আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাত। মোঘল রাজ আকবরের প্রাসাদ।
রাজপুরীর সীমানার ভেতর প্রশস্ত অঞ্চলজুড়ে সম্রাটের শৌখিন বন, বন পেরিয়ে যমুনার ঘাট। নানা মুলুক থেকে সংগ্রহ করে আনা অথবা রাজ-রাজড়াদের তরফ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া পশুপাখির অভয়ারণ্য এটি। সেই বনভূমি ও প্রাসাদের মাঝামাঝি স্থানে, সুচারু ফুলবাগানে টানানো হয়েছে মেহফিলের শামিয়ানা। এখানে-ওখানে ছড়িয়ে আছে পরীর ভাস্কর্য, সিংহের মুখ, পাথরের বালক মালি। রয়েছে কৃত্রিম সরোবর, তায় উৎসারিত ঝরনা।
গ্রীষ্মকাল বটে, নদীর কুলকুল হাওয়া এসে দুলিয়ে যাচ্ছে মাঠের ঘাস, চাঁদোয়ায় উঠছে বাতাসভরা পালের নাচ, হরেক রঙের ঝাড়বাতি, রঙবেরঙের কাগজের ঘুড়ি, ঝালরের ফুল-পাখি-লতা দুলছে, তাদের অভিজাত আলো স্থির, শুধু মোমবাতিগুলোর শিখা অনবরত জুঝে চলছে হাওয়ার দাপটের সঙ্গে পাল্লা মেপে।
আজ রোদভরা মধ্যাহ্ন থেকে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসা অবধি জলসার সাজ সাজ প্রস্তুতি। আজ, এ নবমী চাঁদের রাতে, এখানে ধ্রুপদ সঙ্গীতায়োজন করবেন আকবরের নবরত্নের এক রত্ন মিয়া তানসেন।
চক্রাকার সভার মধ্যখানে হরিণচর্মের ওপর গায়কের প্রশস্ত আসন, রুদ্রবীণাটি শুইয়ে রাখা সদ্য মৃত লাশের মতো শাদা কাপড়ে আবৃত হয়ে আছে। পাশে আসীন তানসেনের কন্যা ও ভাবকন্যা, এদের তিনি নিজ তত্ত্বাবধানে মেঘমল্লার রাগে সিদ্ধ করেছেন। একজন পাখোয়াজে তালসঙ্গত করবে, আরেকজন তানপুরায় জাগাবে স্পন্দন।
বাদশাহি তাকিয়া সবার সামনে, গায়কের মুখোমুখি। এরপর সভাসদ মন্ত্রীদের জন্য বিশেষ সারি। রাজ্যের নানা প্রান্তের গায়ক, বাদক, সঙ্গীতজ্ঞ ভিড় করেছেন আজ। বিশেষ একটি কারণে এই সমাবেশ।
আমির খসরু ঘরানার এক সাধক দরবারে তশরিফ রেখেছিলেন এক হপ্তা আগে। কথা প্রসঙ্গে আকবরকে তিনি জানিয়েছেন, গানের গুপ্ত ভাবজগতে এমন একটা রাগ আছে, মোক্ষপ্রাপ্ত কোনো শিল্পী যদি সে রাগ নিখুঁতভাবে আলাপ করেন, পরিবেশে তার তাপ ও উত্তাপ এমনতর তীব্রতায় ছড়িয়ে পড়ে যে, আশপাশের বিভিন্ন উপকরণে আগুন জ্বলে ওঠে।
আকবর শিশুদের মতো কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। গানের মরমি শুদ্ধ সাধক বলতে তার সাম্রাজ্যে একজনই সর্বোত্তীর্ণ, আর তিনি মিয়া তানসেন। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বাদশা তার দিকে তাকাতেই মিয়া সে প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিলেন।
সুর মানুষের প্রতি সরাসরি ঈশ্বরের দান। যখন সাধক তান ধরেন, তার আত্মার সাথে আল্লার একটা কলবি যোগ তৈরি হয়। আল্লার সুধা থেকে লক্ষ কোটি ভাগের অণুভাগ মহাজাগতিক তরঙ্গ ও ইথারের সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে সরাসরি গায়কের হৃদপুকুরে, তখনই কেবল পরিপার্শ্ব প্রভাবিত হয়, যেহেতু সুরের সঙ্গে শক্তিরও অনুরূপ একটি অংশ নেমে আসে।
কিন্তু এইসব গোপন, মানুষের মজলিসে সে প্রেমসংযোগ জমে না। মহারূপ সর্বদা সৃষ্টির আড়ালে গোপন থাকেন, প্রেমের অধিকারে তার চাদর ধরে টানাটানি পছন্দ করেন না। আকবরের পীড়াপীড়ি তানসেন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বারবার।
এ সুযোগটি নিল মিয়ার প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ, রাজদরবারে সুযোগলোভী একদল গায়ক-বাদক। তারা কথা ছুড়ে দিল, তানসেন যদি উচ্চাঙ্গ সংগীতের সিদ্ধ পুরুষ হনই, তবে পূর্ণ রাগ দীপক বাজিয়েই দেখান। গানবাজনা তো কত লোকই করছে, তার বিশেষ দরবারি সমাদরের বৈশিষ্ট্য প্রমাণ হোক।
তানসেন একমনে কিছু ভাবলেন কিছুক্ষণ, রহস্যময় আনোখা এক হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুখে। তবে তাই হোক, টোডরমলের পুঞ্জি বলছে, এক হপ্তা পর ভরা পূর্ণিমার রাত, সে রাতেই ভরা যমুনার তীরে বসবে আসর।
সান্ধ্যপ্রদীপ জ্বলে উঠেছে অনেক আগেই। এশার আজান পড়ল প্রাসাদের মিনারে। বাদশা আসর অলঙ্কৃত করলেন। অতিথিরাও সকলে উপস্থিত। তানসেন বসে আছেন মাটি থেকে সামান্য উঁচু প্রায় বরাবর গোলাকার মঞ্চে। বীণার তারে হাত, টং করে বেজে উঠল প্রথম ঝংকার ,আর শুরু হলো মন্দ্র তান। আতরচি দাঁড়িয়ে বসরাই গোলাবজল ছিটিয়ে দিলেন হাজেরানে মজলিসের ভেতর। চন্দন, জুঁই, কেওড়া, কমলার ফুলের সুগন্ধি বের হতে লাগল ধূপ থেকে। মিয়াকে ঘিরে আগরবাতির ধোঁয়া কুয়াশার মতো ঐন্দ্রজালিক বলয় তৈরি করেছে—আর যমুনা প্রবাহিত স্নিগ্ধ প্রসন্ন হিল্লোল।
২.
মোঘল রাজধানী আগ্রার ৬০ মাইল দূরে গোয়ালিয়র বনভূমি অঞ্চল। যেদিকে চোখ যায় বন আর বন, সামান্য কিছু গুচ্ছ গ্রাম। সম্রাট ও তার অমাত্যরা মৃগয়ায় আসেন এদিকটায়। শক্তিশালী একটি মোঘল দুর্গও আছে এখানে।
আকবরের মন্ত্রী রাজা মানসিং জঙ্গলের ভেতর তাড়া খাওয়া মহিষের মতো এলোমেলো ছুটছেন, পাজামা ভরে উঠছে চোরকাঁটায়, আচকান এখানে-ওখানে ছিঁড়ে গেছে গাছের চোখা প্রশাখার খোঁচায়। তাকে তাড়া করেছে একটি ক্রোধমত্ত মস্ত বুনো হাতি। তার কলিজাচেরা হুংকারে কেঁপে উঠছে বন। গাছপালা পিষ্ট করে, শৃঙ্খল শ্যামলিমা বিধ্বস্ত করে এগিয়ে আসছে সে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে শিকাররথের সারথিরা আগেই যার যার প্রাণ হাতে পালিয়েছে দিগবিদিক। মানসিংয়ের ঘোড়াও লাগাম ছিঁড়ে পালিয়েছে গহীন অরণ্যে। হস্তির গর্জন, তীব্র গতি চাহিদায় পিঠ কামড়ে ধরা মানুষের অস্থির চাবুকের সঙ্গে সে কুলিয়ে উঠতে পারছিল না। মন্ত্রীও ঘোড়া পুনরাধিকারের জন্য পিছু পিছু দৌড়ে অজানা অঞ্চলে এসে পড়েছেন। চারপাশে আর পথ নেই, যেদিকে তাকান গাছের বড় বড় কাণ্ড দৃষ্টিভূমিকে প্রতিহত করে আছে। কাছাকাছি কোথাও থেকে আহত হাতিটার চিৎকার পাওয়া যাচ্ছে। সে এগিয়ে আসছে এদিকেই।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মানসিং, এমন সময় কোত্থেকে যেন একটি মিষ্টি সুর ভেসে এলো। মধুর তানটা যেন তরঙ্গের মতো কাঁপতে কাঁপতে আসছে কোনো এক বিন্দু থেকে উৎসারিত হয়ে, বাতাসের কণায় কণায় প্রবেশ করে ছড়িয়ে পড়ছে আর ঢেউয়ের মতো ওঠানামার তালে ছন্দে এগিয়ে চলছে বনের সকল শূন্যস্থান ও গাছপালা, লতাপাতা, ফুল-পাখি-পতঙ্গকে আবৃত করে। একটা আবেশ ঘনিয়ে উঠছে বনের ভেতর।
সেই গম্ভীর গমকের মোহে পরাভূত হয়ে হাতির হুংকার নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকল। মানসিং দূর থেকে লক্ষ করছেন হাতিকে, কেমন টলমল করছে সে, বিগলিত হয়ে পড়ছে। কোথাও যেন সে যাচ্ছে, যেন সুরের উৎসের দিকে। কৌতূহলী হয়ে মানসিং তার পিছু নিলেন। তখনো স্বরের আরোহণ অবরোহণ চলছে উভয় নিষাদে। সে উৎস ধরে তারা জীব ও মানুষ এসে পৌঁছুলেন ঘন গাছপালার আড়ালে এক নিবিড় তপোবনের কাছে। জুম্মার দুপুরে পাঞ্জেগানা মসজিদের ভেতরে যেমন থমথমে নির্জনতা, আশ্রমটি অমন বিজন।
মানসিং দেখলেন, ঘন এক পাকুড় গাছের শান্ত ছায়ার নিচে বসে এক মনে তান ধরেছে এক যুবক। আশ্রমবাড়ির পাশেই একটি ছোট করে কাটা তালাব, তাতে পদ্ম ফুটে আছে। গায়কের কণ্ঠস্বর পানির ওপর যেন পৃষ্ঠটান তৈরি করেছে। থিরথির কাঁপছে ভূমিকম্পের মতো। রাগ সপ্তম স্তরে উন্নীত হলো, রক্ত সঞ্চালনের তেজে যুবকের গলার নীল শিরাগুলি প্রকাশিত হয়ে পড়ল ফরসা চামড়ার পরতে। তখন গাছের মরাপাতাগুলো ঝরে পড়তে শুরু করল অকস্মাৎ, যুবকের চারপাশে তৈরি হলো হাওয়ার ঘূর্ণি, ধূসর সবুজ পাতাগুলো তাকে ঘিরে এক পাক ঘূর্ণিনৃত্য দিয়ে মাটিতে পড়তে লাগল। শেষ বিকেলের সোনালি আলো তাতে সঙ্গত করল। পাতার তৈরি কাঞ্চন-চক্র কিছুক্ষণ ঘিরে রইল যুবকের পরিধিটিকে।
রাগ তখনো সমাপ্ত নয়। সপ্তম থেকে দ্বিতল তলায় নেমে প্রথম মাত্রায় ফিরবে। পাকুড় গাছটির ইন্দ্রিয় যেন সক্রিয় হয়ে উঠল তখন, ঝরাপাতাগুলোর স্থলে গজিয়ে উঠতে লাগল নতুন পাতা, সুপ্ত নিদ্রিত ফুলগুলো বর্ণীল সাত রঙে প্রস্ফুটিত প্রলম্বিত হতে শুরু করল সহসা। লজ্জাবতীর ঝোপ নুইয়ে পড়ল, মাঠের দুর্বা ঘাস শিহরিত দেহের পশমের মত টানটান হয়ে রইল জমিনের ওপর। এই অতীন্দ্রিয় সুরসঙ্গম জড়ের ভেতর ইন্দ্রিয়ের জন্ম দিয়েছে।
হাতিটি ধীর পায়ে তার শিয়রের নিকটে এসে শুঁড় উঁচিয়ে কুর্নিশ জানাল। যুবক মুদ্রিত আঁখি খুলে স্নিগ্ধ চোখে অতিকায় হাতিটির দিকে অপলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে বাম হাতের বরাভয় মুদ্রা দেখালেন। আকণ্ঠ মদ গেলা শরাবির মতো টলতে টলতে সে ফিরে গেল বনের পথে।
এতক্ষণ যুবকটি রাগ মল্লার গাইছিলেন, জন্তু-জানোয়ারও এই ধ্বনির মূর্ছনায় শান্ত হয়ে পড়ে। আড়াল থেকে সমস্তই পর্যবেক্ষণ করছিলেন সুর সমঝদার মন্ত্রী মানসিং।
হাতির প্রস্থানের পর বেরিয়ে এলেন তিনি। মাথা ঝুঁকিয়ে লম্বা সালাম করলেন যুবকটিকে। নিজের পরিচয় জানিয়ে মুগ্ধ বিস্ময় প্রকাশ করলেন ঘোরলাগা গায়কির। স্বাগতমের হাসি মুখে ছড়িয়ে পড়ল তার। যুবক জানালেন, তিনি সুফি মুহম্মদ গাউসের শিষ্য। এটি তার প্রয়াত গুরুরই নির্মিত আশ্রম ও মাজার, মুরশিদের তত্ত্বাবধানে কাদেরিয়া তরিকায় তিনি সঙ্গীত সাধনার বিশেষ দীক্ষা নিয়েছেন বহু বছর যাবত। হাতিটির রণধ্বনি শুনেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কোনো শিকারীর দলকে ধাওয়া করেছে সে। জন্তুটার চিত্তপ্রশান্তির জন্যই গান ধরেছিলেন তিনি।
মানসিং যুবকটিকে অনুরোধ করলেন তার সঙ্গে আগ্রায় তশরিফ রাখতে। এই মাপের সঙ্গীতপ্রতিভাকে একাকী বনভূমিতে মানায় না। তার জন্য অপেক্ষা করছে রাজদরবার।
যুবক রাজি হয়েছিলেন ।
রাতের শিঙ্গা বেজে উঠল গোয়ালিয়রের কেল্লায়। মানসিংয়ের সঙ্গে আগ্রার পথে রওনা করলেন পরদিন প্রত্যুষে।
এরপর ইতিহাস। আকবর তাকে দরবারে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের সম্মানে আসীন করলেন। নবরত্নের এক রত্ন—মিয়া তানসেন।
দাউদ নবি যখন আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে নদীর কূলে বসে যবুর পাঠ করতেন—এমন আশ্চর্য মধুর সুর ইহজগতে আগেও ছিল না, পরেও হবে না—সেই সুরে তন্ময় একদল রুপালি ইলিশ ঢেউয়ের উজান ঠেলে প্রত্যহ ভিড় জমাত নদীর কিনারে। পানিতে বিছিয়ে রাখা দাউদ নবির কদমে চুমু খেয়ে ফিরে যেত ফিরতি স্রোতের সাথে।
সহস্রবর্ষ আগে তানসেন ছিলেন সেই দলের এক মাছ। দাউদের স্বরতরঙ্গের পরমাণু পানিবাহিত হয়ে মিশে গিয়েছিল সেই মাছদেহগুলোর অণুর সঙ্গে।
বহু শতাব্দী কেটে গেল এরপর। সুরসিক্ত সেই মাছটির পরমাণু শুষে নিল জলজ উদ্ভিদ, মেঘ হয়ে আকাশে ঘুরে বেড়াল লাখো যুগ। এরপর একদিন ঝরে পড়ল সুফি মুহম্মদ গাউসের ভূমি গোয়ালিয়রে। সেই জল উর্বর করল মাটি, ফলল শস্য, খাদ্যকণা রূপে মিশে গেল পূর্বপুরুষের রক্তে, যূথবদ্ধ পরমাণুগুলো বাহিত হতে থাকল প্রজন্মান্তরে, তকদির-নির্ধারিত একটি গন্তব্যকে লক্ষ করে।
সদ্যোজাত তানসেনের প্রথম কান্নাটি ছিল হাজার বছরের বন্দি সে অলৌকিক সুরের ক্ষীণতম মুক্তি।
যে সুরের পূর্বসূরি রূপ আবার শোনা যাবে মহাজগৎ ধ্বংস হবার অগুণতি সময় পর—বেহেশতের এক ভোরবেলায়, হজরত দাউদের কণ্ঠে।
সুফি মুহম্মদ গউস মূলত কাশফের চোখে ব্যাপারটা টের পেয়েই অর্ধ শতাব্দী আগে আশ্রম বেঁধেছিলেন গোয়ালিয়রের বনে।
৩.
শরাবের পাত্র নিয়ে অল্পবয়সী সাকিরা ঘুরছিল আসরের চারপাশে। গ্লাসে গ্লাসে অম্বর রঙ শরাবের ছলাৎ ছলাৎ মৃদু ছলকানি। পারস্যের জামলাল আঙ্গুরের টসটসে থোকাগুলোর গা থেকে পিছলে পড়ছে আলো।
তানসেন আলাপ শুরু করলেন ওস্তাদ আমির খসরুর রাগ বাহার থেকে। দীপক রাগ ভগবান বিষ্ণুর প্রলয়নাচন থেকে তৈরি, তাই এর রক্ষাকবচ ভূমিকায় রাগ বাহার এনে খসরুর আশীর্বাদের শিশির ছড়িয়ে দিলেন। চঞ্চল প্রকৃতির ধুনটি দিয়ে শ্রোতার চিত্তকে প্রস্তুত করে নিলেন তিনি। দীপক এমনিতেও ছোট রাগ।
রাগ বাহারে দমকা বাতাস এলো, নিভে গেল সব দীপাধার। ভরা পূর্ণিমা উন্মুক্ত হয়ে পড়ল সকলের মধ্যে।
ব্রজভাষায় দেববন্দনায় লিখিত ছোট ছোট গীতিকা অবলম্বন করে তিনি গাইতেন। তানসেন কোমল ঋষভ রি থেকে শুরু করলেন রাগ—শঙ্কর গিরিজা পতি, জগ বিনায়ক, তোমরে বিনা মোরে কাহুঁ নাহি… রাগ চড়ে গেল তীব্র মধ্যমে।
মৃদুমন্দু সমীরণ প্রবাহিত পরিবেশ হঠাৎ তপ্ত হতে শুরু করল। তন্ময় শ্রোতাদের হাতের গেলাস পড়ে যেতে থাকল জাজিমে, কানগুলো ভরে যাচ্ছে অভিভূত সুরে, স্বপ্নহীন শুষ্ক চোখগুলোর তারা সজল হয়ে উঠছে বিভোর খোয়াবে। পঞ্চম থেকে ধৈবতকে ধাক্কা দিয়ে ধরে আবার পঞ্চমে ফেরা—হৃদপিণ্ডগুলোর দেয়ালে ঢেউয়ের ফেনার মতো আচ্ছন্ন রক্তের ধাক্কা ছড়িয়ে যাচ্ছে।
ক্রমে আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে উঠতে লাগল। নারীরা অজান্তে ঢিলে করে নিল শাড়ির আঁচল, পুরুষেরা ভারি পাগড়ি মুঠোবন্দি করে খুলে রাখলেন। হাওয়ার উত্তাপ আরও ছড়িয়ে পড়ল। একে একে শ্রোতা দর্শক উঠে পড়তে লাগলেন মজলিস ছেড়ে। বাদশা হাত তুলে ডাকলেন—মিয়া, এবারে থামো!
ভাবের তুরীয় স্তরে তন্ময় তিনি, চোখ বন্ধ, মনের অতলে আগুনসমুদ্র সাঁতরে যাচ্ছেন তখন, বাদশার আওয়াজ তার কানে পৌঁছাল না। উত্তাপ অসহনীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়লে বাদশা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, প্রাসাদের বারান্দায় গিয়ে বসলেন তড়িঘড়ি, গায়কের অবস্থান অবলোকন করা যায় ওখান থেকে। বাকিরা সকলে দৌড়ে গেল যমুনার তীরে।
নিভে যাওয়া দীপাধারগুলিতে পড়ে ছিল অবশিষ্ট তুলাবীজের তেল আর ঘি মিশ্রিত সলতে। হঠাৎ সবগুলো প্রদীপে অঙ্কুরোদগমের মতো ঘনিয়ে উঠল আগুনের নবজাতক শিখা।
এ পর্যায়ে আসরে বাকি ছিল শুধু কন্যাদ্বয়। আশ্চর্য এ দৃশ্য দেখে তারাও সরে আসলেন। তানসেন অনুরোধ উপরোধে ভ্রুক্ষেপ করার মতো পর্যায়েই ছিলেন না— যেন স্বয়ং আল্লার বাঁশি রূপে ঘোর সম্মোহিতের মতো নিরবচ্ছিন্ন বেজে চলেছেন।
আগুনের ফুলকি উঠল ঘাসের হরিৎশরীর থেকে, স্ফুলিঙ্গ জাগল রূদ্রবীণার তারে তারে সংঘর্ষ থেকে, আগুন ধরে গেল শামিয়ানায়, চাঁদোয়ায়, তানসেনের গায়ের কাপড়ে।
ঈর্ষাকাতর গায়েনরা ধরে নিল, তানসেনের আজ জীবন ইস্তফা। তাদের মনে উড়াল দিল বাকবাকুম পায়রা।
তবে মঞ্চের অনতি দূরেই বসে ছিল যে মিয়ার কন্যা আর ভাবকন্যা, তিনি আগেই তাদের বলে রেখেছিলেন, আগুন জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মেঘমল্লার ধরতে, যে রাগ আকাশে মেঘ জমা করে বৃষ্টি নামিয়ে আনে, চতুর্পার্শ্বে ছড়িয়ে পড়ে শান্তি শীতলতা। ধারাজলে নিভে যায় রাগের অনল।
অশ্রুতপূর্ব দীপক রাগের প্রলয় কন্যাদ্বয়ের কল্পনার চাইতেও ভয়ানক রূপে ধরা দিয়েছে। বিহ্বল দুই কন্যা সে আকস্মিকতায় স্থানু হয়ে বসে রইলেন বেশ কিছু সময়। ততক্ষণে তানসেন অর্ধমৃত, সমস্ত দেহ পুড়ে গেছে তার। উদ্ভ্রান্ত দিশেহারা ভাব কাটিয়ে যৌথ কণ্ঠে বালিকাদ্বয় মেঘমল্লার আলাপ শুরু করলেন—বাদরওয়া বরসন লাগি চমকত বিজুরী চহুঁ ওর…
দূর দিগন্তে গম্ভীর আবাহনীর মতো উৎসারিত হলো সুর—দ্বিতীয় আবর্তে তা আরও ঘনীভূত… আরও আর্দ্র জলজ… দুই কণ্ঠ যেন বর্ষার দুই মাতাল হাওয়া, পরস্পর জড়াজড়ি করে ছুটে চলেছে কী ব্যাকুল।
জল থইথই পুষ্করিণীর ভেতর ডুবুডুবু হাঁসের শামুক তোলার মতো ভঙ্গিতে তারা দুলে ঝুঁকে গান করে যাচ্ছেন, সেই সুর ভেসে ভেসে পৌঁছে গেল মেঘলোকে, মেঘেরা হুটুপুটি করে জড়ো হলো জলসার ওপর, জীমূত সংঘর্ষে আকাশগঙ্গায় বেজে উঠল বজ্রধ্বনি, কোথায় যেন অভিনব বাদ্যঝংকারের মতো বাজতে লাগল শেকল চুরমার হওয়ার শব্দ—আর বড় বড় ফোঁটায় ঝরঝরিয়ে রুমঝুম নৃত্যের ছন্দে নেমে এলো মুষলধারা।
দগ্ধ সাধকের প্রতি দৈব নজরানার মতো সপ্তম আসমানের বড়ই গাছ সিদরাতুল মুনতাহার কাণ্ড থেকে প্রবহিত জাইহান নদীর জল সরাসরি নেমে এলো বৃষ্টির সঙ্গে। সমস্ত শরীর সেরে উঠল তার। কালো পোড়া ক্ষতগুলো মিশে গেল তাজা সজীব চামড়ায়।
পিতার ডান হাতটি ক্রমাগত গমকের তালে তালে কাঁপতে দেখে কন্যাদ্বয় তিহাই দিয়ে গান সমাপ্ত করলেন। শাওনও ধরে এলো।
প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিস্মিত বাদশা ও সভাসদেরা হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে থেকে সবই প্রত্যক্ষ করলেন। কারু মুখে কোনো শব্দ সরল না।। স্বপ্নগ্রস্তের মতো টলতে টলতে সবাই প্রত্যাগত হলেন নিজ নিবাসে।
শত জোছনার অপরূপ চন্দ্রালোক নিয়ে রাত শুধু ছড়িয়ে রইল চরাচরে, একা।