হায়াত মওতের পারাপার (দ্বিতীয় কিস্তি)

আয়েশা আব্দুর রহমান—বিশ্বজুড়ে যিনি ‘বিনতুশ শাতে’ বা ‘তীরকন্যা’ নামে পরিচিত—ছিলেন আরব ও মুসলিম বিশ্বের নারীদের জ্ঞানতাত্ত্বিক রুদ্ধদ্বার খোলার অগ্রদূত; আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী লেকচারার এবং আরবি সাহিত্যে ‘কিং ফয়সাল অ্যাওয়ার্ড’ জয়ী প্রথম নারী। রক্ষণশীল পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে লড়াই করে জায়গা করে নিয়েছেন মিশরের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের একেবারে প্রথম সারিতে। কুরআনের তাফসির, উসুলে ফিকহ ও তুরাস নিয়ে তাঁর ৪০টিরও বেশি আকর গ্রন্থ আজও গবেষকদের জন্য পথপ্রদর্শক। বিশেষ করে নারী কিংবদন্তিদের নিয়ে তাঁর জীবনীসাহিত্য এক অনন্য মানদণ্ড।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন নিজের অধ্যাপক আমিন খওলির সাথে। স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ তিন দশক বিরহ বয়ে বেড়িয়েছেন মিলনের ব্যাকুলতায়। জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি গেয়েছেন সেই বিরহের গান আর শুনিয়েছেন নীলনদের তীরে বিনতুশ শাতে হয়ে ওঠার দুর্বার কাহিনি। হায়াত মওতের পারাপার নামে তাঁর জীবনকথার বাংলা অনুবাদ ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে কেয়ারি-তে।

পূর্ব প্রকাশের পর…

চার.

গ্রাম, ইস্কুল, বাড়ির পরের দুই বছরের কত স্মৃতি মাড়ায়ে, আমি আইসা দাঁড়াই এক আনোখা স্মৃতির পায়ে; আমার ওয়ুজুদের সাথে জাপ্টায় থাকা স্মৃতি, আমার জীবনপ্রবাহে সূদুর আছর ফেলা স্মৃতি।

সেইখান থেকে বের হয়ে আসে একটি অশরীরী দীর্ঘ সুতা; শুরু হয় আমার দিময়াত লুজি আমিরিয়া বালিকা বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর পশ্চিম জানালার সাথের প্রথম সারির শেষপ্রান্তের বেঞ্চি থেকে, শেষ হয় আমার আগুয়ান অজানার গর্বে লুকায়িত ভার্সিটির বেঞ্চে যেয়ে।

দূর অতীতের স্বপ্নের স্মৃতিরা, সময়ের সীমানা ডিঙ্গায়ে, একটা খাস দিনের কথা আমারে ইয়াদ করায়ে দেয়।

সেইদিন ক্লাশরুমে নিজের বেঞ্চিতে মাত্রই বসছি, একজন গুরুগম্ভীর ইন্সপেক্টর ক্লাশে ঢুকলেন; আমাদের ক্লাশের নির্ধারিত সিলেবাস ‘আম্মা’ ও ‘তাবারাকা’ পারার মুখস্থকৃত সুরাগুলি থেকে আমাদের পরীক্ষা নিতে লাগলেন। উনি ছাত্রীদের তেলাওয়াতে বাজাবাজি দেখে যখন বিরক্ত হইতে লাগলেন, হেডমেডাম জয়নব হিন্নাওয়ি বেশ বিনয়ের সাথে উনারে বললেন, উনি যাতে আমার তেলাওয়াত শুনেন, কোরান কারিমের আকছারই আমার মুখস্থ।

কথাটা শুনে ইন্সপেক্টর খানিক সন্দেহের দৃষ্টি দিলেন। আমারে সুরা নূর পড়তে বললেন, আমি কোনোরকম ভুলটুল ছাড়াই, বাজাবাজি না করে ‘আল্লাহু নুরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ’ আয়াতে পৌঁছালাম। সুরা কাহাফ থেকে যা পারি পড়তে বললেন। আমি পড়ে যাইতে লাগলাম আর তাবৎ ধেয়ানের সহিত উনি শুনে যাইতে লাগলেন। এইভাবে পিরিয়ড শেষ হওয়ার ঘণ্টা বাজা তরি আমি পইড়া গেলাম। উনি কিছুক্ষণ কথা বললেন আমার সাথে, আমার জন্য দোয়া করলেন। এরপর খুশদিল হয়ে চলে গেলেন। আমি মনে মনে তাঁর সরলতা দেখে অবাক হইলাম; কারণ আমি তো ভালোকরেই জানি, উনি যেইটারে আমার বিশেষ কৃতিত্ব ভাবতেছেন, দিময়াত ধর্মীয় ইনস্টিটিউটের সকল তলাবা, এমনকি গ্রামের শায়েখ মুরসির মক্তবের সকল সহপাঠীই, সেই গুণের এভারেজ অধিকারী।

আমি বাড়ি ফিরলাম। ইস্কুলের কাহিনি বাড়িতে কাউরে বলবার মতো জরুরি মনে করলাম না।

সেই রাতে, যখন ঘুমানোর জন্য বিছানায় গেলাম, একটা স্বপ্ন দেখলাম। ক্লাশরুমে আমি বইসা আছি আমার সিটে, হঠাৎ আসমান থিকা এক ডানাওয়ালা ফেরেশতা নাইমা আসল আমার পাশের জানালার কাছে, সে একটা সবুজ বান্ধা-গিলাফ আমারে দিয়ে, আকাশে আবার উড়ে গেল। আমি বান্ধা-গিলাফ যখন খুললাম, তার ভিতরে একটা কোরান শরিফ। এত ঝকমকে সমুজ্জ্বল গেলাফের কোরান, আমি এর আগে দেখি নাই।

নদীমাতৃক-সমুদ্রিক পরিবেশে বাইড়া ওঠায়, রূপকথার-কল্পকাহিনির বিস্তার আমার স্মৃতির সীমানা জুড়ে, তাছাড়া একজন সুফি শায়খের কন্যা হওয়ার বিচারে, এই সত্য স্বপ্নরে অন্দরদিলির সাফসুতরাই আর রুহানি চেতনার তজল্লি হিশেবেই ঠাহর করবার রেওয়াজ ছিল।

আমি মনে করি : আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও আশপাশতার কারণে আমি স্বপ্নের দ্বারা ভালোরকমই প্রভাবিত। ফলে যখন ঘুম থেকে জাগলাম, আমার দিলে দৃঢ় একিন জন্মাল, আমার সমগ্রটা জীবন, স্বপ্নের এই আসমানি তোহফায় পাওয়া কোরানের সাথে করে গুজারা হয়ে যাবে।

সেই দিন থেকে, আমি আর ওলামা-হজরতদের মজলিশে যাতায়াতে কামাই করলাম না। জামেউল বাহার মসজিদে আব্বার নির্জন খলওয়াতই আমার প্রিয় জায়গা হয়ে উঠল। নিজের বয়সরে আমি ছাড়ায়ে যেতে চাইলাম, ইসলামি জ্ঞানবিদ্যার অর্জনে নিজের নির্ধারিত গণ্ডিরে ডিঙ্গায়ে যাওয়ার মেহনত করতে লাগলাম।

শৈশবের সেই স্বপ্ন থেকেই আশলে, অদৃশ্য এক সুতা বের হয়ে আসল—নদীর তীরে কাটানো সেই পয়লা পর্ব থেকে শুরু করে, আমার জ্ঞানতাত্ত্বিক সফরের সমাপ্তিতে গিয়ে ঠেকল—সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক সফরে, আমি অধ্যাপক আমিন খওলির ছাত্রত্ব গ্রহণ করি, তাঁর পদ্ধতি মোতাবেক ‘কোরানিক টেক্সট’ গবেষণায় তাখাসসুস স্তরে পৌঁছি।

আমি যখন এই কথাগুলি বলতেছি, আমার স্বজাতির কতক লোকজনরে কল্পনায় দেখতে পারতেছি; তারা আমার সেই স্বপ্নের কথা শুনবার মাত্রই অবজ্ঞার জোড়ে মাথা ঝাড়ছিল। দশ বছর পূর্ণ না হওয়া এক বালিকার দেখা তুচ্ছ স্বপ্ন কেন এতটা বিচলিত করবে আমারে, তা নিয়ে তারা তাজ্জব জাহের করছিল।

হ্যাঁ তারা যদি আমার মতো পরিবেশে বেড়ে উঠত, সেই আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মিরাছ লাভ করত, তবে তারাও হয়তো এই নিয়ে বিন্দুমাত্র আপত্তি না করত।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা যখন কোনো বিদেশি গল্প পড়ে—যার মূল প্লট গড়ে উঠছে কোনো শৈশবি আবলা মনের স্মৃতির পিঠে ভর করে—তখন তারা এই তাজ্জবটা হয় না।

এমনকি, আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের স্বপ্ন-বিষয়ক গবেষণা, স্বপ্নের কারণ-প্রভাব-প্রতিফলন, ইত্যাদি নিয়ে তারা কতই না আগ্রহ আর ভক্তির সহিত পড়াশোনা করে; অথচ যখন আমাদেরই মধ্যকার কেউ নিজের বাস্তবিক জীবনের গভীর থেকে এমন অভিজ্ঞতারই কথা বলে, তারা তখন তাজ্জব হয়ে উপহাস করে। তারা ভুইলা যায়, আমরাও মানুষ; ভুইলা যায়, কখনোসখনো আমাদের ওপর স্বপ্নের প্রভাব বাস্তবতার বিচারকেও ছাড়ায়ে যাইতে পারে, আবেগের যুক্তি বুদ্ধিবৃত্তির যুক্তিরে চ্যালেঞ্জ জানাইতে পারে।

পাঁচ.

বুঝতেছি অবান্তরত মূল প্রসঙ্গের বাইরে চলে গেছি। আচ্ছা, আমার সেই দূর অতীতের পয়লা পথরেখাগুলির সন্ধানে আবার ফিরা যাক।

আমি তখন লুজি বালিকা বিদ্যালয়ের পাঠ চুকাইলাম। বয়স তখন দশ বছর পারাইছে; আব্বার পুনরায় আমারে হেরেমে বন্দি করবার ঠিক করা বয়সটা আরকি।

শুরুর দিকে আমি ভাবলাম হয়তো প্রাইমারি শিক্ষাতেই আমার ইস্কুলের পাঠ খতম হলো। কিন্তু প্রাইমারির লেভেল পার হইতে না হইতেই, আমার মন বইলা উঠল—আমার সহপাঠীরা ওপরের ক্লাসে পড়তে যাবে, আর আমি এই সংক্ষিপ্ত সফরেই থাইমা যাব? মাইনা নিতে পারলাম না।

সেই হাইস্কুল আমাদের ইস্কুলের ভবনেরই ওপরের তলায়। প্রাইমারি লেভেলে পড়বার সময় আমরা সারাক্ষণ ওপরি তলার দিকে অপলক নয়নে তাকায়ে থাকতাম। ওইটাই আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার পরম সীমানা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, প্রাইমারি লেভেল যারা মেধার সাথে উত্তীর্ণ হয়, তাদেরই সেই ইস্কুলে নেওয়া হয়। আর আমি ছিলাম সেই উত্তীর্ণ তালিকার ফার্স্টে।

দুসরাবারের মতো আমি আবার নানার কাছে গেলাম। আব্বার জেদ ভেঙে আমারে হাইস্কুলে পড়াবার অনুমতি আদায়ে তাঁর সাহায্য চাইলাম।

আব্বারে নানা যখন বুঝাইতে ব্যর্থ হইলেন, তখন নানা বাহার মসজিদে যেয়ে সেইখানকার ওলামাদের সাহায্য চাইলেন, তারা যেন আমার আব্বার একগুঁয়েমি ভাঙেন; আমার এখনো হিজাব করার বয়সও হয় নাই, কিন্তু আব্বা আমারে ঘরে আটকায়ে রাখতে চান।

তাদের মধ্যে বেশ লম্বা বিতর্ক হইল। বিতর্ক একপর্যায়ে চরম তিক্ততায় রূপ নিল, কিন্তু আব্বা নাছড় বান্দা নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়লেন না। নানা প্রচণ্ড ক্ষোভে আর রাগে মসজিদ থেকে বেরোয় বাড়ির দিকে যাইতে লাগলেন—তখন রাগের মাথায় উনি বেখেয়াল—একটা দ্রুতগামী পশুবাহন তাঁর সামনে দিয়ে তখন রাস্তা পারাইতেছে—তাঁরে ধাক্কা দিয়া পাথুইরা পথে ফেলে দিল। সেই যে উনি পইড়া গেলেন, আর কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলেন না।

নানারে বাড়িতে আনা হইল। শহরের বড় ডাক্তার আইসা পরীক্ষা করে জানাইল, নানার উরুর হাড় ভাইঙা গেছে। এই বুড়া বয়সে হাড় জোড়া লাগবার আশা নাই বললেই চলে; তবে নানার শারীরিক গঠন ও প্রাণশক্তি ভালো হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি থিকা মুক্ত রইলেন।

গরমের মাসগুলি কাইটা গেল। নানারে নিয়া মামারা হাড়ের ডাক্তার আর কবিরাজদের দ্বারে দ্বারে ঘুরল। শেষ তরি নানার জায়গা হইল ওই বিছানায়, জীবনের বাকি কয়টা বছর পঙ্গু হইয়া কাটানোই নানার নিয়তি হইল।

উনার এই কষ্টের সঙ্গী হইলাম আমি। এক চরম অপরাধবোধ আমারে কুরে কুরে খাইতে লাগল; মনে হইতে লাগল, আমার পড়ার জিদই উনার এই আজীবন পঙ্গুত্বের মূল কারণ। উনার ঘরের কোণায় আমি পইড়া থাকতাম, উনার সেবা-দেখলাভ করতাম, ঘর থিকা গায়েব হইতাম না। কিন্তু যখন হাইস্কুলের নতুন শিক্ষাবর্ষের সময় হইল, উনি জিদ ধরলেন আমারে ইস্কুলে যাইতেই হবে। নিজের কষ্টের কথা উনি বিন্দুমাত্র পরোয়া করলেন না। গ্রামের মানুশ এই নিয়া প্রায় নিশ্চিত ছিল, নানার সাথে যা ঘটছে, তা আশলে আমার আব্বা, যিনি কিনা পরহেজগার ওলি, তার কেরামত। কিন্তু আব্বাও এই পঙ্গু বুড়ার কষ্টে ব্যথিত হইছিলেন, তাই শেষ তরি নতি স্বীকার করে আমারে নানার সেবা ও সোহবতে থাকবার অনুমতি দিছিলেন।

আব্বার অনিচ্ছা সত্ত্বেও নানা যখন আমারে হাইস্কুলে পাঠাইলেন, আব্বা চুপ থাকলেন। মনে হইল, একজন পঙ্গু বুড়া মানুশের শেষ ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাইতে আব্বারও দ্বিধাবোধ হইতেছে। এদিকে দুর্ঘটনার পর নানার ইচ্ছা আরও মজবুত হয়ে গেছে।

আমার ধারণা সেই পর্যায় থেকেই, আমি পরোক্ষভাবে সাংবাদিকতা ও জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত হইতে লাগি। দুর্ঘটনার পর বিছানায় বন্দি হালে নানার একমাত্র শখ ছিল সংবাদপত্রের খবর রাখা। এছাড়াও তাঁর বড় দুশ্চিন্তা ছিল দিময়াত শহররে অর্থনৈতিক ধ্বসের হাত থিকা রক্ষা করা; মোহনার কাছে নীলের পলি জইমা জইমা সমুদ্রের তীরবর্তী বন্দর তখন বন্ধ হয়ে যাবে যাবে হাল।

আমার শিক্ষার লাগি নানার এই ত্যাগ আমার মনে যেই বেদনাবোধের জন্ম দিল, তার ফলে আমি সম্পূর্ণরূপে নিজেরে তাঁর সেবায় সমর্পিত করে দিলাম। আমার মনে হইল, আমি তাঁর কাছে বিশাল ঋণে জর্জরিত। আমার দৈনন্দিন কাজের একটা হয়ে দাঁড়াইল ইস্কুল থেকে ফিরবার পথে ‘আল-আহরাম’ ও ‘আল-মুকাত্তাম’ পত্রিকা কিনে এনে নানারে কাছে বসে বসে পাঠ করা। ছুটির দিনগুলিতে আমি নানার পাশে বসে থাকতাম, আর নানা মিশরের শাসক ও সংবাদপত্রগুলির বরাবর পত্র-প্রবন্ধ লিখতেন। বিষয়বস্তু থাকত বন্দরের অচল অবস্থা এবং পলি জমার দরুন জাহাজ চলাচলের অসুবিধা ও দুর্ঘটনা সংক্রান্ত কথাবার্তা।

হাইস্কুলে কাটানো তিনটা বছর এইভাবেই আমি গুজরায়ে দিলাম। শুরুতে যা ছিল আমার নানার প্রতি ঋণশোধনের একটা কোশেশ, সময়ের সাথেসাথে তা এইসবের মধ্য দিয়া আমারে লেখালেখির প্রেমে ফালায়া দিল। নানার বইলা দেওয়া কথাবার্তা যখন আমার লেখায় সংবাদপত্রে প্রকাশ পাইত, আমি তা দেইখা অদ্ভুতরকম তৃপ্তি পাইতাম। তাই এরপর থেকে আমি ভাষার অলংকার ও শৈলী নিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলাম, লেখারে আরও উন্নত করার জন্য আমার সামর্থ্যের সমস্তটুকু উজাড় কইরা দিলাম।

ছয়.

হাইস্কুলের শিক্ষা আমি সফলভাবে শেষ করলাম। কিন্তু এরপরই আমার সামনের রাস্তাটা রুদ্ধ হয়া আসল।

একদিকে আমার বয়স তখন তেরো বছর, হিজাব করবার এবং নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির অন্তঃপুরে বন্দি হবার বয়স, অন্যদিকে হাইস্কুলের পর দিময়াতে মেয়েদের শিক্ষার কোনো সুযোগও আর বাকি নাই। যারা পড়াশোনা চালায়ে যাইতে চায়, তাদের সামনে খোলা থাকে দুইটা পথ : হয় চার মাসের একটা শর্টকোর্স করে প্রাইমারি ইস্কুলের শিক্ষিকা হয়ে যাওয়া, অথবা মানসুরা শহরের টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুলে ভর্তির পরীক্ষা দেওয়া। মানসুরা শহর আমাদের এইখান থেকে সবচে কাছের জেলা শহর, সেইখানেই এই ইস্কুলটা অবস্থিত।

আমি স্বভাবতই ওই নামমাত্র চার মাসের কোর্স, যা কিনা খালিই জলদি শিক্ষিকা হওয়ার জন্য করা হয়ে থাকে, তার কথা চিন্তায়ও আনলাম না; বরং সমস্ত হতাশা আর নৈরাশ্যকে চ্যালেঞ্জ জানায়ে আমি মানসুরার টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুলের দিকেই নজর ফেললাম। আর ভাগ্যের কী পরিহাস, ভর্তিপরীক্ষার ডেট পড়ল এমন সময়, যখন আমার আব্বা নাই দিময়াতে, উনি তখন কায়রোতে, তান্তা আর দাউসুক শহরে আহলে বাইত ও ওলি-আউলিয়াদের মাজার জিয়ারতে। ফেরার পথে তাঁর অভ্যাস শারকিয়্যা প্রদেশের আবু হারিজ গ্রামে নিজের পীর ও রুহানি গুরু শায়েখ মনসুর আবু হাইকাল শারকাউয়ির সাথে মোলাকাত করা। তাঁর এই সফরের প্রায় দশ দিন সময় লাগে, অথচ আমার পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন শুধুই চারটা মাত্র দিন।

আমার জিদ দেইখা মায়ের মন গইলা গেল। মা চরম একখানা ঝুঁকি গ্রহণ করলেন। কোনো এক সাত সকালে আমারে নিয়ে চুপিসারে দিময়াত থেকে মানসুরার উদ্দেশ্যে বেরোয়ে পড়লেন। মা আমারে টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুলের হোস্টেলে (ভেতর বিভাগ) রাইখা আসলেন, এই শর্তে যে চার দিনের পরীক্ষা শেষ কইরাই আমি দিময়াতের অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে করে বাড়ি ফিরা যাব। মানসুরার সেই উন্নত ইস্কুলের পরিবেশ দেইখা আমি এতটা আবেগে আপ্লুত হইলাম, ভাষায় প্রকাশ করার মত না। সেই বিশাল ভবনের ঘুমানোর ঘর, লাইব্রেরি, ক্লাশরুমের চমৎকার ডিসিপ্লিন—আমি দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকায়ে থাকলাম। পরীক্ষার নিয়ম হইল যারা হাইস্কুল শেষ করছে তারা সরাসরি দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তির পরীক্ষা দিতে পারবে, আর যারা সেই সার্টিফিকেট এখনো পায় নাই, তারা প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিবে।

আব্বার ভয়ে তটস্থ থাইকাও আমি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা শেষ কইরা যখন দিময়াতের ট্রেনে চইরা বসলাম, তখন কয়েকদিন ধরে চাইপা রাখা সেই ভয় আরও ভয় আর তীব্রতার সহিত ফেরত আসল।

বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছায়ে আমি খানিকক্ষণ থমকায়া দাঁড়াইলাম। সোজা নানাবাড়ি গেলাম এই খবর নিতে যে, আমার গরহাজিরিতে কী ঘটেছে বাড়িতে। ওইখান থেকে কিছু সাহস সঞ্চয় করতে চাইলাম—আব্বা যদি আমার এই দুঃসাহসিক কর্মের কথা জাইনা গিয়া থাকেন, তার মুখামুখি যাতে হইতে পারি।

কিন্তু সংকট আপাতদৃষ্টিতে শান্তভাবেই কাইটা গেল।

অন্তত আমাদের তাই মনে হইল। কিন্তু শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময় ঘনায়ে আসতেই আমি অবাক হয়ে দেখলাম—আমার যেইসব সহপাঠী পরীক্ষা দিছিল, তারা ইস্কুল থেকে ভর্তির নোটিশ আর হোস্টেলের জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক আর আসবাবের তালিকা হাতে পাইল। কিন্তু আমি তেমন কিছুই পাইলাম না, অথচ ইস্কুল অলরেডি ফলাফল ঘোষণা করছে এবং আমি সেইখানে দ্বিতীয় বর্ষের মেধা তালিকায় প্রথম হইছি!

নানা মশোয়ারা দিলেন ইস্কুলে একটা রেজিস্ট্রি চিঠি পাঠাইতে, এই অদ্ভুত পরিস্থিতির কারণ কী তা জানতে চেয়ে। দ্রুতই উত্তর আসল—আমার আব্বা অভিভাবক হিশেবে ইস্কুলে যেয়ে আমার ভর্তির সমস্ত কাগজপত্র প্রত্যাহার করে নিয়ে আসছেন! আব্বা কোনো বাকবিতন্ডা-ঝগড়া ছাড়াই অগোচরে কাজটা সাইরা ফেলেছিলেন।

আমি হতাশায় হিতাহিত জ্ঞান হারায়ে ফেললাম। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ কইরা দিলাম, এমনকি আমার জীবন নিয়া শঙ্কা তৈরি হইল। আত্মীয়স্বজন, বাবার সহকর্মীরা তাঁরে অনেক বোঝাইল, শেষ তরি, উনি ইস্কুলে একটা চিঠি পাঠাইবেন বলে রাজি হইলেন।

আব্বার কথার ওপর সন্দেহ করার কোনো কারণ আমাদের ছিল না। কিন্তু ইস্কুল খোলার পর আমরা যা জানতে পারলাম—উনি একটা খামের ভিতর শুধু একটা শাদা কাগজ ভইরা ইস্কুলের ঠিকানায় পোস্ট করে দিছেন! এই আনুষ্ঠানিক নাটকের মাধ্যমে উনি মূলত তাঁর ওয়াদা ভঙ্গের দায় থিকা মুক্তি পাইতে চাইছেন!

ইস্কুল শুরু হওয়ার দুই মাস পর আমার মমতাময়ী মা এমন একজনের কাছ থেকে আমার পড়ার অনুমতি আদায় করলেন, যাঁর আদেশ অমান্য করবার ক্ষেম আবার ছিল না। মা আব্বার সাথে তাঁর পীর শায়েখ মনসুর শারকাউয়ির দরবারে যান। সেইখানে কান্নাকাটি আর অনুনয়-বিনয় করে, আব্বার হাজিরিতেই, মা পীরের কাছ থেকে আমার পড়াশোনার অনুমতি নিয়া আসেন।

মা যখন এই খুশির খবর নিয়া ফিরলেন, আমার মৃতপ্রায় দেহে প্রাণ ফিরা আইল। জলদি মা আমার হোস্টেলের প্রয়োজনীয় পোশাক আর আসবাবপত্র গুছায়ে দিলেন, ঠিক যেন আমার বিবাহের সরঞ্জাম গোছাইতেছেন। আমরা মানসুরায় পৌঁছালাম, এবং সেইখানে যেয়ে একটা বড় ধাক্কা খাইলাম। ইস্কুল কর্তৃপক্ষ জানাইল যে তাদের নির্ধারিত আসন সংখ্যা পূর্ণ হয়ে গেছে, তাই আমার জন্য আর কোনো জায়গা খালি নাই।

সেই অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় আমরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়ে রইলাম। ইস্কুলের হেডমেডাম আমাদের একটা বুদ্ধি দিলেন। বললেন, কায়রোর কাছে হেলওয়ান শহরে একটা নতুন টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুল খোলার সিদ্ধান্ত হইছে। সেইখানে এখনো ভর্তির সুযোগ আছে কারণ ক্লাস আরো পরে শুরু হবে। সেই হেডমেডাম নিজ থেকেই আমারে একটা প্রশংসাপত্র লেইখা দিলেন—‘আয়েশা নামী এই মেয়ে মানসুরার ভর্তি পরীক্ষায় অত্যন্ত সাফল্যের সাথে দ্বিতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হইয়াছে।’

আমরা তখন ইস্কুল থেকে বের হইলাম। আমি ভাবছিলাম মা হয়তো আগে আমারে নিয়া দিময়াতে ফিরবেন, তারপর হয়তো হেলওয়ান যাওয়ার ব্যবস্থা করবেন। এই হেলওয়ান শহরের নাম আমরা আগে কখনো শুনি নাই, সেইখানকার পথঘাট, রাহাখরচের হিশাব আমাদের জানা নাই।

কিন্তু মা মানসুরায় এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। তাঁর হাতের একটা স্বর্ণের চুড়ি বেইচা দিলেন, আর সেই টাকা দিয়া কায়রোগামী প্রথম ট্রেনের থার্ড ক্লাসের দুইটা টিকেট কাইটা ফেললেন।

সাত.

ট্রেন আমাদের আইনা ফেলল কায়রো রেলওয়ে স্টেশনের প্রচণ্ড ভিড় ও শোরগোলের ভিতরে। আমরা মা-মেয়ে দুইজন তখন অচেনা এক জগতে পুরো নিঃস্ব-দিশেহারা। আমার মনে আছে, সেই অজানা বিপদের হাত থিকা বাঁচতেই যেন আমি চোখ বুইজা ফেলছিলাম, আর আমার মা পরম ভরশায় যারেই দেখতেছিলেন তারে সাইয়েদা জয়নব এলাকার জয়নুল আবেদিন রোডের পথ জিগাইতেছিলেন; সেখানে মায়ের মামাজানের একটা নিজস্ব বাড়ি আছে।

মামাই আমাদের নিয়া হেলওয়ান শহরে গেলেন। কিন্তু সেইখানে গিয়া আমরা আবারও ধাক্কা খাইলাম। জানা গেল সেই নতুন ইস্কুলে ওই বছর কেবল প্রথম বর্ষের ক্লাসই শুরু হবে, দ্বিতীয় বর্ষ না। মানসুরা থিকা আনা আমাদের সুপারিশপত্রটি পড়ার সময় হেডমেডাম আমাদের চেহারার হতাশা দেইখাও না দেখার ভান করলেন। তারপর অত্যন্ত হাশিমুখে আমাদের দিকে তাকায়ে বললেন, উনি আমারে ভর্তি করে নিতে রাজি আছেন, যদি আমি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার অধিকার ত্যাগ কইরা পুনরায় প্রথম বর্ষে ভর্তি হইতে রাজি থাকি।

মামা সেই ত্যাগস্বীকারপত্রে সাইন কইলেন। আমাদের বিশ্বাসই হইতেছিল না, দীর্ঘ নিরাশার পর অবশেষে মুক্তির দার খুলছে! মার মনে হইল তাঁর কাঁধ থিকা বিশাল একটা বোঝা নাইমা গেছে। হেডমেডামের অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মা আমাদের পথের সমস্ত দুঃখ-কষ্টের কথা তাঁরে খুইলা বলতে লাগল। মহীয়সী এই নারী দয়া কইরা ইস্কুল খোলার দুই সপ্তাহ আগেই আমারে ইস্কুলে থাইকা যাওয়া অনুমতি দিয়া দিলেন।

আল্লাহর ওপর ভরশা করে এবং সেই দয়ালু হেডমেডামের আশ্রয়ে আমারে রেখে, মা বিদায় নিলেন। উনি দিময়াতে ফিরা গেলেন। এক বিশাল ঝড়ের মোকাবেলা মায়ের একাই করতে হবে, অথচ তাঁর চোখেমুখে তবুও কি স্বর্গীয় ত্যাগের আভা ভাইসা আছে!

ইস্কুল ভবনটা ছিল হেলওয়ান শহরের দক্ষিণ প্রান্তের একটা বিশাল রাজকীয় প্রাসাদ। এর চারপাশ ঘিরে আছে বিশাল একখানা বাগান, ইস্কুল ভবনরে এটা পিছনের জনমানবহীন ধূ ধূ মরুভূমি থেকে আলাদা করে রাখছে।

সকাল-সন্ধ্যায় সেই বাগানে ঘুরে বেড়াইতে আমার ভালোই লাগে। উদাশ মনে তাকায়ে থাকি আমার সেই দূরের শহর, পরিত্যক্ত নদীর তীর আর স্বজনদের কথা ভেবে। হোস্টেলের নির্জনতায় আমি একাকী থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। হেডমেডাম ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিভাগ থেকে দূরে, ছাত্রীদের হোস্টেলে আমি একা থাকতাম। কেবল একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নির্দিষ্ট সময়ে আমার খাবার দিয়ে যাইত এবং রাতে আমার ঘরের পাশের একটা কক্ষে এসে ঘুমাইত।

প্রথম দিকে প্রাসাদের পিছনের মরুভূমি থেকে ভেসে আসা নেকড়েদের ডাক আমারে কিছুটা বিচলিত করত। কিন্তু অল্প দিনেই এতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। রাতের নিস্তব্ধতা ফাক করে যখন নেকড়েদের ডাক ভাইসা আসত, আমার ঘুম ভাইঙা যাইত। মনে হইত, ওই ডাকের সাথে আমার কোনো গোপন মিতালি আছে। আমি কি যে মনোযোগ দিয়া সেই ডাক শুনতাম আর ভাবতাম—এই বন্য পশুদের মনেও হয়তো কোনো গভীর দুঃখ বা ব্যথা লুকায়ে আছে। আমি খেয়াল করলাম, তারা কেবল মাঝরাতেই ডাকে। একটা নেকড়ে ডাক শুরু করলেই এলাকার বাকি সব নেকড়ে তারে সঙ্গ দিতে শুরু করে এবং লোকালয়ের একেবারে কাছে চলে আসে। মনে হইত তারা রাতের নির্জনতারে ভয় পায়, তাই একাকীত্ব দূর করতে মানুশের সোহবত চায়, দিনের আলোয় মানুষের ভয়ে যার সাহস তারা পায় না।

ইস্কুল খোলার দুই দিন আগে দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্রীরা আসতে শুরু করল। আমার সেই নির্জন একাকীত্বের জার্নি শেষ হইল। মানুশের শোরগোলে আমার একান্ত মোরাকাবার পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হইলাম যদিও, কিন্তু ক্লাস শুরু হইতেই আমার ভিতর নতুনরকম গর্ববোধ জাইগা উঠল; আমিই একমাত্র ছাত্রী যে স্বেচ্ছায় দ্বিতীয় বর্ষের অধিকার ছাইড়া প্রথম বর্ষে ভর্তি হইছে। আমার ক্লাসমেটদের সাথে থাকতে আমার বিন্দুমাত্র খারাপ লাগত না, কোনো প্রকার অনুশোচনাও হইত না। বরং যা একসময় অলীক স্বপ্ন মনে হইত, তা বাস্তবে হাতে পাওয়ায়, আমি নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরে পাইতেছিলাম।

কী এক অদ্ভুত নিরাপত্তা আর প্রশান্তিতে আমার জগৎ ভরে উঠল। আমি নতুন পরিবেশের সাথে মিশে গেলাম, নিজের মেধা, পরিশ্রম দিয়ে সেইখানে সম্মানের জায়গা তৈরির চেষ্টা করতে লাগলাম।

তখনো আমার কল্পনাতেও আসে নাই—হেলওয়ানের এই সুখের দিনগুলি কেবল ঝড়ের আগের ক্ষণিক শান্তির মূহুর্ত। জানতাম না অচিরেই গায়েব থেকে আসা আরও নতুন আঘাত আমার জন্য অপেক্ষা করতেছে…

আট.

আমার এই নতুন নিরাপদ জগতে মাত্র দুই মাস সময় গুজরাইছে, এমন সময় হেডমেডাম আমারে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠাইলেন। অত্যন্ত মমতা আর কোমলতার সাথে আমারে জানাইলেন—শিক্ষামন্ত্রণালয় ছাত্রী হিশেবে আমার অন্তর্ভুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয় নাই। কারণ নিয়মানুযায়ী, আমি যে দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষায় পাস করছি, আমারে সেই বর্ষেই ভর্তি হইতে হবে, প্রথম বর্ষে না।

মুহূর্তের জন্য আমার দুনিয়াটা দুলতে শুরু করল। আমি এমন কোনো আশার আলো খুঁজতেছিলাম যা আমারে ভাইঙা পড়া থিকা বাঁচাবে। নিজেরে সামলায়া নিয়া আমি বিড়বিড় কইরা বললাম : আমি কি আগামী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারি, তখন ইস্কুলে দ্বিতীয় বর্ষ খোলা হইলে নাহয় দোবারা ভর্তি হইলাম? কিন্তু আমি বাড়ি ফিরা যাওয়ার পর আবারও যে আব্বা আমারে ইস্কুলে পাঠাইবেন, তার নিশ্চয়তা কী?

হেডমেডাম আমারে সান্ত্বনা দিয়া বললেন : না, তুমি এইখানে আমার জিম্মায়, আমার মেহমান হয়ে থাকবে। আমি মন্ত্রণালয়ে তোমার বিষয়ে আবার কথা বলব, হয়তো তারা তাদের সিদ্ধান্ত বদলে নেবে, অথবা তান্তার টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুলে তোমার জন্য দ্বিতীয় বর্ষে কোনো জায়গা করে দেবে; আমি জানি সেখানে কিছু আসন খালি আছে।

হেডমেডামের এই মহানুভবতায় আমি বেশ অভিভূত হইলাম, কিন্তু একই সাথে আমার মনের কোণে অজানা শঙ্কার দানা বাঁধল যে—পাছে না এই আশা শুধুই মরুর মরীচিকা হয়ে যদি ধরা দেয়! আমি গভীর বিষণ্ণতায় তলায়ে গেলাম এবং কয়েকটা দিন চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে নিজেরে গুটায়ে রাখলাম।

কিছুদিন পর তান্তার টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুল থেকে ইতিবাচক সাড়া আসল। তারা আমারে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি করে নিতে রাজি, তবে একটা শর্তে—আমারে অবশ্যই মেডিকেল টেস্টে উৎরাইতে হবে। যেহেতু মানসুরায় আমার এই পরীক্ষাটা দেওয়া হয় নাই, তাই এখন এইটা বাধ্যতামূলক।

এরই মধ্যে আমার এক চাচা, ওনি ইমবাবার একটা গ্রামের বয়স্কুলের প্রধান হিশেবে সদ্য নিয়োগ পাইছেন, আমার ইস্কুলে আসলেন। আমারে উনি ইস্কুল থিক কায়রোতে নিয়া আসলেন। বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ শায়েখ মুসা কামারের বাড়িতে আমারে মেহমান হিশেবে রাখলেন। শায়েখ মুসা ছিলেন আস-সানিয়া টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুল ও দারুল উলুমের প্রখ্যাত একজন প্রোফেসর।

সিদ্ধান্ত হলো, আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মেডিকেল বিভাগে শারীরিক পরীক্ষা দিব এবং তারপর সেইখান থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপাতি নিয়ে সরাসরি তান্তার উদ্দেশ্যে রওনা হব।

প্রোফেসর শায়েখ মুসা আমার চাচারে পরামর্শ দিলেন, মন্ত্রণালয়ে সরকারি পরীক্ষার আগে আমারে যেন কোনো চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে প্রাথমিক চোখ পরীক্ষাটা করায়ে নেন। সেই প্রাথমিক পরীক্ষায় আমি উত্তীর্ণ হইলাম। তবে ডাক্তার পরামর্শ দিল, আমি যেন চশমা তৈরি করে নেই, এতে মন্ত্রণালয়ের স্ট্রিক্ট পরীক্ষায় ফেল হওয়ার আর ঝুঁকি থাকবে না।

সেই সময় আমার এই চাচা চশমা পরতেন। মন্ত্রণালয়ের মেডিকেল টেস্টের দিন আমি তাঁরে জিজ্ঞেশ করলাম, তাঁর চশমাটা পাওয়ারওয়ালা কিনা। উনি ‘হ্যাঁ’ বলাতে আমি সেইটা ধার চাইলাম। উনি বললেন : আগে পইরা দেখো তোমার চোখে সয় কিনা। আমি তখন সরল মনে ভাবলাম, সব চশমার পাওয়ার তো একই! আমি সেইটা চোখে দিয়া বললাম : হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।

পরদিন সকালে সেই ধার করা চশমা নিয়া আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মেডিকেল বিভাগে গেলাম। সেকখানে মিস জারভিস নামে এক বিদেশিনী ডাক্তার আমার চোখ পরীক্ষা করলেন। তাঁর রুক্ষ চেহারা আর হঠকারী গলা আমার একদম ভালো লাগল না। উনি আমার গ্রাম্য বেশভূষা দেইখা হয়তো অবজ্ঞা করতেছিলেন। মাত্র এক মিনিটের পরীক্ষায় উনি ইশারায় আমারে বোর্ডের লেটার পড়তে বললেন। যা হওয়ার তাই হল—ফলাফল আসল ৬০ ভাগের ৬ ভাগ দৃষ্টিশক্তি! আমি ফেল করলাম।

চাচা আমারে টাইনা নিয়া বাইর হইলেন, আমি তখন হতাশায় হাবুডুবু খাইতেছি। এরপর একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে তিনি আসল রহস্য ধরলেন, যে, চশমাটা আমার চোখের পাওয়ারেরই না! দ্রুত একটা বড় দোকান থেকে আমার চোখের মাপ অনুযায়ী চশমা বানানো হইল। সেই নতুন চশমা পইরা আমি বোর্ডের সব ছোট ছোট লেটারও পরিষ্কার দেখতে পাইলাম।

এইবার আমি শায়েখ মুসা কামারের সাথে আবার মন্ত্রণালয়ে গেলাম। কিন্তু মিস জারভিস আমারে দোবারা পরীক্ষা করতে রাজি হইলেন না। শায়েখ মুসা হাল ছাড়লেন না। উনি মন্ত্রণালয়ের এক অফিস থেকে অন্য অফিসে যেয়ে আমার সেই ‘চাচার চশমা’র গল্প দশবার-বিশবার শুনাইলেন। শেষ তরি উনি শিক্ষা পরিদর্শকের কাছ থেকে একটা চিঠি জোগাড় কইরা তান্তার টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুলে আমার পুনরায় মেডিকেল টেস্ট নিয়া আমারে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি করায়েই ছাড়লেন।

শায়েখ নিজেই আমারে তান্তায় নিয়ে গেলেন এবং পরীক্ষায় পাস না করা পর্যন্ত সেইখানে অপেক্ষা করলেন। অবশেষে আমি সেইখানে দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হইলাম। হোস্টেলে আমার যাবতীয় বন্দোবস্ত করে দিয়ে বিদায় নিলেন উনি। আমি গত সময় পুনরুদ্ধারের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে পড়াশোনা শুরু করলাম এবং অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় সফলভাবে পাস করলাম। কিন্তু, কি এক অজানা আতঙ্ক জানি সর্বদাই আমার পিছু লাইগা থাকত।

শিক্ষাবর্ষ শেষে তৃতীয় বর্ষে উত্তীর্ণ হওয়ার পর যখন বাড়ি ফিরলাম, মা তখন এতদিন আমার কাছ থিকা লুকায়ে রাখা ভয়াবহ ট্র্যাজেডির কথা ফাঁস করলেন :

আমার পেয়ারের নানা মারা গেছেন। আমি তাঁর শেষ বিদায়ের সময়টায় পাশে থাকতে পারি নাই, তাঁর কবরে গিয়া শেষ সালাম জানানোর সুযোগটাও আমার হয় নাই।

তাঁর মওতের পর আমাদের পরিবারে প্রচণ্ড ঝড় বয়া গেল। আব্বা আবার জিদ ধরলেন আমারে ঘরে বন্দি করবেন এবং সেই সহি পথে ফিরায়ে আনবেন যেইখান থেকে আমি বিচ্যুত হয়ে গেছি। আমার মা তখন জাঁতাকলে পিষ্ট : উনি একদিকে আমারে ছাড়তে পারতেছিলেন না, অন্যদিকে আমার আরও পাঁচ বোন আর দুই ভাইয়ের (যাদের একজন দুগ্ধপোষ্য শিশু) ভবিষ্যৎ এবং ঘর ভাঙার শঙ্কায় দুলতেছিলেন।

আমি বুঝতে পারলাম এইবার আমার আত্মত্যাগের পালা। মায়ের ওপর থিকা এই বিশাল বোঝা নামায়ে নিতে আমি নিজেরে কোরবান করতে রাজি হইলাম। পরিস্থিতির চাপে আমি নার্ভাস ব্রেকডাউনে আক্রান্ত হইলাম। কোনো কবিরাজ, ডাক্তারের ওষুধে কাজ হইল না। ইস্কুল থিকা আমার নাম কাটা গেল।

আব্বা এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হইলেন না। হয়তো উনি চাইছিলেন আমি মরেই যাই তবুও ওই ইস্কুলের পথে না যাই। উনি আমার এই কষ্টরে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিশেবে দেখলেন। কিন্তু মা আমার এই কষ্টে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাইতেছিলেন। মায়ের সেই কষ্ট দেইখা আমি নিজেরে আবার শক্ত কইরা বাঁধলাম।

আমি কোনো নতুন পথ খুঁজলাম, মা যাতে অন্তত শান্তি পান এই ভেবে যে, আমাদের আগের সব ত্যাগগুলি বৃথা যায় নাই।

আমার সামনে তখন একটাই পথ খোলা। আমি টিচার্স ট্রেনিং ইস্কুলের শেষ বর্ষের বইগুলি ধার কইরা বাসায় বসেই গোপনে পড়াশোনা শুরু করলাম। একদিন আব্বা যখন শহরের বাইরে সফরে গেলেন, আমি চুপিচুপি বাড়ি থিকা পালায়ে তান্তা কেন্দ্রে যেয়ে টিচার্স সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নিলাম। আমিই সেইখানে একমাত্র পরীক্ষার্থী ছিলাম যে কোনো ইস্কুলে না যেয়েই সরাসরি বাড়ি থেকে পরীক্ষা দিতেছে। আর ফলাফল? আমি সারা মিশরে, দ্বিতীয় স্থান অধিকারীর চেয়ে ১৩০ নম্বর বেশি পেয়ে, প্রথম স্থান লাভ করলাম।

চলবে…

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *