হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার উৎসব

আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত রাজনীতি সচেতন। রাজনীতি তাদের জীবনমান কতটা বদলাতে পারল, সেটা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন আছে। তারপরও মানুষ রাজনীতি নিয়ে ভাবতে, গল্প-তর্ক করতে পছন্দ করে। কিন্তু বহু বছর ধরে দেশ থেকে রাজনীতি উধাও করে দেওয়া হয়েছিল। এই সময়ে রাজনীতির নামে যা চলেছে অপরাজনীতি। ফলে আস্তে আস্তে মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে যাচ্ছিল। রাজনীতির মূল অনুষঙ্গ হলো ভোট। অথচ সেই ভোটই চলে গিয়েছিল নির্বাসনে। টানা প্রায় দেড় দশক ভোটের নামে যা হয়েছে তা ছিল তামাশা। ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে পছন্দের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার মানুষের ছিল না। ফলে হারানো ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানুষের মধ্যে তীব্র হয়ে উঠেছিল। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে এটা নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে। বহু কারণের সঙ্গে ভোটাধিকার বঞ্চিত মানুষেরাও ফুঁসে উঠেছিল তখন। ফলে একটা সফল গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে একটা উৎসবমুখর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। বহু বছর পর ভোটের উৎসব দেখল দেশবাসী। ঈদের সময় যেভাবে মানুষ উৎসবের আমেজ নিয়ে ঢাকা ছাড়ে, এবার এর চেয়েও বেশি আনন্দের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষ ছুটে গেছে দেশের নানা প্রান্তে। একটি ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য তাদের চোখে-মুখে ছিল উচ্ছ্বাস। সামগ্রিক বিচারে এটাকে একটি সুন্দর নির্বাচন বলতে হবে। নির্বাচন নিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ থাকাটা স্বাভাবিক। তবে মোটাদাগে বড় কোনো অভিযোগ ছিল না। আমাদের দেশের বিগত দিনের নির্বাচনগুলোর যে চরিত্র, সেগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এবারের নির্বাচনকে শীর্ষে রাখতে হবে। কেউ কেউ এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করতে পারেন। কথিত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলতে পারেন। কিন্তু দিনশেষে আমরা একটি নির্বাচনকে ভালো বলব যেসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে, সব মানদণ্ডেই এবারের নির্বাচন ভালো ছিল। একটি নির্বাচন ভালো নাকি মন্দ, সেটা নির্ধারণ হয় দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণে। এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক শ পর্যবেক্ষক আসেন। দেশি পর্যবেক্ষকের সংখ্যাও কয়েক হাজার। তাদের কেউই এই নির্বাচনকে খারাপ বলেননি। কেউ ভোট দিতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে—এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি বললেই চলে। সবচেয়ে বড় হলো, সহিংসতামুক্ত নির্বাচন। আমাদের বিগত নির্বাচনগুলো যত শান্তিপূর্ণ ও অবাধই হোক, কয়েক ডজন করে প্রাণ ঝরেছে প্রতিটি নির্বাচনে। সেই অর্থে এবারের নির্বাচনে সহিংসতায় একটি প্রাণহানির খবরও পাওয়া যায়নি। তবে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা দুর্ভাগ্যজনক। 

অন্যান্য বারের চেয়ে এবারের নির্বাচনের চরিত্রটি ছিল ভিন্ন। আমরা গত তিন যুগ ধরে দেখে এসেছি, দেশের প্রধান দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করেই রাজনীতি আবর্তিত হয়। বাকি দলগুলোর বেশির ভাগই বড় দুটি দলের সঙ্গে থেকেছে। এবারই প্রথমবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই। জুলাই আন্দোলনে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত দলটির কার্যক্রম আপাতত নিষিদ্ধ রয়েছে। ফলে একসময়ের মিত্র বিএনপি ও জামায়াত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে ভোটের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। শুরুতে ভাবা হচ্ছিল, যেহেতু একই বলয়ের দুটি দলের মধ্যে নির্বাচন, হয়তো খুব একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে নির্বাচন পুরোদমে জমে উঠেছে। একদিকে বড় দল বিএনপি তাদের মিত্রদের নিয়ে নির্বাচনি মাঠে অবতীর্ণ হয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সমমনা দলগুলো নিয়ে একটি শক্তিশালী মোর্চা গড়ে তোলে। ফলে বিএনপি যতটা সহজে নির্বাচনি বৈতরণী পার হয়ে যাবে বলে ভেবেছিল সেটা হয়নি। জামায়াত শুরুতে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনসহ যে নির্বাচনি ঐক্য গড়ে তুলেছিল, সেটা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলে বিএনপির জন্য আরও কঠিন হতো ক্ষমতার মসনদে যাওয়া। তবে আসন সমঝোতাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে চরমোনাই পীরের দল বেরিয়ে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে ইসলামি শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হয়েছে বিএনপি। তাদের বিশাল জয়ের পেছনে অনেকাংশে ভূমিকা রেখেছেন হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীরা। এমন কয়েক ডজন আসন রয়েছে, যেখানে হাতপাখার ভোট জামায়াত জোটে যুক্ত হলে বিএনপির জন্য বিজয়ী হওয়া কঠিন হতো।

দুই.

এবারের নির্বাচন সামনে রেখে বেশ কিছু সংস্থা আগাম জরিপ চালায়। এসব জরিপে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল উঠে আসে। কোনো কোনো জরিপে বিএনপিকে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে রাখা হয়েছে। আবার কিছু কিছু জরিপে জামায়াত জোটকে বিএনপির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলতে দেখা গেছে। এসব জরিপ নিয়েও তুমুল বিতর্ক হয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে। তবে বেশির ভাগ জরিপেই ধারণা পাওয়া যাচ্ছিল, বিএনপি ক্ষমতায় ফিরবে। যেহেতু আওয়ামী লীগ ভোটের লড়াইয়ে নেই, এজন্য অপর বড় দল বিএনপি ক্ষমতায় যাবে—এটাই ছিল স্বাভাবিক। তবে একদিকে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের কিছু কর্মকাণ্ডে দলটির ইমেজে ভাটা পড়া, অন্যদিকে নানা সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াত ও তাদের মিত্রদের ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতা নির্বাচনকে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর্যায়ে নিয়ে যায়। তবে ব্যালটের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগের একটি ভোটব্যাংক যে আছে, সেটা সবাই স্বীকার করেন। সেই ভোটব্যাংকের একটি অংশ ব্যালটে প্রতিফলিত হবে, সেটাও জানা ছিল। কিন্তু সেই ভোটটা শেষ পর্যন্ত কার বাক্সে পড়বে, সেটা নিয়েই রয়ে গিয়েছিল সংশয়। শুরুতে আওয়ামী লীগের ভোটারদের বেশির ভাগ ভোট জামায়াত পেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করলেও শেষ পর্যন্ত সমীকরণ পাল্টে যায় নানা কারণে। আওয়ামী ভোটের সীমিত অংশ জামায়াত পেলেও বড় অংশটি পায় বিএনপি। 

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি কীভাবে আওয়ামী লীগের ভোট পেল, সেটা নিয়েও আছে নানা বিশ্লেষণ। আওয়ামী লীগ সরকারকে যে তরুণরা ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে তাদের একটা অংশের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। সেই দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোট করে। ফলে আওয়ামী লীগের ভোটের একটা বড় অংশ এই জোটে না পড়ার সম্ভাবনা আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল। তাছাড়া আওয়ামী লীগ যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে, ঠিক সেভাবে না হলেও কাছাকাছি পর্যায়ে ধারণ করার ঘোষণা দেয় বিএনপি। ফলে আওয়ামী লীগের একটা অংশের ভোট পড়ে বিএনপিতে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পেছনে জামায়াত-এনসিপির দাবি থাকলেও বিএনপি ছিল ভিন্ন অবস্থানে। বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দলকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধের বিরোধিতা করে আসছে শুরুর দিন থেকেই। ফলে এদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কোনো না কোনোভাবে ফেরত আসতে বিএনপির সহযোগিতা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা থাকেনি। আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপির বাক্সে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো জামায়াতের হাইপ। নির্বাচনের কয়েক দিন আগ থেকে নানা মহলে একটি হাইপ ওঠে—জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ক্ষমতায় চলে আসতে পারে। এটা টেনশনে ফেলে দেয় আওয়ামী লীগ, প্রগতিশীল ও সুশীল সমাজকে। এমনকি গণমাধ্যম ও ব্যবসায়ী মহলেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তারা জামায়াতের ব্যাপারে আস্থাশীল হতে পারছিলেন না। সত্যিই জামায়াত ক্ষমতায় চলে এলে কী হবে তাদের শাসনব্যবস্থা! তারা কি শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করবে! তারা কি দেশে তালেবানের মতো শাসন কায়েম করবে! নারীদের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কী হবে। এ ধরনের নানা জিজ্ঞাসা ছিল জনমনে। সুতরাং চেনা বিএনপিকে মন্দের ভালো হিসেবে এই শ্রেণিটি বেছে নেয়। তারা বিএনপিকে ভালোবেসে ভোট দেয়নি। মূলত জামায়াতকে ঠেকানোর কৌশল হিসেবে আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল ও সুশীল সমাজ বিএনপিকে বেছে নেয়। এতেই বাজিমাত করে বিএনপি।

তিন.

দুই শতাধিক আসনে জয়ী হয়ে প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। জামায়াত জোট অনেক হাইপ তুলতে সক্ষম হলেও তাদের আসন সংখ্যা ৭৭টিতে থেমে গেছে। ক্ষমতায় চলে যাওয়ার হাইপের সঙ্গে তুলনা করলে জামায়াত ফলাফল খারাপ করেছে। কিন্তু জামায়াতের নীতিনির্ধারকদের এটা ভালোমতোই জানা ছিল—জামায়াত যত ভালোই করুক, ক্ষমতায় যাওয়ার মতো আসন তারা পাবে না। জামায়াত নেতাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও সেটা ফুটে উঠেছে। জামায়াত ক্ষমতায় চলে যাবে বিশ্বাস করলে ঢাকায় তাদের নেতাকর্মীদের ভোট নির্দিষ্ট কয়েকটি আসনে স্থানান্তর করত না। তাছাড়া জামায়াতের জনসমর্থন অনেক বেড়েছে বটে, কিন্তু এখনো তারা বড় দল হয়ে উঠতে পারেনি। দেশের সব জনপদে তাদের সমান শক্তি-সামর্থ্য বিস্তৃত না। আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা—এই তিন বিভাগে জামায়াত ভালো করবে। ফলাফলে দেখা গেছে, বেশি ভালো করেছে খুলনায়। রংপুরেও মোটামুটি ভালো করেছে। কিন্তু রাজশাহীতে প্রত্যাশিত আসন তারা পায়নি। অথচ আসন সংখ্যার দিক থেকে রংপুর বা খুলনা অনেক পিছিয়ে। সিংহভাগ আসন ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। এই দুই বিভাগে জামায়াত তেমন ভালো করবে না—সেটা তাদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেও জানা গেছে। এবার জামায়াত সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করেছে সিলেট বিভাগে। ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগেও তারা ভালো করতে পারেনি। তাদের উদাহরণটা এভাবে দেওয়া যায়—কোনো পরীক্ষার্থী পাঁচটি প্রশ্নের মধ্যে দুটি প্রশ্নের উত্তর খুব সুন্দর করে দিল। কিন্তু বাকি তিনটি প্রশ্নের উত্তরে খুবই খারাপ করল। সেই পরীক্ষার্থী ভালো ফলাফলের আশা করতে পারে না। জামায়াতের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা কয়েকটি অঞ্চলে সীমিত। সারাদেশে তাদের সক্ষমতা ততটা নেই, যতটা বিএনপি বা আওয়ামী লীগের আছে। তাছাড়া এবার যাদের সঙ্গে তাদের জোট হয়েছিল, তাদেরও কারও তেমন কোনো ভোটব্যাংক ছিল না। তাদের বাইরে সবচেয়ে বড় ভোটব্যাংক ছিল ইসলামী আন্দোলনের। কিন্তু এই দলটিকে শেষ পর্যন্ত জোটে ধরে রাখা যায়নি। ফলে ১১ দল নাম হলেও প্রায় ৯০ ভাগ শক্তিই ছিল জামায়াতের। তারা তাদের শক্তির সর্বোচ্চটুকু প্রয়োগ করেছে। তাদের প্রাপ্তিও কম নয়। আসনের বিচারে আঠারো থেকে বেড়ে সত্তরের কাছাকাছি চলে গেছে এককভাবে। ভোটের হারেও তাদের অগ্রগতি হয়েছে প্রায় তিনগুণ। সবচেয়ে বড় হলো, এবার তারা রাজধানীসহ এমন কিছু এলাকায় খাতা খুলতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে খাতা খোলার কথা কোনোদিন চিন্তাই করেনি। জামায়াত তাদের এই উত্থান ধরে রাখতে পারলে একটা সময় ক্ষমতার স্বাদও পেতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগের মতো বড় দল ফিরে এলে তাদের এই অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে না বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। 

বিএনপি গত ১৭ বছর নানা জুলুম-নিপীড়নের শিকার হয়েছে। দলটির প্রধানসহ লাখ লাখ নেতাকর্মী এর ভুক্তভোগী। এবার জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে। ২০ বছর আগে দলটি ক্ষমতায় ছিল। মাঝখানের এই লম্বা সময়ে দুনিয়া অনেক পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে মানুষের মনস্তত্ত্ব। সবচেয়ে বড় হলো, তরুণ প্রজন্মের মন-মানসিকতা বড়ই বিচিত্র ধরনের। এই জেন-জি প্রজন্মই কিন্তু শেখ হাসিনার মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসকের মসনদ উপড়ে ফেলেছে। সুতরাং সময়কে ধারণ করে, নতুন প্রজন্মের চাহিদা বুঝে বিএনপিকে ক্ষমতার চর্চা করতে হবে। না হলে তাদের পরিণতিও ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *