জাতীয় সংসদ নির্বাচন : অভিজ্ঞতার বয়ান

মিছিলপোস্টারবিস্ময়

বাড়ি ছেড়ে আমি তখন মাদরাসায়। আব্বার সঙ্গেই থাকি। জাওয়ার ইমদাদুল উলুম মাদরাসা, তাড়াইল, কিশোরগঞ্জ। বয়স কেবল নয় বছর। সময়টা ১৯৮৮ সাল। হঠাৎ একদিন ফজরের পরে দেখি, মাদরাসার টিনের বেড়ায় রংবেরংয়ের পোস্টার সাঁটানো। এগুলোর কোনোটা সাদা-নীল, কোনোটা সাদা-কালো। গায়ে নানাবিধ মার্কা আঁকা, সাথে ভোট দিন অথবা ভোট চাই লেখা। তখনো খুব একটা পড়তে পারি না আমি। তবে মার্কাগুলো ঠিকঠাক চিনতে পারি—কলসি, তলোয়ার, হুক্কা, লাঙ্গল, ছাতা ইত্যাদি। 

ভোট দেওয়া বা ভোট চাওয়ার বিষয়টা কী, আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।আব্বা ইশরাক শেষে মসজিদ থেকে বের হলে তার কাছে জানতে চাইলাম। তিনি বেশ সময় নিয়ে বুঝালেন। কী বুঝেছিলাম, কতটা বুঝেছিলাম, এখন আর মনে নাই। তবে তলোয়ার মার্কার একটা পোস্টারের আবদার করেছিলাম আব্বার কাছে। একজন সে কথা শুনে কিছুক্ষণ পর বেশ কিছু মার্কার পোস্টার আমাকে এনে দিয়েছিলেন। 

এর মধ্যেই নির্বাচন, পোস্টার, মাইকিং, মিছিল আর প্রার্থীদের লোকজন নিয়ে ভোট চাওয়ার ব্যাপারটা উপভোগ করতে শুরু করেছি। ক্লাসমেটদের কেউ কেউ মিছিলে যায়। সুপার বিস্কুট পাওয়া যায় পাঁচটা করে। বিষয়টা আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে। মিছিলে গেলেই পাঁচটা সুপার বিস্কুট! মানে চার আনা! আমি তো দু-তিনদিন পরে একবার পাঁচটা সুপার বিস্কুট পাই।

মনে মনে একবার মিছিলে যাওয়ার চিন্তা করছি। কিন্তু আব্বাকে বলার সাহস পাচ্ছি না। এমন সময় একজন প্রার্থী মাদরাসার অফিসে এসে আব্বার হাতে কক্সি বিস্কুটের একটা পোঁটলা দিয়ে বললেন, ‘পোলারে দিয়েন। বাড়িতে থাকলে তো মিছিলে-টিছিলে যাইত। এখানে তো যায় না।’ আব্বা কিছুটা ইতস্তত করে নিলেন। আমি খুশি হলাম খুবই।

তখনো নির্বাচন উপলক্ষ্যে ছুটির বিষয়টা মাদরাসায় চালু হয়নি। ফলে আমিও বাড়িতে যাইনি। আবার আব্বার কাজ ছিল নির্বাচনে ডিউটি পালন করবেন। নির্বাচনী মুখরতা দেখতে দেখতে নির্বাচন চলে এলো। নির্বাচনের দিন সকালে লজিং বাড়ি থেকে খাবার আনতে যাই। মাদরাসায় আসার পথে দেখি রাস্তার দুপাশে দুই দল বল্লম, রামদা, কিরিচ ইত্যাদি নিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁকডাক করছে। আমি ও আমরা কিছুটা ভয় নিয়ে দ্রুত মাদরাসায় চলে আসি। 

দুপুরে আবার খাবার আনতে গিয়ে দেখি লোকজন দৌড়াচ্ছে। ব্যালট বাক্স নাকি নিয়ে গেছে কোনো প্রার্থীর লোকেরা। মারমার কাটকাট অবস্থা। খাবার নিয়ে ফিরতে ফিরতেই দেখি, কয়েকজনের শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। লোকজন রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে কয়েকজন বড় ভাই আমাদের নিয়ে দ্রুত মাদরাসায় ফেরেন।

তখন থেকেই আমার মনে নির্বাচন মানেই ব্যালট বাক্স ছিনতাই, রামদা, বল্লম ইত্যাদির একটা মহড়া মনে হতো। এরপর ৯১-এর নির্বাচনে বাড়িতে ছিলাম। তেমন কিছুই দেখিনি। দেখেছি মানুষ ভোট দিতে যাচ্ছে। কেন্দ্রের আশপাশে নানারকম দোকান। আমরা সেসব দোকানে যাচ্ছি। জিলাপি, ডালবড়া কিনছি। কেউ কেউ খেলনা কিনছে। সহিংস নির্বাচন আর অহিংস নির্বাচন দুইটাই খুব কম সময়ের ব্যবধানে কম বয়সে দেখেছিলাম।

নির্বাচনী সহিংসতার খতিয়ান

বাংলাদেশের নির্বাচনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা বেশি হয়। বিরোধ আর ঝগড়াটা হয় চেয়ারম্যান আর মেম্বার বানানো নিয়েই। এমনও দেখেছি—প্রার্থী যে এলাকার, সেই এলাকার এক-দুটি কেন্দ্রের ফলাফল সবার শেষে দেওয়া হতো। কাকতালীয়ভাবে সেই প্রার্থী অল্প ভোটের ব্যবধানে পাশও করতেন। সেসব নিয়ে আবার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়াও চলত। তবে আজকের এই লেখায় আমরা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটা সহিংসতার খতিয়ান উল্লেখ করার চেষ্টা করব।

বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী—‘১৯৯১-২০২৪ সাল পর্যন্ত আটটি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ও প্রাণহানি হয়। সেই নির্বাচনে সহিংসতায় মারা যায় ২৪৮ জন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ৪৯ জন, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৫১ জন, ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে ৪৫ জন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২১ জন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৪২ জন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৬১ জন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ৩০ জন নিহত হয়। এ সময় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৮১৬টি সহিংস ঘটনায় ৩১৭ জন নিহত ও ১৮ হাজার ১০১ জন আহত হয়।’ (আজকের পত্রিকা অনলাইন ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬)

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বেসরকারি গবেষণা সংগঠন সেন্টার ফর অলটারনেটিভের (সিএ) সহিংসতাবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি (বিপিও) ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আটটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে গবেষণা করেছে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত আটটি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগের ২১ দিন ও ভোটের পরের সাত দিনে সংঘটিত সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৬৪৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১৭ জন নিহত হয়েছে প্রতিপক্ষ দলের ওপর হামলা ও উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষে। এসব হামলা ও সংঘর্ষে আহত হয়েছে ১৮ হাজার ১০১ জন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।’

তাজা খবর এক প্রতিবেদনে লিখে—‘বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সহিংসতার মধ্যে ৩৯.৪৮% ছিল এক পক্ষের ওপর অপর পক্ষের হামলা, ২৯.৯৩% দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ, ২৩.৫০% অগ্নিসংযোগ বা সম্পত্তি ধ্বংস, এবং বাকিগুলো ‘মব’ হামলা, অপহরণ, গুলিকাণ্ড, সহিংস বিক্ষোভ, মারামারি ও নাশকতা।’ 

সবচেয়ে বেশি নাশকতা ও সহিংসতার তথ্য পাওয়া যায় ২০০১ এর নির্বাচনে। এই নির্বাচনে সহিংসতায় নিহত হোন ২৪৮ জন।

এইসব হিসাব-পরিসংখ্যান-খতিয়ান দেখার পরে মনে হয়—২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সবচেয়ে কম সহিংসতা হয়েছে। আহত ও নিহতের সংখ্যাও তুলনামূলক কম। যদিও নাগরিক হিসেবে আমাদের চাওয়া—যেকোনো নির্বাচনে, যেকোনো ইভেন্টে শূন্য সহিংসতা।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী—‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৩ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় ৫ জন নিহত ও ২২৬ জন আহত হয়েছেন। এই সময়ে দেশের অন্তত ১৫টি স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।’

এর আগের এক প্রতিবেদনে প্রথম আলো লিখেছে, ‘গত ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, তফসিল ঘোষণার পর ৩৬ দিনে সারা দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।’

এইসব ঘটনার মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের শরিফ ওসমান হাদির শাহাদাত ছিল বাংলাদেশের সকল ঘরানার মানুষের জন্য বড় ধাক্কা।

সহিংসতা কেন হয়, কীভাবেয়?

এইসব সহিংসতার অন্যতম বড় কারণ হলো—ইগো, পরাজয়ের ভয় আর বিজয়ের অহম। এই নির্বাচনের আগে আমরা শেরপুরে দেখেছি, কীভাবে শুধু রাস্তা ব্যবহারের জেদে, প্রশাসনের সকল অনুরোধ উপেক্ষা করে একজনের প্রাণহানী হয়েছে। 

মূলত মিছিলে হামলা, প্রচার মাইককে বাধা দান, মানুষের কাছে ভোট চাইতে বাধা ইত্যাদি কারণে এইসব সহিংসতা শুরু হয়। এরপর কখনো কখনো হত্যাকাণ্ডে পর্যন্ত গড়ায়। 

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন

পরিসংখ্যান বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ব্যতিক্রম। এই নির্বাচনে সহিংসতার কম হয়েছে। ফলে বলা চলে এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল। মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা একটা উপসংহার টানতে পারি। আগের যতোগুলো নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোতেই আওয়ামী লীগ ছিল। হয় নির্বাচনে, না হয় নির্বাচন প্রতিরোধে। আর ২৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল না। না নির্বাচনে, না নির্বাচন প্রতিরোধে। ফলে এ কথা বলাই যায় যে, সহিংসতার মূল আওয়ামী লীগ। নিষ্ঠুরতা আর সহিংসতা আ. লীগের মূল শক্তি। 

নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে

আমি বেশ কয়েকটি নির্বাচনে কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করেছি। কিছু নির্বাচনে প্রার্থীর কর্মী হিসেবে কিছু দায়িত্ব পালন করেছি। এই অভিজ্ঞতা থেকে ত্রয়োদশ নির্বাচন আর বাকি নির্বাচনগুলোর মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য দেখেছি। এর আগের আ. লীগ আমলের নির্বাচনগুলোর ডিউটি পালনের জন্য যখন প্রশিক্ষণে গিয়েছি, দেখা গেছে কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের কেয়ারলেস একটা ভাব থাকত। কাউকে পাত্তা না দেওয়ার একটা ব্যাপার থাকত। শৃঙ্খলা কম থাকলেও বড় বড় বক্তব্য বেশি থাকত।

ব্যালট পেপার সকালে পাঠানো হয়েছে ২৪-এর নির্বাচনে। এরপরেও একতরফা নির্বাচনই হয়েছে। আবার টাকা দিলেও মাস্টার রোল দিতে পারত না। পরের দিন পাঠানো হতো। কিন্তু এবার নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের প্রশিক্ষণ থেকে নিয়ে ফলাফল সাবমিট পর্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে আমি কোথাও অস্বস্তিবোধ করিনি। সবকিছুই একেবারে সাজানো গুছানো ছিল।

একবার আমি আমার ভগ্নিপতির সহযোগিতার জন্য একটা নির্বাচনের কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। মনে আছে দুপুরের পর পুলিশ আমাদের উদ্ধার করে উপজেলায় এনেছিল। আমিও এর আগে অন্তত দুইবার ভোট নিতে গিয়ে নানাবিধ জটিলতায় পড়েছি। পুলিশ ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় সেসব সমাধান করে নির্বাচন শেষ করেছি। কিন্তু এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে কোন ধরনের জটিলতায় পরতে হয়নি আমাকে এবং আমার কলিগদের।

তবে মাওলানা মামুনুল হক ও ববি হাজ্জাজের আসন এবং নাসির উদ্দিন পাঠোয়ারি এবং মির্জা আব্বাসের আসন নিয়ে কারচুপির জোরালো অভিযোগ ছিল। সেসব অভিযোগ নিয়ে রাজপথ উত্তাল হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও দিনশেষে তা আর হয়নি। অভিজ্ঞতা বলে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা হয়ে গেলে সেটা আর উল্টানো যায় না এই দেশে। 

নির্বাচনের আগে

জরিপ, হাইপ আর ডাকসুর ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচনের যে অন্তর্জালিক ভবিষ্যদ্বাণীগুলো চাওড় হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন হয়নি। অবশ্য অভিজ্ঞরা বলেছিলেন—‘২০০৮ এর নির্বাচনেও এই ধরনের আজগুবি জরিপ দেখিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসতে রীতিমতো বাধ্য করেছিল একটি দল। কিন্তু সেইসব জরিপ ও জরিপকারীর নির্বাচনের পরে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এবারও এর ব্যতিক্রম কিছু হবে না।’ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার জয় হয়েছিল।

নির্বাচনের পরে

নির্বাচনে বিএনপির সরকার গঠন করেছে। ১৮০ দিনের পরিকল্পনা এখনো চলছে। দেখা যাক বিএনপি কতটা জনতার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে।

তবে বিএনপি যদি আ. লীগ হতে চায়, আ. লীগের ৪১ সালের মতো ক্ষমতায় থাকার টার্গেট নির্ধারণ করতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের কপালে দুঃখ আছে। ফলে আমাদের সকলে মিলে বিএনপিকে সোজা পথে রাখতে হবে। অন্যথায় ফের ফিরবে কোনো নতুন স্বৈরাচার—নতুন নতুন জুলুমের পসরা নিয়ে।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *