বাঙালি ও প্রথাসিদ্ধ মৃত্যু

এক নিতান্তই গরিব বাঙালি খান্দানের মেয়ে, স্নেহলতা। তার মা-বাবা যে মেয়ের শাদির ফিকিরে হাত-পা গুটিয়ে বসেছিলেন, এমন অপবাদ তাঁদের দেওয়া চলে না; কিন্তু রসম-রেওয়াজের সেই লানতঘেঁষা অমোঘ জিঞ্জিরে আটকা পড়ে বেচারাদের জান একেবারে ওষ্ঠাগত—কারণটা আর কিছুই নয়, পাত্রপক্ষ পণের বাজারে একেবারে ‘একদরে’ তিন হাজার টাকা হাঁকিয়ে বসেছে!

এই বাঙলা মুলুকে (এবং বলা চলে হিন্দুস্থানের আকছার কওমের মধ্যেই) এক আজব দস্তুর চালু আছে—বিয়ের আসরে কনেপক্ষকেই মোটা অঙ্কের নজরানা গুনতে হয়। এর পেছনের কারণটাও বেশ হিতচিন্তামূলক ছিল বটে—হিন্দু আইনে হতভাগা মেয়েদের কপালে তো আর পৈতৃক সম্পত্তির হিস্যা জুটে না, তাই এই বঞ্চনা পুষিয়ে দিতেই বোধকরি গোড়ার দিকে এই প্রথার আমদানি হয়েছিল।

কিন্তু ‘হিতে বিপরীত’ যাকে বলে—সদিচ্ছার খাতিরে যার পয়দা, সেই প্রথাই কালক্রমে এমন জাঁকিয়ে ঘাড়ে চাপল যে, মেয়ের বাপ মানেই এখন বিয়ের বাজারে বরের বাড়ির হীনতম কেনা গোলাম। যেভাবে মর্জি তাকে ইস্তেমাল করা যায়।

মেয়ের জীবনের ফয়সালা এখন বরপক্ষের হাতে। আর বাজারদরের হিসেবটা দেখুন—পাত্র যত উঁচুদরের, তার দামও তত চড়া। আর পাত্রপক্ষ যদি কোনোরূপে টের পায় যে কনেপক্ষের গরজ বা দুশ্চিন্তা বড় বেশি, অমনি সেই সুযোগে নিজেদের দামটি আরও এক কাঠি চড়িয়ে দেয়। এ যেন এক অদ্ভুত সওদাগরি বটে!

শেষমেশ ঘটনা যা দাঁড়াল, এক গরিব বাঙালি পরিবারের জন্য মেয়েটি যেন হয়ে ওঠে সাক্ষাৎ বরবাদি, এক নীরব অভিশাপ। একটি মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে কত শত খান্দান যে তাদের ভিটেমাটি, শেষ সম্বলটুকু বিকিয়ে দিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেল, তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে? আর সেই দুর্ভাগা মা-বাবা? তাঁদের বাকিটা জীবন কাটে অভাবের কশাঘাতে, ধুঁকে ধুঁকে—উপবাসে আর হাহাকারে।

গত একশো বছরে বাংলার মাটি কম তো আর সংস্কারকের জন্ম দেয়নি। রাজা রামমোহন রায় থেকে শুরু করে কেশবচন্দ্র সেন—কত রথী-মহারথী এলেন। একজন লড়লেন সত্যের জন্য, অন্যজন আজীবন গলা ফাটালেন বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে; কিন্তু জাতির পায়ে পরা এই লোহার বেড়িটি কেউ ভাঙতে পারলেন না। সমাজ নামক ওই পাষাণ প্রাচীরে মাথা কুটে তাঁরাও শেষ পর্যন্ত হার মানলেন। জাতির জীবনের এই দুশমনটি যেন অজেয় হয়েই রইল।

আল্লাহর কী কুদরত দেখুন! যেখানে বড় বড় জ্ঞানীগুণী আর মহাজনেরা তাঁদের সমস্ত বুদ্ধি, শাস্ত্র আর দলবল নিয়েও মুখ থুবড়ে পড়লেন—সেখানে মঞ্চে এলো নিতান্তই গরিব এক কিশোরী। ভারতবর্ষের পুরোনো প্রথার জাঁতাকলে যার জীবনের মোটে সতেরোটি বসন্ত পার হয়েছে। এই বিশাল দৈত্যের মোকাবিলা করার জন্য মেয়েটির হাতে না ছিল কোনো সম্বল, না ছিল কোনো অস্ত্র।

তবু, ঝানু সব সমাজপতিরা যা এক জীবনে করে উঠতে পারেননি, এই পনেরো-ষোল বছরের মেয়ে স্নেহলতা এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তে তাই করে দেখাল। হায়, দুনিয়ার যত বিপ্লবী আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াকু মানুষেরা আসলেই জানে না—লড়াইয়ের এই ময়দানের একমাত্র কার্যকর হাতিয়ার হলো আত্মদান ও কুরবানি। ত্যাগের এই ময়দানে তাদের ঝুলি আজ বড্ড শূন্য। তাই আজ বরং এই ছোট্ট স্নেহলতার কাছে তারা হাত পাতুক। শিখে নিক, কী করে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হয়—যে পাঠ তাদের মোটা মোটা পুথিতে নেই, তা আজ এই সতেরো বছরের মেয়েটির  আত্মত্যাগের মাঝেই খুঁজে পাবে।    

স্নেহলতা যখন টের পেল, তার মা-বাবা তাকে বড় কোনো খান্দানে পাঠানোর স্বপ্নে বিভোর, তখন সে বুঝতে পারল—এর চড়া মাসুল জোগাতে মা-বাবার বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও নিশ্চিত নিলামে চড়াতে হবে। সংসারের সম্বল বলতে ছিল তো কেবল ওই ভিটেমাটি আর একচিলতে জমি। বেচারা বাবা আমার, সেগুলো বন্ধক রেখে টাকার জোগাড়যন্তরে নামলেন, কিন্তু পোড়া কপালে তারও কোনো জুতসই দাম জুটল না। নিজের চোখের সামনে জন্মদাতা মা-বাবার এই নাজেহাল দশা দেখে মেয়েটি তার হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে এক কঠিন পণ করে বসল।

সে নিজের ছোট্ট বুকটার কাছে জানতে চাইল—‘আমার মা-বাবা যদি কেবল আমার খাতিরে সবকিছু উৎসর্গ করতে রাজি থাকে, তবে আমি? আমি কি কিচ্ছুটি করতে পারব না? আমি কি আমার  জাতিকে এই রাক্ষুসে প্রথার কবল থেকে বাঁচাতে কিছু করতে পারি না?’

স্নেহলতার চোখের সামনে একদিকে ছিল জীবনের রংবেরঙের হাতছানি আর ভরা যৌবনের মায়াবী বাসনারা—যাদের শক্তি অপরিসীম। কিন্তু সে দু’হাতে সব ঠেলে সরিয়ে দিল। ভেবে দেখুন—নারী! সে তো বড্ড নাজুক, বড্ড কোমল; যে নারী সামান্য শুকনো পাতার মর্মর শব্দেও শিউরে ওঠে, চমকে যায়। কিন্তু আহা! সেই ‘অবলা’ নারীর মন যখন একবার কোনো চূড়ান্ত ফয়সালা করে ফেলে, তখন সে এক অজেয় শক্তি। সাগরের উত্তাল ঢেউ, পাহাড়ের কঠিন শিলা, মাটি ফাটানো ভূমিকম্প, এমনকি দুনিয়ার বড় বড় শাহানশাহর ফৌজও সেই সংকল্পের কাছে খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। সত্যি বলতে কি, নারীর মন এই দুনিয়ার এক দুর্ভেদ্য প্রহেলিকা, যার রহস্যের কূলকিনারা আজও কেউ খুঁজে পেল না।

অবশেষে সেই অন্তিম প্রভাতটি এলো। ঘরের দরজা যখন খুলল, তখন রোজকার মতো স্নেহলতার সেই ম্লান, চিন্তামগ্ন মিষ্টি হাসিটি আর দেখা গেল না। তার বদলে পড়ে ছিল যৌবনের লাবণ্যে ভরা দেহটির দগ্ধাবশেষ। তার পুড়ে যাওয়া শরীরের ছাই আর কয়লা হয়ে যাওয়া অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো যেন নিথর স্তব্ধতায় মানুষের এই চরম স্বার্থপরতার দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসছিল। আর তার বিছানায়? সেখানে পড়ে ছিল সদ্য লেখা একখানা চিঠি। চিঠির কালি ততক্ষণে শুকিয়ে কাঠ, কিন্তু হায়! সেই শুকনো অক্ষরের পরতে পরতে জমে আছে কান্নার এমন এক সয়লাব, যা যেকোনো পাথরের বুকেও বান ডাকতে পারে। স্নেহলতা লিখে গেছে—

ওগো আমার দুঃখী বাবা!

মেয়ের সুখের আসমান গড়তে গিয়ে তুমি পথের ভিখারি সাজবে, সর্বস্বান্ত হয়ে পথে পথে ঘুরবে—এ দৃশ্য আমি কোন প্রাণে সইব বলো? তুমি আমাকে কী অপরিসীম মায়া আর ভালোবাসা দিয়ে কোলেপিঠে করে বড় করেছ, তা কি আমি জানি না? তবে আজ কেন আমি পাষাণ হয়ে দেখব যে, আমারই সুখের জন্য তুমি নিজেকে এমন নির্দয়ভাবে বলি দিচ্ছো?

তার চেয়ে ঢের ভালো, আমিই বরং সরে যাই। আমিই নিজেকে সঁপে দিই আগুনের লেলিহান শিখায়

যে অলক্ষুনে প্রথা আজ হাজারো ঘর ভেঙেছে, কত খান্দানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে—আমি আমার জীবন দিয়ে সেই রাক্ষুসে প্রথার বিরুদ্ধেই নিজেকে উৎসর্গ করছি। আজ আমার শরীর থেকে যে আগুনের ফুলকি জন্ম নেবে, খোদা যদি চান তো সেই আগুন ইনশাল্লাহ দাবানল হয়ে একদিন গোটা হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে পড়বে। আর যে পিশাচী প্রথা গরিবের মেয়েদের তার স্বামীর ঘর করতে দেয় না—আমার এই চিতার আগুনে পুড়ে সেই প্রথা একদিন ছাই হতে বাধ্য।

আল-হিলাল, মার্চ ১৯১৪

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *