কখনো কখনো স্মৃতিই হয়ে ওঠে প্রস্তুতির অংশ। গত কয়েকদিন যাবত টুকরো টুকরো স্মৃতি বুক পকেট হাতড়ে বের করে এনে নির্মাণ করতে চাচ্ছিলাম সেই প্রস্তুতি পর্বের ইতিহাস। কিন্তু এইসব স্মৃতি যতটুকু অবচেতন মনে ঘুরপাক খায়, চেতনে ততটাই বিস্মৃত। আর আয়োজন করে লেখতে বসার পর মনে হয় কর্পূরের মতো উড়ে উড়ে যায় সব।
২০১২-২০১৩ সালের দিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাল-পর্বে নতুন এবং অচেনা পর্ব যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন আমি বেড়ে উঠছিলাম রাজধানীর একদম প্রাণ ভোমরার ভেতর। টিয়ার শেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে ঘুম ভাঙে আর ওয়াক্তিয়া নামাজ পড়তে গেলে পুলিশি হামলায় পল্টনের রাস্তায় রেখে আসি এক পায়ের জুতা। তখনকার স্মৃতিগুলো আদতেই টুকরো টুকরো, বহুবার চেষ্টা করেছি একসাথে পুরোটা লিখে ফেলব, কিন্তু প্রতিবারই শুরু করতে হয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে। আর খানিকটা আগাতেই খেই হারিয়ে ফেলে কিবোর্ড। মাথার ভেতর কিলবিল করে নাইটিংগেল মোড়, ফকিরাপুল পানির ট্যাংক, আল রাজি টাওয়ার, হাউজবিল্ডিং আর দক্ষিণ গেটের আশপাশ এলাকা। বিজয় নগরের আইল্যান্ডের উপর থরে থরে পড়ে থাকা গাছগুলোর মতোই নুয়ে পড়ে আমার কৈশোর।
মে মাসে আমার জীবনের সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে—এই কথা আমি ছোটবেলা থেকেই বিশ্বাস করতাম। কেন যেন ঘটতও তাই। মে মাস প্রীতির কারণ হলো আমার জন্ম মে মাসে। আমার যদ্দূর মনে পড়ে মক্তবে প্রথম কোরআন শরীফের সবক নিয়েছিলাম সে মাস, হেফজ শুরু করেছিলাম মে মাসে, শেষও করেছিলাম কোনো এক মে মাসে। আমার প্রথম গল্পও ছাপা হয়েছিল মে মাসে, এক শিশু-কিশোর পত্রিকার জৈষ্ঠ্য সংখ্যায়। এই মে মাসেই নীরব গণহত্যার সাক্ষী হয়ে গেল ঢাকা শহর।
আমি তখন পল্টন মাদরাসায় পড়ি। পাঁচ তারিখ সারাদিন মাদরাসায় বসে দেখছি পুলিশ আর হেফাজত কর্মীদের অসম যুদ্ধ। আসলে হেফাজত কর্মী বললে আসলে ভুল বলা হবে। সেদিন ঢাকায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষ এসেছিল। আলাদা করে কারও কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। পল্টনে আমি যে মাদরাসায় পড়তাম সে মাদরাসার ঠিক পাশেই ছিল সাপ্তাহিক লিখনীর অফিস। ছয় তারিখ ভোরে হুজুরদের টলমল চোখ আর বিভ্রান্ত চাহনি দেখেও বুঝতে পারি নাই আসলে কি হয়েছে গতরাতে। অনেক রাত অব্দি জেগে ছিলাম আমি। বিবিসি বাংলার খবরে এক হুজুর শুনছিলেন বেগম জিয়া বিএনপির সব নেতা-কর্মীদের মতিঝিল গিয়ে অবস্থান নেওয়ার জন্য বলেছেন। রাতে এক দুইবার কারেন্ট গিয়েছিল বলে মনে পড়ে। আর টিনের চালের ওপর লাঠি দিয়ে বাড়ি দেওয়ার মতো যে শব্দ—যেটা পরে আমরা জেনেছি ছররা গুলি ছোড়ার শব্দ; সেই শব্দ শুনেছি অনেক রাত অব্দি।
একথা অস্বীকার করব না, সে রাতের ভয়াবহতা, প্রকৃত ইতিহাস বা রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট আমি আরো এক দুই বছর পর বুঝতে শুরু করেছি, এখনও বুঝতে চেষ্টা করছি। রাতের অন্ধকারে হাজার হাজার মানুষকে মেরে গুম করে ফেলা হয়েছে, ভোরের আলো ফোটার আগে সব রক্ত মুছে সাফ করে ফেলা হয়েছে বা মাতুয়াইলে ময়লার ভাগাড়ে এনে সব লাশ ডাম্ব করা হয়েছে, জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বা হিন্দী ভাষার পুলিশকে দেখা গেছে সেদিন রাতে… লোকমুখে এসব কথা ঠিক কতদিনে আর কীভাবে ছড়িয়ে গেছে সেটা মনে করতে পারি না। তবে নিজেকে আবিষ্কার করি কখনো এসব আলাপের পক্ষে জোরালো কণ্ঠস্বর হিসেবে। মাদরাসার সিঁড়িতে বসে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে কথা বলছি আমি, আমার চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে ছেলেপেলেরা। আবার এই আমাকেই আবিষ্কার করি কোনো এক আড্ডায় খুব গম্ভীর হয়ে ডিব্যাংক করছি প্রতিটি গুজব। প্রমাণ করার চেষ্টা করছি কেন এত মানুষ এক রাতে মেরে ফেলা সম্ভব না। কখনো আবার ছুটে বেড়াচ্ছি লাইব্রেরির মর্গে। মেলাতে চেষ্টা করছি নানামুখী ঘটনা। শাহবাগের নেপথ্যে যারা ছিল তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি, শাপলার ভুক্তোভোগীদের বয়ান খুঁজে বেড়াচ্ছি। উপন্যাস লেখছি শাপলা-শাহবাগের বাইনারি ভাঙার জন্য। ফিকশনের ভেতর দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছি নেপথ্যে ছিল অন্য কেউ, অন্য কোনো পক্ষ।
চব্বিশ পরবর্তী সময়ে আর্কাইভিং শুরু করার যে সামান্য চেষ্টা আমি করেছিলাম সেটা মূলত তেরোর অসমাপ্ত কাজ হিসেবে। সেদিনের রাতের প্রকৃত ইতিহাস, লাশের সংখ্যা নির্ণয় করতে না পারা, নেতাদের দ্বন্দ্ব, সরকারের প্রতারণা—এসব কিছু মেইনস্ট্রিম না হওয়ার কারণ ছিল আর্কাইভিং না করা। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ফিকশন রচিত হয়েছে, প্রতি বছর প্রতক্ষ্যদর্শীদের নানারকম বয়ান সামনে এসেছে, বিশ্বাসের বহুবচনের মতো কিছু বই বের হয়েছে। তবে ‘শাপলানামা‘ তৈরি হতে অনেক দেরি হয়ে গেছে আসলে।
জুলাইর শেষদিকেই তাই আমি নিয়্যত করেছিলাম, এইসব দিন শেষ হওয়ার পর সবার আগে আমি গণহত্যার দলিল তৈরি করা শুরু করব। গালভরা শব্দ ‘আর্কাইভ‘র সাথে তখনও আমি সেভাবে পরিচিত না। শাপলার ক্ষতই যে আমাকে জুলাই গণহত্যার দলিল তৈরি করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে সে কথা আমি অস্বীকার করি কী করে? জুলাইর পর বেসরকারি উদ্যোগে যতজন আর্কাইভ করছে তাদের একটা বড় অংশই যে মাদরাসার বারান্দা থেকে উঠে আসা—সেটা আপনারা ঠিকঠাক নজর দিলেই দেখতে পাবেন। আমার ধারণা সাবকনশাস মাইন্ডে তারা সবাই শাপলার ক্ষত থেকেই এই কন্টকাকীংর্ণ পথ বেছে নিয়েছে।
শাপলার শহীদ পরিবার নিয়ে মুহিম মাহফুজের লেখা—‘কেমন আছে শহীদ পরিবার’ কয়েক কিস্তি ছাপা হয়েছিল মাসিক রহমতে। সাপ্তাহিক লিখনীর কয়েকটা সংখ্যায় ছোট ছোট প্রতিবেদনের মতো করে টুকটাক লেখা থাকত শাপলা নিয়ে। আমার মনে পড়ে, সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যানের ভেতর এক সন্ধ্যায় সবুজ ঘাসের উপর বসে আছে সালাউদ্দিন জাহাঙ্গীর, সুলাইমান সাদী, ইফতেখার জামিলসহ আরো কয়েকজন, সেই সন্ধ্যার আধো আলো, আধো অস্পষ্ট মজলিসে আছি আমিও। আলাপ হচ্ছে শাপলা নিয়ে একটা কবিতার সংকলন বের করা হবে। কওমি তরুণদের কাছ থেকে কবিতা আহ্বান করা হবে। আমি কবিতা লেখতে পারি না তবে ততদিনে গল্প লিখে ফেলেছি অনেকগুলো। আমি বললাম, ‘একটা গল্প সংকলনও করা হোক।’ সেদিনের সে আলাপ কতটুকু এগিয়েছিল জানতে ম্যাসেনজারের চ্যাট হিস্ট্রি বেয়ে পেছনে যেতে হবে প্রায় এক দশক।
আবছা আবছা মনে পড়ে সিলেটে বা কোনো এক জায়গায় কুইজ প্রতিযোগিতায় শাপলা সংক্রান্ত প্রশ্ন থাকার কারণে আয়োজক কমিটির একজন গ্রেফতার—এমন এক সংবাদের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিছু সাহসী(!) উদ্যোগ। শাপলা নিয়ে পড়া সবথেকে ভালো গল্প, যেটা লিখেছিলেন জুবায়ের মহিউদ্দিন। আমি জানি না গল্পটা এখন পড়লে আমার আগের মতোই ভালো লাগবে না, আমি গোটা একটা উপন্যাস লিখে ফেলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করব কিনা। তবে জুলাই জাদুঘরে শাপলা সেকশনের কাজ করতে গিয়ে যখন আমি সাপ্তাহিক লিখনীর পুরনো সংখ্যাগুলো পাতা উল্টেছি, তখন আমি মিশ্র এক অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়েছিলাম। হতে পারে জুলাইর তাজা স্মৃতি, রক্তের দাগের কাছে কিছুটা ফিকে হয়ে গিয়েছিল মে মাস। অথবা শৈশবে ড্রেসিং টেবিলের পায়ার কাছে দাঁড়িয়ে যতটা বিশাল লাগত আয়না, বড় হওয়ার পর সেই আয়নাতে কেবল গলা অব্দি দেখতে পাওয়ার যে অনুভূতি, তেমন কোনো অনুভূতিতে আক্রান্ত হয়েছিলাম আমি।
প্রতি বছর যখন মে মাস আসত, তখন শহীদদের নিয়ে কোনো দোয়া মাহফিল হচ্ছে না কেন, শহিদ পরিবারের খোঁজ হেফাজতের নেতারা নিচ্ছে না কেন, এমন নানা আলাপ সামনে আসত। চব্বিশ পরবর্তী সময়ে মে মাসের শহীদদের সেই বঞ্চনা কিছুটা হলেও কমেছে। সংসদে যখন অন্যান্য শহিদদের সাথে তাদের নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন মনে হয়—এই আন্দোলন আসলেই বৈষম্যবিরোধী ছিল।
মে থেকে জুলাই মাসে আসতে যতটুকু শিখেছি, পরের কোনো মাসে নিশ্চয়ই তা কাজে লাগবে। কাজে লাগবে জুলাইর নানা ব্যর্থতা। স্মৃতি সংগ্রহের প্রথম শর্ত যে আর্থিক সক্ষমতা সেটা আমরা পরের বার নিশ্চয়ই মনে রাখব। মনে রাখব, পেছনে থেকে যারা টেনে নামিয়ে দেয় তাদের পরিচয়। কখনো কখনো যারা খুব কাছেরই কেউ। এই লেখাটা যখন লেখছি তখন আমি জানতে পারছি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ক্যাম্পেইন করার জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল আমার ছেড়ে আসা সংগঠন। আমি বারবার পড়ি, হাতের কর গুণে ঠিকঠাক বোঝার চেষ্টা করি ঠিক কতগুলো শূণ্য হলে সেটাকে এক কোটি বলে।
আর্কাইভ করতে গিয়ে পদের চাপে পদদলিত হওয়া আমি যে, ওই কিছু টাকার জোগান হবে সংগঠন থেকে আর ওই টাকা দিয়ে আর্কাইভটা শেষ করা যাবে চিন্তা করে সংবাদ সম্মেলনে বসেছিলাম, সেকথা হয়ত অনেকেই বিশ্বাস করবে না। পেছনে তাকালে আমার নিজেরই বিশ্বাস হয় না। সেই যে ঢাকা মেডিকেলের বারান্দায় বারান্দায় নাক চেপে ঘুরে বেড়ানো আমি, আর রূপায়ন টাওয়ারের এসি রুমে বসে থাকা আমাকে কোনভাবেই মেলাতে পারি না। আমার মনে পড়ে ডিসেম্বরের এক বিকেলে নরসিংদীতে বসে আমি ফেসবুকে লেখছি, নিজের পকেটের টাকায় আমি আর আর্কাইভিং চালাতে পারছি না। এর আগে আমাদের উদ্যোম দেখে একটা প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যামেরা আর হাজার ত্রিশেক টাকা দিয়ে বলেছিল তোমরা তোমাদের মতো কাজ করো, কেবল র ফুটেজগুলো আমাদেরকেও দিয়ো। আমরা আমাদের নামে সেগুলো প্রকাশ করবো। আমার মাথায় তখন গণহত্যাল দলিল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়। যে যেটা বলে, সেটাতেই রাজি হয়ে যাই। টাকা আর ক্যামেরা কয়েক হাত ঘোরার পর দিলাম কাছের এক বন্ধুকে বিশ্বাস করে। কাজ চলছিল ভালোই। ঢাকার বাইরে কয়েক জায়গায় গিয়ে ইন্টারভিউও নেওয়া হচ্ছিল। হুট করে একদিন আমাদের দাতা প্রতিষ্ঠান কল এলো, বলল, তোমরা যা করেছ, করেছ। এখন এই মুহূর্ত থেকে কাজ বন্ধ। আগের কাজের হিসেব দাও, বাকি টাকা ফেরত দাও। আর তখন আমি জানতে পারলাম আমার সেই বন্ধুটি তার হাতে থাকা সব টাকা খেয়ে ফেলেছে, আর ভেবে রেখেছে কাজ কাজ করে করে সেই টাকা শোধ করে দিবে। ক্যামেরা যে সহিহভাবে আছে সেটা দেখে আশ্বস্ত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আমার। বারো হাজার টাকা ধার করতে হলো একদিনের ভেতর। তারপর সেই টাকা আর ক্যামেরা ফেরত দিয়ে এলাম। এই ঘটনার প্রভাব এতটাই আমার ভেতরে পড়েছিল যে, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ক্রাউড ফান্ডিং এর মাধ্যমে কাজ চালানো ছাড়া আর কোনো রাস্তা দেখতে পাচ্ছিলাম না সামনে।
আমার ওই পোস্টের পরেই আলাপ হলো বৈছাআ একটি নতুন সেল করবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেল। ওই সেল থেকে অর্থের যোগান দেয়া হবে যারা বেসরকারি উদ্যোগে আর্কাইভিং করছে তাদেরকে। এরপর এক সন্ধ্যায় হুট করে ডেকে সেই সেলের সম্পাদক বানিয়ে দেয়া হলো আমাকে। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, আর্কাইভিংটা তাহলে ঠিকঠাক করা যাবে।
কাজ আসলে এরপর হয়েছে। আমি করতে না পারলেও নানাভাবে হয়েছে। জুলাইকে এখন মুছে ফেলা সহজ হবে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকবে হবে অনেক। চব্বিশের বই মেলাতে দেখলাম লেখক থেকে প্রকাশক বনে যাওয়া এক লোক ‘মিয়া ভাই’ নামে শেখ মুজিবকে নিয়ে বই বের করলেন। জুলাই আসতে তখনও মাস তিনেক বাকি। পঁচিশের মেলাতে দেখলাম ভদ্রলোক বের করেছেন ‘রক্তস্নাত জুলাই’। মেলার মাঠে জুলাইর গল্প নামে একটা অনুষ্ঠান করেছিলাম আমরা। শহিদ পরিবার, আহত আর জুলাইর সংগঠকরা এসে তাদের গল্প বলত। কয়েকদিন টানা বিরক্ত করলেন এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক, জুলাই নিয়ে পুঁথি লিখেছেন তিনি। তাকে এই মঞ্চে সুযোগ দিতে হবে। একটু খোঁজ নিয়েই দেখা গেল তার সর্বশেষ পুঁথি জুলাই নিয়ে হলেও শেখ হাসিনা, শেখ রাসেল, পূণ্যভূমি টুঙ্গিপাড়া তার সব পুঁথির বিষয়বস্তু। জুলাই নিয়ে শত শত বই দেখে তাই আশ্বস্ত হতে পারি না। মনে হয়, ওই শাপলা নিয়ে হাতে গোনা কয়েকটা বইয়ের মতো হলেই ভালো হতো। জুলাই নিরাপদ থাকত।
একবার বেশ জোরেসোরে প্রচার শুরু হলো, আমি জুলাইর নামে গ্রিফ পর্ন চর্চা করছি। গ্রিফ পর্ন (Grief Porn) হলো গণমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়ার এমন এক প্রবণতা, যেখানে কারও ব্যক্তিগত শোক, যন্ত্রণা, ট্র্যাজেডি বা মৃত্যুর ঘটনাকে অতিরঞ্জিতভাবে, সংবেদনশীলভাবে এবং দর্শকদের আবেগ বা কৌতূহল মেটানোর উদ্দেশ্যে প্রদর্শন করা হয়। সহজ কথায়, গ্রিফ পর্ন মানে হলো কারও ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে বা শোকের সময়কে নিজের ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যবহার করা। এই আলাপ আমাকে একদম বরফের মতো অসাড় করে দিল। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে কীবোর্ড ধরতে গিয়েও আর পারলাম না। পেছনে পড়ে থাকলো আমার শাপলার ক্ষত, জুলাইর দাগ।
সব কিছু মিথ্যা মনে হতে থাকল, সাবধানে পা ফেলতে থাকলাম। কোথাও একটা শব্দ বেশি খরচ করলেই মনে হতো, আমি জুলাই বিক্রি করে নিজের ফায়দা নিচ্ছি। খোলসের ভেতর চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছিলাম না। সবাইকে, সবকিছুকে কেমন অস্পষ্ট লাগছিল। মনে হচ্ছিল, আমি আসলে এসবের জন্য না। এখানকার রিখটার স্কেলের মাপ আমার জানা নেই। কত মাত্রার ভূমিকম্পের পর টিকে থাকা যাবে সেটা আমি জানি না। এই নদীতে পানির গভীরতা কতুটুকু, সাঁতার না জানা আমি সেই তথ্যও জানি না। তাই ভিষণ মন খারাপ নিয়ে মাগরিবের আজান শুনে পুরো ম্যাচ খেলতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে ছোট বালক যেমন বাড়ি ফিরে বা শুক্রবার বিকেল বেলায় চোখের কান্না লুকিয়ে যেভাবে মাদরাসায় ফিরতে হয় তালবে এলেমকে, সেভাবেই ফিরে এসেছি আমি লেখার টেবিলে।