সুহায়

‘এ কথা বলো না যে, এক লাখ হিন্দু আর এক লাখ মুসলমান মারা গেছে। বলো, দুই লাখ মানুষ মারা গেছে। আর ট্র্যাজেডি শুধু এটা নয় যে দুই লাখ মানুষ মারা গেছে। প্রকৃত ট্র্যাজেডি এই, যারা মেরেছে আর যারা মরেছে, তারা কোনো হিসাবের খাতাতেই ধরা পড়েনি। এক লাখ হিন্দু মেরে মুসলমানরা হয়তো ভেবেছে হিন্দুধর্ম শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তা বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকবে। একইভাবে লাখ খানেক মুসলমানকে হত্যা করে হিন্দুরা হয়তো ইসলাম খতম হয়ে গেছে বলে বগল বাজিয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা আপনার সামনে, ইসলামের গায়ে কিঞ্চিৎ আঁচড়ও লাগেনি। ওরা আসলেই বোকা, যারা ভাবে বন্দুক দিয়ে ধর্মকে শিকার করা যায়। ধর্ম, দ্বীন, বিশ্বাস, ভক্তি- এসব আমাদের শরীরে নয়, আত্মায় বাস করে। ছুরি, চাকু বা গুলির আঘাতে এগুলো কী করে ধ্বংস হতে পারে?’

সেদিন মমতাজ ছিল খুবই উত্তেজিত। আমরা তিনজন তাকে জাহাজে শেষ বিদায় জানাতে এসেছিলাম। সে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমাদের থেকে জুদা হয়ে পাকিস্তান চলে যাচ্ছিল। সেই পাকিস্তান; যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদের কারও তখন পর্যন্ত এমনকি কল্পনাও ছিল না।

আমরা তিনজনই হিন্দু। পশ্চিম পাঞ্জাবে আমাদের আত্মীয় স্বজনদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটেছিল। সম্ভবত সেই কারণেই মমতাজ আমাদের থেকে আলাদা হয়ে আমাদের ছেড়ে যাচ্ছিল। 

জুগল লাহোর থেকে একটি চিঠি পায়, যাতে লেখা ছিল, ‘দাঙ্গায় তার চাচা নিহত হয়েছে!’ এতে সে নিদারুণ মর্মাহত হয়। সেই শোকের প্রভাবে কথায় কথায় সে মমতাজকে বলে বসে, ‘আমি ভাবছি, যদি আমাদের মহল্লায় দাঙ্গা শুরু হয়, আমি তখন কী করব।’

মমতাজ তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করবে তুমি?’

জুগল খুবই গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, ‘আমি ভাবছি… খুব সম্ভব আমি তোমাকে মেরে ফেলব।’

এই কথা শুনে মমতাজ কিছুই বলল না, একেবারেই নীরব হয়ে গেল আর তার সেই নীরবতা প্রায় আট দিন ধরে স্থায়ী ছিল। হঠাৎ একদিন যখন সে আমাদের জানাল, বিকেল পৌনে তিনটায় সমুদ্রপথে সে করাচি যাচ্ছে, তখনই তার সে নীরবতা ভাঙল।

আমাদের তিনজনের কেউই তার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মুখ খুলল না। জুগলের মনে একটা তীব্র এহসাস জাগল যে, মমতাজের চলে যাওয়ার পিছনে তার ওই কথাই বুঝি দায়ী—‘ভাবছি, খুব সম্ভব আমি তোমাকে মেরে ফেলব।’

মমতাজ মনে হয় এখনো ভাবছে, ‘রাগের বশে সে কি সত্যিই মমতাজকে হত্যা করতে পারে? যে কিনা তার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল!’

আর এই ভাবনাই বোধহয় জুগলকে আমাদের তিনজনের মধ্যে আজ সবচেয়ে বেশি নীরব করে রেখেছে, কিন্তু আশ্চর্যের কথা হলো, সেদিন মমতাজ হয়ে উঠেছিল অস্বাভাবিক রকমের মুখর। খুব করে কথা বলতে শুরু করেছিল সে, বিশেষ করে রওনা হওয়ার ঘন্টা কয়েক আগ থেকে।

সকালে উঠেই সে সুরাপান শুরু করল। তার জিনিসপত্র সে এমনভাবে গুছোচ্ছিল, যেন সে কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে, আনন্দ ভ্রমণে বেরোচ্ছে। সে নিজেই কথা বলছে, নিজেই হাসছে। বাইরের কেউ তাকে দেখলে নির্ঘাৎ ভাববে, বোম্বে ছেড়ে যেতে পারছেই বলে সে এমন আনন্দ অনুভব করছে। কিন্তু আমরা তিনজনই জানতাম, সে আসলে নিজের অনুভূতিকে আড়াল করতেই আমাদেরকে এবং নিজেকেও প্রতারিত করার চেষ্টা করছে।

আমি ঢের চেয়েছিলাম তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া নিয়ে কথা বলতে। ইঙ্গিতে জুগলকেও বলেছিলাম তার এমন করে হঠাৎ প্রস্থানের প্রসঙ্গটা তুলতে, কিন্তু মমতাজ আমাদের কোনো মওকাই দিল না।

তিন-চার বোতল পেগ পান করার পর জুগল আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গেল এবং সোজা পাশের কামরায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।

ব্রজমোহন আর আমি ওর সঙ্গেই রইলাম। তাকে কিছু বকেয়া বিল পরিশোধ করতে হবে। ডাক্তারের ফি, লন্ড্রির কাপড়, এ সব কাজ সে হাসিমুখেই করল। কিন্তু যখন কোণার হোটেলের পাশের দোকান থেকে সে পান কিনতে গেল, হঠাৎ করেই তার চোখে জল এসে গেল। সে ব্রজমোহনের কাঁধে হাত রেখে সেখান থেকে ফেরার পথে বলল, ‘মনে আছে ব্রজ, আজ থেকে দশ বছর আগে, যখন আমাদের খুবই দীন-দশা ছিল, এই গোবিন্দ আমাদেরকে এক রুপি ধার দিয়েছিল।’

এর পর সারাটা পথজুড়ে মমতাজ চুপসে রইল। কিন্তু বাসায় পৌঁছানো মাত্রই তার কথার বান যেন খুলে গেল; অনিঃশেষ, এলোমেলো, যার মাথা-মুণ্ডু কিছুই ছিল না, তবু সে তার কথায় এত আন্তরিক ছিল যে, ব্রজমোহন আর আমি বরাবরই তার কথার ভেতর জুড়ে থাকি। রওনা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো যখন, জুগলও উঠে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। ট্যাক্সি যখন বন্দরের দিকে চলল, সবাই চুপ করে গেল।

মুমতাজের চোখ বোম্বের রাস্তার দুই পাশের প্রশস্ত বাজারগুলোকে বিদায় জানাতে থাকল। এক পর্যায়ে ট্যাক্সি পৌঁছে গেল গন্তব্যে। প্রচণ্ড যানজট। বেজায় হুজুম। হাজার হাজার রিফিউজি। খোশহাল মানুষ হাতে গোনা, বদহাল মানুষের ঢল। তবুও আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল এক মুমতাজই বুঝি চলে যাচ্ছে। আমাদের ছেড়ে সে এমন এক জায়গায় চলে যাচ্ছে, যে জায়গা সে দেখেওনি, আর দেখলেও তার কাছে আজীবন তা আজনবিই থেকে যাবে। যদিও এ একান্তই আমার ভাবনা। বলতে পারছি না মুমতাজও এমন কিছুই ভাবছিল কিনা!

কেবিনে যখন সব লাগেজ চলে গেলে, মমতাজ আমাদের নিয়ে গেল ডেকের কাছে; যেখানে আকাশ আর সমুদ্র পরস্পরে মাখামাখি হয়ে আছে। মমতাজ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে জুগলের হাতে হাত রেখে বলল, ‘এ তো দৃষ্টি-বিভ্রম তাই না জুগল, আকাশ আর সমুদ্রের মিলন! কিন্তু দেখো, এই বিভ্রম, এই মিলন কতটাই না দিলকাশ, কতই না মুগ্ধকর!’

জুগল কিছুই না বলে চুপ করে রইল। হয়তো তখনও তার নিজের বলা কথাটা তার ভেতরে ঘুরছিল, ‘আমি ভাবছি, খুব সম্ভব আমি তোমাকে মেরে ফেলব।’

মুমতাজ জাহাজের বার থেকে ব্র্যান্ডি আনাল। সকাল থেকে সে এটাই খাচ্ছিল। আমরা চারজন গ্লাস হাতে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ালাম। রিফিউজিরা হুড়মুড় করে জাহাজে উঠছে। আর শান্ত সমুদ্রের ওপর চক্কর কাটছে জলপাখির দল।

জুগল এক ঢোকেই পুরো গ্লাস সাবাড় করে ফেলল এবং মমতাজকে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করে দিও, মমতাজ। আমার মনে হয় সেদিন আমি তোমাকে দুঃখ দিয়েছিলাম।’

মমতাজ খানিক থেমে জুগলকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি যখন বলেছিলে—আমি ভাবছি, খুব সম্ভব আমি তোমাকে মেরে ফেলব।’ তখন কি সত্যিই তুমি তা ভেবেছিলে?’

জুগল মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু এখন আমার আফসোস হচ্ছে!’

মমতাজ দার্শনিকের ভঙ্গিতে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে মেরে ফেলতে, তাহলে তোমার আফসোস আরও বেশি হত, তবে শুধু তখনই, যদি তুমি ভেবে দেখতে যে তুমি ‘মুমতাজ’ কে নয়, ‘একজন মুসলমান’ কে নয়, ‘তোমার বন্ধুকে’ নয়, বরং একজন মানুষকে হত্যা করেছ। সে যদি হারামজাদা হতো, তবে তুমি তার ‘হারামজাদাগিরি’কে নয়, তাকে-ই হত্যা করতে। সে যদি মুসলমান হতো, তবে তুমি তার ‘মুসলমানি’কে নয়, তার অস্তিত্বকেই শেষ করতে। তার লাশ যদি মুসলমানদের হাতে পড়ত, তাহলে কবরস্থানে একটি কবর বাড়ত বটে, কিন্তু পৃথিবী থেকে একজন মানুষ কমে যেত।’

কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলতে শুরু করল, ‘সম্ভবত আমার সহধর্মীরা আমাকে শহিদ বলত। কিন্তু খোদার কসম, যদি সম্ভব হত, আমি কবর ফুঁড়ে বেরিয়ে চিৎকার শুরু করতাম! আমি এমন শহীদের মর্যাদা গ্রহণ করতাম না। এমন ডিগ্রি আমার চাই না, যার পরীক্ষাই আমি দিইনি। লাহোরে তোমার চাচাকে একজন মুসলমান হত্যা করেছে। তুমি এই খবর বোম্বেতে শুনে আমাকে হত্যা করলে, বলো তো, তুমি আর আমি কি কোনো পুরস্কারের যোগ্য? আর লাহোরে তোমার চাচা ও তার হত্যাকারী, তারা কি কোনো খিলআত (সম্মান-বস্ত্র) পাওয়ার অধিকারী?’

‘আমি তো বলব, যে মরেছে সে কুকুরের মতোই মরেছে, আর যারা মেরেছে তারা একেবারে নিরর্থকই নিজেদের হাত রক্তে রাঙিয়েছে।’

কথা বলতে বলতে মমতাজ খুব আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এই অতিকথনের মধ্যেও আন্তরিকতার অভাব ছিল না এতটুকু। বিশেষ করে তার এইটুকু কথা খুব করে আমার হৃদয়ে দাগ কেটে গেল—‘ধর্ম, দ্বীন, বিশ্বাস, ঈমান, ভক্তি, যা-ই বলি না কেন, এসব আমাদের দেহে নয়, থাকে আমাদের আত্মায়; গুলি, ছুরি বা বুলেটে যা ধ্বংস করা যায় না।’ 

তাই আমি তাকে বললাম, ‘তুমি একদম ঠিক বলেছ।’

এটা শুনেই মমতাজ তার ভাবনাকে একটু খতিয়ে দেখে কিঞ্চিৎ অস্থির হয়ে বলল, ‘না, পুরোপুরি ঠিক নয়। না মানে আমি বলতে চাইছি ‘ঠিক তো বটেই। কিন্তু হয়তো আমি যা বলতে চাইছি তা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারিনি। ধর্ম বলতে আমি সেই ধর্ম বোঝাচ্ছি না, যার সঙ্গে আমাদের নিরানব্বই শতাংশ মানুষ জড়িয়ে আছে। আমি বলছি সেই বিশেষ জিনিসটির কথা, যা একজন মানুষকে অন্য মানুষ থেকে আলাদা করে দেয়, যে জিনিশ মানুষকে সত্যিকার মানুষ প্রমাণ করে। কিন্তু সেই জিনিসটা কী? আফসোস, আমি তা আমার হাতের তালুতে রেখে দেখাতে পারছি না।’

বলতে বলতে আচমকা তার চোখে এক ধরনের দীপ্তি খেলে গেল, যেন সে নিজেকেই নিজে বিড়বিড় করে প্রশ্ন করছে, ‘কিন্তু তার মধ্যে সেই বিশেষ জিনিসটা কী ছিল? সে ছিল এক কট্টর হিন্দু। পেশা ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট, তবু তার আত্মাটা কী অদ্ভূতরকম উজ্জ্বল ছিল!’

আমি জিজ্ঞাসা করলাম। ‘কার কথা বলছ?’

একজন ভড়ুয়ার!

আমরা তিনজনই চমকে উঠলাম। মমতাজের কণ্ঠস্বরে কোনও দ্বিধা বা সংকোচ ছিল না, তাই আমি গম্ভীর গলায় আবার জিজ্ঞস করলাম, ‘একজন ভড়ুয়ার?’

মুমতাজ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। 

‘আমি বিস্মিত হই সে কেমন মানুষ ছিল! আরও অবাক হই এই ভেবে যে, জনসমাজে সে ছিল একজন নারীদালাল, অথচ তার অন্তর ছিল খুবই নির্মল।

মমতাজ মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, যেন সে পুরোনো সব ঘটনা তার মনে মস্তিষ্কে নতুন করে জাগিয়ে তুলছে। কয়েক মুহূর্তের পর সে আবার বলতে শুরু করল—

‘তার পুরো নাম আমার মনে নেই। ‘সুহায়ে’ বা এমন কিছু একটা হবে। সে বেনারসের বাসিন্দা, খুবই পরিচ্ছন্নতা-পছন্দ। সে যেখানে থাকত সে জায়গা যদিও পরিসরে খুব ছোট ছিল, তবুও সেটাকে সে খুব কায়দা করে বিভিন্ন ভাগে সাজিয়ে রেখেছিল। পর্দা ঝুলানো ছিল। চারপায়া বা খাট ছিল না। ছিল গদি ও তাকিয়া। চাদরগুলো সবসময় ঝকঝকে চকচকে রাখত। সেবক থাকলেও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সে নিজে হাতে করত। শুধু পরিস্কারই নয়, প্রতিটি কাজই করত সে এবং কোনো কাজ থেকে নিজের দায় এড়াত না। কাউকে ঠকাতো না, ফন্দিবাজি করত না। রাত বেশি হয়ে গেলে আশপাশে যে জল-মেশানো মদ পাওয়া যেত, সে অকপটেই বলে দিত, ‘সাহেব, আপনার পয়সা নষ্ট করবেন না। কোনো মেয়ের ব্যাপারে তার কাছে কোনো সন্দেহ থাকলে সে তা লুকাত না…

সে আমাকে এও জানিয়েছিল যে, তিন বছরের মধ্যে সে বিশ হাজার রুপি কামিয়েছে। প্রতি দশ রুপিতে আড়াই ভাগ কমিশন নিয়ে নিয়ে তাকে আরও দশ হাজার রুপি কামাই করতে হবে। আমি জানি না কেন কেবল দশ হাজার রুপি, এর বেশি নয় কেন? সে বলত, ত্রিশ হাজার পূর্ণ হলেই বেনারসে ফিরে যাবে আর একটা পসরার দোকান খুলবে। আমি বলতে পারছি না কেন কেবল পসরার দোকানই সে খুলতে চেয়েছিল!’

এতটুকু শুনে আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘বড়ই অদ্ভুত ছিল মানুষটা।’

মমতাজ তার কথা চালিয়ে গেল। আমার মনে হলো লোকটা পুরোপুরি ভণ্ড। বড্ড পাজি। কে বিশ্বাস করতে পারে যে সে সব মেয়েদের, যারা তার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদেরকে নিজের মেয়ের মতো মনে করত। তখন তো এটাও আমার জন্য অবিশ্বাস্য ছিল না যে, সে প্রতিটি মেয়ের নামে পোস্ট অফিসে সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলে রেখেছিল আর মাসে মাসে তাদের পুরো আয় সেখানে জমা করাত। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ছিল এটা যে, সে দশ-বারো মেয়ের খাবার-দাবারের খরচ নিজের পকেট থেকেই বহন করত। এমনই তার প্রতিটি কথা আমার কাছে অতিরঞ্জন বলে মনে হত। একদিন আমি তার কাছে গেলে সে আমাকে বলল—

‘আমিনা আর সাকিনা দুজনই ছুটিতে আছে। আমি প্রতি সপ্তাহে ওদের দুজনকে ছুটি দেই, যাতে ওরা বাইরে গিয়ে হোটেলে মাংস বা অন্যান্য খাবার খেতে পারে। এখানে তো আপনি জানেনই, সবাই বৈষ্ণব।’

এটি শুনে আমি চুপিচুপি হাসলাম, কারণ আমার বুঝতে বাকি রইল না নির্ঘাৎ সে আমাকে ভোলাচ্ছে!

আরেকদিন সে আমাকে বলল, আহমেদাবাদের যে হিন্দু মেয়েটিকে সে এক মুসলিম খদ্দেরের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল, সে লাহোর থেকে চিঠি লিখেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সে নাকি দাতা সাহেবের দরবারে একটি মানৎ করেছিল, যা পূরণ হয়েছে। এখন সে সুহায়ের জন্য মানৎ মেনেছে যাতে তার ত্রিশ হাজার রুপি দ্রুত পূর্ণ হয় আর সে বেনারসে গিয়ে পসরার দোকান খুলতে পারে।’ 

এটি শুনে আমি হাসতে বাধ্য হলাম। আমি ভাবলাম, যেহেতু আমি মুসলমান, তাই সে আমাকে খুশি করার চেষ্টা করছে।

আমি মমতাজকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার ধারণা কি ভুল ছিল?’

সে বলল, ‘না একদমই না! তার কথায় আর কাজে কোনো ভিন্নতা ছিল না। হতে পারে তার মধ্যে কিছু ত্রুটি আছে। বিচিত্র নয় যে তার জীবনে ঢের স্খলনও ঘটেছে, কিন্তু সে খুবই ভালো একটা মানুষ ছিল।’

‘জুগল জিজ্ঞাসা করল। তুমি এটা জানলে কী করে?’

‘তার মৃত্যু কালে।’ এই বলে মমতাজ কিছু সময়ের জন্য নীরব হয়ে গেল। 

দৃষ্টিটা তার সেদিকটায় স্থির হয়ে রইল, যেখানে আকাশ আর সমুদ্র এক ধূসর আলিঙ্গনে মিলিয়ে গেছে!

… ‘দাঙ্গা তখন শুরু হয়ে গেছে। এক ভোরে উঠে আমি ভান্ডি বাজার দিয়ে যাচ্ছিলাম। কারফিউর কারণে বাজার প্রায় ফাঁকা,  যানজট ছিল না, ট্রামও চলছিল না। ট্যাক্সি খুঁজতে খুঁজতে যখন জে. জে. হাসপাতালের কাছে পৌঁছুই, ফুটপাতে একটা লোককে দেখলাম, বড় একটি টোকরার কাছে পুটলির মতো কুঁচকে পড়ে আছে। আমি প্রথমে ভাবলাম হয়তো কোনো শ্রমিক ঘুমাচ্ছে। কিন্তু যখন পাথরের টুকরোয় জমাট বাঁধা রক্ত চোখে পড়ল, আমি থেমে গেলাম। মনে হলো কোনো হত্যাকাণ্ড হবে। ভাবলাম নিজের পথ ধরব, কিন্তু তখনই মৃতদেহটা নড়ে উঠল। আবার থামলাম। আশেপাশে কেউ ছিল না। আমি মাথা ঝুঁকিয়ে তার দিকে তাকালাম, সুহায়ের চেনা মুখটি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল! রক্তে মাখামাখি। আমি ফুটপাতে তার পাশে বসে আরও গভীরভাবে তাকিয়ে দেখলাম। তার সেই সদা ধবধবে দাগহীন সফেদ কামিস রক্তে মেখে আছে। আঘাতটা তার পাঁজরের কাছে কোথাও হবে। সে কাতরাতে শুরু করল। আমি সাবধানে তার কাঁধ ধরে ডাকলাম, যেন কোনো ঘুমন্ত মানুষকে জাগানো হচ্ছে। এক দুবার আমি তাকে অস্ফুট নামে ডেকে উঠে চলে যেতে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখনই সে চোখ খুলল। আধখোলা চোখে সে অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ তার শরীর ঝাকুনি দিয়ে উঠলো আর সে আমাকে চিনতে পেরে বলল, ‘আপনি? আপনি?’

আমি তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলাম, ‘সে এখানে এলো কীভাবে? কে তাকে আঘাত করল? কতক্ষণ ধরে সে এভাবে ফুটপাতে পড়ে আছে? সামনে হাসপাতাল, আমি কি সেখানে রিপোর্ট করব?’

তার কথা বলার মতো শক্তি ছিল না। আমার সব প্রশ্ন শেষ হলে সে কাতরাতে কাতরাতে খুব কষ্টে এই কথাগুলো বলল, ‘আমার দিন ফুরিয়ে এলো। ভগবানের এমনই ইচ্ছে ছিল!’

ভগবানের কী ইচ্ছে ছিল জানি না, কিন্তু আমার কাছে এটা মনজুর করা সম্ভব ছিল না যে, আমি একজন মুসলমান হয়ে মুসলমানদের এলোাকায় এই অনুভূতি নিয়ে একজন মানুষকে মরতে দেখব, যাকে আমি জানতাম একজন হিন্দু, তাকে যে হত্যা করেছে সে মুসলমান; আর তার শেষ মুহূর্তে তার মৃত্যুশয্যার পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে সেও মুসলমান!

আমি তো ভীরু নই, কিন্তু সেই সময় আমার অবস্থা ভীরুদের চেয়েও করুণ ছিল। একদিকে, আমাকে এই ভয় পেয়ে বসেছিল, পাছে আমিই কি না আবার ধরা পড়ে যাই, অন্যদিকে এই আশঙ্কা ছিল যে, ধরা নাও পড়লেও জেরা করার জন্য জরুর আমাকে আটক করা হবে। একবার তো মনে এই খেয়ালও চেপেছিল, যদি আমি তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই, কে জানে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমাকেই ফাঁসিয়ে দিতে পারে। ভাবতে পারে, মরতেই যেহেতু হবে, কেন না তাকে সঙ্গে নিয়ে মরি! 

এই ধরনের কথা ভাবতে ভাবতে আমি চলে যাওয়ারই উপক্রম করেছিলাম। বরং বলা উচিৎ, পালিয়ে যাওয়ারই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক তখনই সুহায় আমাকে ডাকল আর আমি না থামার দৃঢ় সংকল্প থাকা সত্ত্বেও, আমার পা থেমে গেল। আমি তার দিকে এমন ভঙ্গিতে তাকালাম, যেন আমি তাকে বলছি, ‘তাড়াড়াড়ি করো, আমাকে যেতে হবে।’

সে যন্ত্রণায় কুকড়ে যেতে যেতে খুব কষ্টে তার কামিসের বোতাম খুলল। ভেতরে হাত ঢুকাল, যখন আর কিছু করার হিম্মৎ আর পেল না, তখন সে আমাকে বলল, ‘নিচে একটা থলে আছে, তার ভেতর কিছু গয়না আর বারোশো রুপি আছে। এগুলো সুলতানার জিনিশ। আমি আমার এক বন্ধুর কাছে রেখেছিলাম। আজই ওকে… আজই ওকে আমি পাঠাতে যাচ্ছিলাম কারণ আপনি জানেন, খতরা অনেক বেড়েছে। আপনি ওকে দিয়ে দেবেন আর বলবেন যেন সে এক্ষুনি চলে যায়। নিজের খেয়াল রাখবেন…’

মুমতাজ চুপ হয়ে গেল। কিন্তু আমার মনে হলো, তার কণ্ঠস্বর যেন সেই সুহায়ের কণ্ঠের সঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে, যে কণ্ঠ জে. জে. হাসপাতালের সামনে ফুটপাথে শোনা গিয়েছিল, দূরে, সেখানে, যেখানে আকাশ আর সমুদ্র এক কুয়াশাচ্ছন্ন আলিঙ্গনে মিলিয়ে গেছে।

জাহাজ সিটি বাজাল। 

মুমতাজ বলল, ‘আমি সুলতানার সঙ্গে দেখা করেছি। গয়না আর টাকা তাকে দিলাম। তার চোখে তখন জল নেমে এলো।’

আমরা যখন মমতাজের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নীচে নামছি, সে তখন ডেকে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তার ডান হাত নাড়ছিল।

‘আমি জুগলকে উদ্দেশ করে বললাম, ‘তোমার কি মনে হয় না মুমতাজ সুহায়ের আত্মাকে ডাকছে, নিজের হামসফর বানানোর জন্য?’

জুগল শুধু এতটুকু বলল, ‘হায়! আমি যদি সুহায়ের আত্মা হতাম!’

প্রকাশকাল : ১৯৫০

মন্তব্য লিখুন (1)
  1. এস. আজম রোকন

    গল্পটা ইংরেজিতে একবার পড়েছিলাম। ঠিক কোথায় পড়েছিলাম মনে করতে পারছি না। বাংলায় পড়লাম আজ। ভালো লেগেছে।
    শেষের দিকের ঘটনাগুলি খুবই দ্রুত ঘটে গেছে মনে হলো। অনুবাদকের আরও লেখা ও বই পড়েছিলাম। সবকিছু মিলে ভালোই হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *