মুর্শিদাবাদ নামকরণের ভিন্ন ভিন্ন মত

ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ঐতিহাসিক শহর ও জেলা মুর্শিদাবাদের প্রাচীন নাম ‘মকসুদাবাদ।’ এ নিয়ে দুটো কিংবদন্তি চালু আছে। কেউ কেউ মনে করেন সম্রাট আকবরের নির্দেশে তার ঘনিষ্ঠ সভাসদ আবুল ফজল ইবনে মুবারকের ফার্সি ভাষায় রচিত ‘আকবরনামা’য় বাংলায় সুবেদারের এক ভাইয়ের নাম ‘মুকসুম খাঁ’ হিসেবে বর্ণিত আছে। মুকসুম খাঁ বাংলার বারোভূঁইয়া নেতা মুসা খান মসনদ-ই-আলার জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং ঈসা খানের নাতি। এই মুকসুম খাঁ-ই মকসুদাবাদ নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। 

পরে মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন। তার নাম অনুসারে এই এলাকার নাম হয় মুর্শিদাবাদ। আরেক দল গবেষক মনে করেন, অতীতে মুখসদস দাস নামে এক বৈষ্ণবের আখড়া ছিল এই অঞ্চলে। সেই ধনশালী বৈষ্ণব একবার গৌড়ের বাদশাহ আলাউদ্দিন হুসেন শাহের কঠিন বিমারী সারিয়ে তোলেন। বাদশাহ সন্তষ্ট হয়ে তাকে প্রচুর ভূ-সম্পত্তি দান করেন। বৈষ্ণবের নাম অনুসারে এই এলাকা নিয়েই গঠিত হয় মকসুদাবাদ। এরও কিছুকাল আগে অঞ্চলের নাম নাকি ছিল ‘কর্ণসুবর্ণ।’ হ্যাঁ রাজা শশাঙ্কের আমলের বাংলার রাজধানী ‘কর্ণসুবর্ণ।’

মুর্শিদকুলি খাঁ ছিলেন ব্রাহ্মণপুত্র। বুরহানপুরের দক্ষিণী ব্রাহ্মণ বংশে তার জন্ম। একদল দাস ব্যবসায়ী তাকে চুরি করে ইস্পাহানে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে বিক্রি করেন। ওই ব্যক্তি হাজী ইস্পাহানী নামে পরিচিত। হাজী ইস্পাহানী বালক মুর্শিদকুলি খাঁর নাম রাখেন মুহম্মদ হাদী। ওই হাদী ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং ধর্মের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি প্রদর্শন করতে থাকেন। তিনি যেমন ছিলেন রূপবান, তেমন ছিলেন সাহসী যোদ্ধা। মুঘল দরবারের সাথে হাজী ইস্পাহানীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই সুবাদে মুহম্মদ হাদী বাদশাহ আওরঙ্গজেবের নজরে পড়েন।

ইতিহাসকাররা আরও বলেন, শূর বংশীয়দের রাজত্বকালে মুর্শিদাবাদের নাম ছিল ‘উত্তর রাধা।’ আর পাল রাজাদের আমলে নাম ছিল ‘রঙ্গবর্তী।’ তাদের অনুমান বর্তমান মুর্শিদাবাদে প্রাচীন পল্লী আছে। সেটাই হচ্ছে পাল রাজাদের রাজধানী ‘বঙ্গবর্তি।’ এ ছাড়াও সেখানে ‘মহীপাল নগর’ নামে একটি নগর ছিল। সেটাও পত্তন করেছিল পাল বংশের রাজারা।

প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু মকসুদাবাদ থেকে মুর্শিদাবাদে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনায় কোনো মতভেদ নেই। কথিত আছে, সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে বাংলায় জলদস্যূদের উৎপাত সাংঘতিক রকম বেড়ে যায়। তখন বাংলায় রাজধানী ছিল ঢাকা। সেখানে সুবাদার হিসেবে ছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পৌত্র এবং (প্রথম) বাহাদুর শাহের পুত্র আজিম-উশ-শান। তিনি ছিলেন অকর্ষণ্য অথচ বিলাসপরায়ণ। বিরক্ত হয়ে সম্রাট আওঙ্গজেব ‘মুহম্মদ হাদী’ নামে এক সুপুরুষ যোদ্ধাকে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করে পাঠান। মুহম্মদ হাদী মহা বিক্রমে জলদস্যুদের দমন করেন। এরপর বাংলার কর আদায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে। ১৭০২ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব যখন মারাঠাদের সাথে যুদ্ধে কপর্দকশূন্য, তখন মুহম্মদ হাদী বাংলা মূলক থেকে দিল্লির সম্রাটের উদ্দেশ্যে এক কোটি টাকা রাজস্ব পাঠান। এতে আওরঙ্গজেব এতোই খুশি হয়েছিলেন যে, সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ‘খোদা প্রেরিত পরিত্রাতা’ আখ্যা দেন এবং ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মুর্শিদকুলি খাঁ’র সৌভাগ্যে ঈর্ষান্বিত এবং ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সুবাদার আজিম-উশ-শান। তার বিরুদ্ধে একের পর এক চক্রান্তের জাল বুনতে থাকেন। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে মুর্শিদকুলি খাঁ রাজস্ব দফতরের কর্মচারীদের নিয়ে মকসুদাবাদে তার দেওয়ানী দফতর স্থাপন করেন। ১৭১৭ সালে তিনি দিল্লির বাদশাহ ফাররুক শিয়রকে এক লাখ টাকা নজরানা দিয়ে বাংলার সুবাদার হিসেবে সনদ লাভ করেন এবং আলাউদ্দিন জাফর খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন। এভাবেই বাংলার রাজধানী ঢাকার বদলে মকসুদাবাদে কায়েম হয়ে যায় এবং মুর্শিদকুলি খাঁর নাম অনুসারে তার নাম হয় মুর্শিদাবাদ।

মুর্শিদকুলি খাঁ ছিলেন একজন দরবেশতুল্য মানুষ। কিংবদন্তি আছে, তিনি যখন নামাজে বসতেন, তখন অলৌকিক খাপ থেকে তরবারী খসে তার মাথায় ওপর চক্কর দিত, যাতে কোনো দুশমন তার ওপর চড়াও হতে না পারে। তিনি হিন্দু বিদ্বেষী ছিলেন, এই তথ্যের সমর্থন ইতিহাসে কোথাও নেই। বরং ইতিহাসে আছে, তিনি ছিলেন প্রজারঞ্জক, সুশাসক, ন্যায়দর্শী, হিন্দু-মুসলমানে কোনো ভেদ করতেন না। তিনি কর্মঠ ও গুণী লোকের কদর করতে জানতেন। তিনি যোগ্যতাসম্পন্ন বহু হিন্দু কমর্চারীকে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত করেছেন। ঢাকার দেওয়ান থাকাকালে তৎকালীন কানুনগো (হিসাবরক্ষণ প্রধান) দর্প নারায়ণ রায়ের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্যতা গড়ে ওঠে। এই দুইয়ের যুক্তি, পরামর্শ, সহযোগিতার ফলেই তৎকালীন বাংলার রাজস্ব পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটে। ঢাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি মানিক চাঁদের (প্রথম জগত শেঠের মামা) সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। মুর্শিদকুলি খাঁই দিল্লির দরবার থেকে মানিক চাঁদকে ‘শেঠ’ উপাধি আনিয়ে দেন। তখন শেঠদের গদিতে সব সময় দশ কোটি টাকার কারবার চলত। দেশীয় জমিদার, ইংরেজ, ফরাসি, মহাজন, বণিক সকলেই শেঠদের কাছ থেকে টাকা ধার নিতেন। শেঠরা মুর্শিদকুলি খুব ভালোবাসতেন। দর্প নারায়ণ আর মানিক চাঁদের আনুকূল্যেই তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের পৌত্র বাংলার বিলাসপ্রিয় নাজিম আজিম-উশ-শান-এর সঙ্গে টেক্কা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। মুর্শিদাবাদে দেওয়ানী স্থানান্তরের পশ্চাতেও ক্রিয়াশীল ছিল তাদের বুদ্ধি ও প্রেরণা। সুবাদারের পদ লাভ করার পর তিনি তার যথাযোগ্য প্রতিদানও দিয়েছিলেন।

যেমন, মানিক চাঁদকে মুর্শিদাবাদ নগরীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের যাবতীয় ব্যবস্থা তিনিই করে দিয়েছেন, তার কারবার প্রতিষ্ঠায়ও ব্যাপক আনুকূল্য প্রদান করেছেন। অপুত্রক মানিক চাঁদের মৃত্যুর পর তার ভাগ্নে ফতেহ চাঁদকে তিনিই দিল্লির দরবার থেকে ‘জগৎশেঠ’ (বিশ্ব ব্যাংকার) উপাধি আনিয়ে দেন। পরবর্তীতে এই জগৎশেঠ পরিবারই যে বাংলার রাজনীতিতে নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছিল সে ইতিহাস সকলেরই জানা। মুর্শিদকুলি খাঁ দর্প নারায়ণকে কানুনগোর দায়িত্ব থেকে পদোন্নতি দিয়ে তার প্রধান পরামর্শদাতা এবং দেওয়ান হিসেবে নিযুক্ত করেন। কেবল তাই নয়, তাঁকে মখদুমপুরের জমিদারীও প্রদান করেন।

মুর্শিদকুলি খাঁর শাসনকাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওই সময় হিন্দু এলিট শ্রেণীর নাটকীয় উত্থান ঘটেছিল। কেবল পদস্থ রাজকর্মচারী হিসেবেই নয়, উচ্চ সামরিক পদেও হিন্দুদের নিয়োগ করা হয়। তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে ইউরোপীয়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ লাভ করে। সহায়-সম্পত্তি, বিশেষ করে জমিদারি লাভের ক্ষেত্রেও হিন্দুরা সুস্পষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করে। এর পশ্চাতে যুক্তিযুক্ত কারণও অবশ্য ছিল। হিন্দুরা শিক্ষাসহ নবাবী আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতি গ্রহণ করতে কখনো দ্বিধা করেনি। তাছাড়া সততা ও দক্ষতা দিয়ে তারা নবাবের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। এসব করণে তারা দেওয়ানের পদসহ বকশী, সেনাধ্যক্ষ ইত্যাদি নির্ভরযোগ্য পদ লাভ করতেন। মুর্শিদকুলি খাঁর প্রথম মুখ্য পরামর্শদাতা ছিলেন ভূপতি রায় নামে এক ব্রাহ্মণ কর্মচারী। তার মৃত্যুর পরই তিনি দর্প নারায়ণকে মুখ্য পরামর্শদাতা এবং দেওয়ান নিযুক্ত করেন। দর্প নায়ণের পর দেওয়ান নিযুক্ত করেন রঘু নন্দনকে। রঘু নন্দন টাকশালের দারোগাও নিয়োজিত হয়েছিলেন।

রঘু নন্দনের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আরেকজনকে নিয়োগ করা হয়, তার নাম মৃত্যুঞ্জয়। কিংকর সেন পেশকার পদে দেওয়ানের সহকারী নিযুক্ত হন। লাহারী মল ও দিলপত সিং হাজারী সেনাধ্যক্ষের পদ প্রাপ্ত হন। সেকালে নবাব-বাদশাহদের ফরমান ও পত্রাদি চেনার জন্য বিশ্বস্ত ও দক্ষ কর্মচারীর প্রয়োজন হতো। তার পদের নাম ‘মুন্সি।’ মুর্শিদকুলি খাঁর মুন্সি ছিলেন যশোবস্ত রায়।

মুর্শিদকুলি খাঁ রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে বেশ কঠোর ছিলেন। রাজস্ব সংগ্রহ এবং সময়মতো তা কেন্দ্রে প্রেরণের জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। যে সব জমিদার সময়মতো খাজনা পরিশোধ করতে পারতেন না, তিনি তাদের নামমাত্র বহাল রেখে সেখানে চুক্তিভিত্তিতে ইজারাদার নিয়োগ করতেন। এই ব্যবস্থাকে বলা হতো ‘মাল জামানী’ প্রথা। চুক্তি অনুসারে ইজারাদাররা নির্দিষ্ট মেয়াদে নির্দিষ্ট অংকের রাজস্ব প্রদানে বাধ্য থাকতেন। পরবর্তীকালে এই ইজারাদাররাই জমিদার হিসেবে গণ্য হতেন। এখানে উল্লেখ করা যায়, ইজারাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে মুর্শিদকুলি খাঁ সব সময় হিন্দুদের প্রাধান্য দিতেন। কারণ, ইতিপূর্বে মুসলমান রাজস্ব আদায়কারীরা অর্থ আত্মসাৎ করত এবং সেই অর্থ আদায় করা সম্ভব হতো না। হিন্দুদের দক্ষতার ওপর তার অগাধ বিশ্বাস ছিল। রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের অভিজ্ঞতাই ছিল বেশি। ফার্সি ভাষায়ও তাদের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। এ কারণে কৃষ্ণরায় নামে এক হিন্দু ব্রাহ্মণকে তিনি রাজকোষাধ্যক্ষ-নিযুক্ত করেন।

মুর্শিদকুলির নতুন রাজস্ব ব্যবস্থার কারণেই বেশ কিছু নতুন জমিদারি প্রতিষ্ঠিত হয়, যেগুলোর স্বত্বাধিকারী সকলেই ছিলেন হিন্দু। নতুন জমিদারির মধ্যে একটি ছিল নাটোর জমিদারি। রাজস্ব বিভাগে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং টাকশালের দারোগা রঘু নন্দন তার ভাই রামজীবনের নামে এই জমিদারি লাভ করেন। তিনি প্রথমে রাজশাহী দেবীনগরের জমিদারি লাভ করেন; পরে বনগাছি, ভাতুরিয়া, সুলতানপুর এবং স্বরূপপুরের জমিদারির সঙ্গে যুক্ত হয়। ভূষণার জমিদার সীতারামের মৃত্যু হলে এর কিছু অংশ রামজীবনকে দেওয়া হয়। এভাবে নাটোর রাজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা আঠোরো শতকে বাংলার অন্যতম প্রধান জমিদারিতে পরিণত হয়।

ভাগীরথীর এক ক্ষীণ স্রোতধারা সেকালে এই দিক দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, নাম তার গোবরনালা। এই গোবরনালার তীরেই মুর্শিদকুলি খাঁ অস্ত্রাগার বানিয়েছিলেন; সম্ভবত কৌশলগত দিক থেকে জায়গাটা সুরক্ষিত বলে। অস্ত্রাগার নির্মাণের পরই সাবেক রাজধানী ঢাকা বা জাহাঙ্গীরনগর থেকে কামান, বন্দুকসহ সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র তিনি এখানে নিয়ে আসেন। ব্রিটিশ শাসনের এক পর্যায়ে সকল অস্ত্রাদি কিল্লা নিজামতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু জাহানকোষা নামের সুবিখ্যাত কামানটি আজও সেখানে রয়ে গেছে। ‘জাহানকোষা’ শব্দের অর্থ ‘জগজ্জয়ী।’ কামানটির বিশালত্ব থেকেই এর নামকরণের কারণটি আঁচ করা যায়। এটি লম্বায় ১৮ ফিট, প্রস্থে সাড়ে ৫ ফিট, ওজন প্রায় ২০০ মণ। এর মুখের বেড়ও এক হাতের বেশি; অগ্নিসংযোগের ছিদ্রটির ব্যাস দেড় ইঞ্চি। এটি দাগতে নাকি ১৮ সের বারুদ লাগত। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সময় ১০৩৭ হিজরীতে এই কামানটি তৈরি করেন ঢাকার বিখ্যাত জনার্দন কর্মকার।

সব অস্ত্রই সরানো হয়েছে, অথচ এই বিখ্যাত কামানটি ফেলে রাখার কারণ কী? এ বিষয়ে চালু রয়েছে এক চমকদার কিংবদন্তি। এক সময় কামানটি বটগাছের আলিঙ্গনে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল। মাটি থেকে চার ফুট উঁচুতে কামানটি দেখে সকলেই বিস্মিত হতেন। বটগাছের ঝুরি (শেকড়) দুই শ মণ ওজনের এই কামানটি এমন সুন্দর ও মজবুতভাবে বেষ্টন করে রেখেছিল যে, তার পড়ে যাওয়ার কোনো আশংকাই ছিল না। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঝুরিগুলো কেটে কামানটি বের করে আনেন এবং বাঁধানো এক উঁচু বেদীতে যত্মের সাথে স্থাপন করেন। কামানটি সম্পর্কে কিংবদন্তি এই যে, কোনো কারণে এটি ক্রুদ্ধ হয়ে অস্ত্রাগার থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল। নদীপথে অগ্রসর হওয়ার সময় বটগাছ তার পথ রোধ করে এবং নিজের ঝুরি বিস্তার করে পরম মমতায় তাকে জড়িয়ে রাখে।

বটগাছে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকার কারণেই যে মানুষের কল্পনালতা এই কিংবদন্তি রচনা করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রকৃত ঘটনা এই হতে পারে যে, অতিকায় কামানটি বহন করা খুব কষ্টসাধ্য এবং বিপজ্জনক ছিল। কোম্পানি আমলে যখন সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র কিল্লা নিজামতে নিয়ে যাওয়া হয় তখন জলপথই ছিল পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। কাজেই মুর্শদকুলি খাঁর অস্ত্রাগার থেকে এসব সরিয়ে নেওয়ার সময় পাশের গোবরনালা নদী ব্যবহার করা হয়েছিল। খুব সম্ভব অতিকায় কামানটি নৌকা বা জাহাজে তোলার সময় অসতর্ক অবস্থায় পানিতে পড়ে গিয়েছিল। সেকালে আজকের মতো ক্রেন বা জেটি ছিল না। আর অনেক অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে মাত্র একটি কামান (হলোই বা সর্ববৃহৎ) খোয়া যাওয়ার বিষয় তেমন ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়নি। তাছাড়া কোম্পানি আমলে ওই সেকেলে ধরনের কামানের ব্যবহারও সংকুচিত হয়ে আসছিল। কাজেই ওটাকে উদ্ধার করার তাগিদ আর কেউ অনুভব করেননি। যেহেতু নদীর তীরেই ছিল বটগাছ। নদীর দিকে তার ঝুরি বিস্তার করা স্বাভাবিক। এভাবেই কালক্রমে বটের ঝুরি কামানকে আষ্টেপৃষ্টে পেঁচিয়ে ধরে এবং বটগাছটি বেড়ে ওঠার সাথে সাথে কামানসমেত ঝুরিগুলোও উপরে উঠতে থাকে। এটাই হলো কামানের চার ফুট উঁচুতে ঝুলে থাকার রহস্য। ঝুরি কেটে না নামালে এক শ’ বছর পরে ওটাকে হয়তো ছয় ফুট ওপরে দেখা যেত।

কাটরা মসজিদ নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর কীর্তি। ‘কাটরা’ অর্থ বাজার। মসজিদের পাশের মাঠটাতে বাজার বসত। এজন্যই এর নাম ‘কাটরা মসজিদ।’ ঢাকাতেও তো ছোট কাটরা, বড় কাটরা আছে, তার সাথে এর পার্থক্য কী? বেশ বড়সরো সবুজ মাঠ পেরিয়ে মসজিদের মূল দেয়াল অবস্থিত। মূল দেয়াল থেকে মসজিদের মূল ভিত্তি পর্যন্ত আরেকটি সবুজ চত্বর, প্রায় ২৫ ফুট প্রশস্ত। মসজিদের গাত্রে ছোট ছোট বহু কুঠুরী আধভাঙা অবস্থায় রয়েছে। এসব কুঠুরীতে নাকি সাতশ’ কুরআন পাঠক (কারী), বহু ফকির, মিসকিন, দরবেশ, এতিম, তালবে এলেমরা বসবাস করতেন। তারা এখানে বিনামূল্যে শাহী খানা পেতেন। সবুজ চত্বর পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে হয়। উপরেই মসজিদের মূল চত্বর। পাথরের ঢালাই করা চত্বরটিতে আয়তাকার অসংখ্য খোপ কাটা রয়েছে। এই খোপগুলোতে জায়নামাজ বিছিয়ে প্রায় দু’হাজার লোক নাকি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারতেন। মসজিদের ভেতর ঘরটি লম্বার ৩৯ হাত, প্রস্থে পৌনে ৯ হাত। ভেতরে সুন্দর কারুকাজ এবং সেখানে দেয়ালগাত্র এক স্থানে কষ্টিপাথরের ওপর উৎকীর্ণ রয়েছে ফার্সি পংক্তিমালা। যার মর্মার্থ-‘আরবের মুহম্মদ উভয় জগতের গৌরব, যে ব্যক্তি তার দ্বারের ধূলি লয়, তার মাথার ধূলিবৃষ্টি হউক।’ 

মসজিদের দুই প্রান্তে ৭০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট দু’টি গম্বুজ অর্ধভগ্ন ও ভগ্ন অবস্থায় রয়েছে। সেকালে এই গম্বুজ দু’টি মুর্শিদাবাদ নগরীর চতুপার্শ্বে ৫/৬ মাইল এলাকা পর্যন্ত নগরবাসী ও পথচারীকে আকৃষ্ট করতো। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে উত্তর পাশের গম্বুজটি ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে দক্ষিণ দিকের গম্বুজটিতে উঠলে একদা জনাকীর্ণ মুর্শিদাবাদ নগরীর শেষ ঐতিহ্য হাজার দুয়ারী (নবাব প্যালেস), বড় ইমামবাড়া, কাঠগোলার বাগান প্রভৃতি দৃষ্টিগোচর হয়। গম্বুজে উঠতে ৬৭ টি সর্পগতি সিড়ি অতিক্রম করতে হয়। 

মসজিদের মূল সিঁড়ি যার নিচে ঘুমিয়ে রয়েছেন বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। মুর্শিদকুলি খাঁ যেমন ছিলেন কুশলী যোদ্ধা তেমনি ছিলেন কঠোর শাসক। শেষ জীবনে তিনি তার কর্মের জন্য অনুশোচনাবোধ করেন। তখন এই মসজিদ নির্মাণ করে তার সিঁড়ির নিচে জ্যান্ত কবরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তার ধারণা, সিঁড়ি দিয়ে অর্থাৎ তার বুকের ওপরে পা রেখে আলেম-উলামা মসজিদে ঢুকতে থাকবেন, তাতে ধীরে ধীরে তার পাপচিহ্ন মুছে যাবে। তার ইচ্ছে অনুযায়ী সিঁড়ির নিচে কবর খোড়া হয়। তিনি তাতে জ্যান্ত প্রবেশ করেন। 

নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ জ্ঞানীগুণী লোকদের সমাদর করতেন। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের জ্ঞানীগুণী, পণ্ডিত তার দরবার আলোকিত করতেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা তাঁকে এতো সম্মান করতেন যে, তাদের ধর্মীয় বিরোধ মেটাতেও তারা নবাবের শরণাপন্ন হতেন। বৃন্দাবনের বৈষ্ণব আর নবদ্বীপের বৈষ্ণবদের মধ্যে বিরোধের মীমাংসা তাঁকেই করতে হয়েছিল। সে সময় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছিল। এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করত। হিন্দুরা মুসলমানের ধর্মীয় উৎসব, যেমন-মহররম ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করত এবং মুসলমান পীরের দরগায় সম্মান প্রদর্শন করত। আবার মুসলমানরাও হিন্দুদের হোলি উৎসবে যোগ দিত। মুর্শিদকুলি খাঁ-সহ সকল নবাবই এ ব্যাপারে উদার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এমন কি নবাবরাও এসব অনুষ্ঠানে উপভোগ করতেন। সেকালে হিন্দু-মুসলমান ধ্যান ধারণার একটি বিশ্বস্ত চিত্র পাওয়া যায় রামেশ্বর ভট্টাচার্যের ‘সত্যনারায়ণ’ গ্রন্থে। সেখানে রাম ও রহিমকে একই প্রভুর দুই নাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই গ্রন্থ নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর সময় রচিত। কবি হায়াত মামুদ লিখেছেন—

যখন জন্মিল নবী-ইন্দ্ররাজ আদি সবি

দেবগণ হইল চমৎকার।

ভাঙ্গিল ইন্দ্রের ছত্র খসিয়া পড়িল পত্র

সিংহাসন নড়িল তাহার।

স্বর্গদ্বার হইল বন্দ দেবগণ হইল ধন্দ

গগনে যাইতে নারে কেউ।

আসলে হিন্দু-মুসলমান দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাসের ফলে এবং হিন্দু ঐতিহ্যমূলক কাব্যগুলোও মুসলিম সমাজে জনপ্রিয় হওয়ার দরুন সমাজ জীবনে তার প্রভাব পড়েছিল। নবাবরাও তাতে প্রভাবিত হয়েছিলেন, হয়তো তাদের শাসন-প্রশাসনের সুবিধার স্বার্থেই। এ কারণেই দেখা যায়, মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে শুরু করে সুজাউদ্দৌলা, সরফরাজ খাঁ, আলীবর্দী খাঁ, সিরাজউদ্দৌলা-সকলেই হিন্দু-মুসলমানের মিশ্র সংস্কৃতি আর ভাবধারাকে লালন করেছিলেন।

কাজেই মুর্শিদকুলি খাঁকে হিন্দু বিদ্বেষী হিসেবে পরিচয় করানো সত্যের অপলাপ ছাড়া কিছু নয়। তিনি জীবন্ত সমাধিস্থ হয়েছেন, ইতিহাসে তারও কোনো সমর্থন নেই।

তিনি ১৭২৭ সালের ৩০ জুন ইন্তেকাল করেন। তার আগে প্রিয়তম দৌহিত্র সরফরাজ খাঁকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। নামাজের সময় মুর্শিদকুলি খাঁর মাথায় আলৌকিক তরবারী চক্কর দিত এই তথ্যও ইতিহাস সমর্থিত নয়। তবে তিনি সৎ ও সুযোগ্য শাসক ছিলেন সে কথা ইতিহাসে বার বার উল্লেখ রয়েছে। শাসক হিসেবে তিনি এতটাই সৎ ও দক্ষ ছিলেন যে, তার ক্ষমতা চর্চার সুবিধার্থে সম্রাট আওরঙ্গজেব আপন দৌহিত্র আজিম-উশ-শানকে বাংলার মসনদ থেকে সরিয়ে নেন। আজিম-উশ-শান তার আগে মুশির্দকুলি খাঁকে হত্যার পরিকল্পনা পর্যন্ত করেছিলেন-আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার প্রথম পুত্র শাহ মুয়াজ্জেম বাহাদুর শাহ নাম ধারণ করে সিংহাসনে বসলে আজিম-উশ-শান-এর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তিনি ইচ্ছা করলে মুর্শিদকুলি খাঁর ওপর পূর্ব অপমানের প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু সে পথে অগ্রসর হননি। ধারণা করেছিলেন বৃদ্ধ পিতা বাহাদুর শাহর মৃত্যুর পর তাঁকেই সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নিতে হবে। আর তখন সুবা বাংলায় মুর্শিদকুলি খাঁ মতো সৎ ও দক্ষ লোকের প্রয়োজন পড়বে। কাজেই তিনি শত্রুতা পরিহার করে মুর্শিদকুলি খাঁর প্রতি মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দেন। পরবর্তীকালে দিল্লির বাদশাহ ফররুখশিয়রের সঙ্গে মুর্শিদকুলি খাঁর বিরোধ বাঁধে। ফররুখশিয়র মুর্শিদকুলি খাঁর বিরুদ্ধে তিনবার সৈন্য পাঠান, কিন্তু প্রত্যেকবারই তার বাহিনী পরাজিত হয়। শেষে অনন‌্যোপায় হয়ে মুর্শিদকুলি খাঁকে আলাউদ্দিন জাফর খান নাসিরী উপাধি দিয়ে মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ করেন।

মুর্শিদাবাদের সংস্কৃতির সঙ্গে বৃহত্তর রংপুর (সাবেক রঙ্গপুর), দিনাজপুরের সংস্কৃতির অনেক মিল আছে। কেবল যে খাওয়া-দাওয়া, কথা-বার্তার মধ্যে মিল তাই নয়, নির্মাণ কৌশল বা স্থাপত্য রীতিতেও বেশ মিল আছে। দুই অঞ্চলের মধ্যে সংস্কৃতিগত সাযুজ্যের প্রধানত তিনটে কারণ থাকতে পারে। 

প্রথমত, মুর্শিদাবাদ যখন বাংলার রাজধানী হিসেবে গড়ে উঠেছে, তখন রংপুর তার আশেপাশের এলাকা নিয়ে চাকলা বা প্রদেশ হিসেবে স্বীকৃত। স্বভাবতই, রংপুর প্রদেশের জমিদারদের একটি কেন্দ্রস্থান হিসেবে গড়ে উঠে রংপুর শহর। এখনো রংপুর শহর এবং তার আশেপাশে মাহীগঞ্জ, তাজহাট এলাকায় তার স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। কথিত আছে, রংপুরের জমিদার, সামন্ত অধিপতিদের চাহিদা মেটাতেই রংপুর শহরের পাশে মণি-মুক্তা, হীরা-জহরত এবং তাজ বা মুকুটের একটি বাজার গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সেই এলাকাই তাজহাট নামে প্রসিদ্ধি অর্জন করে। যাহোক, সঙ্গত কারণেই এই বিত্তশালী রাজা-জমিদারদের সঙ্গে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক সমতা গড়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, ১৭৭৩ সালে যখন ওয়ারেন হেস্টিংস কোম্পানীর গভর্নর পদে অধিষ্ঠিত হন, তখন বাহারবন্দ এস্টেটসহ রংপুর, দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার জমিদারীর অধীনে ন্যস্ত হয়। এ বিষয়ে একটি চমকপ্রদ গল্পও চালু আছে। জানা যায়, কাস্তা নন্দী নামে এক ব্যক্তি সেকালে ইংরেজদের কাশিমবাজার কুঠিতে মুহুরীর (কেরানী) চাকরি করত। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা কাশিমবাজার কুঠি আক্রমণ করে কুঠি অধ্যক্ষ মিঃ ওয়াট্সকে গ্রেফতার করেন, কিন্তু ওয়ারেন হেস্টিংস কোনোক্রমে পালিয়ে গিয়ে কান্তা নন্দীর বাসায় আশ্রয় নেন। কান্তা নন্দী নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে দেখাশোনা করতে থাকলে তার ওপর হেস্টিংসের বিশেষ দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে হেস্টিংস যখন বাংলার গভর্নর জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হন, তখন কান্তা নন্দীর কপাল খুলে যায়। হেস্টিংসের আশীর্বাদে বাংলার জমিদারি মঞ্চে তিনি প্রবল প্রতাপে আবির্ভূত হন। রংপুরের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী এস্টেট বাহারবন্দ রানী ভবানীর কাছ থেকে জোর করে লিখে নেন তার ভাই বিশেন নন্দীর নামে। এমনিভাবে রংপুর, দিনাজপুরসহ বাংলার ভালো ভালো পরগনাগুলো নিজের নামে, ভাইয়ের নামে, ছেলে-মেয়ের নামে লিখে নেন, সেকালে যার সমুদয় সরকারি জমার পরিমাণ ছিল ১৪ লাখ টাকা। নন্দী পরিবার এতই প্রতাপশালী হয়ে ওঠেছিল যে, ১৭৮৩ সালে কান্তা নন্দী যখন রংপুরে আসেন, তখন রংপুরের কালেক্টর (দেওয়ান) মি. গুডল্যাড তাকে খুবই তোয়াজ-তাজিম সহকারে সংবর্ধনা দেন। নন্দী পরিবারের এস্টেট বা পরগনার স্থানীয় নিজস্ব দফতর থাকলেও মূল কার্যধারা পরিচালিত হতো কাশিমবাজার থেকে, যেখানে কান্তা নন্দী গড়ে তুলেছিলেন রাজকীয় প্রসাদ। এভাবেই মুর্শিদাবাদের সঙ্গে রংপুরের সংযোগসূত্র স্থাপিত হয় এবং তা স্থায়িত্ব লাভ করে পাক্কা পৌনে দু’শ বছর অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনের গোটা পর্ব জুড়ে। 

তৃতীয়ত, সুদীর্ঘকাল ধরে মুর্শিদাবাদের সঙ্গে রংপুর, দিনাজপুরের বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। মুর্শিকুলি খাঁর আগে মকসুদাবাদ ছিল ভাগীরথী নদীর তীরে একটি সাধারণ বাণিজ্য বন্দর। রপ্তানি হতো কাঁচা সিল্ক আর সিল্কের কাপড়, আমদানি হতো খাদ্যশস্য। মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে এখানে বাংলার রাজধানী স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে কেবল রাজস্ব দফতর এবং তার কর্মচারীদেরই নিয়ে আসেননি, এনেছিলেন সেকালের সুপ্রসিদ্ধ ব্যাংকার মানিক চাঁদ (জগৎ শেঠের মামা) ও অন্যান্য ধনাঢ্য ব্যক্তিকে, কাঁসা-পিতল-স্বর্ণ-রৌপ্য-লৌহের সুনিপুণ কারিগরসহ অন্যান্য কুটির শিল্পের সুদক্ষ নির্মাতাদের। ইংরেজ, ফরাসি, পতুর্গীজ, ওলন্দাজ বণিকরাও কাশিমবাজার, জঙ্গীপুর, সাইদাবাদ, ভগবানগোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সিল্ক শিল্প ও অন্যান্য কারখানা গড়ে তুলতে থাকল। এর ফলে শিগগিরই মুর্শিদাবাদ হয়ে উঠল বাংলার সমৃদ্ধ শিল্প নগরী। কাঁচা সিল্ক, সিল্কের নানা ধরনের সৌখিন কাপড়, স্বর্ণ-রৌপ্য-কাঁসা-পিতলের দ্রব্যাদি, কাঠের নৌকা, জাহাজ, ছড়ি, খেলনাপাতি, আয়না, চিরুনি, চাকু, দোয়াত-কলম, কাগজ, গরুর গাড়ি, দেব-দেবীর মূর্তি-সেকালের এমন কোনো শিল্পদ্রব্য নেই যা মুর্শিদাবাদে তৈরি হতো না। কিন্তু তাতে কী! মুর্শিদাবাদ ছিল বরাবরই খাদ্য ঘাটতি এলাকা। কিছু গম, রবিশস্য আর বছর কয়েক লাখ টাকার খাদ্য আসতো ভগবানগোলা বন্দরে। তাই দিয়ে রাজধানী মুর্শিদাবাদ এবং চাকলাভুক্ত অন্যান্য জেলার ঘাটতি মেটানো হতো। ঘি, পনিরসহ সমস্ত দুগ্ধজাত সামগ্রীর জন্য মুর্শিদাবাদকে নির্ভর করতে হতো ঢাকার ওপরে, তেমনি চালের জন্য নির্ভর করতে হতো প্রধানত রংপুর, দিনাজপুর ও বরিশালের ওপরে। ইংরেজি ১৭৬৯-১৯৭০ সালে সারা বাংলায় দেখা দিয়েছিল ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যা ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে অভিহিত। সেই সময়েও রাজধানী মুর্শিদাবাদ সর্বাধিক চাল আমদানি করেছে রংপুর থেকে। তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে। মীরজাফরের অপোগন্ড পুত্র সাইফুদদৌলা নামমাত্র নবাব। মহারাজ নন্দকুমারকে ষড়যন্ত্র করে সরিয়ে দিয়ে ইংরেজরা মোহাম্মদ রেজা খানকে বসিয়েছে প্রধান মন্ত্রণাদাতা (নায়েবে দিওয়ান) হিসেবে। এই রেজা খানের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, ছিয়াত্তরের মন্বন্তরকালে রংপুরের কেবল দু’টি বাজার থেকেই ৬৯ হাজার ৩শ’ ১১ মণ চাল আমদানি করা হয়। এই দু’টি বাজার হচ্ছে ভবানীগঞ্জ (বর্তমান গাইবান্ধা) এবং গোবিগঞ্জ (বর্তমান গোবিন্দগঞ্জ)। যেসব মহাজনের কাছ থেকে এসব আমদানি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রধান হচ্ছেন সুন্দর সাহা (৩৫০০ মণ), অধিরাম পোদ্দার (৩৪০০ মণ), শ্যাম পোদ্দার (৩৪০০ মণ), ক্যাপ্টেন ডেভিড ম্যাকেঞ্জি (৩০০০ মণ), দশরথ সাহা (২৬০০ মণ) ইত্যদি। তখন রেল লাইন ছিল না। আজকের মতো সড়ক পথও নির্মিত হয়নি। যাতায়াত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নৌপথই ছিল প্রধান ভরসা। মজার বিষয় হচ্ছে, তখন ব্রহ্মপুত্রের সংযোগ ছিল মেঘনার সঙ্গে, পদ্মার সঙ্গে নয়। ময়মনসিংহের শেরপুরের পাশ দিয়ে পূর্ব-দক্ষিণে বাঁক নিয়ে বেগুনবাড়িকে ডাইনে ফেলে কুমিল্লায় মেঘনার সঙ্গে মিশেছিল ব্রহ্মপুত্র। কাজেই মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রংপুরের ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ হতো পদ্মা এবং তার শাখা নদী, উপনদী বিশেষ করে ঘাঘট ও করতোয়া নদীর মাধ্যমে। দীর্ঘকাল এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগের ফলে উভয় অংশের মানুষের জীবনাচারের মধ্যে সাযুজ‌্য তৈরি হয়েছিল নিশ্চয়ই। সেকালে জামিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় মেলা, কাচারি মাঠ বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়িতে যাত্রা, নাটক ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতো। পৌরাণিক কাহিনী, রূপকাহিনী, রাজ-রাজার-যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘটনা-এসবই ছিল বিষয়বস্তু। 

রাজশাহীর দীঘাপতিয়া জমিদারিও মুর্শিদকুলি খাঁ’র সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা দয়ারাম রায় ছিলেন তেলী সম্প্রদায়ভুক্ত। তিনি রাজস্ব বিভাগে রঘুনন্দনের অধীনে নিযুক্ত ছিলেন। রঘুনন্দনের সহায়তায় তিনি ভূষণার জমিদারির  অংশ লাভ করেন। মোমেনশাহী পরগনার চৌধুরী জমদারি এবং মুক্তাগাছার জমিদারিও এই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রীকৃষ্ণ হালদার নামক একজন কানুনগো মোমেনশাহী জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা। শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী নামে একজন বরেন্দ্র ব্রাহ্মণ মুর্শিদকুলি খাঁ’র রাজস্ব সংগ্রাহক ছিলেন। তিনি আলপশাহী পরগনার জমিদারি লাভ করেন। এটাই ছিল মুক্তাগাছা রাজ বংশের প্রথম জমিদারি। পরে আরও পরগনা বর্ধমান, নদীয়া ও দিনাজপুরের হিন্দু জমিদারিগুলোর আয়তনও বৃদ্ধি পায়।

মুর্শিদকুলি খাঁ’র চেষ্টায় মুর্শিদাবাদ শহর বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা-তিন প্রদেশের কেন্দ্রীয় রাজধানীতে পরিণত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুব দ্রুত এর বিস্তার ঘটতে থাকে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানার কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়। মুসলমানরা সাময়িক চাকুরি গ্রহণ করতে এবং উচ্চ বাংলার শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আরব, ইরানি ও তুরানিদের বাদ দিলে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দুরা একচেটিয়া অধিকার বিস্তার করেছিল। পাইকার ও দালালের কাজ হিন্দুদের একচেটিয়া ছিল। অনেক হিন্দু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান যে কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারতো। বাংলার ঢাকা, হুগলি, চট্টগ্রাম, কালিমবাজার প্রভৃতি বন্দরে অসংখ্য ধনী হিন্দু ব্যবসায়ী ছিল। তারা মুসলমান, আর্মেনীয় ও ইউরোপীয় বণিকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ে নিযুক্ত ছিল। মুসলমান ব্যবসায়ীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন খাজা সরহাদ, খাজা দিলান, খাজা আবিদ ও খাজা আরাতন। কিন্তু তার তুলনায় হিন্দু ব্যবসায়ী সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। ব্যাংকিং ব্যবসা ছিল তাদের একচেটিয়া। হিন্দু ব্যবসায়ীদের মধ্যে বারানসী শেঠের নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি ইংরেজদের ব্যবসায়ের একজন দালাল ছিলেন। ইংরেজ কর্তৃক কলকাতা অধিকারের পূর্বে প্রথম যে শেঠ ও বসাক পরিবারের আবির্ভাব ঘটে তিনি সেই গোত্রের আদিপুরুষ। এছাড়া মুর্শিদকুলি খাঁর আনুকূল্যে ব্যাংক ব্যবসা করে সেকালে যারা টাকার কুমির হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ফতেহচাঁদ, আনন্দচাঁদ, মানিকচাঁদ, রামচাঁদ, ললজী, ব্রীজ বকুনন, সদানন্দ, শিবাদত্ত, মিত্রসেন, সুখনেদর সাহা, হিম্মতসিংহ ও লক্ষ্মণসিংহ অন্যতম। এদের সম্পদ সৃষ্টির কাহিনী এখন কিংবদন্তি হয়ে আছে। কথিত আছে, জগৎশেঠের বাড়ি লুট করে মারাঠারা এত টাকা ও ধনরত্ম পেয়েছিল যে, পাছে বাধাপ্রাপ্ত হয় সেই ভয়ে তারা সমস্ত রাস্তায় টাকা ছড়াতে ছড়াতে পালাতে থাকে। সাধারণ মানুষ সেই পথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাঁচা টাকা কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সেই সুযোগে তারা গঙ্গা পার হয়ে যায়।

মুর্শিদকুলি খাঁর চরিত্রও ছিল নিষ্কলুষ। তার স্ত্রীর নাম নৌসেরী বানু। সেকালের শাসকদের মতো তিনি হেরেমে রক্ষিতা পুষতেন না। এ ব্যাপারে বরং বদনাম রয়েছে তার জামাতা সুজাউদ্দৌলা এবং দৌহিত্র সরফরাজ খাঁ’র। স্ত্রী জিন্নাতুন্নেসার সঙ্গে সুজাউদ্দৌলার বনিবনা হতো না ওই একটি কারণেই। 

সুজাউদ্দৌলার প্রকৃত নাম সুজাউদ্দিন মুহম্মদ খাঁ। তিনি চতুর প্রকৃতির লোক ছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁ যখন বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নায়েব নাজিম বা নবাব, সুজাউদ্দিন তখন বিহারের ডেপুটি গভর্নর। বৃদ্ধ মুর্শিদকুলি খাঁর পুত্র না থাকায় তিনি আদরের নাতি সরফরাজ খাঁকে পরবর্তী নবাব হিসেবে মনোনীত করেন। সুজাউদ্দৌলা তা জানতে পেরে মুর্শিদাবাদের মসনদ দখল করার জন্য গোপন তৎপরতা শুরু করেন। তিনি বেশ কয়েকজন দক্ষ লোক যোগাড় করেন এবং তাদের বিভিন্নভাবে পদোন্নতি দিয়ে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। তার পরামর্শকদের মধ্যে দু’জন ছিলেন প্রধান-মুহম্মদ আলী এবং তার যমজ ভাই হাজী আহমদ। মুহাম্মদ আলী ছিলেন দুর্ধর্ষ সৈনিক, আর হাজী আহমদ ছিলেন কূটনীতিজ্ঞ। তারা অত্যন্ত চতুর, ধূর্ত গোপনে তার প্রতিনিধি পাঠান এবং মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নায়েব নাজিম (নবাব) নিযুক্ত করতে সম্রাটের দরবারে চেষ্টা-তদবিরের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে তিনি মুর্শিদাবাদের দিকে সজাগ সৃষ্টি রাখেন। মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যু নিকটবর্তী হওয়ার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে উড়িষ্যা থেকে মুর্শিদাবাদের দিকে যাত্রা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সম্রাটের কাছ থেকে নায়েব নাজিম হিসেবে নিযুক্তি পান বা না পান, মুর্শিদাবাদের মসনদ তিনি দখল করবেন। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে মেদিনীপুরের কাছে পৌঁছলে তিনি মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যু সংবাদ পান। একই সময়ে সম্রাট কর্তৃক তাঁকে বাংলা এবং উড়িষ্যার নায়েব নাজিম নিযুক্ত করার সংবাদও পান। এরপর তিনি মুর্শিদাবাদে পৌঁছে সরাসরি ‘চেহেল সিতুন’ প্রাসাদে (নায়েব নাজিম বা নবাবের দফতর) যান এবং সেখানে তার মসনদে বসার কথা ঘোষণা করেন। এতে মুর্শিদকুলি খাঁর মনোনীত উত্তরাধিকারী সরফরাজ খাঁ হতভম্ব হয়ে যান। তিনি সুজাউদ্দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তার শুভাকাঙ্খীরা, বিশেষ করে তার স্নেহময়ী নানী (মুর্শিদকুলি খাঁর স্ত্রী নৌসেরী বানু) তাঁকে পিতার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করে অপেক্ষা করার উপদেশ দেন। তিনি তাদের কথার সম্মত হন।

মসনদে বসেই সুজাউদ্দিন খাঁ আত্মীয়, পরামর্শক এবং বিশ্বাসভাজনদের উচ্চপদ দান করেন। মুহম্মদ আলী ও হাজী আহমদের পদোন্নতি হয়। হাজী আহমদের তিন পুত্রকেও উচ্চপদ দেওয়া হয়। উড়িষ্যায় নিযুক্ত দেওয়ান আলমচাঁদকে পদোন্নতি দিয়ে খালসা বিভাগের দেওয়ান নিযুক্ত করা হয়। এছাড়া ঢাকার পেশকার রাজবল্লব, দেওয়ান জয়ন্ত রায়, ডাক বিভাগের অধিকর্তা বসন্ত রায়সহ অনেক হিন্দু কর্মচারী সে সময় বিস্তর সুযোগ-সুবিধা অর্জন করে। সুজাউদ্দৌলা শাসক হিসেবে প্রথমদিকে বেশ যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি জমিদারদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করেন। জমিদাররা খুশি হয়ে তাঁকে দেড় কোটি টাকার নজরানা দিয়ে ফেললেন। ওই অর্থ এবং তার সঙ্গে প্রচুর হাতি, ঘোড়া আর বাংলার মসলিন সামগ্রী তিনি উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়ে দিলেন দিল্লির দরবারে। বাদশাহ মুহম্মদ শাহ এতে এতই খুশি হলেন যে, প্রীতিসিক্ত এক পত্র মারফত তাঁকে সুজাউদ্দৌলা উপাধি দিয়ে ফেললেন। বাদশাহর ফরমান অনুসারেই তিনি বাংলা বিহার, উড়িষ্যাকে চারটি প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করলেন—

  • পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় বিভাগ 
  • পূর্ববঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ, সিলেট ও চট্টগ্রাম নিয়ে সমন্বিত ঢাকা বিভাগ
  • বিহার বিভাগ
  • উড়িষ্যা বিভাগ।

সুজাউদ্দৌলা স্বয়ং কেন্দ্রীয় বিভাগ অর্থাৎ মুর্শিদাবাদে অবস্থান করেন। পুত্র সরফরাজ খাঁকে দেওয়ান হিসেবে বহাল রাখেন। আর মুহম্মদ আলীকে (তিনিই পরে আলিবর্দী খাঁ) বিহারে, দ্বিতীয় পুত্র মুহম্মদ তকীকে উড়িয়্যায় এবং জামাতা দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খাঁকে ঢাকায় তার প্রতিনিধি বা ডেপুটি গভর্নর নিযুক্ত করেন।

কথিত আছে, দরবার চলাকালেও প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর নারী দর্শন না করলে সুজাউদ্দৌলা সুস্থির থাকতে পারতেন না। ওই সময় তিনি হেরেমে যেতেন এবং আধ ঘণ্টা, এক ঘণ্টা কাটিয়ে আসতেন।

এ ব্যাপারে তার কৈফিয়তটাও বড় অদ্ভুত। তিনি বলতেন, ‘ভদ্র মহোদয়গণ পৃথিবীতে আমি সর্বাপেক্ষা ক্ষুধার্ত ও সর্বাপেক্ষা অবাধ্য টাট্টু দ্বারা অভিশপ্ত; ইহা আমাকে দানার জন্য অবিরাম জ্বালাতন করিয়া থাকে।’

সুজাউদ্দৌলার পুত্র নবাব সরফরাজ খাঁর হেরেমেও নাকি এক হাজার পাঁচশ’ সুন্দরী রমণী ছিল। তিনি দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় হেরেমে অতিবাহিত করতেন। সত্যি বলতে কি, এই চারিত্রিক কলুষতাই তাদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিলাসব্যাসন আর নারী সম্ভোগে মত্ত হয়ে এরা শাসনকার্যে অমনোযোগী হয়ে পড়েন। ক্ষমতালোভী অভিজ্ঞ অমাত্যবর্গ তার পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে। 

সুজাউদ্দৌল্লার শাসনকালে দেশে সুখ-শান্তি বিরাজ করছিল। ফিবছর ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা রাজস্ব দিল্লির দরবারে নিয়মিত পাঠানোর ফলে সম্রাটের সঙ্গে তার হৃদ‌্যতা গড়ে ওঠে। বাংলার মসনদ নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব-বিরোধ দেখা দেয়নি। সে সময় বাংলায় পাট, নীল, পশম ও তাঁতশিল্পের বিকাশ ঘটে। ধান, চাল, গমসহ সমস্ত ভোগ্যপণ্য সুলভ ও সস্তা ছিল। শোনা যায় নবাব সুজাউদ্দৌলা দানশীল এবং জ্ঞানী-গুণীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ঈদের দিন হাতির পিঠে বস্তাভরতি স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে জাকজমক সহকারে শাহীমহল থেকে বের হতেন। রাস্তার দু’পাশে কাতারবন্দী দরিদ্র প্রজাদের দিকে দু’হাতে মুদ্রাবৃষ্টি করতে করতে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যেতেন। নির্মাণ কাজে তিনি ছিলেন খানিকটা মুঘল বাদশাহদের মতোই সৌখিন।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *