সর্বশেষ আমি আরেকবার আমার বাসা পাল্টাই। প্রথমে যে গলিতে ছিলাম সেটা ভেঙে ফেলার পর কিছুদিন এদিক ওদিক ঘুরেছি। সর্বশেষ এই বাসাটিতে এসে উঠেছি। এখানে আসার পর থেকে আমার জীবনের গতিপথ নতুন মোড় নিয়েছে। নানাবিধ গ্রুপের লোকজন আমার পূর্বের জীবনের কারণে প্রায়ই আসে যায়। এভাবে আসতে আসতে আর যেতে যেতে টুকটাক লেনদেনের সুযোগ হচ্ছে। এতে করে আমার ভিতর আলস্য আর এক ধরনের নির্ভারতা এসে যাচ্ছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত যে, এই সময়ে আমার দর্শন আবারো একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমি জীবনের মূল উদ্দেশ্য খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন দিকে ছুটে যাচ্ছি। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়, এভাবে আমার কাছে সবকিছু এক ঘোর লাগা অস্পষ্টতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
আমার এই স্বচ্ছলতা আমার ভিতর নানাবিধ পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। আমি একটি পিসি কিনেছি। ভালো কনফিগারেশনের এই পিসিতে আমি রাত-দিন গেম খেলি। গেম খেলতে ভালো না লাগলে মুভি দেখি। এর ভিতরে গেম খেলার জন্য ওয়াইফাই নিলাম। ওয়াইফাই নেওয়ার পর থেকে ফোনে রিলস দেখায় আসক্ত হয়ে গেলাম। রিলস দেখতে দেখতে আমি রিলস কম্যুনিটির সাথে ভালো সখ্যতা লাভ করলাম। এখন প্রায়ই দেখা যায় রাতে শুয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু রিলস দেখি আর শেয়ার দেই।
মাঝে মধ্যে সন্ধ্যায় গাঁজা খেয়ে এক রকম ঝিমুনি নিয়ে বাসায় আসি। এসে গেম খেলা শুরু করি। কখনো রেড ডেড রেডেম্পশনের ওল্ড ওয়েস্টে ঘুরে বেড়াই, কখনো এডওয়ার্ড কেনওয়ে হয়ে ক্যারিবিয়ান সাগরে দস্যুগিরি করি। কখনো মাফিয়ার নস্টালজিয়ায় হারিয়ে যাই। আবার কখনো মেট্রো এক্সোডাসের ডিস্টোপিয়াতে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করি। ব্যাপারটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, আমি কী খেলেছি পরেরদিন সকালে ভুলে যাই। এলোভেরার টবের পাশে দাঁড়িয়ে মধ্যরাতে বিড়ি খেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে শুয়ে পড়ি। কখনো ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি খাই। তারপর নিঃশব্দ রাতে দম বন্ধ করে হৃদয়ের আওয়াজ শুনতে শুনতে গভীর ধ্যানে চলে যাই।
মনে হয় আমি দেখি, কীভাবে এক এক করে মানুষজন মরে যাচ্ছে আর আমি সবগুলির স্মৃতি নিয়ে একটি রুগ্ন সময়ের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছি। মনে পড়ে, এক সকালে আমি দোকানে যাই ডিম আনতে। সেখানে এক কাকা আর দোকানদার আলাপ করছে। এর ভিতর দোকানদার একটা পচা ডিম রাস্তায় ছুড়ে মারল। এরপর যে বিশ্রী গন্ধটা বের হলো তাতে করে কাকার মনে পচা লাশের তীব্র গন্ধের স্মৃতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। চাচা আমাকে লক্ষ্য করে বলছে, একবার আজিমপুর গোরস্তানে এমন একটা পচা লাশ নিয়ে আসছে। লাশের কাফন গলে পচা পানি পড়ছে। এই গন্ধ আমি এক সপ্তা পরেও পাইছি।
ব্যাপারটা এমন যে, রাতে শুইলে পরে মনে হয়, মরার পর এইভাবে পচে যাব। তীব্র বিস্মৃতির ব্ল্যাকহোলে মিলিয়ে যাব। ব্যাপারটা যদি এই হয়, এই জীবন এই অস্তিত্ব তাহলে কি এইটুকুতেই ভস্ম হয়ে যাবে, হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে! ব্যাপারটা এতটাই তীব্র আর ভয়াবহরকম অসহনীয় যে, আমি ঘুমাতে পারতাম না। এই নির্ঘুম রাতগুলিতে আমি নানারকম মিউজিক শুনতাম, রিলস দেখতাম। ফজরের আগেই ঘুমিয়ে যেতাম আর যোহরের সময় যখন উঠতাম তখন আমার আর কিছুই মনে থাকত না। পাপ-পূণ্যের হিসেব এভাবে একে অপরকে গিলে খাচ্ছে। প্রতিনিয়ত আমি চেতনাগতভাবে অস্পষ্টতার মধ্যে ডুবে যাচ্ছি।
এমনও দিন আসবে যে, আমি তখন ভুলে যাব আমি কই থেকে এসেছি আর এত এত স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলার উদ্দেশ্য কী। আমার চিন্তা-ভাবনায় যখন এমন দুর্বলতা চলে আসছে তখন আমি ডুবে আছি মেকারভের নৃশংসতায় বা আর্কহাম সিটিতে নীতি-নৈতিকতার তীব্র দ্বন্দ্বে। আমার মন তখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। গেমের ভিতর যদি আমাকে দুটা চয়েস দেয়, একবার আমি ভালোটা বেছে নিলে দ্বিতীয়বার মন্দটা বেছে নেই। ব্যাপারটা এজন্যই যে, মন্দটা কেমন আসলে!
আমার মনে হয় গেমস এমন একটা জগৎ তৈরি করতে পারে যেটা নিজস্ব ফ্যান্টাসিকে ব্যহত করে এবং নৈতিকতার উর্ধ্বে গিয়ে ফলাফলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মনোভাব তৈরি করে। এমন না যে গেমে কোনো সিস্টেম কাজ করে না। কিন্তু যেহেতু এটা গেম, রিয়েলিটি না তাই চাইলেই বাস্তব জগতে যা করা যায় না তা সেখানে কোনোরকম চিন্তাভাবনা না করেই করা যায়। এর ফলে যেটা হয়েছে আমার, আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ভালমন্দ বিচার করি না। আমি শুধু কাঙ্খিত ফলাফল নিয়েই ভাবি। আশ্চর্য ব্যাপার, আমি জানালা দিয়ে দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। এমনকি আমি এতদিন ধরে চিন্তার যে ধারা তৈরি করেছিলাম সেটাও এখন আর মাথায় নাই। অনেক অনেক স্মৃতি বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে।
বৃষ্টির এক দিনে সন্ধ্যায় আমি গাঁজার আসরে বসেছি। একের পর এক পাফ দিচ্ছি। তখন পিনিকের থেকে এটা দেখাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যে আমার লিমিট কতটুকু। অনেক সময় আমি এই লিমিট মাপি একটানা দশ ঘন্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থেকে। হেডফোনের বেন্ডটা মাথার খুলিতেই বুঝি দাগ কেটে ফেলেছে। মাথার ভিতর দপ দপ করছে আর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। অমানুষিক এই যাপন আমাকে স্বচ্ছলতার যে ধারা তৈরি হয়েছিলো তার নিশ্চয়তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আমি আবারও রোগ-বালাইয়ে জর্জরিত হতে থাকলাম।
বৃষ্টির এক দিনে এমনই তুমুল নেশা করে পুরোনো এক গলিতে এসে দাঁড়িয়েছি। অন্ধকার, বিদ্যুৎ চলে গেছে। বিশ্বে যুদ্ধ বেধেছে। রাস্তাঘাটে গাড়িঘোড়ার চাপ কমে গেছে, মাঝে মধ্যে সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বিদ্যুৎ অফিস থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়। এমনই এক সন্ধ্যায় হঠাৎ বাতাস উঠেছে। সে কি বাতাস, জগতের সব ধুলো একাকার হয়ে বাতাসের সাথে সাথে পাক খেয়ে উড়ছে। নীল পলিথিন, লাল পলিথিন আর কালো পলিথিন বাতাসের ঘূর্ণিতে হুটোপুটি করছে। এই পরিবেশে এক কাপ চা নিয়ে বিড়ি ধরিয়েছি আর সাথে সাথেই তীব্র বজ্রপাতসহ বৃষ্টি নামল। একেকটা বজ্রপাতে ধরণী কেঁপে কেঁপে উঠছে, যেন কোনো সেলভিক পূরাণের দানব জেগে ওঠছে। ভয়েই হোক বা বৃষ্টির ছিটা থেকে বাঁচতেই হোক একটা বাসার নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। আরও দুজন লোক ছিল। এদের সাথে আমার টুকটাক পরিচয় ছিল। কিন্তু ইদানিং আমার জীবন-যাপন এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছিল, যে বলার মত কোন কথা ছিল না। কিন্তু তারা আমার কাছ থেকে বিড়ি নিল। বাইরে তীব্র বৃষ্টি হচ্ছে আর থেকে থেকে বজ্রপাত হচ্ছে।
একটা বিলাই আসল। একটা ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে একটানা ডেকে যাচ্ছে। তার স্বরে ভয় এবং আশ্রয়ের আকুতি। বৃষ্টির জন্য শুনতে না পেয়ে হয়তো বাড়ির লোকেরা দরজা খুলছে না। একজন বিলাইটাকে শান্ত করতে চাইল। কিন্তু যতই হাত বুলাক, যতই আদর করুক, বিলাইটা অনবরত ডেকেই চলেছে। যেন অনাগত কোনো দুর্যোগের আশংকায় সে উদ্বিগ্ন। অবলা জানোয়ার অনাগত দুর্যোগের আভাস পায় হয়তো। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, এই বাসার এক তলা অর্ধেক মাটির নিচে। তাই মাথা কিঞ্চিত ঝুকিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে। আমি উপরের দিকে তাকানোর চেষ্টা করতেই আমার সেই ছোট্ট খুপরির কথা মনে পড়ে গেল।
হঠাৎ করেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। সেই অগুনতি অবিস্মৃত দিনগুলির স্মৃতি আমাকে তাড়িত করল। নেশার ঘোরে কি, না কি সেই স্মৃতির যন্ত্রণায় আমি ওই বর্ষার ভিতর বেরিয়ে পড়লাম। পিছনে তারা মশকরা করছিল। তারা বলছিল, এই বর্ষার মাঝে নারীদের দেখতে কতটা কমনীয় লাগে। কিন্তু রসবোধ তখন লোপ পেয়েছে। আমি হঠাৎ করেই যেন বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম।
সেদিন রাতে আবারও এই চিন্তা তীব্র হলো। রাতে যখন বিড়ি খেয়ে এক গেলাস ঠান্ডা পানি গিলে শুয়ে পড়লাম ঠিক তখনই, মনে হচ্ছিল আমার হৃদযন্ত্র থেমে যাচ্ছে, একটা শীতল অনুভূতি বুকের ভিতর ছড়িয়ে পড়ছিল, থেকে থেকে বজ্রপাতের মাঝে আমি আমার হৃদয়ের ধুকপুকানি শুনতে পাচ্ছিলাম, যা ছিল খুবই ধীর ও ক্ষীণ। আমার সমস্ত ঘোর তখন কেটে গেল। মনে হচ্ছিল, আসমান আর জমিনের ফারাক সরে গেছে, গায়েবি পর্দা উঠে গেছে এবং আমি আমার পাপ-পূণ্যের হিসেব দেখতে পাচ্ছি।
আমার স্বেচ্ছাচারিতা বাদ দিলে আমার ওপর যে জুলুম হয়েছে তার কাফফারা স্বরূপ আমার হিসেব কি সহজ হবার কথা না! আমি শেষ বিচার আর রাষ্ট্র-তৈরি আদালতের বিচারের সামঞ্জস্যতা আর স্বচ্ছতা নিয়ে ভাবলাম। ব্যাপারটা কি এরকম মানবের আদালতের আদলেই হবে? মনে হয় না। শেষ বিচারের পাপ-পূণ্যের হিসেব তো সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সাথেই হবে। সেখানে নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে কে-ই বা রক্ষা পাবে। ব্যাপারটা দমবন্ধ-করা এক অনুভূতি দেয়। আমার এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবন যাপনের ভিতর এমন কী ভালো কাজই বা আছে, যেটা আমাকে উতরে দিবে!
মৃত্যু চিন্তা হওয়ার একটা বড় কারণ এ-ও হতে পারে, এই সময়ে দুনিয়ায় মৃত্যু খুব আচমকাই এসে যায়। একেক সময় একেক ভাবে মানুষ মারা যায়। ছোটবেলায় যেমন বাচ্চারা পিপড়ের বাসা পায়ে পিষে ফেলে, শয়ে শয়ে পিপড়া মেরে ফেলে তেমনই মানুষ এরকম শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে মরছে। কেউ খুন করছে, কেউ যুদ্ধ, শান্তি, প্রগতির নামে বোমা মেরে মানুষ মারছে। টাকা কামাতে গিয়ে মানুষ মারছে, ক্ষমতা স্থায়ী করতে, ক্ষমতার রসদ জোগাতে গিয়ে মানুষ মারছে। এসবের সামনে আমার মতো কাউকে যে কতটা তুচ্ছ আর অর্থহীন মনে হয়, তা ভাবলে মৃত্যুকে সহজেই মেনে নিতে হয়।
এসব চিন্তায় রাত পার হয়ে যায়, আমি ঘুমিয়ে পড়ি। জোহরের সময় যখন উঠি তখন এগুলি আবার ফিরে আসে। দীর্ঘদিন যেভাবে যাচ্ছিল সেটার ব্যত্যয় হলো। আমার রুটিনে আবারও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। আমি সেদিন খুব পরিষ্কার ভাবতে পারছিলাম, আমার কী করা দরকার। ব্যাপারটা স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
নিজের এই দীনতা থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ অনুভব করছি। কারণ যে পরিস্থিতি আমি দেখতে পাচ্ছি, সেই একই মেকানিজমের কাজ, আমার মতো মানুষদেরকে মেরে ফেলা কতটা তুচ্ছ এটা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তো নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার মতো, তার ওপর সেই বন্দিত্বের অনুভূতি, অসহায়ত্ব, হায়াতের ওপর সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে পড়া সহ যাবতীয় অনুভূতি আর স্মৃতি, ইদুর, দেয়ালে হিসেব গণনার জন্য দাগ কেটে রাখা সহ নানাবিধ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জুলুম সয়ে-যাওয়া দিনগুলির তো একটা অর্থ থাকা উচিত। নয়তো এই জীবন কি অন্যরকম হতো না!
আমি আসলে কেমন ছিলাম এসবের আগে তা তো মনে করতে পারি না। যদি সবকিছু স্বাভাবিকভাবে আগাতো, আমি হয়তো পরিবার-পরিজন এবং সাধারণ মানুষের মতো উপার্জন ও ভোগ-বিলাসের মধ্য দিয়ে নিশ্চিন্ত একটা গাধার জীবন কাটিয়ে দিতেই পারতাম। লাজনা উপন্যাসের নায়কের মতো প্যান্ট খুলে স্যারের কাছে হোগা পেতে দিতাম চোদার জন্য। কিন্তু সেই সরল জীবনের স্বাদ তো আমি পাইনি। আমি একটা জটিলতর বাস্তবতা ও অভিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে গেছি। নতুন এই জীবনে এসেও উদ্ভ্রান্তের মত এদিক-ওদিক ছুটছি। কী করব, কী করা উচিত, ঠিক-বেঠিকের হিসেব আর নানা শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের আলাপ বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখলাম। কিন্তু সবকিছুই আসলে ভেঙে পড়ে। আরতিওমও তো নিউক্লিয়ার ওয়ারে হারিয়ে যাওয়া রাশিয়ায় কোনো আশা খুঁজে পায়নি। বা আলতাইর, এৎযিও আর আদাওয়ালেরাও তো টেম্পলারদের বিরুদ্ধে আজীবন শুধু লড়াই করে গেছে। আমি গেমসের কথা বলছি। বাস্তবেও চলমান সংঘাতে এত হিসেব-নিকেশ হয় না-কি! হয় অবশ্য, সেটা নীতি-নৈতিকতার না, সেটা কত বেশি ডেস্ট্রাকশন হলো, কত জন মরল আর বিপরীতে কার কত অস্ত্র আর অর্থের ক্ষতি হলো সেটাই মূখ্য হয়ে ওঠে। মনে হয়, নীতি-নৈতিকতা, শিল্প, সভ্যতা ইত্যাদি এই দীর্ঘ সংঘাতে এসে সমস্ত সংজ্ঞা ও তাত্ত্বিকতা হারিয়ে ফেলেছে।
আমার মতো না-মানুষ বা সেই ভণ্ড সুফির ভাষায় না-নাগরিকদের জন্য নিজের জীবনের হেফাজত খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। সবকিছুরই নানারকম ব্যাখ্যা হাজির করা যায়। যেমন, ফ্রিতে গেম খেলছি। হঠাৎ কিছু গেম ফ্রিতে আর দিচ্ছে না। ফ্রিতে খেলতে হলে এমন ক্রাক ইন্সটল করতে হচ্ছে যেগুলো আমার পিসির বায়োস ক্ষতিগ্রস্ত করে দিতে পারে। আবার যেমন, কিছুদিন পর ইলেক্ট্রিক ডিভাইসের আপডেট ভার্সন আসে আর সেগুলোর সুবিধা দেখলে নতুন ডিভাইস নিতে ইচ্ছে করে। ব্যাপারটা এমনভাবেই চলছে। একটা ধারাবাহিক দৌড়ের মতো। শুধু ছুটতেই হবে।
মুক্ত হওয়ার পর থেকে নানারকম কাজবাজ করেছি। নানারকম লোকের সাথেই মিশতে হয়েছে। যদিও স্পষ্ট করে কাউকে মনে থাকে না। কিন্তু বেশ কিছু আড্ডা আর আসরে তো নিয়মিত আসা-যাওয়া করেছি। এতকিছুর পর যা দেখেছি আর বুঝেছি, যে এতসব আলাপ, কর্মযজ্ঞ সবকিছুই একটা সিমুলেশনের মতো। যেমন রেড ডেড রেডেম্পশনে যখন সব শেষ হয়ে যায়। জন আর স্যাডি মাইকাকে খুন করে আর্থারের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিলো তখন খেলা শেষ। কিন্তু এরপর চাইলে খেলা যায়। জন চাইলে শিকার করতে পারে, ঘুরতে পারে আর মাতাল হয়ে পোকার খেলতে পারে। কিন্তু এসবের অর্থ কী? একটা নিশ্চিন্ত জীবন? কিন্তু সেটাই বা কতদিনের জন্য? যদি আমি আমার চাহিদাগুলো পূরণ করে ফেলি তখন আমার আর কী লক্ষ্য থাকতে পারে! পার্থক্য হলো গেমের ভিতর মিশন শেষ হয়ে যায় আর এই সিমুলেশনে মুসালসাল মিশন তৈরি হতে থাকে। এত মিশন তৈরি হয়, যাতে করে সেগুলি শেষ হতে হতেই মরে যায় মানুষ। মানুষের মাঝে একদল নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত রাখতে এই সিমুলেশন কন্ট্রোল করে, ম্যানিপুলেট করে।
এই কন্টিনিউয়াস সিমুলেশনের একটা দারুণ উদাহরণ হতে পারে একটি ছোট্ট ঘটনা। আমি যখন শারীরিক সক্ষমতাকে বড় করে দেখতাম, একজন চূড়ান্ত মানুষ অবশ্যই সক্ষম ও সুঠাম হবে, নানাবিধ শারীরিক কসরত করতাম আমি। এছাড়াও আমি কিছুটা বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠছিলাম। মাঝে মধ্যে টুকটাক লেখা প্রকাশ পেত এবং টুকটাক সভা-সেমিনারেও আমন্ত্রণ পেতাম। এমনই একটা কাজ শেষ করে আমি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। ট্রেন আসতে দেড় ঘন্টা মত বাকি। ভাবলাম এতক্ষণ বসে থেকে কী করব, তারচেয়ে হাঁটতে থাকি, এতে করে শারীরিক পরিশ্রমও হবে সময়টা কাজে লাগানোও হবে। তো এভাবে বিশ মিনিট হেঁটেই আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তখন মনে হয় একবারে মধ্য গ্রীষ্ম, দেড়টা বাজে। শেষে ভাবলাম, থাক ট্রেনে গিয়ে কাজ নেই বাসেই চলে যাই। সেই বাস যখন এয়ারপোর্টে এসে নামালো তখন দেখি আমি যে ট্রেনে আসতে চাইছিলাম সেটা দাঁড়িয়ে আছে।
ব্যাপারটা পরে এক সন্ধ্যায় বিভিন্ন স্তরে ওঠানামার সময় একজনের সাথে ডিছকাছ করলাম। সেও আমার সাথে একমত হলো, যে হ্যাঁ মেট্রিকের ক্লাসে এগুলি পড়ায় এবং এটা না কি পরিক্ষিত। এরপর সে জিজ্ঞেস করল আমি লং ওয়াক দেখেছি কি না। বললাম, জিনিসটা কী? সে বলল এটা একটা পোস্ট এপোকিলিপ্টিক মুভি। আমি বললাম, এটা কি স্টিফেন কিংয়ের লং ওয়াক না কি! সে অবশ্য এটা বলতে পারল না।
ভাবলাম এটা নিয়ে খোঁজ-খবর নিবো। সেদিন রাতে খেতে খেতে সিনেমাটা দেখলাম। দারুণ একটা কনসেপ্ট, আর হ্যা এটা স্টিফেন কিংয়েরই গল্পটা। আসলে লোকটা ভালোই লেখে। ইউনিক সব কনসেপ্ট ক্রিয়েট করে। মুভিটাতে যেটা দেখানো হয়েছে, একটা দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন। এই প্রতিযোগিতায় একজনই জিতবে। বাকি যারা থেমে যাবে তাদেরকে মেরে ফেলা হবে। সবারই ভিন্ন ভিন্ন কাহিনি থাকে। কিন্তু দেখা যায় সেগুলির পরিবর্তন ঘটে। কেউ আসছে প্রতিশোধ নিতে আর কেউ আসছে সমাজে একটা সুন্দর ব্যবস্থা চালু করতে। কারণ যে জিতবে সে টাকা-পয়সার পাশাপাশি একটা উইশ পাবে। কিন্তু সবশেষে তাদের ডিসিশন চেঞ্জ হতে থাকে। তারা দৌড়াতে থাকে আর বলে, এই মুহূর্তটাই হলো আসল। বাকি পিছে কী হলো আর সামনে কী হবে তাতে কিছু আসে যায় না, সেগুলি তেমন গুরুত্বপূর্ণও না। এই মুহুর্ত, আমরা দৌড়াচ্ছি; এটাই আসল। কিন্তু তারা জানে একজন একজন করে তারা মারা পড়বে এবং এই মুহূর্তটাও চলে যাবে। কিন্তু তারপরেও তারা এটাই ভাবছে যে সবকিছু শুধু এই মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। এর ভিতরে তাদের ভিতরে নানাবিধ পরিবর্তন ঘটছে।
মুভিটা আমি কয়েকবার দেখলাম। আমার বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক এরকমই। কিন্তু আমি ধরতে পারছি, এই মুহূর্তটাই সবকিছু না। আমার মৃত্যু হবে, আমি জীবনে কয়েকটা ধাপ পার করেছি। মানুষের ভাষ্যমতে আমি সীমানা পার হওয়ার যে দুঃসাহস দেখিয়েছিলাম, যার জন্য আমাকে দীর্ঘ সময় বন্দি করে রাখা হয়েছিলো তার তো কোনো অর্থ থাকে না। আমার যতদূর মনে পড়ে, আমি একটা ছোট্ট খুপরিতে ইঁদুরের সাথে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। এইটুকুই আমার স্মৃতি। বাকিগুলি মানুষ আমাকে বলে, আর এজন্যই আমাকে তারা কদর করে। অনেকে আমাকে এটাও বলেছে, তাদের যে সিস্টেমেটিক আন্দোলন এটার সাথে যদি আমি যুক্ত হই তাহলে আমি বেকাপ পাবো। চাইলেও আমাকে আবার এরকম বিপর্যয়ে পড়তে হবে না।
মুভিটা দেখার পর আমি বিচার-বিশ্লেষণ করার যথেষ্ট সময় পেলাম। কিছুদিনের জন্য আমার মাথাটা নতুন করে কাজ করতে শুরু করেছে এটা তো আগেই বলেছি। আমি এই মুহূর্ত আর অতীতের দায়িত্বের মধ্যখানে দোদুল্যমান। যে বিড়ালগুলো সীমানার ওইপাশে হারিয়ে গেছে তাদেরকে এখনো কেউ উদ্ধার করতে আগায় আসেনি। আবার মানুষ যেটা বলে, একাকী যারা এসব করতে যায় তাদেরকে বন্দি করা হয়। কারণ এগুলো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু যদি মানুষ যেটা বলছে সেটা সত্যি হয় তাহলে আমার তো এখন একটা দায়িত্বও দাঁড়ায়।
আমি মনে হয় নীতি-নৈতিকতার বেড়াজালে আটকে যাচ্ছি। ব্যাপারটা এমন, আমি একটা সার্কেলের ভিতর ঘুরছিলাম। আমার কাজ ছিলো বাসা পাল্টানো, চিন্তা করা, কিছু কাজ করা, জীবিকা নির্বাহ করা এবং সমস্ত কিছু থেকে মুক্তি পেতে নানান মজলিশে হাজিরা দেওয়া। এরপর দীর্ঘ নির্ঘুম রাত্রি যাপন করা। এখন মনে হচ্ছে নতুন করে এটার সাথে নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারটি জড়িয়ে পড়ছে।
অবশ্য এখন বর্তমানে এই আলাপটা আমাকে নিশ্চিন্ত একটা জীবিকার ব্যবস্থা করে দেবে। যেমন অনেক মানুষ আমাকে সমীহ করে তেমনি অনেক মানুষ আমাকে সমাজের জন্য ক্ষতিকর মনে করে। সমাজ মানে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র হলো সিমুলেশনের একটা অন্যতম মেকানিজম। এটা ওই রেসের মতোই। তুমি হাঁটতে থাকবে। থেমে গেলেই তোমাকে ফেলে দেওয়া হবে। যেমন পুরো বিশ্বে ক্ষমতার বিভাজন, সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষার জন্য একেক রাষ্ট্র দুর্বল আরেক রাষ্ট্রের উপর হামলা করে। যুদ্ধ হলো একটা প্রতিযোগিতা, টিকে থাকার জন্য আমাকে একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। যেখানে আমি নৈতিকতার দ্বন্দ্বে ভুগবো না, আবার আমার অতীতের সাথে একটা নতুন সম্পর্ক করার সুযোগ পাব।
নীতি-নৈতিকতার হিসেব অনেক জটিল। যেমন রাতে যখন ঘুমাই, মাঝে মধ্যে স্বপ্ন দেখি আমার হাতের মাঝ থেকে অনেকগুলি হাত বের হচ্ছে। আমার চারপাশ থেকে নানারকম চোখ বের হচ্ছে। আমার থেকে আজগুবি আকৃতির নানান প্রাণ বের হওয়ার চেষ্টা করছে আর আমার শরীরে এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছে। এটা নিয়েও আমি ভেবেছি। ব্যাপারটা এক লোকের কাহিনির মতো।
লোকটা অপরাধবোধে ভুগত। সে বিয়ের পরেও পরকীয়া করত। এর পিছনে সে খালি যুক্তি দাঁড় করাত। সে বলত, আমি প্রথম যে প্রেমটি করি, মেয়েটা এত সুন্দর মানে তার গলায় চুমু দিলে লাল হয়ে যেত। তারপর সে স্বীকার করে, যে শাওয়ারের নিচে মেয়েটির সাথে সঙ্গম করে। কিন্তু আবার বলে হ্যাঁ তখন আমরা বিয়ে করেছি। এরপরই আবার বলে, হ্যাঁ ও আমাকে দাগা দিছে এটা ঠিক। কিন্তু তখন আমি অন্তত আরও দুটা মেয়ের সাথে ঘুরতাম। এরপর জিজ্ঞেস করলে সে বলে, না ওই মেয়েকে আমি বিয়ে করিনি। আমি একটাই বিয়ে করেছি। এর পরপরই দেখা যেতো তার ফোনে কোনো মেয়ে ম্যাসেজ করেছে।
আমার ব্যাপারটাও ঠিক এমন হয়েছে। আমি একবার নীতি-নৈতিকতার হিসেব করি, আবার আমার স্মৃতি হাতড়াই। মানুষ আমাকে প্রভাবিত করে, আমি অতীত নিয়ে চিন্তা করি। নানারকম আলাপ-আলোচনা সামনে আসে আর আমার ভিতর নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। আমি সবকিছুর মাঝে একটা সামঞ্জস্যতা তৈরি করতে চাই। এজন্য নতুন একটা পরিবর্তন নিয়ে কাজ করব বলে ভাবছি। যদিও এখন গভীর রাত আর আমি মাত্রই এলোভেরার টবের পাশে দাঁড়িয়ে সর্বশেষ বিড়িটি টেনেছি। সুতরাং এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন আসলে সম্ভব কি না সেটা আমি জানি না। যেমন স্বপ্নে আমার দেহ থেকে বিভিন্ন আকৃতির দেহ বের হতে চায়, কিন্তু সেগুলো আটকে থাকে, লড়াই করে। এটা এক প্রকার শাস্তিই বলা যায়।