ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্যবাদী যাত্রা (দ্বিতীয় পর্ব)

পূর্ব প্রকাশের পর…

আওরঙ্গজেব পরবর্তী ভারত

ভারতবর্ষে সম্রাট জহিরুদ্দিন বাবরের হাতে যে প্রবল প্রতাপশালী মোগল সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছিল ১৭০৭ সালে বাদশাহ আওরঙ্গজেব আলমগীরের ইন্তেকালের মাধ্যমে তার পতনদশা শুরু হয়ে যায়। আওরঙ্গজেবের শেষ সময়টুকু স্বস্তির ছিল না। মোগলবিরোধী দেশীয় নানা শক্তির বিরুদ্ধে তাকে সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে। শিখ-মারাঠা ও জাঠ লুটেরা শক্তিগুলো মোগল সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছিল। আওরঙ্গজেব তার নিষ্ঠা, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতা দিয়ে এদের বিরুদ্ধে সফল লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। শিখ শক্তিকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছিলেন। যদি পরবর্তী প্রজন্ম তার মতোই সাহসী ও বিচক্ষণ হতো তবে ভারতের মাটিতে শিখদের চিরখাতেমা হয়ে যেত। মারাঠাদের তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে না পারলেও সফলভাবে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। আলমগীর রহ. এর ইন্তেকালের পর এরা প্রত্যেকেই পূর্বের চেয়ে বহুগুণে দুঃসাহসী হয়ে ওঠে। শিখদের নৃশংসতা আর মারাঠাদের লুটতরাজ বেড়ে যায়। মারাঠা যোদ্ধারা দক্ষিণ ভারতের সীমানা পেরিয়ে উত্তর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তাদের নিষ্ঠুর ধ্বংসালীলায় কেঁপে ওঠে মোগল-নিয়ন্ত্রিত জনপদগুলো।

ওদিকে আওরঙ্গজেবের সন্তানরা নেমে পড়ে সিংহাসন দখলের এক মরণঘাতী লড়াইয়ে। অল্প সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন ময়ুর সিংহাসনে বসেন, অপসৃত হন। কেউ কয়েক মাসের জন্য, কেউ কয়েক দিনের জন্য। ১৭১৯ সালে দিল্লির মসনদে বসেন মুহাম্মদ শাহ। তার শাসনকাল সময়ের পরিমাণে কিছুটা দীর্ঘ (১৭১৯-৪৮) হলেও ব্যর্থতার খতিয়ান ছিল আরও বহুগুণে বেশি। রাজপরিবারে পালিত মুহাম্মদ শাহর রাজ্যশাসনের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক ছিল না। তিনি আমির-উমারাদের উপর শাসনভার সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে ভোগের সাগরে আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছিলেন। নারীদের মতো কাপড় পরতেন। রং-তামাশায় এত বেশি খ্যাতি লাভ করেছিলেন যে, তার নাম পড়ে যায় রঙিলা! অবশ্য বিশ্লেষকদের মতে, তিনি চাইলেও শক্ত হাতে রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না। সেই যোগ্যতাই তার ছিল না। দুর্বলতা ছিল তার প্রকৃতিজাত। তাই সে চেষ্টাটুকুও করেননি।

রাষ্ট্রপ্রধানের যখন এই হাল তখন দরবারি আমির-উমারা তার সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা করবে, এই তো স্বাভাবিক। হলোও তাই। আমিররা হয়ে উঠল দরবারের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা। এরমধ্যে ইরানি-তুরানি আমিররা দুইভাগ হয়ে দরবারকে করে তুলল আরও অশান্ত। সুযোগ নিতে ছাড়ল না আঞ্চলিক শাসকরাও। ১৭২৪ সালে নিজামুল মুলক মুহাম্মদ শাহর অনুমতি ছাড়াই দাক্ষিণাত্যের পূর্বাঞ্চলে বংশীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন এবং হায়দারাবাদকে কেন্দ্র বানিয়ে রাজ্য শাসন করতে থাকেন। একই সময় শিয়া মতাবলম্বী সাআদাত খান এবং তার ভাগিনা ও জামাতা সফদর জং মিলে ফৈজাবাদকে কেন্দ্র করে অযোধ্যায়—যা বর্তমান উত্তর প্রদেশের অধিকাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত—আরেক আঞ্চলিক শাসন গড়ে তুলেন। তারা যদিও শাসন চালাতেন মোগল সম্রাটের নাম ব্যবহার করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ছিলেন স্বাধীন। বাংলায় মুর্শিদকুলিখানও নামমাত্র মোগল সালতানাতের অধীনে থেকে কার্যত স্বাধীন নবাবিব্যবস্থার সূচনা করেন। এই যখন পরিস্থিতি তখন দিল্লির উপর নেমে আলো আরেক কেয়ামত। যা শুধু দিল্লির ভবিষ্যত ও রাজনীতিই বদলে দেয়নি, সুযোগসন্ধানী ইউরোপিয়ান শক্তিগুলো, বিশেষ করে ব্রিটিশদের জন্যও বাণিজ‌্য ছেড়ে রাষ্ট্র শাসনের পথ দেখিয়ে দিয়ে যায়। সেই কেয়ামতের নাম—নাদির শাহ!

নাদির শাহর অভিযান

খোরাসানে জন্মগ্রহণকারী নাদির বংশত এক সাধারণ মেষপালক ও পশম ব্যবসায়ীর ছেলে। নজিরবিহীন সামরিক দক্ষতার ফলে অল্প সময়ে সাফাভিদ সেনাবাহিনীতে উচ্চতর পদ লাভ করেন। সুগঠিত ও শক্তিশালী দেহ, তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি আর স্বভাবে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম। নেতৃত্ব ও বীরত্বের নানা বৈশিষ্ট্যে ছিলেন অনন্য। নিষ্ঠুরতায় ছিলেন প্রবাদতুল্য। ১৭৩২ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তিনি পারস্যের সিংহাসন দখল করেন এবং শিশু শাহজাদাকে হত্যা করে ২০০ বছরের সাফাভি সাম্রাজ্যের ইতি টানেন। এর সাত বছর পর ১৭৩৯ সালে তিনি মোগল-ভারত আক্রমণ করেন। দিল্লি থেকে ১০০ মাইল দূরে কর্ণালে তিনটি মোগল বাহিনীর সম্মিলিত প্রায় দশ লাখ সৈন্যের বাহিনীকে পরাজিত করেন। বাদশাহ মুহাম্মদ শাহকে নৈশভোজের কথা বলে ডেকে নিয়ে বন্দী করেন। এরপর দিল্লির উপর নামিয়ে আনেন কেয়ামতের ভয়াবহতা! প্রায় এক লাখ মানুষ তার সৈন্যদের হাতে নিহত হয়। নাদির শাহর নির্দেশনা ছিল, কেউ প্রতিরোধের চেষ্টা করলেই তাকে হত্যা করা হবে। নর্দমাগুলোতে রক্তের স্রোত বইতে থাকে। পথেঘাটে ছড়িয়ে থাকে মৃতদেহ, যেন বাগানে পায়ে চলার পথে মৃত ফুল ও পাতা ছড়িয়ে আছে। বাড়িঘর লুট করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আটদিন পর্যন্ত চলে এই ধ্বংসলীলা। অবশেষে নিজামুল মুলক মাথার পাগড়ি খুলে হাত বেঁধে হাঁটুগেড়ে বসে নগরবাসীর প্রাণভিক্ষা চাইলে এই ধ্বংসলীলা বন্ধ হয়। শর্ত হয়, দিল্লি ছেড়ে যেতে নাদির শাহকে দিতে হবে ১০০ কোটি রুপি (বর্তমান মূল্যে ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং)। এছাড়াও নাদির শাহ সঙ্গে করে নিয়ে যায় মোগলদের গৌরব ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূর হীরা, তৈমুরের বিখ্যাত পদ্মরাগমণি, বিপুল স্বর্ণ-রূপা ও বহুমূল্য পাথর। একটিমাত্র অভিযান নাদির শাহকে করে তুলে ‍বিপুলা সম্পদের মালিক, আর মোগল ঐশ্বের্যের গৌরব ধূলোয় মিশিয়ে দেয়। এসময় নিজামুল মুলক এবং সফদর জঙ্গ দিল্লিতে খাজনা পাঠানো বন্ধ করে দেন। ফলে সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ দেওলিয়া হয়ে যায়। রাজকীয় জিনিসপত্র বেচাবিক্রি শুরু হয়।

ইউরোপিয়ান বণিকদের তৎপরতা

এই পুরো প্রক্রিয়াটি কলকাতা ও মাদ্রাজে বসে দেখছিল দুই ইউরোপিয়ান শক্তি ব্রিটিশ ও ফরাসি। আওরঙ্গেজেবের মৃত্যুর পরই তাদের আচরণ উদ্ধত ও বেপরোয়া হয়ে ওঠেছিল। নাদির শাহ যেন তাদের পথ দেখিয়ে দিয়ে যায়। নাদির শাহ শুধু লুটতরাজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও তারা এবার ভারত শাসনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। তবে তাদের এই স্বপ্নজয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল কর্ণাটকের লড়াই।

ইউরোপিয়ান বণিকদের মধ্যে সবার পরে ভারতে আসে ফরাসিরা। তারা ১৬৬৪ খৃস্টাব্দে উষ্ণ বালুকাময় করোমণ্ডল উপকূলে মাদ্রাজের দক্ষিণ দিকে ৮৬ মাইল দূরে পন্ডিচেরিতে প্রথম ঘাঁটি ও উপনিবেশ তৈরি করে। নাদির শাহ যখন ভারত লুট করছে তখন পন্ডিচেরিতে বসে জোসেফ ফ্রাঙ্গো ডুপ্লে নিবিড়ভাবে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। পরে ১৭৪২ সালে সে পন্ডিচেরির গভর্নর এবং ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডাইরেক্টর জেনারেল নির্বাচিত হয়। ডুপ্লের মনের দীর্ঘদিনের খায়েশ, ভারত থেকে ব্রিটিশদের চিরতরে বিদায় করে ফরাসিদের একক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। নাদির শাহর আক্রমণের পর তার মনে রাজ্য শাসনের ইচ্ছাও চাগিয়ে ওঠে। ১৭৪২ সালে সে পন্ডিচেরির গভর্নর নির্বাচিত হয়ে বাংলার ঘাঁটি চন্দননগরে নিয়ে আসে। মোগল দরবারে আবেদন করে, তাকে যেন পাঁচ হাজার অশ্বারোহী বাহিনীর ক্ষমতাসম্পন্ন নবাব পদমর্যাদা এবং পন্ডিচেরির ফরাসি ঘাঁটিতে মুদ্রা তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। উভয় আবেদন সঙ্গে সঙ্গে মঞ্জুর হয়ে গেলে ডুপ্লে বুঝতে পারে, নাদির শাহর হামলা মোগল কর্তৃত্বকে কতখানি দুর্বল করে দিয়েছে। ডুপ্লে দ্রুত স্থানীয় অধিবাসী তামিল তেলেগু ও মালায়লামি যোদ্ধাদের বাছাই করে সৈন্যবাহিনীর দুটি রেজিমেন্ট গঠন করে এবং তাদের ইউরোপিয় কায়দায় প্রশিক্ষিত করে তুলে।

কর্নাটকের প্রথম যুদ্ধ

১৭৪০ সালে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকারের যুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেন অস্ট্রিয়ার পক্ষে এবং ফ্রান্স বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এভাবে তারা নিজেরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে ভারতে। ব্রিটিশ নৌবহর হামলা চালিয়ে ফরাসিদের কয়েকটি জাহাজ দখল করে নেয়। কর্ণাটকের নবাব আনওয়ারুদ্দীনের হস্তক্ষেপে পন্ডিচেরি ব্রিটিশ আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। পরে ডুপ্লে নবাবের অনুমতি নিয়ে মাদ্রাজে পাল্টা আক্রমণ করে। নবাব শর্ত দিয়েছিলেন, মাদ্রাজ জয় করে তার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ডুপ্লে শর্তে রাজি হয়ে মাদ্রাজ আক্রমণ করে এবং দখল করে ফেলে। ইংরেজরা পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মাদ্রাজ ছেড়ে আশ্রয় নেয় সেন্ট ডেভিড দুর্গে। ডুপ্লে সেখানেও তাদের পিছু ধাওয়া করে। কিন্তু ব্রিটিশরা বীর বিক্রমে সেই আক্রমণ প্রতিহত করে। ফলে ডুপ্লেকে মাদ্রাজ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।

যুদ্ধ শেষে ডুপ্লে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং মাদ্রাজ নবাবের হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করে। ক্ষিপ্ত নবাব ছেলে মাহফুজের নেতৃত্বে ডুপ্লের বিরুদ্ধে সেনাভিযান পাঠান। কিন্তু নবাবের বাহিনী ডুপ্লের হাতে প্রচন্ড মার খেয়ে ফিরে আসে। আরও একটি বিজয় ডুপ্লের পদচুম্বন করে। এই বিজয় ডুপ্লের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা বিজয়ী হতে পারে, এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ডুপ্লে গোটা ভারতে ফরাসি শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ফিরে ফিরে দেখতে শুরু করেন।

১৭৪৮ সালে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মাঝে সন্ধি স্থাপিত হলে মাদ্রাজ ব্রিটিশদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হয়। ডুপ্লে দুই রেজিমেন্ট সৈন্য বসিয়ে না রেখে তাদের আশপাশের বিভিন্ন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ঝগড়ায় ভাড়া দিতে শুরু করে। একই কাজ করে ব্রিটিশরাও। বিনিময়ে তারা লাভ করে প্রভাব, অর্থ বা ভূমির মালিকানা।

কর্নাটকের দ্বিতীয় যুদ্ধ 

১৭৪৮ সালে নিজামুল মুলক মারা গেলে তার ছেলে নাসির জঙ্গ ও নাতি মুজাফফর জঙ্গের মধ্যে শুরু হয় সিংহাসন দখলের লড়াই। একই সময় কর্ণাটকের নবাবী নিয়েও সাবেক নবাব আনওয়ারুদ্দীনের ছেলে মুহাম্মদ আলি ও চান্দা সাহেবের মাঝে যুদ্ধ বাঁধে। এই যুদ্ধেও ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী দুই পক্ষ নেয়। ইংরেজরা ছেলে নাসির জঙ্গ ও মুহাম্মদ আলি এবং ফরাসিরা নাতি মুজাফফর জঙ্গ ও চান্দা সাহেবের পক্ষ নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করে। ৪৯-৫৪ পর্যন্ত চলে এই যুদ্ধ। চূড়ান্ত পরিণতিতে ইংরেজরা জয়ী হয়। ফরাসিরা হেরে যায়। ডুপ্লেকে বরখাস্ত এবং বন্দী করা হয় এবং অত্যন্ত অপমানিত অবস্থায় ফ্রান্সে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এই যুদ্ধেই রবার্ট ক্লাইভের সৌভাগ্যরবি জ্বলজ্বল করে ওঠে। ক্লাইভের জন্ম ইংল্যান্ডের এক দরিদ্র, কিন্তু অভিজাত পরিবারে। ১৩ ভাইবোনের মধ্যে ক্লাইভ সবার বড়। অল্প বয়সেই তার ডানপিটে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে প্রতিবেশীসহ সকলে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এলাকার সববয়সী ছেলেদের নিয়ে এক মাস্তান গ্রুপ তৈরি করে সে বাজারে চাঁদাবাজি শুরু করে। পরিবার তাকে শোধরানোর সকল প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে পাঠিয়ে দেয় ভারতে। কোম্পানির একজন সাধারণ কেরানি হিসেবে শুরু হয় ক্লাইভের ভারত-জীবন। কিন্তু এই জীবনে ক্লাইভ মোটেও সন্তুষ্ট ছিল না। নিঃসঙ্গ ও নিস্তরঙ্গ জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। কর্ণাটকের যুদ্ধ ক্লাইভের সৌভাগ্যের দরজা খুলে দেয়। দুর্দমনীয় সাহস আর ঝুঁকি গ্রহণের সহজাত প্রবৃত্তি তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে এক অপ্রতিরুদ্ধ বীর হিসেবে উপস্থিত করে। অমিত সাহস আর কৌশলী রণপ্রজ্ঞায় সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। ডুপ্লের দুর্ভাগ্য আর ক্লাইভের সৌভাগ্য একইসঙ্গে দেখা দেয়। ডুপ্লেকে ভারতের রঙ্গমঞ্চ থেকে সরিয়ে ক্লাইভের সেখানে রাজকীয় প্রবেশ ঘটে। ১৭৫৩ সালে ক্লাইভ বিয়ে করে এবং স্ত্রী ও বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে দেশে ফেরে। ইচ্ছা ছিল বাকি জীবন রাজনীতি করে কাটাবে। ভারতে ফেরার কোনো অভিলাষ তার ছিল না। কিন্তু রাজনীতিতে তার সিঁকে ছেড়েনি। বিপুল অর্থ খরচ করেও সংসদে আসন লাভ করতে ব্যর্থ হয়। ১৭৫৫ এর পরিস্থিতি তাকে পুনরায় ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

ইউরোপের সাত বছরের যুদ্ধ ও পলাশী যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

১৯৫৫ সাল। ইউরোপে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মাঝে যুদ্ধের সম্ভাবনা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠলে কোম্পানির ডাইরেক্টররা ভারতে কোম্পানির কুঠিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ডাক পড়ে রাজনীতিতে ব্যর্থ লর্ড ক্লাইভের। তাকে মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট ডেভিডের গভর্নর পদ এবং একটি বেসামরিক সেনাবাহিনীর প্রধান করার প্রস্তাব করা হয়। যেখানে তাকে স্থানীয়দের থেকে সিপাহী নিয়োগ, প্রশিক্ষণদান এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। ক্লাইভ প্রস্তাবটি লুফে নেয়। কারণ রাজনীতি করে ইতিমধ্যে সে সর্বস্ব হারিয়েছে। প্রাপ্তির খাতা শূন্য। এখন নতুন করে টাকা করতে হলে পুনরায় ভারতে ফিরে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু কোম্পানির ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্য শুধু তার উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে পারছিল না। কারণ তাদের অনেকের বিনিয়োগ আছে কোম্পানিতে। ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধলে কোম্পানির বেসামরিক বাহিনী তাদের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারবে, এই আস্থা তারা ক্লাইভের উপর রাখতে পারছিল না। তাই ব্রিটিশরাজের নিয়মিত বাহিনীর একটি অংশকেও সঙ্গে দেওয়ার জন্য তারা গোঁ ধরে। ফলে এডমিরাল ওয়াটসনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একটি অংশও পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

এই বাহিনী ভারতে এসে ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবার আগেই বাংলা থেকে সংবাদ আসে, কাশিমবাজার ও কলকাতা বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পদানত হয়েছে। বহু ইংরেজ মারা পড়েছে সে যুদ্ধে। ক্লাইভ-ওয়াটসনজুটি ফরাসিদের রেখে আপাতত বাংলার উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়। সে গল্পে যাওয়ার আগে সংক্ষেপে এর প্রেক্ষাপট একটু জেনে নিই :

১৭৪০ সালে পাটনার নাজেম আলিবর্দী খান বাংলার বিখ্যাত অর্থ কারবারি পরিবার জগৎশেঠ ও দরবারের অন্যান্য অভিজাতদের সহযোগিতায় এক সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বাংলা-বিহার-ওড়িষ্যার নবাব সরফরাজ খানকে সরিয়ে নবাবি দখল করেন। তার ক্ষমতাদখলের পরই বাংলায় শুরু হয় বর্গি আক্রমণ। মারাঠা বর্গি দস্যুরা হিংস্র আক্রোশে বাংলার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফসলের মাঠ, লোকজনের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। হত্যা করে নারী-পুরুষ যুবক-শিশু নির্বিশেষে বহু মানুষ। তাদের নৃশংসতায় কলুষিত হয় বাংলার নির্মল প্রকৃতি। আলিবর্দী খান তার স্বভাবজাত বিচক্ষণতা, রণকৌশল এবং কূটনৈতিক দক্ষতায় বর্গি হামলা নিয়ন্ত্রণে সফল হন। এক্ষেত্রে বাংলার অভিজাত শ্রেণি এবং জগৎশেঠ গং-কে তিনি সফলভাবে ব্যবহার করেন। বর্গি আপদ দূর হলে তিনি বাংলাকে গড়ে তোলবার কাজে মনোনিবেশ করেন এবং সেখানে স্বাধীন শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেন। দিল্লিতে খাজনা পাঠানো বন্ধ করে দেন। এর মাধ্যমে কেন্দ্রের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বর্গি আক্রমণ যেখানে বাংলার জন্য অভিশাপ হয়ে এসেছিল সেখানে কোম্পানির জন্য এই ঘটনা ছিল আশির্বাদতুল্য। বর্গি হামলায় বিপর্যস্ত মানুষ দলে দলে কোম্পানি-নিয়ন্ত্রিত কলকাতা শহরে এসে ভীড় করে। ইউরোপের বন্দুকদারী সৈন্যদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস বর্গি দস্যুদের ছিল না। শহরের চারপাশজুড়ে বিস্তৃত পরিখাও তাদের পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে ছিল। ফলে কলকাতা বর্গি হামলা থেকে বেঁচে যায় এবং নিরাপত্তাকামী জনসাধারণের জন্য হয়ে ওঠে নিরাপদ আশ্রয়। তাছাড়া প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নানা কারণে ব্যবসায়ী ও অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য কলকাতা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেছিল, সেকথা পেছনে বলেছি। ১৭১৭ সালে মোগল সম্রাট ফররুখ সিয়ার তাদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি দিলে শহরটি ভারতের শ্রেষ্ঠ বাণিজ‌্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। জৌলুস ও সমৃদ্ধিতে ক্রমেই ফুলেফেঁপে ওঠে। গড়ে উঠে মসজিদ-মন্দিরসহ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নানা প্রতিষ্ঠান। বহু সংস্কৃতির লীলাভূমিতে পরিণত হয় কলকাতা। 

কিন্তু শহরের নিরাপত্তাব্যবস্থা বাস্তবে অত উন্নত ছিল না। ফোর্ট ইউলিয়ামের দেয়াল অনেক জায়গায় ভেঙে পড়েছিল। কামানগুলোতে লেগেছিল জং। অস্ত্র-বারুদ এবং সেনাবাহিনীও ছিল অপ্রতুল। ইউরোপে যখন ব্রিটেন-ফ্রান্স যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে তখন ১৭৫৫ এর নভেম্বরের শুরুর দিকে একদিন দেখা যায়, ফ্রান্সের লোরিয়েঁ বন্দর থেকে ১১ টি জাহাজ বন্দর ত্যাগ করেছে। কোম্পানির ডাইরেক্টররা গোয়েন্দা মারফত সংবাদ পেয়ে ধরে নেন, জাহাজগুলো ভারতেই যাচ্ছে। আত্মরক্ষার তাগিদে তারা কলকাতার উদ্দেশ্যে ৫৯ টি কামান এবং গভর্নর ড্রেকের জন্য নির্দেশনা পাঠান, নবাবের অনুমতি নিয়ে দ্রুত যেন কলকাতা দুর্গের সংস্কার ও শক্তিশালীকরণের কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু ড্রেক অনুমতির তোয়াক্কা করার প্রয়োজন মনে করেনি। মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা নদীপথে তিন দিনের পথ। এত দূরে বসে নবাব সংবাদ পাওয়ার আগেই কাজ সম্পন্ন করে ফেলব, এই ছিল তার পরিকল্পনা। 

১৭৫৬ সালে সে নবাবের অনুমতি ছাড়াই দুর্গ সংস্কারের কাজ শুরু করে। কিন্তু নবাব তার শক্তিশালী গোয়েন্দা মারফত সংবাদ পেয়ে যান। তিনি একসঙ্গে কলকাতা-কাশিমবাজার ও চন্দননগর সব জায়গায় সংবাদ পাঠান, দ্রুত যেন কাজ বন্ধ করা হয় এবং যেটুকু দেয়াল তোলা হয়েছে তা ভেঙে দেওয়া হয়। ফরাসিরা স্থানীয় মোগল কর্তাদের ঘুষ দিয়ে নির্মিত অংশ ভেঙে ফেলা থেকে বাঁচিয়ে নিলেও কলকাতার গভর্নর ড্রেক সরাসরি বিদ্রোহ করে। সে নবাবকে চিঠি লিখে জানায়, আমরা নতুন কোনো স্থাপনা তৈরি করছি না। বরং ভেঙে পড়া অংশ সংস্কার করছি মাত্র। এটুকু করার অধিকার আমাদের রয়েছে। নবাব তাকে পুনঃ সতর্ক করেন এবং নারায়ন সিংহকে তার কাছে পাঠান। ঢাকার নায়েব রাজবল্লভের ছেলে কৃষ্ণবল্লভকেও ফেরত পাঠাতে বলেন, ড্রেক যাকে কলকাতায় আশ্রয় দিয়ে রেখেছিল। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার রাজস্বের বহু অর্থ নিয়ে সে পালিয়ে গেছে। নারায়ণ সিংহের জবাব নিয়ে আসার আগেই আলিবর্দী খান দুনিয়া ছেড়ে চলে যান। তার শেষ ইচ্ছা হিসেবে বাংলার নবাব হন নাতি সিরাজউদ্দৌলা ।

ষড়যন্ত্রের কবলে বাংলার স্বাধীনতা

সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের বৈরি সম্পর্ক ছিল নানা কারণেই। কোম্পানির বিনা শুল্কে বাণিজ্য বাংলার নবাবরা পছন্দ করতেন না। কলকাতা-কাশিমবাজার থেকে পাটনা পর্যন্ত গঙ্গাবক্ষে কোম্পানির নৌকা অবাধে যাতায়াত করবে, নবাবী চৌকিতে একটি টাকাও মাশুল দেবে না, এ ছিল স্বাধীনচেতা নবাবদের সহ্যের বাইরে। মুর্শিদকুলি থেকে শুরু করে বাংলার সকল নবাব এই সিদ্ধান্তের প্রতি বিরক্ত ছিলেন। মোগল বাদশাহর ফরমান বলে যদিও তা হজম করতে হতো। কিন্তু কোম্পানি শুধু এটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কোম্পানির বহু কর্মচারী ব্যক্তিগত ব্যবসা করত। তারাও নবাবকে কর দিতে চাইত না। এদের আশ্রয় দিত কলকাতার গভর্নর ড্রেক। কৃষ্ণবল্লভকেও সেই আশ্রয় দিয়েছিল। এসব কারণে আগে থেকেই সিরাজ কোম্পানির উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন। নবাব হওয়ার পর রীতিমাফিক অন্যান্য ইউরোপিয় বণিকরা তাকে উপঢৌকনসহ অভিনন্দন জানালেও ইংরেজ বণিকরা তা থেকে বিরত থাকে। যা ছিল নবাবের প্রতি তাদের বিরোদ্ধ মনোভাবের সুস্পষ্ট প্রকাশ।

নবাব হওয়ার পরপরই সিরাজকে নবাবী রক্ষার যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে হয়। তার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছিল দরবারের অভিজাতমহল এবং ব্যবসায়ীদের একটি দল। নানা কারণে যারা তার প্রতি ক্ষিপ্ত ছিল। বাংলাকে দিল্লি কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার পর বাংলার নবাবকে আঞ্চলিক বিভিন্ন শক্তি, জমিদার, ব্যবসায়ী ও অভিজাত মহলের প্রতি নির্ভরতা সৃষ্টি করতে হয়। আলিবর্দী বিষয়টিকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। সিরাজ সে যাত্রায় সফল হতে পারেননি। ফলে অভিজাত শ্রেণিটির সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই তালিকায় প্রথমেই আসে জগৎশেঠ পরিবারের সদস্য মহতাব রায় ও স্বরূপ চাঁদের নাম। জগৎশেঠদের পিতৃভূমি যোধপুরের নাগর অঞ্চলে। মোগল সম্রাট ১৭২২ সালে তাদের জগৎশেঠ উপাধিতে ভূষিত করেন। মুর্শিদকুলি খান এদের নিয়ে আসেন বাংলায়। এরা টাকশাল পরিচালনা, সোনা-রূপা ও হুন্ডি ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। তারা নবাব থেকে টাকশাল ইজারা নিত। রূপা ইত্যাদি কিনে রুপি তৈরি করত। এই বাজার তারা একচেটিয়া দখলে রেখেছিল। পরবর্তীতে ইংরেজরা নবাবের থেকে টাকশাল বসানোর অনুমতি পেলেও পলাশী যুদ্ধের আগ পর্যন্ত তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি শুধু জগৎশেঠদের কারণে। এদের তুলনা করা হয় ইউরোপের বিখ্যাত ধনকুবের পরিবার রথসচাইল্ডের সঙ্গে। আওরঙ্গজেব পরবর্তী ভারতের পরিস্থিতি যখন সঙ্কটময় হয়ে ওঠে, পথ হয়ে যায় অনিরাপদ তখন মুর্শিদকুলি খান এদের মাধ্যমে হুন্ডি করে দিল্লিতে রাজস্ব পাঠাতেন। নানা কারণে এরা নবাব সিরাজের উপর ক্ষিপ্ত হয় এবং কোম্পানিকে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যবহার করার প্রয়াস পায়।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে দ্বিতীয় প্রধানতম ব্যক্তি ছিল উমিচাঁদ। সে কলকাতায় ব্যবসা করত। তার একান্ত খায়েশ ছিল জগৎশেঠদের সঙ্গে সমমর্যাদায় তার নাম উচ্চারিত হবে। কিন্তু জগৎশেঠের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো অবস্থান তার ছিল না। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে সে ছিল সিরাজের খালা ঘসেটি বেগমের দলে। কৃষ্ণদাস কলকাতায় পালিয়ে এলে তার কথাতেই ইংরেজরা তাকে আশ্রয় দেয়।

ষড়যন্ত্রীদের মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম রায়দুর্লভ। নবাব দরবারের একজন বিশিষ্ট দরবারী। উচ্চাবিলাসী এবং ধূর্ত। উচ্চাবিলাস আর চরম লোভ তাকে ষড়যন্ত্রীদের দলে টেনে নেয়। মির জাফর এই দলে যোগ দেন একটু পরে। তার কথা যথাস্থানে আসবে।

কিছু স্বার্থের সংঘাত, কিছু প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান ইত্যাদি নানা কারণে সিরাজের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যার সূচনা ছিল নবাব আলিবর্দী খানের জীবদ্দশাতেই। আলিবর্দী খান পরবর্তী নবাব হিসেবে সিরাজের নাম ঘোষণা করলে অনেকেই তা মেনে নিতে পারেনি। নবাবীর অন্যতম দাবিদার ছিলেন সিরাজের খালু নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান এবং পূর্ণিয়ার শাসক শওকত জং। দরবারে নওয়াজিশ মুহাম্মদ খানের পাল্লাই ভারি ছিল। ঢাকার নায়েব রাজবল্লভও ছিল তার সপক্ষে। তবে মির জাফর পক্ষে ছিল না। নওয়াজিশ মারা যান আলিবর্দীর জীবদ্দশাতেই। তার নায়েব হোসেন কুলি খানও নিহত হন। এবার বিরোধীরা সমর্থন দেন নওয়াজিশ মুহাম্মদের স্ত্রী ঘসেটি বেগমকে। কিন্তু ঘসেটি বেগম তেমন সুবিধে করতে পারেননি। নবাবি লাভ করেই সিরাজ খালা ঘসেটি বেগমকে বন্দী করেন। কুচক্রি দলটি তখন এগিয়ে যায় পূর্ণিয়ার শাসক শওকত জঙ্গের সমর্থনে। সিরাজ নবাবী লাভ করেই পথের কাঁটা শওকত জঙ্গকে সরাতে পূর্ণিয়ায় অভিযান প্রেরণ করেন। শওকত জঙ্গের পতন হয়। একটি গুলি তার চোখে ঢুকে ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়।

নবাব-ইংরেজ যুদ্ধ

নবাব তখনো পূর্ণিয়ায়। কলকাতা থেকে নারায়ণ সিংহ ফিরে আসেন। জানান, গভর্নর ড্রেক তাকে বন্দী করে অপমান করেছে। এরপর সাক্ষাৎ না দিয়েই কলকাতা থেকে বের করে দিয়েছে। পূর্বোক্ত কারণগুলো তো ছিলই, তার মধ্যে এই নতুন বেয়াদবি। নবাব এবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, ইংরেজদের একটা উচিত শিক্ষা দিতেই হবে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে কাশিমবাজারে অভিযান প্রেরণ করেন। পরে নিজেও তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। নবাবের বাহিনী কাশিমবাজার কুঠি অবরোধ করলে কুঠির প্রধান ওয়াটস প্রমাদ গুনে। আত্মসমর্পন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ দেখতে পায় না। নিজেকে নবাবের গোলাম দাবি করে পায়ে পড়ে ক্ষমা ভিক্ষা চায়।

কাশিমবাজার অবরোধ চলাকালে সিরাজ পুনরায় ড্রেকের কাছে বার্তা পাঠান, বাংলায় শান্তিতে থাকতে চাইলে সকল স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে, পরিখা ভরাট করে ফেলতে হবে এবং মুর্শিদকুলি খানের সময় যেসব শর্তে বাণিজ্য করতে সেই শর্তেই বাণিজ্য করতে হবে। নিষ্কর বাণিজ‌্য আর চলবে না। কিন্তু রগচটা ড্রেক সেই চিঠির জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। উল্টো উমিচাঁদ ও কৃষ্ণবল্লভকে বন্দি করে। কারণ ড্রেকের সন্দেহ হয়, উমিচাঁদই নবাবকে পথ দেখিয়ে এনেছে। যদিও এতটা ঈমানদার উমিচাঁদ কখনোই ছিল না। কাশিমবাজার জয় করেই সিরাজ কলকাতা জয় করতে বের হন। অস্বাভাবিক দ্রুততায় ড্রেকের কল্পনাকে হার মানিয়ে ৭০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে সিরাজ কলকাতা দুর্গের কড়া নাড়েন। ড্রেক প্রতিরোধের চেষ্টা করেও যখন বুঝতে পারল জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম, তখন গোপনে জাহাজে চেপে পালানোর পথ খুঁজে। কলকাতা সিরাজের পদানত হয়। উমিচাঁদ ও কৃষ্ণবল্লভ মুক্তি পায়। তিনি কলকাতার নতুন নামকরণ করেন আলিনগর। মানিকচাঁদকে কলকাতার শাসনভার দিয়ে তিনি মুর্শিদাবাদ ফিরে আসেন।

পরে এই ঘটনা নানা অতিরঞ্জিত বর্ণনায় মথিত হয়ে ইতিহাসের নামে ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, নবাব জীবিত দেড়শতাধিক ব্রিটিশ সৈন্যকে মাত্র ১৮ বাই ১৮ ফুট দৈর্ঘ‌্যের এক কামরায় বন্দী করে রেখেছিলেন। সন্ধ্যা সাতটা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত সেখানে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে থেকে তাদের অধিকাংশ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই ট্রাজেডির নাম দেওয়া হয় অন্ধকূপ হত্যাকান্ড। যদিও ঐতিহাসিকগণ এই ঘটনার সত্যতাকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

এই সংবাদ মাদ্রাজে পৌঁছলে কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের মাথায় হাত ওঠে। কলকাতার মতো এমন সম্ভাবনাময় বাণিজ‌্যকেন্দ্র হারানোর কথা তারা ভাবতেও পারে না। স্বাভাবিক অবস্থায় হয়তো তারা সিরাজের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করত। ক্ষমা চেয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের তদবির করত। কিন্তু ততদিনে ক্লাইভ ও ওয়াটসনের বাহিনী মাদ্রাজে পৌঁছে গেছে। তাই কোম্পানি আলোচনার পাশাপাশি রণপ্রস্তুতিও সঙ্গে রাখার সিদ্ধান্ত নিলো। ক্লাইভ ও ওয়াটসনকে মাদ্রাজ ছেড়ে দ্রুত কলকাতা রওনা হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। ওয়াটসন শুরুতে মাদ্রাজকে ফরাসিদের হুমকির মুখে রেখে যেতে রাজি হলেও শেষ পর্যন্ত যেতে বাধ্য হয়। তাদের উপর নির্দেশ ছিল, কোনো যুদ্ধ নয়, নবাবের সঙ্গে সন্ধি করে শুধু ক্ষতিপূরণ আদায় এবং নিষ্কর বাণিজ‌্যের অনুমতি পুনরুদ্ধার করতে হবে। তবে প্রয়োজনে যুদ্ধ বা শত্রুর সঙ্গে হাত মেলানো যেতে পারে।

মানিকচাঁদের বিশ্বাসঘাতকতায় ১৭৫৭ সালের ২রা জানুয়ারি ক্লাইভ কলকাতা পুনরুদ্ধার করে এবং সিরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। সিরাজউদ্দৌলা তার বাহিনী নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে এগিয়ে আসেন। কলকাতা পৌঁছার আগে এডমিরাল ওয়াটসনের কাছে চিঠি লিখে সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। সিরাজ এসে পৌঁছলে ক্লাইভ সন্ধির আলাপের বাহানায় লোক পাঠায় সিরাজের তাঁবুতে। এরা গিয়ে মুসলিম বাহিনীর অবস্থান, সিরাজের তাঁবু সবকিছু চিহ্নিত করে আসে। রাতের আঁধারে তারা সিরাজের তাঁবু টার্গেট করে হামলা করে। সৌভাগ্যক্রমে সিরাজ তখন অন্য তাঁবুতে ছিলেন। তাই এ যাত্রায় বেঁচে যান। পরদিন দুই দলে প্রচণ্ড লড়াই হয়। কিন্তু প্রচণ্ড কুয়াশায় কেউ অপরপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি আন্দাজ করতে পারছিল না। ব্যাপারটা দুই দলের জন্যই ছিল অস্বস্তিকর। এরমধ্যে ক্লাইভের নিপুণ চক্রান্তে সিরাজের বাহিনীর ভেতরে বেশ কিছু গাদ্দার তৈরি হয়ে যায়। সিরাজ সেসব জানতেন। তিনি আবারও সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। ক্লাইভ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। সন্ধির শর্তমতে কোম্পানি তাদের দুর্গ মজবুত করার অনুমতি, পূর্ববৎ করমুক্ত বাণিজ‌্য করার সুযোগ এবং টাকশাল বসানোর অনুমতি পায়। আরও ‍চুক্তি হয়, সিরাজ যতদিন সন্ধির শর্ত মেনে চলবেন ব্রিটিশরা তার সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করবে। সিরাজ ও ক্লাইভের মাঝে সংগঠিত এই সন্ধি আলিনগরের সন্ধি হিসেবে খ্যাত হয়।

ক্লাইভ যখন সিরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে ইউরোপে তখন ব্রিটিশ-ফরাসি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সিরাজের সঙ্গে সন্ধি হয়ে যাওয়ার পর ক্লাইভ-ওয়াটসনের উপর নতুন নির্দেশ আসে, এবার ফরাসিদের বাংলা থেকে উৎখাতের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলায় ব্রিটিশ-ফরাসি সম্পর্ক শুরু থেকেই ছিল সৌহার্দ‌্যপূর্ণ। কলকাতা পতনের পর ফরাসিরা তাদের চন্দননগরে আশ্রয় দিয়েছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলাও চাচ্ছিলেন না ফরাসিরা বাংলা থেকে বিদায় হয়ে যাক। সিরাজের অসম্মতির কথা জানতে পেরে ক্লাইভও ইতস্তত করছিল। কিন্তু ওয়াটসনের গোয়ার্তুমিতে বাধ্য হয়ে তারা চন্দননগর আক্রমণ করে। সে আক্রমণ ঠেকানোর সক্ষমতা ফরাসিদের ছিল না। ফলে তাদের বাংলা থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যেতে হয়। ফরাসি দুর্গ পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে। 

বাংলায় ক্লাইভ-ওয়াটসনের অভিযান সফলভাবে শেষ হয়েছে। সমর ও কূটনীতি উভয়ক্ষেত্রে এসেছে সাফল্য। যদিও ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক ফায়দা তেমন হয়নি এবং এ নিয়ে তারা কিঞ্চিত অসন্তুষ্ট। বাংলার অঢেল ধনসম্পদ কিছুই তাদের করতলগত হবে না, এ যে সহ্যের বাইরে। কিন্তু সিরাজের সঙ্গে সন্ধি এবং ফরাসিদের উৎখাত করার পর বাংলায় আর করারও কিছু নেই। মাদ্রাজ দুর্গও অনিরাপদ পড়ে আছে। বর্ষা শেষ হলেই ওমুখো পথ ধরতে হবে। তবে যাওয়ার আগে নবাবকে ভয় দেখিয়ে হাতে রাখার স্বার্থে বাহিনীর একটা অংশ বাংলায় রেখে যেতে হবে। ক্লাইভ-ওয়াটসন বর্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। হয়তো ফিরে যেতও। কিন্তু এরমধ্যে বাংলার সম্পদসম্ভার নিজ থেকে তাদের হাতছানি দিতে শুরু করে। দরবারের ষড়যন্ত্রকারী অভিজাত গোষ্ঠীটি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। শওকত জঙ্গকে নিয়ে দেখা যে স্বপ্ন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে ইংরেজদের মাধ্যমে তারা তা পূরণ করতে চায়।

পলাশীর ষড়যন্ত্র

এই অভিজাত শ্রেণিটির মধ্যে রয়েছে নবাবের সেনাপতি মির জাফর, বিখ্যাত জগৎশেঠ পরিবার, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ প্রমুখ। এদের সবার লক্ষ্য একটাই: নবাব সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করা। উমিচাঁদের সঙ্গে যদিও ইংরেজদের সম্পর্ক ইতিমধ্যে তিক্ততায় রূপ নিয়ে ফেলেছে, কিন্তু সে ছিল জাত ব্যবসায়ী। ফলে ইংরেজদের সঙ্গে ঝামেলা জিইয়ে রেখে ব্যবসার এত বড় সম্ভাবনা রুদ্ধ করতে চাচ্ছিল না। মির জাফরের স্বপ্ন ছিল সবার চেয়ে ভিন্ন। সবচেয়ে বড়। সে নিজেই নবাব হতে চায়। ইরাকি বংশদ্ভূত এই অল্প শিক্ষিত সিপাহি আলিবর্দির আমলে মারাঠাদের বিরুদ্ধে এবং নবাব সিরাজের সঙ্গে কলকাতা যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। সে হিসেবে তার প্রত্যাশা ছিল, কলকাতার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হবে। কিন্তু সিরাজ তার পরিবর্তে হিন্দু মানিকচাঁদকে গভর্নর বানালে সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। উমিচাঁদ তাকে নবাব বানানোর প্রলোভন দিলে সহজেই সে দলে ভীড়ে যায়। যদিও আলিবর্দীর কাছে সে কোরআন হাতে নিয়ে শপথ করেছিল, কখনো সিরাজের পক্ষ ত্যাগ করবে না।

নবাব এখানে একটু ভুল করে ফেলেন। চুক্তির টাকা আনতে ওয়াটস যখন মুর্শিদাবাদে রওনা হবে নবাব উমিচাঁদকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। যেহেতু নবাব নিজ হাতে তাকে ইংরেজের বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিয়েছেন তাই তার প্রতি নবাবের আস্থা ছিল। কিন্তু তিনি জানতেন না, স্বার্থ ছাড়া উমিচাঁদ জগতে কিছুই চেনে না। ওয়াটস-উমিচাঁদ কলকাতায় বসে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে শুরু করে। চুক্তি হয়, ক্লাইভ যদি মিরজাফরকে নবাব হতে সহায়তা করে তাহলে পুরষ্কার হিসেবে ক্লাইভকে তিনি যুদ্ধের খরচ ছাড়াও ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা দেবেন। এর মধ্যে এক কোটি থাকবে ক্লাইভের নিজের, বাকিটা কলকাতার ক্ষয়ক্ষতি এবং ইউরোপীয় নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ বাবদ। পাশাপাশি তাদের বাংলায় জমির মালিকানা লাভ, ব্যক্তিগত টাকশাল স্থাপন এবং বিনাশুল্কে ব্যবসা করার অনুমতি দেবে। ক্লাইভ পৃথক দুটি চুক্তিপত্র তৈরি করে। এরমধ্যে উমিচাঁদের জন্য করা ‍চুক্তিপত্রটি ছিল জাল। বোকা উমিচাঁদ না বোঝে অর্থের লোভে এতে সাক্ষর করে। ২১ জুন সিরাজের বাহিনী পলাশীর প্রান্তরে এসে পৌঁছে। ক্লাইভের বাহিনীও এসে পৌঁছায়।

২৩ জুন ১৭৫৭। সেদিনের সকাল ছিল রোদ্দৌজ্জ্বল। আকাশ ছিল স্বচ্ছ আলো ঝলমলে। নবাব ও কোম্পানির বাহিনীর মাঝে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। নবাবের কামানের দায়িত্বে ছিল একদল ফরাসি যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ। নবাব বাহিনীর কামানের গোলা কোম্পানিকে যথেষ্ট পেরেশান করছিল। ক্লাইভ বাহিনীকে সরিয়ে নিয়ে আমবাগানের আড়ালে চলে যায়। দুপুর গড়াতেই শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টি। কোম্পানির সেনারা নিজেদের কামানগুলোকে তেরপল দিয়ে ঢেকে ফেলে। কিন্তু নবাব বাহিনীর কামান ভিজতে থাকে বৃষ্টিতে। ফলাফল: সবগুলি কামান অকেজো হয়ে যায়। ঝড় থামলে অশ্বারোহী দলের সেনাপতি নবাবের বিশ্বস্ত মির মদন তার বাহিনী নিয়ে কোম্পানির উপর হামলা করে। এবার কোম্পানির কামানগুলো একসঙ্গে গর্জে উঠে। বিপরীতে তাদের জবাব দেওয়ার মতো কোনো কামান সক্রিয় ছিল না। মির জাফর, রায়দুর্লভ নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে থাকে। মিরমদন বীরের মতো লড়াই করে মৃত্যুকুলে ঢলে পড়েন। এসময় মেজর কার্কপ্রেট্রিক ক্লাইভের অনুমতি ছাড়াই নবাবের কামানবহরের উপর হামলা চালিয়ে তা দখলে নিয়ে নেয়। ক্লাইভ শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে গ্রেফতারের হুমকি দেয়। কিন্তু এই ঘটনাই ইংরেজদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করে তোলে। মির মদনের মৃত্যুতে নবাব ভেঙে পড়েন। তিনি মিরজাফরকে সংবাদ পাঠালে সে জানায়, আমরা বিশ্বস্ততার সঙ্গে আপনার পাশে আছি। তবে আজকের মতো আর যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। একথা বলে সে বেরিয়ে যায় যায় এবং ক্লাইভকে চিঠি লিখে সব জানিয়ে দেয়। একটু পরে আসে রায়দুর্লভ। সে  নবাবকে পরামর্শ দেয়, আপনি মুর্শিদাবাদে ফিরে যান। বাকিটা আমরা দেখছি। এটিও ছিল পরিকল্পনারই অংশ। পরাজয়ের আগেই নবাবকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দিয়ে পরাজয় নিশ্চিত করার চক্রান্ত। নবাবের আরেক বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলাল এবং ফরাসিরা ‍যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু মিরমদনকে হারিয়ে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত নবাব রায়দুর্লভের কথা মেনে নেন। তিনি মুর্শিদাবাদ ফিরে যান।

সেদিন সূর্যাস্তের আগেই পলাশীর প্রান্তরে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। পরদিন মুর্শিদাবাদে সংবাদ পৌঁছুলে সিরাজ তার পরিবারসহ নিরাপদ আশ্রয়ের খুঁজে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি। গ্রেফতার হয়ে মির জাফরপুত্র মিরণের হাতে নিহত হন। ২৪ জুন ক্লাইভের সঙ্গে মির জাফরের সাক্ষাৎ হয়। ক্লাইভ তাকে দ্রুত মুর্শিদাবাদ ফিরে গিয়ে রাজকোষ দখলে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। ২৯ জুন ক্লাইভ মুর্শিদাবাদে পৌঁছে মির জাফরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সে হাতে ধরে মির জাফরকে নবাবের আসনে বসিয়ে দেয় এবং কুর্নিশ করে সম্মান প্রদর্শন করে। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নতুন নবাব হিসেবে অধিষ্ঠিত হন মির জাফর। কিন্তু শাসনের নাটাই থেকে যায় ক্লাইভের হাতে। মির জাফর তার অনুগত ভৃত্যের মতো নবাবীর অভিশাপ বয়ে বেড়াতে থাকে।

কিন্তু যার জন্য এতকিছু সেই টাকা কোথায়? মুর্শিদাবাদের কোষাগার হাতড়ে দেখা গেল, চুক্তির পয়সা দেওয়ার মতো অর্থের সেখানে যথেষ্ট অভাব রয়েছে। ফলে নতুন চুক্তি হয়, আপাতত চুক্তির অর্ধেক টাকা দেওয়া হবে। বাকিটা তিন বছরের কিস্তিতে পরিশোধ হবে। সে হিসেবে নগদ ৭৫ লাখ রুপি পরিশোধ করা হয়। বাকি টাকার জামানত গ্রহণ করে জগৎশেঠ। উমিচাঁদের ভাগে কিছুই জুটে না। 

বাকি টাকার যোগান দেওয়ার জন্য মির জাফর তার প্রজাদের লুট করতে শুরু করে। ফলে প্রজাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে অস্থিতরতা। জমিদাররা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। বিদ্রোহ দমনের জন্য পুনরায় হাত পাততে হয় ক্লাইভের কাছেই। কিন্তু ক্লাইভ কেন বিনে পয়সায় সাহায্য করবে? বিনিময়ে সে হাতিয়ে নেয় বিপুল অর্থসম্পদ, বিভিন্ন অঞ্চলের জায়গির এবং কোম্পানির জন্য নানান সুযোগ-সুবিধা। শুরু হয় বাংলায় হরিলুট। যা ধীরে ধীরে স্বর্গসদৃশ এই ভূমিকে ফোকলা করে দিয়ে ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের কাঁচামাল সরবরাহ করতে থাকে। সেই গল্প অন্য কোনো পর্বে বলা যাবে।

চলবে…

সহায়ক বইপত্র

  • কোম্পানি কি হুকুমত, বারি আলিগড়ি
  • দি এনার্কি, উইলিয়াম ড্যালরিম্পল, আনোয়ার ‍হোসেইন মঞ্জু অনূদিত
  • পলাশির ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ, রজতকান্ত রায়
  • ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস, তীর্থংকর রায় 
Write a Comment

মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *