলিরে গেছে এর বুকে পেতে।

মোর ধানক্ষেত, এইখানে এসে দাঁড়ালে উচ্চ শিরে,

মাথা যেন মোর ছুঁইবারে পারে সুদূর আকাশটিরে!

এইখানে এসে বুক ফুলাইয়া জোরে ডাক দিতে পারি,

হেথা আমি করি যা খুশী তাহাই, কারো নাহি ধার ধারি।

হেথায় নাহিক সমাজ-শাসন, নাহি প্রজা আর সাজা,

মোর ক্ষেত ভরি ফসলেরা নাচে, আমি তাহাদের রাজা।

(ধান ক্ষেত/ জসীম উদ্‌দীন)

কার্তিকের উশ পড়া সকালে উত্তরের পথ ধরে এগিয়ে যেতে যেতে কানে আসে বাঙালি বধূর নুপূরের মতো ঢেপা নদীর কলকল ছন্দ। সেই জলধ্বনি অনুসরণ করে আমরা এগিয়ে যাই কান্তনগর। এখানেই অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে নির্মিত কান্তজীউ মন্দির। এই গ্রামটির পূর্বনাম ছিল শ্যামনগর। পরবর্তীতে মন্দিরকে ঘিরে এই গ্রাম পেয়েছে নতুন নাম। শ্রীকৃষ্ণের একশো আট নামের একটি হলো শ্রীকান্ত। সেই ‘কান্ত’ শব্দ থেকে মন্দিরের নামকরণ করেছিলেন দিনাজপুরের জমিদার প্রাণনাথ রায়। আর ‘জীউ’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে সম্মানের আসন থেকে। এই হচ্ছে কান্তজীউ মন্দিরের নাম রহস্য। হিন্দু পুরাণ মতে, এখানে একদিন শ্রীকৃষ্ণের যুদ্ধ-বিগ্রহ অধিষ্ঠান হয়েছিল। সেই স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করতে ১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন দিনাজপুরের জমিদার রাজা প্রাণনাথ রায়। মন্দিরটি উৎসর্গ করা হয় শ্রীকৃষ্ণ ও তাঁর প্রিয়তমা রুক্মিণীর প্রতি। কিন্তু এর কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যান জমিদার প্রাণনাথ রায়। মৃত্যুর পূর্বে রাজা তার পালকপুত্র রামনাথ রায়কে দায়িত্ব দিয়ে যান এর নির্মাণকাজ পূর্ণ করার। আটচল্লিশ বছরের অবিরাম প্রচেষ্টা ও অপেক্ষায় এবং দুই প্রজন্মের শ্রম ও তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে টেরাকোটা শিল্পের আশ্চর্য নিদর্শন এই মন্দির। এর দেয়াল ও পুরাকীর্তির দিকে তাকালেই চোখে পড়ে দীর্ঘ সময় শ্রম ও বিপুল কর্মযজ্ঞের ছাপ। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মন্দিরটি। মন্দিরের মাথায় যে নয়টি রত্ন বা চূড়া ছিল—যার কারণে একে ডাকা হতো ‘নবরত্ন মন্দির’ বলে—সেগুলো সব ভেঙে পড়ল ধুলায়। রাজা গিরিজনাথের হাতে এর সংস্কার হয়। কিন্তু সেই নয় চূড়া আর স্থাপন করা যায়নি। বুকের গভীরে শিল্প ও স্থাপত্যের আগুন নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে আজ শত শত বছর। মন্দিরের সামনে দাঁড়াতেই চোখ আটকে গেল দেয়ালে—রক্তের মতো লাল পোড়ামাটির ইটে খোদাই করা আরব্য রজনীর মতো সহস্র গল্প। মন্দিরজুড়ে টেরাকোটার টালির সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। প্রতিটি টালিতে জীবন্ত হয়ে আছে মহাভারত, রামায়ণ আর নানা পৌরাণিক কাহিনির দৃশ্য। যে মাটি দিয়ে এই ইট তৈরি, সেই মাটি আনা হয়েছিল স্থানীয় নদী ও পুকুরের তলা থেকে। আর ভিত্তিপ্রস্তরের পাথর এসেছে হিমালয়ের তরাই, আসামের পাহাড়, বিহারের রাজমহল ও বিন্ধ্যাচলের অরণ্য থেকে। বাংলার মাটি ও ভারতবর্ষের নানা রাজ্য থেকে বহন করে আনা পাথরের মিলনে ইরানি শিল্পীরা তৈরি করলেন ইন্দো-পারস্য ভাস্কর্যের এক অনন্য স্থাপত্য।  

পঞ্চাশ ফুট উঁচু এই মন্দিরের নিচতলায় রয়েছে একুশটি খিলান, দ্বিতীয় তলায় সাতাশটি, আর তৃতীয় তলায় তিনটি। নিচের প্রতিটি খিলানে চোখ রাখলে দেখা যায় ভেতরে বিরাজমান দেবমূর্তি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দুইশো ছেষট্টিটি পোড়ামাটির মন্দিরের মধ্যে কান্তজীউকে বলা হয় সবচেয়ে সুন্দর। এই সুন্দরের সাক্ষী যে দেখবে সেই দেবে। বাংলাদেশের নানা অঞ্চলে মোগল স্থাপত্য রয়েছে অনেক। এই ভ্রমণেও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটির দেখা পেয়েছি। এসবের সঙ্গে কান্তজীউয়ের যে স্থাপত্যশিল্প, এর কোনো তুলনা হয় না। কী নিবিড় যত্ন ও পরম সাধনায় আঁকা হয়েছে এর প্রতিটি দেয়াল। অবিশ্বাস্য! কেবলই মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম পারস্যের সেই শিল্পীদের হাতে গড়া অনন্য শিল্পকর্ম। ঢেপা নদীর তীরে, লাল মাটির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্য সেই সকল নাম না জানা কারিগরদের কবিতা, যারা মাটিকে পরিণত করেছিলেন কালজয়ী শিল্পে।

বছরের একবার কান্তনগর রূপ নেয় মহোৎসবে। শীতের পূর্ণিমায় এখানে জমে রাস মেলা—রাজা রামনাথ রায়ের আমল থেকে পালিত হয়ে আসছে এই পূর্ণিমা উৎসব। মেলায় বাংলাদেশ ও ভারতের নানা প্রান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা এসে জড়ো হন কান্তনগরে। এখন এই কার্তিকেই শুরু হয়ে গেছে রাস মেলার প্রস্তুতি। আর কিছুদিন বাদেই শুরু হবে মেলা। অস্থায়ী দোকানিরা ব্যস্ত তাদের পসরা সাজানোয়।

কান্তজীউ দেখে আমরা যাই পার্শ্ববর্তী নয়াবাদ গ্রামে। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক নয়াবাদ মসজিদ। মন্দির থেকে এর দূরত্ব দেড়-দুই কিলোমিটার। পুরো এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত। শতাব্দীকালব্যাপী তারা বসবাস করছে এই অঞ্চলে। ঠিক তাদের নাভিমূলে এই ঐতিহাসিক মসজিদটির অবস্থান বিস্মিত করে আমাদের। তাই জানার চেষ্টা করলাম এর পেছনের ইতিহাস। স্থানীয় জমিদার প্রাণনাথ রায় কান্তজীউ মন্দির নির্মাণের জন্য পারস্য থেকে যে শিল্পীদের নিয়ে এসেছিলেন তারা ছিলেন মুসলিম। মনোযোগী ছিলেন ধর্মপালনে। আর তৎকালীন এই শ্যামনগরে ছিল না কোনো মসজিদ। তখন সেই পারসিক স্থপতি ও নির্মাণশিল্পীরা রাজার নিকট আবদার করলেন, পাশাপাশি একটি মসজিদও যেন নির্মাণ করা হয়, তাহলে দৈনন্দিনকার নামাজ-কালাম সহজেই আদায় করতে পারবে তারা। হিন্দু রাজা সাদরেই গ্রহণ করলেন তাদের আবদার। নির্মিত হলো এই মসজিদ। অর্ধশতাব্দীকাল তারা ছিল এই অঞ্চলে। এর মধ্যে অনেকেই মারা যায়। এখানেই কবরস্থ করা হয়। সেইসব কবরের কোনো চিহ্ন আজ আর অবশিষ্ট নেই, হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে, হয়তো ভেসে গেছে টেপা নদীর ঘূর্ণিস্রোতে। একটি কবর এখনো রয়েছে মসজিদপ্রাঙ্গণে। তবে এর সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা নেই কারো। মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনাশৈলীর সঙ্গে মিল রেখে মসজিদটিতে ব্যবহার করা হয়েছে পোড়ামাটির অলংকরণ। আমরা গভীরভাবে দেখি মসজিদটির চারপাশ। মসজিদের সামনে দাঁড়ালে প্রথমেই নজর কাড়ে এর তিনটি গম্বুজ। চার কোণে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে চারটি অষ্টভুজাকৃতির মিনার। দেয়ালগুলো বেশ পুরু—যা আড়াই শতাব্দীর ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে রয়েছে একটি করে জানালা। হাজার বছরের পুরোনো রোদ এসে খেলা করছে সেই জানালার কার্নিশে। লাল পোড়ামাটির বুকে বিছিয়ে আছে কমলা রঙের রোদ। যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে টেরাকোটা শিল্পের প্রাগৈতিহাসিক কাহিনি। মনে হচ্ছিল আমি তা খুব ভালো করেই পড়তে পারছি আর বিচরণ করছি কালের ধুলো সরিয়ে ইতিহাসের পথে পথে। মসজিদের গায়ে একসময় ছিল অপূর্ব সব টেরাকোটার কারুকাজ। কিন্তু কালের নিষ্ঠুর আঘাতে সেগুলোর বেশিরভাগই আজ বিলীন। যেগুলো টিকে আছে তাও অক্ষত নয়, কালের ঝড়ঝাপ্টার আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত।  

মসজিদ ও মন্দির পরিদর্শন করে আমরা বিদায় নিই সুন্দরপুর থেকে। ট্যুরপ্ল্যান অনুযায়ী এবার আমরা যাত্রা করি দিনাজপুরের বিখ্যাত রামসাগর দিঘি। কাহারোল থেকে বাসে করে দিনাজপুর শহরে আসি। এখান থেকে অটোতে করে রামসাগর। শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দক্ষিণে, তাজপুর গ্রামে শুয়ে আছে এই বিশাল জলরাশি। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম মানবসৃষ্ট দিঘি। বলা হয়, পনেরো লক্ষ মানুষ কাজ করেছে এই দিঘি খননে। এর বিস্তার চোখ দিয়ে মাপা কঠিন। তটভূমিসহ এর আয়তন প্রায় সাড়ে চার লক্ষ বর্গমিটার। দশ মিটার গভীর এই জলরাশির চারপাশের পাড় উঠে গেছে পনেরো মিটার উচ্চতায়। সবুজ ঘাস দিয়ে মোড়ানো এই মাটির প্রাচীর বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে দিঘির সৌন্দর্য।  মানুষের হাতে তৈরি হয়েও এই দিঘি আজ প্রকৃতির অংশ হয়ে টিকে আছে শত শত বছর। ঐতিহাসিকদের মতে, পলাশীর যুদ্ধের আগে, ১৭৫০ থেকে ১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে রাজা রামনাথ অত্র অঞ্চলের প্রজাদের সুপেয় পানির চাহিদা পূরণের জন্য খনন করিয়েছিলেন এই দিঘি। তারই নামের স্মৃতিতে জলাশয়টির নাম হয় রামসাগর। দিঘির পশ্চিম পাড়ের মধ্যখানে একদা একটি ঘাট ছিল—বেলেপাথরের স্ল্যাব দিয়ে তৈরি। সেই ঘাটের কিছু স্মৃতি-অংশ আজও টিকে আছে। শেওলা জমেছে ভাঙা পাথরের গায়ে—যেন সবুজ রঙে ইতিহাস নিজেই ঢেকে নিয়েছে তার ক্ষতচিহ্ন। দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে সবিস্ময়ে চেয়ে দেখি এর বিস্তার ও বিশালতা। সারি সারি সবুজ বৃক্ষলতা ঘিরে আছে এর চতুর্পাশ। দিঘির জলে পড়েছে তার ঘন ছায়া—মনে হবে উপুড় হয়ে নিজের মুখ দেখছে সবুজ বন। আকাশে নেই কুয়াশা। খেলা করছে ফুটফুটে রোদ। কোথাও ঈষৎ ছড়িয়ে আছে কালো মেঘের দলা। কবুতরের ডানার মতো ধূসর তার রঙ। শত সহস্র পাখির কিচিরমিচিরে মুগ্ধ হয়ে হেঁটে বেড়াই আমরা দিঘির পাড় ধরে। দেহমনে ছুঁয়ে যায় সবুজ পাতার ঝিরিঝিরি শীতল হাওয়া। আমরা একটু বসি। শিরশিরে বাতাসে শুকিয়ে নিই ভ্রমণের ক্লান্তি। চিপসের প্যাকেট ছিঁড়ি। খাই আয়েশ করে। গল্প করি। ইতিহাস ও প্রকৃতির নিবিড় সংস্পর্শে হারিয়ে যাই এক অন্য ভুবনে। নৈসর্গিক। অপার্থিক। বড্ড মায়ায় পড়ে যাই আমি এই সুন্দরের। ফিরে আসতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু বেলা অনেক হয়ে গেছে। মধ্যদুপুর। আর ঘণ্টা তিনেক বাদে ফিরতি ট্রেন।

হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ আরাম করে গোসল সেরে নিই। সেই যে কাকডাকা সকালে বেরিয়েছি, এখন ঝিমধরা দুপুর। ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিই। একেবারে বেরিয়ে পড়ব ঢাকার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে দুপুরের খাবার খেয়ে চলে যাব দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ঐতিহ্যবাহী গোর-এ-শহিদ ঈদগাহ দেখতে। তারপর সোজা স্টেশন, ঢাকাগামী ট্রেন ধরব। তাই সবকিছু গোছগাছ করে হোটেল এক্সিট দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে। দুপুরের খাবার খেতে যাই সাদ্দামের ভাতের হোটেলে। এখানকার গরুর কালো ভুনা দিনাজপুরে বিখ্যাত। ঢাকা থেকে আসার সময়ই এক শুভানুধ্যায়ী বলে দিয়েছিলেন, দিনাজপুরে গেলে যেন অবশ্যই টেস্ট করি সাদ্দামের কালো ভুনা। সারাদিনের উপোস আমরা। সকালে কান্তনগরে হালকা নাশতা করেছিলাম, আর পথে পথে কিছু শুকনো খাবার, এই যা। একদিন হতে চলল ভাত খাইনি। আমি গ্রামে বেড়ে ওঠা মাছে-ভাতের মানুষ। ভাত না হলে আমার চলে না। ভাত না খেলে মনে হয় কিছুই খাইনি। সাদ্দামের হোটেলে কালো ভুনা দিয়ে উদরপূর্তি করি। যেমন শুনেছিলাম তেমনই ছিল খাবারের স্বাদ। শেষে মাটির হাড়ির দই ছিল আরো অমৃত। চেটেপুটে খেয়ে শতমুখে বলি আলহামদুলিল্লাহ।

গোর-এ-শহিদ ঈদগাহ ও দিনাজপুর রেলস্টেশন দুটিই কাছাকাছি। ট্রেন আসতে এখনো মোটামুটি সময় বাকি। রিকশা নিয়ে চলে যাই ঈদগাহে। যেতে যেতে কথা বলে নিই চালকের সঙ্গে। তার অনুভূতি জানতে চাই, কখনো নামাজ আদায় করেছে কি না এখানে। কথায় আঞ্চলিক সুর মিশিয়ে খেটেখাওয়া লোকটি একনাগাড়ে বলে যায় তার আনন্দের কথা এবং কেমন করে গায়ে আতর মেখে লাখো নামাজির ভীড়ে সে ও তার শিশুপুত্র এসে শামিল হয়েছে সফেদ কাতারে। গোর-এ-শহিদ ঈদগাহের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে টের পাই এর বিশালতা। কী বিরাট এর আয়তন। যেন আদিগন্ত বিস্তীর্ণ হয়ে বিছিয়ে আছে এক শূন্য উদ্যান। সাত লাখের অধিক মানুষ একত্রে ঈদের নামাজ আদায় করতে পারে। শোলাকিয়া ঈদগাহের আয়তন সাত একর। অন্যদিকে দিনাজপুর গোর-ই শহীদ বড় ময়দানের আয়তন বাইশ একর, তিনগুণ বেশি। সে হিসাবে এটি দেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ। সাতচল্লিশে দেশবিভাগের বছর প্রথম এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। চোখে-মুখে বিস্ময় মেখে হাঁটি এর ভেতরে। বিশাল মাঠ জুড়ে সবুজ ঘাস, আর তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে বায়ান্নটি গম্বুজের সারি। কাছে গেলে চোখ যায় মেহরাবের দিকে। পঞ্চান্ন ফুট উঁচু সেই মেহরাব মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আগ্রার ফতেহপুর সিক্রির আদলে। আছে দুটি মিনার, বত্রিশটি খিলান। শেষ দুপুরের রোদে চিকচিক করছিল গম্বুজ ও মিনারের প্রতিটি চূড়া। এর প্রতিটিতে আছে বৈদ্যুতিক সংযোগ। সন্ধ্যার পর জ্বলে ওঠে নিয়ন আলো।

দেখতে দেখতে ফুরিয়ে এল বেলা। প্রত্যাবর্তনের হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন প্রবেশ করে স্টেশনে। আমরা ফিরে যাচ্ছি। বাইরে কার্তিকের মাঠে উড়ছিল সোনালি ডানার চিল।

সমাপ্ত

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *