মানুষের অন্যতম শক্তি ভাষা। ভাষার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে প্রকাশ করে এবং অন্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এজন্য মানুষকে আরবিতে বলা হয় ‘হাওয়ানে নাতেক’ বা ভাষা ব্যবহারকারী জীব। পৃথিবীতে বিচরণশীল জীব-জন্তু নিজেকে প্রকাশ ও অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে এক প্রকার ইঙ্গিতবহ ভাষা ব্যবহার করলেও সেটা মানুষের ভাষার মতো অর্থবহ নয়, ব্যাকরণের কাঠামোতে পরিশোধিত নয় এবং সভ্যতার উপাদানে সমৃদ্ধ ও সংরক্ষিতও নয়। মানুষের ভাষার এই শক্তি সরাসরি আল্লাহর দান। কুরআনে সুরা আর-রাহমানের সূচনা বক্তব্যেই বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং ভাষাজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। একইভাবে সভ্যতার প্রধানতম বাহন ভাষা-সাহিত্যের পঠন ও লিখনের ওপরও বিশেষ দৃষ্টিপাত করা হয়েছে সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থে। কুরআনে অবতীর্ণ প্রথম শব্দই হলো ‘পড়ো’; এবং এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কলমের কথা। কুরআনে ‘কলম’ নামে একটি সুরাও রয়েছে এবং এতে কলমের কসম করা হয়েছে। কলম হলো জগতের বাদশাহ; কলম যার হাতে থাকে, পৃথিবীর রাজনীতিও সে নিয়ন্ত্রণ করে, রাজনীতির ভাষ্য ও বয়ান নির্মিত হয় তার হাতেই।
চলমান সভ্যতায় ভাষা কেবলই ভাবের বাহন নয়, বরং রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ ও নির্মাণের একটি শক্তিশালী অস্ত্র। এজন্য চলমান সভ্যতার পথিকৃৎ হিসেবে শেষ নবিকে পাঠানো হয়েছে পৃথিবীর সাহিত্যগর্বী জাতির মাঝে। আরবের চারপাশের রোম-পারস্যের কারিগররা যখন গড়ছিলেন ইট-পাথরের প্রাসাদ, মরু আরবের কবি-সাহিত্যিকরা তখন গড়ছিলেন জাদুময় সাহিত্যের প্রাসাদ। আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সূর্যালোকে বিলীন হয়ে যায় একদিকে পারস্যের পাহলভি সাহিত্য; আরবি বর্ণমালা মিশে যায় প্রাচীন ফারসি ভাষায়। আরেকদিকে বিলীন হয়ে যায় প্রাচীন মিসরের কিবতিক সাহিত্য; প্রাচীন হায়ারোগ্লিফিক বর্ণমালা মিশে যায় আরবি বর্ণমালায়। অপরদিকে ভারতবর্ষেও আছড়ে পড়ে আরবি ভাষার ঢেউ; সিন্ধু উপকূলে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি সালতানাত, যার ফলে ভারতবর্ষের ভাষাতেও মিশে যায় আরবি ভাষার বর্ণমালা। পৃথিবীর আরেক প্রান্তে গ্রীক-রোমান ও ইউরোপীয় ভাষাও বিপুল পরিমাণে আত্মস্থ করে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের সম্পদ। তবে তারা আরবিকে এত পরিমাণে পরিবর্তন করে যে, তাদের বর্ণমালা অক্ষত থাকার কারণে বিষয়টি হয়তো প্রথমে চোখে পড়ে না।
ইউরোপীয় ভাষায় আরবি ভাষা কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, সেটা চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন লিবিয়ার ভাষাবিজ্ঞানী আলি ফাহমি খুশাইম তার ‘রিহলাতুল কালিমাত’ বইয়ে। ‘রিহলাতুল কালিমাত’ মানে ‘শব্দের ভ্রমণ’। মানুষ যেমন বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে, তেমনই মানুষের মুখের শব্দও দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ায়। ভ্রমণে মানুষের শরীর-মনে যেমন পরিবর্তন ঘটে, তেমনই পরিবর্তন ঘটে শব্দেরও শরীর, অবয়ব, চেহারা, রুহ এবং আত্মায়। আমরা মানুষের ভ্রমণকাহিনি পড়ে রোমাঞ্চিত হই; আর এই বইয়ের মাধ্যমে সুযোগ হয় আমাদের মুখের শব্দাবলির অভিযাত্রা ও শোভাযাত্রার বর্ণাঢ্য বিবরণ পাঠের। এতে আমরা দেখি, আরবি থেকে ইউরোপীয় ভাষায় যেভাবে সমৃদ্ধকরণ হয়েছে, সেসব শব্দ রূপান্তরের অভিনব সব দৃশ্য। ছোট একটি উদাহরণ দেখা যাক—‘ম্যাগাজিন’ বলতে আমরা বুঝি কোনো পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বা কোনো মাসিক কাগজ। শব্দটিকে আপাতত ইংরেজি মনে হলেও এর জন্ম আরবের মরুভূমিতে। আরবের মরু বালিয়াড়ি থেকে মুসলিম বিজয়ী বাহিনীর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে তা যায় আন্দালুসে (বর্তমান স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স)। এরপর ব্রিটিশদের হাত ধরে ইংলিশ-ল্যান্ড ঘুরে আমাদের ভারতবর্ষে আসে। এবং আমাদের বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলা শব্দের মতোই।
শব্দটির রূপান্তর প্রক্রিয়া দেখুন, আরবি ভাষার শব্দ ‘খাজানা’ (خزانة), যার অর্থ ‘ভান্ডার’। খাজানা শব্দটিও বাংলায় ব্যবহৃত হয়। শব্দটি ফারসিতে গিয়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘ইঞ্চি’ প্রত্যয়। ফলে নতুন একটি শব্দ তৈরি হয় ‘খাজাঞ্চি’, যার অর্থ ভান্ডারের তত্ত্বাবধায়ক। মূল শব্দটি আরবি ক্রিয়া-কাঠামোতে গিয়ে গঠিত হয় আরও অনেক শব্দ। যেমন কর্তাবাচক শব্দ ‘খাজিন’ (خازن), কর্মবাচক শব্দ ‘মাখজুন’ (مخزون), স্থান-কাল-পাত্রবাচক শব্দ ‘মাখজান’ (مخزن) ইত্যাদি। এই শেষোক্ত মাখজান শব্দের বহুবচন ‘মাখাজিন’ (مخازين)। আর এই মাখাজিন শব্দটিই ইংরেজিতে গিয়ে হয়েছে ‘ম্যাগাজিন’ (Magazine)। আন্দালুসে আট শত বছরের মুসলিম সভ্যতা থেকে ইটালিয়ান বণিকরা শব্দটিকে গ্রহণ করে বাজারের বিক্রয়পণ্যের স্টোররুম অর্থে। তারপর ইংরেজরা শব্দটিকে সামরিকীকরণ করে একে অস্ত্র ও গোলাবারুদের ভান্ডার হিসেবে ব্যবহার করে। ক্রমান্বয়ে তা রাইফেল বা রিভলভারের কার্তুজ ইত্যাদি বোঝাতে ব্যবহার শুরু হয়। তারপর ১৭৩১ সালে ‘ম্যাগাজিন’ শব্দের নতুন একটি অর্থ তৈরি হয় ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত ‘The Gentleman’s Magazin’ (সুশীলদের অস্ত্রভান্ডার) নামে একটি মাসিক পত্রিকার সূত্র ধরে। ১৭৩১ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যায় সম্পাদক এডওয়ার্ড কেভ জানিয়ে দেন, ‘এটি অস্ত্রভান্ডার নয়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্যভান্ডার। প্রতিমাসে অজ্ঞতা ধ্বংসকারী জ্ঞান ও তথ্যের অস্ত্র বের হতে থাকবে, তাই এর নাম রাখা হলো ম্যাগাজিন’। পত্রিকাটির মূল নাম ছিল ‘monthly intelligencer’। তবে পত্রিকাটির হেডলাইনে নতুন শব্দদ্যোতনা পাঠকসমাজে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। পিস্তলের গুলি যেমন ম্যাগাজিন থেকে ধারাবাহিকভাবে বের হতে থাকে, তেমন ধারাবাহিকভাবে বের হওয়া মাসিক পত্রিকাগুলোও ‘ম্যাগাজিন’ নাম ধারণ করে বাজারে আসতে থাকে। অবশ্য বাংলায় পত্রিকার বিশেষ সংস্করণকে ‘সংখ্যা’ শব্দেও ব্যক্ত করা হয়, যেভাবে আরবি পত্রিকায় ‘আদাদ’ এবং উর্দু পত্রিকায় ‘নাম্বার’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি তার ‘আল-মুসলিমুনা ফিল হিন্দ’ বইয়ে লিখেছেন, ‘মিস্ত্রি’ শব্দটি এসেছে আরবি থেকে। আরবিতে একটি শব্দ আছে ‘সাতর’ (سطر), যার অর্থ লাইন বা রেখা। খাতায় যে রেখা টানা থাকে সেটাকে আরবিতে বলে সাতর। এটি ক্রিয়া-কাঠামোতে গিয়ে কিছু শব্দ গঠন করে। যেমন সাতির, মাসতুর, মিসতারাহ, মিসতার ইত্যাদি। মিসতারাহ (مسطرة) অর্থ রুলার, যা দাগ সোজা করে। আমাদের স্থাপত্যশিল্পীরাও রশি ঝুলিয়ে সোজা করে ইট গেঁথে দেয়াল তোলে। এই সোজা করার কাজটিকে বলা হয় ‘মিসতারি’ (مسطاري), যা বাংলা উচ্চারণে ‘মিস্ত্রি’। তবে আরবি থেকে বাংলায় আসার পথে মধ্যখানে উর্দুতে শব্দটির উচ্চারণে কিছুটা তেরছা ভাব তৈরি হয়। ধ্বনি-বদল তো স্বভাবিক, খোদ অক্ষর বদলেরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। আরবি-ফারসি ভাষায় ‘জিম’ ও ‘গাইন’ হরফে ধ্বনি-বদলের উদাহরণ দেখুন, সৌদি আরবে বলা হয় ‘জামিল’, মিসরে বলা হয় ‘গামিল’। ‘কাফ’ ও ‘গাইন’ হরফেও ধ্বনি-বদল হয়; যেমন সৌদি আরবে বলা হয় ‘কামাল’, মিসরে বলা হয় ‘গামাল’। ইরাকের একটি প্রসিদ্ধ শহরের নাম ‘জিলান’; সে শহরের প্রখ্যাত আলেম ও আধ্যাত্মিক সাধকের নাম ‘আবদুল কাদের জিলানি’। জিলান শব্দটি ফারসিতে গিয়ে হয়ে যায় ‘গিলান’; ভারতের একজন বিখ্যাত আলেমের নাম ‘মানাজির আহসান গিলানি’। আরবি ‘জিম’ হরফ ফারসিতে ‘গাফ’ বা ‘গাইন’ বর্ণে রূপান্তরের আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে চেরাগ। আরবি ‘সিরাজ’ শব্দের শেষের ‘জ’ ফারসিতে হয়ে যায় ‘গ’। আরবি ‘সিরাজ’ শব্দের বহুবচন ‘সুরুজ’, যা হিন্দি-সংস্কৃত ভাষার বানানে হয়ে যায় ‘সূর্য’। সিরাজ, সুরুজ, চেরাগ, সূর্য—চারটি শব্দই অভিন্ন অর্থ দান করে; সবকটিই আলো বিতরণ করে।
আমাদের ইতিহাসে শব্দের মোড় ও মোড়ক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ সম্ভবত ‘হিন্দু’ শব্দটি এবং এই শব্দকে ঘিরে সুদূরপ্রসারী ও বহুমাত্রিক রাজনীতি। আদতে হিন্দু কোনো ধর্মের নাম নয়, বরং একটি সার্বজনীন ভৌগোলিক পরিচয়ের নাম। মূল শব্দটি এসেছে আরবি ভাষা থেকে; আরবি ‘হিন্দ’ শব্দের বিশেষণবাচক তুর্কি উচ্চারণ ‘হিন্দু’। যেমন পাঞ্জাবি, বাঙালি, বিহারি—এসব কোনো ধর্ম নয়, বরং একটি স্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত যেকোনো জিনিসের নাম বা বিশেষণ। ‘পাঞ্জাবি’ বলতে বোঝানো হয় পাঞ্জাবের পোশাক, খাবার, মানুষ, ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি বা যেকোনো বিষয়। একইভাবে ‘হিন্দু’ অর্থ হিন্দের পোশাক, খাবার, মানুষ, ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি বা যেকোনো বিষয়। স্বাভাবিকভাবে ‘হিন্দ’ শব্দের বিশেষণ হওয়ার কথা ‘হিন্দি’। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী শব্দের শেষে ‘সম্বন্ধ ইয়া’ (ياء النسبة) যোগ করে এ ধরনের বিশেষণ তৈরি হয়। কিন্তু তুর্কিরা সেটাকেই মুখ গোল করে উচ্চারণ করে ‘হিন্দু’। মূল শব্দটি ভারতবর্ষে এসেছে আরব বণিকদের মাধ্যমে। হাজার হাজার বছর আগে আরবের মরুভূমি থেকে আরব বণিকরা এই ভূখণ্ডে ‘হিন্দ’ শব্দটি বহন করে আনলেও ১০২৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ৮৩৪ বছর যারা এই ভূমি শাসন করেন, তাদের বড় অংশ ছিল তুর্কি-মোগল জাতির মানুষ; তাদের পারিবারিক ভাষা ছিল তুর্কি চাগতাই। ফলে আরবি উচ্চারণের চেয়ে তুর্কি উচ্চারণই বেশি প্রচলিত হয়।
মুসলিম শাসকদের আগমনের আগে ‘ভারতবর্ষ’ নামের কোনো একক ভূখণ্ড ছিল না, ‘হিন্দু’ নামের কোনো ধর্ম ছিল না, ‘হিন্দি’ নামের কোনো ভাষাও ছিল না। এই ভূখণ্ড একক কোনো দেশ বা রাষ্ট্রও ছিল না; ছিল খণ্ড খণ্ড ভাগে বিভক্ত শত শত রাজ্য, যেগুলো পরিচিত ছিল স্থানীয় অসংখ্য নামে। মুসলিম শাসকরা এসে ৮০০ বছরের ইতিহাসে সেই খণ্ড খণ্ড রাজ্যগুলো জয় করে একটি অখণ্ড মানচিত্র সৃষ্টি করেন এবং সে মানচিত্রের নামকরণ করেন তৎকালীন প্রশাসনিক ভাষা ফারসিতে ‘হিন্দুস্তান’, যাকে আরব বণিকরা আবহমানকাল থেকে আরবিতে বলত ‘হিন্দ’। এ থেকেই বিশেষণবাচক শব্দগুলো তৈরি হয়—আরবিতে ‘হিন্দি’, তুর্কিতে ‘হিন্দু’, ফারসিতে ‘হিন্দুস্তানি’। তবে এই শব্দগুলোর মধ্যে জগাখিচুড়ি তৈরি করে ব্রিটিশরা এসে। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ১৯০ বছরে তারা ফারসি ভাষা বিলুপ্ত করে সেখানে প্রতিস্থাপন করে ইংরেজি ভাষা। ফলে ‘হিন্দুস্তান’ হয়ে যায় ‘ইন্ডিয়া’। এই সময়ে তারা ক্ষমতাসীন মুসলমানদেরকে চেয়ার থেকে মাটিতে নামিয়ে দেয় এবং ‘ব্রাহ্ম’ ধর্মের লোকদের ক্ষমতায় অংশীদার করে নেয়। কিন্তু ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দের সঙ্গে লেগে ছিল বৈষম্যমূলক জাতপ্রথার দৃষ্টিকটু কালো দাগ। এই কালো দাগ গোপন করা হয় ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দের জায়গায় ‘হিন্দু’ শব্দটি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। আরবদের লিখিত প্রাচীন কিতাবপত্রে বর্তমান ‘হিন্দু’ ধর্মের নাম দেখা যায় ‘ব্রাহ্মণ’ (براهمن)। ব্রিটিশ আমলে ব্রাহ্মণ ধর্মে বড় আকারে সংস্কার করেন আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী (১৮২৪–১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দ)। ব্রিটিশদের ছত্রছায়ায় নতুন বিধিবদ্ধ রূপ লাভ করে ‘হিন্দু ধর্ম’, ‘হিন্দি ভাষা’ ও ‘ভারত রাষ্ট্র’। ব্রিটিশদের ১৯০ বছরের আগে এই ভূখণ্ডে ‘হিন্দু ধর্ম’ বা ‘হিন্দি ভাষা’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। আর এটা অকপটে স্বীকার করেছেন আমাদের কবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি তার ‘বাংলা ভাষা পরিচয়’ বইয়ে লিখেছেন, ‘আজ আমরা যে হিন্দু নাম দিয়ে নিজেদের ধর্ম ও আচারগত একটা বিশেষ ঐক্যের পরিচয় দিয়ে থাকি, সে নামকরণ আমাদের নিজকৃত নয়। বাইরে থেকে মুসলমানরা আমাদের এই নাম দিয়েছিল। হিন্দুস্তান নাম মুসলমানদের কাছ থেকে পাওয়া।’ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ফলাফল এটাই দাঁড়ায়—‘হিন্দু’ মূলত একটি ভৌগোলিক বিশেষণ। এজন্যই ভারতবর্ষের ফারসি-উর্দু ইতিহাসের বইয়ে স্থানীয় পৌত্তলিক ধর্মের প্রতিশব্দ হিসেবেও এর ব্যবহার দেখা যায়।
ভাষার রাজনীতির সবচেয়ে বড় মাঠ সম্ভবত ভারতবর্ষ। এই মাঠে বিপুল বিক্রমে খেলা দেখিয়েছে ব্রিটিশরা। সাইয়েদ সুলাইমান নদভি তার ‘হিন্দুস্তান মে হিন্দুস্তানি’ (ভারতবর্ষের লোকজ ভাষা ‘হিন্দুস্তানি’) প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনামলে বিস্তৃত ভারতবর্ষজুড়ে ২০টির বেশি প্রভাবশালী ভাষা ছিল। মুসলিম শাসকরা সব ভাষাকেই সমান মর্যাদায় সমাদর করেছেন। মুসলিম শাসকরা পরিবারের ভেতর কথা বলতেন তুর্কি চাগতাই ভাষায়, দাফতরিক কাজ চলত ফারসি ভাষায় এবং রাজদরবারে কবি-সাহিত্যিকরা তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় চর্চা করতেন স্থানীয় মাটি ও মানুষের ভাষা। এভাবে ভারতবর্ষে জন্ম নেয় একটি স্বতন্ত্র মিশ্র ভাষা। তবে ব্রিটিশ বণিকরা এসে ভেঙে দেয় মুসলিম শাসকদের ভাষাচর্চার উদার ধারা এবং শুরু করে ভাষার নামে বিভিন্ন প্রকার বিভাজনের রাজনীতি। ব্রিটিশরা মুসলমানদের ৮০০ বছরের রাষ্ট্রীয় ভাষা ফারসি বিলুপ্ত করে একমাত্র ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং এই ভাষা শেখানোর জন্য ভারতবর্ষ জুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে দেয় স্কুল-কলেজ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলায় শাসন শুরু হয়। ভারতবর্ষে শাসন পরিচালনা করতে গিয়ে ব্রিটিশরা প্রথমেই ভাষাজনিত সমস্যার মুখোমুখি হয়। মোগল শাসকদের কারণে ভারতবর্ষজুড়ে রাজভাষা হিসেবে রাজত্ব করছিল ফারসি ভাষা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতের প্রধান ভাষা ছিল ফারসি। হিন্দুরা সংস্কৃত ভাষার চর্চা করলেও ফারসি ভাষা শিখে রাজদরবারে জায়গা করে নিয়েছিল। তদুপরি বিভিন্ন অঞ্চলের লোকেদের নিজস্ব মাতৃভাষাও বড় বাধা ছিল।
ভারতবর্ষে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের জন্য ব্রিটিশ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন ভাষার সমস্যা গভীরভাবে উপলব্ধি করে। ভারতবর্ষের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছেও ইংরেজি ভাষা ছিল একেবারেই নতুন। আর কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করার জন্যও ইংরেজি ভাষাটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই সংকটের অবসান ঘটে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মেম্বার লর্ড ম্যাকলের মাধ্যমে। ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লর্ড ম্যাকলে ঘোষণা করেন ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তার অভিমত ‘মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’। এতে তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন, ভারতবর্ষে শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার হতে হবে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই। তার ফলশ্রুতিতে ১৮৩৫ সালে তখনকার ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংক ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন অ্যাক্ট’ প্রস্তাব করেন এবং ভারতবর্ষের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতে ইংরেজি ভাষাকেই অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। ইংরেজিই তখন হয়ে ওঠে ভারতবর্ষের মানুষের জীবনমান নিয়ন্ত্রণ ও রাজনীতির ছড়ি ঘোরানোর ভাষা। ব্রিটিশ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও সেসব স্কুল-কলেজেই রাষ্ট্রীয় অনুদান দিতে থাকে, যেখানে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে জ্ঞানচর্চা হয়।
একইভাবে আমাদের বর্তমান বাংলা ভাষার কাঠামোও ঠিক করে দেয় সাত সমুদ্দুরের ওপারের ছোট দ্বীপদেশ থেকে আগত ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা। ১৬৬০ সালের দিকে ব্রিটিশরা আমাদের দেশে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সরব পদচারণা শুরু করে। তাদের ব্যবসায়িক সংগঠনের নাম ছিল ‘ব্রিটিশ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। ১৬৯০ সালের ২৪ আগস্ট ব্রিটিশ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ম্যানেজার জব চার্নক বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর তীরবর্তী তিনটি গ্রাম—সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতার কিছু জায়গা কিনে স্থাপন করেন তার কোম্পানির বাণিজ্যকেন্দ্র। কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তৃত হলে নিজেদের সুরক্ষার জন্য তার ছয় বছর পর, ১৬৯৬ সালে সেখানে একটি সামরিক কেন্দ্র বা দুর্গ নির্মাণ করেন স্যার চার্লস আয়ার। দুর্গের নাম রাখেন ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের নামে ‘ফোর্ট উইলিয়াম’ বা উইলিয়াম দুর্গ। এভাবে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের হাত ধরে জমজমাট হয়ে ওঠে কলকাতা নগরী। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে ফোর্ট উইলিয়ামকে কেন্দ্র করে লর্ড রবার্ট ক্লাইভ বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার পর ১৭৭২ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা শহরটি ব্রিটিশদের উপনিবেশায়িত ভারতবর্ষের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কলকাতা যখন ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের নিজস্ব শহর ও রাজধানী হিসেবে গড়ে ওঠে, তখন তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পরাজিত মুসলমানদের বাদ দিয়ে স্থানীয় হিন্দু পণ্ডিতরা গড়ে তোলে তাদের মতো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা গ্রামের আঞ্চলিক গ্রাম্য বাংলাকে ঘোষণা করা হয় বাংলা মানভাষা বা প্রমিত বাংলা। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা যদি পশ্চিমবঙ্গে হুগলি নদীর তীরের সুতানুটি-গোবিন্দপুর ও কলকাতা গ্রামে বসতি স্থাপন না করে বাংলাদেশের বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরের কোনো গ্রামে বসতি স্থাপন করতেন এবং সেটাকে রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতেন, তাহলে আজ বরিশালের ভাষাই হতো প্রমিত বা বিশুদ্ধ বাংলা। কিংবা যদি পুরান ঢাকায় সদরঘাটের তীরে তাদের বাণিজ্যকেন্দ্র ও ফোর্ট নির্মাণ হতো, তাহলে পুরান ঢাকার কুট্টি ভাষাই হতো আজকের প্রমিত বা শুদ্ধ বাংলা। যেহেতু রাজ্য চলে রাজার চালে, রাজা যেখানে বসে সেটাই হয় রাজধানী, তাই সেখানকার ভাষা ও সংস্কৃতিই হয়ে ওঠে মূলধারা। রাজার শহরে উচ্চারিত শব্দের আঘাতে নির্মাণ হয় রাজনীতির ভাষ্য ও বয়ান। শব্দের মোড়কে চলে অহেতুক ‘জল-পানি’ রাজনীতি। রাজার ইশারায় ‘আবহাওয়া’ হয়ে যায় ‘জলবায়ু’, আদমশুমারি হয়ে যায় জনশুমারি বা জনগণনা, ‘লাশ’ হয়ে যায় ‘মরদেহ’, ‘জানাজা’ হয়ে যায় ‘শেষকৃত্য’, ‘খোদা’ হয়ে যায় ‘সৃষ্টিকর্তা’। আরবি ভাষার ক্ষেত্রেও দেখুন, নবিজির যুগে মক্কা ও আশপাশের অঞ্চলে বসবাস করতো আট-দশটি কবিলা বা গোত্র। প্রত্যেক কবিলার আরবি উচ্চারণ ছিল আলাদা। পবিত্র কুরআন পাঠ হতো যার যার কবিলার নিজস্ব উচ্চারণে। তায়েফের আরবি ছিল মক্কার আরবির চেয়েও বিশুদ্ধ। নবিজি শৈশবে ছয় বছর তায়েফে থেকে আয়ত্ত করেছিলেন বিশুদ্ধ আরবি। তবুও পরবর্তীতে কুরআনের বিশুদ্ধ পাঠ বা প্রমিত আরবি হিসেবে স্বীকৃতি পায় মক্কার কুরাইশদের উচ্চারণ। পরবর্তীতে সৌদি থেকে পড়ে আসা শায়খরা বলেন, ‘রমজান’ বলা যাবে না, বলতে হবে ‘রামাদান’; ‘ইবনে কাসির’ লেখা যাবে না, লিখতে হবে ‘ইবনু কাসির’।
আমরা ইতিহাসের আরও গভীরে দৃষ্টি বিস্তার করলে দেখি, আসলে ভাষার রাজনীতি বা শব্দের মোড়কে রাজনীতির ভাষ্য নির্মাণ বর্তমানের বিষয় নয়। নবিজির যুগে ইহুদি সম্প্রদায় সচেতনভাবেই শব্দের শরীর বা অর্থে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা করত। ইহুদিরা মুসলমানদের সম্ভাষণ করত ‘আস-সামু আলাইকুম’ (তোমাদের মৃত্যু হোক) বলে। একইভাবে মদিনার ইহুদিরা আরেকটি শব্দ বলে মুসলমানদেরকে অবজ্ঞা ও উপহাস করত; হিব্রু শব্দের বিদ্রূপার্থক শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে আরবিতে ‘রায়িনা’ শব্দটি ব্যবহার করত, যার অর্থ ‘আমাদের রাখাল’ বা ‘আমাদের দেখাশোনা করুন’। আর ‘উনযুরনা’ অর্থ ‘আমাদের প্রতি নজর দিন’ বা ‘আমাদের খেয়াল করুন’। কুরআনের সুরা বাকারার ১০৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুসলমানদে ‘রায়িনা’ (راعنا) শব্দটি ব্যবহার করতে নিষেধ করেন এবং এর পরিবর্তে ‘উনযুরনা’ (أنظرنا) বলতে নির্দেশ দেন। এমনকি হজরত মুসা (আ.)-এর যুগেও যখন বনি ইসরাইলকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তোমরা ‘হিত্তাহ’ (ক্ষমা) বলো, তখনো তারা বলেছিল ‘হিনতাহ’ (আটা)।
নবিজির যুগে আরবের অন্যতম সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল কাব্যযুদ্ধ। নিয়মিত কবিতার আসর বসত এবং কবিতার ছন্দে তীব্র লড়াই হতো। জাহেলি আরবের নিদর্শন ‘সাবউল মুয়াল্লাকাত’ যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নবিজি নিজেও তার মসজিদে মিম্বারের পাশে কবি সাহাবিদের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা বিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের বিরুদ্ধে তীব্র কাব্যিক তির ছুড়তেন, যা ছিল ওই সময়ের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। বিরোধী পক্ষও নবিজিকে ট্যাগ দিত ‘কবি’, ‘গণক’, ‘পাগল’ ইত্যাদি শব্দে। শব্দের রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলেই হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় যখন মুসলমানদের পক্ষ থেকে সন্ধিপত্রে লেখা হলো, ‘মিন মুহাম্মাদিন রাসুলিল্লাহ..’ (আল্লাহর প্রতিনিধি মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে..), তখন কুরাইশদের পক্ষ থেকে জোর আপত্তি উঠল ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটি মুছে দেওয়ার জন্য। তারা বলল, আমরা যদি মুহাম্মাদকে রাসুল বলে স্বীকার করেই নিই, তাহলে আর সন্ধি কেন? কুরাইশদের কথায় নবিজি ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটি কেটে ফেলতে সম্মত হলেন, তবে সাহাবিরা সম্মত হলেন না। সন্ধিপত্র লিখছিলেন হজরত আলি; তিনি সরাসরি বললেন, আমি ‘রাসুলুল্লাহ’ স্বীকার করি, আমি এটি কাটতে পারব না। তখন নবিজি শব্দটি দেখাতে বললেন। এরপর নবিজি নিজ হাতে সেটি কেটে দিলেন এবং আপাতত সন্ধিপত্র লিপিবদ্ধ হলো। একটি জটিল রাজনৈতিক সংকট আপাতত স্থগিত হলো।
একটি শব্দ কেবলই শব্দ নয়। শব্দের থাকে আলাদা শক্তি, প্রভাব, ভাষ্য ও বয়ান। বিখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, আমার দাদা ‘হাযান’ একবার নবিজির দরবারে উপস্থিত হলেন। নবিজি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কী? দাদা বললেন, আমার নাম হাযান (হাযান অর্থ শক্তভূমি)। নবিজি বললেন, না; বরং তুমি হলে ‘সাহল’ (অর্থাৎ তোমার নাম হাযানের পরিবর্তে সাহল রাখো; সাহল অর্থ নরম জমিন)। দাদা বললেন, আমার বাবা আমার যে নাম রেখেছেন, আমি তা পরিবর্তন করব না। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, এর ফল এই হলো যে, এরপর থেকে আমাদের বংশের লোকদের মেজাজে রুঢ়তা ও কর্কশভাব রয়ে গেল। (সহিহ বুখারি : ৬১৯৩)। আরেক হাদিসে দেখি, মদিনার আমের গোত্রের এক সাহাবি নবিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। হুজরার বাইরে থেকে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনায় বললেন, ‘আ-আলিজু?’ (আমি কি ঢুকব?)। তখন নবিজি তার খাদেমকে বললেন, তুমি গিয়ে তাকে অনুমতি প্রার্থনার পদ্ধতি শিখিয়ে দাও যে, ‘আস-সালামু আলাইকুম, আ-আদখুলু?’ (আমি কি প্রবেশ করব?)। সাহাবি শিক্ষা পেয়ে তাই বললেন এবং নবিজি তাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। (সুনানে আবু দাউদ : ৫০৮৫)। আরবিতে প্রবেশ করা অর্থে দুটো শব্দই প্রায় সমার্থক, তবে ‘আলিজু’ অর্থ ছোট জায়গায় ঢোকা, আর ‘আদখুলু’ অর্থ স্বাভাবিক জায়গায় প্রবেশ করা। ছোট ছোট শব্দ নিয়ে কুরআন-হাদিসের এত এত আলোচনা আমাদের এটাই বুঝিয়ে দেয়, শব্দ খুব সাধারণ বিষয় নয়।
শব্দ সবসময় নিরীহ কোনো বায়বীয় পদার্থ নয়। শব্দের মোড়কে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ মরণাস্ত্র ও জাতিগত নিধনের হাতিয়ার। শব্দের মাধ্যমেই নির্মিত হয় ইতিহাস, বৈধতা পায় নিজের পক্ষের অবৈধ কাজ এবং সন্দেহজনক ও নিধনযোগ্য হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ। এই কারণে শব্দ কখনো নিরপেক্ষ নয়। শব্দ একটি অস্ত্র, যা রক্তপাত ছাড়াই মানুষকে পরাজিত করতে পারে, একটি জনগোষ্ঠীকে অপরাধী বানাতে পারে, অথবা একটি বিশ্বাসকে বহিরাগত হিসেবে চিত্রিত করতে পারে। যেমন, আমাদের ভাষায় ‘আদিবাসী’ একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ; এর সরল অর্থ আদি বাসিন্দা। কিন্তু এই শব্দের প্রয়োগের ভেতরে একটি সুগভীর রাজনৈতিক ভাষ্য রয়েছে। যখন কোনো ভূখণ্ডের একটি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলা হয়, তখন সেই ভূখণ্ডের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী অটোমেটিকক্যালি ঘোষিত হয় আগন্তুক বা বহিরাগত। এর মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীকে ভূমির প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে এবং অন্যদেরকে বহিরাগত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন, বর্তমান স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের কিছু অংশ মিলে গঠিত ছিল ‘মুসলিম আন্দালুস’। ৭১১ সাল থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮০০ বছর তারা সেখানে বসবাস করেন এবং সৃষ্টি করেন নতুন একটি সভ্যতা। কিন্তু যদি সেখানকার ইতিহাসে একটি গোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলে প্রতিষ্ঠিত করা হয়, তাহলে ১৪৯২ সালে মুসলমানদেরকে সেখান থেকে সমূলে উৎখাত, বিতাড়ন ও নিধন করা বৈধতা পায়। মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সমূলে উৎখাত, বিতাড়ন ও নিধন করা বৈধতা পায়। এভাবেই একটি শব্দ হয়ে ওঠে জাতিগত নিধনের ভয়ংকর অস্ত্র।
আমাদের ইতিহাসে যখন লেখা হয়, ‘ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমন’ বা ‘বাংলায় মুসলমানদের আগমন’; কিংবা ‘ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন’ বা ‘বাংলাদেশে ইসলামের আগমন’, তখন ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশ থেকেও বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে সমূলে উৎখাত, বিতাড়ন ও নিধন করা সম্ভব। এই শব্দগুচ্ছ আপাতদৃষ্টিতে নিরপেক্ষ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর সংকটময় রাজনৈতিক ভাষ্য। ‘আগমন’ শব্দটি নির্দেশ করে বাইরে থেকে আসা। অর্থাৎ এই শব্দটি পরোক্ষভাবে এই ধারণা তৈরি করে, ইসলাম এই ভূমির বাইরের একটি উপাদান এবং মুসলমানরা এই ভূমির বাইরের মানুষ। বিপরীতে পৌত্তলিক বা ব্রাহ্মণরা এই ভূমির স্থানীয় মানুষ এবং তারাই এই ভূমির মালিক। অতএব মুসলমানদের সমূলে উৎখাত এবং উৎখাতের নিয়তে জাতিগত নিধন বৈধ হয়ে ওঠে। এই শব্দগুচ্ছের সরল ব্যবহারের কারণে অনেক সময় আমরা সাধারণ চোখে ধরতেও পারি না, কী ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী ভবিষ্যৎ আমরা স্বীকার করে নিচ্ছি। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতা কী বলে? আমাদের বাংলাদেশের কথাই ধরুন, বাংলাদেশের সব মুসলমান কি আরব থেকে হিজরত করে এখানে আগমন করেছেন? কিংবা আমাদের পূর্বপুরুষ সবাই কি হিজরত করে এই দেশে আগমন করেছেন? ‘আগমন’ শব্দটিকে যদি আক্ষরিক অর্থেও ধরি, তবুও ঐতিহাসিক বাস্তবতা এত সরল নয়। বরং জাতিগতভাবে আমরা সবাই এখানকার স্থানীয়। আবহমানকাল ধরেই আমরা এই ভূমির মালিকানা বহন করছি।
বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের চেয়েও প্রাচীন। হাদিস ও তাফসিরের আলোকে জানা যায়, হজরত আদম (আ.) জান্নাত থেকে পৃথিবীতে অবতরণের সময় প্রথম কদম রাখেন ভারতবর্ষে এবং দীর্ঘ এক হাজার বছর জীবন কাটিয়ে তিনি ভারতবর্ষের মাটিতেই সমাহিত হন। তখন থেকেই এই ভূমিতে ইসলাম ও মুসলমান বিদ্যমান। তারপর দেড় হাজার বছর আগে যখন শেষ নবির অভ্যুদয় হয়, তখন নতুন করে মুসলিমদের বিভিন্ন বাহিনী বিজয়ী বেশে আগমন করে। আরব বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগমনকারী মুসলিম সেনাপতি, পির-দরবেশ ও ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ছিল খুবই অল্প; অল্প সংখ্যক আগমনকারী মুসলমানদের দাওয়াতে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়। যেমন বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে মাত্র ১৮ জন ঘোড়সওয়ার বাহিনী নিয়ে আগমন করেন ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি। ১২০৩ সালে তিনি গৌড় জয় করেন, যা বর্তমান বাংলাদেশের দিনাজপুর, চাপাইনবাবগঞ্জসহ চারটি জেলা এবং সীমান্তের ওপারে ভারতের অন্তর্গত চারটি জেলা নিয়ে গঠিত। এই বিস্তৃত গৌর অঞ্চলে ওই সময় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা যদি ধরি ১ লাখ, এবং তাদের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যদি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে থাকেন, তাহলে ‘মুসলমানদের আগমন’ কথাটির অর্থ দাঁড়ায় বিপুল সংখ্যক স্থানীয় ভূমিপুত্রদের বহিরাগত দাবি করে জাতিগত নিধনের বৈধতা দেওয়া। আমার প্রস্তাবনা হচ্ছে, এক্ষেত্রে সবচেয়ে যথার্থ শব্দগুচ্ছ ও শিরোনাম ‘মুসলিম শাসকদের আগমন’। একইভাবে হজরত শাহ জালাল (রহ.) যখন তার ৩৬০ আউলিয়া নিয়ে সিলেটে আগমন করেন, তখন তার দাওয়াত ও আখলাকের মাধ্যমে বহু স্থানীয় মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা কোনো বিদেশি ছিলেন না; তারা এই ভূমির সন্তান ছিলেন, যারা একটি নতুন ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ করেছিলেন। চট্টগ্রামে ১২ আউলিয়ার কাহিনিও ইতিহাসে সুবিদিত। দেখুন, ‘আগমনকারী মুসলমান’দের সংখ্যা সব অঞ্চলেই হাতে গোনা, আমরা যদি ইতিহাস থেকে প্রতীকি সংখ্যা ধরে বিচার করি, তাহলে উত্তরবঙ্গে ১৮ জন, সিলেটে ৩৬০ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন। পুরো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অল্প সংখ্যক আগমনকারী মুসলমানদের দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছেন বিপুল সংখ্যক স্থানীয় মানুষ। এজন্যই ‘মুসলমানদের আগমন’ কথাটি বড় ধরনের ঐতিহাসিক ভুল ও ভাগ্যবিড়ম্বনার ফাঁদ। সঠিক শব্দগুচ্ছ ও শিরোনাম হবে ‘মুসলমান শাসকদের আগমন’ বা ‘মুসলিম বণিকদের আগমন’ বা ‘পির-দরবেশদের আগমন’, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের তথ্য দেয়, কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পরিচয়কে ‘বহিরাগত’ হিসেবে উপস্থাপন করে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বহুল ব্যবহৃত আরেকটি শব্দাস্ত্র হলো ‘রাজাকার’। ১৯৭১ সালে রাজাকার ছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সহযোগী বাহিনী, যারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করেছিল। এই কারণে ‘রাজাকার’ শব্দটি স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে বিশ্বাসঘাতকতা ও জাতিদ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই শব্দটি একটি নতুন রাজনৈতিক অর্থ ও অস্ত্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিরোধী রাজনৈতিক ও ইসলামপন্থি জনগণের বিরুদ্ধে ‘রাজাকার’ শব্দটি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ‘রাজাকার’ শব্দটি একটি ঐতিহাসিক সত্তা থেকে একটি সমকালীন রাজনৈতিক অপবাদে রূপান্তরিত হয়। বিরোধী পক্ষকে দমন ও দলনের জন্য শব্দের মোড়কে এমন অনেক রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি হয়।
শাসকরা জানেন, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মানুষের ভাষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই কারণে তারা নতুন নতুন শব্দ উদ্ভাবন করেন কিংবা উদ্ভাবিত শব্দের ভেতর নতুন অর্থ ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন। বিশেষ করে আমাদের মতো উপনিবেশ-প্রভাবিত দেশের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন আরও বেশি দেখা দেয়। ব্রিটিশরা যখন এই দেশে আসে, তখন তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম; কিন্তু স্থানীয় জনগণ ছিল তাদের তুলনায় অনেক বেশি। এত বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে শাসন করার জন্য প্রয়োজন দেখা দেয় জনগণকে বিভক্ত করে বিভিন্ন দলে ভাগ করা, ভাগ করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে নামিয়ে আনা এবং দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি তৈরি করা। আর বিভক্তি তৈরি করার জন্য দরকার শব্দ, ট্যাগ, স্লোগান, ভাষ্য ও বয়ান। এজন্য মানুষের সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ‘আগমন’, ‘আদিবাসী’, ‘রাজাকার’, ‘গুপ্ত’, ‘মব’ কিংবা এ জাতীয় নানা শব্দাস্ত্র। এসব শব্দাস্ত্র প্রয়োগ করে নিজেদের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করা হয় এবং বিরোধী পক্ষকে অবদমন করা হয়। একটি জনগোষ্ঠীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়, আরেকটি জনগোষ্ঠীকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। শব্দের মোড়কে এসব রাজনৈতিক ভাষ্য ও বয়ানের মাধ্যমে নির্মিত বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের চেতনাকে প্রভাবিত করে। এভাবে শব্দের মাধ্যমেই নির্মিত হয় একটি জাতির আত্মপরিচয়; নির্ধারিত হয় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পথরেখা।
তথ্যসূত্র :
- পবিত্র কুরআন ও তাফসির
- হাদিস শরিফ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ
- আল-মুসলিমুনা ফিল হিন্দ, সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি, মাকতাবা দারুল ফাতাহ, দামেশক
- রিহলাতুল কালিমাত, আলি ফাহমি খুশাইম, মারকাজুল হাজারাতিল আরাবিয়া, মিসর
- হিন্দুস্তান মে হিন্দুস্তানি, সাইয়েদ সুলাইমান নদভি, ইনতিখাব মাজামিন, উর্দু একাডেমি, লখনৌ
- হারিয়ে যাওয়া হরফের কাহিনি, ফরহাদ খান, দিব্য প্রকাশ
- বাংলা ভাষা পরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ধ্রুপদ প্রকাশন
- বাংলা শব্দের উৎস-অভিধান, ফরহাদ খান, প্রতীক প্রকাশন
- শব্দচিন্তা চমৎকারা, দিলীপ দেবনাথ, বিদ্য প্রকাশ
- শব্দ সংস্কৃতির ছোবল, জহুরী