ঘুমাইলেই স্বপ্নে দেখি বাড়িতে বসে আছি। ভাইয়ের সাথে বসে ঢাকা ফেরত বাসের টিকিট নিয়ে আলাপ করতেছি৷ সারাটা স্বপ্ন মন খারাপ হয়ে থাকে। ঘুম ভাঙলে শরীররে লাগে অবশ। কয়েকটা মুহূর্ত এত নির্লিপ্ত লাগে, স্বপ্ন আর জেগে থাকার ভিতর ফারাক করতে পারি না। এমন না যে বাড়িতে থাকতে চাই। কিন্তু ঘুমাইলেই স্বপ্নে দেখি বাড়ি। কিছু কিছু স্বপ্ন এত সবুজ। ভ্যানে চড়ে ঘুরতে গেছি কোথায় কোথায় যে৷ পানি আর পানি। বাতাসে ভরে আছে ধানমুখি মাঠ।
জীবনে অনেক কিছুই করতে চাই আমি। কবিতা লিখতে চাই। উপন্যাস৷ তার্কিশ সিনেমা ‘বাল’ (Honey) দেখার কথা ভাবি। সিনেমাটা প্রথমবার দেখার সময়টা মনে পড়ে৷ একটা ঠান্ডা সন্ধ্যা৷ বিষ্টি হইতেছিল। দুনিয়ায় করার মতো যেকোনো কাজরেই বেহুদা লাগতেছিল আমার। আমি সিনেমাটা দেখতেছিলাম। থেমে থেমে৷ যেন শেষ হয়ে গেলে পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য ঠাশ করে নাই হয়ে যাবে আমার সামনে থেকে৷ আমি একটা কাগজের ঠোঙা হয়ে পড়ে থাকব জমিনে। ভাবি সুন্দরের এমন চূড়ায় মানুষ কেমনে পৌঁছায়। ভিতরটা খালি হয়ে যায়।
কখনো একটা ইন্সট্রুমেন্ট বাজানো শিখতে ইচ্ছা করে৷ একটা ধুন, একটা সুর। একটা রাগ, ঠুমরী যখন বাজতে বাজতে সারাটা ঘরে ছড়ায়া যায়, ঘর থেকে বারান্দা তারপর হাওয়ায় আর আমার সমস্ত ইমাজিনেশন দোল খাইতে থাকে—প্রেমে পড়া মানুষের মতন ভিতরটা মোচড়াইতে থাকে—সুন্দরের একেকটা রূপ দেখে টলটল করতে থাকে জীবন; পুরাটা জিন্দেগি হেঁটে হেঁটে এমন একটা সুর ধরতে ইচ্ছা করে। কবিতা আছে এমন পড়তে পড়তে এতিম বাচ্চার মতন হারায়া যাইতে মন চায়। কীভাবে তৈরি হয় এমন সুন্দর, গলার কাছে দলা পাকাইতে থাকে সব, কোনোদিকে যাইতে পারি না; নিজের শরীর ছিঁড়ে, সিনার ভিতর গিয়ে দেখতে ইচ্ছা করে কেন আমার অন্তরে এমন খুশবু নাই!
কিন্তু ঘুমাইলেই স্বপ্নে দেখি বাড়ি৷ ভাইয়ের সাথে হাঁটতেছি আড়ায়। যেকোনো সুন্দরের খোঁজ করার বদলে শৈশবের আড়া জঙ্গল, জলি আর মধুফুলের মিঠা হাতড়াইতে থাকি খালি৷ এমনভাবে উত্তরের জানালায় তাকায় থাকি যেন নজরেই বাড়ির দূরত্ব কমায়া ফেলা যাবে৷ বুঁদ হয়ে খুঁজতে চাই কিছু একটা। জীবনে তো এমন অনেক দৃশ্য আছে, স্মৃতি বা মোমেন্ট—মনে হলেই দিল ঠান্ডা হয়ে আসে আরামে, খিলখিল করে ওঠে শরীর। সেগুলারে কেমনে আনা যায় ভাষায়! ভাষারে কেমনে মোচড় দিলে সে তার অপূর্ব স্বাদ নিয়ে হাজির হবে সামনে৷ বহুদিন আগের একটা খুশি, একটা আনন্দ এমন যে ভাবলে সেই সময়ের বাতাসটা গায়ে এসে লাগে—এই শিরশির করা খুশি আমি কীভাবে ধরব আমার ভাষাতে। সারাদিন যেন নিজেরে ফালায়া রাখতে চাই একটা টলটলা কুয়ায়। ঠান্ডা পানি। আহা। নিজেরে দেখি। যে কুয়ার দিকে তাকায়া থাকতাম হাঁ করে তার উত্তেজনা কেমনে যে লেখা যায়!
এবার বাড়িতে গেলে প্রতিটা ফজরের ওয়াক্ত এমন ভরপুর জীবনের দিকে নিয়ে গেল৷ যেন রহমের ভিতর খালি পায়ে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। তার ভিতরেও একটা দৃশ্য কাবু করে ফেলছে আমারে এত। প্রতিদিন কেন সেই ওশভরা সকাল মনে হলে এত আরাম লাগে। সারাটা জীবন ছেকে ছেকে এমন একটা লমহা পাওয়া যায় যা হয়তো চরভাঙা একটা নিঃসঙ্গ মানুষের বেঁচে থাকার সাহারা হয়ে থাকে৷
বাড়তি কোনো চাকচিক্য নাই। নাই নজরানা। ছোট্ট, একটা পাখির শিস কান থেকে রুহ অবধি যাওয়া মাত্রই থেমে যায়; কিন্তু মিলায়া যায় না পুরাপুরি, ঝোপের ভিতর, পাতার শিরায়, গাছে ফোটা প্রথম কুসুমে শরম হয়ে লেগে থাকে—যেন টোকা দিলেই আবার শোনা যাবে৷ বাড়িতে এক ভোরে কালবৈশাখি ঝড় শুরু হইল। উঠানে ছড়ানো ছিটানো জিনিসপত্র উদ্ধারের আগেই তুমুল বিষ্টি। বারান্দায় দাঁড়ায়া সুপারিগাছগুলার অতি লম্বাজনিত কারণে বাঁচামরার লড়াই দেখতেছিলাম। একটা ভেঙেই পড়ল মাজা বরাবর।
যেভাবে শুরু হয় উঠানে কাচা পাতার মেলা বসায়া থেমে গেল সব। আমি উঠানের কোনায় বাগানের পাশে দাঁড়ায়া ছিলাম। কেবল তারুণ্যের দিকে আগাইতে থাকা পেয়ারা গাছে শাদা ফুল ফুটে আছে। ফোঁটা ফোঁটা পানি৷ পাতাগুলাতে আরও অধিক। হঠাৎ করে মনে হয় পেয়ারার ফুল যে এমন তা তো ভুলেই গেছি। পেয়ারার গাছ থেকে সামান্য দূরে দাঁড়ায় ছিলাম। ভাই যাইতেছিল পড়তে৷ আমারে তাড়াহুড়া করে ডাকল পেয়ারা গাছের নিচে৷ গাছটা ধরে নাড়া দিল এমন ভঙ্গিতে যেন গাছে জমে থাকা পানি নয়, আমার ওপর সমস্ত শৈশব তারার মতন ঝুরঝুর করে ঝরতেছে৷ আর ও খিলখিল করে হেসে দৌড় দিল রাস্তায়। হাসিটা সেই তেমন ছোট্ট একটা শিসের মতন দ্রুতই শেষ কিন্তু লেগে থাকল আমার জীবনের সাথে, আমার অন্তরে একটা সুকুন হয়ে থাকল—যখনই নাড়া দিই পেয়ারা গাছের সমস্ত পানিসহ হাসিটা আমার শরীরেই বাজতে থাকে ঠুমরীর মতন।
একটা ছোট্ট মোমেন্ট, একটা দৃশ্য। এমন খিলখিল আনন্দ আমি কেমনে বলব ভাষায়। জানি না। নিজেরে জড়ায়া ধরার মতন এই সুকুন আমি কীভাবে বোঝাবো লেখায়। খুঁজতে থাকি। এই আনন্দ আর হাহাকারের মধ্যে দাঁড়ায়া হাঁপাইতে থাকি। তাকায়া থাকি শাদায়। জিভে লেগে থাকা স্বাদ, সারাঘরে ছড়ায়া পড়া খুশবুময় একটা সুর, একটা ধুন, গজলের শেষ একটা টান—কীভাবে টলমল সুন্দর আমি ধরতে পারব যে—কোথায়, কোন গুহার অন্ধকারে—প্রতিধ্বনিময় কোন প্রাচীন শ্যাওলাধরা কুয়ায়—জানি না।