সন্ধ্যায় মীরার স্ট্যাটাসটা চোখে পড়তেই নড়েচড়ে বসি। একটা মেয়ের ছবি পোস্ট করে তার ওপরে লিখেছে—‘আজ বিকেলে লাইব্রেরি থেকে ফিরছিলাম। হঠাৎ পথের পাশে পড়ে থাকা একটা মানিব্যাগ চোখে পড়ল। ঢাকার রাস্তায় মানুষ ছাড়া এক জিনিস বেশিদিন এভাবে অনাদরে পড়ে থাকার কথা নয়। টাকা-পয়সা সংশ্লিষ্ট হলে তো কথাই নেই! মানিব্যাগের চেহারাটাই বলে দিচ্ছে এটা খুব আগের নয়। অন্যদিন হলে হয়তো না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলেই যেতাম, কিন্তু কী মনে করে যেন আজ মানিব্যাগটা নেড়েচেড়ে দেখার ইচ্ছে হলো। সংকোচ না করে হাতে তুলে নিলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ব্যাগটাতে টাকা-পয়সা বা অন্য কোনো কাগজপত্র নেই। একটামাত্র ছবি আছে, এই মেয়েটার ছবি। মেয়েটাকে পেলে জিজ্ঞেস করা যেত, এই ব্যাগের মালিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী? কেনইবা মানিব্যাগে তার ছবি ছিল?’
মীরা সাংবাদিকতায় না পড়ে পরিসংখ্যানের মতো রস-কষহীন একটা বিষয়ে কেন পড়ছে কিছুতেই তা আমার মাথায় ঢোকে না। ওর প্রশ্নের সামনে যে কেউ থতমত খেয়ে যাবে। সবচেয়ে বেশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় আমাকে।
‘আচ্ছা ছবিটা দেখে তোমার কী মনে হয়?’
‘একটা মেয়ের ছবি বলেই তো মনে হচ্ছে!’
‘হেঁয়ালি ছাড়ো, মেয়েটার সঙ্গে মানিব্যাগের কী সম্পর্ক হতে পারে?’
‘মেয়েটা হয়তো শখ করে ছেলেদের মতো মানিব্যাগ ব্যবহার করত। অসাবধানতাবশত ব্যাগ থেকে পড়ে গেছে।’
‘যুক্তি ছাড়া এভাবে কথা বলবে না তো!’
‘তাহলে হয়তো ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিল। ছিনতাইকারীরা ব্যাগের ভেতর থেকে টাকা-পয়সা বের করে নিয়ে ফেলে রেখে গেছে। মেয়েটার ছবি তাদের কাছে মূল্যবান মনে হয়নি।’
‘তোমার কথা নিতে পারছি না। কারণ এটা ছেলেদের মানিব্যাগ। এ শহরের কোনো মেয়ে এ ধরনের ব্যাগ বহন করবে এ সম্ভাবনা ক্ষীণ। হতে পারে মানিব্যাগের মালিক ছেলেটি ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছিল কিংবা ব্যাগটা তার পকেট থেকে পড়ে গিয়েছিল।’
‘তাহলে ছবিটা?’
‘ছেলেটা সম্ভবত ছবির মেয়েটাকে ভালোবাসে। মানিব্যাগে প্রিয়জনের ছবি রাখা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।’
‘কিন্তু এ তো সনাতনী চর্চা! এ সময়ে ভালোবাসার মানুষের ছবি রাখতে গেলে কিছুদিন পরপরই ছবি পাল্টাতে হবে। নয়তো টাকা-পয়সার বদলে ছবিই রাখতে হবে।’
‘তোমার কাছ থেকে এ ধরনের কথা আশা করি না আবির। প্রেমের জন্য মানুষ এখনো অনেককিছু করে। তোমাকেও একটা কাজ করতে হবে।’
‘আমিও তো তোমার জন্য কতকিছু করি!’
‘এবার একটা বিশেষ কাজ করতে হবে।’
‘বলো তো দেখি।’
‘তোমার মানিব্যাগে আমার একটা ছবি রাখবে। আমি যখন চাইব তখনই প্রদর্শনে বাধ্য থাকিবে। এ মানিব্যাগটা হাতে পাওয়ার পর থেকেই কেন জানি আমার ভেতরে ইচ্ছেটা চাউর হয়ে উঠেছে। শুধু টাকা-পয়সা না, ভালোবাসা বহনের জন্যও মানিব্যাগ দারূন একটা মাধ্যম হতে পারে।’
‘জো হুকুম ম্যাডাম।’
আমি হেসে বললেও, মীরা হাসল না। ও আগের মতোই স্থির।
‘একটা জিনিস খেয়াল করেছো, আবির?’ মীরা বলল।
‘কী?’
‘মেয়েটার চোখ।’
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘আবার শুরু করলে? চোখে কী আছে?’
‘মনে হচ্ছে না, ও যেন সরাসরি তাকিয়ে আছে?’
‘সব ছবিতেই তো মানুষ তাকিয়ে থাকে!’
মীরা বলল, ‘না… এই দৃষ্টিটা আলাদা।’
আমি হালকা হেসে বললাম, ‘তুমি পরিসংখ্যান ছেড়ে রহস্যকাহিনি লিখলে ভালো করতে।’
মীরা এবার মুচকি হাসল, ‘তোমার মতো পাঠক থাকলে অবশ্যই।’
পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা আমার সবসময় থাকে। কিন্তু মীরা যেকোনো বিষয়ে একটু যেন বেশিই সিরিয়াস!
‘ধরো,’ মীরা বলল, ‘এই মেয়েটা কারও খুব প্রিয় মানুষ ছিল। সে তার মানিব্যাগে ছবি রাখত। হঠাৎ সেটা হারিয়ে গেল। এখন সে হয়তো পাগলের মতো খুঁজছে।’
আমি বললাম, ‘অথবা খুঁজছেই না।’
‘কেন খুঁজবে না?’
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম।
‘হয়তো সে জানে-কিছু জিনিস খুঁজে পাওয়া যায় না।’
মীরা ভ্রু কুঁচকাল।
‘তুমি আজকে খুব দার্শনিক হয়ে গেছো দেখছি।’
আমি একটু চুপ করে থাকলাম। জানি না কেন-ছবিটার দিকে তাকালে আমার ভেতরে অদ্ভুত একটা টান লাগছে!
মীরা হয়তো বিষয়টা খেয়াল করেছে। স্রষ্টা মেয়েদের অনেককিছু আন্দাজ করার বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছেন। মীরাও তার ব্যতিক্রম নয়।
‘তুমি আগে কখনো এই মুখটা দেখেছ?’
প্রশ্নটা খুব সাধারণ। কিন্তু আমার ভেতরে যেন কোথাও হালকা একটা ঝাঁকুনি লাগল।
আমি দ্রুত বললাম, ‘না তো।’
মীরা সরাসরি তাকাল, ‘নিশ্চিত?’
আমি ছবিটার দিকে আরেকবার তাকালাম। খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করলাম।
গোলগাল মায়াবী মুখ, চোখ দুটো…
অদ্ভুতভাবে চেনা চেনা লাগছে! এতক্ষণের হেঁয়ালির জন্য নিজের কাছেই বিব্রত লাগল।
মীরা চুপ করে রইল।
একটু গুছিয়ে বসে বললাম, ‘মীরা, আমি…সম্ভবত মেয়েটাকে চিনি।’
‘সম্ভবত?’ মীরা ভ্রু তুলল।
‘হ্যাঁ… মানে এখনো নিশ্চিত নই,’ আমি বললাম। ‘জারিফ নামে একটা ছেলেকে পড়াতাম। তাদের বাসায় বোধহয় এই ছবিটা দেখেছি! ওর একটা বড় বোন ছিল। জারিফ বলেছিল ছবিটা তার বোনের। মেয়েটা খুব মেধাবী ছিল। পরে শুনেছিলাম কী একটা কঠিন অসুখে মারা গেছে।’
মীরা চুপ করে শুনল। চোখ দুটো কিঞ্চিৎ ছলছল।
‘তাহলে মানিব্যাগটা…’ সে ধরা কণ্ঠে বলল।
আমি ধারণায় ভর দিয়ে বললাম, ‘হতে পারে, যে তাকে ভালোবাসত তার।’
মীরা এবার আগের মতোই প্রশ্নটা করল, ‘তাহলে এখানে পড়ে থাকবে কেন?’
আমি একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললাম, ‘এবারও একই উত্তর-হয়তো পকেট থেকে পড়ে গেছে।’
মীরা মাথা নাড়ল।
‘না, আবির…কেউ এত যত্ন করে রাখা ছবি এভাবে হারায় না।’
আমি আর কিছু বললাম না। কোনটা ঠিক তা আমাদের কেউ-ই জানে না। ধারণার ওপরে ভর করে সবসময় উপসংহারে পৌঁছানো যায় না।
দুই.
জারিফের সঙ্গে অনেকদিন যোগাযোগ নেই। ফোন ঘেঁটে নম্বরটা খুঁজে বের করে কল করলাম।
‘স্যার!’ ওর কণ্ঠে বিস্ময়।
কিছুক্ষণ গল্প করার পর বললাম, ‘তোমার আপুর একটা ছোট ছবি ছিল না? টেবিলে বইয়ের পাশে রাখতে?’
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর জারিফ বলল, ‘হ্যাঁ স্যার…ছিল। কিন্তু কয়েক মাস আগে হারিয়ে গেছে।’
আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
‘কেউ নিয়েছিল?’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘জানি না,’ জারিফ বলল। ‘তবে আপুর এক বন্ধু ছিল, প্রায়ই আসত। আপুর মৃত্যুর পরও মাঝেমধ্যে আসত। শেষবার এসেছিল…ছবিটা হারানোর কিছুদিন আগে।’
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
ফোনটা কেটে দিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম।
তিন.
পরদিন মীরাকে সব বললাম।
সে মনোযোগী শ্রোতার মতো মন দিয়ে শুনল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, ‘তাহলে মানিব্যাগের মালিক কে-তা আন্দাজ করা যায়।’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ। আন্দাজ করতে তো আর বাধা নেই! মানুষ হিসেবে এই স্বাধীনতাটুকু আমাদের আছে।’
মীরা একটু যেন বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকাল!
আমি যোগ করলাম, ‘ছেলেটা বোধহয় মেয়েটাকে ভুলতে পারেনি, ছবিটা ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছিল তার কাছে!’
মীরা তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘তাই রাস্তায় ফেলে দিয়ে দায় সেরে ফেলল?’
আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘না। ফেলে দেওয়া আর ছেড়ে দেওয়া এক জিনিস না, মীরা।’
‘তফাতটা কী?’ ও জানতে চাইল।
আমি বললাম, ‘ফেলে দিলে জিনিসটা হারিয়ে যায়। আর ছেড়ে দিলে জিনিসটা থেকে যায়, কিন্তু মালিকানা বদলে যায়।’
মীরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ব্যাগ থেকে মানিব্যাগটা বের করল। ধীরে খুলল। ছবিটা বের করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
আমি লক্ষ্য করলাম-ওর চোখে এবার কোনো রহস্য খোঁজার চেষ্টা নেই। আছে শুধু বোঝার চেষ্টা।
‘জানো,’ মীরা বলল, ‘মেয়েটা কিন্তু জানেই না কেউ তাকে এতদিন মানিব্যাগে করে ঘুরে বেড়িয়েছে।’
আমি বললাম, ‘হয়তো জানলে তার ভালো লাগত!’
মীরা মাথা নেড়ে বলল, ‘না। হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতো!’
আমি কিছু বললাম না। মীরার ভাবনাকে পাত্তা দিলাম।
মীরা ছবিটা আবার ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
তারপর হঠাৎ বলল, ‘আমরা এটা ফেরত দেব না।’
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
‘কেন?’
মীরা শান্তভাবে বলল, ‘কারণ যার ছিল, সে নিজেই এটা রেখে গেছে। সে চাইলে খুঁজত।’
আমি বললাম, ‘তুমি নিশ্চিত?’
মীরা আমার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
‘তুমি নিজেই তো বললে-সে ছেড়ে দিয়েছে!’
আমি চুপ করে গেলাম।
ফেরার পথে মীরা হঠাৎ বলল, ‘তুমি কি এখনো আমার ছবি রাখবে?’
আমি একটু হেসে বললাম, ‘তুমি তো আদেশ করেছ! আমি কি তোমার আদেশ ফেলতে পারি!’
মীরা থামল। আমার দিকে তাকাল।
‘আদেশ না…একটা পরীক্ষা ধরো।’
‘কীসের পরীক্ষা?’
মীরা ধীরে বলল, ‘কতদিন রাখতে পারো।’
আমি হেসে বললাম, ‘সারা জীবন।’
মীরা মাথা নেড়ে বলল, ‘এত সহজ না, আবির।’
আমি আর কথা বাড়ালাম না।
চার.
রাতে বাসায় ফিরে আমার মানিব্যাগটা বের করলাম।
মীরার একটা ছবি প্রিন্ট করে রাখার কথা, কিন্তু…
ফোন খুললাম। মীরার স্ট্যাটাসের নীচে মায়াবী মুখের ছবিটা আবার বের করলাম।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
তারপর হঠাৎ মনে হলো-যে মানুষটা এতদিন একটা ছবি বয়ে নিয়ে শেষে চুপচাপ রেখে গেছে সে কি দুর্বল ছিল?
নাকি সে-ই সবচেয়ে শক্ত!
ভাবনাগুলো মস্তিষ্কের কোষে তীব্রভাবে ছুটে বেড়াচ্ছে। এটা থেকে বের হওয়া প্রয়োজন। ফোনটা বন্ধ করে দিলাম। মানিব্যাগটা খুলে আবার বন্ধ করলাম। ফাঁকা রইল।
প্রথমবারের মতো বুঝলাম-ভালোবাসা প্রমাণ করার জন্য মানিব্যাগে ছবি রাখা যায়, কিন্তু ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার জন্য কখনো কখনো মানিব্যাগটা ফাঁকাই রাখতে হয়।