হারানো মনীষীদের স্মৃতির খোঁজে

চলে যাওয়া আকাবির মনীষীদের ওপর বাংলাদেশে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের রেওয়াজ খুব বেশিদিন আগের নয়। বিগত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে সম্ভবত প্রথম কোনো স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেটা মুজাহিদে আজম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ. স্মারকগ্রন্থ। এটি প্রকাশিত হয় মাদরাসা দারুর রাশাদের ব্যবস্থাপনায়। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের স্বপ্নদ্রষ্টা মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান। তিনি মাদরাসা দারুর রাশাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম এবং মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর খলিফা। ফরিদপুরী রহ.-এর চিন্তাধারায় প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত। তিনি এই কাজে উদ্বুদ্ধ হন ভারত-পাকিস্তানের আলেমদের কালচার দেখে। সেখানকার কোনো আলেম মনীষী চলে যাওয়ার পর পত্রিকাগুলো রাতারাতি ডাউস সাইজের স্মরণসংখ্যা প্রকাশ করে। স্বতন্ত্র স্মারকগ্রন্থও হয়। পরবর্তী সময়ে হয় জীবনীগ্রন্থ। বাংলাদেশে এর আগে ছোটখাটো স্মরণিকা হলেও নিয়মতান্ত্রিক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। ফলে বলা যায়- দারুর রাশাদই মনীষীদের ওপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের আঁতুড়ঘর এবং এই সৃজনশীল কাজের উদ্যোক্তা মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান। ওই স্মারকগ্রন্থটির কাজ চলে বেশ কয়েক বছর ধরে। সম্ভবত নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কাজের সূচনা হয় এবং গ্রন্থটি আলোর মুখ দেখে দশকের শেষ দিকে ১৯৯৮ সালে। 

স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশের অনেক বছর পরে দারুর রাশাদে যাওয়ার এবং মাওলানা মুহাম্মাদ সালমানের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ আমার হয়। তখন স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের বিভিন্ন গল্প নানাজনের কাছে শুনি। একটি স্মারকগ্রন্থের কাজ কীভাবে হয়, লেখা সংগ্রহে কতটা শ্রম দিতে হয়, এই কাজে কতটা সাধনার দরকার পড়ে- এসব বিষয় তখন আঁচ করতে পারি। তখন মনে মনে সাধ জাগে- এ ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে যদি যুক্ত হতে পারতাম! ততদিনে মাওলানা সালমান সাহেব আমাদের ভেতরে মনীষীদের জীবনী ও স্মৃতিকথা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ইতোমধ্যে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর ওপর ডাউস সাইজের স্মারকগ্রন্থটি বেশ সাড়া ফেলে দেয়। রুচি-বৈচিত্রের বিচারে এটিই তখন পর্যন্ত সেরা। এর আগে এতো বৃহৎ পরিসরে আর কোনো স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। এই স্মারকগ্রন্থটির প্রায় সব কাজ নির্বাহ করেন লেখক-সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ। ততদিনে তাঁর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তিনিও নানা সময় স্মারকগ্রন্থের গল্প শোনান। কীভাবে সারাদেশ ঘুরে লেখা সংগ্রহ করেছেন, কার কাছে কী অভিজ্ঞতা হয়েছে মোটামুটি সব গল্পই তাঁর কাছ থেকে শোনার সুযোগ হয়। এর মধ্য দিয়ে স্মারকগ্রন্থের প্রতি আমার ঝোঁক আরও বেড়ে যায়। হাফেজ্জী হুজুর স্মারকগ্রন্থের কাছাকাছি সময়ে চলে যাওয়া আরও কয়েকজন আলেম মনীষীর ওপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রায় সব স্মারকগ্রন্থই পড়ার সুযোগ হয়। এতে আকাবিরের স্মৃতি, কর্ম ও সাধনা সংরক্ষণের তাগিদ আরও বেশি করে অনুভব করি।

মাদরাসা দারুর রাশাদে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা এবং পরবর্তী সময়ে সেখানকার প্রকাশনার দায়িত্ব পাওয়ায় মনীষী চর্চার সুবর্ণ সুযোগ সামনে আসে। এই কাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ি। দারুর রাশাদে নিয়মিতই কোনো না কোনো মনীষীর ওপর চর্চা হতো। আর-রাশাদ পত্রিকায় মনীষী আলেমদের জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা থাকত। এর বেশির ভাগই আমাকে লিখতে হতো। এছাড়া মাওলানা সালমান সাহেবের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন মনীষীর ওপর নিয়মিত বইপুস্তক প্রকাশিত হতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই সেগুলোর কাজের সঙ্গে আমাকে যুক্ত থাকতে হয়। এমনকি অন্য কেউ লিখলেও সেটাকে ছাপার উপযোগী করা এবং পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার কাজটি আমাকে করতে হতো। মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, তাবলিগ জামাতের আমির মাওলানা আব্দুল আজিজ রহ., বিশ্ব তাবলিগের আমির হজরতজি মাওলানা ইউসুফ রহ., তাবলিগের মুরব্বি মাওলানা সাঈদ আহমদ খান রহ., আকাবিরে দারুল উলুম দেওবন্দসহ জীবনীমূলক বিভিন্ন বইপত্র তখন দারুর রাশাদ থেকে প্রকাশিত হয়। সম্ভবত ২০০৭-০৮ সালের দিকে ভারতের বিখ্যাত আলেম মাওলানা মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমী রহ.-এর ওপর একটি স্মারকগ্রন্থ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যথারীতি মাওলানা সালমান এর উদ্যোক্তা। তিনি এদেশে ততটা পরিচিত নন। বেশির ভাগ লেখাই উর্দু স্মারক থেকে অনূদিত। সেই স্মারকগ্রন্থটি মাওলানা লিয়াকত আলী সাহেবের সম্পাদনায় প্রকাশিত হলেও প্রায় পুরোটার সঙ্গেই আমার সম্পৃক্ততা ছিল। উর্দু লেখা অনুবাদ থেকে শুরু করে সম্পাদনা, ছাপার উপযোগী করা এবং প্রকাশনার প্রতিটি ধাপে আমি যুক্ত ছিলাম। দারুর রাশাদের প্রকাশনা বিভাগের কর্মী হিসেবে সেটা আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এজন্য ভূমিকায় নাম থাকলেও ইনারে নাম ছিল না।

মাদরাসা দারুর রাশাদ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর চিন্তাধারার প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সালমানের চিন্তা-চেতনাজুড়ে এই মনীষীর প্রভাব। এজন্য দারুর রাশাদ থেকেই নদভী রহ.-এর জীবন ও কর্মের ওপর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এর ৭/৮ বছর পর একটি স্মারকগ্রন্থ করার উদ্যোগ নেন মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান। ঢাকায় অবস্থানরত প্রায় সব নদভীকে দারুর রাশাদে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সবাইকে নিয়ে আলী মিয়া নদভীর ব্যক্তিত্বের শান অনুযায়ী একটি স্মারকগ্রন্থ হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। ‘নামকরা নদভীদের’ নিয়ে একটি সম্পাদনা কমিটিও হয়। দারুর রাশাদের প্রকাশনা বিভাগের দায়িত্বশীল হিসেবে আমাকেও যুক্ত করা হয় সেই সম্পাদনা কমিটিতে। আমি মনে মনে খুশিই হই যে, অন্তত এতো বড় বড় লেখক-সাহিত্যিকদের কাছ থেকে কিছু শেখার সুযোগ হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেই নদভীদের কাউকেই পরবর্তী সময়ে কাজে পাওয়া যায়নি। দিনের পর দিন তাদের জন্য অপেক্ষা করে মাওলানা সালমান সাহেব অনেকটা রাগ করেই বললেন- ‘আমরাই কাজ করবো। যতটুকু হয় হবে।’ আমাকে বললেন, ‘আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করে দাও।’ আমি তাঁর নির্দেশনা মতো কাজ শুরু করলাম। সালমান সাহেব নিয়মিত তাগাদা দিয়ে বেশ কিছু লেখা সংগ্রহ করে দিলেন। উর্দু থেকে অনুবাদ করা হলো অনেক লেখা। টানা কয়েক বছর কাজ করে অবশেষে সাত শতাধিক পৃষ্ঠার একটি স্মারকগ্রন্থ আমরা করতে সক্ষম হই। মাওলানা সালমান সাহেবের পৃষ্ঠপোষকতায় সেই স্মারকগ্রন্থের সম্পাদক ছিলেন মাওলানা লিয়াকত আলী, আমি নির্বাহী সম্পাদক। সেই স্মারকগ্রন্থটি এখনো বাজারে আছে। মাওলানা আলী মিয়া নদভীকে জানার জন্য এটি সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১১ সাল পর্যন্ত আমি দারুর রাশাদে ছিলাম। এই সময়ে আরও কয়েকটি স্মারক ও জীবনীগ্রন্থের কাজ করার সুযোগ হয়। বিশেষ করে একটি স্মারকগ্রন্থের পুরো কাজই আমার হাতে হয়। সেটি হচ্ছে মাওলানা আবু সাঈদ ওমর আলী রহ. স্মারকগ্রন্থ। তিনি সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর খলিফা ছিলেন। অত্যন্ত মুখলিস দাঈ হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিশ্বকোষ বিভাগের পরিচালক ছিলেন। নওমুসলিমদের মধ্যে দাওয়াতি কাজ করতেন। লেখক-অনুবাদক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি রয়েছে। আলী মিয়া নদভীর বেশির ভাগ বইয়ের বাংলা অনুবাদ তিনি করেছেন। তাঁর ইন্তেকালের পর দারুর রাশাদে একটি স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। যথারীতি মাওলানা সালমান সাহেব পৃষ্ঠপোষক। আর দারুর রাশাদের কাজ মানেই আমার যুক্ত থাকা। তখনও আবু সাঈদ ওমর আলী সাহেবের ভক্ত-অনুরাগী অনেককে নিয়ে কয়েকটি মিটিং হয়। মিটিংগুলোতে মনে হতো, সবাই কাজের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেবেন! কিন্তু কাজের সময় আর কাউকে সেভাবে পাওয়া যেতো না। দিনের পর দিন তাদের অপেক্ষায় থেকেও যখন কোনো সহযোগিতা পাওয়া গেল না তখন সালমান সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন কেউ আসুক আর না আসুক আমিই স্মারকগ্রন্থটি করব। এমনকি আবু সাঈদ ওমর আলী সাহেবের পবিরার থেকেও কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। তবু আমরা অনেক কষ্টে, দিনের পর দিন লেগে থেকে কিছু লেখা সংগ্রহ করলাম। অবশেষে মাঝারি সাইজের একটি স্মারকগ্রন্থ হয়। সম্ভবত ২০১১ সালের মাঝামাঝিতে সালমান সাহেবের তত্ত্বাবধানে আল ইরফান লাইব্রেরি থেকে সেই স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। যথারীতি সম্পাদক মাওলানা লিয়াকত আলী আর আমি নির্বাহী সম্পাদক। এটাই দারুর রাশাদে আমার সর্বশেষ স্মারকগ্রন্থ।

দুই.

আগে কয়েকটি স্মারকগ্রন্থে কাজ করলেও সেই অর্থে মাঠে-ময়দানে দৌড়ানোর কাজটি আমাকে করতে হয়নি। ফলে স্মারকগ্রন্থ করার প্রকৃত স্বাদটি পাইনি। শায়খুল হাদিস আল্লামা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী রহ. স্মারকগ্রন্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেই স্বাদটিও পাওয়ার সুযোগ হয়। এখন পর্যন্ত স্মারকগ্রন্থের সত্যিকারের অভিজ্ঞতা এই স্মারকেই অর্জিত হয়েছে। হজরত গহরপুরী রহ. ছিলেন দেশের শীর্ষ ও বরেণ্য আলেমদের একজন। টানা প্রায় নয় বছর জাতীয় প্রতিষ্ঠান বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সভাপতি ছিলেন। তাঁর পরেই হাটহাজারীর হুজুর সভাপতি হন। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া গহরপুরসহ অসংখ্য দীনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সিলেটের লোক হলেও শাইখুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর এই বিশিষ্ট শাগরেদের দেশজুড়ে ছিল ব্যাপক প্রভাব। বিশেষ করে আমাদের ময়মনসিংহ অঞ্চলে তাঁর প্রভাব ছিল একচেটিয়া। ছোটবেলা থেকেই গহরপুরী হুজুরের নাম শুনে আসছি। এই ব্যক্তিত্বের প্রতি একটা দুর্বলতা কাজ করতো বরাবরই। ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। এর প্রায় চার বছর পর তাঁর ওপর একটি প্রামাণ্য স্মারকগ্রন্থ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূল উদ্যোক্তা তাঁর একমাত্র ছেলে এবং সুযোগ্য উত্তরসূরি মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু। তিনি বর্তমানে গহরপুর জামিয়ার মুহতামিম এবং বেফাকের সহসভাপতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে ১১ দলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বেশ আলোচিত হয়েছেন। গহরপুরী হুজুরের খলিফা, শাগরেদ ও মুহিব্বিনদের একটি বড় অংশও স্মারকের কাজে যুক্ত ছিলেন। যেহেতু এর আগে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মানসম্পন্ন হাফেজ্জী হুজুর স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেন মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ, এজন্য তাঁকেই সম্পাদক হিসেবে বাছাই করা হয়। পুরো কাজের দায়িত্ব তিনিই পান। সেই সময় তিনি দৈনিক আমার দেশের সহ-সম্পাদক এবং মাসিক আল-কাউসারের নির্বাহী সম্পাদক। লেখালেখির সুবাদে ইতোমধ্যে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পড়াশোনা শেষে দারুর রাশাদেই আমার কর্মজীবন শুরু হয়। শরীফ মুহাম্মদ সাহেবের বাসাও দারুর রাশাদের পাশে সাংবাদিক আবাসিক এলাকায়। প্রায় প্রতিদিনই দেখা-সাক্ষাৎ ও নানা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হতো। এর মধ্যেই তিনি গহরপুরী রহ. স্মারকগ্রন্থে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আমাকে অফার দেন। তাঁর সঙ্গে কোনো কাজে যুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে আমার জন্য ছিল সৌভাগ্যের। ফলে আমি সেই অফার লুফে নিই। তরুণদের মধ্যে আবদুল্লাহ মোকাররম, আলী হাসান তৈয়ব ও রোকন রাইয়ানও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। মোকাররম ভাই সিলেটে এক-দুটি সফরে ছিলেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের কিছু লেখা সংগ্রহ করেন। আলী হাসান তৈয়ব ঢাকা-বগুড়ার কয়েকটি লেখা এবং রোকন ঢাকার কিছু লেখা সংগ্রহ করেন। এর বাইরে বড় কাজটি আমিই করি। 

তখনও রাজু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। সম্ভবত ২০০৯ সালের মাঝামাঝিতে স্মারকগ্রন্থের কাজে প্রথমবার সিলেটে যাই। সেই সূত্রেই রাজু ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ও সম্পর্ক। সেটা এক সময় ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। কাজের মাধ্যমে গড়ে উঠা সেই বন্ধুত্বে গত প্রায় দেড় যুগেও কোনো চিড় ধরেনি। স্মারকগ্রন্থের পরিকল্পনা এবং প্রতিটি লেখা শরীফ মুহাম্মদ সাহেব নিজেই সম্পাদনা করেন। শুরুর দিকে তিনি সিলেটে কয়েকটি সফরও করেন। সেসব সফরে বিশিষ্টজনদের অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়ে লেখাও তৈরি করেন। তবে অন্যান্য ব্যস্ততা এবং বিভিন্ন কারণে মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে তাঁর পক্ষে পুরো মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে তাঁর নির্দেশনায় নির্বাহী ভূমিকা আমাকেই পালন করতে হয়। ডাউস সাইজের স্মারকগ্রন্থটির অর্ধেকের বেশি লেখা আমার সংগৃহীত। স্মারকে জায়গা পাওয়া হুজুরের জীবনীমূলক শতাধিক পৃষ্ঠার লেখাটিও আমার, যা পরবর্তী সময়ে স্বতন্ত্র বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। একদম শুরুতে আমি না থাকলেও যুক্ত হওয়ার পর থেকে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া পর্যন্ত স্মারকগ্রন্থটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। স্মারকগ্রন্থ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতার সিংহভাগ অর্জিত হয়েছে এই স্মারকে কাজ করতে গিয়ে।

গহরপুরী রহ. স্মারকগ্রন্থের কাজে সারাদেশে শত শত কিলোমিটার সফর করেছি দিনের পর পর দিন। ২০০৯ থেকে ২০১১-এই তিন বছর প্রতি মাসে কয়েক বারও সিলেট সফর করেছি। তখন আমি দারুর রাশাদে। সাধারণত বৃহস্পতিবার রাতের বাসে ওঠতাম। ফজরের সময় পৌঁছে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াতাম নানাজনের কাছে। মাদরাসা ছুটি হলে টানা কয়েক দিনের জন্যও যেতাম। লেখা সংগ্রহের সফরে বেশির ভাগ সময়ই সঙ্গে থাকতেন রাজু ভাই নিজে। তখন তাঁর একটি জিপ গাড়ি ছিল। নিজেই ড্রাইভিং করতেন। পাশের সিটে আমাকে নিয়ে ছুটতেন রাত-বিরাতে। এমনও হয়েছে, কুয়াশার রাত, সামনে কয়েক হাতও দেখা যায় না; এই অবস্থায়ও দক্ষতার সঙ্গে গাড়ি ড্রাইভিং করেছেন রাজু ভাই। সিলেটের এমন কোনো থানা নেই যেখানে এই কাজে আমার বারবার যাওয়া হয়নি। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বেশির ভাগ থানায়ও গিয়েছি স্মারকের কাজে। বিশেষ কারণে রাজু ভাই যেতে না পারলে সিএনজি দিয়ে পাঠাতেন। সঙ্গী হতেন গহরপুর মাদরাসার শিক্ষক আনোয়ার ভাই, সেই সময়ের ছাত্র মীম সুফিয়ান কিংবা অন্য কেউ। এই সুবাদে গহরপুর জামিয়া সংশ্লিষ্ট প্রায় সবার সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

শুধু সিলেটই নয়, স্মারকগ্রন্থের কাজে দেশের নানা এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছি। রাজু ভাইসহ সফর করেছি খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর দুমকির পাঙ্গাসিয়া মাদরাসায় গহরপুরী হুজুরের কর্মজীবন শুরু হয়। সেখানে গিয়েছি দুইবার। হুজুরের সান্নিধ্য পাওয়া কয়েকজনকে খুঁজে বের করে তাদের সাক্ষাৎকারও নিয়েছি। স্মারকের লেখা সংগ্রহের পাশাপাশি সফরের স্বাদও নেওয়া হয়েছে। এই স্মারকের উসিলায় নতুন নতুন এলাকা সফরের সুযোগও হয়েছে। জীবনে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে এই স্মারকগ্রন্থের কাজে নেমে। এমন অনেক বড় বড় আলেমের সোহবতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে, যাদের কাছে হয়ত এমনিতে যাওয়া হতো না। গহরপুরী রহ. ছিলেন সর্বজন স্বীকৃত একজন বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব। এতোটা বিতর্কহীন, গ্রহণযোগ্য এবং সব মত-পথ ও ঘরানার মানুষের প্রিয় আলেম এদেশে খুব বেশি আছেন বলে জানা নেই। এমন একজন মহান মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণের কাজে যুক্ত হতে পারা নিঃসন্দেহে আমার জীবনের অনেক বড় অর্জন বলে মনে করি। তাঁর মতো বুজুর্গের রুহানি ফয়েজ লাভের আশাতেই মূলত নিজের সবটুকু উজাড় করে কাজটি করার চেষ্টা করেছি।

এই স্মারকগ্রন্থের কাজ করতে গিয়ে গহরপুরী রহ.-এর নিসবতে খ্যাতিমান অনেক আলেম, বুজুর্গ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের স্নেহ-ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি। তখন বয়সেও অনেক ছোট, উল্লেখ করার মতো কেউ নই; তারপরও সবার মূল্যায়ন পেয়েছি। শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিয়েছেন, হুজুরকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন। কেউ আবেগে আপ্লুত হয়েছেন, কেউ কেঁদেছেন; হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করে জানিয়েছেন অনুভূতি। কেউ ‘গহরপুরীর ছাব’, কেউ ‘সিলেটের হুজুর’ আবার কেউ ‘মুহাদ্দিস সাব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তাঁকে। হজরত মাদানী রহ.-এর দীর্ঘ সোহবতপ্রাপ্ত এই মনীষীর জীবন যে এতোটা বর্ণিল, আধ্যাত্মিকতায় মোড়ানো এবং সংগ্রাম ও সাধনামুখর সেটা জানা ছিল না। হয়ত এই কাজে যুক্ত না হলে জানতে পারতাম না কোনো দিন। স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত না হলে হয়ত অজানাই থেকে যেতো আমার মতো অনেকের কাছে। 

স্মারকগ্রন্থের কাজে যেখানে গিয়েছি সেখানেই অসম্ভব আদর-আপ্যায়ন ও সম্মান পেয়েছি। বেশির ভাগ জায়গায় যেহেতু সাহেবজাদা রাজু ভাই সঙ্গে ছিলেন, এজন্য একটু বেশিই কদর পেয়েছি। একজন বুজুর্গের সন্তানকেও মানুষ কতটা সম্মান ও শ্রদ্ধা করে- সেটা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস হতো না। এমনও হয়েছে, মেহমানদারির চাপে টার্গেট অনুযায়ী কাজ করা যায়নি। তবু মানুষের ভালোবাসা ও আবেগের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছে। একটি ঘটনা আজও মনে পড়ে। স্মারকের কাজে সিলেটের গোলাপগঞ্জে দিকে যাই। দিনভর কাজ সেরে আমরা শহরের দিকে ফিরছিলাম। সিলেট-জকিগঞ্জ রোডের পাশে একটি মসজিদে মাগরিবের নামাজ আদায় করি। রাজু ভাইকে নামাজে দেখে এক ব্যক্তি গিয়ে গহরপুরী হুজুরের এক ভক্তকে জানান। আমরা নামাজ শেষে অনেক দূর চলে আসি। ওই ভক্ত খবর পেয়ে কাঁদো কাঁদো অবস্থায় রাজু ভাইকে ফোন দেন। নিজ শায়খের সাহেবজাদাকে কোনো মেহমানদারি ছাড়া ওই এলাকা থেকে কোনোভাবেই যেতে দেবেন না। পীড়াপীড়ির এক পর্যায়ে রাজু ভাই বাধ্য হন গাড়ি ঘুরিয়ে ওই ব্যক্তির বাড়িতে যেতে। ৫/৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমরা ওই লোকের বাড়িতে যাই এবং তিনি ভরপুর মেহমানদারি করেন। এমন ঘটনা অহরহ ঘটেছে। এমনও হয়েছে, আমরা স্মারকের কাজে কোনো মাদরাসায় গিয়েছি; সেই মাদরাসার মুহতামিম সাহেব নিজে এসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমাদের স্বাগত জানাতে। শায়খের সাহেবজাদার দোয়া ও নসিহত নেওয়ার জন্য মাদরাসার দরস বন্ধ করে দিয়েছেন। গহরপুরী হুজুর তাদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য এবং প্রিয় ছিলেন; সেটা রাজু ভাইকে মূল্যায়নের দ্বারা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছি। 

তবে দুই একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা যে নেই তা কিন্তু নয়। সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকার একজন প্রভাবশালী আলেম। সেই সফরে রাজু ভাই ছিলেন না। সঙ্গে ছিলেন সিলেটের আলোচিত উপস্থাপক মীম সুফিয়ান। আগে যোগাযোগ করে ওই আলেমের বাড়িতে যাই। সঙ্গে কিছু হাদিয়াও নিই। তখন বেলা তিনটার কাছাকাছি। আমরা অবশ্য লাঞ্চ সেরেই গিয়েছি। সাক্ষাৎ করে আমরা উদ্দেশ্যের কথা জানাই। কিন্তু ওই আলেমের আচরণ ছিল খুবই আপত্তিকর। তিনি আমাদের বসতে পর্যন্ত বলেননি। আমরা তার জন্য নেওয়া হাদিয়াটুকু সামনে পেশ করে দাঁড়িয়েই কথা বললাম কয়েক মিনিট। তিনি জানালেন, অনেক ব্যস্ত। তাছাড়া গহরপুরী হুজুর সম্পর্কে তার তেমন কিছু বলার নেই। ন্যূনতম ভদ্রতাটুকুও তার কাছ থেকে পাইনি। পরে জানতে পারি, মূলত তিনি গহরপুরী হুজুরের বিরোধী ছিলেন আগে থেকেই। সেটাই তিনি তার আচরণে প্রকাশ করেছেন। এ ধরনের আরেকটি ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম ঢাকায়ও। রাজধানীর একটি বড় মাদরাসার মুহতামিম। তিনি এখন মরহুম। পরপর দুই দিন ফোন করে উদ্দেশ্যের কথা বলে তার সঙ্গে মাদরাসার অফিসে গিয়ে সাক্ষাৎ করি। সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন তরুণ লেখক হাসনাইন হাফিজ। ওই মুহতামিম আমাদেরকে বেশ কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখলেন ব্যস্ততার কথা বলে। পরে ডেকে বললেন, গহরপুরী হুজুর সম্পর্কে তার তেমন কিছু বলার নেই। আমরা যেন চলে যাই। কিছুটা বিস্মিত হলাম। তিনি কিছু না বলতে চাইলে আগেই আসতে মানা করতে পারতেন। আমাদের বসিয়ে এটা করার দরকার ছিল না। পরে শুনলাম, কোনো কারণে তিনিও হয়ত গহরপুরী হুজুরকে পছন্দ করতেন না। 

তবে এই দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া আর কোথাও এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়নি। বরং সবার কাছে অসম্ভব মূল্যায়ন পেয়েছি। বিশেষভাবে মনে পড়ে রাজধানীর আকবর কমপ্লেক্সের মুফতি দিলাওয়ার হোসাইনের কথা। হুজুরকে রাতে ফোন দিই। গহরপুরী হুজুরের স্মারকগ্রন্থের জন্য একটি লেখা চাই। হুজুর রাজি হন এবং পরদিন এগারটার দিকে যেতে বলেন। আমি আর হাসনাইন হাফিজ যথাসময়ে তাঁর মাদরাসার অফিসে যাই। সেখানে তাঁকে পাইনি। আবার ফোন দিই। হুজুর জানান, বাসা থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই আসছেন। আমরা ভাবছি, হয়ত তিনি আমাদের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করবেন, আমরা লেখা তৈরি করবো। কিন্তু আমাদেরকে বিস্মিত করে দিয়ে হাতে একটি কম্পোজ লেখা আমাদের দিলেন। রাতে ফোন পেয়ে সকাল হতে হতে তিনি স্মৃতিচারণমূলক একটি লেখা তৈরি করেছেন। এতোটা সিরিয়াস আর কাউকে পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। 

প্রায় তিন বছরে আমরা স্মারকগ্রন্থের কাজ সম্পন্ন করি। সংগ্রহ করা হয় দুই শতাধিক মানুষের লেখা। বেশির ভাগই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন। রয়েল সাইজের প্রায় আটশ পৃষ্ঠা দাঁড়ায়। প্রুফ-সম্পাদনা সেরে পুরোটা ছাপার উপযোগী করা হয়। এমনকি মেকাপও দেওয়া হয়। মালিবাগ মোড়ে ম্যানহাটন নামে একটি আবাসিক হোটেল ছিল। ঢাকায় এলে সেই হোটেলে উঠতেন রাজু ভাই। অনেকটা নিজের বাড়িঘরের মতো হয়ে গিয়েছিল। মূলত সেই হোটেলেরই একটি বড় কামরায় হামীম কেফায়েত ভাই টানা কয়েক দিনে পুরো স্মারকের মেকাপ সম্পন্ন করেন। কিন্তু অজানা কারণে স্মারকগ্রন্থটি আর ছাপার পর্যায়ে যায়নি। পুরো কাজটি সম্পন্ন করে দেওয়ায় আমাদের কিছু করারও ছিল না। নানাজন জানতে চাইলেও বলার কিছু ছিল না। শুধু রাজু ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাগাদা দিতাম। কিন্তু তিনি হচ্ছে-হবে বললেও স্পষ্ট করে কিছু বলতেন না। এভাবে প্রায় ১০ বছর কেটে যায়। এমনকি অনেক শ্রম দিয়ে করা মেকাপও হারিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে জেনেছি, মূলত স্মারকগ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর এসব প্রসঙ্গে গহরপুরী হুজুর সংশ্লিষ্ট যে বিবরণ উঠে এসেছে সেগুলো অক্ষুণ্নভাবে রাখার জন্য রাজু ভাই ক্ষমতার পালাবদলের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ১০ বছরেও যখন সেটা হলো না অবশেষে ২০২০ সালে করোনা মহামারির প্রথম ধাক্কার পরপর রাজু ভাই সিদ্ধান্ত নেন স্মারকগ্রন্থটি এবার প্রকাশ করবেন। ততদিনে স্মারকগ্রন্থে লেখা দেওয়ার পর মারা গেছেন- এমন মানুষের সংখ্যা সত্তর পেরিয়ে যায়। দেশের শীর্ষ সারির প্রায় সবার লেখাই স্থান পায় স্মারকটিতে। অবশেষে আবার নতুন করে মেকাপ এবং কিছুটা পরিমার্জন করে ওই বছরের ডিসেম্বরে আলোর মুখ দেখে স্বপ্নের কাজটি। ২০২১ সালের শুরুতে স্মারকগ্রন্থটি পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ঢাকায় একটি ঘরোয়া আয়োজন এবং সিলেটে গহরপুর জামিয়ার বার্ষিক মাহফিলে স্মারকগ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তখন সিলেটের মেয়র। তিনি এক কপি স্মারকগ্রন্থ কিনেছিলেন তিন লাখ টাকা দিয়ে। কথা ছিল ঢাকায় একটি বড় আয়োজনের। প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। কিন্তু করোনার প্রকোপসহ নানা কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। 

তিন.

গহরপুরী রহ. স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর আরও বড় দুটি স্মারকগ্রন্থের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সৌভাগ্য হয়। এর একটি নূরানী পদ্ধতির আবিষ্কারক শায়খুল কুরআন আল্লামা কারী বেলায়েত হুসাইন রহ.; অপরটি ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান রহ. স্মারকগ্রন্থ। জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিত এই দুই মনীষীর স্মারকগ্রন্থের কাজে যুক্ত হতে পারাও আমার জীবনের একটি বড় প্রাপ্তি বলে মনে করি। এই দুটি স্মারকগ্রন্থের ক্ষেত্রে মাঠে-ময়দানে ছুটে বেড়ানোর কাজটির সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম না। তবে সম্পাদনার মূল দায়িত্বটুকু আমাকে পালন করতে হয়। গহরপুরী রহ. স্মারকের তুলনায় এই দুটি স্মারকের কাজে খাটুনি কম হয়েছে। কিন্তু সেই স্মারকের তুলনায় দায়িত্বের বোঝাটি ছিল একটু ভারী। সেই স্মারকের নির্বাহী সম্পাদক ছিলাম। আর এই দুটি স্মারকগ্রন্থের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। 

এই স্মারকগ্রন্থ দুটির সম্পাদক মূলত আমাদের বন্ধু আওয়ার ইসলাম সম্পাদক হুমায়ুন আইয়ুব। তার সঙ্গেই কর্তৃপক্ষের আলোচনা হয়। কোনো স্মারকের কর্তৃপক্ষের সঙ্গেই শুরুর আলোচনায় আমি ছিলাম না। তবে হুমায়ুন আইয়ুব তার প্রায় সব কাজেই আমাকে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত রাখে। এখানেও তাই হয়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার সঙ্গে বসেছে এবং পুরো কাজের পরিকল্পনা এবং কীভাবে কাজটি সম্পন্ন করা যায় সেই পরামর্শ নিয়েছে। তখনই কর্তৃপক্ষের সম্মতিতেই সম্পাদনার মূল দায়িত্বটি আমার ওপর অর্পণ করা হয়। মাঠ থেকে লেখা সংগ্রহের দায়িত্ব পুরোটাই আঞ্জাম দেন হুমায়ুন। তিনি তার সহযোগী কয়েকজনকে নিয়ে সারাদেশে ঘুরে বেড়ান। প্রতিটি লেখা খসড়া হওয়ার পর আমার কাছে চলে আসতো। সেই লেখাটি ছাপার উপযোগী করা ছিল আমার দায়িত্ব। এভাবেই আমরা টিমভিত্তিক একটি কাজের সিস্টেম দাঁড় করাই। সম্পাদনা সম্পন্ন হলে আমাদের বন্ধু রফরফের স্বত্বাধিকারী ইলয়াস হোসাইনকে দিয়ে মেকাপ এবং কবি মুনীরুল ইসলামকে দিয়ে শেষ প্রুফ দেখানো হয়। একাধারে কয়েকটি স্মারকগ্রন্থ এভাবেই কাজ হয়েছে।  

শায়খুল কুরআন কারী বেলায়েত রহ. ইন্তেকাল করেন ২০১৭ সালে। তিনি নূরানী পদ্ধতি আবিষ্কারের মাধ্যমে এদেশে কুরআনি শিক্ষা এবং শিশুশিক্ষা প্রসারে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখে গেছেন। তাঁর খেদমতের বিস্তৃতি গোটা দেশে। লাখ লাখ শিক্ষক-শিক্ষার্থী তাঁর দ্বারা সরাসরি উপকৃত হয়েছে। মুজাদ্দিদতুল্য এই মনীষীর ইন্তেকালের পরপরই তাঁর সাহেবজাদারা একটি স্মারকগ্রন্থ করার উদ্যোগ নেন। তবে কাজটি শুরু করতে করতে দেশে করোনা মহামারির প্রকোপ শুরু হয়ে যায়। এতে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। কারী বেলায়েত রহ.-এর মেজো ছেলে এবং নূরানী বোর্ডের পরিচালক মাওলানা ইসমাঈল বেলায়েত পুরো কাজের তত্ত্বাবধান করেন। তিনিই হুমায়ুন আইয়ুবকে সঙ্গে নিয়ে দেশের নানা প্রান্তে ছুটে যান এবং লেখাগুলো সংগ্রহ করেন। পুরো কাজে তিনি খুব নিবিড়ভাবে জুড়ে ছিলেন। কর্মচঞ্চল ইসমাঈল ভাই খুবই বন্ধুবৎসল। এই স্মারকগ্রন্থের কাজের সূত্রেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। টানা কয়েক বছরে পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার স্মারকগ্রন্থটি সম্পন্ন হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এটি পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজন করা হয় মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের। সম্ভবত এ যাবত যত আকাবির মনীষীর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত হয়েছে এই স্মারকগ্রন্থটি। যেখানে সাধারণত এক হাজার কপি ছাপা হয়, সেখানে প্রথম ধাপেই এই স্মারকগ্রন্থটি ছাপা হয় পাঁচ হাজার কপি। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি সংস্করণ করা হয়। মাঝারি অবয়বের এই স্মারকগ্রন্থটি দেশে-বিদেশে বিপুল সমাদৃত হয়েছে। 

কারী বেলায়েত রহ. স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশের আগেই ২০২১ সালের শেষ দিকে হুমায়ুন আইয়ুব ফকিহুল মিল্লাত মুফতি আবদুর রহমান রহ.-এর ওপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেন। দেশের প্রভাবশালী শীর্ষ এই আলেম ২০১৫ সালের নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। তিনি জীবদ্দশায় গতানুগতিক কোনো স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ না করার ব্যাপারে ছেলেদের ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন। এজন্য তাঁর ইন্তেকালের পাঁচ/ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সাহেবজাদারা এমন কোনো উদ্যোগ নেননি। তবে একটা পর্যায়ে ভক্ত-অনুরাগীদের কেউ কেউ মুফতি সাহেবের সাহেবজাদাদের এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু তাঁরা বাবার ওসিয়তের ব্যত্যয় ঘটাতে চাননি। এজন্য নিজেরা গতানুগতিক কোনো স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। তবে কেউ কোনো উদ্যোগ নিলে তারা সহযোগিতার ব্যাপারে সম্মত হন। অবশেষে সেই উদ্যোগটি নেয় অনলাইন নিউজপোর্টাল আওয়ার ইসলাম। মুফতি সাহেবের দুই ছেলে এবং তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের সহযোগিতায় কাজটি সম্পন্ন হয়। টানা কয়েক মাস সারাদেশ চষে হুমায়ুন আইয়ুব ও তার টিমের সদস্যরা লেখা সংগ্রহ করেন। 

যেহেতু ব্যক্তিত্বের বিচারে মুফতি আবদুর রহমান রহ. অনেক উঁচু মাপের আলেম ছিলেন, এজন্য তাঁর ওপর কাজটিও শান অনুযায়ী হতে হবে- এমন একটা চেষ্টা শুরু থেকেই ছিল। ফলে বৃহৎ পরিসরে পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই স্মারকগ্রন্থটিতে ভারত-পাকিস্তানের ১৫/২০ জন আলেমের লেখা স্থান পায়। যা অন্য কোনো স্মারকগ্রন্থে হয়নি। দেশের শীর্ষ আলেমদের প্রায় সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি তাঁর জীবনের নানা দিকের ওপর বিজ্ঞ লেখকদের দিয়ে স্বতন্ত্র প্রবন্ধ লেখানো হয়। ফলে এই স্মারকগ্রন্থটি অতীতে হওয়া সব স্মারকগ্রন্থ থেকে ভিন্নতা পায়। অবয়বের ক্ষেত্রেও রেকর্ড ভঙ্গ করে, প্রায় দেড় হাজার পৃষ্ঠা। এজন্য সিদ্ধান্ত হয় স্মারকগ্রন্থটি তিন খণ্ডে করা হবে। এতে বহন ও পড়তে সহজ হবে। এর আগে তিন খণ্ডে কোনো স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। প্রায় এক বছর কাজ করে ২০২২ সালের নভেম্বরে স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। চট্টগ্রামে বিশাল ইসলামি সম্মেলনে দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানী সাহেব এর মোড়ক উন্মোচন করেন। 

স্মারকগ্রন্থটির সার্বিক তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনা দেন ফকিহুল মিল্লাতের বড় ছেলে এবং বসুন্ধরা ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারসহ কয়েকটি বড় এদারার পরিচালক মাওলানা আরশাদ রাহমানী। আর স্মারকের কাজটিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন ছোট ছেলে মাওলানা শাহেদ রাহমানী; ইসলামি ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ হিসেবে যিনি ব্যাপক পরিচিত। এই কাজে যুক্ত হয়েই মূলত শাহেদ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা। কাজের ব্যাপারে তাঁর সিরিয়াসনেস স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয়েছে। প্রতিটি লেখা তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন। টেকনিক্যাল বিষয়গুলো তিনি দেখেছেন। নয়াপল্টনে ইলয়াস ভাইয়ের হাউজে মেকাপের কাজটি সারতে দিনের পর দিন পড়ে রয়েছেন। লিফট না থাকায় অনেক কষ্টে ছয় তলায় পায়ে হেঁটে প্রতিদিন উঠতেন। একাধিক ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্য হওয়ার পরও তাঁর আচরণে সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। যোগ্যতা ও বিচক্ষণতার পাশাপাশি এমন বিনয়ী মানুষ খুবই সচরাচর চোখে পড়ে। একজন দেশসেরা আলেমের জীবন ও কর্মের ওপর একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যের ব্যাপার। পাশাপাশি বড় মানুষের সন্তানদের কাছ থেকে সদাচার পাওয়াও বড় প্রাপ্তি। আলহামদুলিল্লাহ, পরপর তিনজন আকাবির মনীষীর স্মারকগ্রন্থের কাজে যুক্ত হয়ে তাদের সন্তানদের কাছ থেকে অসম্ভব স্নেহ-ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছি। এটাকেও নিজের জীবনের বড় প্রাপ্তি হিসেবেই দেখি। 

এর মধ্যে আরেকটি ছোটখাটো স্মারকগ্রন্থের কাজ মোটামুটি সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রকাশিত না হওয়ার আক্ষেপ আছে। সেটি হচ্ছে আমার উস্তাদ ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব, সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ. স্মারকগ্রন্থ। সেই ২০১২ সালে পল্টনে খান সাহেব হুজুরের সাহেবজাদা মাওলানা উবায়দুর রহমান খান, মাওলানা অলিউর রহমান খান আল-আজহারী, মাওলানা মুহিব খানসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে স্মারকগ্রন্থের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। একটি কমিটি করা হয় আহ্বায়ক নদভী সাহেব, আর আমি সদস্য সচিব। স্মারকের চিঠিও ছাপা হয়। পুরোদমে কাজ করে আমরা বেশ কিছু লেখাও সংগ্রহ করি। তবে কাঙ্ক্ষিত লেখা সংগ্রহ হয়নি। ২০/৩০ জনের লেখায় দশ-বারো ফর্মার মতো হয়। সেই লেখাগুলো দিয়ে ছোটখাটো একটি স্মারকগ্রন্থ তখনই প্রকাশ করা যেতো। পুরোটা বইয়ের সেটাপ দিয়ে দৈনিক ইনকিলাব অফিসে গিয়ে নদভী সাহেবের হাতে তুলে দিই। তিনি জানান, বাকি আরও কিছু লেখা সংগ্রহ করে পরিবারের উদ্যোগে বইটি প্রকাশ করবেন। এরপর কেটে গেছে এক যুগের বেশি সময়। অজানা কারণে আজও সেই স্মারকটি আলোর মুখ দেখেনি। অথচ মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ.-এর সন্তানরা যোগ্যতায় ও কর্মে দেশে-বিদেশে ব্যাপক পরিচিত। এমন খ্যাতিমান আলেম দেশে দ্বিতীয়জন নেই, যার সব ছেলেই যোগ্যতায় ও কর্মে আলোকিত। তারপরও স্মারকগ্রন্থটি হয়নি। এর জন্য শুধুই আক্ষেপ ছাড়া কিছুই করার নেই। 

বছর-দেড়েক আগে আরেকজন বিশিষ্ট আলেম মনীষীর স্মারকগ্রন্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ হয়। তিনি হলেন হাফেজ্জী হুজুরের খলিফা মুফতি আবদুল বারী রহ.। জামিয়া আশরাফিয়া সাইনবোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও মুহতামিম। এর আগে বড়কাটারা মাদরাসার দীর্ঘদিনের মুহতামিম ছিলেন। স্মারকগ্রন্থটি মূলত তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসা থেকেই করা হয়। তবে শেষ মুহূর্তে পুরো স্মারকগ্রন্থটি ছাপার উপযোগী করে দেওয়ার কাজটি আমি করেছি। যদিও ইনারে সেভাবে আমার নাম উল্লেখ করা হয়নি। সত্যি বলতে, এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারাকেই সৌভাগ্য মনে করি। বৈষয়িক প্রাপ্তি কিংবা নামধামের বিষয়টি এখানে গৌণ। 

এর মধ্যে আরও কয়েকটি স্মারকগ্রন্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কথাবার্তা হলেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। আলোচনা পর্যায়ে আছে কয়েকটি। বর্তমানে অনেক আগে চলে যাওয়া একজন আকাবির মনীষীর ওপর একটি কাজ চলমান। যেহেতু কাজটি এখনো প্রকাশ্যে ঘোষণার মতো অবস্থায় আসেনি এজন্য নাম উল্লেখ করলাম না। আশা করি, শিগগির সেই কাজটিও প্রকাশ্যে আসবে। আকাবিরের জীবন ও কর্মের ওপর যেকোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকাকে নিজের নাজাতের উসিলা হিসেবে দেখি। কেউ এ ধরনের কাজ করতে চাইলে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার মানসিকতা সব সময় পোষণ করি। সময়-সুযোগ হলে এবং আল্লাহ তাওফিক দিলে আগামীতেও এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই। আমি চাই, আমাদের রত্নতুল্য আকাবির মনীষীরা চলে যাওয়ার পর তাদের স্মৃতি ও কর্মগুলো মলাটবদ্ধ হোক। আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাক ইতিহাসের মূল্যবান দলিল হিসেবে। 

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *