হারানো শহরে নিজেকে খুঁজি

আমি ঢাকায় এসেছি ১৯৯৬ সালে। ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ে এখন ২০২৫ সাল। অর্থাৎ এই শহরে আমি কাটিয়েছি একটি জীবনের প্রায় ৩০টি বসন্ত। মাত্র তিন দশকে এই শহর যেন চোখের পলকেই আমূল বদলে গেছে। আমাদের ছোটবেলায় ঢাকা শহরটাকে দেখেছি শহর ও গ্রাম দুয়ের সমন্বিত রূপে, এখন ঢাকায় সবুজের চিহ্ন আলাদা করে খুঁজতে হয়। মিরপুর কচুক্ষেতের যে এলাকায় আমাদের বাসা, সেখান থেকে স্কুলে যাওয়ার পথটি ছিল গ্রামের মেঠোপথের মতো। দুপাশে ছায়াদার গাছ ছিল, খেতখামার ছিল, নদীতে জেলেরা জাল ছড়িয়ে মাছ ধরার দৃশ্য দেখা যেত। এখন সেই পথটি পিচ কার্পেটে মোড়ানো, গাছের জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছে বিশাল দালান, নদী ভরাট হয়ে গড়ে উঠেছে গার্মেন্টস। ঢাকায় আগে অনেক গ্রাম ছিল, এখন গ্রামগুলো উজাড় হয়ে সেসব জায়গায় জুড়ে বসেছে কংক্রিটের দালান। আগের সেই গরুর খামার নেই, মুরগির খামার নেই; এখন সেখানে ঝাঁ চকচকে গাড়ির শোরুম, কাচ্চির রেস্টুরেন্ট। আমাদের শৈশবের ক্রিকেট খেলার মাঠে এখন দাঁড়িয়ে আছে আলো ঝলমলে শপিং মল।

এই অভাবিত পরিবর্তন শুধু আমাদের ঢাকায় নয়, পরিবর্তনের ঢেউয়ে ভেসেছে পুরো পৃথিবী। তিন দশক আগেও মানুষ চিঠি লিখত, এখন মেসেঞ্জারে নক করে। আগে ভোরের আলো ফুটলে সবাই জেগে উঠত, সন্ধ্যায় নামলে ঘরে ফিরে ঘুমের প্রস্তুতি নিত; এখন সন্ধ্যা নামলে শহরে বিজলি বাতি জ্বলে ওঠে, শপিং মলে মানুষের কোলাহল চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। মাত্র তিন দশকে আমাদের পৃথিবী এতটা বদলেছে, যা আগের তিন হাজার বছরের ইতিহাসকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। বাস্তবেও আমরা প্রবেশ করেছি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তৃতীয় হাজার বছরের সীমানায়। আস্ত দুটো সহস্রাব্দ শেষ করে আমরা এখন তৃতীয় হাজার বছরের শুরু ভাগে অবস্থান করছি। আমি নিজের চোখে দেখেছি একটি হাজার বছরের সূর্যাস্ত এবং আরেকটি হাজার বছরের সূর্যোদয়। আমার শৈশব কেটেছে পুরো একটি শতাব্দির শেষ ভাগে এবং কৈশোর কেটেছে আরেক শতাব্দির শুরুভাগে। এজন্য আমাদের জেনারেশনকে বলা হয় ‘মিলেনিয়াম’ বা হাজার বছরের প্রজন্ম। আমরা শুধু পৃথিবীর রূপান্তর দেখিনি, একটি শতাব্দীর রূপান্তরও দেখেছি। দেখেছি ঢাকার বুকে জেগে থাকা সবুজ গ্রাম ও গ্রামীণ জীবন, যেখানে ভাঁজ করে রেখেছি আমার শৈশব-কৈশোরের অজস্র গল্প। সেই হারানো শহরে আমি এখনো নিজেকে খুঁজি।

আমি এই জাদুর শহরে বেড়ে ওঠা মানুষ। এই শহরের বয়স কত? ইতিহাসের পাতায় চোখ মেলে দেখি ‘ঢাকা’ নাম ধারণ করে এই শহরের জন্ম হয়েছে ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে, ইসলাম খান চিশতি নামক একজন মোগল গভর্নরের হাত ধরে। ১৬১০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত হিসাব করলে আমাদের এই শহরের বয়স এখন ৪১৫ বছর। আমাদের দেশ তখন পরিচালিত হতো দিল্লি থেকে, মোগল সুলতানদের অধীনে। মোঘল শাসক জাহাঙ্গীরের ফরমানে এই জনপদকে সুবাহ বাংলার রাজধানী ঘোষণা করা হয় ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই। সুবাহ বাংলার প্রাদেশিক গভর্নর হয়ে আসেন ইসলাম খান চিশতি। দিল্লি থেকে নৌবহর নিয়ে পুরান ঢাকার সদরঘাটে নেমে যেখানে শিবির স্থাপন করেন সুবাহদার ইসলাম খান, সে জায়গার নাম রাখা হয় ইসলামপুর, এখনো সেই নামেই জায়গাটি পরিচিত। আর সদরঘাট ঘিরে কয়েক মাইল জায়গা জুড়ে রাজধানীর নাম রাখা হয় জাহাঙ্গীরনগর। সেই রাজধানী শহরের উন্নয়নের আগ্রাসন পুরোন ঢাকার সীমানা পেরিয়ে থেকে অগ্রসর হতে থাকে নতুন ঢাকার দিকে। দক্ষিণ থেকে শাহবাগ পেরিয়ে উত্তর দিকে উত্তরা অবধি সব গ্রাম উজাড় করে দেয় সেই আগ্রাসী উন্নয়নের যাত্রা। উন্নয়নের জোয়ারে হারিয়ে যায় শহরের প্রাণ ও প্রকৃতি।

শহরের বুক থেকে গ্রামের দৃশ্য পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আগ মুহূর্তে আমি এই শহরে উপস্থিত হই। এখনো আমার শৈশবের সেই বিলীয়মান সময়টাকে দেখতে পাই অদ্ভুত এক স্মৃতির ভেতর, ডায়েরির ভাঁজে লুকিয়ে রাখার ফড়িঙের ডানার মতো। আমাদের মিরপুর কচুক্ষেতের গ্রামীণ পরিবেশে খেলতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই সবুজ মাঠ থেকে ফড়িং ধরে আনতাম এবং পাখা জমিয়ে রাখতাম। একজন কিশোরের কাছে ফড়িঙের সবুজ ডানা তেমনই মূল্যবান—একজন ষোড়শীর কাছে গোলাপের পাঁপড়ি যেমন মূল্যবান এবং একজন পুরুষের কাছে চেকবইয়ের পাতা যেমন মূল্যবান। ডায়েরির গোপন ভাঁজে লুকিয়ে রাখা গোলাপের শুকনো পাঁপড়ি, শৈশবের সবুজ ডানা কিংবা কিংবা চেকবইয়ের স্বাক্ষরিত পাতা সবই যার যার জীবনের বলয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কখনো ঘুমের ভেতর হঠাৎ বিছানা থেকে উঠে জানালা খুলে ভেসে বেড়ানো মেঘের দল দেখার মতো এখনো তাকিয়ে দেখি সেই স্মৃতির মিছিল। আসলে এই দেশে যারা সরকারি চাকুরি করেন, তাদের সাথে তাদের পরিবারকেও একটা সময় বোহেমিয়ান জীবন কাটাতে হয়। আমার বাবাও সরকারি চাকরি সূত্রে কাটিয়েছেন অনেক জেলায়—চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, টাঙ্গাইল, যশোর, ঢাকা। বাবা-মায়ের সাথে খুব অল্প কিছু সময় কাটিয়েছি টাঙ্গাইলের পাহাড়কাঞ্চনপুরের বনাঞ্চলে, তারপর কিছুকাল যশোরের ভারত-বেনাপোল সীমান্তঘেঁষা এলাকায় কাটিয়ে ঢাকায় আসি ১৯৯৬ সালে। আমার জীবনে তখন পুষ্পিত শৈশব। আধুনিক নতুন ঢাকার শহরাঞ্চলও তখন শৈশব পেরিয়ে পূর্ণ যৌবনের পথে বাড়বাড়ন্ত।

আমার বাবার কাজ ছিল বিমান বাহিনীতে, আকাশে বিমান ওড়ার আগে এবং আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসার পর বিমানের ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল তার কাজ। আকাশে উড়ে যাওয়া বিমান কিংবা পাখা ঘুরিয়ে উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টার দেখে ছোটবেলায় মনে হতো ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখি কিংবা মাঠে উড়ে বেড়ানো ঘাসফড়িং। এই কৃত্রিম পাখি বা ঘাসফড়িং আকাশে ওড়ানোর জন্য আড়ালে কাজ করে একদল মানুষ। একদল থাকে ককপিটে, আরেকদল থাকে রাডারে, আরেকদল থাকে যন্ত্রাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। বিমান বা হেলিকপ্টারের পাখার মতোই আমাদেরও ঘুরতে হয়েছে বাবার সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলায়। ১৯৯৬ সালে ঢাকায় এসে ক্যান্টনমেন্টের আবাসিক কোয়ার্টারে ওঠার আগে কিছুদিন আমরা অবস্থান করি কচুক্ষেত বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা কাফরুলে। পুরনো বিমান বন্দরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা বিশাল ঝিলের পাড়ে একটি তিন তলা ভবনের ভাড়া বাসায়। ঝিলের বড় অংশ তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরের রানওয়ে ঘিরে। বাসার ছাদেও দাঁড়িয়ে দেখতাম বিমান ও হেলিকপ্টারের ওঠানামা। সকালে ঝিলের উপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যেতে দেখতাম শাদা বক। বিকাল হলেই আমরা নৌকায় চড়ে খেলতে যেতাম পুরনো বিমানবন্দরের বিশাল খোলা মাঠে। কচুক্ষেত থেকে কাফরুলের রাস্তায় তখনও আধুনিক পিচের প্রলেপ পড়েনি। আমাদের বাসার আশপাশে ছিল কয়েকটি গরুর খামার, মুরগির খামার, ধানখেত। আমাদের বাসায় মুরগি, ডিম, দুধ সব আসতো সেসব খামার থেকে। মনে আছে, বাসার নিচের মুদি দোকান থেকে মাঝেমধ্যে আম্মা এটা-ওটা কিনতে পাঠাতেন; তখন এক হালি ডিমের দাম ছিল ৫ টাকা এবং এক লিটার দুধের দাম ছিল ২০ টাকা। মাঝেমধ্যে বাবার সাথে কচুক্ষেত বাজারে যেতাম; গরুর মাংসের দাম ছিল ৫০ টাকা কেজি এবং ইলিশ মাছের দাম ছিল ৫০ টাকা। বাজার থেকে বাসায় ফিরতাম ২ টাকা রিকশা ভাড়ায়, যা বেড়ে এখন ২০ টাকা।

বাবার কাছে শুনেছি, বিমান বাহিনীতে চাকরির সুবাদে তিনি এই কচুক্ষেত এলাকায় আসেন ১৯৭৯ সালের দিকে। তারপর আমরা আসি ১৯৯৬ সালের দিকে। তখন কচুক্ষেতের মেইনরোড, যেটা বনানী-কাকলির দিকে গিয়েছে, পাকা হলেও খুব সরু ছিল এবং আশপাশের রাস্তাগুলোও ছিল কাচামাটির। এখন যেখানে ডিজিএফআইয়ের বিশাল ভবন দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ছিল একটি পুকুর ও কচুরক্ষেত। মানুষ জাল ছড়িয়ে মাছ ধরত। বাবা বলেন, ওই সময় কচুক্ষেত-ইবরাহিমপুর পুরোটাই ছিল মাটির গ্রাম, চারপাশে ছিল ধানখেত ও খালবিল। সেখানে একটা পুল ছিল, যার নাম এখনো পুলপার। তবে এখন সেই পুল নেই, সেখানে পিচ কার্পেট করা বক্স কালভার্ট রোড। এখন খালের অস্তিত্ব নেই, তবে খুব ক্ষীণ একটা ডোবা আছে। আর কচুক্ষেতের কোনো অস্তিত্ব এখন নেই, সেখানে গড়ে উঠেছে বিশাল মার্কেট। সেই মার্কেটের নাম ‘কচুক্ষেত’ বদলে ‘রজনীগন্ধা’ নাম দেওয়া হলেও মানুষ এখনো কচুক্ষেত বলেই ডাকে। অবশ্য, কচুক্ষেত বাজারের পেছনে মুসলিম মডার্ন স্কুলের দিকে গলির পাশে কিছুটা নর্দমা আছে, সেখানে কচুর ক্ষেত দেখা যায় এখনো।

আমাদের বাসা ছিল উত্তর কাফরুল ঝিলপাড়। ইবরাহিমপুরের এই পুলপাড় থেকে ঝিলপাড়ের বাসা পর্যন্ত পুরোটা পথ ছিল কাচামাটির। ইট খুলে লক্করঝক্কর অবস্থা। আমি তখন পড়তাম শেওড়াপাড়া যাওয়ার পথে পুরনো বিমানবন্দরের রানওয়ে লাগোয়া ইবরাহিম সালাহউদ্দিন স্কুলে। স্কুলের সামনে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। আমরা দুই ভাইবোন টিফিন পিরিয়ডে সেখানে গিয়ে শিঙাড়া-সমুসা কিনে খেতাম। আমাদের দুই ভাইবোনের জন্য আম্মা দুই টাকা দিতেন। দুই টাকায় বিশাল আকৃতির দুইটা শিঙাড়া পাওয়া যেত। এখন কিছু কিছু ফাস্টফুডের দোকানে কাচের বক্সের ভেতর যে শিঙাড়া সাজিয়ে রাখা হয়, ভেতরে এক দুই টুকরো মাংস-কলিজা পাওয়া যায়; তখন ঠিক এই শিঙাড়াগুলোই কচুক্ষেত-ইবরাহিমপুর-কাফরুলের সব হোটেল-রেস্তোরাঁয় বিক্রি হতো। ভেতরে কলিজা থাকত এবং দাম ছিল মাত্র ১ টাকা। কিছুদিন পর দেখলাম রেস্টুরেন্টগুলোতে অর্ধেক সাইজের নতুন শিঙাড়া বানানো হচ্ছে এবং দাম রাখা হচ্ছে ১ টাকা, আর আগের বড় শিঙাড়াগুলো হয়েছে ২ টাকা। কালক্রমে শিঙাড়ার ভেতর থেকে কলিজা হারিয়ে গেল। বর্তমানে সেই ৫০ পয়সার শিঙাড়া ৫ টাকা থেকে লাফিয়ে ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর আদি ও আসল ১ টাকার বড় শিঙাড়া ফাস্টফুডে আছে ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে গেছে অতীতের সুখ ও স্বাদ। 

পুরনো বিমানবন্দরের রানওয়ে ঘিরেই ছিল আমাদের বাসা স্কুল ও মসজিদ। রানওয়ের শেষ প্রান্তে ঘন গাছগাছালি ঘেরা জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় মাটি ফেলে বানানো হয়েছিল আমাদের এলাকার মসজিদ। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে বুনো লতাগুল্মের ভেতর দিয়ে ছিল মসজিদে যাতায়াতের পথ। জঙ্গল পরিষ্কার করা ও মাটি কাটা থেকে শুরু করে মসজিদ নির্মাণে আমিও অংশ নিয়েছিলাম। আমাদের বাসা ও স্কুলের মাঝখানে ছিল মসজিদটি। পুরোটা দৃশ্যই যেন এখন ক্যানভাসে আঁকা ছবি। সেই মাটির মসজিদ এখন বহুতল ভবন। ওই সময়টায় ঢাকা শহরের অনেক জায়গাই ছিল গ্রামের মতো, পুরোপুরি গ্রামীণ পরিবেশ। কাচা মাটির এবড়োখেবড়ো পথ। কিছু জায়গায় ইটের আস্তর বসানো হয়েছিল মাত্র। মিরপুর-উত্তরার মতো জায়গায়ও কৃষকদের ধানখেতে কাজ করতে দেখেছি। জেলেরা জাল ছুড়ে মাছ ধরত। আমিও বড়শি ফেলে তেলাপিয়া মাছ ধরে বাসায় এনেছিলাম। আমাদের এলাকায় কয়েকটা গরুর খামার ছিল। রানওয়ে তখন ছিল সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। কোনো দেয়াল বা বেড়া কিছুই ছিলো না। বিশাল মাঠে গরু ঘাস খেত, ছেলেরা ঘুড়ি ওড়াত, খেলাধুলা করত আর আমি বসে বই পড়তাম। আমাদের স্কুলে সাংস্কৃতিক চর্চায় বিশেষ গুরুত্ব ছিল। বিভিন্ন উপলক্ষে অনুষ্ঠান হতো এবং পুরস্কার হিসেবে বই দেওয়া হতো। আমি কয়েক বছরে বেশ কিছু বই পেয়েছিলাম স্কুল থেকে। বিকালে রানওয়ের মাঠে বসে বই পড়তাম এবং কবিতার মাধ্যমে পৃথিবীর যোগসূত্র মেলানোর চেষ্টা করতাম।

এখনো আমরা এই কচুক্ষেত এলাকাতেই বসবাস করছি। ইবরাহিমপুর কালভার্ট রোডের সেই হারানো পুলের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি ফুট ওভার ব্রিজ, আর রাস্তার বিপরীতে তামান্না কমপ্লেক্স। প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় সেখানে দাঁড়িয়ে অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করি। শত শত কর্মব্যস্ত মানুষের বিচরণ দেখি। সেই সেকাল থেকে আজ পর্যন্ত কত শত মানুষ অনবরত হেঁটে চলেছে এই পথ ধরে! দুই পাশের জল কোলাহল হারিয়ে সেই খাল ভরে গড়ে উঠেছে অনেক দোকানপাট। মাঝেমধ্যে এখান থেকে বাসার জন্য বাজার-সদাই করি। দোকানে গিয়ে শুনি এক হালি ডিমের দাম ৫০ টাকা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অতীতের ছবি; ছোটবেলায় আম্মা ৫ টাকা হাতে দিয়ে বলতেন মুদি দোকান থেকে এক হালি ডিম কিনে আনতে। কখনো সঙ্গে ২৫ টাকা দিতেন এক লিটার দুধ আনতে। ছোট বেলায় যে এলাকার দোকান থেকে ৫ টাকা হালি ডিম কিনেছি, ঠিক সেখানেই এক হালি ডিমের দাম এখন ৫০ টাকা। একটি শূন্য (০) দেখার জন্য জীবনের কতটা পথ পেরিয়ে এলাম! কচুক্ষেত-ইবরাহিমপুরের এই পুলপাড় আগেও ছিল, এখনো আছে। আগে ছিল বাস্তবে, এখন আছে নামে ও ইতিহাসে। আছে আমাদের স্মৃতির অ্যালবামে।

কচুক্ষেত থেকে কিছুদিন পরেই গেলাম নীহারিকায়। ফার্মগেট থেকে মহাখালীর দিকে যাওয়ার পথে বাঁকসন্ধিতে শহীদ জাহাঙ্গীর গেট; যেখানে দাঁড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ব্যবহৃত চারটি কামানের একটি। জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে সোজা সামনে গেলেই হাতের ডান দিকে বিএএফ শাহীন কলেজ; যেখানে মিশে আছে আমার স্বপ্নমুখর শৈশবের কিছু কোলাহল। আরেকটু সামনে গেলে পুরনো বিমানবন্দর ভবন, এয়ারফোর্সের বিভিন্ন দফতর এবং সামরিক পরিবারগুলোর আবাসিক এরিয়া—ছায়ানিবিড়, নিসর্গের ভাঁজে ভাঁজে সাজানো কোয়ার্টার। বর্তমান নাম নীহারিকা এবং সাবেক নাম সৌদি কলোনী। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে সৌদি বাদশার অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিকতা ও প্রকৃতির মিশেলে সবুজে মোড়ানো শান্ত-স্নিগ্ধ এলাকাটি। আমাদের বাসার সামনেও ছিল বিশাল মাঠ। মাঠের চারপাশে জনশূন্য পথ। পাখিদের মতো স্বাধীন ডানায় সাইকেল নিয়ে উড়ে বেড়ানোর সুন্দর পরিবেশ। সাধারণত আমরা কোয়ার্টারের ভেতরেই খেলাধুলা করতাম, ঘুড়ি উড়াতাম এবং সাইক্লিং করতাম। মাঝেমধ্যে দলবল নিয়ে চলে যেতাম কোয়ার্টারের বাইরে। বাইরে আমাদের প্রথম পছন্দ ছিল পুরনো বিমানবন্দরের বিশাল রানওয়ে, তারপর আরও সামনে এগিয়ে সংসদ ভবন এরিয়া এবং গণভবন।

ছোটবেলায় আমাদের খেলাধুলার প্রিয় জায়গা ছিল সংসদ ভবনের মাঠ। আমরা বন্ধুরা দলবল মিলে সংসদ ভবনের মাঠে ফুটবল খেলতাম, ঘুড়ি উড়াতাম এবং পাখির ঝাঁকের মতো সাইকেল বহর নিয়ে উড়াউড়ি করতাম সংসদ ভবনের বিশাল কমপ্লেক্সের পথে পথে। মাঝেমধ্যে গণভবনেও যেতাম এবং ঘুমন্ত দুপুরে মেহগনি গাছের ছায়ায় বসে ক্লান্তি দূর করতাম। আমাদের একটি প্রিয় খেলা ছিল শুকনো মেহগনি ফল ভেঙে পাপড়িগুলো বাতাসে উড়িয়ে হেলিকপ্টার বানানো। হেলিকপ্টারের পাখার মতো শুকনো পাপড়িগুলো বাতাসে ঘুরে ঘুরে পড়ে যেতো সবুজ ঘাসের উপর। গাছের ছায়ায় ফেলে রাখা সাইকেল তুলে আবারো প্যাডেল চেপে উড়ে যেতাম দূরের পথে। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো, কে কার আগে যেতে পারে। মাঝেমধ্যে অভিনব কিছু প্রতিযোগিতাও হতো। একবার পাখির ডানা বিস্তারের মতো দুই হাত শূন্যে তুলে সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতা হলো। মনে আছে, আমি টানা আট মিনিট দুই হাত মেলে সাইকেল চালিয়ে গিয়েছিলাম। বাসায় ফেরার সময় পাঞ্জাবির কোঁচড়ে ভরে অনেকগুলো কদম ফুল এনেছিলাম ছোট দুই বোনের সাথে বারান্দায় খেলাধুলা করার আশায়। কিন্তু কদম ফুলের কষ লেগে নতুন পাঞ্জাবিটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং আম্মুর হাতে কানমলা খেয়েছিলাম। কিশোর বয়সে কদম ফুলের সৌন্দর্যে যেভাবে মোহিত হয়েছিলাম, একইভাবে একরাশ অভিমানও জন্মেছিল এই ঘটনায়।

ওই সময় সংসদ ভবন এবং গণভবন ছিল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। ফজরের নামাজের পর সংসদ ভবনে বড়রা জগিং করতো, কারাতে প্রাক্টিস করতো আর বিকালে পুরো কমপ্লেক্স থাকতো আমাদের দখলে—ঢাকা শহরের ছেলে-মেয়েরা খেলাধুলা করত, ঘুড়ি উড়াত, সাইক্লিং করত এবং সবুজ ঘাসের উপর প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াত। আমরা সাধারণত বের হতাম দুপুর তিনটার দিকে, যখন সবাই যখন থাকে অলস ঘুমে। বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমরা বেরিয়ে যেতাম, কারণ দুপুরে রাস্তায় মানুষ থাকে কম এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত একটা দীর্ঘ একটা সময় পাওয়া যায়। একবার সংসদ ভবনের সিঁড়িতে খুব অদ্ভুত একটি দৃশ্য দেখেছিলাম। সম্ভবত তখনও আসরের আজান হয়নি। সংসদ ভবনের মার্বেল রঙের সিঁড়িতে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে বসা। আমরা ঘুমন্ত দুপুরের নীরবতা ভেঙে সাইকেলের ঝাঁক নিয়ে ছুটে যাওয়ার পথে দেখি, সংসদ ভবনের সিঁড়িতে একটি ছেলে একটি মেয়ের মাথায় একটি গোলাপ ফুল গুঁজে দিচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম। আমাদের মধ্যে তখন একটি প্রশ্ন উঠেছিল—মানুষের মাথায় ফুল গুঁজে দেওয়ার কারণ কী হতে পারে? আরেকটি অনুচ্চারিত প্রশ্ন ছিল—এত মানুষ ঘুরতে আসে, কিন্তু জায়গায় জায়গায় জোড়ায় জোড়ায় ছেলে-মেয়ে বসে থাকে কেনো? ছেলেরা আলাদা ও মেয়েরা আলাদা বসে না কেনো? কিংবা আমাদের মতো দল বেঁধে বসে না কেনো?

একটি নতুন এক শতাব্দীর ভোরবেলা তখন। ক্যালেন্ডারের হিসাবে ২০০১-৩ খ্রিষ্টাব্দ। একই সঙ্গে তখন পরিবর্তন হচ্ছে একটি শতাব্দী, মানবসভ্যতা, বিশ্বরাজনীতি এবং পৃথিবীর ইতিহাস। পৃথিবীতে ঘটে যাচ্ছে পটপরিবর্তনের নানা ঘটনা। আমেরিকায় বিমান উড়িয়ে টুইন টাওয়ার ধ্বংস করা হলো, আফগানিস্তানে কার্পেট বোম্বিং শুরু হলো, ইরাকে ধ্বংস করা হলো, আফ্রিকায়ও চলছিল গৃহযুদ্ধ। জাতিসংঘের অধীনে এসব যুদ্ধে যাচ্ছেন আব্বুর বন্ধু-সহকর্মী অনেকেই এবং আহত-নিহত হচ্ছেন। একবার আফ্রিকার কঙ্গোতে এক আঙ্কেল মৃত্যুবরণ করলেন। আমাদের পাশের ভবনেই ছিল তার পরিবার। অনেক মানুষের কান্নার রোল এখনো কানে বাজে। এসব কিছুই প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল আমার নিজস্ব পরিমণ্ডল। যখন কোথাও কোনো আলোড়ন ওঠে, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। যুদ্ধ এবং সংঘাতের অভিঘাত আমাদেরকেও তুমুলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আমি তখন পৃথিবীটাকে মাত্র চিনতে শুরু করেছি। বয়স তখন ১০ থেকে ১৩/১৪-এর মধ্যে। কম্পিউটারে বেশিরভাগ সময় যুদ্ধের ভিডিও দেখতাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার বিষ্ফোরণের দৃশ্য, পার্ল হারবারের যুদ্ধ আমার ভেতরে চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল। নিয়ম করে পত্রিকাও পড়তাম। বাসায় আমার ছোট মামা থাকতেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। মামা দুটো পত্রিকা রাখতেন—ইত্তেফাক ও প্রথম আলো। সকালে হকার পত্রিকা দিয়ে গেলেই প্রথমে আমি দখলে নিতাম। প্রথমেই দেখতাম যুদ্ধের খবর। বই পড়ার নেশা ছিলো আগে থেকেই। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে একটি বইয়ের দোকান ছিল। সেখান থেকে নিয়মিত বই নিয়ে পড়তাম। কমিক্স, টিনটিন, তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা এসব ছিল আমার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। আমার অ্যাভন সাইকেলে কয়েকটি ক্যারিয়ারের সঙ্গে একটি ছোট ব্যাগও ছিল। সাইকেল ব্যাগে সবসময় থাকতো পছন্দের বই এবং নীহারিকা মাঠে বা সংসদ ভবনের মাঠে বা গণভবনের মাঠে সাইকেল ফেলে গাছের ছায়ায় বসে বই পড়তাম। আমরা ১০/১২ জনের সাইকেল বাহিনী একসঙ্গে বের হতাম; বন্ধুরা বিশাল মাঠে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলত আর আমি গাছের ছায়ায় বসে বই পড়তাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমার সমবয়সী একটি ইহুদি মেয়ের লেখা দিনলিপি—‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সম্ভবত সংসদ ভবনের মাঠে বইটি ফেলে এসেছিলাম। অনেক পরে একদিন পুরনো বিমানবন্দরে আব্বুর অফিসে গিয়ে দেখি টেবিলে সেই বইটি। সম্ভবত হাত বদল হতে হতে আব্বুর টেবিলে গিয়ে উঠেছিলো। তখন বুঝতে পেরেছিলাম, কেন ‘আউট বই’ পড়ার অপরাধে রেস্ট্রিকশন দেওয়া হয়েছিল।

একবার ঈদের নামাজের পর বন্ধুরা বলল, আজ খেলাধুলা বা ঘোরাফেরা না করে সাইকেল নিয়ে দূরে কোথাও ঘুরতে যাই। আমাদের সীমিত জগতের ভেতর তখন ‘দূর’ মানে ছিলো পুরনো বিমানবন্দরের বিশাল রানওয়ে দিয়ে সাইকেল নিয়ে ছুটতে থাকা কিংবা সংসদ কমপ্লেক্সের অলি-গলি চষে বেড়ানো। আমরা ১০/১২ জনের একটি সাইকেল বাহিনী রওনা হয়ে গেলাম প্যাডেল চেপে। আমাদের জন্য নিরাপদ রাস্তা ছিল নীহারিকা থেকে বের হয়ে পুরনো বিমানবন্দরের ভেতরের পথ। গাছের ছায়ায় ছায়ায় সাইকেল উড়িয়ে চলে যেতাম সংসদ ভবন এবং গণভবনের প্রকৃতির কোলাহলের ভেতর। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রভোস্ট আঙ্কেলরা বাঁশি ফুঁকে নিষেধ করলেও আমরা সাইকেলের গিয়ার বাড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়তাম। মাঝেমধ্যে বকুনি খেতাম। সংসদ ভবন এবং গণভবন এলাকা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও খুব বেশি ভিড় হতো না। খুব অল্প মানুষই ঘোরাফেরা করতো। কিংবা বিশাল এলাকা হওয়ায় অনেক মানুষ ঢুকলেও সংখ্যায় কম দেখাত। কিন্তু সেদিন গণভবনে গিয়ে দেখি অনেক মানুষের ভিড়। এত মানুষের ভিড় দেখে আমাদের মনে কৌতূহল জাগলো। একটি মেহগনি গাছের ছায়ায় আমরা সবাই সাইকেল পার্কিং করে ভিড়ের ভেতর ঢুকে পড়লাম। একটু পর বুঝতে পারলাম চাপ সহ্য করতে পারছি না। বুকের হাড় ভেঙে পড়বে অবস্থা। ছোট হওয়ায় মানুষের চাপের ভেতর হাঁটতেও পারছি না, কিছু দেখতেও পারছি না। এক পর্যায়ে বন্ধুদের হারিয়ে ফেললাম। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। একজনের সাহায্যে একটু উপরে উঠলাম। কিন্তু উপরে ওঠার পর আর মাটিতে পা স্পর্শ করতে পারছি না। ভিড়ের চাপে আটকে গিয়েছি। জনসমুদ্রে ভেসে ভেসে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। আরেকটু উপরের দিকে উঠে জনসমুদ্রে জায়গা করে নিলাম। আমাকে হাঁটতে হচ্ছে না, মানুষের স্রোতই আমাকে সামনে এগিয়ে নিচ্ছে। এভাবে অনেক্ষণ ভেসে চলার পর ভিড় একটু কমলো, আমিও মাটিতে অবতরণ করলাম। দেখলাম আর্মি সদস্যরা সবাইকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। দূর থেকে দেখতে পেলাম একটি সিংহাসনে বসে আছেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। গায়ে গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই ধরণের পাতলা শাড়ি জড়ানো। লাইন ধরে আমিও কাছাকাছি গেলাম এবং হ্যান্ডশেক করলাম। কিন্তু মনে হয়েছিলো ভুলে তুলার মতো নরম কাপড়ে হাত দিয়েছি; হ্যান্ডশেক করা হয়নি। দ্বিতীয়বার হ্যান্ডশেক করলাম এবং তিনিও অন্যদের চেয়ে একটু বেশি সময় আমার হাত ধরে ছিলেন। তারপর আরো কয়েকবার দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে।

আমাদের কিশোর বয়সের আলোচিত এ ঘটনার ২২/২৪ বছর পর গণভবনে ঘটলো আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ঘোষণা হলো ‘সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন’। এটা শুনেই বুকের ভেতর চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। পলকে পলকে ইতিহাস পরিবর্তন হচ্ছে। দ্রুত অফিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। অফিসে ফোন দিলাম, গাড়ি আসবে কখন? ঘড়িতে বাজে দুপুর তিনটা, তখন শুনি গাড়ি মাত্র যাত্রাবাড়ি; সুতরাং গাড়ির অপেক্ষা করা যাবে না। বের হওয়ার সময় দেখি ফেসবুকে একটি লাইভ হচ্ছে, গণভবনের ডাইনিং রুমে আরাম কেদারায় বসে গণমানুষ খাবার খাচ্ছে। রাস্তায় নেমে দেখি, মানুষ আনন্দ মিছিল করে যাচ্ছে। বাসার কাছেই দেখলাম একটা ছাদ খোলা পিকাপ গাড়ি যাচ্ছে গণভবনের দিকে। আমাকেও একজন হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো পিকাপে। অল্প সময়েই গাড়ি ভরে গেল। পুরো ঢাকা শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে এবং শ্লোগান দিতে দিতে সবাই গণভবনের অভিমুখে ছুটে যাচ্ছে। গণভবনের প্রবেশমুখে বিশাল জনসমুদ্র। একদিকে বন্যার ঢলের মতো জনস্রোত ভেতরে প্রবেশ করছে, আরেক দিক দিয়ে অসংখ্যা মানুষ বের হচ্ছে। সবার হাতে গণভবনের জিনিসপত্র। গণিমতের সম্পদের মতো যে যা পারছে নিয়ে আসছে স্মৃতি হিসেবে। বালিশ, তোষক, কম্বল, চাদর, খাট, চেয়ার, টেবিল, ফ্রিজ, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, প্লেট, জগ-গ্লাস, আচারের বয়াম, ফ্রিজে থাকা বিশাল বিশাল মাছ, গরু-ছাগলের আস্ত রান, শাকসবজি, হাঁস, মুরগি, গরু-ছাগল; এমনকি এসি, ফ্যান, লাইট, বেসিন ও পানির কল খুলে নিয়ে আসছে। একজনকে দেখলাম বাসার ছাদে থাকা বিশাল কালো রঙের পানির ট্যাংকি গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ নিয়েছে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মনিটর, টিভি, পিসি আরো কত কী! এমনকি গণভবনে যেসব গাছ লাগানো হয়েছিল, সেসব গাছ তুলে তুলে নিয়ে আসছে মানুষজন। সবার মুখে বিজয়ের হাসি।

গণভবনের সবুজ মাঠে একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আমি কিশোর বয়সের স্মৃতিগুলো রোমন্থন করছিলাম, কিন্তু এই দৃশ্য একই সঙ্গে আনন্দের এবং বেদনার। জনস্রোত ঠেলে আমরা পাশে সংসদ ভবনের রাস্তায় গিয়ে উঠলাম। দেখি সংসদ ভবনের ভেতরেও মানুষ ঢুকে পড়েছে। সেখানেও বাঁধভাঙা গণজোয়ার। এত বছর সংসদ কমপ্লেক্সে সাধারণ মানুষকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এখন সুযোগ পেয়ে সবাই ঢুকছে। ছোটবেলায় তো আমরা নিয়মিত ঢুকতাম। এত বছর পর সুযোগ পেয়ে আমরাও ঢুকলাম। ভেতরে ঢুকে ছবি ও ভিডিও নিলাম। দেখি, সংসদ ভবনের ভেতরেও মানুষ ঢুকে পড়েছে। একেবারে মূল ভবনের ছাদে উঠে মানুষ পতাকা নাড়াচ্ছে। লেকের ভেতর নেমে সবাই গোসল করছে, সাঁতার কাটছে। নিচের দুটো প্রবেশপথেও মানুষের ঢল। সমগ্র বাংলাদেশ যেন একটি বিজয়ের আনন্দ ও স্বাদ উপভোগ করছে। ১৯৭১ সালে বিজয়ের দিন মানুষ যেমন স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপন করেছিল, ৫৩ বছর পর ২০২৪ সালে দ্বিতীয়বার সমগ্র জাতি আরেকটি জাতীয় উৎসব উদ্‌যাপন করছে। ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতী, পুরুষ-নারী সবার মুখে বিজয়ের হাসি। দমিয়ে রাখা বিজয়ের আনন্দ হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে পেয়ে সবাই যেন স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। সবাই বিশ্বাস করতে চাইছে যে, এই স্বাধীনতাটা স্বপ্নে নয়, বাস্তবেই উদ্‌যাপন করছে। আসরের সময় আকাশের বুক চিড়ে একটি শাদা রঙের বিমান উড়ে যেতে দেখা গেল। হাজার হাজার মানুষের সাথে আমিও তখন সংসদ ভবনের চত্বরে দাঁড়ানো। উড়ে যাওয়া বিমানের দিকে লক্ষ করে লক্ষ জনতা সমস্বরে বলে উঠল—‘এই বিমানেই পালিয়ে যাচ্ছে’। কোরাস কণ্ঠে আরো অনেক শ্লোগান চলল। অসম্ভব নয়, কারণ বিপ্লবের এই দিনগুলোতে বাংলার আকাশে বিমান উড়ছে না। এত বছর পর একটি বিকালে সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দেখলাম আকাশে উড়ে যাওয়া পাখি। পাখি উড়ে যায়; ফেলে যায় বৈষম্য ও নিষ্পেষণের দীর্ঘ কালো ছায়া।

মাঝেমধ্যেই ত্রিশ বছর আগের ঢাকায় হারিয়ে যাই। ঢাকার ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে খুঁজতে থাকি অতীতের স্মৃতিচিহ্ন। অনেক জায়গায় এখনো দাঁড়িয়ে আছে বড় অবহেলায় লাল-নীল-সবুজ লেটার বক্স। গায়ে লেগে আছে জং ধরা তালা। কারণ লেটার বক্সের জায়গা নিয়েছে এখন ইনবক্স। ছোটবেলায় লেটারবক্সে ডাক টিকেট লাগিয়ে চিঠি ফেলে আসতাম, কয়েক দিন পর ডাক পিয়নের হাত থেকে পেতাম ফিরতি চিঠি। সেই অদৃশ্য স্পর্শের সুখ ও শিহরণ এখন কোথায়? মাঝেমধ্যে পছন্দের পত্রিকার ঠিকানায়ও লেখা পাঠাতাম। পরের মাসে ছেপে আসত রাত জেগে সাজানো স্বপ্ন। এখন ই-মেইলে লেখা যায়, লেখা আসে; কিন্তু এতে স্পর্শের সুখ কোথায়? ডাক বক্সগুলো হয়তো পরিত্যক্ত স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে, কিন্তু চলার পথে আইল্যান্ডে কোনো লেটার বক্স দেখলেই কিছুক্ষণের জন্য আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে যাই। ধুলোবালি সরিয়ে তার শরীর স্পর্শ করি এবং হারানো শহরে নিজেকে খুঁজি।

Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *