বই পড়িবার কায়দাকানুন

শোপেনহাওয়ার এই কাজটি করেননি, বরং আমি পাঠকের সুবিধার্থে প্রবন্ধটি দুটো অংশে এবং ছোট ছোট অনুচ্ছেদে ভাগ করেছি। এর প্রথম অংশে কোন ধরনের মানুষের জন্য বই পড়া জরুরি’, ‘কীভাবে বই পড়লে ফায়দা পাওয়া যায়’, ‘কারা বই পড়লে সত্যিকার অর্থে উপকৃত হয়’, ‘কোন কোন লেখকের বই পড়া অনর্থক’, ‘সাহিত্যের কোন ধারা পাঠককে প্রকৃতপক্ষে সমৃদ্ধ করে’—ইত্যাকার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। আর দ্বিতীয় অংশে তার সময়ের সাহিত্যচর্চা ও দর্শনচর্চার সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। কেয়ারির পাঠকগণ চাইলে দ্বিতীয় অংশ এড়িয়ে যেতে পারেন। প্রবন্ধের শেষে অনুবাদকের নোটযোগ করে দিয়েছি, সেটা পড়লে মূল পয়েন্টগুলো আরেকটু স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

আর জানিয়ে রাখা জরুরি : এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় ১৮৫১ সালে, Parerga und Paralipomena বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডে। প্রায় ১৭৫ বছর আগে লেখা এই প্রবন্ধ কেবল লেখকের দূরদর্শিতা প্রমাণ করে না, বরং আমরা যে পড়াশোনার জগতে একই স্থানে ঠাড় মেরে দাঁড়িয়ে আছে—এটাও প্রমাণ করে। 

মওলবি আশরাফ

সবার জন্য বই পড়া জরুরি না

অজ্ঞতা কেবল তখনই নিন্দনীয়, যখন এর সাথে ধন-সম্পদের দোস্তি থাকে। (মানে খোদ অজ্ঞ ব্যক্তি যদি ধনবান হন। কারণ) গরিব মানুষের হাত-পা অভাব আর নানা প্রকারের জরুরতে বান্ধা থাকে, কেমনে দুই পয়সা কামাই করা যায় এটাই তার একমাত্র ধেয়ান ও জ্ঞান হয়, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই চিন্তাই তার জ্ঞানের অভাব আড়াল করে ফেলে। কিন্তু যে সকল লোক একই সাথে ধনী আবার অজ্ঞ, তারা খাহেশ আর খেয়ালখুশির অনুসারী হয়ে ওঠে—তাদের জীবনযাত্রা মাঠে চড়ানো জন্তু-জানোয়ার থেকে আলাদা নয়। এবং এ কারণে তাদেরকে নিন্দা করা যায়, ধনদৌলত ও অবসরের মতো নেয়ামত পেয়েও তারা কোনো কাজে লাগাতে পারে নাই—যা করতে পারলে সত্যিকার অর্থে তাদের শান-শওকত আরও বাড়ত।

একই সাথে বই পড়া ও নিজের মস্তিষ্ক খাটানো

আমরা যখন বই পড়ি, তখন অন্য একজন আমাদের হয়ে চিন্তা করে দেয় : আমরা কেবল তার মস্তিষ্কজাত চিন্তার পুনরাবৃত্তি করি। বাচ্চাকাচ্চারা যখন নতুন লিখতে শুরু করে, তখন যেমন শিক্ষকের লিখে দেওয়া অক্ষরের ওপর তাদের হাত ঘোরাতে হয়; বই পড়ার ব্যাপারটা এমনই—চিন্তার বড় অংশটা আগেই একজন করে দিয়ে কেবল আমাদের দিয়ে তার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়। এই কারণে নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকার পর বই হাতে নিলে এক ধরনের সুকুন বা স্বস্তি অনুভূত হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, তখন আমরা সক্রিয়ভাবে চিন্তা করছি; বরং আমাদের মস্তিষ্ক সেসময় অন্যের চিন্তার খেলাঘরে পরিণত হয়। ফলে একজন পাঠক যদি দিনের প্রায় পুরোটা সময় বই পাঠে ব্যয় করে, আর মাঝখানের অবসর বা বিশ্রামের সময়ে যদি কোনো চিন্তা-ফিকির ছাড়া কাটায়, তবে ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র চিন্তার শক্তি হারিয়ে যায়—ঠিক যেভাবে সবসময় ঘোড়ায় চলাচল করা ব্যক্তি হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলে। বহু জ্ঞানীগুণী মানুষের বেলায় এমন পরিণতি হয়েছে, তারা পড়ে পড়ে আরও নির্বোধে পরিণত হয়েছে। কেননা সময় ও সুযোগ পেলেই বই পড়া, আর পড়া ছাড়া অন্য কিছু না করা, (মানে নিজস্ব চিন্তা-ফিকিরে সময় না দেওয়া) এই ব্যাপারটা মস্তিষ্ককে এমনভাবে অচল করে দেয়—একজন মজদুর সারাদিন গতর খাটলেও এতটা ক্লান্ত হয় না। কারণ মজদুর বেচারাও তো অন্তত আপন খেয়াল-ভাবনায় কিছু সময় কাটায়, কিন্তু চিন্তাহীন নিরলস পাঠে সেই ফুরসতটুকুও থাকে না। অবিরাম বাইরের কোনো চাপ থেকে মুক্ত হতে না পারলে একটি স্প্রিং যেমন তার স্থিতিস্থাপকতা হারিয়ে ফেলে; অন্যের চিন্তা যদি ক্রমাগত মনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে মনের অবস্থাও ঠিক তেমনই ঘটে। অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাবার যেমন শরীর খারাপ করে, মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত খাদ্যদানও তেমন চিন্তাশক্তিকে গলা টিপে খুন করে। আপনি যত বেশি পড়বেন, আপনার মনে তত কম তার ছাপ স্থায়ী হবে—মন তখন একখানা স্লেটের মতো হয়ে যাবে, যার ওপর বারবার একটি লেখার ওপর আরেকটি লেখা হয়েছে, কিন্তু কিছুই স্থায়ী হয়নি। কারণ আপনি যা পড়েছেন, তা ওপর গভীর চিন্তা করার জন্য আলাদা সময় দেননি, অথচ এই উপায় ছাড়া পঠিত বিষয়কে আত্মস্থ করার আর কোনো পথ নেই। যদি আপনি নিজের চিন্তাশক্তিকে কাজে না লাগিয়ে কেবল পড়ে যান, তবে যা পড়বেন তার কিছুই মনে গেঁথে বসবে না, বেশির ভাগই উধাও হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে মস্তিষ্কের খাবার শরীরের খাবারের মতোই, যা খাবেন বড়জোর তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ শরীরে থাকে, বাকি সব মলমূত্রের সাথে বেরিয়ে যায়।

এতসব কথার মানে এই—কাগজে লেখা চিন্তা সমুদ্রে বালির ওপর পায়ের ছাপের মতো : আপনি পথিকের পায়ের নিশানা দেখতে পাবেন, কিন্তু সে কী কী দেখেছে তা জানতে হলে আপনার প্রয়োজন তার চোখ।

যার গুণ আছে, বই কেবল তাকেই গুণধর বানায়

লেখকের বাকচাতুর্য, কল্পনাশক্তি, উপমা-চিত্রায়ণ-দক্ষতা, দৃঢ়তা, তিক্ততা, বীরত্ব, ঔদার্য, প্রকাশদক্ষতা বা প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, অভাবনীয় প্রতিতুলনা, অল্প কথায় অনেক ভাব প্রকাশ বা সহজ-সরল উপস্থাপন—এ ধরনের যত গুণই থাকুক না কেন, এমন কোনো তেলেসমাতি উপায় নাই যে আপনি বই পড়ে লেখকের সেসব গুণ আত্মস্থ করতে পারবেন। কিন্তু এই গুণগুলো যদি আগে থেকেই আমাদের মধ্যে থাকে, বই পড়ে আমরা হয়তো সেগুলোকে জাগিয়ে তুলতে পারি, এবং সচেতন হতে পারি। আমরা শিখতে পারি এই সহজাত গুণগুলোকে কোথায় কীভাবে ব্যবহার করা যায়, এবং আমাদের মাঝে এগুলো ব্যবহারের সাহস ও আগ্রহ তৈরি হয়। অন্যের লেখায় উদাহরণ দেখে আমরা নিজেদের এসব গুণের সার্থক প্রয়োগ ও প্রভাব যাচাই করতে পারি এবং এর সঠিক ব্যবহার রপ্ত করতে পারি। আর এই স্তরে পৌঁছানোর পরই বলা যায়—আমরা সত্যিকারভাবে সেই গুণগুলোর অধিকারী হয়েছি। কেবলমাত্র এই পদ্ধতিতেই বই আমাদের ফায়দা দেয়। অর্থাৎ আমরা কিছু গুণের বহুমাত্রিক প্রয়োগ শিখতে পারি, কিন্তু তার জন্য শর্ত হলো—সেই গুণ আগে থেকেই আমাদের মাঝে থাকতে হবে। অন্যথায় পড়ার মাধ্যমে আমরা কেবল যান্ত্রিক আর মরাধরা কিছু নিয়মনীতি শিখতে পারব, যা আমাদের ভাসা-ভাসা অনুকরণকারী ছাড়া অন্যকিছু বানাবে না।

বেশির ভাগ বই পড়ার উপযুক্ত না

যেভাবে পৃথিবীর ভূস্তরে প্রাচীনকালে বসবাসকারী প্রাণীদের সারিবদ্ধ চিহ্ন সংরক্ষিত থাকে, ঠিক তেমনই লাইব্রেরির তাকে সাজানো সারি সারি বইগুলোও অতীতের ভুলভ্রান্তি এবং সেগুলো খণ্ডন করার ইতিহাসকে ধারণ করে। মাটির নিচে চাপা পড়া সেই প্রাণীদের মতো এসব বইও একসময় প্রাণবন্ত ছিল এবং যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল; কিন্তু এখন তারা কঠিন ও জীবাশ্মের মতো স্থবির হয়ে পড়েছে এবং কেবল জীবাশ্মবিজ্ঞানীদের কৌতূহলের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। 

হেরোডোটাসের বর্ণনায় পাওয়া যায়, পারস্য সম্রাট জেরেক্সেসের তার দিগন্তজোড়া বিশাল সেনাবাহিনী দেখে চোখ অশ্রুতে ভিজে উঠেছিল, দুঃখপীড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন—আজ থেকে একশ বছর পর এদের কেউ বেঁচে থাকবে না। তেমনই নতুন প্রকাশিত বইয়ের দীর্ঘ তালিকা দেখে কেউ এই চিন্তা করে কাঁদতে পারে—আজ থেকে ১০ বছর পরে হয়তো এসব বইয়ের একটারও নাম শোনা যাবে না।

ভালো বই সংখ্যায় কম হয়

সাহিত্য মানুষের জীবনের মতোই : আপনি যেভাবে কোনো ভালো জায়গায় বেড়াতে গেলে দেখেন মানুষ গিজগিজ করছে, গরমের দিনের মাছির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ, সব নোংরা ও কাদা-কাদা করে ফেলছে; বইয়ের জগতে ‘খারাপ বইয়ের’ ফিরিস্তিও এমন অগুনতি। সাহিত্যের এইসব আগাছা শস্য থেকে পুষ্টি শুষে নেয়, এবং ক্ষেত নষ্ট করে।

যেসব ভালো বই এবং মহৎ উদ্দেশ্যে রচিত কাজ সাধারণ মানুষের মূল্যবান সময়, অর্থ ও মনোযোগের প্রকৃত হকদার, এমন সব ‘খারাপ বই’ তার জায়গা দখল করে রেখেছে—যেগুলো লেখা হয়েছে কেবল দুটো পয়সা উপার্জন আর পদ-পদবি বাগিয়ে নেওয়ার মতলবে। তাই এ ধরনের বই কেবল অন্তঃসারশূন্য নয়, বরং ভয়াবহ রকমের ক্ষতিকর। আজকালকার শতকরা নব্বই ভাগ বইয়ের মূল লক্ষ্য পাঠকের পকেট থেকে কয়েকটা পয়সা হাতিয়ে নেওয়া; আর এই লক্ষ্য হাসিলে লেখক, প্রকাশক, রিভিউ লেখক বা সমালোচকেরা একজোট হয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

যেভাবে বাজে বই বাজার দখল করে

আমি এখানে ধড়িবাজির একটি কৌশল আপনাদের বলি, স্বীকার করতেই হয় বহু পেশাদার সাহিত্যিক, ফরমায়েশি লেখক ও বহু গ্রন্থ প্রণেতারা এই কৌশল ব্যবহার করে সফল হয়েছে। তারা রুচিবোধ এবং যুগের প্রকৃত সাংস্কৃতিক মানদণ্ডকে একদমই তোয়াক্কা না করে এক ধরনের বই পড়ার ফ্যাশন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণে সবাই এখন একই তালে তাল মিলিয়ে কেবল ইদানীংকালের বইগুলো পড়ছে। এবং একই জিনিস পড়ার কালচার গড়ে তুলেছে। এই কাজের পেছনে উদ্দেশ্য হলো—অভিজাত মহলে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখা এবং আলাপ-আলোচনার রসদ জোগানো। Karl Spindler, Edward Bulwer-Lytton, Eugène Sue-র মতো একসময়ের জনপ্রিয় লেখকদের নিম্নমানের উপন্যাসগুলো মূলত এই উদ্দেশ্যই সাধন করে। পাঠকসমাজের জন্য এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী হতে পারে, তারা সবসময় অত্যন্ত সাধারণ মানের লেখকদের সর্বশেষ প্রকাশিত বা নতুন বই পড়তে বাধ্য হচ্ছে—যেসব বই শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য লেখা, এবং যার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। অথচ এর বিনিময়ে তারা সর্বকালের ও সর্বদেশের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের ধ্রুপদী সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে কেবল নামপরিচয়েই সীমাবদ্ধ থাকে। এমনকি সাহিত্য সাময়িকীগুলোও এক ধরনের বিশেষ ফন্দি হিসেবে কাজ করে, সেগুলো পাঠকদের মূল্যবান সময় কেড়ে নিয়ে তাদের আনাড়ি ও নিম্নমানের লেখকদের প্রতিদিনকার লেখাজোকায় নিমগ্ন রাখে, অথচ এই সময়টা তাদের প্রকৃত সংস্কৃতিচর্চার জন্য উৎকৃষ্ট সাহিত্যকর্মে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল।    

কেবল প্রচারণা দেখেই বই না পড়া

তাই পাঠাভ্যাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেকে সংযত রাখার ক্ষমতা। এই দক্ষতা তখনই আসে যখন কোনো বই হাতে তুলে নেওয়ার আগে ভেবে দেখি যে, ইদানীং সবাই এই বই পড়ছে বলেই আমি পড়তে চাচ্ছি কিনা। অর্থাৎ কোনো বই শুধুমাত্র এই কারণে হাতে না নেওয়া যে বইটি খুবই আলোচিত; যেমন রাজনৈতিক বা ধর্মীয় প্রচারপত্র, উপন্যাস, কবিতা, বা বিতর্ক সৃষ্টি করে পরিচিতি পাওয়া বই—যেগুলো প্রকাশের বছরেই বেশ কয়েকটি সংস্করণ বের হয়ে যায়। ভেবে দেখুন, যিনি আহাম্মকদের জন্য লেখেন, তিনি সবসময় একটি বড়সড় পাঠকগোষ্ঠী সম্পর্কে নিশ্চিত থাকেন। তাই বই পড়ার জন্য আপনার সময় সীমিত করার বিষয়ে সতর্ক হোন। এবং এই সময়টাকে একচ্ছত্রভাবে সেইসব বইয়ের ক্ষেত্রে লাগান, বিভিন্ন দেশের কালোত্তীর্ণ মহামনীষীগণ যেসব সৃষ্টিকর্মের জন্য জান কোরবান করেছেন—যারা কাজ করেছেন কেবল মানুষের কল্যাণে, যারা লিখেছেন জনতার কণ্ঠস্বরে জনতার উন্নয়নে। প্রকৃতপক্ষে তাদের কাজই আমাদের শিক্ষিত ও হাতে-কলমে তালিমপ্রাপ্ত করবে।

এমনিতে আপনি কখনোই মানহীন সাহিত্য খুব কম পড়তে পারবেন না, (কারণ এ ধরনের সাহিত্য খুবই মুখরোচক) আবার ভালো সাহিত্য খুব বেশি পড়তে পারবেন না। খারাপ বই বুদ্ধিবৃত্তিক বিষ (intellectual poison); তারা মন এ মননশীলতাকে ধ্বংস করে ফেলে। কারণ মানুষ সবসময় শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্মগুলো উপেক্ষা করে কেবল সমসাময়িক নতুন জিনিসের পেছনে ছোটে; তখন লেখকেরাও হালজমানার সীমিত চিন্তার বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়েন; আর এভাবেই প্রতিটি যুগ ধীরে ধীরে নিজের সৃষ্টি করা পাঁকে গভীরভাবে ডুবে যেতে থাকে।

প্রকৃত সাহিত্য চেনা জরুরি

সবসময়েই দুই ধরনের সাহিত্য সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলে, যদিও তাদের একে অপরের সাথে পরিচয় থাকে যৎসামান্যই; এর একটি হলো প্রকৃত সাহিত্য, অন্যটি কেবলই আপাত বা লোকদেখানো। প্রথমটি কালক্রমে স্থায়ী সাহিত্যে রূপ নেয়; যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান কিংবা কবিতার সাধনায় জীবন উৎসর্গ করেন, তারাই এর মূল কারিগর। এর গতি অত্যন্ত ধীর, শান্ত ও গম্ভীর; এমনকি একশ বছরে পুরো ইউরোপ মহাদেশে এ ধরনের কাজ সর্বসাকুল্যে ডজনখানেকও হয় না, অথচ সেই সৃষ্টিগুলোই যুগের পর যুগ টিকে থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের সাহিত্য নিয়ে মেতে থাকে সেইসব লোক, যারা বিজ্ঞান কিংবা কবিতা বেচে জীবন চালায়। এই ধরনের সাহিত্য অনেক শোরগোল ও সমর্থকদের চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্য দিয়ে ঝড়োবেগে ছুটে চলে। প্রতি বছর হাজার হাজার বই বাজারে ছাড়ে। কিন্তু কয়েক বছর না পেরোতেই লোকে জিজ্ঞাসা করে—কোথায় গেল সেগুলো? সেই যে এত জৌলুস, রাতারাতি আসা সাফল্য আর এত হইচই, তার কী হলো? এই ধরনের সাহিত্যকে বলা যায় ক্ষণস্থায়ী সাহিত্য, আর প্রথমটিকে প্রকৃত বা স্থায়ী সাহিত্য।

[২]

সাহিত্যের দুনিয়া গ্রহনক্ষত্রের উপকক্ষপথের মতো

রাজনীতির ইতিহাসে অর্ধশতাব্দী বরাবরই এক দীর্ঘ সময়; কারণ রাজনীতি যে উপাদান নিয়ে গঠিত তা সবসময়ই গতিশীল—সেখানে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু ঘটছেই। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক সময় এমন ৫০ বছরের সময়কাল একপ্রকার সম্পূর্ণ স্থবিরতার মধ্যে কাটে, তখন বিশেষ কিছুই ঘটে না, কারণ আনাড়ি চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে তো আর গণনায় ধরা যায় না। এর মানে, আপনি ঠিক সেখানেই পড়ে থাকেন, যেখানে ৫০ বছর আগে ছিলেন।

আমার কথার উদ্দেশ্য পরিষ্কার করতে মানবজাতির জ্ঞানের অগ্রগতিকে আমি একটি গ্রহের গতিপথের সাথে তুলনা করতে চাই। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির পর মানুষ সাধারণত যেসব ভুল পথে পা বাড়ায়, সেগুলো অনেকটা টলেমির জ্যোতির্বিজ্ঞান পদ্ধতির ‘এপিসাইকেল’ বা উপকক্ষপথের মতো; এই গোলকধাঁধায় একবার চক্কর দেওয়ার পর দুনিয়া ঠিক সেই জায়গাতেই ফিরে আসে, যেখান থেকে সে শুরু করেছিল। কিন্তু যেসব মহামনীষী প্রকৃত অর্থে মানবজাতিকে তার গতিপথে এগিয়ে নিয়ে যান, তারা সময়ের ব্যবধানে তৈরি হওয়া এই ভুল উপকক্ষপথের আবর্তে নিজেদের শামিল করেন না।

এ থেকেই বোঝা যায় কেন মরণোত্তর খ্যাতি প্রায়শই সমসাময়িক প্রশংসার বিনিময়ে খরিদ করতে হয়, আবার এর উল্টোটাও ঘটে। এমন এক ‘উপকক্ষপথ’ বা ভুল আবর্তের উদাহরণ হলো ফিখটে (Fichte) ও শেলিংয়ের (Schelling) শুরু করা দর্শন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছে হেগেলের হাতে তার একপ্রকার ব্যঙ্গাত্মক বিকৃত রূপে। এই আবর্তটি ছিল দর্শনের সেই সীমা থেকে বিচ্যুতি, যেখানে কান্ট শেষ পর্যন্ত একে পৌঁছে দিয়েছিলেন; আর আমি পরবর্তীতে ঠিক সেই বিন্দু থেকেই আবার কাজ শুরু করি যাতে একে আরও সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়। এদিকে এই মধ্যবর্তী সময়ে, আমার উল্লেখ করা ওই মেকি দার্শনিকরা এবং আরও কেউ কেউ তাদের সেই আবর্তের চক্কর শেষ করেছেন, যা কেবলই সমাপ্ত হলো; ফলে যারা তাদের এই পথযাত্রায় শামিল হয়েছিল, তারা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে যে তারা ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে যেখান থেকে সফর শুরু করেছিল।

এই পরিস্থিতিই বাতলে দেয় কেন প্রতি ৩০ বছর অন্তর বিজ্ঞান, সাহিত্য আর শিল্পকলা—সময়ের স্পন্দনে যা প্রতিফলিত হয়—সবই দেউলিয়া ঘোষিত হয়। সময়ে সময়ে যেসব ভুলভ্রান্তি দানা বাঁধে, তা এই ক’বছরে এমন এক উচ্চতায় গিয়ে ঠেকে যে কেবল নিজেদের অসারতার ভারেই সেই ইমারত ভেঙে পড়ে; অথচ একই সময়ে ওই ভ্রান্তির বিরুদ্ধে এক পাল্টা শক্তিও ভেতরে ভেতরে মজবুত হতে থাকে। ফলে এক ওলটপালট ঘটে যায়, যার পিছু পিছু প্রায়ই এক বিপরীতমুখী ভুলের জোয়ার আসে। ইতিহাসের এই পর্যায়ক্রমিক আবর্তনগুলোকে তুলে ধরাই হওয়া উচিত ছিল সাহিত্যের ইতিহাসের আসল উদ্দেশ্য; তবে এদিকে নজর দেওয়া হয় খুবই কম। তাছাড়া, এই সময়পর্বগুলো তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে বহু আগের জমানার তথ্যাদি সংগ্রহ করা বেশ মুশকিল হয়ে পড়ে, তাই নিজের প্রজন্মের হালহকিকত পর্যবেক্ষণ করাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান থেকে এই ঝোঁকের একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে ভের্নারের ‘নেপচুনিয়ান’ ভূতত্ববিদ্যার মাধ্যমে।

তবে আমি ওপরে দেওয়া উদাহরণটির ওপরই কড়া নজর রাখি, কারণ ওটিই আমাদের সবচেয়ে কাছের উদাহরণ। জার্মান দর্শনের ক্ষেত্রে কান্টের সেই উজ্জ্বল যুগের ঠিক পরেই এমন এক সময়ের আবির্ভাব হলো, যার উদ্দেশ্য মানুষকে যুক্তি দিয়ে সন্তুষ্ট করা নয় বরং ঠাটঠমক দেখিয়ে চমকে দেওয়া। সেখানে গভীরতা আর স্বচ্ছতার বদলে প্রাধান্য পেল চোখধাঁধানো আতিশয্য এবং এক বিশেষ ধরনের দুর্বোধ্যতা; সত্য সন্ধানের পরিবর্তে তা লিপ্ত হলো কূটচালে। এই তরিকায় দর্শনের কোনো উন্নতি হওয়া সম্ভব ছিল না; এবং শেষমেশ এই পুরো ঘরানা আর তাদের কর্মপদ্ধতি দেউলিয়া হয়ে পড়ল। কেননা হেগেল আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের ধৃষ্টতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল—সে তাদের চাতুর্যপূর্ণ অসার কথাবার্তার কারণেই হোক, কিংবা বিবেকহীন অতিপ্রশংসার জোরেই হোক, অথবা এই কারসাজির আসল উদ্দেশ্য একেবারে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কারণেই হোক—শেষ পর্যন্ত এই তামাশার ভণ্ডামি সবার সামনে ফাঁস হওয়া ঠেকানোর আর কোনো উপায় রইল না। এরপর বিশেষ কিছু খোলসা হওয়ার দরুন উঁচুমহলে তারা যে আনুকূল্য পেত তা যখন ছিনিয়ে নেওয়া হলো, তখন এই মতবাদ প্রকাশ্যেই হাসির খোরাক হয়ে দাঁড়াল। এ যাবৎকাল যত তুচ্ছ দর্শন দুনিয়ায় এসেছে, এটি ছিল সর্বাধিক শোচনীয়; এর পতন শুধু নিজেকেই ধ্বংসে নিক্ষেপ করেনি, বরং এর পূর্বসূরি ফিখটে ও শেলিংয়ের মতবাদগুলোকেও নিজের সাথে সাথে বদনামের অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে গেল। আর এভাবেই জার্মানির ক্ষেত্রে কান্ট-পরবর্তী অর্ধশতাব্দীর দার্শনিক অযোগ্যতা আজ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে; তা সত্ত্বেও জার্মানরা আজও বিদেশিদের তুলনায় নিজেদের দার্শনিক মেধা নিয়ে দেমাগ দেখায়; বিশেষত যখন এক ইংরেজ লেখক বিদ্রূপের সুরে তাদের ‘চিন্তাশীল জাতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

শিল্পকলার ইতিহাসেও আছে ভুল আবর্তে চলার নজির

শিল্পকলার ইতিহাস থেকে উপকক্ষপথ বা এই ভুল আবর্তের একটি সাধারণ উদাহরণ হিসেবে ভাস্কর্যের সেই ঘরানাটির দিকে নজর দিতে পারেন, যা গত শতাব্দীতে বার্নিনির (Bernini) নামানুসারে বেশ রমরমা হয়ে উঠেছিল; বিশেষত এর যে বিকাশধারা ফরাসিদেশে প্রাধান্য লাভ করেছিল, তার দিকে। এই ঘরানার আদর্শ প্রাচীন ধ্রুপদী সৌন্দর্য ছিল না, বরং ছিল অতি সাধারণ আটপৌরে প্রকৃতি। প্রাচীন কলার সেই সাদাসিধে ভাব আর লাবণ্যের পরিবর্তে এতে ফুটে উঠেছিল ফরাসি ‘মিনুয়েট’ নাচের আদবকেতা।

শিল্পকলার এই ঝোঁক তখন দেউলিয়া হয়ে পড়ল, যখন উইঙ্কেলমানের (Winckelmann) দিকনির্দেশনায় মানুষ আবার সেই প্রাচীন ধ্রুপদী ধারায় ফিরে এলো। চিত্রকলার ইতিহাসেও এই শতাব্দীর প্রথম সিকিভাগে এমন এক উদাহরণ পাওয়া যায়, যখন শিল্পকে নেহাতই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অনুভূতি প্রকাশের উপায় ও হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো; যার ফলে ছবির বিষয়বস্তু কেবল গির্জা-কেন্দ্রিক বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অথচ এসব বিষয়ের রূপায়ণ করছিলেন এমন সব চিত্রকর, যাদের অন্তরে বিশ্বাসের সেই প্রকৃত নিষ্ঠা বিন্দুমাত্র ছিল না। এক আজব মোহে পড়ে তারা ফ্রান্সেসকো ফ্রান্সিয়া (Francesco Francia), পিয়েত্রো পেরুজিনো (Pietro Perugino), অ্যাঞ্জেলিকো দা ফিয়েসোল (Angelico da Fiesole) এবং তাদের মতো অন্যদের অনুসরণ করতেন; এমনকি পরবর্তীকালের সত্যিকারের মহান উস্তাদদের চেয়েও এদের বেশি কদর করতেন। এই ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং সেই সময়ে কবিতাতেও একই ধরনের একটি উদ্দেশ্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় গ্যোটে (Goethe) তার রূপকধর্মী রচনা ‘ফাফেনস্পিয়েল’ (Pfaffenspiel) লিখেছিলেন। এই ঘরানাটিও খামখেয়ালি হিসেবে বদনাম কামালো এবং শেষমেশ দেউলিয়া হয়ে পড়ল। এর পর আবার প্রকৃতির দিকে ফেরার ঝোঁক তৈরি হলো, যা নানা পদের জীবনচিত্র আর সাধারণ দৃশ্যপটের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করল—যদিও মাঝেমধ্যে তা অশ্লীলতা বা সস্তা রুচির দিকেও পা বাড়িয়েছিল।

সাহিত্যের ইতিহাসে নিম্নমানের সাহিত্যিকরাই বেশি আলোচিত

সাহিত্যের ময়দানেও মানবমনের এই অগ্রগতি একই পথ অনুসরণ করে। সাহিত্যের ইতিহাস বলতে গেলে অনেকটা বিকলাঙ্গ বা কুৎসিত সব জিনিসের জাদুঘর; আর এদের সযত্নে সংরক্ষণ করার জন্য শুয়োরের চামড়ার বাঁধাই হবে সবচেয়ে মানানসই। যেসব অল্পসংখ্যক সৃষ্টি নিখুঁত সৌন্দর্যের ছাঁচে জন্ম নিয়েছে, তাদের এখানে তালাশ করার প্রয়োজন নেই। তারা আজও জিন্দা এবং দুনিয়ার সবখানেই তাদের দেখা পাওয়া যায়; তারা অমর এবং তাদের যৌবন চিরসবুজ। কেবল তারাই সেই জিনিস গঠন করে যাকে আমি ‘প্রকৃত সাহিত্য’ বলে অভিহিত করেছি। এই সাহিত্যের ইতিহাসে ব্যক্তির সংখ্যা নেহাত কম হলেও, কোনো সংকলন গ্রন্থ আমাদের শোনানোর আগেই শিক্ষিত মহলের মুখে মুখে শৈশব থেকেই আমরা তা জেনে নিই।

সাহিত্যের ইতিহাস পড়ার যে একরোখা বাতিক দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে যার উদ্দেশ্য বাস্তব কোনো জ্ঞান অর্জন নয়, বরং কিছু না জেনেই সব বিষয়ে কথার ফুলঝুরি ছড়ানো—তার দাওয়াই হিসেবে আমি লিশটেনবার্গের (Lichtenberg)-এর রচনার (দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০২) একটি অংশের দিকে ইঙ্গিত করতে চাই; যেটা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পাঠ করার মতো।

যারা জ্ঞানের কদর বোঝে, তারা ভালো মানের লেখা খুঁজে বের করে

আমার বিশ্বাস এই যে, বিজ্ঞান ও বিদ্যার ইতিহাসের খুঁটিনাটি নিয়ে অতিমাত্রায় মগ্ন থাকা, যেটা আমাদের বর্তমান সময়ের এক প্রকট বৈশিষ্ট্য, এটা জ্ঞানের নিজস্ব অগ্রগতির জন্য বড়ই ক্ষতিকর। এই ইতিহাস অনুসরণ করার মধ্যে একটা আনন্দ আছে বটে; কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি মনকে একেবারে খালি না রাখলেও নিজস্ব ক্ষমতাশূন্য করে ফেলে, কারণ এটি মস্তিষ্ককে তথ্যের ভারে বড্ড বেশি ঠাসা করে দেয়। যিনি নিজের মনকে কেবল পূর্ণ করার পরিবর্তে শক্তিশালী করতে, নিজের মেধা ও যোগ্যতার বিকাশ ঘটাতে এবং সামগ্রিকভাবে নিজের সক্ষমতা বাড়ানোর আশা রাখেন, তিনি দেখবেন জনৈক তথাকথিত ‘সাহিত্যিক’-এর সাথে জ্ঞানের এমন কোনো বিষয়ে আলাপ করার চেয়ে দুর্বলতাসৃষ্টিকারী আর কিছু নেই—যে বিষয়ে সে নিজে বিন্দুমাত্র চিন্তা করেনি, যদিও তার ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে হাজারও ছোটখাটো তথ্য তার জানা আছে। এটা অনেকটা এমন—আপনি ক্ষুধার্ত, আর সামনে বসে রান্নার বই পড়ছেন। আমি মনে করি, এই নামধারী সাহিত্যের ইতিহাস সেইসব চিন্তাশীল মানুষের কাছে কখনোই পাত্তা পাবে না, যারা নিজেদের মর্যাদা এবং প্রকৃত জ্ঞানের কদর বোঝেন। অন্যেরা তাদের বুদ্ধি কীভাবে খরচ করেছেন তা নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে, এই মানুষগুলো নিজেদের আকল বা বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাতেই বেশি পছন্দ করেন।

সবচেয়ে মুসিবতের কথা এই যে, আপনি লক্ষ্য করবেন, জ্ঞান যত বেশি সাহিত্য-গবেষণার রূপ ধারণ করে, জ্ঞানের প্রকৃত উন্নতির শক্তি ততটাই কমে যায়; কেবল বৃদ্ধি পায় সেই তথ্যের মালিকানার অহংকার। এ ধরনের লোকেরা মনে করে তারা প্রকৃত জ্ঞানীদের চেয়েও বেশি জ্ঞানের অধিকারী। আসলে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি কথা হলো—জ্ঞান কখনও তার অধিকারীকে অহংকারী করে না। কেবল তারাই অহংকারে ফুলে ওঠে, যারা নিজের যোগ্যতায় জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে অক্ষম হয়ে এর ইতিহাসের অন্ধকার দিকগুলো পরিষ্কার করতে ব্যস্ত থাকে, কিংবা অন্যরা কী করেছে তা বয়ান করতে পারে। তারা গর্ববোধ করে কারণ এই কাজটাকেই তারা জ্ঞানচর্চা বলে ধরে নেয়, অথচ বাস্তবে এটা এক ধরনের যান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়া কিছুই নয়। আমি চাইলে এর উদাহরণও দিতে পারতাম, কিন্তু তা হবে একেবারেই অরুচিকর কাজ।

সত্যিকারের সাহিত্যিকগণ ইতিহাসে বিস্মৃত

তবুও আমার ইচ্ছা এই যে, কেউ যদি সাহিত্যের একটি বিয়োগান্তক ইতিহাস লেখার হিম্মত দেখাতেন, যেখানে তুলে ধরা হতো সেইসব লেখক ও শিল্পীদের কথা—যারা আজ নিজ নিজ জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে গৌরবময় সম্পদ হয়ে উঠেছেন—বেঁচে থাকতে তাঁদের সাথে স্বজাতীয়রা কেমন ব্যবহার করেছিল। এমন ইতিহাস সামনে নিয়ে আসত সেই অবিরাম লড়াইয়ের চিত্র, যা প্রতিটি যুগে ও প্রতিটি দেশে ভালো আর খাঁটি জিনিসকে লড়তে হয়েছে মন্দ আর বিকৃতের বিরুদ্ধে। এটি শোনাত সেইসব মানুষের আত্মত্যাগের দাস্তান, যারা প্রকৃতপক্ষে মানবজাতিকে আলোকিত করেছিলেন, শোনাত সকল শিল্পের মহান উস্তাদদের কষ্টের কথা। এটি আমাদের দেখাত কীভাবে গুটিকয়েক বাদে তাদের প্রায় সবাইকেই তিলে তিলে যন্ত্রণার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল—তারা পাননি কোনো স্বীকৃতি, পাননি সহানুভূতি, জোটাতে পারেননি কোনো অনুসারী। কীভাবে তারা অভাব আর মুসিবতে জিন্দেগি কাটিয়েছেন, অথচ খ্যাতি, ইজ্জত আর দৌলত জুটেছে অযোগ্যদের কপালে। তাদের নসিব ছিল ঠিক ইসাউর মতো, যে যখন তার পিতার জন্য শিকারের তালাশে ছিল, তখন তার ভাই জ্যাকব তার পোশাক পরে ছদ্মবেশে এসে সেই আশীর্বাদ ছিনতাই করে নিয়ে গিয়েছিল। তবুও সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তাদের টিকিয়ে রেখেছিল কাজের প্রতি ভালোবাসা। এভাবে চলতে থাকে মানবতার শিক্ষক হওয়ার এই তিক্ত সংগ্রাম; অবশেষে যখন সেই সংগ্রামের সমাপ্তি ঘটে, যখন তার সামনে অমরত্বের জয়মাল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই মুহূর্ত আসে—যখন বলা যায়:

Der schwere Panzer wird zum Fluegelkleide

Kurz ist der Schmerz, unendlich ist die Freude.

ভারী বর্ম একসময় রূপ নেয় ডানাওয়ালা পোশাকে,

দুঃখ ক্ষণস্থায়ী—কিন্তু এই আনন্দ অনন্তকালের।

অনুবাদকের নোট :

১. প্রবন্ধের শুরুতেই শোপেনহাওয়ার বলছেন—আপনি যদি কামাই-রোজগার করা আমজনতা হন, আপনার জন্য শিল্পসাহিত্য চর্চা জরুরি না। কারণ এটা অবসরে চর্চার কাজ।

২. শিল্পসাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে পরিশীলিত করে তোলা, এটা তার জন্য জরুরি—যার অনেক টাকা-পয়সা আছে, সাংসারিক চাপ নাই, আর তার জীবন জন্তু-জানোয়ারদের থেকে ব্যাতিক্রম না।

৩. অনেক অনেক বই পড়ার আলাদা কোনো ফায়দা নাই। বই পড়ার চেয়ে চিন্তা করা বেশি জরুরি।

৪. বই পড়া মূলত অন্যের চিন্তা গ্রহণ করা, কিন্তু প্রতিটি মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতা আলাদা। তাই বাছবিচার ছাড়া অন্যের চিন্তা নেওয়া ব্যক্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর।

৫. মৌলিকভাবে বই মানুষকে কোনো উপকার দেয় না, কিন্তু যার গ্রহণ করবার মতো গুণ আছে, সে বই থেকে উপকার খুঁজে বের করে।

৬. জ্ঞানের উৎস হিসাবে চোখ বন্ধ করে বইকে গ্রহণ করার সুযোগ নাই। যুগে যুগে মানুষ অনেক ভুল করেছে, বই সেই ভুলগুলোর সাক্ষী।

৭. বাজারে ভালো বইয়ের চেয়ে খারাপ বইয়ের সংখ্যা বেশি। সাহিত্য পত্রিকাগুলো প্রচুর বাজে বইয়ের প্রমোট করে, বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডায় নির্দিষ্ট বই নিয়ে মাতামাতি হয়, তাই এসব থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

৮. বই পাঠের চেয়ে নিজেকে সংযত রাখা বেশি জরুরি। কেবল ভালো ও ‘না পড়লেই নয়’ বই পাঠ করা।

৯. যারা শিল্পসাহিত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, এমন সত্যিকারের সাহিত্যিকগণের ক্লাসিক বই পাঠ করা।

১০. সমকালীন সাহিত্যিকদের খপ্পড়ে না পড়া, এবং ভালো সাহিত্যকদের খুঁজে তাদের কদর করা।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *