মেলার পোকা ডাকা শুরু করলে আমরা বুঝতাম মেলা আসতেছে। বাড়িঘর, বাগান, খেত, কান মাথা ঝি ঝি করে সারাদিন রাত ডাকত মেলার পোকা। এরা দেখতে কেমন জানি না। কোথায় থেকে আসে আবার কই চইলা যায় তাও বলতে পারি না। এই সময়ে হঠাৎ এলোপাতাড়ি বাতাস আসত। আড়া জঙ্গল খানিক ময়লা ও কম ঘুটঘুটে। শিমুল ফেটে বাতাসে ভাসতে থাকে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো ধবধবে তুলতুলে তুলা। মনে হবে, একটা কাটাওয়ালা বিরাট গাছে গোলাপি রঙের বদলে শাদা লজ্জাবতী ফুল ফুইটা আছে। মানুষের ভিতরে একটা গা ছাড়া ভাব। কাঠালের মুচি আর ছোট ছোট সবুজ আমভরতি গাছ। আর লম্বা গাছ থেকে কোকিল ডাকত কুউউউ। আমরাও তখন ওরে ভেঙায়া ডাকতাম কুউউউউ, এরপর কোকিল। একসময় কোকিল জোরে ডাকতে ডাকতে রেগেমেগে চুপ হয়ে যাইত। দুপুরগুলো হয়ে উঠত চঞ্চল। কোনো কোনো রাইতে হঠাৎ ঝড়। বেড়ার ফাক দিয়ে পানির ছিটা লাগলে ঘুম ভেঙে যাইত। ঘরের উপর বয়সি আম ও কাঁঠাল গাছের ডাল কাঁটা মুরগির মতো ঝাপাইত যখন আমাদের ছোট্ট শরীর মায়ের কলিজার মধ্যে ঢুকে পড়ত যেন। সকালে উঠে দেখা যাইত অনেক আম ঝইড়া গেছে। ছোট্ট ছোট্ট দানা আম। সবুজ পাতা সারা উঠান। ভেজা ও নরম মাটি শরীর থেকে খুশবু ছেড়ে দিছে। আর চোখের সামনে ঝকঝকা একটা সকাল যেন মা ছাই দিয়ে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করছে দিনটারে।
মেলা হইত সাধারণত দুইবার। বোশেখ মাস ও দূর্গো পুজার সময়। মূলত বোশেখ মাসের মেলাটাই মেলার সিজন হিসেবে মানা হইত। কুটুম দাওয়াত থেকে শুরু করে বাচ্চাদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়া সবই এই মেলা ঘিরেই হইত। আমরা বলতাম গাংনাগরের মেলা। গাংনাগরে মেলা বইলাই এই নাম। বছরের পর বছর থেকে অনেকগুলা গাঁয়ের আনন্দের আয়োজন। ছোটদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে যাইত যে এই মেলার চমক কি! সার্কাসে কী দেখাবে এবার। এই ভাবতে ভাবতে ঘুম হারাম। সে এক বিরাট কাণ্ড। বিশাল মাঠের মধ্যে সার্কাসের তাঁবু টানানো হইত অনেক দিন ধরে। সার ধরে দোকান পাট, নাগরদোলা। আলো আর খুশবু। মেলার মাইকিং চলত পাড়ায় পাড়ায়। মেলার পোকা ও মাইকিং যেন বাতাসের গায়ে গায়ে ছড়াইতে থাকে মেলার বাজনা।
মেলাই শুধু আনন্দের জায়গা না মেলায় যাওয়া আসাটাও অনেক খুশির ঘটনা। একইসাথে ভয়েরও। ভয় আসলে আমাদের মতো ছোটদের। মেলা তো অনেকদূর। একলা তো যাওয়া না। আবার না যাওয়া যায় পায়ে হাঁইটা নাকি ভ্যানে। ভ্যানের ভাড়া তো পত্যেক দিন মা দিবে না। আর মেলা এত দূর একটা দুইটা তিনটা… পাঁচটা গ্রাম পার হইলে মাঠের মধ্যে হুজুরের পাগড়ির মতো সার্কাসের তাবু দেখা যাইত। আবার দিনে গিয়ে ফেরত আসা লাগত মাগরিবের আগেই। আমাদের নমলা পা খা খা রোদে বেশিদূর হাঁটতে পারত না। কখনো একটা ভ্যানের পিছে পা ঝুলায়া কিছুদূর আবার কিছুক্ষণ হাঁটা আবার একটা পাকুড় গাছের নিচে একটু দম নিয়ে হাঁটা শুরু। দুইপাশে নজর নজর ধানখেত। মাঝের কাচা রাস্তায় একদল বাচ্চা স্কুল পালায়া, মিছে কথা বইলা জীবনের পয়লা বিস্ময় আবিষ্কার করতে যাইতেছে। পকেটে একটা টাকাও নাই। চোখ চিলিক দিচ্ছে জাদুকরের পয়গাম!
দলবেঁধে মেলায় যাওয়াই নিয়ম। কিন্তু ছোটরা একলা গেলে হবে না। যাইতে হবে আব্বার সাথে। বা মামা চাচা বা বড় কোনো আত্মীয়ের সাথে। কারণ আসল জাদু তো সার্কাসে। দি লায়ন সার্কাস। আর এই সার্কাস শেষ হইতে হইতে অনেক রাত। আব্বার সাথে তার বন্ধু ও তাদের ছেলে মিয়ে মিলে বিকালে রওনা হইতাম সবাই। রাস্তায় অনেক ভ্যান। সবাই মেলায় যাচ্ছে। কেউ ফিরতেছে বাপের আঙুল ধরে। ঠোঁটে প্যা পু বাঁশি। গাঁয়ের কান তালি লাগা নীরবতারে মেলার খুশখবরি দিতে দিতে বাড়ি ফিরতেছে। অনেক দূর থেকেই মেলার হট্টগোল টের পাওয়া যাইত। পাঁচ-সাত গ্রামের বাচ্চারা নয়া কাপড়ে ফুটফুট হয়ে মেলার রঙরে আরও উজ্জ্বল করছে। নানান বয়সের মানুষ। নানান জিনিসের দোকান। হাড়ি পাতিল, হাতপাখা, বাঁশের বানানো জিনিস। কসমেটিকসের হরেক দোকান। মিষ্টির দোকান ছিল একদমই আলাদা। মিষ্টিরে আমরা বলি গোল্লা। মেলার বিশাল আকারের গোল্লা পাওয়া যাইত। সারা বছর এমন গোল্লা পাওয়া যাইত না কখনো। মানুষ বাজি ধরে গোল্লা খাইতো। আমরা তো আব্বাদের টানতে থাকতাম খেলনার দোকানের দিকে। হ্যাজাক বাতির আলোতে খেলনাগুলা যেন চকচক করে আমাদের ইশারা দিত। এত এত গাড়ি, পুতুল। এত সুন্দর ছোট্ট লাল গাড়ি তো জীবনেও দেখি নাই। আমি যেন বুকের মধ্যে গাড়িটারে লুকায়া ফেলি। টিনের পিস্তল, টমটম, কাগজের ফুল আরও কত্ত কী। আমরা যেন জিয়ানো মাছ, আনন্দ আর লোভ আমাদের দাত পড়া চেহারায় খলবল করতে থাকে।
নাগরদোলা ও চড়কির সামনে আমাদের এইটুক জান লাফায়া ওঠে। আব্বারে শক্ত করে ধরে বসে থাকি যেন আমি দুনিয়ার সবথেকে সাহসী বাচ্চা। একটু একটু যখন ঘোরা শুরু করে মনে হয়, ভয় পাওয়ার কি আছে। একটু পর চোখ বন্ধ করে পুরা দুনিয়া ও ফ্রক পরা শরীরটা আব্বার কলিজার মধ্যে লুকায়া ফেলতে চাই। মার কথা মনে পড়ে। সব শেষ হলে লাইন ধরে ঢোকা হয় সার্কাসের তাবুতে। বিখ্যাত দি লায়ন সার্কাস। চারপাশে গোল করে থই থই মানুষ। হইহই রইরই। মাঝখানে সার্কাসের লোকজন তাদের খেলা দেখায়। দড়ির উপর দিয়ে হাঁইটা যাওয়া, একটা ফুল উড়ে আসে কবুতর হয়ে, একটা মানুষরে কেটে ফেলার পরেও সে আবার তেমনই ফিরে আসে। আমরা যেন চোখ গোল গোল করে অনেক গল্প বলার খোরাক পেয়ে যাই। যেন আলিবাবা ও চল্লিশ চোরের দরজা আমাদের সামনে খুলে গেছে। শাদাকালো টিভি থেকে বের হয়ে জাদুকর আমাদের কল্পনারে জিন্দা করে দিলো এক লহমায়। সবশেষে আসল খেলা। হাতি। চারদিকে চিৎকার ও হাততালিতে তাবুর পর্দা ফেটে যেন সব উল্লাস উইড়া যাবে খেত পার হয়ে পাড়ায় পাড়ায়। একটা বড় হাতি তার পাশে বাবু হাতি। শুড় দিয়ে কত কী করে দেখায়। ঢেউ খেলে খেলে আমাদের মুখের সামনে বল তুলে দেয়। হাতির পিঠে আমাদের মতোই একটা বাবু। মনে হয় ও রাজা। খুল যা ছিম ছিম বলে সব গুপ্তধন বের কইরা ফেলবে।
অনেক রাত। গুটিসুটি মেরে ভ্যানে উঠে বসি। ভ্যানওয়ালাকে সাবধানে যাইতে বলা হয়। যে জায়গাগুলায় জান কবজ করা অন্ধকার ওইখানে ডাকাত পরার ভয়। আমাদের চোখে তখন সার্কাসের জাদু। বাতাসে কখন আব্বার কোলে ঘুমায় পড়ছি বলতে পারি না। সকালে দেখি বিছানায় শুয়ে আছি। হাতে ধরা লাল গাড়ি।
বাড়ি বাড়ি তখন কুটুমের আদর। বড় মাছ, মাংসের জিভ ভেজা খুশবু। জামাই, মেয়ে, নাতি, নাতনি দিয়ে উঠান ভইরা যায়। শালা, শালিদের নিয়ে মেলায় যাবে জামাই। নানার কোলে চড়ে নাতি নাতনিরাও টমটম বেলুন কিনে ফিরবে। কানমুচড়ি, নকুনদানা, বাতাসা, ছাচ ওয়ালা হাতি ঘোড়া নানানরকম মিঠাই। হাতি ঘোড়া মিঠাই আমরা হাতে নিয়ে ঘুরতে থাকি। একটু একটু কইরা খাই। রাতের বেলা উঠানে পালা হয়ে কানমুচড়ি চাবাইতে থাকি আর আপাদের গল্প শুনি। মেয়ের বাড়িতে বাপে বিশাল বড় মাছ পাঠায়। কোনো কোনো মাছ লম্বায় আমাদের মাথা ছুয়ে ফেলে। আমরা হা হয়ে মাছ কাটা দেখি। যত গরিবিই থাকুক জামাইরে দাওয়াত করতে হবে মেলায়। মায়ে হয়তো একটু একটু টাকা জমায়া রাখে। একটা মাঝারি কিংবা বড় মাছ কিনে জামাইরে খাওয়ায়। জামাইও মেলা থেকে গোল্লা, গুড়ের জিলাপি নিয়ে আসে। টানাহেঁচড়া ও ধারদেনার ভিতরেও বোশেখ মাসের ঝড়ের মতোই কয়টা দিন মিঠা ও গোলাপি হয়ে থাকে। লোল পড়া মুখে নানা নানী ডাক শুনতে শুনতে নিজেরাও আদরে গাল পাইতা দেয় জীবনের দিকে।
মেলার সিজনে খেলাধুলাও বদলায়া যাইত। ছোট্ট টমটম নিয়ে সারা রাস্তা দৌড়ায়া বেড়াইত সবাই। কারও কাছে লাটিম। লাটিম ঘুরানো শিখতে শিখতেই কয়েকদিন কাইটা যাইত। ছোট ছোট গাড়ি। সবথেকে কমন ও আনন্দের খেলা ছিল টিনের পিস্তল নিয়ে। আমরা যেন বাংলা সিনেমা থেকে বের হয়ে আসা ডাকাত পুলিশ। পিস্তলের সাথে ছোট্ট ছোট্ট মোটর দানার সমান গুলিও থাকত। ঠাশ ঠাশ শব্দে খেলার উত্তেজনা বাইড়া যাইত অনেক। পাড়ার একেকজনের কাছে একেক খেলনা। সবকিছু ভাগ করেই একেকবেলা একেক খেলায় কাইটা যাইত দিন।
দূর্গাপূজার মেলা বেশিদূর না গাঁয়ের কাছের বাজারেই বসত। হিন্দুপাড়াতে মন্দিরে দূর্গা সাজানো হইলেও বড় করে মন্ডপ বসানো হইত নির্দিষ্ট একটা জায়গায়। ওইখানেই বসত মেলা। এই মেলাও আমাদের জন্য আনন্দের। বাড়িতে কুটুম না আসলেও বড় কারো সাথে জিদ করেই মেলায় যাইতাম। এই মেলায় মেয়েদের জিনিসপত্র বেশি। কুমারপাড়া থেকে থরে থরে মাটির খেলনা দিয়ে ভরে যাইত মেলা। ছোট্ট ছোট্ট হাড়ি পাতিল পাটা বাটনা থেকে শুরু করে একদম সব। আর ছিল টেপা পুতুল। ছোট মাঝারি বড়। টেপা পুতুল মানেই খুশি। পুতুলের বিয়ে। মাটির হাড়ি পাতিল পুতুল কিনে আনে মেয়েরা। কখনো শুধুই হাড়ি পাতিল খেলা কখনো পুতুলের বিয়ে। ঘরের পিছনে আম কাঁঠাল গাছের শেকড়ের ফাঁকে রান্নাঘর সাজানো, পুতুলের ঘর সাজানো হইত। কখনো মাটির পিরালী সাথে বালু দিয়ে দাগ দিয়ে দিয়ে বানানো হইত ঘর। তার মধ্যে মেলা থেকে কিনে আনা রঙিন পুতুল, হাড়ি। কিছুদিন পরেই এগুলা থেকে হয়তো মন উঠে যাইত। পিরালির পাশে বিষ্টিতে ভিজতে থাকত হাড়ি পাতিল। আবার পরের বছরের মেলার দিকে চায়া থাকত আমাদের পুতুল খেলার হাউশ!