জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক পালাবদলের নাম নয়, বরং জুলাই আমাদের কাছে এক আত্মজাগরণ; যেখানে গোটা জাতি নিজেদের শেকড়, পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। যার ফলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হয়ে উঠেছিল একটি গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের মহাকাব্য। এই জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে বিশ্বব্যাপী ‘জেন-জি বিপ্লব’ বা ‘মনসুন রেভল্যুশন’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। জুলাইয়ের গভীরে প্রোথিত ছিল কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং নাগরিক অধিকার হরণের বেদনা। এই আন্দোলনের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ অথচ দীর্ঘকাল নেপথ্যে থাকা শক্তি ছিল বাংলাদেশের আলেম সমাজ, কওমি মাদরাসার লাখো শিক্ষার্থী এবং শাপলার নৈতিক প্রজন্ম।
জুলাই আন্দোলনের প্রথম দিকে মাদরাসা শিক্ষার্থী ও আলেম সমজের অবস্থান ছিল দ্বিধান্বিত। কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে রাজপথে নেমেছিলেন। আবার কেউ ছিলেন মাদরাসা, পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের চাপের মুখে নীরব। কিন্তু এই গণঅভ্যুত্থান ধারণ করেছিল গণমুখী চরিত্র; বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ তো আর এমনি এমনি রাজপথে নামেনি। যখন মানুষ তাদের ওপর হওয়া জুলুম-নির্যাতন, গুম-খুন, নাগরিক অধিকার, ভোটাধিকার হরণ এবং বিচারহীনতার প্রতিধ্বনি রাজপথে শুনতে পেয়েছিল, তখন তাদেরকে মোবাইলে ম্যাসেজ দিয়ে, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেফতার, গুলি করে বুক ঝাঁজরা করেও আটকে রাখা যায়নি।
২৪ সালের জুন মাসে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ১৮’র কোটা বাতিলের পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করার পর থেকেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে যখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দেন, তখন এই আন্দোলন একটি আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়। এই রাজাকার তকমাটি আলেম সমাজের কাছে ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ ও দলীয় বয়ানের মাধ্যমে দাড়ি-টুপিধারী আলেমদের এই তকমা দিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখা হয়েছিল। ফলে আলেম সমাজ এই আন্দোলনকে কেবল কোটা সংস্কারের লড়াই হিসেবে দেখেননি, বরং তারা একে জুলুমের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক এবং ন্যায্য প্রতিবাদ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় বিচ্ছিন্নভাবে ১৭ জুলাই থেকে মাদরাসা শিক্ষার্থী ও আলেম সমাজ ছদ্মবেশে অংশ নিলেও ১৯ জুলাই শুক্রবার সেটা অনেককে তীব্রভাবে ট্রিগার্ড করেছিল। মাঝখানে যখন আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়েছিল, সরকার এই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার জন্য আলেমদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকে বসেন। ৩১ জুলাই দোসর মিডিয়াগুলো প্রচার করতে থাকে, আলেমরা এই সরকারের পাশেই থাকবেন। হেফাজতে ইসলাম ১৮ জুলাই ৬ নিহত শিক্ষার্থীকে শহিদ ঘোষণা এবং রাজপথে নামার বিবৃতি দিলেও সেটা আশানুরূপ সাড়া ফেলেনি। সবার আশা ছিল সরাসরি রাজপথের কর্মসূচি। তবে আলেমরা রাজপথে নামার কারণে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে ঠেলে দেওয়ার বাস্তবতাও ছিল সামনে।
এরকম পরিস্থিতিতে সাধারণ আলেম সমাজ ‘আমারও কিছু বলার আছে’ শিরোনামের সংহতি সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেয়। ২ আগস্টে রাজপথের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এটি ছিল ইতিহাসের দাবি, আত্মপরিচয়ের প্রয়োজন এবং আলেম সমাজের শতাব্দীজুড়ে অবমূল্যায়নের জবাব। এই কর্মসূচির মাধ্যমে আলেমরা স্পষ্ট করে দেন—ইসলামি রাজনীতি শুধু দলীয় কর্মসূচি নয়, এটি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক সত্তার ইনসাফ ও জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার এক চিরন্তন লড়াই।
দুই.
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে সহিংস এবং গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র ছিল লাইটহাউজ খ্যাত যাত্রাবাড়ী অঞ্চল। এই অঞ্চলটি মূলত কওমি মাদরাসা অধ্যুষিত হওয়ার কারণে এখানে আন্দোলনের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ ছিল অভূতপূর্ব। ইতিহাস বলে, যখনই কোনো আন্দোলনে নৈতিক ভিত্তির প্রয়োজন পড়ে, তখন এই নৈতিক আদর্শসম্পন্ন প্রজন্মই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আসে। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধেও কিন্তু ইমাম-খতিব ও আলেম সমাজ মসজিদে-মিম্বরে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। অথচ তাদের সম্পর্কে সমাজে এই ন্যারেটিভ ছিল—দাড়ি-টুপি মানেই রাজাকার; আলেম মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি। এজন্য তরুণ আলেমরা এবার শীর্ষ আলেমদের চেইন অব কমান্ড ভেঙে রাজপথে নেমে যায়। এমনটা না হলে এই জেন-জি প্রজন্ম আলেম সমাজকে কেবল কটাক্ষ করে স্মরণ করত।
বিষয়টি বুঝতে পেরেই তরুণ আলেম সমাজ নড়েচড়ে বসে। ১৮ জুলাই তরুণ আলেমদের একটা বিবৃতি প্রকাশিত হয়; সেখানে এই আন্দোলন কেন ন্যায্য এবং নৈতিক, সে বিষয়ে তারা তাদের অবস্থান প্রকাশ করেন। তখন থেকেই মূলত তরুণ আলেমদের ভেতর একটা চেইন তৈরি হয়ে যায়। এরপর ইন্টারনেট অফ করে দিয়ে কারফিউ জারি করা হলেও তারা ফোনে ফোনে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন। কিন্তু যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় নতুন জুলাইয়ের সূচনা হয়, ধীরে ধীরে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের দিকে যেতে থাকে, তখনই সাধারণ আলেম সমাজের পক্ষ থেকে রাজপথের কর্মসূচি দেওয়া হয়। বিগত গণঅভ্যুত্থানগুলোর মতো এই অভ্যুত্থান থেকেও আলেম সমাজের অবদান মুছে ফেলা হবে, এই আশঙ্কায় দনিয়া কলেজের সামনে ‘আমারও কিছু বলার আছে’ শিরোনামে সমাবেশ ও মিছিল করে সাধারণ আলেম সমাজ।
৫ আগস্ট খুনি হাসিনার পতনের দিন যাত্রাবাড়ী এলাকাটি সম্পূর্ণভাবে আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদর নিয়ন্ত্রণে ছিল। তারা যৌথ বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র প্রতিরোধ উপেক্ষা করে গণভবন অভিমুখী জনস্রোতকে ত্বরান্বিত করেছিলেন। মাদরাসার শিক্ষার্থীরা কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে কাজ করত। একটি গ্রুপ যৌথ বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত, অন্য একটি গ্রুপ পুলিশের আক্রমণ প্রতিহত করত এবং আরেকটি গ্রুপ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকার বাইরের মানুষদের প্রবেশের ব্যবস্থা করত। সেইসাথে লং মার্চে আসা মানুষের জন্য তারা পানি, শরবত এবং শুকনো খাবার সরবরাহ করত—যা আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের মমত্ববোধ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এছাড়াও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন মাদরাসা এবং মসজিদগুলোকে তারা আশ্রয়কেন্দ্র ও খাবার তৈরির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এটি ছিল ২০১৩ সালে শাপলা আন্দোলনে নিজেদের পুরোনো কৌলেরই পুনরাবৃত্তি। ফলে যাত্রাবাড়ী এলাকার আন্দোলনে নিহতের একটি বড় অংশই ছিল হাফেজ এবং মাদরাসা শিক্ষার্থী। শহিদ খুবাইবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২১ বছরের এই যুবক যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনের সম্মুখভাগে ছিলেন এবং ৫ আগস্ট বিজয়ের দিন পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। তার বাবা আল্লামা আব্দুর রহমান উজানীর ভাষ্যমতে, খুবাইব নিজেই তার শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল।
এই গণঅভ্যুত্থানে ইসলামি রাজনৈতিক দল ও অঙ্গসংগঠনগুলো রাজপথে থাকলেও আলেম সমাজের উপস্থিতি ছিল ভিন্ন মাত্রায় চোখে পড়ার মতো। তারা কোনো দলীয় ব্যানারে নয়, বরং ইসলাম, ইনসাফ ও জনগণের পক্ষে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে সামনে আসেন। এই আলেম সমাজ নিজস্ব চিন্তা, স্বতন্ত্র কণ্ঠ এবং সত্যের সাহসী অবস্থানের মাধ্যমে একটি নৈতিক নেতৃত্বের সাইন তৈরি করেন—যা দলীয় ছায়া ছাড়িয়ে বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহর প্রতিনিধিত্ব করে। এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় স্বাক্ষর।
তিন.
একদফা দাবির এই পর্যায়ে আলেম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে বারুদের মতো বিস্ফোরক করে তোলে। বলতে দ্বিধা নেই, জুলাই অভ্যুত্থানের সফলতার পেছনে একটি বড় অনুঘটক ছিল ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের গণহত্যার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন স্পষ্টভাবেই বলেছেন, শাপলা চত্বরে হেফাজত কর্মীদের ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতনই ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
২০১৩ সালে আওয়ামী সরকার রাতের অন্ধকারে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়ে যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, তাকে পরবর্তী সময়ে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ‘গাছ কাটার তাণ্ডব’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আলেম সমাজকে প্রান্তিক ও অমানবিক হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল, কিন্তু ২০২৪ এ যখন আবার একই ধরনের রাষ্ট্রীয় নৃশংসতা শুরু হয়, তখন আলেম সমাজ আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি।
১৩, ২১, ২৪ সাল, বাংলাদেশ রক্তে লাল—এই স্লোগানটি ছিল মূলত শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রতিটি শহিদের রক্তের এক সুশৃঙ্খল ধারাবাহিকতা। মূলত আলেম-উলামা ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী সরকারের জুলুম-নির্যাতন এবং মৌলিক অধিকার হরণের ধারাবাহিকতা আর জুজুর ভয় দেখিয়ে আলেম সমাজের ওপর কঠোর দমন-পীড়নই তাদের ভূমিকাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছিল।
জুলাইয়ের শেষ দিকে যখন একদফা আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়, তখন সাধারণ আলেম সমাজ অভিনব কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। নাম ছিল ‘গাশত কর্মসূচি।’ গাশত শব্দটি মূলত ইসলামি দাওয়াত ও প্রচার কার্যক্রমের একটি পদ্ধতি, যা তাবলিগি জামাত এবং মাদরাসা পরিমণ্ডলে অত্যন্ত পরিচিত। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল—একদফার যৌক্তিকতা এবং রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে মানুষকে ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে সচেতন করা। গাশত কর্মসূচির মাধ্যমে আলেম সমাজ দলবদ্ধভাবে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন আদায় করতেন। এটি আন্দোলনকে কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে আধ্যাত্মিক ও ন্যায়বিচারের ইন্তিফাদায় রূপান্তরিত করে। ধর্মীয় আবহে রাজপথ ধরে রাখার এই কৌশলটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল, কারণ এটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল।
মাদরাসা শিক্ষার্থীরা নানান প্রতিবন্ধকতা ও কারফিউ থাকা সত্ত্বেও যথাসম্ভব নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে। সাধারণ আলেম সমাজের সংহতি সমাবেশ এবং এর আগে হাটহাজারী, বারিধারা, মিরপুর, উত্তরা, গাজীপুর ও চরমোনাইয়ের মতো মাদরাসাগুলোর শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসা মাদরাসামহলে অদৃশ্য ভয়ের দরজা ভেঙে দিয়েছিল। সাধারণ আলেম সমাজের আহ্বান ছিল, প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দলবদ্ধ হয়ে অথবা ব্যক্তিগতভাবে আশপাশের সব দ্বিধান্বিত মানুষকে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য যেকোনো ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যাবে। আলেম সমাজ ছিল মূলত আলেম ও দাঈ সমাজের প্লাটফর্ম, তাই তাদের কর্মসূচিগুলো গতানুগতিক রাজনৈতিক প্যাটার্নে না করে ধর্মীয় ও কালচারাল প্রতিনিধিত্বশীলতার জায়গা থেকে করার চেষ্টা করেছিল।
এ কারণে জুলাই বিপ্লবকে অনেক বুদ্ধিজীবী বাঙালির মুসলিম পরিচয়ের ‘তৃতীয় জাগরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কালচারাল ফ্যাসিজম বা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের মাধ্যমে গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের আদি ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার যে চেষ্টা করা হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থান ছিল তার বিরুদ্ধে এক সজোর প্রতিবাদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ পরিচালিত হতো ‘মুজিববাদ’ এবং প্রতিবেশী দেশের আধিপত্যবাদী কাঠামোর সমন্বয়ে। তারা দাড়ি-টুপি এবং কওমি মাদরাসাকে উগ্রবাদের সাথে সমার্থক করে তুলেছিল। কিন্তু জুলাইয়ের রাজপথে যখন দাড়ি-টুপিধারী আলেমদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে দেখা গেল বা হিন্দু মন্দির পাহারা দিতে, তখন সেই প্রোপাগান্ডার দেয়াল ভেঙে পড়ে। আলেম সমাজের এই বৌদ্ধিক ও নৈতিক উপস্থিতি একটি ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে।
সাংস্কৃতিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাঙালি মুসলমানের আত্মার জাগরণ ইতিহাসে তিনটি প্রধান ধাপে ঘটেছে। প্রথম জাগরণ ঘটেছিল ৮ম থেকে ১২তম শতাব্দীতে। নাড়োপা ও নিগুমা এবং পরবর্তী সময়ে সুফিদের আগমনের মাধ্যমে ইসলামি, বৈষ্ণব ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের এক সমন্বিত রূপ তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয়বার জাগরণ ঘটেছিল ঔপনিবেশিক যুগে। সেসময় বালাকোট আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন এবং ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মাধ্যমে ব্রিটিশ ও বর্ণবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করেছিল। তৃতীয়বার জাগরণ ঘটেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। যা ছিল স্বৈরাচার ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-আলেম-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থান। এই তৃতীয় জাগরণটি ছিল একই সাথে আধুনিকতা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল।
অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের এই বিশাল আত্মত্যাগ সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতে তাদের কথা সেভাবে উঠে আসেনি। জাতিসংঘ থেকে প্রকাশিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে জুলাইয়ের গণহত্যার অনেক চিত্র থাকলেও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো দীর্ঘদিনের নিপীড়ন এবং ১৩’র শাপলা চত্বরের রেফারেন্স না থাকাটা দুঃখজনক। এটাই প্রমাণ করে, বিশ্বব্যবস্থায় নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর অবদানকে মুছে ফেলার মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা এখনো বিদ্যমান। এভাবেই আমাদের প্রিয় জুলাই বিপ্লবকে পুনর্ব্যাখ্যা করে সম্ভাবনাময় নতুন বাংলাদেশপন্থার আকাঙ্খাকে টুটি চেপে ধরেছে দোসরদের পুরনো বয়ান ও কালচালার ফ্যাসিজম।
চার.
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন জুলাই-আগস্টের সহিংসতা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে অন্তত ১৪০০ মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার গুলি, বিশেষ করে ১২-গেজ শটগানের পেলেট ব্যবহার করে শিশু ও তরুণদের হত্যার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে ৫ আগস্টের পর হিন্দুসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রতিহিংসামূলক হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই হামলাগুলোর অধিকাংশই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত; এখানে ধর্মীয় কোনো ফ্যাক্ট ছিল না। অথচ আওয়ামী দোসর সুশীলরা একে ধর্মীয় কট্টরপন্থা হিসেবেই ফ্রেমিং করতে চেয়েছিল। নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে এসেছে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের নয়টি মৃত্যুর কোনোটিই ধর্মীয় কারণে হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় আলেম সমাজ এবং মাদরাসা শিক্ষার্থীরা মন্দির পাহারা দিয়ে এবং পাড়ায় পাড়ায় পাহারা বসিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিহত করেছেন। তা সত্ত্বেও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে একটি বড় ঘাটতি ছিল ১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার অনুপস্থিতি। আলেম সমাজ মনে করেন, শাপলা চত্বরের বিচারহীনতাই শেখ হাসিনাকে ২৪ সালে আরও বড় ধরনের গণহত্যা চালানোর সাহস জুগিয়েছিল। এত বড় একটা ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিস করাটা রাষ্ট্রীয় ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অংশ।
পাঁচ.
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আলেম সমাজের অন্যতম দাবি ছিল, রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পরিবর্তন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে একটি অকেজো এবং দলীয় আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে এনে কার্যকর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করা ছিল সময়ের দাবি। ফলে আমরা চেয়েছিলাম জুলাই পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন নতুনভাবে কার্যকর হবে। যেহেতু রাষ্ট্রের সিংহভাগ জনগণ মুসলমান। তাই এ জনপদকে সম্পূর্ণরূপে ইসলামবিমুখ ও সাংঘর্ষিক জীবনধারায় চালাতে গেলে রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা চলমান থাকবে। ইফাকে কার্যকর করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের বেসিক নলেজ, বিভিন্ন ধরনের কালচারাল মুভমেন্ট জোরালোভাবে চলমান থাকলে এ অস্থিতিশীলতা বহুলাংশে কমবে। কিন্তু তা হলো না।
আমরা চেয়েছিলাম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন আয়োজন সরকারি ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র আলেম সমাজকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মূল্যায়ন করবে। জঙ্গি নাটক ও ইসলামোফোব দূরীকরণে পদক্ষেপ থাকবে। সংবিধান সংস্কারে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস ফিরে আসবে। জুলাই সনদে এ দেশের মানুষের প্রধান মূল্যবোধ তথা ইসলামাচার উচ্চারিত হবে। কওমি সনদের স্বীকৃতি বাস্তবায়ন হবে। পাঠ্যপুস্তকে নিঃস্বার্থ এই প্রজন্মের আত্মত্যাগ, তাকওয়া ও সাহসিকতার গল্পগুলো উঠে আসবে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ সত্যিকারের নিরপেক্ষ সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠবে। মডেল মসজিদগুলো ইসলামি সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। কিন্তু এগুলোর কিছুই হয়নি।
জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফপূর্ণ ও ওয়েলফেয়ার স্টেট গঠনে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং আলেম সমাজের বৌদ্ধিক ও সামাজিক অবদানকে যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা জরুরি। শহিদদের রক্ত যেন বৃথা না যায় এবং নতুন বাংলাদেশ যেন তার রুহের সাথে বিচ্ছিন্ন না হয়—সেটাই হোক এই অভ্যুত্থানের মূল শিক্ষা। একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশের জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাস এবং আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যে একটি সম্মানজনক মেলবন্ধন এখন ইতিহাসের অনিবার্য দাবি।
আলেম সমাজ এই রাষ্ট্রের পরগাছা নয়, তারা এই মাটির শেকড়; বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক সত্তার পুনর্জাগরণকারী নৈতিক শক্তি। জুলাই অভ্যুত্থান এই চিরন্তন সত্যটিকেই আবার নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেছে।