নবিজির তাদাব্বুরে কুরআন

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ওপর কুরআনুল কারিম অবতীর্ণ হয়েছে। তাই কুরআনের সাথে ছিল তাঁর সবচেয়ে গাঢ় ও সুদৃঢ় সম্পর্ক। কুরআনকে তাঁর মতো করে আর কেউ ভালোবাসতে পারেনি। বুঝতেও পারেনি। কুরআনের সবরকম হক আদায় করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে এগিয়ে।

আল্লাহ তায়ালা নিজেই তাঁর রাসুলকে কুরআন বোঝানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন—

لَا تُحَرِّكۡ بِهٖ لِسَانَكَ لِتَعۡجَلَ بِهٖ اِنَّ عَلَیۡنَا جَمۡعَهٗ وَ قُرۡاٰنَهٗ   فَاِذَا قَرَاۡنٰهُ فَاتَّبِعۡ قُرۡاٰنَهٗ ثُمَّ اِنَّ عَلَیۡنَا بَیَانَهٗ

‘তাড়াতাড়ি ওহি আয়ত্ত করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা দ্রুততার সাথে সঞ্চালন করবেন না। নিশ্চয় এর সংরক্ষণ ও পাঠ করানোর দায়িত্ব আমার। কাজেই আমি যখন তা পাঠ করি, তখন আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন। তারপর তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার দায়িত্বও আমারই।’[1]

কুরআন সবচেয়ে বেশি বোঝার পরেও নবিজি নিয়মিত কুরআনের তাদাব্বুর করতেন। কুরআনের সাথে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতেন। কখনো কখনো কুরআনের ভেতর নিমগ্ন থেকে কাটিয়ে দিতেন সারাটা রাত। তিনি যেহেতু আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ, তাই ধর্মীয় প্রতিটি বিষয়ে আমাদেরকে দীক্ষা দিয়েছেন। কোন বিষয় কীভাবে করতে হবে, তার নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তাদাব্বুরে কুরআনও এর বাইরে নয়। তাঁর জীবনাচারের দিকে তাকালে আমরা তাদাব্বুরের অনেক দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। যেগুলো আমাদের বলে—একজন মুসলিম কীভাবে কুরআনের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে। কুরআনে প্রদত্ত আল্লাহ তায়ালার বার্তাগুলো হৃদয়ঙ্গম করবে। চিন্তা-ফিকিরের মাধ্যমে তা আত্মস্থ করবে।

হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক রাতে আমি আল্লাহর রাসুলের সাথে সালাত আদায় করছিলাম। তিনি সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা শুরু করলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, সম্ভবত একশো আয়াতের মাথায় তিনি রুকু করবেন। কিন্তু তিনি একশো আয়াত শেষ করে আরও সামনে এগোলেন। আমি ভাবলাম, তিনি হয়তো সুরা বাকারা দিয়ে সালাত শেষ করবেন। কিন্তু তিনি সুরা বাকারা শেষ করে সুরা আলে-ইমরান আরম্ভ করলেন। এটিও পড়ে শেষ করলেন। তারপর সুরা নিসা শুরু করে তাও পড়লেন। তিনি ধীরস্থিরতার সাথে তেলাওয়াত করছিলেন। যখন তাসবিহ যুক্ত কোনো আয়াতে ঢুকে পড়তেন, তখন তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) পাঠ করতেন। আবার যখন প্রার্থনার কোনো আয়াতে ঢুকে পড়তেন, তখন প্রার্থনা করে নিতেন। আর যখন আল্লাহর কাছে আশ্রয়গ্রহণের আয়াতে পৌঁছতেন, তখন আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতেন।

তারপর তিনি রুকু করলেন এবং রুকুতে سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ (আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি) বলতে থাকলেন। তাঁর রুকু ছিল প্রায় তাঁর দাঁড়ানোর সমান প্রলম্বিত। এরপর তিনি বললেন, سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ (যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে আল্লাহ তা শোনেন)। তারপর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন; রুকুতে যতক্ষণ ছিলেন, তার কাছাকাছি। তারপর সিজদায় গিয়ে পড়লেন سُبْحَانَ رَبِّيَ الأَعْلَى (আমার সুমহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি)। তাঁর সিজদার পরিমাণ ছিল দাঁড়ানোর কাছাকাছি।[2]

এই ঘটনায় আমরা বিশেষভাবে তিনটি বিষয় দেখতে পাচ্ছি—

১. নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সালাতে লম্বা সময় কুরআন তেলাওয়াত করতেন। কারণ নামাজের তেলাওয়াতই হচ্ছে সর্বোত্তম তেলাওয়াত।[3]

২. নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তারতিলের সাথে (ধীরস্থিরতা অবলম্বন করে) তেলাওয়াত করতেন। কেননা এটি তাদাব্বুরের জন্য সহায়ক।

৩. কুরআনের আয়াতে যে বিষয়গুলো বিবৃত হয়েছে, তার সাথে সাথে তিনি সাড়া দিতেন।

আউফ ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক রাতে আমি আল্লাহর রাসুলের সাথে নামাজে দাঁড়াই। তিনি সুরা বাকারা পাঠকালে যখন রহমতের আয়াতে পৌঁছেন, তখন সেখানে থেমে রহমত কামনা করেন। যখন কোনো আজারের আয়াতে পৌঁছেন, তখন সেখানে থেমে আজাব থেকে মাগফিরাত কামনা করেন। তারপর তিনি কিয়ামের সমপরিমাণ সময় রুকুতে অতিবাহিত করেন। সেখানে তিনি ‘সুবহানা যিলজাবারুতি ওয়াল মালাকুতি ওয়াল কিবরিয়াই ওয়াল আযমাতি’ পাঠ করেন। তারপর তিনি কিয়ামের সমপরিমাণ সময় সিজদায় অতিবাহিত করেন। সেখানেও উপরিউক্ত দোয়াটি পাঠ করেন। পরে পাঠ করেন এক একটি সুরা।[4]

এই ঘটনাতেও দেখা যাচ্ছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আয়াতে উল্লিখিত বিষয়ের সাথে সাড়া দিচ্ছেন। যখন যে বিষয়গুলো সামনে আসছে, সাথে সাথে তিনি প্রতিউত্তর করছেন। তাদাব্বুরের এ ধরনটি তাঁর থেকে অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া যেত। হাদিস শরিফে এ ধরনের আরও অনেক বর্ণনা রয়েছে।

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসুল যখন ‘সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা’ [তোমার সুমহান রবের নামের পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করো] পড়তেন, তখন তিনি ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আলা’ [আমার রব অতি মহান, পবিত্র!] পাঠ করতেন।[5]

নবিজির তাদাব্বুরের একটি ধরন ছিল, তিনি একই আয়াত বারবার পাঠ করতেন। কখনো কখনো তা রাতের শেষ অব্দি প্রলম্বিত হতো। এর মাধ্যমে সেই আয়াতে বর্ণিত বিষয়টিকে অন্তরের অন্তস্তলে গেঁথে নিতেন কিংবা ফরিয়াদ করার মতো বিষয় হলে ফরিয়াদ করতেই থাকতেন; যেন আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করেন। 

এই ধরনের একটি ঘটনা হজরত আবু জর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদিন আল্লাহর রাসুল সালাতে দাঁড়িয়ে ভোর হওয়া পর্যন্ত একটি আয়াত বারবার তেলাওয়াত করতে থাকেন। সেই আয়াতটি হলো—

إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

“আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, (অবশ্যই আপনি তার অধিকার রাখেন) কারণ তারা আপনারই বান্দা। আর যদি তাদের মাফ করে দেন, (আপনি তা পারেনও) কারণ আপনিই পরাক্রমশালী মহাবিজ্ঞ।”[6]

এই বর্ণনাটি আরও বিস্তারিত আকারে মুসনাদে আহমাদে[7] এসেছে।

আবু জর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসুল এক রাতে দাঁড়িয়ে সবাইকে নিয়ে ইশার নামাজ পড়লেন। নামাজ শেষে কজন সাহাবিকে দেখলেন পেছনে দাঁড়িয়ে তারা এখনো নামাজ পড়ছে। এজন্য তিনি তাঁর কামরায় চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর যখন দেখলেন, পেছনে আর কেউ নেই, নামাজ পড়ে প্রায় সবাই চলে গেছে, তখন তিনি তাঁর নামাজের জায়গায় এসে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিলেন। আমি গিয়ে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে গেলাম। কিন্তু তিনি আমাকে ইশারায় ডানে দাঁড়াতে বললেন। আমি তাঁর ডানে গিয়ে দাঁড়ালাম। এরপর ইবনু মাসউদ এলেন। তিনি এসে আমি ও আল্লাহর রাসুলের পেছনে দাঁড়ালেন। কিন্তু আল্লাহর রাসুল তাকে বাম দিকে দাঁড়ানোর ইশারা করায় তিনি বামে গিয়ে দাঁড়ালেন। এরপর আমরা দাঁড়িয়ে তিনজনই নিজেদের নামাজ পড়লাম। আল্লাহর ইচ্ছায় কুরআন থেকে যার যার মতো তিলাওয়াত করলাম। কিন্তু আল্লাহর রাসুলের একটি বিষয় আমাকে অবাক করে। খেয়াল করে দেখলাম, তিনি কুরআনের একটি আয়াতকেই বারবার পুনরাবৃত্তি করছেন। এমনকি এই আয়াত পুনরাবৃত্তি করতে করতেই এক সময় ফজর হয়ে গেল।

সকাল হওয়ার পর আমি ইবনু মাসউদকে ইঙ্গিতে গত রাতের ব্যাপারে আল্লাহর রাসুলকে জিজ্ঞেস করতে বলি। কিন্তু তিনি হাত ইশারায় বলেন, আল্লাহর রাসুল নিজ থেকে না বললে আমি কিছুই জিজ্ঞেস করব না। অগত্যা আমিই জিজ্ঞেস করে বসি—‘আমার মা-বাবা আপনার উপর কুরবান, হে আল্লাহর রাসুল! গত রাতে দেখলাম পুরো কুরআন আপনার হৃদয়ে রক্ষিত থাকা সত্ত্বেও সারাটা রাত কেবল একটি আয়াতই পুনরাবৃত্তি করছেন। অথচ আমাদের কেউ এমন করলে আমরা তার উপর চড়াও হতাম!’

আল্লাহর রাসুল এক বাক্যে বললেন, ‘আমার উম্মতের জন্য দোয়া করছিলাম।’

আমি বললাম, ‘দোয়ার ফলাফলে আপনাকে কী দেওয়া হলো?’

আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘আমাকে এমন কিছু দেওয়া হয়েছে, তা যদি তোমরা জেনে নাও, তাহলে তোমাদের অনেকেই নামাজ ছেড়ে দেবে!’

জানতে চাইলাম, ‘আমি কি এ কথা বলে লোকদের সুসংবাদ দেব?’

আল্লাহর রাসুল বললেন, ‘অবশ্যই, দিতে পারো।’

আল্লাহর রাসুলের অনুমতি পেয়ে আমি দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলাম। উমর তখন তার কাছে ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, এই ব্যাপারটি লোকেরা জানলে তারা ইবাদত ছেড়ে দেবে।’

এ কথা শুনে আল্লাহর রাসুল সাথে সাথে আমাকে ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন। আমি ফিরে এলাম। তিনি যে আয়াতটি বারবার পুনরাবৃত্তি করছিলেন, তা হলো—

إِن تُعَذِّبُهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُالْحَكِيمُ

“আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, (অবশ্যই আপনি তার অধিকার রাখেন) কারণ তারা আপনারই বান্দা। আর যদি তাদের মাফ করে দেন, (আপনি তা পারেনও) কারণ আপনিই পরাক্রমশালী মহাবিজ্ঞ।”[8]

একই আয়াত বারবার তেলাওয়াত করতে থাকা সংক্রান্ত তাদাব্বুরের একটি ঘটনা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল একবার সুরা তুর দিয়ে তেলাওয়াত শুরু করলেন। এরপর তিনি একটি আয়াতে পৌঁছে বারবার তা আবৃতি করতে থাকলেন। সেই আয়াতটি হলো—

 فَمَنَّ اللّٰهُ عَلَیۡنَا وَ وَقٰىنَا عَذَابَ السَّمُوۡمِ

“তারপর আল্লাহ আমাদের প্রতি দয়া করেছেন এবং আগুনের আজাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন।”[9]

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তাঁর সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। কেননা এতে মানুষের জন্য রয়েছে নানারকম নিদর্শন। এটি একজন মানুষকে সৃষ্টিকর্তার নিপুণতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাঁর কুশলতার অজানা রহস্যের দ্বার উন্মোচিত করে। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন—

وَ فِیۡۤ اَنۡفُسِكُمۡ ؕ اَفَلَا تُبۡصِرُوۡنَ

“আর (নিদর্শন আছে) তোমাদের মাঝেও, তোমরা কি দেখো না?”[10]

তিনি আরও বলেন—

أَفَلَا یَنظُرُونَ إِلَى ٱلۡإِبِلِ كَیۡفَ خُلِقَتۡ ، وَإِلَى ٱلسَّمَاۤءِ كَیۡفَ رُفِعَتۡ ، وَإِلَى ٱلۡجِبَالِ كَیۡفَ نُصِبَتۡ ، وَإِلَى ٱلۡأَرۡضِ كَیۡفَ سُطِحَتۡ

“তারা কি উটের দিকে তাকায় না? কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে?  আকাশের দিকে? কীভাবে তাকে উঁচু করা হয়েছে? আর পাহাড়ের দিকে? কীভাবে তাকে স্থাপন করা হয়েছে? জমিনের দিকে? কীভাবে তাকে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে?”[11]

তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর সৃষ্টি-নিদর্শন দেখে সেই সংক্রান্ত আয়াত স্মরণ করতেন। এতে সেই আয়াতের অর্থের সাথে চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণের সম্মিলন ঘটত। এটি আয়াতের প্রতি বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে থাকে। ঈমানকে বৃদ্ধি করে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার তিনি নবিজির সাথে রাত যাপন করেছিলেন। নবিজি শেষ রাতে উঠলেন। বেরিয়ে এসে তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। এরপর সুরা আলে-ইমরানের এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন—

اِنَّ فِیۡ خَلۡقِ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ اخۡتِلَافِ الَّیۡلِ وَ النَّهَارِ لَاٰیٰتٍ لِّاُولِی الۡاَلۡبَابِ الَّذِیۡنَ یَذۡكُرُوۡنَ اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوۡدًا وَّ عَلٰی جُنُوۡبِهِمۡ وَ یَتَفَكَّرُوۡنَ فِیۡ خَلۡقِ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ رَبَّنَا مَا خَلَقۡتَ هٰذَا بَاطِلًا ۚ سُبۡحٰنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

“নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে, বসে ও কাত হয়ে এবং আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে। (বলে) ‘হে আমাদের রব, তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করোনি। তুমি পবিত্র, মহান। তুমি আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করো।”[12]

এরপর ঘরে ফিরে এসে মেসওয়াক করলেন এবং ওজু করলেন। তারপর দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলেন। তারপর শুয়ে পড়লেন। তারপর আবার উঠে বাইরে রেরিয়ে গেলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন। তারপর ফিরে এসে মেসওয়াক করলেন, ওজু করলেন। তারপর দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলেন।[13]

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর আজাব এবং কেয়ামত সংক্রান্ত আয়াত ও সুরাগুলো নিয়ে অনেক তাদাব্বুর করতেন। কেয়ামত দিবসে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির অবতারণা হবে, তা কল্পনা করে ভীত হতেন। আল্লাহর কাছে সেদিনের দুরাবস্থা থেকে পানাহ চাইতেন। এই বিষয়গুলো নিয়ে অধিকহারে চিন্তা করা তাঁর বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করেছিল। বিষয়টি একটি হাদিস থেকে বুঝে আসে।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আবু বকর একবার আল্লাহর রাসুলকে বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেলেন!’ তিনি জবাবে দিলেন, ‘সুরা হুদ, ওয়াকিয়া, ওয়াল মুরসালাত, আম্মা ইয়াতাসাআলুন ও ইযাশ-শামসু কুওয়িরাত আমাকে বৃদ্ধ করে দিয়েছে!’[14]

মূলত এই সুরাগুলোর মধ্যে কেয়ামত ও আল্লাহর অবাধ্যতাকারীদের প্রতি প্রেরিত শাস্তির বিবরণ বিবৃত হয়েছে।

সুরা হুদ

কুরআনের ১১ নং সুরা হলো হুদ। এটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। ১১ নং পারার এই সুরাতে পূর্ববর্তী নবিগণ ও তাদের গোত্রের ওপর আল্লাহর প্রেরিত আজাব সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালিব মারা যাওয়ার পর যখন তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তখন এই সুরা নাজিল করে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। মানে মক্কার কাফের-মুশরিকরা তাঁর সাথে যা করছে, সেটা নতুন কিছু নয়। যুগে যুগে সব নবিদের সাথেই এমন দুরাচার করা হয়েছে। তবে তারা কেউই সফল হয়নি। আল্লাহ একসময় তাদের আজাব দিয়ে সমূলে বিনাশ করে দিয়েছেন।

সুরা ওয়াকিয়া

এটিও মক্কায় অবতীর্ণ একটি সুরা। ২৭ নং পারায় অবস্থিত। কুরআনের ৫৬ নং সুরাটিতে কেয়ামত দিবসের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। কীভাবে কেয়ামতের সময় ভূমিকম্প হবে। পাহাড়-পর্বত চূর্ণবিচূর্ণ হবে ইত্যাদি। সেই সাথে হাশরের মাঠে মানুষের আমলের হিসাব-নিকাশেরও কিছু বিবরণ আছে।

সুরা মুরসালাত

এই সুরাটিও মক্কি। ২৯ নং পারার শেষ সুরা এটি। কুরআনের ৭৭ নং সুরাটিতে কেয়ামতের পূর্বের বিভিন্ন নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। যেমন চাঁদ আলোহীন হয়ে যাওয়া৷ আকাশ ভেঙে পড়া। পাহাড়সমূহ টুকরা টুকরা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।  এছাড়াও আল্লাহর অবাধ্যতাকারীদের জন্য প্রস্তুত শাস্তির কিছু বিবরণও এই সুরাতে রয়েছে।

সুরা আম্মা ইয়াতাসাআলুন বা সুরা নাবা

এই সুরাটিও মক্কি। সুরার ধারাক্রম হিসেবে এটি ৭৮ নং সুরা। ৩০ নং পারা এই সুরার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। এতে কিয়ামতের বিভিন্ন সচিত্র দৃশ্যপট এবং জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা আছে।

ইযাশ-শামসু কুওয়িরাত বা সুরা তাকওইর

এই সুরাটিও মক্কি। সুরার ধারাক্রম হিসেবে এর অবস্থান ৮১ নং। ৩০ নং পারায় অবস্থিত এই সুরার শুরুর অংশে তুলে ধরা হয়েছে, কেয়ামতের সময় শিঙ্গায় ফুঁৎকারের কারণে কীভাবে গোটা দুনিয়া উলটপালট হয়ে যাবে। সূর্য-নক্ষত্র-পাহাড়-সমুদ্র সব ধ্বংস হয়ে যাবে।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সালাম নামাজে কুরআন তেলাওয়াতকালে অর্থের দিকে এত গভীরভাবে লক্ষ্য করতেন, আজাবের আয়াত আসলে তিনি প্রচুর কান্না করতেন। তাঁর কান্নার আওয়াজ থেকে মনে হতো যেন পাতিলে পানি ফুটছে।

আব্দুল্লাহ ইবনু শিখখির রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘একদিন আল্লাহর রাসুলের কাছে গিয়ে দেখলাম, তিনি নামাজ পড়ছেন। তখন তার বুক থেকে কান্নার এমন শব্দ বের হচ্ছিল, যেন চুলায় রাখা ডেগের পানি টগবগ করে ফুটছে।’[15]

ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিইয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘নবিজির কান্নায় কোনো শব্দ হতো না। তিনি কখনো বিলাপ করে কাঁদতেন না। তবে তাঁর দু’চোখ ভিজে যেত। ভেসে যেত কপোল। আর তাঁর ভেতর থেকে আসত ডেগের ফুটন্ত পানির মতো টগবগ আওয়াজ।’[16]

তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহর রাসুলের কান্না ছিল হাসির মতোই। কারণ তিনি শব্দ করে কাঁদতেন না, যেমন স্বশব্দে হাসতেন না কখনো। কেবল তার দুচোখ অশ্রু ঝরাত।’[17]

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এক রাতে আল্লাহর রাসুল উঠে গিয়ে ওজু করলেন। এরপর নামাজ পড়া শুরু করলেন। তিনি নামাজের মধ্যে এত বেশি কান্না করলেন, তাঁর বুক ভিজে গেল। তিনি নামাজে বসা অবস্থায়ও এত কান্না করলেন, তাঁর দাঁড়ি ভিজে গেল। এরপরও তিনি এত কান্না করলেন, জমিনও ভিজে গেল। একসময় বিলাল এসে ফজরের আজান দিল। তিনি যখন দেখলেন, আল্লাহর রাসুল এত কান্না করছেন তখন তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আপনার তো আগে পরের সকল গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। তবুও কেন আপনি এত কান্না করেন?’ এই কথা শুনে তিনি বললেন, ‘আমি কি শুকরগুজার বান্দা হব না?’[18]

অনেক সময় তিনি অন্য সাহাবিদের থেকেও তেলাওয়াত শুনতেন। শুনতে শুনতে তাদাব্বুরের কারণে তাঁর দুচোখ ভিজে যেত।  

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসুল আমাকে বললেন, ‘তুমি আমাকে সুরা নিসা পড়ে শোনাও।’ আমি বললাম, ‘আমি আপনাকে পড়ে শোনাব, অথচ তা আপনার ওপরেই অবতীর্ণ হয়েছে!’ তিনি বললেন, ‘আমি অন্যকে দিয়ে তা পড়িয়ে শুনতে চাই।’ আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাযিয়াল্লাহু  বলেন, ‘আমি সুরা নিসা পড়তে পড়তে এই আয়াতে চলে আসি—

فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَىٰ هَٰؤُلَاءِ شَهِيدًا

“আমি যখন প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে সাক্ষী হিসেবে পেশ করব তখন কী অবস্থা হবে!”[19]

মাথা তুলে দেখি, তাঁর দুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে।[20]


[1] সুরা কিয়ামা, আয়াত : ১৬-১৯

[2] সহিহ মুসলিম : ১৬৮৭

[3] আত-তিবিয়ান ফি আদাবি হামালাতিল কুরআন, ইমাম নববি, পৃষ্ঠা : ১২২ 

[4] সুনানে আবু দাউদ : ৮৭৩; সহিহ

[5] সুনানে আবু দাউদ : ৮৮৩; সহিহ

[6] সুরা মায়িদা, আয়াত : ১১৮

[7] মুসনাদে আহমাদ : ২১৪৯৫; সনদ হাসান; নবিজির তেলাওয়াত, শায়খ হামদান আল-হুমাইদি, পৃষ্ঠা : ৫৮-৫৯ 

[8] সুরা মায়িদা, আয়াত : ১১৮

[9] মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল, পৃষ্ঠা : ১৪৮; তাদাব্বুরুল কুরআনিল কারিম, আবদুল লতিফ তুইজিরি, পৃষ্ঠা : ২৩২ 

[10] সুরা যারিয়াত, আয়াত : ২১

[11] সুরা গাশিয়া, আয়াত : ১৭-২০

[12] সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১৯০-১৯১

[13] সহিহ মুসলিম : ৪৮৯

[14] সুনানে তিরমিজি : ৩২৯৭; সহিহ

[15] সহিহ ইবনে হিব্বান : ৭৫৩

[16] ফাতহুল বারি, ইবনে হাজার আসকালানি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২০৬; নবিজির তেলাওয়াত, শায়খ হামদান আল-হুমাইদি, পৃষ্ঠা : ৬৫

[17] যাদুল মাআদ, ইবনুল কাইয়িম

[18] সহিহ ইবনে হিব্বান : ৬২০

[19] সুরা নিসা, আয়াত : ৪১

[20] সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৬৮

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *