মানব ইতিহাসের ধারায় ভ্রমণকে ভৌগোলিক স্থানান্তরের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়ে থাকে অধিকাংশ সময়। কিন্তু ভ্রমণকে কীভাবে দেখা উচিত? ভ্রমণকে একটি বৌদ্ধিক, আধ্যাত্মিক এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক যাত্রা হিসেবে আমরা দেখতে পারি। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ‘রিহলা’ প্রথা থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব পরবর্তী ট্যুরিজম পর্যন্ত ভ্রমণের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষের অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা সময়ের সাথে সাথে তার রূপ পরিবর্তন করেছে। মিশর বা তুরস্কের মতো একটি প্রাচীন সভ্যতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা নীল নদ বা কায়রোর প্রাচীন অলিগলি অথবা বসফরাস ও তার আশপাশের মহল্লাগুলো পর্যবেক্ষণ করি, তখন সেখানে কেবল স্থাপত্যশৈলিই চোখে পড়ে না, বরং দৃশ্যমান হয় হাজার বছরের সঞ্চিত নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির কয়েক হাজার পরত। এই প্রতিবেদনটি ঐতিহাসিক রিহলা প্রথার গভীর দর্শন, মধ্যযুগীয় পর্যটকদের জ্ঞানতাত্ত্বিক অন্বেষণ এবং আধুনিক পর্যটন শিল্পের যান্ত্রিকতার মধ্যেকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করবে আশা করি।
প্রথম কথায় তাই রিহলা বা ভ্রমণের দার্শনিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে আলাপ করতে পারি আমরা।
আরবি শব্দ ‘রিহলা’ (Rihla) মূলত ভ্রমণ বা পরিভ্রমণকে নির্দেশ করলেও মধ্যযুগীয় ইসলামি ঐতিহ্যে এটি একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ধারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তখন এ নিয়ে লিখিত কিতাবাদি ও বইপত্রের বিষয়বস্তু কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার বিবরণই ছিল না। সেখানে থাকত কালচার ও সভ্যতার গল্প। থাকত হাকিকত ও সত্যের সন্ধান। তখন রিহলা বা ভ্রমণ হয়ে উঠেছিল আধ্যাত্মিক উত্তরণের একটি মাধ্যম। ৯ম শতাব্দী থেকে এই ধারার বিকাশ ঘটে যখন মুসলিম বণিক, হজযাত্রী এবং পণ্ডিতরা জ্ঞান ও বাণিজ্যের সন্ধানে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকেন।
মধ্যযুগীয় ইসলামি বিশ্বে ভ্রমণের একটি অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ‘তলাবুল-ইলম’ বা জ্ঞানের অন্বেষণ। তৎকালীন পণ্ডিতদের বিশ্বাস ছিল, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য কেবল বই পড়াই যথেষ্ট নয়, বরং মূল জ্ঞান বহনকারী বা শিক্ষকদের (বিশেষ করে মুহাদ্দিস) সান্নিধ্যে গিয়ে সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এই প্রথাটি বিশেষ করে হাদিস সংগ্রহ ও যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এক অনন্য বিপ্লব নিয়ে আসে। যেমনটা আমরা ইমাম বুখারি ও অন্যান্য হাদিস সংগ্রাহকদের জীবনে দেখতে পাই।
এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ভ্রমণের ফলে মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্ব একটি বৈশ্বিক জ্ঞান কেন্দ্রে পরিণত হয়। ছাত্ররা প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর দূর-দূরান্তের শহরে ভ্রমণ করতেন এবং বিখ্যাত শিক্ষকদের কাছ থেকে ‘ইজাজা’ (Ijaza) বা শিক্ষকতার সনদ গ্রহণ করতেন। এই গতিশীলতা ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে একটি অভিন্ন ইসলামি সংস্কৃতি ও চিন্তা কাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
দ্বিতীয়ত, ভ্রমণ বা রিহলা যখন থেকে একটি কাঠামোবদ্ধতা নিতে শুরু করে তখন থেকেই পৃথিবীর কয়েকটি বিখ্যাত শহর ছিল এসবের ডেসটিনেশন। সে হিসেবে কায়রো শহরটি ইতিহাসের বিভিন্ন যুগে পর্যটকদের কাছে একটি জাদুকরী আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইবনে বতুতা এবং ইবনে খালদুন উভয়ই এই শহরটিকে তাদের জীবন ও দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখেছিলেন।
ইবনে বতুতার ১৩২৬ সালের কায়রো অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা যখন ১৩২৬ সালে কায়রোতে পা রাখেন, তখন তিনি একে ‘শহরসমূহের জননী’ এবং ‘প্রাসাদ ও অট্টালিকার অতুলনীয় রানি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর লেখায় তৎকালীন মামলুক শাসনামলের কায়রোর এক জীবন্ত চিত্র ফুটে ওঠে, যেখানে তিনি কেবল স্থাপত্য নয়, বরং শহরের ব্যস্ত সামাজিক জীবন এবং জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের বর্ণনা দিয়েছেন।
ইবনে বতুতা কায়রোর ‘মারিস্তান’ বা হাসপাতালগুলোর সেবায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। সুলতান নাসির মুহাম্মাদ বিন কালাউনের হাসপাতালটি ছিল আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি আদি রূপ, যেখানে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হতো। সেখানে রোগীদের বিনোদনের জন্য সংগীতের ব্যবস্থা ছিল এবং পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত শোনানো হতো। ইবনে বতুতার বর্ণনায় কায়রো ছিল এমন এক শহর যা জনসমুদ্রে উত্তাল এবং যার অলিগলি বাজার ও সরাইখানায় ঠাসা।
ইবনে খালদুন কায়রো দেখে বলেছিলেন, ‘যে কায়রো দেখেনি, সে ইসলামের মহিমা দেখেনি।’ তাঁর কাছে কায়রো ছিল মহাবিশ্বের মহানগর এবং মানবতার মৌচাক। তিনি কায়রোকে একটি স্থিতিশীল সমাজ হিসেবে দেখেছিলেন যেখানে জ্ঞান ও সভ্যতার চর্চা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমা’-তে তিনি সভ্যতার উত্থান-পতনের যে তত্ত্ব দিয়েছেন, তার অনেক পর্যবেক্ষণই তিনি মিশরের এই বিশাল জনপদ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন।
মধ্যযুগীয় প্রসিদ্ধ পরিব্রাজকদের অভিজ্ঞতা থেকে বললাম, যারা এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে বেড়িয়েছেন। কীভাবে তারা একেকটা শহরকে পর্যবেক্ষণ করতেন তা অতুলনীয়। সজাগ দৃষ্টি। নিষ্কলুষ মন। এবং একেকটা সত্য পর্যবেক্ষণ। ইবনে বতুতা যখন গৌরে আসলেন, তখন তিনি শাহজালাল এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। গৌর ছিল সিলেটের অংশ। তিনি চিটাগংয়ের বর্ণনা দিয়ে বলেছিলেন, এখানে সমস্ত কিছু সস্তায় মেলে৷ এই দেশে চাল হয় প্রচুর।
তৃতীয়ত, এক শহর থেকে অন্য শহরে জ্ঞানের সন্ধানে যাত্রা ও সফর। ইবনে হাজার আসকালানি ছিলেন মধ্যযুগের একজন শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ এবং ইতিহাসবিদ। ১৩৭২ সালে কায়রোতে জন্মগ্রহণকারী এই পণ্ডিতের জীবন ছিল একটি নিরবচ্ছিন্ন রিহলা। তিনি মাত্র নয় বছর বয়সে কুরআন মুখস্থ করেন এবং এরপর জ্ঞান অর্জনের নেশায় মক্কা, মদিনা, ইয়েমেন, দামেস্ক এবং জেরুজালেম ভ্রমণ করেন। তাঁর শিক্ষা জীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তিনি প্রায় ৬২৮ জন শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেন, যার মধ্যে ৫৫ জন ছিলেন বিদুষী নারী। ফাতিমা বিনতে আল-মানজা আল-তানুখিয়ার মতো নারী শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি অনেক শাস্ত্রীয় গ্রন্থ পাঠ করেছিলেন, যা তৎকালীন মুসলিম সমাজে নারীর জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থানের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইবনে হাজারের মহৎ সৃষ্টি ‘ফাতহুল বারি’ (সহিহ বুখারির ভাষ্য) সমাপ্ত হওয়ার পর কায়রোতে যে উৎসব হয়েছিল, তাকে তৎকালীন ঐতিহাসিকরা ‘যুগের শ্রেষ্ঠ উৎসব’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর এই দীর্ঘ ভ্রমণ কেবল তথ্যের জন্য ছিল না, বরং তা ছিল একটি আধ্যাত্মিক সাধনা যা তাঁকে ‘শায়খুল ইসলাম’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল।
বিবর্তনের ইতিহাস : উমাইয়া থেকে অটোমান যুগ
ইসলামি পরিভ্রমণের ইতিহাস হজ বা জ্ঞান অন্বেষণে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি বিশ্বের মানচিত্র পুনর্গঠন এবং অজানা সভ্যতা আবিষ্কারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এখানে এমন কিছু ব্যক্তিবর্গের নাম উল্লেখ করব যারা হাজার বছর পরও জ্ঞানের উৎস হয়ে আছেন।
ইবনে ফাদলান ও আল-মাসুদি; মানচিত্র ও নৃ-তত্ত্বের সন্ধানে
উমাইয়া ও আব্বাসি যুগে ইবনে ফাদলান এবং আল-মাসুদির মতো পর্যটকরা বিশ্বকে দেখার নতুন চশমা সরবরাহ করেছিলেন। ইবনে ফাদলান ৯২২ খ্রিষ্টাব্দে ভলগা নদী অঞ্চলে ভাইকিং বা ‘রুস’ (Rus) উপজাতির সাথে সাক্ষাৎ করেন। তাঁর বর্ণনায় ভাইকিংদের শারীরিক গঠন, পোশাক, ধর্মীয় আচার এবং জাহাজ পুড়িয়ে মৃতদেহ সৎকারের যে রোমহর্ষক বিবরণ পাওয়া যায়, তা আজও ঐতিহাসিকদের কাছে ভাইকিং সংস্কৃতির প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে আল-মাসুদিকে ‘আরবদের হেরোডোটাস’ বলা হয়। তিনি প্রথম ইতিহাসবিদ যিনি ইতিহাসের সাথে বৈজ্ঞানিক ভূগোলের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তাঁর গ্রন্থ ‘মুরুজ আল-জাহাব’ (Meadows of Gold) একটি বিশ্বকোষীয় রচনা যেখানে তিনি কেবল রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং নৃতাত্ত্বিক ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি নীল নদের উৎস এবং আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলের যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা তৎকালীন মানচিত্র নির্মাণে বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
আব্বাসি আমলের পর মামলুকি সালতনাতের সময় ইবনে বতুতা ও ইবনে খালদুনকে তো সবাই চিনেন। এরপর আমরা যাই অটেমানদের কাছে।
এভলিয়া চেলেবি এবং অটোমান বৈভব
১৭শ শতাব্দীতে অটোমান পর্যটক এভলিয়া চেলেবি তাঁর ১০ খণ্ডের ‘সেয়াহাতনামে’ (Seyahatname) বা ভ্রমণসমগ্রের মাধ্যমে আধুনিক পর্যটনের এক প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি নিজেকে ‘বিশ্ব পরিভ্রমণকারী এবং মানবতার বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। চেলেবি মিশরের নীল নদের প্রতিটি শাখা, কায়রোর প্রতিটি অলিগলি এবং এমনকি নীল নদের উৎস সন্ধানে সুদান ও ইথিওপিয়া পর্যন্ত ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর বর্ণনা ছিল রসে ভরা এবং তিনি কেবল ঐতিহাসিক তথ্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, খাবার এবং লোকজ সংস্কৃতির খুঁটিনাটি তুলে ধরেছিলেন।
এরপর আমরা শিল্প বিপ্লবের যুগে আসি। যখন এই ভ্রমণকে আরও হাতের নাগালে করা হয়। এবং পাশাপাশি এর উদ্দেশ্য পরিবর্তন হতে শুরু করে। শিক্ষা ও তীর্থযাত্রা থেকে সরে গিয়ে উপভোগ ও জীবন জীবিকার হিজরতে পরিণত হতে থাকে ভ্রমণের উদ্দেশ্য।
আধুনিক পর্যটন ও টমাস কুকের প্যাকেজ ট্যুর
ভ্রমণের এই দীর্ঘ ও গভীর ঐতিহ্য ১৮৪১ সালে এক আমূল পরিবর্তনের সম্মুখীন হয় যখন টমাস কুক প্রথম বাণিজ্যিক রেল ভ্রমণ বা ‘প্যাকেজ ট্যুর’ প্রবর্তন করেন। কুকের এই উদ্যোগ ভ্রমণের সংজ্ঞাকে চিরতরে বদলে দেয়।
সহজলভ্যতা বনাম গভীরতার এক নতুন মানদণ্ড দাঁড়ায়
টমাস কুকের হাত ধরে ভ্রমণ মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসে। তিনি ১৮৬৯ সালে মিশরে স্টিমার সার্ভিস চালু করেন, যার ফলে নীল নদ ভ্রমণ ইউরোপীয় পর্যটকদের কাছে একটি ‘পণ্য’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। আধুনিক পর্যটনের এই বিকাশে ভ্রমণের ‘ঝুঁকি’ কমেছে এবং ‘নিরাপত্তা’ বেড়েছে, কিন্তু রিহলার সেই ধ্রুপদী জ্ঞানতাত্ত্বিক গভীরতা কি রক্ষা পেয়েছে?
প্রাচীন রিহলার মুখ্য উদ্দেশ্য থাকত জ্ঞান ও আত্মিক সন্ধান। অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদী অভিযাত্রা এবং সাধারণের জীবনযাত্রার সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া। মানচিত্র, সাধারণ লোকজন ও নক্ষত্রই হতো পথ নির্দেশক।
টমাস কুকের উদ্ভাবিত ‘হোটেল কুপন’ এবং ‘ট্রাভেলার্স চেক’ ভ্রমণের যান্ত্রিকতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা আজকের গ্লোবাল ট্যুরিজমের মূল ভিত্তি। কিন্তু বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর ভ্রমণে আমরা মাটির ঘ্রাণ নেওয়ার চেয়ে ছবির ‘ফ্রেম’ ঠিক করতেই বেশি ব্যস্ত থাকি কি না, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।
নৃ-তাত্ত্বিক স্বচ্ছতা ও মডার্ন মানচিত্রের ডিএনএ
উদাহরণ স্বরূপ আমরা একটা দেশ নিই—মিশর। এই দেশের ভ্রমণে কেবল পিরামিড বা মসজিদ দেখাই যথেষ্ট নয়; এর পেছনের হাজার বছরের নৃ-তাত্ত্বিক ইতিহাস বা ‘ডিএনএ’ বোঝা প্রয়োজন। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, আজকের মিশরের মানুষ এবং হাজার বছর আগের ফারাওদের মধ্যে এক গভীর জিনগত সংযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় মিশরের মমি থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে, যেখানে দেখা যায় যে প্রাচীন মিশরীয়দের সাথে বর্তমানের মিশরীয়দের প্রায় ৮০-৯০% জিনগত মিল রয়েছে। যদিও গত ২,০০০ বছরে উত্তর ও দক্ষিণ দিকের অভিবাসনের ফলে কিছু সংমিশ্রণ ঘটেছে, তবে মূল কাঠামোটি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি পর্যটকদের এই অন্তর্দৃষ্টি দেয় যে, কায়রোর রাস্তায় যে সাধারণ মানুষের সাথে তারা চা পান করছে, তাদের ধমনীতে বইছে সেই একই রক্ত যা পিরামিড নির্মাতাদের দেহে ছিল।
এরকমভাবে বর্তমান সময়ে আমাদের প্রতিটি ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে রাখতে নৃতত্ত্বের সাথে আধুনিকতার সংমিশ্রণ করা আমাদের জন্য অতীব জরুরি। আরও কিছু উদাহরণের মাধ্যমে ব্যপারটা বোঝার চেষ্টা করি।
স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে আত্মপরিচয়
পিরামিড দেখে অথবা সাহারার বালুর কথা শুনে মিশরের স্থাপত্য শুধু পাথরের স্তূপ এরকম ভাবাটা বোকামি হবে। যেকোনো দেশের স্থাপত্য হচ্ছে সে দেশের সভ্যতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়। ১৯শ ও ২০শ শতাব্দীতে মিশরে নিও-মামলুক (Neo-Mamluk) স্থাপত্যশৈলীর বিকাশ ঘটে, যা মামলুক যুগের গৌরব ফিরিয়ে আনার একটি চেষ্টা ছিল। কায়রোর আল-রিফাই মসজিদ বা রামসিস রেলওয়ে স্টেশনের নকশায় এই শৈলীর প্রতিফলন দেখা যায়, এবং বর্তমানে মিশর সরকার সাইয়েদা যায়নাব এলাকায় বিশালাকারে এই প্রজেক্ট চালিয়ে যাচ্ছে। যা প্রমাণ করে যে মিশর তার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সাথে মিলিয়ে নিতে কতটা যত্নশীল।
আমার কাছে মনে, আধুনিক টুরিজমকে আরও আকর্ষণীয় করতে হলে ঐতিহ্যের সাথে বর্তমানের শিকড় গড়ে তোলা আবশ্যক। মানুষ তার শেকড়ের সন্ধান করে।
সে হিসেবে আধুনিক টুরিজমের এক নতুন সংযোজন হচ্ছে ট্যুর গাইড।
নির্দেশক বনাম গল্পকার : ট্যুরিজমের নতুন দর্শন
আধুনিক পর্যটন শিল্পে ‘গাইড’ বা নির্দেশকের ভূমিকা আজ কেবল তথ্য প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানের পর্যটকরা চান একজন ‘গল্পকার’ (Storyteller), যিনি তথ্যকে অনুভূতিতে রূপান্তর করতে পারেন।
ফ্রিম্যান টিলডেনের ব্যাখ্যা তত্ত্বটা এখানে উল্লেখযোগ্য।
ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যার জনক ফ্রিম্যান টিলডেনের মতে, ব্যাখ্যা কেবল তথ্য নয়, বরং এটি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন সত্যের উন্মোচন। একজন দক্ষ গল্পকার পর্যটকের মনে বিস্ময় জাগিয়ে তোলেন এবং তাকে তার নিজের সংস্কৃতির সাথে গন্তব্যের সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করেন। এটা পর্যটন শিল্পে গাইডের এই বিবর্তনের মতো প্রজেক্টের মূল দর্শন, যেখানে গাইড একজন নৃ-তাত্ত্বিক অনুবাদক হিসেবে কাজ করেন। মাটি ও মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করেন। তখন স্থাপত্যের পেছনের মানুষের ত্যাগের গল্প পর্যটককে আবেগপ্রবণ করে তোলে। এবং তার মনে স্থায়ী স্মৃতি তৈরি করে দেয়। তখন কেবল তারিখ বা সাল মনে রাখার চেয়ে একটি চমৎকার গল্প পর্যটকের স্মৃতিতে চিরকাল গেঁথে থাকে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক শ্রদ্ধাও বৃদ্ধি হয়। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের পেছনের দর্শন বুঝতে পারলে পর্যটকদের মধ্যে সেই জাতির প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়। সেজন্য একজন অভিজ্ঞ টুর গাইডের অর্থ হচ্ছে দুটি সংস্কৃতির সেতুবন্ধন।
ভ্রমণের ভবিষ্যতের রূপরেখা কেমন হতে পারে?
ভবিষ্যতের ভ্রমণ হয়তো আরও প্রযুক্তি নির্ভর হবে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হয়তো আমাদের ঘরে বসেই লুক্সর বা কায়রোর অলিগলিতে ঘুরিয়ে আনবে। কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের সরাসরি সংযোগ এবং সেই মাটির স্পন্দন অনুভব করার তৃষ্ণা কখনোই মিটবে না।
মধ্যযুগীয় পর্যটকদের কাছে ভ্রমণ ছিল একটি ‘মিশন’, যা তাদের জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিত। আজকের পর্যটন মূলত একটি অভিজ্ঞতা বা পণ্যের মতন। যা আমরা কেনাকাটা করি। কিন্তু যখন আমরা একটি সুলতানি আমলের মসজিদের উঠানে দাঁড়াই, তখন সেখানে কেবল স্থাপত্যশৈলী দেখলে আমরা পর্যটক হিসেবে ব্যর্থ হই। আমাদের দেখা উচিত সেই যুগের মানুষের ভক্তি, তাদের কারিগরি দক্ষতা এবং তাদের সামাজিক কাঠামো যা ইবনে বতুতা বা ইবনে খালদুনরা দেখেছিলেন।
পাথর থেকে প্রাণে ফেরার এই রিহলা আমাদের জারি রাখা জরুরি। ভ্রমণের অর্থকে মানচিত্রের এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যাওয়া এমনটা বানিয়ে নেওয়া অনুচিত। ভ্রমণ হলো নিজের ভেতরের নতুন এক মানুষকে আবিষ্কার করা। ইবনে বতুতার অজানাকে জানার রোমাঞ্চ আর আধুনিক প্যাকেজ ট্যুরের নিরাপত্তা এই দুইয়ের মধ্যে যে সেতুবন্ধন, তাই হলো প্রকৃত রিহলা। রিহলা প্রজেক্টের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই প্রাচীন গভীরতাকে আধুনিক পর্যটনের সুরক্ষার সাথে মিলিয়ে দেওয়া, যেখানে একটি পিরামিড কেবল পাথর হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত সভ্যতা হিসেবে পর্যটকের সামনে হাজির হবে। মনে রাখতে হবে, ভ্রমণের অর্থ পৃথিবী ঘুরে ঘুরে দেখাই নয়, ভ্রমণ মানে হলো পৃথিবী থেকে শেখা এবং নিজেকে বিশ্বের নাগরিক হিসেবে নতুন করে চিনতে পারা।