২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে এক অকল্পনীয় গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল বাংলাদেশে, এর ফলে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে ভারতে পালাতে বাধ্য হয়। তারপর ড. ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানকে কিছুটা সংস্কার করার চেষ্টা করে, ফলে কয়েকটি সংস্কার কমিটি গঠিত হয় তখন।
এই সময়ে জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ঘরে ফিরে যায়, যার যার মতো নিজেদের জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। বিপ্লবের ভ্যানগার্ড ছাত্রনেতাদের এক অংশের নেতৃত্বে নতুন একাধিক দল গঠিত হয়, আর বাকিরা পূর্বের বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে নিজ নিজ দলের ব্যানারে রাজনীতি শুরু করে। কিন্তু অল্প কিছু মানুষ ‘সবার আগে জুলাই’—এই স্পৃহা সামনে রেখে জুলাইয়ের জন্য রাজপথে থেকে যায়। সেই মানুষদের একজন হলেন শহিদ শরিফ উসমান বিন হাদি।
২৪ সাল শেষ হয়ে ২৫ সালও শেষের দিকে চলে এসেছিল, ইন্টেরিম গভমেন্ট কেবল নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেছে ১১ ডিসেম্বর, মানে তারা বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তার একদিন পর ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজের পরে রিকশায় করে যাওয়ার সময় উসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি করে দুর্বৃত্তরা, এরপর ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের এক হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি শাহাদাত লাভের মর্যাদা নিয়ে দুনিয়ার সফর শেষ করেন।
দুই.
শহিদ উসমান হাদির এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে খুব স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানান প্রশ্নের ভান্ডার তৈরি হয়, কিন্তু সত্যি বলতে এখনো পর্যন্ত অধিকাংশ প্রশ্নেরই উত্তর আমরা খুঁজে পাইনি। এই সুযোগে শহিদ হাদিকে ব্যবহার করে কিছু লোক বারবার রাজনীতি করার চেষ্টা করছে, এক দল অন্য দলকে দোষারোপ করে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করছে প্রায়শই।
একজন বাংলাদেশপন্থি আদর্শ রাজনৈতিক নেতা হতে চেয়েছিলেন আমাদের হাদি ভাই, ফলে জীবিত থাকতে অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে খুব বেশি সহযোগিতা পাননি তিনি, কিন্তু এখন তার ‘লাশ’ নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে ঠিকই।
এই লেখায় শহিদ হাদির হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে নিয়ে যেসব প্রশ্ন আমাদের মনে উদিত হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। সেইসাথে যেকোনো রাজনৈতিক দলের ন্যারেটিভকে উপেক্ষা করে নিরপেক্ষ জায়গা থেকে প্রতিটি প্রশ্ন সমাধা করার চেষ্টা করব।
একই সাথে হাদি বিরোধীদের প্রোপাগান্ডামূলক বিভিন্ন যুক্তি খণ্ডনেরও চেষ্টা থাকবে এই লেখায়। কেননা আমরা দেখছি হাদিকে গালিবাজ, গুরুত্বহীন, জামাতের প্রোডাক্ট ইত্যাদি প্রমাণ করার জন্য তার বিরোধীরা সংঘবদ্ধভাবে কতক গুজব আর লজিক্যাল ফ্যালাসি ভরপুর বয়ান বাজারে ছড়ানোর চেষ্টা করছে নিয়মিতই। তাদের সেসব আপত্তিরও যৌক্তিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা থাকবে এই লেখায়।
তিন.
হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভাবলে প্রথম যে প্রশ্নটি আমাদের মাথায় আসে; হাদির বিরোধীরাও তাকে খাটো করার জন্য এই প্রশ্নটিই করে থাকে নরমালি, তবে ওরা ফ্রেমিংটা করে এভাবে—হাদিকেই কেন মারা হলো? জুলাইয়ের প্রথম সারির সমন্বয়কদের বাদ দিয়ে তার মতো থার্ড লেয়ারের নেতাকে কেন হত্যা করল লীগ?
এই প্রশ্নের উত্তর এতটা সহজ না আসলে। তাকেই কেন হত্যা করল, সেটা শুধু খুনিরাই বলতে পারবে। তবে হাদিকে যেভাবে ফ্রেমিং করা হচ্ছে ‘থার্ড লেয়ারের নেতা’ হিসেবে—যেন তার গুরুত্ব কম ছিল—সেটা আসলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফ্রেমিং ছাড়া কিছুই না। কারণ জুলাই যখন সংঘটিত হয়, তখন হাদি থার্ড লেয়ারের নেতা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে জুলাইকে ঔন করার ফলে তিনি লীগের চোখে হয়ে যান প্রথম সারির নেতা।
তাই যখন তাকে হত্যা করা হয়, সেসময়ের কথা চিন্তা করলে আমরা দেখি, তখন হাদির জনপ্রিয়তা হাসনাত-সার্জিসদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না, বরং একমাত্র হাসনাতকে বাদ দিলে বাকি সব ছাত্রনেতা থেকে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
খেয়াল করলেই বুঝবেন, যাদেরকে প্রথম সারির নেতা বলা হচ্ছে বা যাদেরকে আমরা চিনি, তাদেরকে ততদিনে কোনো না কোনোভাবে বিতর্কিত করা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু একমাত্র হাদিই ছিলেন ক্লিন ইমেইজের অধিকারী; যাকে বদনাম করা যাচ্ছিল না, কোনোভাবেই তাকে থামানো যাচ্ছিল না যাকে।
আমরা জানি, জুলাইয়ের একদম প্রথম সারির নেতা হলেন নাহিদ আর আখতার। এর মধ্যে আখতার হোসেন তো জুলাইয়ের পর থেকে মোটামুটি দল গঠনেই ব্যস্ত ছিল। উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করার পর নাহিদও একই কাজ করেছে। ফলে তারা বড় নেতা হলেও বারবার জুলাইকে সামনে এনে সেভাবে লীগকে হার্ট করতে পারেননি—যতটা হার্ট করতে পেরেছেন শহিদ হাদি। মানে তারা অতটা ভোকাল নেতা নন।
ভোকাল ছিলেন যারা, তাদের মধ্যে কাকে কী বলা হয় সেটা দেখুন : হাসনাতকে বলা হয় বন্যার টাকা মেরে খেয়ে ফেলেছে। সার্জিস আর সাদিক কায়েমের ব্যাপারে বলা হয়, তারা একসময় ছাত্রলীগের লুঙ্গির নিচে ছিল। আসিফ মাহমুদের ব্যাপারে তো অভিযোগের শেষ নাই। এগুলো কোনোটাই হয়তো সত্য না, কিন্তু এসব কন্সপিরেসি আর গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে তাদের জনপ্রিয়তাকে কিছুটা কমানো গেছে বলে আমরা দেখি।
এর বাইরে আরও প্রথম সারির ভোকাল নেতা হলেন—আবু বাকের মজুমদার, রিফাত রশিদ, আব্দুল কাদের এবং নারীদের মধ্যে নুসরাত তাবাসসুম ও উমামা ফাতেমা। তাদেরকে আমরা জুলাইয়ের পর ভোকাল দেখলেও জনগণ তাদের নেতৃত্ব মেনে নেয়নি বামপন্থার প্রতি টান থাকার কারণে। মানে তারা হয়তো পুরোপুরি বামপন্থি না, কিন্তু তাদের কোনো কোনো বক্তব্য বামপন্থিদের সাথে এলাইন করে। তাদের মতামত ভুল নাকি সঠিক, সেটার চেয়ে বড় কথা হলো মানুষ তাদেরকে কীভাবে নিচ্ছে।
তাহলে এবার লীগের লেন্স থেকে ভেবে দেখার চেষ্টা করেন, আদৌ কি হাদি পরবর্তী সময়ে থার্ড লেয়ারের নেতা ছিলেন, নাকি প্রথম সারির নেতা হয়েছিলেন? গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন কি না? যদি কম গুরুত্বপূর্ণ হতেন, তাহলে তাকে সবগুলো প্রথম সারির মিডিয়া কেন স্পেস দিল? তার কথার যদি মূল্য না থাকত, তাহলে মানুষ তার কথা কেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত?
খেয়াল করলে দেখবেন, হাদি ছাড়াও আরও অনেক থার্ড, ফোর্থ কিংবা ফিফথ লেয়ারের জুলাইয়ের অংশীদাররা পরবর্তী সময়ে লীগের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে কেবল জুলাইকে নিয়ে ধারাবাহিক কাজ করার ফলে। ছোট্ট একটি উদাহরণ হলো—‘জুলাই রেকর্ডস’ যারা চালায় তাদের অন্যতম কবি কাজী ওয়ালিউল্লাহকেও প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেয় লীগের কবি ডাল্টন সৌভাত হিরা; অথচ জুলাইয়ের নেতৃত্বের দিক থেকে চিন্তা করলে কাজী ওয়ালী কত নম্বর লেয়ারের নেতা? তাই জুলাইয়ের সময় ততটা পরিচিত মুখ না হয়েও যে পরবর্তী সময়ে জুলাইকে ধারণ করার কারণে বড় নেতা হয়ে ওঠা যায়, এটা প্রমাণিত। একটু ভালোভাবে খেয়াল করলেই ভুরিভুরি উদাহরণ পেয়ে যাবেন।
সুতরাং হাদিই কেন টার্গেট হলো, এই প্রশ্নটা ভ্যালিড হলেও তাকে কম গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার ফ্রেমিংটা একদমই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যেটা কোনোভাবেই যৌক্তিক না, কেবল তার প্রতি বিদ্বেষের ফলে এইভাবে তাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করা হচ্ছে, তাকে গুরুত্বহীন বানানোর পায়তারা চলছে, অথচ লীগ ঠিকই তার গুরুত্ব বুঝেছিল।
চার.
এরপরে সবচেয়ে বড় যে দুটি প্রশ্ন রয়ে যায় মনে, সেটি হলো—
- তাকে কে বা কারা হত্যা করল?
- তাকে কী উদ্দেশ্যে হত্যা করা হলো? হত্যার মোটিভ কী?
প্রথমত, পুলিশ ও মিডিয়া বলছে খুনটা লীগ করিয়েছে ফয়সালকে দিয়ে, বিশেষত লীগের এক সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাপ্পীকে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে দেখিয়ে চার্জশিট করেছে পুলিশ। ইনকিলাব মঞ্চসহ আরও অনেকের কথাবার্তায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় এজেন্সির লোকজন এই হত্যাকান্ডে জড়িত, জামাত-শিবির মাঝে মাঝেই বলার চেষ্টা করেছে বিএনপি জড়িত কিংবা মির্জা আব্বাসই আসল খুনি, আর ওদিকে হাদি বিরোধীরা দাবি করেছে, তাকে জামায়াত হত্যা করিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, হত্যার উদ্দেশ্য কী ছিল, এই ব্যাপারে পুলিশ জানিয়েছে—রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই লীগের পক্ষ থেকে করা হয়েছে এই খুন। যদিও অন্যদের দাবি ভিন্ন ভিন্ন।
যেহেতু এই পুলিশ আর রাষ্ট্রের ওপর আমাদের ভরসা নাই, তাই তাদের করা রিপোর্টকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। আমরা নিজেদের মতো করে ভাবতে পারি কে কাজটা করিয়েছে। ওদিকে অভিযুক্ত ফয়সাল এগুলোকে তার প্রতি মিথ্যা অভিযোগ বলছে, সেহেতু আপাতত একচুয়াল মোটিভও জানা সম্ভব না, তবে আমরা গেস করতে পারি। কার কী উদ্দেশ্য হতে পারে, সেটা বিশ্লেষণ করলেও খুনি কে হতে পারে সেটাও আঁচ করতে পারব।
লীগ খুনটা করিয়ে থাকলে তাদের উদ্দেশ্য হতে পারে দুই রকম—
- কেবল প্রতিশোধ নিতে হাদিকে হত্যা করা হয়েছে : মানে তারা যে কতটা হিংস্র, সেটা দেখানোর চেষ্টা হতে পারে।
- নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করে হাদিকে বলি দেওয়া হয়েছে : সেক্ষেত্রে হাদি ফ্যাক্টর না, জাস্ট তাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে লীগ দেশে গন্ডগোল লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল মেবি, এবং এই সুযোগে দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে চেয়েছিল বলে ধরে নেওয়া যায়। যেহেতু তারা পরাজিত হায়েনার মতো হয়ে গিয়েছিল, যেকোনো মূল্যে নির্বাচন ঠেকানোটা তাদের লক্ষ্য ছিল। ফলে তারা ভেবেছিল যখন হাদিকে হত্যা করা হবে, তখন অন্যান্য ক্যান্ডিডেটরা ভয় পাবে, নির্বাচন পিছিয়ে যাবে।
উদ্দেশ্য যদি প্রথমটা হয়, তাহলে তো হাদি টার্গেট হওয়াটা মোটেই আশ্চর্যের কিছু না। কারণ হাদি যে পরিমাণ লীগকে চটিয়েছে, তাতে প্রত্যেকটা লীগের কর্মীই একবার করে হয়তো হাদিকে খুন করতে চেয়েছে। আপনারা দেখেছেন, ঈদের খুশিতে চান রাতে মিছিল নিয়ে বের হয়েছে, এবং শ্লোগান ধরেছে—‘আপা ছাড়া; ঈদ মোবারক, লীগ ছাড়া; ঈদ মোবারক।’ এমনভাবে লীগকে আর কে দৌড়ের ওপরে রেখেছে জুলাইয়ের পরে? এখন লীগের জন্য এমন একটা ক্যারেক্টারকে ফেলে দেওয়ার প্ল্যান করাটা অস্বাভাবিক না।
আর যদি উদ্দেশ্য দ্বিতীয়টা হয়, তাহলেও হাদি বেস্ট টার্গেটই ছিল জুলাইয়ের মুখ হিসেবে। কারণ সেসময়ে হাদি বাদে শুধু হাসনাত ছিল যাকে খুন করা হলে পুরো বাংলাদেশে প্রতিবাদ হতো। সেক্ষেত্রে তুলনামূলক হাদিই বেটার চয়েজ ছিল। কারণ হাসনাত তখন গ্রামে গ্রামে ক্যাম্পেইন করছিল, আর গ্রামে গিয়ে নতুন একটা মানুষ আশ্রয় নিয়ে তারপর সুযোগ বুঝে শ্যূট করাটা রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু হাদির সাথে কানেকশন তৈরি করাটা সহজ ছিল সেই হিসেবে।
পাঁচ.
কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, খুনটা ডিপ স্টেট বা এজেন্সি করিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদেরও উদ্দেশ্য হতে পারে দুইটা :
- নির্বাচন বাতিল করা : এই পসিবলিটি আছে; কারণ আসিফ মাহমুদ কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ডিপ স্টেট নাকি তাদেরকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় রাখতে চেয়েছিল। অবশ্য ডিপ স্টেট বলে তিনি কী বুঝিয়েছেন এটা ক্লিয়ার না, আবার তাদেরকে পাঁচ বছর ক্ষমতায় রাখলে এজেন্সির লাভটা কি হতো সেটাও ক্লিয়ার না।
সেইম ব্যাপারটা ইনকিলাব মঞ্চের জুমার এক বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়। শেষবার যখন প্রোটেস্ট হলো ‘হাদি হত্যার বিচার যেন জাতিসংঘের আন্ডারে হয়’ সেজন্য, তখন আন্দোলনকারীদের ওপর খুবই হিংস্রভাবে হামলা করে পুলিশ। সেই বিষয়ে এশিয়া পোস্টের একটা ইন্টারভিউতে জুমা বলেছে, ও্দইন পুলিশদের দেখে মনে হচ্ছিল—প্রশাসনেরই একটা অংশ চাচ্ছে নির্বাচনটা বানচাল হোক, নির্বাচন বন্ধের পায়তারা করেই ওদেরকে পিটানো হয়েছে, জনগণকে উত্তেজিত করার জন্য।
- জনগণকে উস্কে দিয়ে ইউনুস সরকারকে ইমিডিয়েটলি নামানো : ড. ইউনুসের সরকার শেষ সময়ে কিছু চুক্তিতে সই করে গিয়েছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ইন্টেরিম গভমেন্ট গুম প্রতিরোধ বিষয়ক অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন তার কয়েকদিন আগেই। সেসময়ে হাসিনার আমলের গুমের সাথে জড়িত অফিসারদের বিচার সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে কথা হচ্ছিল এবং হাদি বিভিন্ন বাহিনীর অফিসারদের নাম ধরে ধরে সংবাদ সম্মেলনে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছিল; এগুলো অবশ্যই ডিজিএফআইয়ের মাথাব্যথার কারণ। সুতরাং তারা কাজটা করাতেই পারে।
বিএনপির দিকে সরাসরি কেউ আঙুল না তুললেও শুরুতে সকলের সন্দেহ হয়েছিল মির্জা আব্বাসকে। বিএনপিকে সন্দেহ থেকে খালাস করার একটা কারণ হচ্ছে—তারা তখন বারবার নির্বাচন চাচ্ছিল, এমতাবস্থায় এমন একটা হত্যাকাণ্ড সেই নির্বাচনকে বানচাল করার পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারত, তাই তাদের এই রিস্কটা নেওয়ার কথা না।
অপরদিকে মির্জা আব্বাস কাজটা করিয়ে থাকলে তার উদ্দেশ্য তো স্পষ্ট—নির্বাচনে কোনো রিস্ক তিনি নিতে চাচ্ছিলেন না। এটা সন্দেহ করা যায় ঠিকই, কিন্তু কোনো লিংক আপ প্রমাণিত না হওয়ায় বিশ্বাস করা যায় না। এছাড়াও উসমান হাদিকে তিনি আদৌ ভয় পাচ্ছিলেন কি না, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
ছয়.
সর্বশেষ যে সন্দেহটা থাকে, সেটা জামাতকে নিয়ে। তাবৎ হাদি বিরোধী এবং জামাত বিরোধীরা এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে, জামাতই কাজটা করিয়েছে।
আমি মনে করি না তারা এটা করাতে পারে না, অবশ্যই পারে। রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদেরকে আমি অন্য দশটা দলের মতোই ভাবি। স্বার্থের খাতিরে তারা এগ্রেসিভ হতেই পারে।
প্রশ্ন হলো যদি করায়া থাকে তাহলে কেন করেছিল? তাদের উদ্দেশ্যটা আবার কি হতে পারে?
তাদের দুইটা উদ্দেশ্যের কথা জামাত বিরোধীরা বলে থাকে :
- তাদের কোনো জাতীয় ফিগার নাই, তাই হাদিকে তারা তৈরি করেছে মেরে ফেলার জন্য, এবং তাকে জাতীয় নেতা হিসেবে পরিচিত করানোর জন্য।
- হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনের মাধ্যমে একটা গন্ডগোল বাঁধায়া নির্বাচন বানচাল করে সরাসরি ক্ষমতায় যাওয়া অথবা আরও সময় নিয়ে নিজেদেরকে প্রস্তুত করার জন্য।
হত্যার মোটিভ হিসেবে দ্বিতীয়টা মোটামুটি যৌক্তিক, কিন্তু আমরা হাদি হত্যার পরবর্তী সময়ে তাদের কার্যক্রম দেখে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারি—তারা এমন কিছু করে নাই। যদি করতই তাহলে তারা নির্বাচন বানচাল করার কোনো চেষ্টা করল না কেন? তাছাড়া তারা হত্যা করে থাকলে পুলিশ কেন কোনো লিংক আপ খুঁজে পাচ্ছে না? এজেন্সির অপরাধ প্রশাসন লুকাতে পারে, এটা মানা যায়। কারণ তারা এজেন্সির আন্ডারেই থাকে। কিন্তু যে প্রশাসন আর মিডিয়া পান থেকে চুন খসলেই জামাতকে ধুয়ে ফেলে, তারা এমন কোনো তথ্য পেয়ে প্রকাশ করবে না, এটা অবিশ্বাস্য। আবার দেশের গোয়েন্দারাও জানে না, সেটাও বিশ্বাসযোগ্য না।
তবে প্রথম যুক্তিটা একদমই বাজে এবং অযৌক্তিক। এটলিস্ট তারা যেসব যুক্তি দিয়ে এই দাবি করে, সেগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় এগুলো যুক্তি টেকসই না।
যেমন তারা যুক্তি দেয় :
- হাদি ইনকিলাব সেন্টার করার টাকা কই পেল? বড় কারও আশীর্বাদ ছিল নিশ্চিত এবং সেটা জামাতই হবে।
এখন এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আপনাকে একবার ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারটা ঘুরে আসতে হবে। খুবই ছোটো একটা জায়গা, কোনো অফিস প্লেসও না, একটা থাকার ফ্ল্যাটকে একটু গুছায়া কালচারাল সেন্টার করেছে। ঢাকার শহরে অমন একটা বাসা ভাড়া নিতে হলে কিন্তু অত টাকাও লাগে না। এরপর আর কি আছে ওখানে? কয়টা বই ছাড়া? সেই বইগুলোও কিন্তু পাবলিক পোস্ট দিয়ে এভাবে চেয়ে নিয়েছেন হাদি ভাই—আমি কারও কাছে কিছু চাই না কখনো, তবে আপনারা আমার এই কালচারাল সেন্টারটার জন্য এই এই বই লাগবে সেগুলো দিতে পারেন—যখন এই পোস্টটা দিয়েছিলেন, তখনো সেন্টারটা একদম খালি বলা যায়।
তো কীভাবে বলা যায় হাদি জামাতের টাকায় এটা তৈরি করেছিলেন? হতে পারে যারা ডোনেশন দিয়েছেন তাদের কেউ কেউ জামাতের আইডিওলোজি ধারণ করে, কিন্তু এটা ছিল পাবলিক ডোনেশন। এর থেকে বড় বড় প্রতিষ্ঠান মানুষ শুধুমাত্র পাবলিকের ডোনেশন নিয়ে করে ফেলে, কোনো দলের আশীর্বাদ লাগে না; অসংখ্য উদাহরণ আছে আশেপাশে।
- হাদিকে যদি মারার জন্য তৈরি না করা হয়, তাহলে তাকে লাইমলাইটে আনা হলো কেন? তাদের দাবি জামাতের বিভিন্ন পেইজ থেকে নাকি তাকে সিগমা মেইল দেখানো হতো, ভাইরাল করা হয়েছে ইচ্ছাকৃত। অথচ হাদি জীবিত থাকতে তাকে ভাইরাল করেছে সব দলের মানুষই, আবার তাকে গালিও দিয়েছে সব দলের মানুষ। এটাই তার রাজনীতির বৈশিষ্ট ছিল।
সুতরাং এটা একটা হাস্যকর যুক্তি। হাদি জনপ্রিয় হয়েছেন নিজের যোগ্যতায়। জামাত যদি তাকে লোক সাপ্লাই দিতো বা সাপোর্ট দিতো, তাহলে তাকে ছয়-সাতজন লোক নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বেড়ানো লাগত না। তাছাড়া তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ধীরে ধীরে। তার কথায় ওজন ছিল বলেই মিডিয়া তাকে ফোকাসে রেখেছিল, তার সংবাদ আর সাক্ষাৎকার তো শুধু জামাতের পেজ বা মিডিয়াতেই প্রচার হতো না, দেশের প্রায় সবগুলো মিডিয়া তার সংবাদ সম্মেলনে যেত শেষ দিকে এসে। তার লাস্ট সাক্ষাৎকারটা ছিল মেবি সময় টিভিতে, সময় টিভিও কি তাহলে জামাতের ধরে নেব?
তাছাড়া এই মোটিভের ব্যাপারটাই তো অযৌক্তিক—যদি তাদের জাতীয় নেতাই বানাবে হাদিকে, তাহলে কোনো কিছু অর্জন করার আগেই তাকে মেরে ফেলবে কেন? আগে তো তাকে দিয়ে কিছু করাবে এরপর না মারবে? মাত্র তো তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। তিনি এমপি হতেন, মন্ত্রী হতেন, তারপর মেরে ফেললে এটা মেনে নেওয়া যেত।
আবার একজন তার লেখায় দাবি করেছে—হাদির মাথায় নাকি জামাত মৃত্যুর কথা ঢুকিয়ে দিয়েছিল, এজন্য তিনি বারবার মৃত্যুর কথা বলতেন। অথচ সে একটু রিসার্চ করলেই জানতে পারত—হাদিকে কারা হত্যার হুমকি দিয়েছে, সে ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পুলিশকে আগেই দেওয়া হয়েছে; থানায় জিডি করেছিলেন হাদি জীবিত থাকতেই। পুলিশ কেন সেই তথ্য পাবলিশ করছে না? এখন তো বিএনপি ক্ষমতায়, তারা বলুক সেই নাম্বারগুলোর তথ্য বের করে জানাতে। জামাতের কেউ হলে পুলিশ এখনো সেই তথ্য প্রকাশ করছে না, এটা হাস্যকর।
তো এসব ব্যাপার মাথায় রেখে নিরপেক্ষ জায়গা থেকে চিন্তা করলে মনে হয়—লীগ এবং এজেন্সি তথা ডিজিএফআই-সহ প্রশাসনের ভেতরে থাকা বিভিন্ন গ্রুপের প্ল্যানেই হত্যাকাণ্ডটা হয়েছে, তাদের মোটিভটাই বেশি রিলেটেবল মনে হচ্ছে। পুলিশের মেলানো ডটে লীগ উপস্থিত থাকলেও এজেন্সির কথাটা মিসিং মনে হচ্ছে, লীগের একা এটা করার সাহস থাকার কথা না।
আর হত্যার উদ্দেশ্য যদি এটাই হয়, মানে নির্বাচন বানচাল সহ দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা, সেক্ষেত্রে বলা যায় ব্যক্তি হাদি টার্গেট ছিল না আসলে, টার্গেট ছিল—জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি, টার্গেট ছিল নির্বাচন, টার্গেট ছিল বাংলাদেশ। শহিদ হাদি মূলত ‘বলির পাঠা’ হয়ে গিয়েছিলেন তাদের জন্য। যদিও শব্দটা খুবই বাজে হলো, কিন্তু সঠিক ভাবটা বোঝানোর জন্য এরচেয়ে উপযুক্ত শব্দ পেলাম না।
তবে আশার কথা হলো, উদ্দেশ্য যদি এটা হয়েই থাকে তাহলে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ওদের এত লম্বা সময়ের প্ল্যান কীভাবে ব্যর্থ হলো, সেটা একটু খুঁজে দেখি।
সাত.
এখন একটা টার্ম খুব চলছে, সেটা হলো ‘হাদি ব্যবসা।’ এই হাদি ব্যবসা জিনিসটা কী? মানে কেউ হাদিকে নিয়ে বেশি কথা বললে, লেখালেখি করলে, গান বানালে কিংবা হাদি হত্যার বিচার চাইলে কি সে হাদি ব্যবসায়ী হয়ে যায়?
ব্যাপারটা তো এমন হওয়ার কথা না। হাদিকে নিয়ে ব্যবসা করছে এ কথা শুধুমাত্র তখন বলা যায়—যখন হাদির নাম নিলে কারও ফায়দা হয়।
দুঃখজনক সত্য হলো, হাদিকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করেছে বলা যায় জামায়াত-শিবির। এটা অবশ্য শুধু হাদির ক্ষেত্রে না, তারা সবার লাশ নিয়েই ব্যবসাটা করে। যেমন নির্বাচনের আগে তাদের একজন রুকনকে হত্যা করা হয়েছিল। সেসময়ে তারা খুব হইচই করলেও এরপরে কিন্তু সেই ব্যক্তির হত্যাকারীদের বিচার নিয়ে তারা কোনো কনসার্ন দেখায়নি। মানে তাদের আসলে বিচার দরকার না, তাদের দরকার হলো মৃত ব্যক্তির লাশ ব্যবহার করে বিরোধী দলকে চাপে রাখা। হাদির ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
কেন বললাম এ কথা?
- হাদিকে যেদিন গুলি করা হয়, ঠিক সেদিনই ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম একটি পোস্ট করেন। ওই পোস্টে তিনি চাঁদাবাজদের প্রতিরোধ করার কথা বলে মির্জা আব্বাসের দিকে ঈঙ্গিত করে বোঝান—হাদিকে গুলি তিনিই করিয়েছে, তাই তাকে প্রতিহত করতে হবে। যেহেতু তাকে কয়েক লক্ষ মানুষ ফলো করে, তাই তার মতো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এমন একটা পোস্টই অনেক বড় ইস্যু আসলে।
গ্রামের একটা শিবির করা ছেলে তার কোনো পোস্টকে একদম ধর্মগ্রন্থের মতো মনে করে বিশ্বাস করা শুরু করে। ফলে তার এই পোস্টের পরপরই অনলাইনে মির্জা আব্বাসকে ব্যাশিং করা শুরু হয়,। অথচ তখনো কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি। কেবল সন্দেহের ভিত্তিতেই বিএনপিকে হাদির বিরোধী বানানো শুরু করে।
- নির্বাচনের আগে তারা বারবার হাদির নাম নিয়েছে, অথচ তাদের রাজনীতির সাথে হাদির রাজনীতির বিস্তর ফারাক ছিল। এক্ষেত্রে এনসিপির পাটোয়ারি করেছেন আরও জঘন্য কাজ। নির্বাচনে জেতার জন্য একরকম প্রতিদিন হাদিকে বিক্রি করেছেন। তারা ন্যারেটিভ ছড়িয়েছিল—বিএনপি ক্ষমতায় এলে হাদি হত্যার বিচার করবে না। ব্যাপারটা এমন না যে তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিচার নিশ্চিত করা, তারা শুধুমাত্র বিএনপিকে ঘায়েল করার জন্যই বারবার বিএনপিকে হাদি বিরোধী বা হাদির হত্যাকারী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে, এবং নিজেদের ভোট ব্যাংক বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
- হাদি যেদিন শাহাদাত বরণ করে, সেদিন রাতে প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারে হামলা হয়, এতে অন্যান্য ইসলামিস্ট গ্রুপের মতো জামায়াত শিবিরেরও অনেক বড় ইনফ্লুয়েন্স ছিল।
শুধু যে তারা ব্যবসাই করেছে তাই না, বরং হাদির ছবি প্রোফাইলে ব্যবহার করে বিভিন্ন জনকে ট্যাগ দেওয়া থেকে শুরু করে নারীদের গালাগালি করা পর্যন্ত যত কাজবাজ তারা করেছে, তাতে হাদির বদনাম হয়েছে অনেক বেশি। যদিও এসবের জন্য হাদিকে দায়ী করাটা ভোগাজ যুক্তি, কিন্তু মানুষের কাছে একটা খারাপ ম্যাসেজ গিয়েছে তো। যদিও ইদানী এটাকে ট্রিক হিসেবে ইউজ করছে হাদি বিরোধী বিভিন্ন গ্রুপ। বিএনপির কেউ কেউ হাদিকে প্রোফাইলে রেখে ইচ্ছাকৃত মানুষকে গালাগালি করছে তাকে বদনাম করতে, কিন্তু শুরুর দিকে এটা জেনুইন ছিল।
এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিটা হয় হাদির—যারা তাকে শত্রুজ্ঞান করার কথা না, তারাও তাকে নিয়ে কুৎসিত কথা বলা শুরু করে। এগুলোই মূলত হাদি ব্যবসা, তাকে ইউজ করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টাটাই হলো প্রকৃত ব্যবসা।
আট.
অপরদিকে স্বয়ং বিএনপির চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশে এসে সর্বপ্রথম হাদিকে নিয়ে কথা বলেছেন, হাদি হত্যার বিচার নিয়ে কথা বলেছেন। এটা যে কেবল মানুষদের কনভিন্স করার জন্য বা মানুষের ভোটটা পাওয়ার জন্য করেছেন, সেটা যে কেউই বুঝতে পারবে। সুতরাং বলা যায় যে তিনিও হাদিকে নিয়ে ব্যবসাটা করেছেন।
অথচ হাদিকে নিয়ে যাদের ব্যবসা করার অধিকার সবচেয়ে বেশি, তারা কিন্তু ব্যবসাটা করেনি। ইনকিলাব মঞ্চের জাবের-জুমা এবং হাদির বোনের কথা চিন্তা করুন। যেমন হাদির বোন হাদির ওই আসন থেকে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে নাকি করতে দেওয়া হয়নি। তারপরও তিনি চুপ ছিলেন। অন্যদিকে জাবের-জুমারা ইচ্ছাকৃতভাবেই করেননি। না করার সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছিলেন? এটার কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, তারা হাদির নাম ব্যবহার করে নির্বাচনে জিততে চান না। তারা যদি নির্বাচনে করেন, তাহলে নিজেদের দমে করবেন।
আর এখন সবচেয়ে বেশি হাদি ব্যবসায়ী ট্যাগ খাচ্ছেন এই জাবের-জুমারাই, শুধুমাত্র হাদি হত্যার বিচার চাওয়ার কারণে। অথচ চিন্তা করে দেখুন, হাদিকে যে কারণে হত্যা করা হয়েছিল বলে আমরা ধারণা করে থাকি, সেরকম কোনো পরিস্থিতি যে দেশে ঘটেনি এবং ওদের প্ল্যান ব্যর্থ হয়েছে, এটা কেবল জাবের-জুমার কারণে। এতে অন্যান্য ছাত্র নেতাদের অবদানও আছে। কিন্তু মেইনলি জাবের-জুমা তথা ইনকিলাব মঞ্চের কন্ট্রোলের কারণেই স্থিতিশীল ছিল।
নরমালি এরকম সময়গুলোতে শহিদ ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন ও ভাই-ব্রাদার যারা থাকে, তারা দুই ধরনের কাজ করে—হয় তাকে নিয়ে ব্যবসা করে, অথবা নিজেদের ওপর থেকে কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলে; ফলে তারা যেকোনো কাজ করে ফেলে হুটহাট এবং তারা নিয়ম ভাঙে, বিদ্রোহ করে বসে। যেমনটা মুক্তিযুদ্ধের সময় হয়েছে, শেখ মুজিবকে হত্যার পরেও হয়েছে।
এক্ষেত্রে হাদির ঘটনাটাকে ওরা অসম্ভব রকম ভালোভাবে হ্যান্ডেল করতে পেরেছে বলে মনে করি। আমরা দেখেছি সেদিন জানাযায় ১০ লক্ষ মানুষের জমায়েত হয়েছিল, সেদিন যদি তারা বলতেন—আমরা আবার সংসদে ঢুকে যাব কিংবা আমরা ক্যান্টনমেন্টে হামলা করব, তাহলে তারা বলতে পারতেন, কিন্তু তারা এটা বলেননি। তারা ধৈর্য ধরেছেন এবং উল্টো মানুষকে এই ধরনের কাজ করা থেকে বিরত রেখেছেন।
আমরা বলতে পারি, তারা হাদির নাম ব্যবহার করে নির্বাচনও করেনি, আবার প্রতিটা বিক্ষোভ সমাবেশ ইত্যাদি কৌশল করে করার কারণে খুনিদের ইচ্ছাও পূরণ হয়নি। সুতরাং তারা বাদে বাকি সবাই কমবেশি হাদি ব্যবসা করেছে বলা যায়।
নয়.
যারা হাদির বিরুদ্ধে আছে, তারাও হাদিকে নিয়ে ব্যবসা করেছে। সেটা কীভাবে?
হাদির বিরোধিতা করতে গিয়ে তার নাম নিয়ে গালাগালি করাটাই যেন ওদের রাজনীতি হয়ে গিয়েছিল, এটাও তো তাদের জন্য ফায়দাজনক হয়েছে। তারা শুরু থেকেই বারবার হাদির নামে বিভিন্ন কন্সপিরেসি থিওরি নিয়ে আসছিল। যেমন একদম শুরুতে যেদিন তাকে গুলি করা হয়, তখন তার বিরোধীরা এইটা বলে বয়ান তৈরি করে—আরে এগুলো তো নাটক, আমরা সব বুঝি। কোনো ধরনের যাচাই ছাড়াই তারা এই ধরনের কথাবার্তা ছড়াতে থাকে। যখন তাদের এই কথাটা ভুয়া প্রমাণিত হলো এবং হাদি শহিদ হলো, তখনো কিন্তু তারা তাদের ওই মিথ্যা অপবাদের কারণে ক্ষমা চায় নাই। তখনই তো উচিত ছিল নাকে খত দিয়ে রাজনীতি থেকে বের হয়ে যাওয়া, কিন্তু তারা সেটা করে নাই।
এরপরে আরও নোংরা ন্যারেটিভ তারা নিয়ে এসেছিল। জুমার সাথে নাকি কোনো একটা অবৈধ সম্পর্ক ছিল হাদির এবং এই হত্যাকাণ্ডটা রাজনৈতিক না, বরং কোনো ইন্টার্নাল ইস্যু হবে। এই ধরনের আপত্তির কারণে হাদির স্ত্রীকে রাস্তায় পর্যন্ত আসতে হয়েছে। এখন তো এটা প্রমাণিতই। কারণ হাদির স্ত্রী ফেসবুকেও চলে এসেছেন, এখন তারা এটা নিয়ে আর কোনো কথা বলছে না। হাদির বিরুদ্ধে বিরোধিতা করাটাই তাদের রাজনীতি হয়ে উঠেছে, তাই এটাকেও বলা যায় হাদি ব্যবসা।
এছাড়াও হাদির প্রতি পুরোনো সেই ট্যাগ তো আছেই—হাদি হলো মূলত জামায়াত নেতা। অথচ যেকোনো রাজনীতি সচেতন মানুষই বুঝতে পারবেন—হাদি কেন জামায়াতের কেউ না, তাদের মাঝে কী কী পার্থক্য আছে। হ্যাঁ, যেহেতু হাদিও মূলত ডানপন্থি ছিলেন এবং জামায়াতও ডানপন্থি দল, তাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের কার্যক্রম হয়তো মিলে যেত, এটা স্বাভাবিক।
দশ.
আজকে হাদি হত্যার চার মাস হয়ে যাচ্ছে, অথচ এখনো তার বিচার আমরা পাইনি এবং ভবিষ্যতেও পাব এমন কোনো আশা দেখছি না।
আসলে এই দেশ হাদিদের জন্য না। যদি আপনি হাদি হতে চান, তাহলে হয় আপনাকে হত্যা করা হবে, অথবা আপনাকে স্টাবলিশমেন্ট এর ভেতরে ঢুকে যেতে হবে। এমনকি আপনি মরে গেলেও কারও কিছু যাবে আসবে না। আপনি যাদের জন্য নিজের আত্মসম্মানের তোয়াক্কা না করে ক্যামেরার সামনে এসে গালি দেবেন তাদের দুঃসময়ে, তারা আপনার মৃত্যুর পর নিজ নিজ নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত হয়ে যাবে।
যে ছেলেটা ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কারণে আপনি আনন্দ মিছিল করবেন, আপনি শাহাদাত বরণ করার পরে সে গিয়ে স্বরাষ্ট্রউপদেষ্টার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে হেসে হেসে আল্টিমেটাম দেবে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই করবে না।
শহিদ শরিফ উসমান বিন হাদির হত্যা নিয়ে বহু রাজনীতি আসলে হয়েছে, হচ্ছে, আমরা সেসব থেকে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। এরপরও সব প্রশ্নের উত্তর আমরা পাইনি, আর পাবও না হয়তো। তবে একটাই চাওয়া—তার হত্যাকারীদের বিচারটা হোক, তাকে নিয়ে রাজনীতিটা বন্ধ হোক, ভবিষ্যতে এই দেশটা যেন হাদির মতো মানুষদের জন্যই হয়।
হাদি ভাইয়ের কথা মনে হলে কবি জীবনানন্দ দাশের এই পঙক্তি মাথায় আসে—
‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর!’
এই মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব।