মধ্য কার্তিকের ফিনফিনে কুয়াশা উড়িয়ে ছুটে চলছে রাতের ট্রেন। দ্রুতযান এক্সপ্রেস। ঢাকা টু পঞ্চগড়। বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা এবং ঢাকা থেকে দেশের সবচেয়ে দূরবর্তী স্টেশন। হঠাৎ করেই মনে হলো দূরে কোথাও ঘুরে আসি। এক ছুটির সন্ধ্যায় নদীতীরবর্তী একটা কুঁড়েঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম বন্ধুদের সঙ্গে—আলতো করে চুমুক দিচ্ছিলাম চায়ের কাপে। আমাদের মফস্বলে জীবনের খুব কাছেই বহতা নদী। চাইলেই হুডখোলা রিকশায় চড়ে হাওয়া খেতে চলে যাই। অধিকাংশ দিন আমি একাই যাই। পাড় ধরে হাঁটি। বসে থাকি কাশবনের ছায়ায়। দেখি হোগলার বনে পাখিদের ওড়াউড়ি। সেদিন চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে আচমকা দেখি কুয়াশা ঘন হচ্ছে দিগন্তে। ধূসর হয়ে উঠছে নদীর ওপার। অনতিদূরে ব্রিজের ল্যাম্পপোস্টে সাদা আলো ঘিরে জমাট বাঁধছে রহস্য। তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, হলুদ ধানের মতো পাক ধরেছে হেমন্তে। কার্তিকের তখন মাঝামাঝি হবে। মনে ভাবি দূরে কোথাও বেরিয়ে পড়ব। পাহাড় সমুদ্র না, যাব নতুন কোথাও, আগে যাইনি যেখানে। হেমন্তের শীত আসি আসি করি এই সময়টা আমাকে ভীষণ অনুভূতি দেয়। রূপসী বাংলা তখন অন্যরকম ব্যঞ্জনায় হাজির হয় আমার চোখে। আর আমার মন আকুপাকু করে দূর পৃথিবীর গন্ধে। ইচ্ছে করে ভোরের পাখিদের মতো উড়ে যেতে শহর মাড়িয়ে নদী পেরিয়ে মাঠ ছাড়িয়ে বহুদূরে কোথাও, যেখানে একদিন সোনালি ডানার পরি এসে উড়িয়ে নিয়ে গেছে আমাদের কৈশোরের রাজকুমারকে। আমি টের পাই, শীতের প্রথম কুয়াশা চেপে ধরেছে আমার অনুভূতিকে। ততক্ষণে সন্ধ্যা ফুরিয়ে গিয়ে রাত নেমে এসেছে। অন্ধকারে তারা জ্বলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে আকাশ ভরে যেতে থাকে আমের বোলের মতো অসংখ্যা তারা নক্ষত্রে। আমরা উঠে আসি নদীর তীর ছেড়ে এবং ঢুকে পড়ি নিত্য শহুরে জীবনে। তারপর যখন রাতে বিছানায় ঘুমুতে যাই, মনে পড়ে সন্ধ্যার কুয়াশার কথা। আমি দেখি আমার স্মৃতি ও করোটিতে উড়ছে কার্তিকের ফিনফিনে কুয়াশা।
পরদিন বিস্তর চিন্তা-ভাবনার পর ঠিক করি এই হেমন্তে ঘুরে আসব উত্তরবঙ্গ থেকে। আগে যাইনি কখনো উত্তরবঙ্গে। বাংলার বিরাট এই অঞ্চলের মাটি ও প্রকৃতি সম্বন্ধে বাস্তব জ্ঞান নেই। পরীক্ষার ছুটি হয়েছে, হাতে সময় আছে এক সপ্তাহ। ঠিক করি দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় যাব। ঢাকা থেকে এর অধিক দূরত্বে আর কোনো জেলা নেই। ভ্রমণের দূরত্বটা সবসময়ই উপভোগ করি। যেতে থাকবে যেতেই থাকব, অন্তহীন এই পথচলা ভীষণ আনন্দ দেয়। আমি যাব এতটুকু নিশ্চিত হয়েছি, এখন দরকার একজন সফরসঙ্গী। কিন্তু কে যাবে আমার সঙ্গে এতদূর? তাছাড়া সময়েরও ব্যাপার আছে। করোটিতে একের পর এক নাম তালাশ করি বন্ধু ও প্রিয়জনদের। প্রথমেই বলি ওয়াসিমকে—আমার বন্ধু ও কাজিন, দুই বছর হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে সরকারি চাকরি করছে কাকরাইলে। ভাগ্য ভালো, বলামাত্রই ওয়াসিম রাজি হয়ে গেল। তারও নাকি অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল উত্তরবঙ্গ ঘুরে দেখার। শুক্র-শনি তার সাপ্তাহিক ছুটি, এর ওপর বাড়তি আরও দুইদিনের ছুটি নিল। দেরি না করে অনলাইনে কেটে নিই আসা-যাওয়ার টিকেট। যাওয়ার টিকেট কাটলাম ঢাকা টু পঞ্চগড়—শোভন চেয়ারে ভাড়া পড়ল জনপ্রতি সাড়ে সাতশো করে। ফিরতি টিকেট কাটলাম দিনাজপুর টু ঢাকা—এসি কোচে জনপ্রতি ভাড়া পড়ল পনেরোশো টাকা। যেহেতু উত্তরবঙ্গ যাচ্ছি, দূরের সফর, তাই পঞ্চগড়ের সঙ্গে আরও একটি জেলা ঘুরে আসব। ঢাকা থেকে সরাসরি পঞ্চগড় চলে যাব। সেখান থেকে পরে দিনাজপুর।
তিন অক্টোবর, শুক্রবার। রাত ন’টা বেজে দশ মিনিটে আমাদের ট্রেন ছেড়ে গেল ঢাকা স্টেশন থেকে। উত্তরবঙ্গের লাইনে চলে ব্রডগেজ ট্রেন। সাধারণ মিটারগেজ ট্রেন থেকে ব্রডগেজ ট্রেনের বগি দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে বড় হয়। তাই রেললাইনও হয় প্রস্থে বড়। ঢাকা-উত্তরবঙ্গ রোডে চলে ব্রডগেজ আর ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট রোডে চলে মিটারগেজ ট্রেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট রোডে নিয়মিত চলাচল করলেও আজই প্রথম চড়লাম উত্তরবঙ্গ রোডের ব্রডগেজ ট্রেনে। ভেতরে প্রতি সারিতে একপাশে তিনটি অপরপাশে দুটি করে মোট পাঁচটি সিট। মিটারগেজ ট্রেনে সিট থেকে থাকে দুটি করে চারটি। আমরা নিলাম একপাশের দুটি সিট। আমি বসলাম উইন্ডো সিটে। ভ্রমণে জানালার পাশে বসতে ভালো লাগে। বাইরের ধাবমান দৃশ্য দেখি তাকিয়ে। ট্রেন বিমানবন্দর স্টেশন ছেড়ে গাজীপুরে প্রবেশ করলে রাতের খাবার খেয়ে নিই। প্রস্তুত হতে হতে সময় পেরিয়ে যায়। তাই হাতে সময় ছিল না। খেয়ে নিতে পারিনি। পল্টন থেকে দুই প্যাকেট হাজির তেহারি নিয়ে দ্রুত রিকশায় চেপে বসি। আমাদের সঙ্গে আরও অনেকেই দেখলাম রাতের খাবার খেয়ে নিচ্ছে। শুরুর দিকে খানিক বিরক্ত হচ্ছিলাম। আমরা যে বগিতে ছিলাম সেখানে ট্যুরিস্ট ছিল কম, ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড়ের স্থানীয় নারী-পুরুষই ছিল বেশি। তারা অতিরিক্ত শোরগোল করছিল ট্রেনের ভেতর। পরে ধীরে ধীরে পরিবেশ স্বাভাবিক হতে শুরু করে। রাত বাড়তে থাকলে ঘুমিয়ে পড়ে তারা।
ট্রেন ছুটছে তীব্রস্বরে। ছুটছে মাঠ-ঘাট-নদী আর বনভূমি পেরিয়ে। জানালার ঠান্ডা গরাদে কাত হয়ে তাকিয়ে আছি বাইরে। আমার চোখ-মুখ-কান ছুঁয়ে যাচ্ছে বাইরের ধাবমান কুয়াশা। আকাশে ভাসছে সাদা বেলুনের মতো শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ। অমনি করে যেন ছুটছে আমার সঙ্গে। আমি একবার প্রকৃতির দিকে তাকাই একবার তাকাই আকাশের বুকে। আমার ভালো লাগে দেখতে রাতের এই নিসর্গ। ট্রেন যত উত্তরের দিকে এগিয়ে যায় ততই বাড়তে থাকে ঠান্ডার প্রকোপ। ঘন হতে থাকে কুয়াশা। ধীরে-ধীরে কার্তিক যেন পৌষ-মাঘ হয়ে যাচ্ছে। রাত ক্রমশ বেড়ে চলে। শীত নামে ঝেঁপে। সেইসাথে বাড়ে অন্ধকার। অন্ধকারে মিশে আছে কোমল জোছনা। গভীর ঘুমে ডুবে গেছে সারাটা কম্পার্টমেন্ট। আমার ঘুম আসে না। আমি অবিরাম তাকিয়ে থাকি বাইরে। কেননা আমি তো বেরই হয়েছি দেখতে কার্তিকের কুয়াশা আর জোছনার ডুব-সাঁতার। আমি ঘুমাই না। আমার কানে ছন্দ হয়ে বাজতে থাকে ট্রেনের ধাতব চাকার একটানা ছান্দিক শব্দ—ঝকঝক ঝকঝক, ঝনঝন ঝনঝন। রাতের একটানা সেই ছন্দে মনে পড়ে কৈশোরের ছড়া—
ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাত দুপুরে অই।
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই?
একটু জিরোয়, ফের ছুটে যায়
মাঠ পেরুলেই বন।
পুলের ওপর বাজনা বাজে
ঝন ঝনাঝন ঝন।
(ট্রেন/শামসুর রাহমান)
ট্রেন যখন পা রাখল যমুনা সেতুর ওপর তখন আমার ভেতর ছড়িয়ে পড়ল কৌতূহল, উত্তেজনা। চোখ বড় করে থাকিয়ে থাকি বাইরে। আকাশে চাঁদ নেই যদিও, মেঘ ঢেকে আছে. তবু রাতে এখানে কাকের ডানার মতো মিশকালো অন্ধকার নয়। কবতুরের পালকের মতো ধূসর। মনে হচ্ছিল বিশাল যমুনাকে আবৃত করে আছে এক রহস্যময় কালো চাদর। সেতুর ওপর ট্রেনের গতি শ্লথ হয়ে আসে। আমি চোখ ফেলে নিচে তাকাই। দেখি বিস্তীর্ণ যমুনা শুয়ে আছে শান্ত হয়ে। তার বুকে ঢেউ নেই। কোলাহল নেই। নিস্তরঙ্গ। তবে প্রবল স্রোতঃস্বিনী। সেতুর আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাই জলের ঘূর্ণি। উঁচু থেকে দেখলেও আঁতে ভয় ধরিয়ে দেয় যমুনার কালো জলরাশি। মধ্যরাতে সেই জলরাশি আরও কেমন হিংস্র হয়ে আছে। আর অদূরে সেই অতল জলের বুকে এবং নদীর তীর ঘেঁষে অজস্র নিয়ন আলো যেন লক্ষ লক্ষ জোনাকি হয়ে জ্বলছে মিটিমিটি। নদীর ওপর দিয়ে দূর দিগন্ত পর্যন্ত এঁকেবেঁকে চলে গেছে আলোর সারি। দেখে মনে হচ্ছিল, একটি সুবিশাল আলোর মালা আলতো হাতে পরিয়ে দিয়েছে কেউ যমুনার বুকে। সেতুর ওপর দিয়ে এক দীঘল ধাতব সরীসৃপের মতো আমাদের ট্রেন ধীরে ধীরে এগোয়। যেতে যেতে ট্রেন যখন সামান্য বাঁক নিল, সেই কান্তিময় দৃশ্য আরও শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠল। মনে হলো, আমরা যেন আলোর কোনো সুদীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছি স্বপ্নের সানুদেশে।
সিরাজগঞ্জ পেরিয়ে আরও উত্তরের দিকে যেতে যেতে বৃষ্টির মুখে পড়ে ট্রেন। বৃষ্টির ছাট আছড়ে পড়ে জানালায়। ভিজিয়ে দেয় আমার চোখে-মুখ। অন্য জানালাগুলো ঢের আগেই এঁটে দিয়েছে যাত্রীরা। কয়েকটা জানালা আধভেজানো। আমি পূর্ণ জানালাই খুলে রেখেছি আয়েশ করে। যদিও ছুটে আসা ঠান্ডা বাতাসে জমে গেছে শরীর। তবু ভালো লাগছিল। তীরের ফলার মতো বৃষ্টি পড়তে শুরু করলে অগত্যা আমিও এঁটে দিই জানালা। ওয়াসিম ট্রে টেবিলের ওপর রেখে একটি বই পড়ছিল। বাইরে কী ঘটছে এসবে তার মনোযোগ নেই। আমিও সযত্নে ব্যাগে পুরে নিয়ে এসেছি একখান বই—জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। ওয়াসিমের দেখাদেখি বইটি বের করি। ট্রেনের দোলনায় দুলতে দুলতে পড়ি জীবনানন্দের নৈসর্গিক বর্ণনা—
রাত্রির কিনার দিয়ে তাহাদের ক্ষিপ্র ডানা ঝাড়া
এঞ্জিনের মতো শব্দে; ছুটিতেছে— ছুটিতেছে তা’রা।
তারপর প’ড়ে থাকে নক্ষত্রের বিশাল আকাশ,
হাঁসের গায়ের ঘ্রাণ— দু-একটা কল্পনার হাঁস;
মনে পড়ে কবেকার পাড়াগাঁর অরুণিমা সান্যালের মুখ;
উড়ুক উড়ুক তা’রা পউষের জ্যোৎস্নায় নীরবে উড়ুক
কল্পনার হাঁস সব; পৃথিবীর সব ধ্বনি সব রং মুছে গেলে পর
উড়ুক উড়ুক তা’রা হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোৎস্নার ভিতর।
সকাল দশটা নাগাদ ট্রেন পৌঁছে পঞ্চগড় স্টেশন। বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে ঝিরিঝিরি। সাথে হিমালয় থেকে উড়ে আসা উত্তরের ঠান্ডা হাওয়া। ট্রেন থেকে নেমে চারপাশটা দেখে নিলাম ভালো করে। প্রায় এগারো-বারো ঘণ্টার জার্নি। ক্লান্তি জেঁকে ধরেছে। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। অনিদ্রা আর সফরের ধকলে বিধ্বস্ত প্রায়। ক্ষিধেও পেয়েছে। তাই ট্রেন থেকে নামার পর এখন প্রথম করণীয় হলো পেটপুরে সকালের নাশতা সেরে নেওয়া। স্টেশন থেকে বেরোলাম। আশপাশে কোনো রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ল না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, কিছুদূর সামনে বাসস্ট্যান্ড, তারপর ব্রিজ পেরিয়ে বাজার। সবকিছু সেখানেই পাওয়া যাবে। রিকশায় করে চলে যাই পঞ্চগড় শহরে। পথে দেখা মেলে করতোয়া নদীর। সেঁতু পাড়ি দিতে-দিতে ভালো করে চেয়ে দেখি নদীর অবয়ব। সরু ও আঁকাবাঁকা। ঘোলাজল। শীতের সকালে মরা সাপের মতো পড়ে আছে শান্ত হয়ে। যেন বহুদূরে তার লেজ। অঘ্রানে নদীর পানি কমে দুই তীর সাদা হয়ে আছে বালুতে। এমন বারোটি নদী আছে পঞ্চগড়ে। প্রতিটি নদীর নামই সুন্দর। সামনে একটি-একটি করে দেখা মিলবে নদীগুলোর। রিকশাওয়ালা আমাদেরকে একটা হোটেলের সামনে নামিয়ে দেয়। হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা অর্ডার করি। গরম পরোটা, ডিমভাজি ও বুটের ডাল। খেতে-খেতে সারাদিনের পরিকল্পনা সাজিয়ে নিই। দুয়েকটা বিষয়ে অস্পষ্টতা ছিল, আমাদের পাশে একজন বয়স্ক ট্রাফিক পুলিশ নাশতা করছিলেন, তার থেকে জেনে নিই।
একটা ইজিবাইক রিজার্ভ করি। চুক্তি হয় ড্রাইভার আমাদেরকে ঘুরিয়ে দেখাবেন পঞ্চগড় শহর এবং এর আশপাশের কয়েকটি পর্যটনস্পট। আমরা প্রথমে যাই বারো আউলিয়ার মাজার। পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে এর দূরত্ব নয় কিলোমিটার। পঞ্চগড় একটি ছোট্ট মফস্বল শহর। একমুঠো ঘাসের হিল্লোলের মতো বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের এক ছোট্ট মফস্বল। চারপাশে বিস্তৃত ধানি জমি। পেকে হলুদ হয়ে আছে। যতদূর চোখ যায় ফসলের খেত। ‘রাশি রাশি ধান মাটি আর পানির কেমন নিশ্চেতন করা গন্ধ।’ বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি দেখতে-দেখতে দ্রুতই পৌঁছে যাই। আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত মাজারটি। কথিত আছে সপ্তদশ শতকে ইসলাম প্রচারের মহৎ উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সুফিদের একটি কাফেলা চট্টগ্রামে আসে। তাদের মধ্য থেকে বারোজন সুফি ইসলাম প্রচার করতে-করতে উত্তরবঙ্গের মির্জাপুর গ্রামে আস্তানা গাড়ে। এখানে থেকে আশপাশের অঞ্চলে তারা দাওয়াতের কাজ করেন। মৃত্যুর পর এই গ্রামেই সমাহিত হন তারা। তাদের মধ্যে তিনজনের কবর পাশাপাশি। বাকি নয়জনের কবর খানিক দূরে দূরে অবস্থিত। একই গ্রামে কিন্তু একসঙ্গে না। কোথাও হলুদ ধানক্ষেতের মাঝে, কোথাও গাছপালা ঘেরা সবুজ জংলার ভেতর। আধো বৃষ্টিতে ভিজে ঘুরেফিরে দেখি পুরো মাজার এলাকা। মাজারের পাশে রয়েছে একটি মাঝারি আকৃতির পুকুর। পুকুরের চারপাশ উঁচু গাছ দিয়ে ঘেরা। সবুজ ছায়াঘন এলাকা। লোকজনের উপস্থিতি নেই। সুনসান। মাজারের খাদেম কাউকে পেলাম না। তাই জানতে পারিনি কিছু। ড্রাইভার বলল, নির্জন গ্রাম হবার কারণে এদিকে পর্যটক আসে না কেউ তেমন। ছাতা মাথায় পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে স্মৃতিস্বরূপ একটি ছবি তুলে বিদায় নিই।
বারো আউলিয়ার মাজার দেখার পর যাই মির্জাপুর শাহি মসজিদ। পঞ্চগড়ের একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে শাহী মসজিদ বেশ প্রসিদ্ধ। মসজিদের নির্মাণ সম্পর্কে পারস্য ভাষায় লিখিত মধ্যবর্তী দরজার উপরিভাগে একটি ফলক রয়েছে। ফলকের ভাষা ও লিপি অনুযায়ী ধারণা করা হয় সতেরো শতকে দিল্লি সালতানাতের মোগল বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের যুগে নির্মিত হয়েছে মসজিদটি। ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত মসজিদটির সাথে মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মাণশৈলীর মিল রয়েছে। এ থেকে ধারণা করা হয় ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে অবস্থিত মসজিদের সমসাময়িক কালে মির্জাপুর শাহী মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। মসজিদটির দেওয়ালের টেরাকোটা ফুল এবং লতাপাতার নকশা খোদাই করা রয়েছে। মসজিদটি অদূরে আছে শিয়াদের একটি প্রাচীন ইমামবাড়া, যা বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত একটি পুরাকীর্তি। এর নির্মাণকাল সম্বন্ধে কোনো ধারণা পেলাম না। কোনো শিলালিপিও খুঁজে পেলাম না। একটি শক্তিশালী তোরণ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি। উঠোন বা চত্বরের মতো পেরিয়ে তারপর ইমামবাড়া। শাহী মসজিদের তুলনায় এটি আরও জীর্ণশীর্ণ। আমার ভারি কৌতূহল জাগল। ভেতরে প্রবেশ করে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখেছি এর সমস্ত কিছু। অভ্যন্তরে একটি মাত্র কক্ষ। কক্ষের চারপাশে খোলা বারান্দা। দেয়াল ও খিলান লাল ইটের তৈরি। আস্তর ধসে পড়ে বেরিয়ে আছে ভেতরের লাল ইট। ওপরে গম্বুজ। ইমামবাড়ার পাশে রয়েছে কয়েকটি পুরোনো কবর। তেমনি লাল ইট দিয়ে বাঁধানো।
শাহী মসজিদ ও ইমামবাড়া দেখে মির্জাপুর গ্রাম থেকে আমরা রওনা করি পরবর্তী স্পট মহারাজার দিঘি। প্রকৃতি তখনো মেঘলা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। স্যাঁতসেঁতে পথঘাট। কদিন ধরে উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া মেঘাচ্ছন্ন। এরই মধ্যে আমরা ঘুরছি। তবে অনুভূতি ছিল খুবই আনন্দঘন। মধ্য কার্তিকের এই বাদলা দিনের ঠান্ডা হাওয়া জুড়িয়ে দিচ্ছিল মনপ্রাণ। চলতে-চলতে কোথাও টং দোকান দেখলে গাড়ি থামিয়ে গরম চায়ে উষ্ণ করে নিচ্ছি শরীর ও মন। মির্জাপুর গ্রাম থেকে মহারাজার দিঘি প্রায় ত্রিশ কিলো হবে। ঘণ্টারও বেশি সময় লাগবে পৌঁছুতে। গাড়ি ছুটছে আমাদের নিয়ে। ড্রাইভার লোকটি বেশ সহজ-সরল। একে তো উত্তরবঙ্গের মানুষ, তার ওপর মনে হয়েছে অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান। স্থানীয় নানা বিষয়ে তার তথ্য ও অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ করেছে আমাদের। বয়সে আমার চেয়ে খানিক বড় হবে। তার আচরণ ও আন্তরিকতায় বুঝতে পারি, আমাদেরকে তিনি কেবল যাত্রী নয় বরং অতিথি হিসেবে বরণ করেছেন। তার জন্য পঞ্চগড় ভ্রমণের প্রথম দিনটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আনন্দদায়ক হয়েছে। মির্জাপুর থেকে মহারাজার দিঘি যেতে দুটি পথ ছিল। যে পথে এসেছি সেই পথে অর্থাৎ শহর হয়ে গেলে নতুন কিছুর দেখা আমরা পাব না। ড্রাইভার আমাদের নিয়ে গেলেন গ্রামের ভেতরের অন্য একটি রাস্তা দিয়ে। স্নিগ্ধ ও মনোরম সেই পথ। পথের দুই পাশে গ্রাম, ছড়ানো ঘরবাড়ি। কোথাও বিস্তীর্ণ ফসলের জমি। আদিগন্তজুড়ে ধানখেত। এর শেষ দেখা যায় না। যেন মেঘমেদুর আকাশ কুয়াশার ভারে নুয়ে পড়েছে ফসলের কাঁধে। আমি কেবলই দেখছি তাকিয়ে। দেখছি এর সমাহিত রূপ। এই পথ দিয়ে যতই অগ্রসর হচ্ছিলাম ততই আচ্ছন্ন হচ্ছিলাম মুগ্ধতায়। অনেকদিন পর মনভরে উপভোগ করলাম হেমন্তের আদি সৌন্দর্য। আমাদের গাঁয়ে হেমন্তে ধান হয় না। হয় বৈশাখে। ছোটো থেকে বইয়ে পড়েছি হেমন্ত হচ্ছে ধানের ঋতু। কিন্তু সেই রূপে ভরা হেমন্ত দেখা হয়নি। আজ দেখলাম দুচোখ ভরে। পিচঢালা পথের দুপাশে হেমন্তের পাকা ধানের নকশিকাঁথা দেখে দেখে এগিয়ে চলেছি। একটা বিষয় নজরে পড়ল। সকাল থেকে দুপুর অবধি মাইলের পর মাইল আমরা চলছি, কিন্তু কোথাও চোখে পড়ল না একচিলতে শূন্য জমি। এক ইঞ্চি মাটি অনাবাদি নেই এখানে। আদিগন্ত চকজুড়ে ধানখেত। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সোনালি ফসল দুলছে বাতাসে। বাড়িঘরের আঙিনায় আছে লাউ-কুমড়োর মাচান। কোথাও আবার লকলকিয়ে বেড়ে উঠছে সবুজ ডগা। মাথা তুলে ফুটে আছে টগবগে লাউফুল। কোথাও শীতের শুরুতে কোপানো মাটিতে রুয়ে দিয়েছে বেগুন মরিচের চারা। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে যা বলল তার সারাংশ হলো, এখানকার লোকজন সবাই পরিশ্রমী। সকলেই কোনো না কোনো কাজে নিমগ্ন। কায়িক শ্রমে পুরুষরা উপার্জন করছে বাইরে, নারীরা বাড়ির ভেতরে নিজেদের মতো কোনো কাজে পার করছে সময়। নিদেন ভেতর বাড়ির আঙিনায় ছাইগাদার পাহাড়ে অথবা পোড়োজমির পাশে মাচান বেঁধে তার নিচে রুয়ে দিচ্ছে আনাজপাতির চারা। তিনদিন ঘুরে আমারও তাই মনে হলো। উত্তরবঙ্গের মাটি মানুষ ও প্রকৃতির শুনেছি অনেক তারিফ। তিনদিনের সফরে এর বাস্তব অভিজ্ঞতাও হয়ে গেল।
প্রাকৃতিক রূপের আরও একটি বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। গাড়ি যখন ক্রমশ গভীর গ্রামের ভেতর প্রবেশ করছিল তখন চা বাগানের মতো ঝাঁকড়া সবুজ কিছু একটা চোখে পড়তে লাগল। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি এগুলো কীসের খেত হবে। মনে করছিলাম স্থানীয় কোনো ফসল হয়তো, যা আগে দেখিনি। পরে ভালো করে তাকিয়ে দেখি, চা বাগান। আশ্চর্য হলাম, সিলেটে তো এমন ধানখেতের মতো চা বাগান দেখিনি। সেখানে পাহাড় ও বড় টিলার ওপর চা বাগান অবস্থিত। আর এখানে ঠিক ধানক্ষেতের মতো। দুইটাই পাশাপাশি। এমনটা আগে দেখিনি। অসংখ্য চা বাগান। কিছু বাগান এমনই বড় যে, শেষ দেখা যায় না। পথের দুই পাশে জমির পর জমি চা বাগান। যেন চায়ের রাজ্য ভেদ করে আমরা ছুটে চলছি অনন্ত সুন্দরের দিকে। যেদিকে তাকাই, কেবল ধু-ধু সবুজ। যেন সবুজ জলের নদী। যেন সবুজ বালির মরুভূমি। ছোট ছোট ঘন সবুজ চা পাতার ওপর ঝলমল করছে শিশিরের মতো বৃষ্টির ফোটা। অপলক শুধু আমার দেখতেই ইচ্ছে করছিল। করোটিতে ঢেউ খেলে যায় কবির অপূর্ব শব্দগুচ্ছ—
স্বচ্ছ নির্মল গাছের পাতায় মুক্তা
ছোট ছোট ফুল যেন অনেক তারা
যেন বনকন্যাদের চোখের পানি
যেন নিটোল নখের উপর শুক্তির স্বচ্ছতা।
(আমার পূর্ব-বাংলা/সৈয়দ আলী আহসান)
এই সৌন্দর্য আমাকে অক্টোপাসের আট পায়ের মতো এমনভাবে টেনে ধরল যে, ড্রাইভারকে বলে গাড়ি থামালাম। তারপর সুন্দরের টানে বিমুগ্ধ শিশু হয়ে দৌড়ে গেলাম চা বাগানের ভেতর। ধানখেতের মতো মাঝখানে সরু আলপথ। দূরে একটা ঘরের মতো দেখা গেল। ওপরে টিনের চালা আছে কিন্তু পাশে নেই বেড়া। এখান থেকে পানি সরবরাহ করা হয় বাগানে। এর নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। বসলাম টুল পেতে। ফ্ল্যাক্সে চা ছিল। ব্যাগ থেকে বের করে চা পান করলাম। ঠিক নৈসর্গিক অনুভূতি। চা বাগানে বসে চা পান করছি। আশপাশে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। মেঘাচ্ছন্ন দিন তাই লোকজন নেই বাইরে। আনন্দের বহিঃপ্রকাশ এবং সুন্দর এই স্মৃতি ধারণের জন্য চা বাগানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। রাস্তা থেকে অনেকটা ভেতরে নির্জন বাগানের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে কাকতাড়ুয়ার মতো দুই হাত প্রসারিত করে ছবি তুলি। ফিরতে যেন ইচ্ছে করে না নিসর্গের উদ্যান ছেড়ে। আরও খানিকটা বসে থাকি। তারপর না চাইলেও উঠি। আমাদের যেতে হবে। সময় বড় কম। সন্ধ্যার পূর্বেই তেঁতুলিয়া পৌঁছে হোটেল ঠিক করতে হবে। গাড়িতে উঠে আমি ড্রাইভারকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই। তার উদার আন্তরিকতার কারণেই আমরা এই অসীম সৌন্দর্যের সাক্ষী হতে পেরেছি। তিনি আমার ধন্যবাদ কবুল করলেন। তার আনন্দে গদগদ মুখটি দেখে আমি তা আন্দাজ করতে পেরেছি। অতঃপর তার নিজের ভালো কিছু গুণের কথা আমাদের শোনাতে লাগলেন এবং পর্যটকদের প্রতি তার যে একটা দায়িত্ব আছে সেকথা পুনরায় ব্যক্ত করলেন। তার এই হাসিমুখ ও স্বপ্রশংসার উত্তরবঙ্গীয় সরলতার সুবাস পেলাম। তাকে বেশিক্ষণ নিজের কথা বলতে না দিয়ে পঞ্চগড়ের চা বাগানের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। বললেন, আগে এদিকে শুধু ধানখেতই হতো। চা বাগানের বিষয়ে জ্ঞান ছিল না লোকেদের। কিন্তু পাশেই ভারতের শিলিগুড়ি। দুই জায়গার একই মাটি। কিন্তু সীমান্তের ওপারে প্রচুর চা বাগান রয়েছে। আমাদের এখানে করা হয় কেবল ধান। ব্যাপারটা অনেকের দৃষ্টি কাড়ল। শিলিগুড়ির দেখাদেখি কিছু কোম্পানি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পঞ্চগড়ে চা বাগান শুরু করল। তারা সফল হলো। লাভের মুখ দেখল। পরে ধীরে-ধীরে তা বৃদ্ধি পেতে লাগল। এখন কোম্পানি ছাড়াও সাধারণ মানুষ ব্যক্তি উদ্যোগে চা বাগান করতে লাগল। যাদের একটু সামর্থ্য আছে তারা ধান ছেড়ে চায়ের দিকে ঝুঁকছে। ধান বছরে দুইবার করতে হয়। আর চা বাগান একবার করতে পারলে দুইশো বছর পর্যন্ত চলে যাবে। কিছুদূর যাবার পর একটি চা কোম্পানি পেলাম। বিরাট জায়গা নিয়ে অবস্থিত। চারদিকে চায়ের কাঁচা গন্ধে ম-ম করছিল। গভীর নিঃশ্বাস টেনে চায়ের কাঁচা গন্ধ নিলাম। আমুদে চোখ বুঁজে এলো আমার। ভাবি, আহা কোথায় পেতাম এই স্বাদ। কোথায় ধরে এই অনির্বচনীয় সুখ। কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে, ‘দূর পৃথিবীর গন্ধে ভরে ওঠে আমার এ বাঙালির মন’।
বহু পথ পাড়ি দিয়ে শেষে আমরা পৌঁছলাম মহারাজার দিঘি। এই অঞ্চলের একটি প্রসিদ্ধ জায়গা। এর ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন দিঘি এটি। পঁচিশ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছিল ভিতরগড় দুর্গনগরী। বর্তমানেও এই এলাকা ভিতরগড় নামে পরিচিত। এককালে এটি ছিল জলেশ্বর রাজার রাজধানী। দিঘির অদূরে ছিল পৃথু রাজার বাড়ি। কথিত আছে, পৃথু রাজা তার পরিবার পরিজন ও ধনরত্ন নিয়ে ‘কীচক’ নামক এক নিম্নশ্রেণী দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে এই দীঘিতে আত্মহত্যা করেছিলেন। ভিতরগড় দুর্গনগরীর বাইরের আবেষ্টনীর উত্তরাংশ, উত্তর-পশ্চিমাংশ এবং উত্তর-পূর্বাংশ বর্তমানে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত। তাই ধারণা করা হয় ষষ্ঠ শতকের শেষে কিংবা সপ্তম শতকের শুরুতে ভিতরগড় একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মহারাজার দিঘি উত্তরাঞ্চল ও ভারতীয় সনাতনী লোকদের কাছে তীর্থস্থানের মতো। প্রতি বছর অসংখ্য ভারতীয় দিঘির দর্শনে আসেন। আমরা গাড়ি থেকে নেমে দিঘির আঙিনায় পা রাখতেই পর্যটকদের ছোটখাটো ভিড় চোখে পড়ল। মহারাজা দিঘির দশটি ঘাট রয়েছে। প্রতিটি ঘাটের দুই পাশে ইট ও মাটি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে সুউচ্চ পাড়। আমরা প্রধান ঘাট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি। দিঘির স্বচ্ছ জলরাশি স্মিত হেসে যেন আমাদের স্বাগত জানাল। খুবই স্বচ্ছ এর জল। ঘুঘুপাখির চোখের মতো। কিছু উৎসাহী পর্যটক ডিঙ্গিতে চড়ে ভাসছে দিঘির বুকে। তারা দিঘির জলে হাত ডুবিয়ে খেলছে জলকেলি। কিছুক্ষণ ঠাঁই দাঁড়িয়ে পরখ করে নিলাম দিঘির আয়তন ও সৌন্দর্য। ঘাট থেকে দিঘির পাড় বেশ উঁচুতে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। মাটির সিঁড়ি। বৃষ্টিতে পিচ্ছিল হয়ে আছে। সাবধানে পা ফেলে ওপরে উঠলাম। এখান থেকে দেখা যায় দিঘির আসল রূপ। পাড়ে দিঘির দিকে মুখ করে কংক্রিটের বেঞ্চ তৈরি করা আছে। কিছুক্ষণ বসে রইলাম এখানে। দিঘির চারদিকে প্রচুর গাছগাছালি। যেন প্রাচীন কোনো উদ্যান। প্রতিটি গাছ অনেক উঁচু এবং বেশ পুরোনো। মনে হবে প্রকৃতির সবুজ দেওয়াল ঘিরে রেখেছে মহারাজার দিঘি। অনেকটা দূর পর্যন্ত হেঁটে বেড়ালাম। হাঁটতে হাঁটতে ঘন গাছপালার সিঁথির ফাঁকে চোখে পড়ে মেঘলা আকাশ আর দিঘির স্বচ্ছ জল। আরও দেখা মিলল বিচিত্রসব পাখির। সেখানে অসংখ্য পাখির ডাক কোরাস হয়ে বাজছিল। আমি দেখার চেষ্টা করলাম দিঘি কোথা থেকে শুরু হয়ে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে। কিন্তু পারলাম না। কিছুদূর গিয়ে দিঘি বাঁক নিয়েছে। তা দেখতে হলে আরও কয়েকটি ঘাট ঘুরে দেখতে হবে। এর জন্য অনেক সময়ের দরকার। এদিকে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের যেতে হবে।
পঞ্চগড় সদরে দেখার মতো আরও দুটি জায়গা ছিল। রকম মিউজিয়াম এবং ভিতরগড় দুর্গনগরী। এটি বাংলাদেশের একমাত্র পাথর জাদুঘর। এখানে এক হাজারের অধিক স্থানীয় প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকজ সংগ্রহ রয়েছে। পাথর জাদুঘরটি দেখার বিশেষ ইচ্ছে ছিল। সরকারি মহিলা কলেজের ভেতরে অবিস্থত। শনিবারে বন্ধ থাকায় দেখা হলো না। সময়ের অভাবে ভিতরগড় দুর্গনগরীতেও যাওয়া হলো না। দেখতে হলে মহারাজার দিঘি থেকে বিশ কিলোর বেশি যেতে হবে। ততক্ষণে বেলা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। মেঘলা দিনের কারণে সময়ের পূর্বেই আলো নিভে আসছিল। তাই ইজিবাইকে আমরা দ্রুত চলে যাই পঞ্চগড় বাজার। সেখান থেকে তেঁতুলিয়ার বাস ছেড়ে যায়। পেটে বেশ খিদেও পেয়েছে। দুপুরের ওয়াক্ত পেরিয়ে গেছে প্রায়। খাওয়া হয়নি এখনো। গতকাল রাতে ট্রেনের ওঠার পূর্বে কমলাপুর থেকে নানারকম শুকনো খাবার নিয়েছিলাম। কিছু ট্রেনে বসে খেয়েছি। কিছু রয়ে গিয়েছিল। আস্ত কেক ছিল। দুজনে খেয়ে নিলাম। ড্রাইভারও আমাদের মতো ক্ষুধার্ত। কেকের বড় অংশটি তাকে দিলাম। সবশেষে তাকে বিদায় দেওয়ার সময় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দুইশো টাকা বাড়িয়ে দিয়েছি। তাও সাকুল্যে ছয়শো টাকা মাত্র। তবু আমার মনে হলো, ছয়-সাত ঘণ্টার পারিশ্রমিক ছয়শো টাকাও বড্ড কম হয়ে যায়। কিন্তু উত্তরবঙ্গের জন্য এ-ই অনেক বেশি। জিজ্ঞেস করলাম, এখন কী করবেন? জানালেন, আপনাদের বাসে তুলে দিয়ে সোজা বাসায় চলে যাব, আজ আর ভাড়া মারব না। যে পর্যন্ত বাস ছেড়ে যায় মহৎ লোকটি আমাদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে রইলেন। আমরা তার আন্তরিকতার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলাম। প্রশংসাও করলাম দুচার কথা বলে। খুশি হলেন। তার হাসিমুখ দেখতে-দেখতে মিলিয়ে গেলাম বাসের পেটের ভেতর।
সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই আমরা এসে নামি তেঁতুলিয়া। আজকের মতো আমাদের একমাত্র করণীয় হলো, ভালো দেখে একটা হোটেল দেখা। টানা জার্নি এবং সারাদিনের ক্লান্তিতে নুয়ে পড়েছি। ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নেব। একটা ভ্যানে করে চলে যাই তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো। সেখান থেকে খোঁজ নিয়ে পাশে একটি হোটেলে ওঠি। ঠিক হোটেল বলা যাবে না, ফ্যামিলি বাসা। স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী নিজের বসবাসের জন্য তৈরিকৃত বাড়িতে কিছু আধুনিক সুবিধা যুক্ত করে পর্যটকদের কাছে ভাড়া দিচ্ছেন। তার পরিবার সন্তানের পড়ালেখার সুবাদে পঞ্চগড় শহরে থাকে। নজরুল হোম স্টে। দেখে বেশ পছন্দ হলো। আমাদের বিশেষত দরকার ছিল গরম পানির ব্যবস্থা। হিমালয়ের নিকটবর্তী হবার কারণে রাতে এখানে বেশ ঠান্ডা পড়ে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে তেঁতুলিয়া। তাই হঠাৎ ঠান্ডার আক্রমণ থেকে বাঁচতে গরম পানি ছিল জরুরি। দরদাম করে আটশো টাকা ভাড়া ঠিক করি। প্রশস্ত কামরা। দুটি ফ্যামিলি বেড। এটাচ বাথ, হাই কমোড। সবমিলিয়ে দারুণ এবং সাশ্রয়ী। ফ্রেশ হয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ি। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখ দুটি বুঁজে এলো। ঘুমের ডলক নামল। বলতেও পারি না কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। রাত আটটার দিকে বাড়ির মালিক এসে আমাদের ডেকে দিলেন। জানিয়ে গেলেন, বাজার বন্ধ হয়ে যাবে। গিয়ে যেন রাতের খাবার খেয়ে আসি। হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়ি। পাশেই বাজার। হাঁটতে থাকি। এই শুরুর রাতেই শীত কাবু করে ফেলেছে। প্রচণ্ড কুয়াশা। গাছের পাতা থেকে শিশির পড়ছে টপটপ করে। শীতের কাপড় নিয়ে আসিনি। শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে ঠান্ডায়। দুই হাত বুকের ওপর পেঁচিয়ে হাঁটতে থাকি। পথে স্থানীয় মডেল মসজিদের ইমামের সঙ্গে দেখা। আমাদের মতোই বয়সি। কথা পরিচয় হলো। বাজারে পৌঁছে যুবক ইমাম আমাদেরকে একটি হোটেল দেখিয়ে দিলেন। দুজনে হাঁসের গোশত দিয়ে খেলাম পেটপুরে। খাবারের মান যথেষ্ট ভালো এবং অতি সুস্বাদু। সে তুলনায় দাম খুবই সস্তা। হাঁসের গোশতটা আমার কাছে এমনই মজাদার লেগেছে যে, পরদিন দুপুরেও এ হোটেলে হাঁসের গোশত দিয়েই ভুরিভোজ করেছি। রাতের খাবার খেয়ে তেঁতুলিয়া বাজারে কিছু সময় এলোমেলো ঘুরাফেরা করি। এখানেরই সরাসরি বাগান থেকে প্রস্তুতকৃত চা পান করি। চায়ে বুনোগন্ধের মতো একটা কাঁচা ফ্লেভার ছিল। ভালো লেগেছে। সারাদিনের ক্লান্তি, সন্ধ্যার কাঁচা ঘুম থেকে উঠে যখন বাজারে বসে শীত শীত রাতে চায়ের কাপে চুমুক দিই, পুরো শরীর উষ্ণতায় সজীব হয়ে ওঠে। একটা তৃপ্তিকর অনুভূতি ছড়িয়ে পরে সারা শরীরে। বাজারে একটা প্রাচীন তেঁতুলগাছের নিচে বিছিয়ে রাখা টুলে বসে দুজন গল্প করি। উত্তরবঙ্গ ও পঞ্চগড় সফর নিয়ে দুজনের অনুভূতি জানি একে অপরে। আগামীকাল কখন কোথায় যাব একটা প্ল্যান সাজাই। আমি চায়ে আসক্ত মানুষ। নানারকম চা আমার ভালো লাগে। তেঁতুলিয়া বাজার থেকে কয়েক প্যাকেট চা কিনি। রোজেলা, চায়ের শুকনা পাতা ও কালো পাতি—তিন পদের চা নিই।
রাতে পুনরায় বৃষ্টি নামে। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ ছন্দের মতো বাজছে একটানা। সন্ধ্যায় ঘুমিয়েছিলাম বলে এখন ঘুম নেই চোখে। শরীরের ক্লান্তিও ধুয়েমুছে গেছে। জানালার পর্দা সরিয়ে দিই। বাইরে জলপাইগাছ। মৃদু বাতাসে দুলছে তার ডালপালা। বৃষ্টিতে ভিজে পাতাগুলো বাতির আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে হয়ে ঝলমল করছে সবুজ মুদ্রার মতো। এমনই নির্জন কোনো বৃষ্টিভেজা রাতে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছিলেন তার শ্রেষ্ঠ কবিতাটি—
আমার পূর্ব-বাংলা অনেক রাত্রে গাছের
পাতায় বৃষ্টির শব্দের মতো
কখনো মৃদঙ্গ, হঠাৎ কখনো বেহালা
এক সময় বাঁশির সুর
যখন রাত্রে একাকী ঘুম ভাঙে
অনবরত কোমল কোলাহলে
স্বপ্নের মতো পাতায় পাতায়
শব্দকে দেখি।
(আমার পূর্ব-বাংলা/সৈয়দ আলী আহসান)
পরদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে আমরা যাই তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো। বাইরে কুয়াশা। গাছের পাতায় শিশির। ভিজে আছে পথ। পায়ে হেঁটে যাই। বের হয়েই চমৎকার একটি দৃশ্য মন অসম্ভব ভালো করে দেয়। ভোরের আলোয় দেখি, বিস্তৃত চা বাগানের মাঝে সাদা রঙের আধুনিক মডেল মসজিদ। সারি সারি নারকেলগাছের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে মসজিদের উঁচু মিনার। সামনে যত এগিয়ে যাই ছোটবড় চা বাগান দেখি। এখানকার মানুষ চা বাগানকে শৌখিতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কারও বাড়ির সামনে অথবা পেছনে অল্প একটু জায়গা খালি আছে, তো চা বাগান করে রেখেছে। এটা এই অঞ্চলের একটি বিশেষ সৌন্দর্য। ডাকবাংলোর কাছাকাছি পৌঁছলে আমাদের বাড়িওয়ালার দেখা পাই, তিনি একটি চা বাগান পরিচর্যা করছেন। আমাদের দেখে বাগানের ভেতর থেকে এগিয়ে এলেন। নানা কথা হলো। রাতে কোনো অসুবিধা হয়েছে কি না জানতে চাইলেন। কোথায় কী আছে, কীভাবে যেতে পারি, কেমন খরচ হবে এইসবের একটা ধারণা দিলেন। আমরা তাকে ধন্যবাদ জানালাম।
পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। কারণ এই জেলাটি হিমালয় পর্বতমালার কাছে অবস্থিত। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে এই পর্বতশৃঙ্গটি স্পষ্ট দেখা যায়। এটি হিমালয়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, যা ভারত ও নেপালের সীমান্তে অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সবচেয়ে সুন্দর পয়েন্ট হচ্ছে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো। এখানে মহানন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় প্রকৃতির অসামান্য এই রূপ। এ সময় অসংখ্য পর্যটক সারাদেশ থেকে ছুটে আসে তেঁতুলিয়া। সকাল সকাল আমরা ডাকবাংলো পৌঁছে যাই। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য বলতে হবে, এদিন আকাশ অপরিষ্কার থাকায় আমরা দেখা পাইনি কাঞ্চনজঙ্ঘার। সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর এই দুই মাসে বাংলাদেশ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আকস্মিক আবহাওয়া খারাপ করে। আমরা যখন ট্রেনে উঠি তখন থেকেই উত্তরবঙ্গে বৃষ্টি শুরু হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়, বৃষ্টি কয়েকদিন স্থায়ী হবে। গতকাল সারাদিন হালকা বৃষ্টির মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছি। সকাল থেকে আবহাওয়া ভালো হতে থাকে। চেষ্টা করি ডাকবাংলো থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার। একেবারে যে দেখতেও পারিনি তা না, আবার ভালোভাবে দেখেছি তাও না। আবহাওয়া সম্পূর্ণ পরিষ্কার থাকলে পাহাড়ের চূড়ায় রোদ পড়ে, তখন দেখা যায় পরিপূর্ণ। আমরা আবছা আবছা দেখেছি এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার অবয়বটা অনুভব করতে পেরেছি। তবে বলা ভালো, পঞ্চগড় আসার অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার, দেখতে পারলে ভালো, আমি মনে করি দেখতে না পারলেও দুঃখবোধের কিছু নেই, পঞ্চগড় অত্যন্ত মনোরম ও সৌন্দর্যে ঘেরা একটি অঞ্চল। শুধু পঞ্চগড় দেখার জন্যই একবার আসা উচিত। অসংখ্য পর্যটন স্পট তো আছেই, বিশেষ করে এখানের প্রকৃতি লা-জওয়াব। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার চেষ্টা করে ডাকবাংলোতে একটি লোহার বেঞ্চে আরাম করে বসি। ঠিক সামনেই নদী। মহানন্দা নদী। সরু ও খরস্রোতা। নদীটি তার নামের মতোই সুন্দর। দুই তীরে সবুজ প্রকৃতি। নদীর এপারে বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া, ওপারে ভারতের দার্জিলিং। মহানন্দা নদীর উৎপত্তিস্থল হিমালয় পর্বতের ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার অংশে। দার্জিলিং থেকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এটি বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া উপজেলার, বাংলাবান্ধা দিয়ে প্রবেশ করে এবং পরে তেঁতুলিয়া পুরাতন বাজার দিয়ে আবার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলায় প্রবেশ করে। এখানে নদীরে পাড়ে বসে সামনে যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। এক দিঘল চা বাগান। দুচোখ ভরে উপভোগ করি এই অনিন্দ্য নিসর্গ। তারপর ডাকবাংলো থেকে নিচে নেমে যাই, নদীর খুব কাছে, পাড় ঘেঁষে। ততক্ষণে রোদ উঠে গেছে। আমরা আয়েশ করে বসি নদীর পাড়ে সবুজ দুর্বাঘাসে। গল্প করি—নিজের সাথে, প্রকৃতির সাথে।
এখানে নদীর মতো এক দেশ
শান্ত, স্ফীত, কল্লোলময়ী
বিচিত্ররূপিণী অনেক বর্ণের রেখাঙ্কন
এ-আমার পূর্ব-বাংলা
যার উপমা একটি শান্ত শীতল নদী।
(আমার পূর্ব-বাংলা/সৈয়দ আলী আহসান)
সকালটা ডাকবাংলো ও মহানন্দা নদীর তীরে কাটিয়ে বাসায় ফিরি। পথে এক হোটেলে সেরে নিই সকালের নাশতা। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ি বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের উদ্দেশে। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে বাংলাদেশ মানচিত্রের সর্বোত্তরের স্থান বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। এখান থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটারদূরে ভারতের শিলিগুড়ি শহর, নেপাল ৬১কি.মি, ভুটান ৬৮কি.মি এবং চীন সীমান্ত মাত্র ২০০কি.মি দূরত্বে অবস্থিত। মহানন্দা নদীর তীর ধরে একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যানে করে আমরা যাই বাংলাবান্ধা। তেঁতুলিয়া থেকে ১৬ কি.মি দূরত্ব। যেতে-যেতে খোলা ভ্যানে বসে দেখি চারপাশের নিসর্গরাজি। নভেম্বরের মিঠেল রোদে বেশ আরামই লাগছিল পথটুকু। পথের পাশে কখনো নদী—নদী থেকে পাথর তুলছে শ্রমিকরা, দূর থেকে দেখলে তাদেরকে ঝাঁকবাঁধা হাঁস বলে ভ্রম হয়, কখনো কাঁচা-পাকা ধানখেত, কখনো পাথর ভাঙার কর্মযজ্ঞ। মহানন্দা নদীর স্রোতে ভারত থেকে পাথর আসে প্রচুর। স্থানীয় লোকেরা দলবেঁধে নদী থেকে তুলে সেই পাথর। বড় বড় পাথর। সেগুলো মেশিন দিয়ে ভেঙে গুঁড়ো করা হচ্ছে। মেশিন ও পাথর ভাঙার একটানা খটখট আওয়াজে ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। কয়েক কিলোমিটার জুড়ে দুই পাশে অসংখ্য পাথর কারখানা। সেখানে কাজ করছে বহু শ্রমিক। বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট পৌঁছে ঘুরেফিরে দেখি বন্দরের নানা কার্যক্রম। পুনরায় একই ভ্যানে করে ফিরে আসি তেঁতুলিয়া। বেলা অনেকটা পেকে উঠেছে। দুপুর পেরিয়ে সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা চড়ে বসি আন্তঃজেলা বাসে। পরবর্তী গন্তব্য দিনাজপুর।