চুপ

চাচির নজর এড়িয়ে কাসিমের দিকে ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়েছিল জিনা। তারপর নিজেকে সংবরণ করে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে। ঠোঁটে খেলে যায় মুচকি হাসি। চাচির সাথে পুনরায় আলাপে মজে যায় জিনা। লজ্জাবনত কাসিম। নিজেকে ধাতস্থ করতে খাটে পড়ে থাকা রুমালের কারুকাজে মন দেয়; খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকে। খামোখাই তার মন দুখিয়ে ছিল। অনুভব করছিল, হয়তো সে কোনো জুলুমের সূচনা করে ফেলেছে। বারকয়েক সে লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখেছে জিনাকে। দেখেছে তার গোলাপি যৌবন। ধরা যে খায়নি তা নয়। জিনা হেসে ফেললেও তার শরম কাটেনি। লাজে জারজার হতে হয়েছে। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ধরা পড়লেই নজর লুকোনোর অপ্রস্তুত কিন্তু সলজ্জ চেষ্টা। জানিনা কেন, জিনার দিকে চোখ পড়লেই ও জমে যেত। নিথর। নিশ্চুপ। কী দেখছিল, ভুলে যেত তখন। কিংবা আদৌ কিছু দেখছিল কি না; মনে করতে পারত না।

জটিলতাটা তৈরি হতো তখন, যখন কি না জিনার পাশে কোন বান্ধবী বা অন্যকেউ বসে থাকত। জিনা কখনো একা থাকলে বলত, অমন করে কি দেখছ, কাসিম? আমি? আআমি? কই, না তো! ঘাবড়ে যেত কাসিম। জিনা হাসত। কন্ঠে আদর মেখে বলত, কারও সামনে অমন বুঁদ হয়ে দেখো না, বিল্লু! কখনো কাজের ভেতর যদি জিনার টাখনু বেরিয়ে যেত, কিংবা বুক থেকে ওড়না সরে যেত, কাসিম চোখ তোলার সাহস করত না। জিনাও মনোযোগী হয়ে কাজে ডুবে যেত। কিন্তু অশান্ত হয়ে উঠত কাসিম। আমি এখন যাচ্ছি! জিনা চোখ মটকে বলত, যাচ্ছ মানে, বোসো এখানে!

একটা জরুরি কাজ আছে! অপ্রস্তুত চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখত কাসিম।

কোনো কাজ নেই। পরে করবে। তবুও সে চলে যেত। যেন-বা সে অপারগ। নিশ্চুপ বসে থাকত জিনা।

আজ যখন কাসিম চলে যাচ্ছিল, জিনা মেশিন চালাতে চালাতে তাকে ডাকে, কাসি, একটু এদিকে আসো না! একটা কথা জিজ্ঞেস করব। কী কথা? কাসিম দাঁড়িয়ে যায়। জিনা কাসিমের দিকে না তাকিয়ে বলে, আগে এদিকে আসো। বসো, বলছি। জিনার কাছাকাছি গিয়ে মাটিতে বসে পড়ে কাসিম। হুট করেই কাসিমের কাঁধে হাত রাখে জিনা। কাসিম অপ্রস্তুত। টেনে উরুতে শুইয়ে ফেলে। সত্যি সত্যি বলো কাসি। দুয়েকবার মাথা তুলতে চেষ্টা করে কাসিম। কিন্তু রেশম-কোমল উরু, মিষ্টি সুবাস এবং শরীরি মাদকতা তাকে ডুবিয়ে রাখে। স্থবির হয়ে পড়ে দেহ। নড়াচড়া ভুলে যায়। তুমি আমার দিকে অমন বিগলিত নয়নে কি দেখো, হ্যাঁ? আদুরে থাপ্পড় দিয়ে বলে, সত্যিটা বলো। এবার পুরো শক্তি দিয়ে মাথা তুলে ফেলে কাসিম। আবেগে বুঁদ হয়ে ছিল জিনা। চোখ যেন জ্বলন্ত আগুন। চেহারা ক্রমশ লাল হয়ে উঠছিল। ফুলে ফুলে উঠছিল শ্বাস। এই, তোমার কী হয়েছে? কথা বলছ না কেন? চোয়াল ধরে জিজ্ঞেস করে জিনা। কিছু না, মুখ ঘুরিয়ে জবাব দেয় কাসিম। রাগ করেছ? মুখে ওড়না চেপে হাসির গমক আটকে মেশিন চালাতে চালাতে জানতে চায় জিনা। না না, তেমন কিছু নয়; জবাব দেয় কাসিম।

আচ্ছা, তাহলে আমি এখন আসি; বলেই উঠে চলে যায় কসিম।

এরপর থেকে যখনই দুজন একা হয়ে পড়তো, কাসিম উঠে যেতে যেতে বলত; আচ্ছা, আমি যাচ্ছি! তবুও কি যেত? কিছুদূর গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। জিনা হাসি ফিরিয়ে দিয়ে বলত, আচ্ছা, একটা কথা শোনো। নিষ্পাপ মুখে জিজ্ঞেস করত কাসিম, কী কথা? আগে এদিকে আসো। বসো, বলছি। জিনার কাছ ঘেঁষে বসে আরও নিষ্পাপ কন্ঠে জানতে চাইতো, কী কথা? হুট করেই কাসিমের চোয়ালে হাত রাখত জিনা। তরঙ্গায়িত হতো দুজনই। হাতেরা খুঁজে নিতো পরবর্তী গন্তব্য। তারপর সল্পদৈর্ঘ একটা শ্রাবণে সময়। লাল হয়ে উঠত কাসিম। ফুলে ফুলে উঠত শ্বাস। বেশি সহ্য করতে পারত না। একটা রঙিন অস্থিরতা তাকে অশান্ত করে তুলত। উঠে যেত সে; এখন আমি যাচ্ছি। মাথা নিচু করে ইষৎ হেসে চলে যেত কাসিম। জিনা হাসত।

এরপর কী হলো কে জানে! একটা রঙিন অস্থিরতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে কাসিম। নিথর হয়ে খাটে বসে থাকে। তখন তার চোখদুটো এমন টকটকে দেখাত, যেন-বা সদ্যই পান করে এসেছে! জীবনের ওপর দিয়ে যেন বয়ে গেছে কালবোশেখি ঝড়। আড়চোখে দেখে হাসত জিনা। নজর এড়িয়ে দুষ্টুমি করার সুযোগ ছাড়ত না। চাচি বা মুরুব্বি কারও চোখের আড়াল হলেই একটা কাপড় হয়তো নিজের দিকে টেনে নেবে। তারপর চেহারা আড়াল করে নানা ভঙ্গিমায় শুরু হতো জ্বালাতন। ওদিকে লাজুক কাসিমের অবস্থা বেগতিক। জিনা মুখে কাপড় চাপা দিয়ে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করত। কখনো দুহাত মেলে নিজের দিকে আকর্ষণও করত কাসিমকে। যদি চাচি বা মুরুব্বি কেউ তার বুজরুকি খেয়াল করে ওঠার চেষ্টা করতেন, নিজেকে ব্যস্ত দেখাত জিনা। শেলাই মেশিনের আওয়াজে ঢাকা পড়ে যেত সব। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টায় কখনো নিরুপদ্রব বসে থাকা কাসিমের ঘাড়েও কাঁঠাল ভাঙত, আজ এতো চুপচাপ বসে আছ যে; বাইরে থেকে ঝগড়া করে আসোনি তো?

আবার কখনো জিনা একা বসে থাকলে কাসিম নিজ থেকে উঠে এসে জিনার কাছে বসত। ঘোর নয়নে এক-দুবার শেলাই মেশিনে কর্মরত চঞ্চল হাতদুটো দেখত। তারপর আনমনেই মাথাটা এলিয়ে দিত জিনার সুসাসিত উরুতে। কখনো-বা কাছে যেতেই জিনা চোয়াল ধরে বলত, কী ব্যাপার, হ্যাঁ? কখনো কাসিম মাথা তুলে জিনার মুখের দিকে যাবার চেষ্টা করলে জিনা আদুরে মার দিয়ে বলত, তুমি আজকাল বড্ড দুষ্টু হয়ে গেছ, কাসিম! কেউ দেখে ফেললে! একটু তো লজ্জা করো! একদিন উরুতে মাথা রেখে পড়ে ছিল কাসিম। জিনা বলে, কাসি, কী হয়েছে তোমার? ভালো লাগে? সেদিন কীভাবে কী হয়েছে কে জানে, মুখে বুলি ফুটে কাসিমের। কথা বলে ওঠে কাসিম, আমি তোমাকে ভালোবাসি…সাথে সাথে তার মাথা ঝাঁকিয়ে দিয়ে জিনা বলে—চুপ! কেউ যদি শুনে ফেলে! বিবাহিতার সাথে প্রেম করতে নেই! বাড়ির কেউ শুনে ফেললে নাক তো কাটা যাবেই, ঘর থেকেও বের করে দেবে; বুঝেছ বিল্লু! উঠে বসে কাসিম। কিন্তু অন্যদিনের মতো উঠে চলে যাবার বদলে সেদিন তার চোখ ভিজে উঠেছিল। এখন আমার কী হবে? সজল চোখ তাকে বিবর্ণ করে তুলেছিল। জিনার ডাক উপেক্ষা করেই সে বেরিয়ে যায়। গোসলখানায় গিয়ে মুখে ঠান্ডা পানির ঝাঁপ্টা দিতে থাকে।

জানা নেই সেই রেশম-কোমল, সুবাসিত উরু তাকে কী বলেছে! মাসকয়েক পরেই সে কাসি থেকে কাসিম হয়ে যায়। সর্বক্ষণ ঘাড় নিচু করে হাঁটার স্বভাবে পরিবর্তন আসে। বেড়ে যায় কণ্ঠের তেজ। বুকে পশমের আনাগোনা। ইষৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে পুরুষালি স্তন। হাত পড়লে চিনচিনে ব্যথায় বুকটা ভারি হয়ে আসে। গোটায় ভরে যায় মুখ। লতানো গড়ন হঠাৎ থমকে যায়।

তারপর একদিন সে ওখানে যাবার জন্য উঠতেই মা জিজ্ঞেস করেন, কেথায় যাস? কোথাও না। তারপর থেমে বলে, জিনার কাছে। মা বলেন, মুখে দাড়ি উঠে গেছে, এখনো হুঁশ হবে না তোর? এখন ওর কাছে গিয়ে বসলে মানুষজন না জানি কি ভাবে! ধরে নিলাম, ও খুব আপন। কিন্তু ওর সম্মানও তো আমাদের সম্মান! মানুষের কথা আর কি বলব! ধক করে ওঠে কাসিমের বুক। চুপচাপ ঘরে গিয়ে খাটে শুয়ে পড়ে। আকাশ-পাতাল এক করে যদি কিছুক্ষণ কাঁদা যেত!

সেজন্যই হয়তো ও আর আসেনি। অথবা তার আরও স্ফীতযৌবনা কাউকে প্রয়োজন ছিল। আরও কত ভাবনাচিন্তা। হাসতে হাসতে কাসিমদের বাড়ি ঢুকে জিনা। কাসিমের মাকে ডেকে বলে, ভাবি, কালো সুতো হবে? কথায় ফাঁকে ফাঁকে আতিপাতি খুঁজে ফিরে তার চোখ; কাসিমকে কোথাও দেখছি না যে? কোথাও গেছে নাকি? ঘরের ভেতর বসে আছে; ভাবি জবাব দেন। আজকে আমার কাছেও আসেনি; জিনা বলে। সব ঠিকাছে তো? আমিই ওকে যেতে নিষেধ করেছি; ভাবি জবাব দেন। দেখো জিনা, ও এখন যুবক হয়েছে। মানুষ না জানি কি মনে করে! কারও মুখই আটকে রাখা যাবে না। মহল্লাবাসীদের তো তুমি চেনোই। মানুষ কখনো বিবেকহীন কথাও বলে বসতে পারে! তোমার ইজ্জতের মামলা তো আছেই। তুমি কী বলো, আমি ওকে যেতে না দিয়ে খারাপ করেছি? কিছুসময়ের জন্য থমকে যায় জিনা। তারপর স্থির হয়ে বলে, অবশ্যই ঠিক করেছ। তুমি চিন্তা না করলে আমার চিন্তা কে করবে! তোমার চেয়ে আমার আপন কেউ আছে? চিন্তা-চেতনায় তুমি অনেক ক্ষুরধার, ভাবি। কথা শেষ করে জিনা উঠে দাঁড়ায়। কোথায় লুকিয়ে বসে আছে বলতে বলতে ঘরে ঢুকে পড়ে। কাসির মুখ হলদে হয়ে গিয়েছিল। জলে ভরা চোখ। কাসিকে অমন দেখে মুচকি হাসে জিনা। কাছে গিয়ে পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে বলে—চুপ! তারপর আওয়াজ উঁচু করে বলে, আমাকে একটা ডিএমসি’র কৌটা এনে দিতে হবে, কাসি। সব রং যেন থাকে, খেয়াল করে আনবে। তারপর ওর আঙ্গুল ধরে দাঁত বসিয়ে দেয়। কাসি হাসতে থাকে। ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে চুপ করিয়ে দেয় জিনা। এখন তো জীবন দুর্বিষহ হয়ে গেল, জিনার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে কাসি। আমি এখন কি করব! আমার কি হবে! কি এমন হয়েছে? এইটুকুতে ঘাবড়ে গেলে হবে? তারপর আওয়াজ উঁচিয়ে বলে, কালো সুতোর একটা কাঠিম যেন অবশ্যই থাকে; আমার ওটা লাগবে। ভীষণ জরুরি। কথা শেষ করে কাসির কানে মুখ লাগায় জিনা, রাত একটায় বৈঠকখানার ঘরে চলে এসো; দরজা ভেজানো থাকবে। দুটো শব্দই কাসিকে দিশেহারা করে দেয় ‘অবশ্যই আসবে’। তারপর কাসির মাথাটা শরীরে চেপে ধরে। যাবার সময় সুতো আনার তাকিদ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে জিনা। পেছন ফিরে আবার বলে, আজ না হলেও কাল অবশ্যই এনে দেবে। তারপর দ্রুত চলে যায়।

সে রাতে মহল্লার নানামুখী আওয়াজে গলি গমগম করছিল। দুরুদুরু করছিল কাসিমের বুক। বিরামহীন ছিল সে আওয়াজ। কোনো থামাথামি নেই। যেন-বা একটার ভেতর আরেকটা সেধিয়ে আছে। ক্লান্তিহীন বেজেই চলছে। এ যেন ধৈর্যের চূড়ান্ত প্রতিশোধ। বাচ্চারা তখনো বাইরে খেলছিল। বড় অসহ্য লাগছিল কাসিমের। মায়েরা কেন যে ওদের এতো রাতোব্দি বাইরে খেলতে দেয়! রাত গাঢ় হয়। ধীরে ধীরে নীরব হয়ে আসে চরাচর। তারপরেই যেন দূরবর্তী কোনো মহল্লা থেকে ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠস্বর! কার যেন চিৎকার শোনা যায়! কেউ হয়তো কান্না করছে! কি ভয়ংকর সে আওয়াজ! হঠাৎ নীরবতা ছেয়ে যায়। নিষিদ্ধ নীরবতা। দরজা খোলাই হচ্ছিল নাকি বন্ধ, বোঝায় কায়দা নেই! উফ! সে কি অসহ্য চিৎকার! দরজাও এমন বিলাপ করে! এমন মার্সিয়া গাইতে পারে! চিন্তায় পড়ে যায় কাসিম। নামাজিরা ফিরে আসছিল। তাদের প্রতিটা কদমই কাঁপিয়ে দিচ্ছিল তার বুক। মহল্লার গলিতে হাঁটার সময় যেন পুরো তল্লাট জেগে ওঠে। একে একে সব দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কে জানে কি হয়েছে! গোটা মহল্লা যেন সেদিন একত্রে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। এহেম এহেম! সম্মিলিত কাশি। যেন-বা সবাই গোপন সেই ভেদটা জানে!

ঢংঢং। রাত বারোটা। আওয়াজ শুনতে পায় কাসিম। তরঙ্গায়িত হতে থাকে সেই শব্দ। শিশুরা হুটহাট ঘুমের ভেতর জেগে উঠছে। মাকে ডেকে খানখান করে দিচ্ছে রাতের সবটুকু নীরবতা। আবার কখনো কোনো বৃদ্ধ বুকভাঙা কাশিতে ক্রমশ থেমে আসা কলবর পুনরায় জাগিয়ে তুলছে! তারা কি রোজই এমন জেগে থাকে? নাকি আজকেই নিয়ম ভঙ্গ করে এমন জেগে আছে? জানা নেই! পাশের রুমে আম্মার খাট ককিয়ে যাচ্ছিল! আম্মাও ঘুমুচ্ছে না। আম্মা কি কিছু টের পেয়েছে? বাইরে যেতে গেলে যদি পেছন থেকে এসে হাত চেপে ধরে! ভয়টা ক্রমশ মনে বসে যেতে থাকে কাসিমের। এখন যদি উল্টো জিনাই চলে আসে! উফ! ধক করে ওঠে কাসিমের বুক! চতুর্মুখী শব্দ তরঙ্গের ভেতর সে ধুকছিল!

হয়তো সে কল্পনাতে জিনার কোলে মাথা রেখে কেঁদে কেঁদে বলছিল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। খেয়ালি হাতে তাকে ভালোবাসার আদরে সিক্ত করছিল জিনা। তখনো তরঙ্গায়িত হচ্ছিল আওয়াজ। তার ধুকতে থাকার এটাও একটা কারণ, দীর্ঘশ্বাসেই কেটে যেত তার সারাটা দিন। চুপচাপ। রাতে আলাদা রুমে শুতে জিদ করত। যথারীতি ডিএমসির কৌটা চাইতে আসত জিনা; সজাগ হয়ে উঠত কাসিমের কান। চোখ বন্ধ। সে ভুলে যেত আম্মার কাছে মহাল্লার অনেক নারীই বসে আছে! কখনো মাথা থেকে জিনার চিন্তা ছুটে গেলেও কান খাড়া হয়ে যেত, কারণ জিনার স্বামী রোজই তার সাথে ঝগড়া করত। অথচ জিনা দৃশ্যত তার অনেক যত্ন নিত। সমস্যা কাটতে সময় লাগতো না। ভালোবাসাপূর্ণ কথায় পাল্টে যেত মুহূর্ত। তবুও কেন যেন স্বামীর মন দুখিয়ে থাকত। মনে হতো, ও আমার প্রতি দিনদিন উদাসীন হয়ে যাচ্ছে! দেয়ালেরও কান আছে। কথারা লতিয়ে পড়ে দেয়ালের বাইরে। মহল্লাবাসীও চুপ থাকতে পারেনি। যেভাবেই হোক, হুট করেই কথা ছড়িয়ে যায়। যেমন হুটহাট, যখন-তখন ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়ে জিনা।

প্রথমে ফিসফাস। এই আদরের কাসিম, নাওয়াব বিবির ছেলে, হায়! এমন তো কখনো দেখিনি! কাসিমের আম্মা আর জিনা বাইরে বের হলে তাদের গলার জোর আরও বেড়ে যায়। না না, আমার বিশ্বাস হয়না! সেদিনের ছেলে! এমন হতে পারেনা! হায়! কি আর বলব ভাবি, কি যে ঝানু হয়েছে, এমন সন্তর্পণে মিলিত হয় আল্লাহ; যদি তুমি দেখতে! মানুষের তো আর কোনো বিকার নেই, যেভাবে খুশি কথা ছড়িয়েছে।

ভাবি, জিনাকে একটু খেয়াল করে দেখো। এমন ঢঙি হয়েছে, পুরো নেশার ডিব্বা। হাতের মেহেদি কখনো মুছে যেতে দেখিনি! হ্যাঁ বোন, বেশ রংচঙেই থাকে! মুখের ওপর সত্যটা বলে দেওয়া খারাপই কি না, আল্লাহ জানে! ওর স্বামীর কথা আর কি বলল, আস্ত একটা বুদ্ধু! ঘর কীভাবে সামলায়, কে জানে! হায়, কী যুগ চলে এলো!

কাসিম খেয়াল করেছে, আজকাল লোকজন তাকে বেশ খুঁটিয়ে দেখা শুরু করেছে। প্রথম প্রথম সে এটা অনুভব করে বেশ লজ্জা পেত। পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবে, বৈঠকখানার তৃতীয় দরজাটা না আবার চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়! গভীর ভাবনায় তলিয়ে যায় অন্তর। তাদের ঘিরে মহল্লায় গুঞ্জন যতোই বাড়ছিল; সমানুপাতিক হারেই বাড়ছিল জিনার উচ্ছলতা। সে হাসত। আমাদের কি এখন ভয় পাওয়া উচিত? তার খেয়ালি হাত আরও চঞ্চল হচ্ছিল। সুরভিত হচ্ছিল তার ব্যবহার্য। আর এই নানামুখী কথা উড়াউড়ির ভিড়েও জিনার প্রতি ঋজু হয়ে আসছিল কাসিমের মন।

কখনো যদি বৈঠকখানার তৃতীয় দরজাটা বন্ধ থাকত, কাসিম ভেবে নিত, সে হয়তো স্বামীর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ। অথবা তার সেই সুবাসিত কোলে কেউ মাথা রেখে শুয়ে আছে। তার মেহেদিরাঙা হাতে কারও হাত! কাসিমের বুকে দৌঁড়ে বেড়াতো বিষাক্ত সাপ! ছটফটিয়ে কাটত সারাটি রাত। তারপর যখন তাদের সাক্ষাত হতো, কাসিমের অভিমানী অভিযোগ। কখনো কাঁদতে কাঁদতে চোখ ভেসে যেত। সব দুঃখ মুছে দিতো মেহেদিরাঙা নরম দুটি হাত!

কাসিম আর জিনার কাহিনি এবার বেশ জোরেশোরেই গুঞ্জরিত হতে শুরু করে। এবং সেটা বাড়ছিলই। ফিসফিস এখন হুমকিতে বিবর্তিত হয়েছে! ইশারা বন্ধ হয়ে শুরু হয় সরাসরি আক্রমণ; বলি কি চাচি, রাতে তো গোপনে সাক্ষাত করতে দেখা যায়! মসজিদের মোল্লা নিজ চোখে দেখেছে! তার স্বামীর কথা বলে তো লাভ নেই। রাতে ঘর থেকে যে বউ নাই হয়ে যায়, সে খবর কী তার আছে! শুনেছি, একদিন সে নিচে নেমে এসেছিল! তারপর জিনা! তার মাথায় তো শয়তানের বাসা। কীভাবে যেন সে যাত্রায় বেঁচে যায়। শুনেছি, সে অসুস্থ। পেটে ব্যথা। আল্লাহ ঠিক বিচার করেছেন। সে অষুধ খুঁজতে এসেছিল; তাকেই-বা কি বলবেন, চাচি! আর বুদ্ধু মিয়া তো বুদ্ধু মিয়াই! বউকে শাসন করার বদলে সে কি পেরেশানি তার! তুমি চলো, আমি অষুধ খুঁজে নিয়ে আসবোনে। এখন কী অবস্থা কে জানে! যখন অষুধের জন্য এসেছিল, অবস্থা বেশ খারাপ ছিল তখন। মসজিদের মোল্লা দেখে বলে, হায় হায়! তার কী হয়েছে! তাদের আলাপ শুনে শুনে জ্বলছি। কান পেকে গেছে। সদ্য অপারেশন হয়েছে। ভালো হবার কথা না? আবারও নতুন করে সমস্যা দেখা দিয়েছে—তাওবা! হারামে লিপ্তদের আওয়াজ থেকে পানাহ চাই৷ না জানি দুজন কী করে বেড়ায়! কখনো হাসে। কখনো কাঁদে। রঙঢঙের আওয়াজও পেয়ে উঠি কখনো। যেন-বা কাবাডি খেলছে। আচ্ছা, ঘরে আপন মানুষ থাকতে এমন উঁকিঝুঁকি মারে কেউ? পাশ থেকে একজন বলে ওঠে, আরে রাখো, চুরির মজা চুরিই। মাথায় তখন হারামের খুন। এই সন্তর্পণে করা চুরির মজা তুমি কী বুঝবে! আল্লাহ দয়া করেন। আমি বলি কী, ওরা লুকোচুরি খেলছে, খেলুক। পর্দা খুলবেই। একসময় ঠিকই ঘটনাটা রাষ্ট্র হয়ে যায়। মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। একসময় অগ্রহীদেরও অনুসন্ধিৎসা মিটে যায়। জিনা কোন মাটির তৈরি, কে জানে! তার প্রতিটা পদক্ষেপই ছিল গোপন। যারাই তাকে সন্দেহের চোখে দেখতে গিয়েছে, তার চওড়া হাসিই ঠেকিয়ে দিয়েছে তাদের। মহল্লাবাসীর সাথে তার মেলামেশাও কমেনি। না হাসি, না মেলামেশা; সবকিছুই দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এসেছে। যদিও সে জানত, এরাই তার পেছনে তার সমালেচনা করে। আর কাসিম? কাসিমের সাক্ষাত ছিল কষ্টসাধ্য, মধুময়। দিনদিন সেটা বাড়ছিলই। রোদ চেহারায় দুজনের সাক্ষাত হতো। নখের আচঁড়ে অন্তরঙ্গতা তৈরি করত জিনা। দুষ্টুমি করত। পরিস্থিতিই অধিকতর গরম ও সুবাসিত করে দিচ্ছিল তার কোল। কিন্তু যখন ঘটনাটা বাড়িবাড়িরকম ছড়িয়ে যায়। কৌতুহল হারিয়ে ফেলে মানুষ। জিনাও হঠাৎ নিজেকে পাল্টে ফেলে। কাসিম থেকে নিমিষেই ধুয়েমুছে উঠে যায় যাবতীয় মোহ। মানুষের নিস্পৃহতা তাদের নীরবতাকে করে তুলে আরও অর্থহীন।

[গল্পটির বাকি অংশ এখানে যোগ করা হবে।]

মন্তব্য লিখুন (1)
  1. এস. আজম রোকন

    গল্পটা কোন দেশি? অনুবাদ বেশ ভালো হয়েছে। বাকি অংশের অপেক্ষায় আছি।

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *