পৃথিবীর ইতিহাসে বিখ্যাত কয়েকজন পর্যটকদের মধ্যে ইবনে বতুতার নাম থাকবে প্রথম সারিতে। তিনি বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীকে জানার জন্য। মাত্র ২১ বছর বয়স থেকে শুরু করে জীবনের পরবর্তী ৩০ বছরে তিনি প্রায় ৭৫,০০০ মাইল (১,২১,০০০ কিমি) পথ পরিভ্রমণ করেছেন। তবে এই বিখ্যাত পর্যটকের বিশ্বভ্রমণের অনেকাংশে জড়িয়ে আছে সুফি-দরবেশের সাক্ষাতের গল্প। ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেন, তার সফরগুলোর মূল উদ্দেশ্য থাকত—সে দেশের বড় পীর,বিখ্যাত সূফি-দরবেশ ও বিজ্ঞ আলমদের সাথে মোলাকাত করা। ঐতিহাসিকরা আরও বলেন, ইবনে বতুতার বাংলাদেশে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মহান দরবেশ হজরত শাহজালাল ইয়েমেনির সাথে সাক্ষাৎ করা।
তখন ১৩৪৬ সাল। ৯ ই জুলাই। এই সবুজের বুকে পা রাখেন বিশ্বপর্যটক ইবনে বতুতা। ইবনে বতুতা যখন বাংলায় আসেন তখন বাঙ্গালা সালতানাতের শাসক ছিলেন, সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ। ইবনে বতুতা প্রথমে বাংলা ভূখন্ডের যে অংশে প্রবেশ করেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তুহফাতুন নাজ্জার ফি গারা-ইবিল আমসার ওয়া আজা-ইবিল আসফার’—এ তিনি সেই জায়গার নাম উল্লেখ করেছেন ‘সাঁদকাও’1 তথা চাটগাঁও। তারপর সেখান থেকে সিলেটের দিকে রওনা দেন। ইবনু বতুতা সিলেট অঞ্চলকে কামরূপের অন্তর্গত অঞ্চল বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি ‘নহরে আজরক’ তথা সুরমা নদী দিয়ে হাবাঙ্ক (গবেষকদের মতে আজমিরিগঞ্জ) শহর হয়ে জলপথে সিলেট আসেন। তাঁর বর্ণনায় সিলেটিদের গড়ন ছিল তুর্কিদের মতো চ্যাপটা নাকবিশিষ্ট; এর অধিবাসীরা ছিল দুঃসাহসী ও জাদুবিদ্যায় পারদর্শী। সিলেটকে তিনি একটি গহীন বনভূমি বলে বর্ণনা করেছেন2।
তাছাড়া ইবনে বতুতা তার সফরনামা আজায়িবুল আসফার গ্রন্থে হজরত শাহজালাল ইয়েমেনির সাথে সাক্ষাতের দীর্ঘ ইতিহাস ও কয়েকটি কারামতের বর্ণনা পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকরা ইবনে বতুতার কথা নকল করে এভাবে বর্ণনা করেন—“আমি শায়েখ শাহজালাল ইয়েমেনির সাথে সাক্ষাতের জন্য যখন বের হই, তখন তাঁর তিন-চারজন ভক্ত বা শিষ্য আমাকে এগিয়ে নিতে আসে। আমাকে অভ্যর্থনা জানায় তারা। তারা বলছিলেন, শায়েখ আমাদেরকে জানিয়েছেন, ‘আজ একজন মরক্কো দেশীয় ভ্রমণকারী আমার এখানে হাজির হবেন। তোমার হুজরাখানার বাহিরে অবস্থান করতে থাকো। তিনি এলে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে আমার হুজরায় নিয়ে আসবে।’ শিষ্যরা বলছিলেন, ‘তাই আমরা শায়েখের নির্দেশ অনুসারে এসেছি।’ শিষ্যদের এ কথা শুনে আমি তো ভীষণ থেকে ভীষণ হতবাক হয়ে যাই। যিনি আমাকে কখনো দেখেন নাই। আমার সমন্ধে তার কোনো সাক্ষাৎজ্ঞান নেই। তাহলে কীভাবে তিনি আমার আগমনের সংবাদ পেলেন! এটা একজন বড় পীর ও কামেল দরবেশ ছাড়া আর কারও পক্ষে সম্ভব নেই। নিঃসন্দেহে তিনি বড় আল্লাহওয়ালা ও বুজুর্গ মানুষ। আমি আর সাতপাঁচ না ভেবে তাদের সাথে শায়েখের খেদমতে হাজির হই।”3
ইবনে বতুতা হজরত শাহজালাল ইয়েমেনির সাথে সাক্ষাতের বাকি গল্প বুনেন এভাবে—“শায়েখের খানকায় খুব বেশি লোকজন ছিল না। খুব নিরিবিলি ও শান্ত্ব প্রকৃতির। তবে ভক্তকুল ও শিষ্যরা নিয়মিত আসাযাওয়া করত। ধর্মবর্ণ তথা হিন্দু-মুসলমান সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল সেই খানকা। হিন্দু-মুসলমান সবাই শায়েখকে দর্শন করতে আসত। মুলাকাত করে দোয়া নিয়ে যেত। তারা অধিকাংশই হাদিয়া-তুহফা নিয়ে আসত। সেগুলো আবার যারা গরিব-দুঃখী, ফকির- কাঙ্গাল ছিল খানকায়; তারা ভক্ষণ করত। শায়েখ সেগুলো খেতেন না। তিনি একটি গরুর দুধ খেয়ে তামাম দিন কাটাতেন। আমি যখন তার খেদমতে হাজির হলাম—তখন তিনি দাঁড়িয়ে আমার সাথে মুয়ানাকা করলেন। আমার ও আমার পরিবারের হালপুরসি করলেন। আমি আনত নয়নে নিচু স্বরে সবকিছুর উত্তর দিলাম। তারপর তিনি বলতে থাকেন, ‘আপনি আরবের মধ্যে বিখ্যাত ভ্রমণকারী। পাশ থেকে শায়েখের এক মুরিদ বলে উঠেন, ‘হজরত, তিনি আরব ও আজম তথা আরব ও অনারবে একজন বিখ্যাত পর্যটক।’ তখন শায়েখ বলছিলেন, ‘হ্যাঁ তিনি আরব ও অনারবের মধ্যে বিখ্যাত ভ্রমণকারী। তোমরা তার ইকরাম করো। যথাযথ সম্মান ও কদর করো।’ তারপর আমাকে খানকায় নিয়ে লাগাতার তিনদিন পর্যন্ত আতিথেয়তা ও আপ্যায়ন করেন।”4
ইবনে বতুতা আরও বলেন, “আমি যেদিন প্রথম শায়েখের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাই, সেদিন ছাগলের উল বা চামড়ার তৈরি একটি জুব্বা তাঁর পরনে ছিল। জুব্বাটি খুব মনে ধরেছিল আমার। মনে মনে বলেছিলাম, হায় যদি শায়েখ জুব্বাটি আমাকে হাদিয়া দিতেন! তাহলে খুব আনন্দিত হতাম। কিন্তু যেদিন আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি, সেদিন শায়েখ তাঁর নিজের গতর থেকে জুব্বাটি খুলে আমাকে পরিয়ে দিলেন এবং নিজের মাথার টুপি খুলে আমার মাথায় রেখে দেন। আমি খুব অবাক হয়ে যাই এই ঘটনা দেখে। এই সুন্দর জুব্বা পরে যখন হুজরার বাহিরে এলাম, তখন শায়েখের শিষ্যরা আমাকে জানান, ‘শায়েখ সচরাচর জুব্বা পরেন না। তাঁর জুব্বা পরার খুব অভ্যাসও নেই। শুধুমাত্র আপনার আসার সংবাদ শুনে জুব্বা পরেছিলেন। তিনি জুব্বাটি পরে শিষ্যদের জানিয়েছিলেন, মরক্কো থেকে একজন ভ্রমণকারী এসে নাকি জুব্বাটি তাঁর কাছে তলব করবেন। আর তিনিও দিয়ে দিবেন। প্রকৃত অর্থে এই জুব্বাটি শায়েখের নয়। শায়েখের ঘনিষ্ঠ বন্ধু চীনে অবস্থানরত ইসলামপ্রচারক শায়েখ বুরহান উদ্দিন সাগরজি রাহ.-এর জন্য তা তৈরি করা হয়েছিল।’
শায়েখ তার অনুচরদের আরও বলেছিলেন, ‘আমার মাধ্যমে (ইবনে বতুতা) জুব্বাটি তার কাছে পৌঁছবে ঠিক, কিন্তু চীনে পৌঁছামাত্রই এক বিধর্মী রাজা তার থেকে সুনিপুণ কৌশলে জুব্বাটি হাতিয়ে নিবেন। অবশ্য সে বিধর্মী রাজা শেষমেশ তা শায়েখ বুরহান উদ্দিন সাগরজির কাছে পৌঁছে দেবেন।”5
ইবনে বতুতা যখন শাহজালাল ইয়েমেনি রাহ.-এর অনুচরদের থেকে এই ঘটনা শুনলেন, চীনের রাজা তার থেকে জুব্বাকে কেড়ে নেবেন, তখন তিনি মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করলেন, এই মূল্যবান জুব্বা পরে কখনোই চীনের বিধর্মী রাজার মুখোমুখি হবেন না। যেহেতু তিনি একজন মহান দরবেশের দোয়ার নিদর্শনস্বরূপ এই জুব্বাটি পেয়েছেন, তাই তিনি তা সহজে হারাতে চান না। তারপর তিনি শায়েখের কাছ থেকে বিদায় নেন। তারপর তিনি ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
তারপর দীর্ঘকাল অতিবাহিত হয়ে যায়। ইবনে বতুতা বলেন, “একবার আমি চীনে যাই। সেখানকার খনশা শহরে সঙ্গীদের সাথে ঘুরাঘুরি করছিলাম। সেবার খনশা শহরে প্রচন্ড ভিড় ছিল। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে আমি একাকী হয়ে যাই। সেদিন আমি শাহজালাল ইয়েমেনি থেকে হাদিয়াপ্রাপ্ত উলের জুব্বা পরেছিলাম। পথে উজিরের সাথে মুলাকাত হয়। তিনি আমাকে ডেকে হাল ধরে হালপুরসি জিজ্ঞাসা করলেন। আমি উত্তর দিলাম। আমরা রাজদরবারে গেলে চীনের সেই রাজার দৃষ্টি নিবন্ধ হয় আমার জুব্বার উপর। জুব্বাটি দেখে তিনি খুব প্রশংসা করে বললেন, ‘জুব্বাটি খুলে আমাকে দাও।’ আমিও সহজেই হুকুম মেনে নিই। জুব্বাটি নিয়ে রাজা আমাকে দশটি খলয়াত, একটি ঘোড়া ও খরচাপাতির জন্য কিছু নগদ অর্থকড়ি দিলেন। আমার ভেতরটা তখন দুঃখে ভারী হয়ে উঠছিল! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পরের বছর আমি পিকিং শহরে শায়েখ বুরহান উদ্দিন সাগরজির সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখি শায়েখ আমার ঐ জুব্বাটি পরে কুরআন তেলাওয়াতে মগ্ন। আমার ভেতরটা নড়ে ওঠে। বারবার জুব্বাটি হাত দিয়ে নাড়িয়ে দেখছিলাম, তখন শায়েখ বলে উঠেন, ‘এভাবে দেখার কী আছে! জুব্বাটি চিনো নাকি?’ তখন আমি শায়েখের কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করি। তখন শায়েখ বললেন, ‘আমার বন্ধু জালাল উদ্দিন (শাহজালাল ইয়েমেনি) জুব্বাটি আমার জন্য তৈরি করেছিলেন। তারপর আমাকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছে, অমুক লোকের মারফত তোমার কাছে এই জুব্বাটি পৌঁছাবে।’ ঐ চিঠির বিবরণ দেখে তো আমি আরও অবাক হয়ে যাই, শাহজালাল ইয়েমেনি রাহ.-এর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার নিদর্শন দেখে। আমি তখনো সেখানেই অবস্থান করছিলাম, সেসময়েই আমি বাঙালি শ্রেষ্ঠ পীর ও কামেল দরবেশ শাহজালাল ইয়েমেনির ইন্তেকালের সংবাদ পাই। আর নামের সাথে সংযুক্ত হয় রাহিমাহুল্লাহু।”6
- আরেক বর্ণনায় এসেছে ‘সাদকাওয়ান’, জালালাবাদের কথা, পৃষ্ঠা : ১৯। তবে ইতিহাসবিদ আহমাদ শরীফ বলছেন, সদকাউন ( Sadkawan), চট্টগ্রামের ইতিহাস, পৃষ্ঠা : ৭৮। ↩︎
- শামসীর হারুনুর রশীদ : শাহজালাল রাহ. ও সূফিদর্শন, পৃষ্ঠা : ৩৩ ↩︎
- জাহিদুর রহমান চৌধুরী সম্পাদিত : সিলেট মে উর্দু, মাসিক ভিন্নধারা ↩︎
- দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী : জালালাবাদের কথা, পৃষ্ঠা : ২০ ↩︎
- ড. এনামুল হক, এ্যা হিস্টোরি অফ সুফিজম ইন বেঙ্গল, পৃষ্ঠা : ১৬০ ↩︎
- দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, জালালাবাদের কথা, পৃষ্ঠা : ২০-২১ ↩︎