যুগসাক্ষীর স্মৃতিকথা (দ্বিতীয় পর্ব)

মালিক বিন নবি আলজেরিয়ান দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী ও সমাজবিজ্ঞানী। ফরাসি উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার মুক্তি-সংগ্রামের অকুতোভয় তাত্ত্বিক পুরুষ। এ কালের আরব দুনিয়ায় প্রধান দার্শনিকের মর্যাদা দেওয়া হলেও তাঁর খ্যাতি ও যোগ্যতা এখনো অপরিচয়ের অন্ধকারে। এর একটা কারণ হতে পারে তাঁর লেখালেখি মূলত ফরাসি ভাষায়, যার আরবি-ইংরেজি ভাষান্তর এখনো অপ্রতুল। আরেকটা কারণ এ-ও মনে করা হয়, সেক্যুলার জাতিরাষ্ট্রের দিকে ক্রমে ঝুঁকে পড়া উত্তর-সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের ভয়ানক শত্রুতা আর কাঠামোগত ইসলামবিদ্বেষ। ফলে বামধারার অন্য বুদ্ধিজীবীরা স্বীকৃতি পেলেও মালিক বিন নবির কপালে উপেক্ষা ছাড়া কিছুই জুটেনি। ১৯৭৩ সালের ৩১ অক্টোবর এই মনস্বী ভাবুক ইন্তেকাল করেন।

তার প্রধান রচনাবলি হলো : The Conditions of the RenaissanceThe Question of CultureIslam in History and SocietyThe Birth of a Society ইত্যাদি। مذكرات شاهد للقرن বা Memoirs of a Witness of the century তাঁর আত্মজীবনী। যুগসাক্ষীর স্মৃতিকথা নামে এর বাংলা অনুবাদ ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে কেয়ারি-তে।

পূর্ব প্রকাশের পর…

তেবেসায় খেলাধুলার ধরনও ছিল কনস্টান্টিনের চেয়ে ভিন্ন ভিন্ন। আমার শৈশবের প্রথম শহর কনস্টান্টিনের শিশুরা তুলনামূলক বেশি সচ্ছল হওয়ায় তাদের খেলাধুলা ছিল মার্জিত এবং তাতে ছিল আভিজাত্যের ছাপ। সেখানকার শিশুদের কাছে খেলনা হিসেবে ছিল রঙিন কাঠের তৈরি এক ধরনের সস্তা ছোট সিন্দুক, যেগুলো তেবেসার উপজাতি মেয়েরা বিয়ের জেহেজের সঙ্গে বহন করে। অন্যদিকে বড়দের জন্য ছিল লাফঝাঁপ এবং ‘কেনা’ নামক এক ধরনের খেলা।

আর তেবেসার খেলাধুলা স্থানীয় রুক্ষ ঐতিহ্যের প্রভাবে হয়ে উঠে তুলনামূলক কঠোর ও রূঢ়ধর্মী। কোনো কোনো খেলা কখনো জাদুটোনা আর ভেলকিবাজির কাছাকাছি চলে যেত।

এছাড়াও তেবেসায় আরও কিছু মওসুমি খেলাধুলার প্রচলন ছিল। বসন্তে শহর আর উপশহরের ছেলেদের মধ্যে ‘কুরা’ নামক একটি জনপ্রিয় খেলার বন্দোবস্ত হতো। অনেকসময় সেই খেলায় অংশ নেয় বড়রাও। ‘কুরা’ বা বল বানানো হতো ওক গাছের গিঁট কিম্বা ছাগলের চুল থেকে। খেলার নিয়ম হলো দুইটা দল দুদিকে থাকবে, প্রতিটি দলই প্রাণপণে কুরাকে প্রতিপক্ষের অংশে পাঠানোর চেষ্টা করবে। এর জন্য ব্যবহৃত হতো ওক গাছের ডাল, যার একপ্রান্ত আগুনে হালকা ছ্যাঁকা দিয়ে বাঁকানো হয়েছে। বর্তমান সময়ের গলফ খেলার সাথে এর অনেক মিল।

তেবেসায় আরেকটি খেলা ছিল তুলনামূলক ভয়ংকর। খেলাটি হলো তেবেসা আর উপশহরের ছেলেদের মধ্যকার ছোটখাটো মারামারি। এই খেলাটার প্রচলন কনস্টান্টিনেও ছিল, সেখানে মারামারির জন্য মুখোমুখি হতো কান্তারা মহল্লা আর জাদাবিয়া গেটের ছেলেরা।

তবে আমাদের তেবেসার ছেলেদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলা ছিল ‘ঝটিকা আক্রমণ’। তেবেসা শহরকে ঘিরে রেখেছে একটি বিস্তীর্ণ সবুজ অঞ্চল, কৃষকরা যেখানে নানান প্রজাতির সবজি-ফল চাষ করে। লেটুস আর ফলের মৌসুমে আমরা দল বেঁধে সেগুলোতে ঝটিকা আক্রমণ করে হাতের মুঠোয় যা ধরে, তাই নিয়ে দৌড়ে পালাতাম। এমনকি কখনো কখনো শিশুরা দলে দলে স্কুল পালিয়ে সেসব ফসলি জমিতে হানা দিত। সম্ভবত জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সাথে এই ফসলি জমিগুলো জনশূন্য পতিত ভূমিতে পরিণত হওয়ার কারণ ওই শিশুরাই, পরবর্তীতে যা দুটি আবাসিক এলাকা হিসেবে সমৃদ্ধ হয়।

আমার নিজেরও পছন্দের জায়গা আর পছন্দের দিন ছিল। প্রতি বুধবার জোহরের পর বাগান লুটের জন্য বিশেষ টান অনুভব করতাম। বুধবারে স্কুলের শিক্ষক—তখনো আমি ভর্তি হইনি ফরাসি স্কুলে—নির্ধারিত সময়ের আগেই আমাদের ছুটি দিয়ে দিতেন। তবে এর জন্য প্রতিটি শিশুকেই দুই পয়সা করে গুনতে হতো। বাগানগুলোতে ঝটিকা আক্রমণের পর্যাপ্ত সময় এই বিদায়েই আমরা পেয়ে যেতাম।

দুপুরের সময় যখন সূর্যের মনোরম সোনালি আভায় শহরটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকে গভীর ভাবালুতায়, তখন কনস্টান্টিন শহরের ফুটপাত কিম্বা কারনো স্কয়ারে খেলে আমার খুবই  ভালো লাগত। কারনো স্কয়ারে একটি সঙ্গীত কিয়স্ক স্থাপিত ছিল, যেখানে চৌদ্দ জুলাই রাতে ফরাসিরা সঙ্গীতের তালে নেচে-কুঁদে মাতোয়ারা হয়ে থাকে।

এখনো মনে পড়ে এক বুধবার বিকেলের কথা, ফুটপাতে খেলতে খেলতে জনৈক ইউরোপীয়ের পায়ের ওপর পাড়া দেওয়ায় সে আমাকে সজোরে লাথি মারে। প্রাচীরের কাছে খেলে বিশেষ আনন্দ পেতাম, মনে হতো আমি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ছি অন্য জগতে।

শহরের অন্যান্য অংশে গেলে আমার হৃদয় অস্থির হয়ে যেত। যখনই বড় বোনের সঙ্গে গির্জার পাশ দিয়ে অতিক্রম করতাম, একনাগাড়ে চেয়ে থাকতাম গির্জার ঘণ্টীর দিকে। তখন আমাকে এমন একটা ভাবনা পেয়ে বসেছিল, যা কখনো কাউকেই আমার বলা হয়নি। আমি বিশ্বাস করতাম আমার ছোট বোন ওয়ারদা—যাকে কখনো আমার দেখা হয়নি, কারণ আমি যখন দুধের শিশু, তখন সে মারা যায়—সেই গির্জার ভেতর বন্দী হয়ে আছে। যেন সে কারও কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া কোনো গুপ্তধন, যা নিরাপদে লুকিয়ে রাখা হয়েছে এমন সুরক্ষিত জায়গায়, যেখানে কোনো হাত পৌঁছুতে পারে না।

কাদেরিয়া মহল্লা আমাদের বাড়ি থেকে বেশি দূরে ছিল না। তৎকালীন রীতি ছিল পাড়ার বাদ্যদল বিয়ের দিন বরকে এবং খতনার দিন খতনাকৃত শিশুকে সঙ্গ দিবে। বাদ্যদলের প্রথম বাজনাটুকু কানে আসতেই আমি ছুটে যেতাম। দুপুরে বাজনা শুনলে বুঝতাম অমুক পরিবারে খতনার অনুষ্ঠান হচ্ছে। তখন মহল্লার অন্য ছেলেদের সাথে আমিও সেই বাদ্যদলের সাথে শোভাযাত্রার পেছনে পেছনে দৌড়াতাম।

এই সময়ে এসে সেই স্মৃতিগুলো খুবই অদ্ভুত মনে হয়। পাশাপাশি ধীরে ধীরে আমাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। ছেলেবেলায় স্কুলে পড়াশোনার সুবাদে আমার বাবার চাকরি হয় তেবেসার মিশ্র পরিষদে।

এরপর ফরাসি স্কুলে পাঠানো হয় আমাকে। একই সঙ্গে আগের কুরআনিক স্কুলেও যাতায়াত অব্যাহত রাখলাম। প্রতিদিন ভোরে চলে যেতাম কুরআনিক স্কুলে আর সকাল আটটায় হাজির হতাম ফরাসি স্কুলে। এই দ্বৈত চাপ একসময় অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। ফরাসি স্কুল আর কুরআনিক স্কুল এবং এ দুটোর শিক্ষকদের ভেতরকার যে বৈপরীত্য, দুটো একসাথে মানিয়ে নেওয়া আমার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। ফলে কুরআনিক স্কুল থেকে ধীরে ধীরে সরে পড়ি। এতে বাবা আর কুরআন শিক্ষকের নিয়মিত শাস্তি আমার কপালে জুটে।

এর পাশাপাশি কুরআনিক স্কুলের প্রতি আমার বিতৃষ্ণা আরও বেড়ে যায়। এভাবে চলতে চলতে উভয় স্কুলেই আমার অবস্থার ভীষণ অবনতি ঘটে। এক পর্যায়ে বাবা বুঝতে পারলেন, আমারও কুরআনিক স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। কুরআনিক স্কুলে চার বছর কাটালেও তেমন কিছু শেখা হয়নি। সর্বোচ্চ সূরা আ’লা পর্যন্ত শিখেছিলাম।

এখানে আরেকটি মজার স্মৃতি মনে পড়ছে। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো আমিও সকালবেলা মাদরাসার কোণে থাকা ছোট্ট হাউজে পাথরের তক্তাটি ধুয়ে নিতাম। আমাদের লেখার কালি মিশে যেত সেই পানিতে, সামাগ নামের যে কালি শিক্ষক নিজেই ভেড়ার চর্বি দিয়ে তৈরি করতেন। হাউজের পানি সেই কালিতে ভরে গেলে আমরা বালতি দিয়ে তুলে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে ফেলে আসতাম।

একদিন আমি আর আমার সহপাঠীরা সেই পানি এই বিশ্বাসে পান করি যে, এতে আল্লাহর নাম মিশে আছে। আমাদের এই কাজটি ছিল নিষ্কলুষ ও গভীরভাবে আবেগময়; আমরা তো স্বয়ং আল্লাহর পবিত্র কালামকেই পান করতে চেয়েছিলাম।

আমাদের ছোট্ট শহরের একমাত্র ফরাসি স্কুলে স্থানীয় ছোট ছেলেদের জন্য একটি বিশেষ চতুর্থ শ্রেণি খোলা হয়, যার নাম দেওয়া হয়েছিল petits indigenes। এটাকে বলা যায় এক ধরনের ‘পরিশোধনাগার’, যেখানে একটি ছেলে প্রথমে কয়েকবছর কাটায়। তারপর পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় সে দ্বিতীয় নাকি তৃতীয় শ্রেণির জন্য উপযুক্ত। আমি সৌভাগ্যক্রমে সরাসরি তৃতীয় শ্রেণির জন্য উপযুক্ত হয়ে যাই।

আমার মনে হয় এই সৌভাগ্যই আমার পড়াশোনার পথ খুলে দিয়েছিল। আর সেই সৌভাগ্যের মূর্তপ্রতীক ছিলেন আমার শিক্ষিকা মাদাম বেল, যার কথা আজও আমি উষ্ণ ভালোবাসায় স্মরণ করি। এই শ্রেণিতেই প্রথমবারের মতো আমি ইউরোপীয় শিশুদের সঙ্গে ক্লাসে বসি, যারা পঞ্চম শ্রেণির বারান্দা পেরিয়ে এসেছিল।

আমার পরিবার তখন বিশেষভাবে আমার প্রতি গুরুত্বারোপ শুরু করে, যেন নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারি। আমাকে একটি কালো ইউনিফর্ম আর ব্যাগ দেওয়া হয়, যেন সহপাঠীদের সাথে মিশে যেতে আমার কোনো দ্বিধা না থাকে।

প্রথম পরীক্ষায় আমি এক নম্বর হই। যতটুকু মনে পড়ে, পরীক্ষাটি ছিল ফরাসি ইমলা আর ভাষা সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নের। পুরস্কারস্বরূপ সেদিন শ্রেণিকক্ষের খাতার প্রথম পাতায় আমাকে অনুশীলন লেখার সুযোগ দেওয়া হয়। যে খাতাটি প্রতিদিন সকালে শিক্ষক বা শিক্ষিকা মেধাক্রম অনুযায়ী ছাত্রদের হাতে তুলে দিতেন।

তবে আমার স্মৃতিতে সবচেয়ে জীবন্ত যে ঘটনাটি, তা হলো মাদাম বেলের প্রতি বিদ্যুৎস্পর্শের মতো ভালোবাসা, যা প্রচণ্ড বেগে আমাকে আকর্ষণ করেছিল। এক সকালে ঘুম থেকে জেগে তার প্রতি উন্মত্ত ভালোবাসা অনুভব করি, যেন তিনি আমার নিজেরই মা। হয়ত ফ্রয়েডের তত্ত্বগুলোর আলোকে এর কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ভদ্রমহিলাও আমার ছোট্ট হৃদয়ের আকুলতায় সাড়া দিয়েছিলেন।

সবকিছু মিলিয়ে আমার পড়াশোনার সূচনাটা ভালোই হলো। ধীরে ধীরে রাস্তাঘাটেও আমার আচরণে পরিবর্তন আসতে থাকে। শান্ত ও সুশৃঙ্খল হয়ে চলতে শুরু করলাম। সম্ভবত সেই সময় থেকেই ঘনঘন মসজিদে যাওয়া-আসা শুরু। বিশেষত ছুটির দিনগুলোতে। জুমআর নামাজে যেতে আলাদা আনন্দ হতো; কারণ কেবল এই উপলক্ষ্যেই আমাকে পরতে দেওয়া হতো কারুকার্যখচিত সাদা জামা আর ছেট্ট বুরনুস। এই সুন্দর জামাগুলো আমাকে উপহার দিয়েছিলেন চাচার স্ত্রী বাহিজা, যার মায়ার আঁচলে কনস্টান্টিনে বেড়ে উঠেছে আমার শৈশব। তিনি প্রায়ই তেবেসায় এসে আমাদের দেখে যেতেন। তার প্রতিটা আগমন আমার ভেতর জাগিয়ে তুলত জন্মভূমির প্রতি নস্টালজিয়া আর গভীর আকুলতা।

ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যদের কথাবার্তা বুঝার সক্ষমতা তৈরি হলো। এভাবেই চাচী বাহিজার এক আগমনে জানতে পারলাম আমার দাদা পশ্চিম ত্রিপোলি থেকে কনস্টান্টিন চলে এসেছেন। পশ্চিম ত্রিপোলি এখন ইতালিয়ানদের দখলে।

খেলাধুলা আর পড়াশোনার ভেতর তেবেসায় আমার সময়গুলো কাটতে থাকে। হঠাৎ একদিন সুযোগ আসে কনস্টান্টিন ভ্রমণের আর সেই দাদার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার, ইতোপূর্বে যার মুখ দেখার সৌভাগ্য আমার লাভ হয়নি।

তেবেসা শহরকে ঘিরে থাকা সমতলভূমির প্রাচীন পরিবারগুলো কৃষিকাজের ওপরই নির্ভর করত, যা তাদের এবং তাদের গবাদিপশুর খাদ্যের জোগান দেয়। ১৯১২ সালের ভয়াবহ দাবানলে এই অঞ্চলের বনভূমি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এরপর থেকেই প্রাচীন পরিবারগুলোর ধীরে ধীরে আর্থিক সংকট শুরু হয়। একপর্যায়ে সংকট চরম আকার ধারণ করে। ফলে সেই সামাজিক অবক্ষয় বা ভাঙন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি প্রাচীন রোমান শহরের প্রাচীর ডিঙিয়ে এর স্রোত প্রাচীরের ভেতরও বইতে থাকে।

সেইসময় প্রাচীরের ভেতর তেবেসা শহরকে দেখে মনে হতো তার জনজীবন স্বাভাবিক। শুধু ব্যতিক্রম ঘটনা ছিল শহরের নির্বাচন। একসময় রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে শহরের ভেতর। তখন দুটি নেতৃত্বের ভেতর টানাপোড়েন চলছিল শহরে। একদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্বাস ইবনে হামানা আর অন্যদিকে প্রশাসনের মদদপুষ্ট বিন আল্লাওয়া।

ইবনে রিহাল যেমন ছিলেন পশ্চিম আলজেরিয়ার জাতীয়তাবাদী চিন্তার অগ্রদূত, তেমনই তার সমসাময়িক ইবনে হামানাও ছিলেন আলজেরিয়ার পূর্বাঞ্চলের অগ্রদূত। যদিও তার ততটা প্রসিদ্ধি ছিল না। দুজন প্রথমে পরিচিত হন। এরপর উভয়ে মিলে গঠন করেন প্রথম আলজেরিয়ান প্রতিনিধিদল, যা সেইসময় প্যারিস ভ্রমন করে সরকারের কাছে স্থানীয় জনগণের দাবিদাওয়া পেশ করে।

প্যারিসে ইবনে হামানা একটি মজার স্মৃতি রেখে আসেন। ফরাসিরা দেশের জন্য তাদের দাবিকৃত অধিকারে সাড়া দেয়নি, তবে ইবনে হামানাকে তারা দিয়েছিল ‘কৃষি-কৃতিত্ব পদক’। পরবর্তীতে আলজেরিয়ায় জনৈক ইউরোপীয় কর্মচারী তাকে জিজ্ঞেস করে আপনি কী চাষ করার বদৌলতে এই পদক পেলেন? তিনি উত্তর দেন, আমি কিছুই চাষ করিনি, তবে প্যারিসে ‘প্রভাব’ চাষ করে এসেছি!

তবে ওই সময় এই মানুষটির নাম জড়িয়ে পড়ে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সাথে, যা আলজেরিয়ায় ফরাসি প্রশাসনের ভীত কাঁপিয়ে দেয় এবং ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঘটনাটি এতই আলোচিত হয় যে, জনৈক ইউরোপীয় লেখক এ নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যার নাম দেন ‘তেবেসা মামলা’।

তদুপরি ইবনে হামানা স্মরণীয় ভিন্ন এক কারণে। তিনিই প্রথম আলজেরীয়, যিনি দেশে আরবি ভাষার পুনর্জাগরণে কাজ শুরু করেন। তারই উদ্যোগে তেবেসার নগর-প্রাচীরে গড়ে ওঠে প্রথম আরবি স্কুলের দেয়াল।

এভাবে হঠাৎ করেই যেন শহুরে জনজীবন চাঙ্গা হয়ে ওঠে, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা। পৌর নির্বাচনের আগের দিনগুলো নানান তৎপরতায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। আর ফলাফল ঘোষণার পরবর্তী সন্ধ্যাগুলো হয়ে পড়ে আরও তীব্র, বিজয়ী দল শহরের অলিগলিতে উৎসবমুখর মিছিলে মেতে ওঠে। এসব মিছিল শুধু প্রধান সড়ক আর অলিগলিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পরাজিত দলের সমর্থকদের বাড়িঘরের সামনে থেমে গেটগুলোতে লাঠি দিয়ে আঘাত করে।

এক সন্ধ্যায় মিছিল এসে থামে আমাদের বাড়ির সামনে। আমরা ছিলাম সালেহ বিন হামানার সমর্থক, যিনি নির্বাচনে হেরে যান। আমাদের গেটে বিজয়ী দলের লাঠির আঘাত ছিল স্বাভাবিক। এখানে স্বীকার করতে চাই যে, সেই মুহূর্তে ভয়ে আমার বুক কেঁপে ওঠে। আমাদের আশঙ্কা হচ্ছিল, তারা হয়ত গেটে আঘাত করেই থামবে না, বরং ঘরের ভেতরে ঢুকে সবকিছু ভেঙে-চুরে দেবে। এমনকি ছোট্ট আমাকেও হয়ত লাঠির আঘাতে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। বাবা তখন বাড়ির বাহিরে ছিলেন, আর আম্মা জানালার ফাঁক দিয়ে দেখছিলেন সেই দৃশ্য, আমি আতঙ্কে আম্মার পেছনে লুকিয়ে পড়ি।

তেবেসায় আরেকটি পরিচিত দৃশ্য ছিল—লোকজ-দৃশ্য। বাজারের দিনগুলোতে, যদি তা আমার ছুটির দিনগুলোর সাথে মিলে যেত, আমি বাজারে গিয়ে ‘বাব আল-জাদিদে’র নিকটের চত্বরে দাঁড়িয়ে গল্পকারদের গল্প শুনতাম গভীর মনোযোগে। তারা সুর করে হজরত আলির বীরত্বের গল্প বলত। আমাকে আরও বেশি মুগ্ধ করত সাপুড়েদের সাপের খেলা। কখনো সেখান থেকে সরে বিন ঈসা পার্টির কাছাকাছি ভীড়ে দাঁড়িয়ে তাদের ভেলকিবাজি দেখতাম, যা জমজমাট হয়ে উঠত তাদের সঙ্গে থাকা কমেডিয়ানের বিবিধ অঙ্গভঙ্গিতে, যাকে তারা ‘মুসাইয়াহ’ নামে ডাকত।

সন্ধ্যায় মানুষ আলজেরীয় কফিখানায় সমবেত হতো গল্পকারদের কণ্ঠে আলিফ লায়লা আর বনু হিলালের উপাখ্যান শোনার জন্য। আর যারা এশার নামাজের পর মসজিদে থেকে যেত, তারা মনোযোগ দিয়ে শুনত ইমাম সাহেবের দরস। এভাবেই তেবেসা হয়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে অতীতের উপাদান আর ভবিষ্যতের হাওয়া মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। নিশ্চিতভাবেই আমার মন আর মননও এই দুই ধারার ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ে এভাবেই চলছিল তেবেসার জীবন, ফরাসিরা পরবর্তীতে যাকে অভিহিত করে ‘সুন্দর যুগ’ বা ‘বেল এপোক’ হিসেবে।

এক সকালে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে আব্বাস ইবনে হামানা খুন হয়েছেন। এর অল্প কিছুদিন পরেই শহর প্রত্যক্ষ করে চোদ্দ জুলাই ফরাসিদের সর্বশেষ স্বাধীনতা উৎসব, যা যেন সুন্দর যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করছিল। ফরাসিরা প্রতিটি পথে, সেনাছাউনির গেটের দুই পাশে তোপ স্থাপন করে রাখে। আমার মনে হতে থাকে এগুলোর সাথে নিশ্চয়ই ইবনে হামানার খুনের সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি এর কিছুদিন পর যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে, তখনো আমার মনে হয়েছিল এগুলো ইবনে হামানার হত্যাকাণ্ডেরই ফলাফল।

চলবে…

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *