ওসমান হাদির শাহাদাত : মুমূর্ষু বাংলাদেশপন্থা

ফ্ল্যাশব্যাক

আধিপত্যবাদ বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে এক জটিল ও কুটিল সমস্যা। দীর্ঘ বছর ধরেই আমরা এই চক্রের ভেতর দিয়ে নানাবিধ সমস্যা হজম করে করে উন্নয়নশীল তকমা ধারণ করেছিলাম। আধুনিক পৃথিবীর প্রেক্ষিতে কোনোমতে টিকে থাকা যেন। কোথাও কোনো স্বস্তি ও সুসংবাদ আমাদের জন্য ছিল না। দুর্নীতি, ঘুষ, অপশাসন, খাদ্যে ভেজাল, আমদানি অপসংস্কৃতি, আইন প্রয়োগে উন্নাসিকতা, আমলাতান্ত্রিকতা, শিক্ষাব্যবস্থাকে বাণিজ্যে পরিণত করা এবং সামাজিক মূল্যবোধহীনতাকে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত করেছিলাম আমরা।

স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তুলতে যে নেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্যের দরকার ছিল, তা কোনোভাবেই আমরা পাইনি। আমরা পেয়েছিলাম বিভাজনের রাজনীতি। পেয়েছিলাম প্রতিহিংসার রাজনীতি আর আমাদের ছিল কিছু অসৎ সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবেপারী। যারা মিডিয়া ও বিনোদন জগতের শাহেনশাহ হয়ে এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের সকল ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে অবদমিত করে এক ভঙ্গুর আমদানি রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক বয়ান গিলাতে থাকে পাঁচ দশক ধরে। এর ফলে আমরা দলে দলে, পার্টিতে পার্টিতে, এলাকাতে এলাকাতে বিভাজিত হই। আজীবন ‘বটমলেস বাস্কেট’ই আমাদের নিয়তি হয়ে যায়।

শহিদ জিয়ার ঝলক

এরশাদের স্বৈর শাসনের পর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ একটা স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক শাসনের উন্নীত হয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এই উন্নয়ন সইতে পারেনি। ফলে ১৯৯৫ সালে শুরু হয় নতুন সংকট। ১৫ দিনের সংসদ গঠন করে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ নীতিতে কিছুটা রাজনৈতিক স্বস্তি পায় জনতা। এরপর আবার ২০০৬-এ এসে রাজনৈতিক সংকট। এক-এগারোর ফখরুদ্দিন-মঈন সরকার। আটের নির্বাচন। আওয়ামী লীগের সরকার গঠন।

এক নতুন ফ্যাসিবাদ ও ব্যক্তিতন্ত্রের দীর্ঘ জুলুম ও অপশাসন। মানুষ মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধরে নিয়েছিল এই ষণ্ডাতন্ত্র ও গুমতন্ত্রের শেষ নেই। নিরাশ মানুষেরা অভিযোজিত হয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করছিল। সবাই কেমন যেন হাত গুটিয়ে একা একা লড়াইহীন শেষ সফরের অপেক্ষা করছিল। তারুণ্য ‘আই হেইট পলিটিক্স’ বলে টাকার মেশিন কিংবা উপার্জনের টুলস হয়ে যাচ্ছিল।

শাপলা চত্ত্বরে গণহত্যা, গুম, খুন, অর্থ পাচার, ব্যাংক লুট, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্ক্যাম, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ভিপি নূরদের কোটাবিরোধী আন্দোলন, মোদিবিরোধী আন্দোলন, ইজরাইলে ভ্রমণ বাধা পাসপোর্ট থেকে উঠিয়ে নেওয়া ইত্যাদি কোনো কিছুই জনতাকে রাজপথে টেনে আনতে পারেনি। এক অজেয় শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল হাসিনা-লীগ-ভারত ত্রয়ী।

দোষাদোষী-ট্যাগাট্যাগি

ইতোমধ্যেই চেতনার বাণিজ্য জমজমাট। এক চেতনার ছাকনিতেই বিরোধী মতের সবাইকে খারিজ করে দেওয়ার রেওয়াজ তীব্র তখন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আর বিপক্ষের বিভাজনে ক্ষমতার চেয়ার তখন সুসংহত। মানুষ ন্যারেটিভ আর ইস্যু দিয়ে ইস্যু ঢাকার খেলায় খেই হারিয়ে ফেলছে।

ভারতপন্থি, পাকিপন্থি, পিকিংপন্থি, ইউএসপন্থি, জেহাদি, তালেবানি, হিজবুতি, জঙ্গী ইত্যাদি ট্যাগে এক জটিল ও কুটিল বিভাজনের আত্মঘাতী খেলায় আমরা মেতে উঠি। ভারতপন্থি ছাড়া আর কোনোটিই দৃশ্যমান ছিল না। ঠোঁটকাটা লোকজন বলেন, ভারতপন্থাকে নিরাপদ রাখতেই বাকি ইউটোপিয়ান পন্থাকে নির্মাণ করেছিল লীগ-ভারত যৌথ প্রযোজনায়।

অপরদিকে বামপন্থা যারা সবসময়ই নীতি আদর্শের কথা বলত, তারা হয়ে গেল লীগের ভ্যানগার্ড। কেউ মন্ত্রিত্বের বিনিময়ে আর কেউ অদৃশ্য লেনদেনে। ফলাফল এক দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের অপশাসনে আমাদের কেবলই পেছনে হাঁটা।

শিক্ষা, সংস্কৃতি, সিনেমা, রাজনীতি, মূল্যবোধ সবকিছু ধ্বংস করে একটা অথর্ব জাতিতে পরিণত করে আমাদেরকে পরনির্ভরশীল করার সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছিল হাসিনার দল ও সরকার। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সবকিছুকেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজের মতো চালানোর স্বৈরপন্থাকে প্রতিষ্ঠিত করার সকল আয়োজন সম্পন্ন করার শেষ প্রস্তুতি চলছিল। কেউই মুখ খুলতে পারছিল না। যারা কথা বলত তাদের অধিকাংশই বিদেশ থেকে বলত। আর যারা দেশে থেকে বলত, প্রতিবাদ করত, তারা হতেন নানাবিধ জুলুমের শিকার। জেল, গুম, আয়নাঘর ও ক্রসফায়ার ছিল তাদের অন্যতম অস্ত্র। একটা অবগুণ্ঠনের পরিবেশে দমবন্ধ হয়ে আসছিল আমাদের।

কেউ কালচারে, কেউ ফ্যাশনে, কেউ জীবনযাপনে, কেউ আবার রাজনীতিতে বহুবিধ এজেন্সির এজেন্ডা নিয়ে সরব ছিল মাঠে। হঠাৎ করেই কেউ হারিয়ে যেতেন। দাড়ি-টুপিঅলা হলে কয়েক মাস পর জঙ্গী তৎপরতার অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হতো। কাছের মানুষেরা নির্বাক হয়ে তাকে বহু এঙ্গেল থেকে দেখার কসরত করত। কিন্তু ঠোঁট সেলাইকালে সবাই থাকত চুপচাপ।

২৪ সাল এবং জুলাই

এভাবেই কোনোভাবে টিকে থেকে, বেঁচে থেকে আমরা একদিন উপনীত হই ২৪ সালের জুলাই মাসে। রাজপথে নামে মানুষেরা। ছাত্ররা। চাকুরিতে কোঠা নামক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। মূলত দানবের বিপক্ষে মানবের লড়াই শুরু হয়। অধিকারের দাবি শেষ পর্যন্ত দানবের পতনের দাবিতে পরিণত হয়। আমরা জানি মানুষ রাজপথে এলে দানবের দিন, দহনের দিন কিংবা অবদমনের দিন শেষ হয়। দানব পালায়। স্বৈরতন্ত্রের পতন হয়।

তারুণ্য এই জুলাই অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বড় যে সবকটি পায় সেটি হলো, বাংলাদেশপন্থা। দিল্লি না ঢাকা? এই প্রশ্নে ‘ঢাকা’র উচ্চারণ এক নতুন নাগরিক চৈতন্যের উত্থান ঘটায়। প্রবল ধ্বনি ঝংকারে ‘ঢাকা’ হয়ে ওঠে নতুন ঐক্যের প্রতীক। ওদিকে তারেক জিয়ার—‘দিল্লি নয় পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটিও বাংলাদেশপন্থার রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে ওঠে।

ধীরে ধীরে জুলাই থেকে আগস্ট হয়ে বাংলাদেশ এক নিষ্ঠুর স্বৈরাচারের রাহুমুক্ত হয়ে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদকে তো পরাজিত করেছি আমরা; কিন্তু কালচারাল ফ্যাসিবাদকে কীভাবে মোকাবেলা করব। এই ফ্যাসিবাদ আমাদের মগজে মগজে ঝাণ্ডা গেঁড়ে বসে আছে। ভারত-লীগের প্রক্সি দেওয়ার জন্যে এই কালচারাল ফ্যাসিবাদ পেটেভাতে কামলা খাটতেও তৈরি হয়ে আছে।

‘৩৬ জুলাই’ পর্যন্ত যে আন্দোলনকে ফুয়েল দিয়েছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান কবিতা আর ইসলামপন্থি জনতার ত্যাগ; সেই আন্দোলনের পর পরেই রবীন্দ্রনাথের প্রেতাত্মারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সক্রিয় হয় দেশকে অস্থিতিশীল করতে মাজারে ভাঙচুর করার কিছু লোক। ছায়ানট আর উদীচী যারা শিল্পচর্চার আড়ালে লীগের ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রেখেছিল, তারাও প্রাসঙ্গিক হওয়ার জন্য ন্যারেটিভের খেলা শুরু করল। যে ইসকন ভারতীয় এজেন্ডা নিয়ে লীগের বি-টিম হয়ে কাজ করত, সেই ইসকন তৎপর হয়ে উঠল অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করতে। মাঠে নেমে এলো বহুবিধ প্রক্সি ক্যারেক্টার। সেই প্রক্সি ক্যারেক্টারগুলো নানা রকমের পথ ও পন্থার কাঁধে সওয়ার হলো। একটা অস্থিতিশীল জাতীয় পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের’ মতো উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করেছে কেউ কেউ। আবেগী ইসলাম প্রিয় কিছু ভাইও সেইসব বিভ্রান্তির ভেতরে প্রবেশ করেছেন।

ফিনিক্সের উত্থান

যখন চারদিকে ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা, ভিন্ন ভিন্ন গেম, ভিন্ন দেশের ডেডিকেটেড দালালেরা তৎপর, তখনই দৃশ্যপটে হাজির হন জুলাই সংগ্রামের অন্যতম মুখ শরিফ ওসমান হাদি। সাহস, ভাষা, স্পর্ধা আর চেতনার এক কমপ্লিট প্যাকেজ যেন। সকল পথ আর মতকে একপাশে রেখে বাংলাদেশি চেতনার বাংলাদেশপন্থা নিয়ে আনোখা সব বক্তব্য দিয়ে হাদি জনতার ফোকাসের প্রায় পুরোটাই টেনে নেন নিজের দিকে।

তাঁর আটপৌরে বাংলাদেশি ভাষা। বাড়ির পাশের ছেলেটির মতো হেঁড়ে ও ভরাট গলা। যেন কোনো আপনজন আমাদের না বলা কথাগুলো আমাদের হয়ে দ্বিধাহীন বলে দিচ্ছেন। ভয়ডরহীন যেখানেই অনিয়ম সেখানেই আওয়াজ উঠাচ্ছেন। মনে হচ্ছে ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসছেন কোনো নেক দিল যুবরাজ। যার নীতি-আদর্শ খুল্লামখুল্লা।

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে এই অভ্যুত্থানের তরুণ নায়কেরা ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে, রাজনৈতিক দল করে, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষে নিজেদের ইমেজ ও পার্সোনালিটি খুইয়েছেন। মানুষের প্রত্যাশার রংকে করেছেন ধূসর। নতুন বাংলাদেশের গণস্বপ্নকে প্রায় কবর দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের চর্চিত অপরাজনীতির চক্রেই তারা আবর্তিত হচ্ছিলেন।

এমন সময় নিরেট একটা স্বদেশি চৈতন্যের লক্ষ্য নিয়ে সক্রিয় হন শরিফ ওসমান হাদি। রাজনৈতিক লড়াইয়ের চেয়ে সাংস্কৃতিক কাউন্টার লড়াই এবং প্রতি-বয়ান তৈরি করতে শুরু করেন তিনি। গঠন করেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। চলতে থাকে তাঁর নিজস্ব লড়াই। বাংলাদেশপন্থার লড়াই।

বাংলাদেশপন্থা কী?

বাংলাদেশে এর আগে জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ও বাম-আওয়ামীলীগের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে একটা বিরোধ রীতিমতো সংঘাতেও পরিণত হয়েছিল। এই দুই জাতীয়তাবাদ মৌলিকভাবে আমাদের বিভাজনের খেলাটাকে এগিয়ে নিয়েছিল। দিনশেষে এই পরিচিতিটি রাজনৈতিক ক্যাডারের বিষয় হয়ে যায়। এই দুইয়ের বিরোধের ভেতর দিয়ে চব্বিশের অভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে ‘বাংলাদেশপন্থা’ নামে আরেকটা নতুন রাজনৈতিক দর্শন সামনে চলে আসে। প্রশ্ন হলো, এই ‘বাংলাদেশপন্থা’ কি শেষ পর্যন্ত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ আর ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’র মতো আরেকটি বিরোধের জন্ম দেবে!

তবে আশার কথা—আগের দুটি জাতীয় পরিচয় আর শেষোক্তটি একটা রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে উঠছে। এই বাংলাদেশপন্থার পোস্টার-বয় হয়ে উঠছিলেন ওসমান হাদি।

তাহলে বাংলাদেশপন্থাটি হলো, চিন্তা-চেতনায়, রাজনীতি-অর্থনীতিতে, শিল্প-সংস্কৃতিতে ও সমাজ বাস্তবতায় আমাদের চেতনায় শুধু বাংলাদেশ থাকবে। পৃথিবীর যেকোনো দেশ বা শক্তি আমাদের বন্ধু হতে পারবে। কিন্তু কখনোই বড় ভাই হতে পারবে না। আমরা আমাদের ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত নেব। আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে নিজেদের এগিয়ে নেব।

আর ওসমান হাদির বাংলাদেশপন্থার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল—ইসলাম ও মুসলমানদের কৃষ্টি-কালচার। বিগত ৫০ বছর ধরে উদীচী ও ছায়ানটীদের হাত ধরে ভারতীয় আধিপত্যবাদের যে সংস্কৃতিকে আমাদের বলে গিলানো হয়েছে, তা মূলত ছিল এই দেশের ইসলাম-মুসলিমদের উপেক্ষার সংস্কৃতি। ইসলাম-মুসলিমদের অপর করে দেখার রাজনীতি।

বাংলাদেশপন্থা এইসব ভারতীয় ও হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি ও এজেন্সির করতল থেকে বেরিয়ে নিজের ভালো বুঝে চলা। রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে নিজস্বতায় উত্তরণ।

হাদির শাহাদাত এবং…

গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ শুক্রবারে দুপুরে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় হাদিকে গুলি করে আততায়ীরা। এরপর ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শাহাদাতের অমীয় সুধা পানে ধন্য হয় তাঁর জীবন। এই শাহাদাতের মধ্য দিয়ে একটা কথা পরিষ্কার—বাংলাদেশপন্থার রাজনীতি ও নিজস্ব সংস্কৃতি চেতনার মূল্য এই দেশে জীবন দিয়ে শুধাতে হয়। যেমনটা চুকিয়ে ছিলেন শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

ওসমান হাদির মধ্যে জিয়ার চেতনার প্রতিচ্ছায়া দেখেছিলাম আমি। যদি তিনি নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারতেন, তাহলে জিয়ার মতোই সত্যিকারের দেশপ্রেমিক নেতা হয়ে উঠতেন। শহিদ রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম ধারক হয়ে উঠতেন ওসমান হাদি।

তাহলে কি বাংলাদেশপন্থিদের পরিণতি জিয়াউর রহমান ও ওসমান হাদির মতোই হবে?!

এইসব পরিণতি যেন না হয়, সেজন্যই তাঁরা জীবনকে সওদা করেছেন বাংলাদেশপন্থার বিনিময়ে। এখন আমরা এই লিগ্যাসিকে কতটা আপন করে এগিয়ে নিতে পারব—সেইটা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। আগামীর শাসকদেরকে বাধ্য করতে হবে সকল বিদেশি শক্তি ও আধিপত্যবাদকে উপেক্ষা করে নিজেদের মতো দাঁড়িয়ে যেতে।

যদি ক্ষমতাসীনরা বাংলাদেশপন্থাকে ঔন করেন, তাহলে এদেশের আমজনতা প্রয়োজনে একবেলা কম খেয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে তৈরি হয়ে যাবে। যেমনটা আমরা ২৪-এর আন্দোলনে আমাদের জীবন ত্যাগের মাধ্যমে ও রক্তের নজরানার মাধ্যমে প্রমাণ করেছি।

এখন শুধু বিচার

ওসমান হাদির খুনিদের বিচার করলেই হবে না, এর পেছনের সকল কুশীলবকে খুঁজে বের করে জনতার সামনে তথ্য উন্মোচন করতে হবে। বন্ধ করতে হবে এইসব খুনের পথ ও পন্থা। আমরা যদি এটুকু করতে ব্যর্থ হই, তাহলে এই দেশে এভাবে বহু মানুষ আমাদের বাঁচাতে এসে জিয়া ও ওসমান হাদির মতো শহিদ হয়ে যাবে। একদিন এমন হবে—ওসমান হাদিরা নীরবে দেশ ছেড়ে চলে যাবেন। এই দেশ আরেকটা সিকিম, আরেকটা আররাকান হয়ে উঠবে। লেন্দুপ দর্জিদের মতো ভীরু ও দালালেরা এই দেশের নেতা ও শাসক হয়ে উঠবে।

ওসমান হাদির এই শাহাদাতের মামলায় কাউকেই সন্দেহের বাইরে রাখার সুযোগ নেই। বরং প্রতিটি সক্রিয় পক্ষকে সন্দেহের চোখে রেখে তদন্ত চালু রাখতে হবে। যেকোনো ব্যক্তি বা গণমাধ্যম এই বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার জন্য ধূম্রজাল তৈরি করবে, অপতথ্য সরবরাহ করবে—তাদেরও সন্দেহের আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশপন্থার আগামী

আমরা যদি এই শাহাদাতের বিচার করতে না পারি, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে কালপ্রিট হয়ে যাব। অপরাধীরা আরও দুর্দমনীয় হবে। আশকারা পাবে। প্রথমত মানুষ দেশের জন্য, জাতির জন্য ঝুঁকি নিতে ভয় পাবে। আবার অসৎ ও ভণ্ডরা শাসক হবে। দ্বিতীয়ত আমাদের ইন্টেলিজেন্স ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের প্রতি জনতার আস্থা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে শত্রুপক্ষও আমাদের থোড়াই কেয়ার করবে। প্রতিটা সীমান্ত আবার উত্তাল হবে। অগণিত ফেলানি ট্রাজেডির পরে আমাদের কাঁদতে হবে। প্রতিবেশী আরও নিষ্ঠুর ও বিরক্তিকর হয়ে উঠবে। মুমূর্ষু হয়ে উঠবে বাংলাদেশপন্থা।

ইনকিলাব মঞ্চ

বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটাই কালচারাল হিপোক্রেটরা নিয়ন্ত্রণ করত। ওসমান হাদির ইনকিলাব মঞ্চ সেই কালচারাল পার্ভার্টদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। আমরা জুলাইয়ের অংশীদাররা এখন যদি হাদির এই কালচারাল ফাইটকে এগিয়ে নিতে না পারি, ইনকিলাব মঞ্চকে আপন করে নিতে না পারি, তাহলে সেই কালচারাল হিপোক্রেটরা অগণিত হাসিনা তৈরি করবে। তাই ওসমান হাদির বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি ও বাংলাদেশি সংস্কৃতির বাস্তবতাই আমাদের ইজ্জত ও আজাদির ভবিষ্যৎ।

শেষের আগে

একটা নতুন বাংলাদেশ আমরা যদি চাই, নয়া বন্দোবস্ত যদি চাই, মাথা উঁচু করে ইজ্জতের সাথে স্বাধীনতা উপভোগ করতে যদি চাই—তাহলে অবশ্যই আমাদের বাংলাদেশপন্থাকে ঔন করতে হবে। বাংলাদেশপন্থাকে ঔন করলে ওসমান হাদিকেও ঔন করতে হবে। ঔন করতে হবে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকেও। ফলে আজকে যারা নিজেদের জিয়ার উত্তরাধিকার ভাবেন, তাদেরকে সবার আগে ওসমান হাদির খুনিদের বিচারের আওয়াজ তীব্র করতে হবে। তাহলেই জিয়ার বাংলাদেশপন্থার যথার্থ উত্তরাধিকার হাদির বাংলাদেশপন্থা তার মুমূর্ষু অবস্থা থেকে বের হয়ে নতুন বাংলাদেশের গণস্বপ্নকে বাস্তবায়ন করে দেবে।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *