রাজনীতিটা এখন কেবল ভোট, মিছিল আর সরকার গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি এখন আমাদের সমাজকে আরও বহুভাবে প্রভাবিত করছে, এবং ভবিষ্যতে যে এই প্রবণতা আরও বিস্তৃত হবে, সে কথা হলফ করেই বলা যায়। কিন্তু আমাদের কওমি আলেমসমাজ রাজনীতি জিনিসটা যে তরিকায় সমাজে উপস্থাপন করেন, সেই তরিকা কতটা সমাজবান্ধব এবং আগামীতে তারা কতটা সমাজকে প্রভাবিত করতে পারবেন, সেই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্ববহ।
কওমি মাদরাসার দহলিজে একদিকে আছে শতাব্দী-প্রাচীন রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আবার অন্যদিকে আছে আজকের বাস্তবতা। এর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কওমি মাদরাসার এক বিশাল তরুণ প্রজন্ম, যাদের রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আশা আছে, কিন্তু প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্নও কম নেই।
ইতিহাস আমাদের সাক্ষ্য দেয়, বাংলার আলেমরা কখনো রাজনীতিবিমুখ ছিলেন না। ১৮৫৭ সালের মহাবিপ্লব থেকে শুরু করে রেশমি রুমাল আন্দোলন, দেওবন্দের ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’ প্রতিষ্ঠা থেকে পাকিস্তান আন্দোলন—সকল মঞ্চে আলেমরা সক্রিয় অংশীদার ছিলেন।
বাংলার নিজস্ব ভূমিতে ফরায়েজি আন্দোলন এই সত্যের সবচেয়ে প্রাণবন্ত দৃষ্টান্ত। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লাকে কেবল ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভাবলে ভুল হবে। শাসকের সামনে ধর্ম ও আজাদির ঝান্ডা নিয়ে দাঁড়ানোর যে সাহস, এই রাজনৈতিক দর্শনই বাংলার আলেমদের চিরায়ত দর্শন।
পূর্বসূরিদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত থেকে একালের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলো কতটা শিক্ষা গ্রহণ করতে পেরেছেন, সে প্রশ্ন তোলা রইল। তবে বর্তমানে তারা যে কেবল সমাজের আদর্শিক লড়াইয়ের পরিবর্তে নির্বাচনকেন্দ্রিক ক্ষমতার ‘টুলসে’ পরিণত হয়েছে, একথা অস্বীকারের জো নেই। প্রতিটি সরকারই ইসলামি দলগুলোকে ব্যবহার করেছে কখনো নির্বাচনী মিত্র হিসেবে, কখনো জনমত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে। আর ইসলামি দলগুলোও এই সুযোগ নিয়েছে কখনো সরকারি সুবিধা আদায়ের লোভে, কখনো রাজনৈতিক বৈধতার জন্য। সরকার ইসলামি দলকে ব্যবহার করে নাকি ইসলামি দল সরকারকে ব্যবহার করে—এই পারস্পরিক ব্যবহারের খেলায় আদর্শের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়েছে মাত্র।
এ সময়ের রাজনীতি ও কওমির অবস্থান
কওমি মাদরাসায় রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া আছে। দরসি অধ্যয়ন, রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং উম্মাহর বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রতি গভীর মনোযোগের দরুণ কওমি শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা খুব স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু সমস্যা হলো, এই প্রক্রিয়াটি প্রায়শই তাত্ত্বিক পর্যায়ে থেকে যায়। ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনা হয়, কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংসদীয় কার্যপ্রণালি বা স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম বিষয়ে কোনো ব্যাবহারিক জ্ঞান নিয়ে তাদের মাঝে তেমন কোনো আগ্রহ কখনোই দেখা যায় না। ফলে মাদরাসার শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হলেও মাঠের রাজনীতিতে অদক্ষ রয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মাঠ নতুনভাবে সাজছে। পুরনো দলগুলোর বৈধতার সংকট, নতুন শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের গভীর আকাঙ্ক্ষা—এই তিনটি বিষয় মিলে একটি অনিশ্চিত কিন্তু সম্ভাবনাময় পরিবেশ তৈরি করেছে।
এই পরিবেশে কওমি আলেমদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। সাধারণ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ বাড়ছে, ইসলামি মূল্যবোধের প্রতি আগ্রহ তীব্র হচ্ছে। এই আগ্রহকে একটি পরিপক্ব, কর্মসূচিনির্ভর ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার এটাই উপযুক্ত সময়।
তবে একটি বিপদের কথাও বলা দরকার। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে যে উৎসাহ তৈরি হয়, তা প্রায়ই ক্ষণস্থায়ী। দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি না হলে এই উৎসাহ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কওমি অঙ্গনে এই কাঠামো তৈরির কাজটি এখনো সম্পন্ন হয়নি—এই সত্য স্বীকার করে নিতেই হবে। বিশেষত এর পুরো দায়িত্ব কওমি তরুণকেই কাঁধে তুলে নিতে হবে।
কওমির তরুণ প্রজন্ম : সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা
কওমি মাদরাসার তরুণ শিক্ষার্থীরা আজ আর শুধু কিতাবের পাতায় সীমিত নেই। ২৪-এর জুলাই বিপ্লব, স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা দেশীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারণ তো বটেই, বিশ্বের রাজনৈতিক গতিবিধির সাথেও পরিচিত হচ্ছে।
তাদের সম্ভাবনার আরেকটি উৎস হলো আধ্যাত্মিক লিগ্যাসি। একজন তরুণ আলেম যিনি ধর্মীয় ইবাদতে পাবন্দ, যার বুকে কুরআনের ঐশ্বরিক জ্ঞানভান্ডার আছে, যিনি মানুষের দুঃখ-কষ্টে সংবেদনশীল—এই তরুণের পক্ষে একজন ন্যায়পরায়ণ নেতা হওয়া খুব সহজ সবক। কওমি মাদরাসা তার ভেতরে ধর্ম ও নৈতিকতার যে ভিত বপন করে, এই রোপিত চারাগাছকে যদি একটু জাগতিক দক্ষতা দিয়ে যত্ন নেওয়া যায়, তাহলে এখান থেকেই তৈরি হতে পারে আগামী বাংলাদেশের নেতৃত্ব।
কিন্তু প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। প্রথমত, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাব। কওমি মাদরাসার স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। যিনি নিজের জীবিকা নিয়েই অনিশ্চিত, তার পক্ষে রাজনীতির মতো ব্যয়সাপেক্ষ কাজে নিয়োজিত হওয়া কঠিন।
দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির সমস্যা। কওমি সনদের সীমিত স্বীকৃতির কারণে এই শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক বা সিভিল সোসাইটির বিভিন্ন পদে প্রবেশের সুযোগ পান না, যা রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারত।
তৃতীয়ত, মেন্টরশিপের অভাব। রাজনীতিতে অভিজ্ঞ, নীতিনিষ্ঠ ও কৌশলী আলেম নেতৃত্বের যে অভাব, তা পূরণ না হলে তরুণ প্রজন্ম দিকনির্দেশনাহীন হয়ে পড়বে।
চতুর্থত, মতাদর্শিক বিভ্রান্তি। বৈশ্বিক ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার নানা ধারা কওমির তরুণদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে, একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক দর্শন গড়ে তোলার পথে বাধা দিচ্ছে।
আগামীর নেতৃত্বে কওমির অংশগ্রহণ কেন জরুরি
বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর নব্বই শতাংশেরও বেশি মুসলমান। এই দেশের রাজনীতিতে ইসলামি মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব যদি না থাকে, তাহলে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হবে না। এই রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে কওমি আলেমদের অংশগ্রহণ কেবল কাঙ্ক্ষণীয় নয়, অপরিহার্য।
কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা দেশের প্রান্তিক সমাজের সাথে সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত। শহুরে উচ্চমধ্যবিত্তের রাজনীতি যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে একজন কওমি আলেম স্বাভাবিকভাবেই পৌঁছান। গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের সাথে এই সংযোগ একটি গণমুখী রাজনীতির জন্য অমূল্য।
আরও গুরুত্বপূর্ণ, নৈতিক সংকটের এই যুগে যখন রাজনৈতিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মিথ্যাচার নিত্যসঙ্গী, তখন একটি মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা সমাজে প্রবল। কওমি আলেমরা যদি সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন, তাহলে তারা রাজনীতিতে একটি নতুন সংস্কৃতির সূচনা করতে পারেন।
রাজনীতিতে প্রবেশ মানে শুধু ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া নয়, বরং এর অর্থ সমাজের দায় কাঁধে নেওয়া। সেই দায় নেওয়ার সাহস ও সক্ষমতা একসাথে থাকাটা জরুরি।
তবে এই অংশগ্রহণ হতে হবে প্রস্তুতির সাথে। কেবল ধর্মীয় জ্ঞান নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, আইন এবং সামাজিক নীতির জ্ঞান অর্জনও আবশ্যক। এই প্রস্তুতি নেওয়াটাই আগামীর আলেম-রাজনীতিবিদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইতিহাস সাক্ষী, যখনই আলেমরা সত্যিকারের ইখলাস ও প্রস্তুতি নিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন, সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। হাজি শরীয়তুল্লাহ থেকে মওলানা ভাসানী—রাজনীতির এই ঐতিহ্য বাংলার মাটিতে সুদীর্ঘ ইতিহাস রচনা করেছে।
আজকের কওমি তরুণদের সামনে সেই ঐতিহ্যের মশাল বহন করার সুযোগ এসেছে। প্রশ্ন হলো, তারা কি সেই সুযোগকে চিনতে পারবেন? প্রস্তুতি নেবেন? আদর্শকে আঁকড়ে ধরে, ক্ষমতার প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করে, গণমানুষের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করবেন?
যদি পারেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি একটি নতুন মোড় নেবে। যেখানে ক্ষমতার সাথে দায়িত্ব থাকবে, ভাষণের সাথে আমল থাকবে, নেতৃত্বের সাথে জনতা থাকবে। সেই রাজনীতির স্বপ্ন দেখাটা অসম্ভব নয়। শুধু দরকার সঠিক মানুষের সঠিক পদক্ষেপ এবং সেই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।