উপমহাদেশে মোল্লা-মিস্টার এখাতেলাফ, শাইখুল হিন্দের উদারনীতি ও আমরা

ডিভাইড এন্ড রুল

‘ডিভাইড এন্ড রুল’ হিন্দুস্তান শাসন করবার ক্ষেত্রে ইংরেজদের প্রধান উসুল। এ উসুল ছিল একটা দুধারি করাত, যার মাধ্যমে ইংরেজরা হিন্দুস্তানে বসবাসরত প্রধান দুই জনগোষ্ঠী—মুসলিম ও হিন্দু উভয়কেই জখম করেছে। এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা। তবে এর চেয়েও বড় বাস্তবতা—ইংরেজরা মূলত এ করাত তৈরি করেছিল হিন্দুস্তানি মাটির গভীরে প্রোথিত মুসলমানদের শিকড় কেটে ফেলবার জন্যে।

মুসলমানের শিকড় কাটবার জন্যে মুসলিম-হিন্দুর যে অর্ধ হাজার বর্ষী সম্প্রীতি মূলক সহবস্থান ছিল তা নষ্ট করা ছিল জরুরি। কারণ এ সহবস্থান নষ্ট না করতে পারলে মুসলিম শাসকদের আসন দখল করে উপনিবেশ কায়েমের যে স্বপ্ন তারা দেখছিল তা দুঃস্বপ্নে রূপান্তরিত হওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। তাই দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি যেন না হতে হয়, সেজন্যে যাবতীয় উপায় তারা গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে তাদের ফুট সোলজার হিসেবে কাজ করে মুসলমানদের ভারতবর্ষ শাসনের ছয়শ বছরেরও অধিক কালের বিভিন্ন সময়ে মুসলমানদের হাতে পরাজিত হওয়া হিন্দু রাজা, জমিদার, রাজপুত, জাঠ, মারাঠা, শিখ ও তাদের বংশধররা। সবার প্রচেষ্টাতেই মুসলিম-হিন্দু সহবস্থান ভেঙে ফেলবার মিশন সফল হয়েছিল তখন।

ইংরেজ দখলদাররা সহবস্থান নষ্ট করবার মিশনে সফল হলেও মুসলমানদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারেনি, কারণ তারা জানত—মুসলমান এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোর সামনেই নত হবার নয়, আগে হোক কিংবা পরে, তারা বিদ্রোহ করবেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, জুলিমের বিরোধিতা করাটা ফিতরতের তাকাজা ও ঈমানি দায়িত্ব। মুসলমান এ তাকাজা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। তাই মুসলমানদেরকে ফিতরতের তাকাজা থেকে গাফেল ও  ঈমানি দায়িত্ব থেকে বেখবর করতে তারা আবারও সেই ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ এর সাহারা নিল। মুসলমানদের ভাগ করে ফেলল দুই ভাগে—মোল্লা ও মিস্টার। শুরু হলো এখতেলাফ।

আরবিস্তানি বনাম ইংলিস্তানি : এখতেলাফের আদর্শিক বুনিয়াদ

ইংরেজরা ক্ষমতা দখলের আগে হিন্দুস্তানের শিক্ষা সিলেবাস ছিল ধর্মীয় ও সাধারণ বিষয়াদির সমন্বয়ে গঠিত। দরসে নিজামীর কারিকুলাম অনুসরণ করা মাদরাসাগুলোর সিলেবাসে বিজ্ঞান ও গণিতের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইংরেজরা মুসলমানদেরকে শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখবার জন্যে প্রথমত মাদরাসাগুলো ধ্বংস করে দেয়। ইংরেজরা আসবার আগে যেখানে কেবল দিল্লিতেই এক হাজার মাদরাসা ছিল ইংরেজরা ক্ষমতায় আসবার পর সেগুলোর একটাও অবশিষ্ট থাকেনি। দ্বিতীয়ত মুসলমানদের মঝে মোল্লা-মিস্টার এখতেলাফ সৃষ্টির জন্যে কারিকুলাম থেকে ধর্ম শিক্ষাকে বাদ দিয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে প্রথমে ১৮৩৫ সালে ‘ইংলিশ এজুকেশন এক্টের’ মাধ্যমে ফার্সি ও উর্দুকে বাতিল করে ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম বানানো হয়। এরপর শিক্ষাকে ধর্মনিরপেক্ষ করবার নামে ধর্মহীন করবরার লক্ষ্যে কারিকুলাম থেকে ধর্মশিক্ষাকে ছাটাই করে ফেলা হয় হয়। উদ্দেশ্য মুসলমানদেরকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে একটি অশিক্ষিত মুর্খ জাতিতে পরিণত করা ও একটি ‘ইংরেজ পুরুস্ত’ প্রজন্ম গড়ে তোলা। এ সম্পর্কে ধর্মহীন, বরং ধর্মবিদ্বেষী, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে ইসলম বিরোধী এ কারিকুলামের প্রধান কুশিলব লর্ড ম্যাকলে বলেন—‘আমাদের উচিত এমন একটি দল তৈরি করা– যারা আমাদের অধিনস্ত লাখ লাখ হিন্দুস্তানির মাঝে আমাদের পক্ষ থেকে আমাদের প্রতিনিধি হবে। যারা রক্তে মাংসে ঠিকই হিন্দুস্তানি হবে, কিন্তু চিন্তা-চেতনা ও রঙ-ঢঙে হবে ইংরেজ।’ ভিন্ন শব্দে বলা যায় আমাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য এমন এক নওজোয়ান প্রজন্ম তৈরি করা যারা বংশ পরিচয়ে হবে হিন্দুস্তানি, কিন্তু চিন্তা-চেতনায় হবে ইংলিস্তানি।

মুসলমানদের ইসলাম রক্ষায় ইংরেজদের এই মিশনের পালটা মিশন নিয়ে আসল দারুল উলুম দেওবন্দ। দারুল উলুমের প্রতিষ্ঠাতা হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতবি বললেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো এমন প্রজন্ম তৈরি করা—যারা বংশ পরিচয়ে হবে হিন্দুস্তানি, তবে চিন্তা-চেতনায় হবে আরবিস্তানি ও ইসলামিস্তানি।1 সহজ কথায় মাওলানা কাসেম নানুতবি চান এমন প্রজন্ম যাদের আদর্শ হবে ইসলাম ও সাদাসিধ আরবরা, আর লর্ড ম্যাকলে চান এমন প্রজন্ম যাদের আদর্শ পশ্চিমা দর্শন ও ইংরেজ শ্বেত ভদ্রলোকেরা।

মাওলানা কাসেম নানুতবি ও স্যার সৈয়দ, দেওবন্দ ও আলিগড় : এখতেলাফের একাডেমিক সূচনা

মাওলনা কাসেম নানুতবি মুঘল সালতানাতের পরবর্তী সময়ে হিন্দুস্তানি মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয়, বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলন ‘তাহরিকে ওয়ালিউল্লাহ’র সপ্তম কিংবা অষ্টম সিপাহসালার। ইংরেজরা যে ধর্মীয় শিক্ষাকে ছুড়ে ফেলে গোটা একটা জাতিকে জ্ঞানান্ধ করে দিতে চেয়েছিল, মাওলনা কাসেম নানুতবি সে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়েই মুসলমানদেরকে পুনোরুজ্জিবীত করবার মিশন হাতে নিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি সম্পূর্ণরূপে ইংরেজদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকবার মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দ। অপর দিকে কাসেম নানুতবির বিপরিতা দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান। তিনি ইংরেজদের আনূকুল্য গ্রহণ করাকে বানিয়েছিলেন মূলমন্ত্র। মূলত এখান থেকেই মুসলমানদের মাঝে মোল্লা-মিস্টারের এখতেলাফ শুরু।

এ সম্পর্কে ইমামুল ইনকিলাব মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধি বলেন—

‘দেওবন্দি চেতনা ও এর রাজনৈতিক এজেন্ডাকে বুঝতে হলে একথা মথায় গেঁথে নিতে হবে, আমি যে দেওবন্দি জামায়াতকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাচ্ছি তা মূলত সেই দেহলভি জামায়াতেরই নাম—যে জামায়াত মাওলান ইসহাক দেহলভির হিজাজ হিজরত করবার পর হিন্দুস্তানে তাঁর ফিকিরের প্রচার প্রসারের জন্যে বানানো হয়েছিল। এই জামায়াতের প্রথম আমির ছিলেন দিল্লি কলেজের প্রধাণ শিক্ষক মাওলানা মামলুক আলি। তাঁর পর এ দায়িত্ব পান হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি।… এ দেহলভি জামায়াত দিল্লিতেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছিল, কিন্তু ১৮৫৮ সালে ইংরেজরা যখন দিল্লির ক্ষমতা অনুষ্ঠানিকভাবে কব্জা করে নিল, তখন দিল্লিতে তাহরিকে ওয়ালিউল্লাহর কার্যক্রম পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে গেল। ফলে তাদের কার্যক্রম এমন কোনো এলাকায় স্থানান্তরিত করা অনিবার্য হয় গেল যা হবে  ইংরেজদের হস্তক্ষেপ থেকে নিরাপদ। ১৮৫৭ সালে এই জামায়াতের কার্যক্রমে দিল্লি সরকারের (ইংরেজ সরকারের) সহায়তা নেওয়া হবে কিনা এবং সরকারের পক্ষপাতিত্ব করা হবে কিনা তা নিয়ে এখতেলাফ দেখা দেয়, যার ফলে তারা দুই দলে ভাগ হয়ে যান। (এক দলের নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা কাসেম নানুতবি, আরেক দলের নেতৃত্বে ছিলেন স্যার সৈয়্যদ) মাওলানা কাসেম নানুতবি দিল্লি কলেজের আরবি বিভাগকে নিয়ে চলে গেলেন দেওবন্দে, আর স্যার সৈয়দ ইংরেজি বিভাগ2 নিয়ে আলিগড়ে গিয়ে ঘাটি গাড়লেন3

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার দশ বছর পর ১৮৭৬ সালে স্যার সৈয়দ আহমদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা হয় আলিগড় মুসলিম ইউনভার্সিটি। শায়েখ মুহাম্মদ আকরাম সহ অনেকের মতে তিনিও হিন্দুস্তানি মুসলমানদের পুনর্জাগরণ চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা ছিল ইংরেজ অধীনতা মেনে নিয়ে। তাই তিনি বিভিন্ন সময়ে ইংরেজ সরকারের বিরোধিতা করলেও সেই বিরোধিতাটাও ছিল অনেকটা পরামর্শের সুরে। ফলে ইংরেজদের সমালোচনা করে লেখা তার বই ‘আসবাবে বাগাওয়াতে হিন্দ’ এবার ‘অবৈধ’ ইংরেজ সরকারকে ‘আমাদের সরকার’ ‘আমাদের সরকার’ বলে স্বীকৃতি দিয়ে কথা বলেছেন। ফলত তিনি কখনোই ইংরেজদের জন্যে হুমকি হয়ে উঠতে পারেননি, বরং ১৮৫৭ সালে সশস্ত্র বিপ্লবে পরাজিত হয়ে যেসব মুসলমান মাওলানা কাসেম নানুতবির প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম দেওবন্দের স্কলারদের নেতৃত্বে আরেকটি নয়া বিপ্লবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তাদের মোকাবেলায় স্যার সৈয়দ হয়ে উঠেছিলেন ইংরেজদের বাজির ঘোড়া। যার প্রতিদান স্বরূপ তিনি পেয়েছিলন ‘নাইট হুড’ উপাধি।

স্যার সৈয়দের আলিগড় ইউনিভার্সিটি যেহেতু সরকারি ছিল, তাই ইউনিভার্সিটির বার্ষিক ব্যায়ের প্রায় পুরোটাই আসত ইংরেজ অবৈধ সরকারের পক্ষ থেকে। সে প্রতিষ্ঠান থেকে মুসলমানের বাচ্চারাই শিক্ষা নিত, কিন্তু ইংরেজদের ব্যাপারে স্যার সৈয়দের নমনীয় নজরিয়া ও সে নজরিয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি সরকারি খরচে পরিচালিত হওয়ার ফলে এখানকার গ্রাজুয়েটদের বড় অংশটাই লর্ড ম্যাকলের সেই রঙ-ঢঙে হিন্দুস্তানি কিন্তু আদতে ইংলিস্তানি তথা ‘ইংরেজ পুরুস্ত’ প্রজন্মে পরিণত হয়েছিল।

অপর দিকে ইংরেজদের পতনের মাঝেই হিন্দুস্তানি মুসলমানদের পুনর্জাগরণ নিহিত এ বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারা মুসলমনরা সর্বাত্মকভাবে ইংরেজ বিরোধিতা করে যাচ্ছিল।

লর্ড ম্যাকলের ইংলিস্তানি প্রজন্মের মোকাবেলায় কাসেম নানুতবি আরবিস্তানি প্রজন্ম তৈরির যে মশন হাতে নিয়েছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের পৃষ্ঠপোষকতায় সে মিশন অনেক দূর এগিয়েও গিয়েছিল। ফলত মুসলমানদের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল দুটি দল—আরবিস্তানি ও ইংলিস্তানি। টুপি কোর্তাওয়ালা ইংরেজ দুশমন মোল্লা-মৌলভি ও চোস্ত ভদ্র লোক ইংরেজ দোস্ত মিস্টার।

শাইখুল হিন্দের নজরে মুসলমানদের পতনের নেপথ্য : পারস্পরিক এখতেলাফ

দিন যতই গড়ায় দুদলের দূরত্ব ততই বাড়ে। এতে করে ইংরেজ বিরোধী জিহাদও লম্বা হয়। এসময়ের মধ্যেই (১৯১৩-১৯২০) মাওলানা কাসেম নানুতবির শাগরেদ শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসানের নেতৃত্বে গড়ে উঠতে শুরু করে আরেকটি আশাজাগানিয়া আন্দোলন। এর লক্ষ্য কেবল হিন্দুস্তানকে ইংরেজ মুক্ত করে হিন্দুস্তানি মুসলমানের পুনর্জাগরণ নিশ্চিত করাই নয়, বরং কাফের মুশরিকদের চতুর্মাত্রিক চক্রান্তে দূর্বল হয়ে পড়া মুসলমানদের রাজনৈতিক কেন্দ্রস্থল উসমানী খেলাফতকে রক্ষা করাটাও ছিল আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু কুদরতের ফয়সালা ছিল ভিন্ন।  বিপ্লবের চুড়ান্ত পর্ব যখন ঘনিয়ে এলো, তখন শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান হিজাজ থেকে সেই চূড়ান্ত পর্বের প্ল্যান একটি রেশমী রুমালে লিপিবদ্ধ করে হিন্দুস্তানে অবস্থানরত আন্দোলনের নেতৃবর্গের কাছে পাঠিয়ে দেন। দুর্ভাগ্যবশত ইংরেজ গোয়েন্দারা রুমাল বহনকারীকে গ্রেফতার করে রুমালটি জব্দ করে ফেলে। হিজাজ থেকে শাইখুল হিন্দ ও তাঁর একান্ত শাগরেদ শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানিসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে মাল্টায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মাল্টায় সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময়ের বন্দি জীবন শেষে যখন শাইখুল হিন্দ ১৯২০ সালে হিন্দুস্তানে ফিরে আসেন।

শাইখুল হিন্দ বন্দী হওয়ার আগে হিন্দুস্তানি মুসলমানের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন গভীরভাবে। ইংরেজ বিরোধী ও খেলাফত রক্ষাকারী যে তাহরিক তিনি শুরু করতে চেয়েছিলেন তার জন্যে গভীর পর্যবেক্ষণ জরুরিও ছিল। তিন বছরেরও বেশি সময়ের বন্দী জীবনে তিনি তার পর্যবেক্ষণ নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাব করেন। তাঁর চিন্তা-ভাবনার নতিজা ছিল—মুসলমানদের অধঃপতন ও পরাজয়ের কারণ মূলত দুটি— 

  • কুরআন থেকে দূরে সরে যাওয়া, 
  • পরস্পরের মাঝে এখতেলাফ।

তাই ইংরেজ খেদিয়ে মুসলমানদের পুনর্জাগরণ নিশ্চিত করতে  হলে কুরআনের ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটাতে হবে ও পারস্পরিক এখতেলাফ দূর করতে হবে।

শাইখুল হিন্দ বন্দী জীবন থেকে যখন ফিরে আসেন তখন তাঁর বয়স ও স্বাস্থ্য কোনোটাই তাঁর অনুকূলে ছিল না। তার পরও তিনি এ দুই কাজের জন্যে নিজেকে সপে দেন। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের বিখ্যাত কুরআন গবেষক ডা. ইসরার আহমদ লিখেন—‘মাওলানা মাহমুদ হাসানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, উপমহাদেশে ইসলামি স্বাতন্ত্র্য পুনরুজ্জীবনে তাঁর ভূমিকা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব সম্পর্কে বিদগ্ধ পণ্ডিত সমাজ অনেক কিছু লিখেছেন এবং এখনো লিখে চলেছেন। তবে আমি তাঁর বহুমুখী ব্যক্তিত্বের এমন একটি দিক উন্মোচন করার চেষ্টা করেছি যা আমার সামান্য জ্ঞান অনুযায়ী বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।’

​কেননা তিনি নিজেই বলতেন, ‘জেলখানার নির্জনে বসে আমি যখনই এ বিষয়ে চিন্তা করেছি, গোটা বিশ্বে কেন মুসলমানরা দীনি ও দুনিয়াবি উভয় দিক থেকে ধ্বংস হচ্ছে, তখন এর দুটি কারণ আমার সামনে স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, তাদের কুরআন পরিত্যাগ করা এবং দ্বিতীয়ত, নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক মতভেদ ও গৃহবিবাদ। তাই আমি সেখান থেকেই (মাল্টা থেকে) এই সংকল্প নিয়ে ফিরেছি—আমার বাকি জীবন এই কাজে উৎসর্গ করব যেন পবিত্র কোরানের শব্দ ও মর্মকে সর্বজনীন করা যায়। শিশুদের জন্য প্রতিটি জনপদে কুরআনের শব্দ শেখার মক্তব কায়েম করা হবে এবং বয়স্কদের ‘দরসে কুরআন’-এর মাধ্যমে এর অর্থ ও মর্মের সাথে পরিচিত করে তোলা হবে এবং কুরআনি শিক্ষার ওপর আমল করার জন্যে প্রস্তুত করা হবে। আর মুসলমানদের পারস্পরিক কলহ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।’

​যখন শাইখুল হিন্দ কারামুক্তি লাভ করে হিন্দুস্তানে প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন তিনি তাঁর সকল ছাত্র ও ভক্তদের এই নির্দেশনা দেন—তারা যেন তাদের পূর্ণ মনোযোগ কোরানের সেবায় নিবদ্ধ করেন।4

এদিকে শাইখুল হিন্দ কারাগারে বসেই শাহ আব্দুল কাদের দেহলভির করা কুরআনুল কারিমের প্রথম উর্দু তরজমা ‘موضح قرآن’ এর ওপর নতুনভাবে কাজ করেন যার নাম ছিল ‘موضح فرقان’ যা পরবর্তীতে ‘তরজমায়ে শাইখুল হিন্দ’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

ডিভাইড এন্ড রুল তথা এখতেলাফ বাধাও শাসন করোনীতি বাস্তবায়নে আলিগড়ের কারনামা

অপর দিকে মুসলমানদের দুই শ্রেণি তথা প্রাচীন ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত মৌলভি ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মিস্টারদের মাঝে এখতেলাফ দূর করবার জন্যেও তিনি মেহনত মুজাহাদা শুরু করেন। ইংরেজদের ডিভাইড এন্ড রুলের মাধ্যমে সৃষ্ট বিভেদ-বিভাজন দূর করতে সচেষ্ট হন।

স্যার সৈয়দের নজরিয়া ও আলিগড়ের আদর্শ দিয়ে ইংরেজদের কবল থেকে মুক্তি সম্ভব নয় এ বাস্তবতা দেওবন্দি স্কলাররা স্যার সৈয়দের ‘স্যার’ হয়ে ওঠা ও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। ইতিমধ্যে দেখা গেল আলিগড়ের অনেক গ্রেজুয়েটও এ বাস্তবতা উপলব্ধি শুরু করেছেন। তারা বুঝতে শুরু করেছেন—আলিগড়ের নরম নরম ইংরেজ বিরোধিতা আদতে ইংরেজদের বৈধতা দেওয়ার পথকেই সহজ করে। অপরদিকে সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান হওয়ার ফলে এর সংশ্লিষ্টদের জন্যে খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণেরও কোনো উপায় ছিল না। ইংরেজ নওয়াজ প্রফেসর ও পৃষ্ঠপোষকদের প্রচেষ্টায় আলিগড় আকিদা-বিশ্বাসেও হয়ে পড়েছিল দেউলিয়া। ইতিহাসবিদ শায়েখ মুহাম্মদ আকরাম আলিগড়ের করুণ পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন—

‘স্যার সৈয়দ বিশ্বাস করতেন, আলিগড়ের উত্তরসূরিরাই তাঁর মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তিনি কল্পনা করেছিলেন—তারা হবে ইসলামি ভারতবর্ষের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারীস। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় আপত্তির এমন দাঁতভাঙা জবাব দেবে যে সমালোচকরা স্তব্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ছিল ঠিক উল্টো—

در بغل تیر و کمان گشته و نخچیر شدیم!

হাতে আমাদের তীর-ধনুক, তা সত্ত্বেও আমরাই শিকারে পরিণত হলাম!

পরিস্থিতি তো এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কোনো দিক থেকে ইসলাম, মুসলমান কিংবা আলিগড়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠলে তাতে সায় দেওয়ার জন্যে সবার আগে আলিগড়ের লোকেরাই দাঁড়িয়ে যায়। তাদের ভাবসাব অনেকটা এমন:

سر تسلیم خم ہے جو مزاج یار میں آئے

প্রিয়জনেরা যা ভালো মনে করেন, তা-ই আমরা মাথা পেতেনি।

মুসলমান, মুসলিম শাসক কিংবা ইসলামের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে আলিগড় কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রজন্মের সমাপ্তির পর আজ পর্যন্ত সেখান থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য বই প্রকাশিত হয়নি। বরং অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে—কোনো অমুসলিম যদি সুলতান মাহমুদ গজনভি  কিংবা আওরঙ্গজেবের মতো কোনো মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে কিছু লেখে, তবে আলিগড়ের সে সব ‘স্মার্ট’ ও ‘চোস্ত ভদ্র লোক’দের উত্তর হয় এই—

مجھے تو خوہے کہ جو کچھ کہو بجا کہیے ؟

আমার নিজেরও তো মনে হয়—আপনি যা বলছেন ঠিকই বলছেন।

বরং তারা আগে বেড়ে এমনও বলবে—কেবল মাহমুদ গজনভি বা আলমগীরই গোঁড়ামির মূর্ত প্রতীক ছিলেন না, বরং  (হিন্দুস্তানে) মুসলিম সালতানাতের মহান স্থপতি সুলতান মুহাম্মদ ঘুরিও ছিলেন একজন আনাড়ি জেনারেল এবং অদক্ষ সৈনিক। তার হাতে একটি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হওয়া কাকতালীয় বিষয় ছাড়া কিছুই নয়!5

শায়েখ আকরাম আরেক জায়গায় লিখেন—  

‘যদি ধর্মের মৌলিক বিধানগুলোর বাহ্যিক পাবন্দি বা অনুসরণের বিষয়টিকেও এক মুহূর্তের জন্যে উপেক্ষা করা হয়, তবুও আলিগড়ের ভেতরে ভেতরে এক ধরনের সাধারণ ঈমানি দুর্বলতা এবং আধ্যাত্মিক হীনম্মন্যতার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে। আপনি গুটিকয়েক ব্যতিক্রম বাদে সেখানকার যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক এবং প্রখর ও সম্ভাবনাময় ছাত্রদের কথা শুনলে, তাদের মানসিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে উপলব্ধি করবেন—তাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো—আপনি যেন তাদেরকে কোনোভাবেই দকিয়ানুসি বা সেকেলে রক্ষণশীল মুসলমান মনে না করেন। অর্থাৎ তাদের মানসিকতা এমন—আলিগড় তো—

کالج ہے، امام باڑہ تو نہیں ہے!

কলেজ মাত্র, কোনো ইমামবাড়া তো নয়!

এ মানসিকতা সম্ভবত কোনো গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক যেমনটি সাইয়্যেদ সুলাইমান নদভি ও অন্যান্য নদভিদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে—যদিও ‘নদওয়া’ প্রাচীন ও আধুনিকের সমন্বয়ক হিসেবে গণ্য হয়—তবুও তারা যেন এমন কোনো কথা না বলেন যা নিয়ে দেওবন্দের সামান্যতম আপত্তির অবকাশ থাকে। আর এভাবেই তারা এখন প্রাচীনপন্থার সমর্থন ও রক্ষণশীলতায় দেওবন্দকেও ছাড়িয়ে গেছেন। একইভাবে আলিগড়িদের অবচেতনেও এই আবেগ তীব্রভাবে কাজ করে যে—যদিও তাদের প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি ধর্মীয় মৌলিকত্বের ওপর, তবুও তাদের থেকে যেন এমন কোনো কথা বা কাজ প্রকাশ না পায় যা সরকারি কলেজসমূহ বা প্রগতিশীল মহলে সমালোচনার সুযোগ তৈরি করে, কিংবা যার কারণে তাদের ‘প্রাচীনপন্থি’ ও ‘সেকেলে’ বলে গণ্য করা হয়।6

মোটকথা লর্ড ম্যাকলে যেমন ইংরেজ পুরস্ত প্রজন্ম গড়ে তুলবার আকঙ্খা করেছিলেন, আলিগড় দায়িত্বের সঙ্গে তার সে আকাঙ্খা পূরণ করেছিল। একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করেছিল তাদের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ তথা ‘এখতেলাফ বাধাও শাসন করো’ এর মিশনও।

এখতেলাফ নিরসনে শাইখুল হিন্দের উদার নীতি

এমন তিক্ত ও ভয়াবহ বাস্তবতা সৃষ্টি হওয়ার ফলে আলিগড়ের সমঝদার গ্রেজুয়েটদের সামনে আলিগড় থেকে বেরিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

এরই প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ আলি জাওহার, হাকিম আজমল খান, মুখতার আওমদ আনসারি প্রমুখের নেতৃত্বে ইংরেজ কর্তৃত্ব থেকে সম্পূর্ণ আজাদ আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলবার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯২০ সালে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে সে আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী জলসা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় ‘জাতীয় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ যা পরবর্তীতে ‘জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। সে উদ্বোধনী মজলিসে প্রধান মেহমান করা হয় শাইখুল হিন্দ মাওলনা মাহমুদ হাসানকে। এটা যে সময়ের কথা, যখন শাইখুল হিন্দ ছাড়াও হিন্দুস্তানের তাহরিকে আজাদির জন্যে নিবেদিত প্রাণ আরও অনেক মুসলিম লিডার ইংরেজদের চোখে চোখ রেখে কথা বলছেন। কিন্তু তা সত্বেও প্রতিষ্ঠাতাগণ শাইখুল হিন্দকেই প্রধান মেহমান বানিয়েছিলেন, কারণ তাঁরা তাঁর উঁচু ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা ও উদারতার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারা হয়তো শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানির মতো একথারও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন—মাওলানা  মাহমদু হাসান ‘শাইখুল হিন্দ’ হিসেবে পরিচিত হলেও, তাঁর ইলম, মেহনত ও উদারতার কারণে ‘শাইখুল আলমই’ হলো তাঁর যথাযোগ্য উপাধি।7 

সেসময় শাইখুল হিন্দের স্বাস্থ্য খুবই প্রতিকুল ছিল, এমনকি সে বছরই প্রতিকূল স্বাস্থ্যই তাঁর ইন্তেকালের ওসিলা হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতেও তিনি তাদের দাওয়াত কবুল করে কেনো আলিগড়ে উপস্থিত হয়েছিলেন তা নিজেই তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এই বার্ধক্য, অসুস্থতা সঙ্গে করে এমন  দুর্বল অবস্থায়—যা আপনারা নিজ চোখেই দেখছেন—আমি আপনাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছি। কারণ আমি এখানে আমার একটি হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।’

সে হারানো সম্পদটা যে মুসলমানদের মোল্লা-মিস্টারের ঐক্য-সম্প্রতি সেটাও তিনি তাঁর বক্তব্যে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তবে তিনি একথা বলতেও দ্বিধা করেননি–এ এখতেলাফ দূর করবার ক্ষেত্রে সমঝদার মিস্টাররাই বেশি অগ্রসর। তিনি বলেন, ‘হে দেশের নবীন প্রজন্ম! যখন আমি দেখলাম আমার এই দহন, যা আমার অস্থিমজ্জা পর্যন্ত গলিয়ে দিচ্ছে, এর প্রকৃত সহমর্মীদের সংখ্যা মাদরাসা ও খানকায় কম, বরং স্কুল ও কলেজসমূহে বেশি, তখন আমি এবং আমার কিছু আন্তরিক সাথী আলিগড় কলেজের দিকে অগ্রসর হলাম।

এভাবেই আমরা উপমহাদেশের দুটি ঐতিহাসিক কেন্দ্র—‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ ও ‘আলিগড় কলেজ’8-এর মধ্যে এক সংযোগ স্থাপন করলাম।

শাইখুল হিন্দ জানতেন তাঁর এ যুগান্তকারী ও জরুরি পদক্ষেপের কারণে অনেক আলোচনা সমালোচনা হবে, অনেকে হয়ত তাঁকে ‘পথচ্যুত’ হিসেবেও অবহিত করবেন। তাই তিনি বলেছিলেন—‘এমনটা হওয়া অসম্ভব নয়, অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ভালো মানুষ আমার এ পদক্ষেপের সমালোচনা করবেন এবং আমাকে আমাদের পূর্বসূরিদের পথ থেকে বিচ্যুত বলে অভিহিত করবেন। কিন্তু যারা গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন, তারা বুঝেন আমি যতটুকু আলিগড়ের দিকে অগ্রসর হয়েছি, আলিগড় তার চেয়েও বেশি  আমার দিকে অগ্রসর হয়েছে।’

শাইখুল হিন্দ ছিলেন দেওবন্দি ঘরানা ও এর সমমনাদের প্রাণপুরুষ। তাই বিভিন্ন কারণে ঘরনার বাইরের লোকদের গ্রহণ করতে না পারার যে অদৃশ্য দেয়াল দেওবন্দি ও এর সমমনাদের ব্যষ্টন করে রেখেছি তা ভেঙে বেরিয়ে আসাটা তাঁর জন্যে মোটেও মামুলি বিষয় ছিল না—যা তাঁর বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট। তা সত্ত্বেও তিনি সে দেয়াল ভেঙে ছিলেন, ভিন্ন ঘরানাকে আপন করে নিয়েছিলেন, তাদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার উদারতা দেখিয়েছিলেন। কারণ মোল্লা-মিস্টার নির্বিশেষে উম্মতের প্রতি তাঁর দরদ ও সকলের ঐক্যের মাধ্যমে উম্মতের পুনর্জাগরণের আকাঙ্খা।

শাইখুল হিন্দের উদার নীতি : আমাদের পুনর্জাগরনের সোপান

বর্তমান সময়টা আমরা মুসলমানদের জন্যে খুবই নাজুক। ডিভাইড এন্ড রুলের মাধ্যমে ইংরেজদের সৃষ্ট এখতেলাফ আমাদের ওপর এখন আরও প্রবলভাবে সওয়ার। আমাদের দুশমনরাও এখন আগের চেয়ে অনেক প্রতাপশালী ও কুটকৌশলী। তাই পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকাটা অনেক বেশি জরুরি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা মুসলমানরা এখন বহু দলে বিভক্ত।  মোল্লা এবং মিস্টার, হুজুর এবং জেনারেল বিভেদটা এখন চরমে। মাওলানা সাহেবরা  অমাওলানা বা পরিভষায় যারা ‘জেনারেল’ তাদের মনে করেন আধা মুসলিম কিংবা অমুসলিম। আর তারা মাওলানাদের মনে করেন সেকেলে ও অসভ্য। শায়েখ মুহাম্মদ আকরাম আলিগড়ের যেমন অবস্থা বর্ণনা করেছেন বর্তমানের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতিও তেমন, বরং আরও খারাপ। ঈমান-আকিদা সম্পর্কে বেখবর, ধর্মীয় দায়িত্ব সম্পর্কে গাফেল, নৈতিক মূল্যবোধের বালাই নেই, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারাই দুনিয়ার একমাত্র সিভিলাইজড, ইন্টিলেকচুয়াল ও মডার্ন শ্রেণী। আর সবাই অশিক্ষিত বর্বর ও পশ্চাৎপদ।

ইংরেজদের প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি ঠিকই কিন্তু তাদের পরোক্ষ প্রভাব থেকে আজও মুক্ত হিতে পেরিনি। তাদের রেখে যাওয়া সিস্টেমকে আমরা ছুড়ে ফেলতে পারিনি। বিশেষত শিক্ষার ক্ষেত্রে তো এখনো সেই লর্ড ম্যাকলের বানিয়ে যাওয়া কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়, ফলে সে কারিকুলাম অধিনে পাঠ লাভ করে রঙে-ঢঙে মুসলমান কিন্তু প্রকৃত অর্থে ইংরেজদের মানস সন্তানরাই বেরুচ্ছে প্রতিনিয়ত।

মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র কালামে নির্দেশ দিয়েছেন— 

واعْتَصِمُوْا  بِحَبْلِ  اللّٰهِ  جَمِیْعًا  وَّ  لَا  تَفَرَّقُوْا۪ وَاذْكُرُوْا  نِعْمَتَ  اللّٰهِ  عَلَیْكُمْ  اِذْ  كُنْتُمْ  اَعْدَآءً  فَاَلَّفَ  بَیْنَ  قُلُوْبِكُمْ  فَاَصْبَحْتُمْ  بِنِعْمَتِه اِخْوَانًاۚ ۞

আল্লাহর রশিকে (তাঁর দীন ও কিতাবকে) দৃঢ়ভাবে ধরে রখো এবং পরস্পরে বিভেদ করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন তা স্মরণ রাখো। একটা সময় ছিল, যখন তোমরা একে অন্যের শত্রু ছিলে। তারপর আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহকে জুড়ে দিলেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা ভাই-ভাই হয়ে গেলে।9

মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন—

وَ لَا تَكُوْنُوْا كَالَّذِیْنَ تَفَرَّقُوْا وَ اخْتَلَفُوْا مِنْۢ بَعْدِ مَا جَآءَهُمُ الْبَیِّنٰتُ ۞

এবং তোমরা সে সকল লোকের (ইহুদি ও নাসারার) মতো হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি আসার পরও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল ও আপসে মতভেদ সৃষ্টি করেছিল।10

কুরআন সর্বজনীন, তাই মানুষমাত্রই কোরানের আদেশ নিষেধ তার ওপরে বর্তায়। তবুও আলেমগণ নবিগণের ওয়ারিস সে হিসেবে একতা ও সম্প্রীতির মাধ্যমে ভাই ভাই হয়ে থাকবার নির্দেশটা সবার আগে তাদের ওপরই বর্তায়। তাই আলেমদের পারস্পরিক এখতেলাফ দূর করে যারা আলেম নন তাদের সঙ্গে যে এখতেলাফ ও দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা দূর করবার জন্যে আলেমদেরকেই আগে হাত বাড়াতে হবে। এমন এখতেলাফ দূর করবার জন্যে শাইখুল হিন্দ মাদরাসার বাইরে কলেজ-ইউনিভার্সিটি গড়ে তুলবার প্রয়োজন অনূভব করেছিলে, এখনো সে প্রয়োজন প্রবলভাবে বিদ্যমান, তাই আলেমদেরকেও সে পথেও এগোতে হবে।

গবেষক ও চিন্তক মাওলানা যাহেদুর রাশেদি বলেন—‘দেওবন্দ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ধর্মীয় আন্দোলনের নাম। আর এ আন্দোলন যদি কারোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গরূপে ভাস্বর হয়ে ওঠে তিনি হলেন শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান রহ.।11 অর্থাৎ শাইখুল হিন্দ দেওবন্দ ও দেওবন্দিয়্যেতের আমলি ভাষ্যকার। সুতরাং কেউ যদি নিজেকে ‘দেওবন্দি’ দাবি করে, কিন্তু শাইখুল হিন্দের দর্শন, তাঁর উদার চিন্তাকে আত্মস্থ করতে না পারে অথবা না চায়, তাহলে সেটা হবে চরম অন্যায় ও ধোঁকাবাজী। দেওবন্দ ও আকাবিরে দেওবন্দের নাম ভাঙিয়ে উদর পূর্তির ব্যবস্থা করা।

মুদ্রার অপর পিঠে যারা আলেম নন, বরং ‘জেনারেল’ হিসেবে পরিচিত  তাদের ওপরও অনেক দায়িত্ব বর্তায়। জামিয়া মিল্লিয়ার প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকেই ছিলেন জেনারেল। কিন্তু তারা নিজেদেরকে ‘সিভিলাইজড’ মনে করে আলেমদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেননি, বরং তাদের মজলিসের প্রধাণ ও পরামর্শ দাতা বানিয়েছিলেন একজন মাওলানাকে। মুসলমান হিসেবে আল্লাহর নির্দেশ যেহেতু তাদের ওপরও বর্তায়, তাই মোল্লা-মিস্টারের এখতেলাফ দূর করে এক উম্মত হয়ে দীন প্রতিষ্ঠার জন্যে তাদেরকেও হাতটা বাড়িয়ে দিতে হবে। শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানি শাইখুল হিন্দকে ‘শাইখুল আলম’ বলেছেন। তাঁর কথা চূড়ান্ত বাস্তব। মাওলানা মাহমুদ হাসান চিন্তায়, কর্মে ও উদারতায় হিন্দুস্তানের সীমান ছাড়িয়ে বৈশ্বিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। তাই যারা নিজেদেরকে ‘দেওবন্দি’ মনে করেন না কিংবা দেওবন্দি হিসেবে পরিচয় দিতে অস্বস্তি বোধ করেন, তারাও শাইখুল হিন্দের চিন্তা ও উদারতাকে গ্রহণ করতে পারেন অনায়াসে।

আমরা যারা নিজেদেরকে দেওবন্দি দাবি করি, তারা যদি এভাবে শাইখুল হিন্দকে পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারি এবং সাধারণকে মুসলমান মনে করে তাদের সামনে শাইখুল হিন্দকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারি এবং তারাও শাইখুল হিন্দকে যথাযথভাবে গ্রহণ করেন, তাহলে আশা করা যায়—আমাদের চারপাশে যে অস্থিরতা ও পরস্পরের প্রতি অনাস্থা তা সহজেই দূর হয়ে যাবে। ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবার যে নেক আকাঙ্খা তা বাস্তবায়নের পথও সুগম হবে, ইনশাআল্লাহ।

  1. নকশে হায়াত, হুসাইন আহমদ মাদানি, খণ্ড :  ১, পৃষ্ঠা : ১৮৬ ↩︎
  2. এখানে আরবি-ইংরেজি বিভাগ বলে শুধু এই দুই বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উদ্দেশ্য নয়, বরং আরবি বিভাগ বলে মাওলানা কাসেম নানুতবির সমচিন্তার ব্যক্তিবর্গ ও ইংরেজি বিভাগ বলে স্যার সৈয়্যদের সমচিন্তার লোকদের বোঝানো হয়েছে। আর স্যার সৈয়দের চিন্তাধারা কেমন ছিল, সেটা বোঝবার জন্যে মুহাদ্দিসুল আসর আল্লামা ইউসুফ বিন্নুরির এতটুকু কথাই যথেষ্ট—
    “اور سرسید احمد خان کے بارے میں اکابرعلماء کی متفقہ رائے یہ ہے کہ وہ ملحد، بے دین اور گمراہ شخص تھے، الحاد وزندقہ کے نتیجہ میں بالآخر ’’فرقہ نیچریہ‘‘ کے بانی بن بیٹھے، جس کی بنیاد اس پر تھی کہ آدمی مذہب کے معاملہ میں اپنی فطرت وطبیعت (نیچر) کا تابع ہے نہ کہ کسی آسمانی  ہدایت کا۔ اور اسی بنا پر ہر اس مسلمہ عقیدہ کا انکار جو انسانی عقل میں نہ آتا ہو اس فرقہ کا خاصّہ ہے، جو سراسر گمراہی اور الحاد ہے” – یتیمۃ البیان فی شیءٍ من علوم القرآن، ص:101-108
    আরও দেখা যেতে পারে – “سرسید احمد خاں کا نظریہٴ حجیتِ حدیث بحث وتحقیق کے آئینہ میں” بہ قلم: حضرت مولانا حبیب الرحمن اعظمی  ”  ↩︎
  3. শাহ ওয়ালিউল্লাহ আওর উনকি সিয়াসি তাহরিক, উবাইদুল্লাহ সিন্ধি, পৃষ্ঠা : ৯৮-১০০ ↩︎
  4.  জামায়াতে শাইখুল হিন্দ আওর তানযিমে ইসলামি, ডা. ইসরার আহমদ ↩︎
  5. মাওজে কাওসার, শায়েখ মুহাম্মদ আকরাম, পৃষ্ঠা : ১৫২ ↩︎
  6. মাওজে কাওসার, শায়েখ মুহাম্মদ আকরাম, পৃষ্ঠা : ১৫৪ ↩︎
  7.  শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান : শাখসিয়্যাত, আফকার, কারনামে, মাওলানা যাহেদুর রাশেদি ↩︎
  8. আলিগড় কলেজ বলতে স্যার সৈয়দের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় উদ্দেশ্য নয়, বরং সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটা ও এর প্রতিষ্ঠাতাদের সমমনা যারা ছিলেন তারাই উদ্দেশ্য। ↩︎
  9. সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১০৩ ↩︎
  10. সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০৫ ↩︎
  11.  শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান : শাখসিয়্যাত, আফকার, কারনামে, মাওলানা যাহেদুর রাশেদি, পৃষ্ঠা : ২১ ↩︎
Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *